শিবকালী ভট্টাচার্যমশায় বলেছিলেন, “ওরে বাবা, গরম জলে কোনো জিনিসকে ভিজিয়ে ভালোভাবে চাপা দিয়ে কিছুক্ষণ রাখার পর গরম থাকতে থাকতে হেঁকে নিলে যে গরম পানীয় পাওয়া যায়, তাকেই প্রাচীন ভারতে বলতো ফান্ট! এদেশের গিরি পর্বতবাসীরা এইভাবেই চা উপভোগ করতেন। এর সঙ্গে দুধ-চিনির কোনো সম্পর্ক ছিল না।”
তা হলে দুধ-চিনির ব্যাপারটা কি আমরা সাহেবদের কাছ থেকে শিখে চায়ের ব্যাপারে অধঃপতিত হলাম?
পটলাদা বললেন, “চায়ের ব্যাপারে ইংরেজ এমন দেমাকী ভাব দেখায় যেন লিপটন ব্রুকবন্ড এঁরাই ইন্ডিয়াকে চা খাওয়াতে শিখিয়ে পতিত জনকে উদ্ধার করলেন। অথচ ১৬৫৯ সালের আগে খোদ লন্ডনেই কোনো চায়ের দোকান ছিল না।
একটু থেমে পটলাদা বললেন, “চায়ের ব্যাপারে আমরা হাওড়ার লোকরাও একটু স্পেশাল গর্ব করতে পারি। শিবপুরের কোম্পানিবাগানেই পলাশির যুদ্ধের তিরিশ বছর পরে কিড সাহেব ভারতের প্রথম চা গাছের পত্তন করেছিলেন।”
“কিন্তু পটলাদা, কিড সাহেব তো জানিয়েছিলেন এ জায়গা চায়ের উপযুক্ত নয়।”
পটলাদা বললেন, “সময় কীভাবে এগিয়ে চলে! এখন আই আই টির প্রচেষ্টায় খোদ খড়গপুরেও চায়ের চাষ হচ্ছে। সেই চা আমিও খেয়েছি, খারাপ লাগেনি!”
শিবকালীবাবু বলতেন, “চায়ের পাতা তিন থেকে পাঁচ মিনিটের বেশি ভেজাতে নেই, তাহলে চায়ের ট্যানিন বেশি আসবে না, কিন্তু বেশি ভেজালেই বা সেদ্ধ করলেই দ্বিগুণ মাত্রায় ট্যানিন ফান্টে চলে আসে।”
অতন্দ্ৰী নামটি নিয়েও সামান্য সন্দেহ থেকে যায়। চা কি মানুষের ঘুম কেড়ে নেয়?
শিবকালী ভট্টাচার্য আমাকে বকুনি লাগিয়েছিলেন। “ওটা তো কফির কথা হয়ে গেল। যাদের ঘুম হয় না তারা রাতে কফিকে বাঘের মতো ভয়। পায়। কিন্তু অতন্দ্রী যখন চা, তখন তার অর্থ হলো, অসময়ের ঢুলু ঢুলু ভাবটা চা পান করলে কেটে যাবে, অথচ শরীরের বিন্দুমাত্র ক্ষতি হবে না।”
অতন্দ্রী না হয় বোঝা গেল, কিন্তু ওই শ্যামপর্ণী ব্যাপারটা? পর্ণ তো আমরা জানি পাতা, কিন্তু কৃষ্ণের নামকেই একটু ভদ্রভাবে শ্যাম বলা?
শিবকালীবাবুর ব্যাখ্যা, শ্যান ঠিক সবুজও নয় আবার কালোও নয়, তারপরই নতুন সারপ্রাইজ দিয়েছিলেন শিবকালীবাবু। “ব্রাদার, সংস্কৃত অভিধান খুললে দেখবে, শ্যাম একটি অতি গোলমেলে শব্দ, এর মানে উজ্জ্বল গৌরও হতে পারে।”
পটলাদার ফান্ট শব্দটি খুব ভাল লেগেছে। “হাজারখানেক বহু ব্যবহৃত সংস্কৃত শব্দকে গরম জলে চুবিয়ে ঢেকে রেখে তৈরি করে রাখলে পাঠক ও লেখক দুই পার্টির খুব উষ্কার হবে।”
পটলাদা আবার স্বামী বিবেকানন্দ প্রসঙ্গে ফিরতে আগ্রহী হয়ে উঠলেন। “মস্ত মানুষ, সবসময় সাধারণ মানুষের সুখ-দুঃখ সাধ-আহ্লাদের কথা ভাবতেন। চায়ের ভক্ত হয়েই বুঝেছিলেন, সারা দেশকে এই পানীয় যথার্থ আনন্দ দিতে পারবে। মনে রাখতে হবে, সেই সময় পণ্ডিতরা চারদিকে চায়ের বদনাম ছড়িয়ে বেড়াচ্ছেন, বলছেন, শরীর স্বাস্থ্যের সর্বনাশ করবে এই নেশা। বিবেকানন্দ উলটোপথের বিপ্লবী, নিজের মঠে মাদকদ্রব্য নিষিদ্ধ করলেও চা-কে সম্মান ও স্বীকৃতি দিলেন। বেদ-বেদান্ত-উপনিষদ পাঠ করো, সেই সঙ্গে চা খাও কোনো ক্ষতি নেই। কিন্তু আমাদের এই হাওড়া সন্ন্যাসীর সঙ্গে এবিষয়ে ভালো ব্যবহার করেনি। বেলুড় মঠের উপস্থিতি যেখানে সেই বালি মিউনিসিপ্যালিটির তঙ্কালীন চেয়ারম্যান মঠের ট্যাক্সো প্রচুর বাড়িয়ে দিলেন, যুক্তি এটা নরেন দত্তের তো বাগানবাড়ি, যেখানে ঘন ঘন চা খাওয়া হয়।”
“অ্যাঁ!”
“অ্যাঁ নয়, স্বামী বিবেকানন্দও অন্যায় সহ্য করবার পাত্র নন, পুরসভার বিরুদ্ধে দিলেন মামলা ঠুকে চুঁচড়ো জেলা কোর্টে। সেই মামলায় মঠে চা পানের ব্যাপারে সাক্ষী-সাবুদ নেওয়া হলো, সাক্ষীরা অস্বীকার করনে না তারা চা খান। জজ সাহেব আধুনিকমনস্ক, বুঝলেন ব্যাপারটা, আলতী নির্দেশে সাহেব ম্যাজিস্ট্রেট ঘোড়ায় চড়ে বেলুড় মঠে তদন্ত করতে এলেন, এবং চা পানের অভিযোগকে পাত্তা দিলেন না।”
“তদন্ত করতে এসে গোরাসাহেব কি বেলুড় মঠে চা পান করেছিলেন?”
“ঠিক জানি না, তুই এ-বিষয়ে বেলুড় বাজারে খোঁজখবর নিয়ে, নথিপত্তর দেখে আলোকপাত করতে পারিস। তবে এটা জেনে রাখ, সেকালের কলকাতায় মণ্ডামিঠাই, কচুরি-জিলিপি-গজার অসংখ্য দোকান ছিল, কিন্তু ছিল না কোনো চায়ের দোকান, ছিলো না ডবল হাফ, ছিলো না ভড়। কিন্তু দূরদ্রষ্টা বিবেকানন্দ সেই কবে ভবিষ্যদ্বাণী করলেন, একদিন পাড়ায় পাড়ায় চপ কাটলেটের দোকান হবে। এবং বুঝতেই পারছিস, চপ কাটলেট টোস্ট এটসেটরার পর চা আসতে বাধ্য, এর উল্লেখ পর্যন্ত প্রয়োজন হয় না। সাহিত্যে এবং শিল্পে একে বলে পরিমিতিবোধ, ঠিক জায়গায় থেমে যেতে পারলে ইঙ্গিতে অনেক বেশি বলা হয়ে যায়।”
পটলাদার সংযোজন, “শুধু আদালতে মামলা করা নয়, চা নিয়ে এদেশে এতো চিন্তা-ভাবনা বিবেকানন্দর মতো কেউ করেননি। লেখার মধ্যে যেখানেই পেয়েছে চায়ের কথা ঢুকিয়েছেন, দুনিয়ার যেখানে গেছেন সেখানে চা-কে মন দিয়ে স্টাডি করেছেন। পরিব্রাজক বইতে স্বামীজি দুঃখ করছেন, চায়ের চল–ইংল্যান্ড ও রাশিয়া ছাড়া অন্যত্র বড়ই কম।…চা পানের ধুম রাশিয়াতে অত্যন্ত–বেজায় ঠাণ্ডা, আর চীন-সন্নিকট। চীনের চা খুব উত্তম চা–তার অধিকাংশ যায় রুশে। রুশের চা-পানও চীনের অনুরূপ, অর্থাৎ দুগ্ধ মেশানো নেই। দুধ মেশালে চা বা কফি বিষের ন্যায় অপকারক। আসল চা-পায়ী জাতি চীনে, জাপানী, রুশ, মধ্য এশিয়াবাসী বিনা দুগ্ধে চা পান করে..তবে রাশিয়ায় তার মধ্যে এক টুকরো পাতি লেবু এবং এক ডেলা চিনি ফেলে দেয়।”
