উনিশ শতকের শেষ দশকে বিলেতে সাহেব-মেমদের চা-বিলাস সম্পর্কে সম্পূর্ণ বিশ্বাসযোগ্য এবং অত্যন্ত উপাদেয় বর্ণনা আমরা মহেন্দ্রনাথের কলম থেকে পেয়েছি।
বিবেকানন্দ তখন বিশিষ্ট সাহেবদের আতিথ্যে বেলা চারটার সময় চা খেয়ে নানা আলাপ-আলোচনায় মগ্ন হতেন।
মহেন্দ্রনাথ, স্বামীজির ক্ষিপ্রলিপিকার গুডউইন, ফক্স ও স্বামী সারদানন্দ একদিন সাড়ে চারটের সময় চা-পানে বসলেন। “বাটিতে একজন বুড়ি ঝি বা হাউস-কিপার ছিল, সে চা লইয়া আসিল। একটা টি-পট করিয়া চা, একটি ছোট জা-এ করিয়া কাঁচা দুধ, পিচ বোর্ডের মতো পাতলা পাতলা মাখন দেওয়া পাউরুটি কাটা ও লাম্প সুগার! আর একটা বড় জাগ-এ গরম জল থাকে; যিনি পাতলা চা খান, তাকে গরম জল দেয়। সাধারণত ইংরেজরা পাতলা চা খায়, বাঙালিদের মতো কড়া চা খায় না। খালাসিরা কড়া চা খায় বলিয়া সেইজন্য তাহাকে ‘সেলার্স টি’ বলিয়া থাকে।”
মহেন্দ্রনাথ আরও লিখেছেন, “গুডউইন কর্তা হইয়া সকলের বাটিতে চা ঢালিয়া দিলেন–সকলেই চা ও রুটি দু’টুকরা করিয়া খাইলেন। ইংরেজের দেশে দুধ গরম করিয়া খায় না, সর্বদা কঁচা থাকে। একবার বর্তমান লেখক গরম দুধ খাইয়াছিলেন কিন্তু এত লবণ বোধ হইতে লাগিলো যে, খাইতে কষ্ট হইতে লাগিলল। গোরুকে ইহারা অতিরিক্ত লবণ খাওয়ায়। ইহারা দুধ কাঁচা খায় বলিয়া বাংলাদেশে যাহাকে দুধের সর বলে তাহা তথায় নাই। সেইজন্য দুধের সরের কোন ইংরাজি কথাও নাই।”
মহেন্দ্রনাথের পরবর্তী ব্যাখ্যা, “চিনি হইতেছে বিট সুগার, অর্থাৎ বিট পালঙের চিনি। এক ইঞ্চি স্কোয়ার এবং তিনখানা রাখিলে কিউব হয়। ইহাকে বলে লাম্প সুগার।…লাম্প সুগার লইবার প্রথা হইতেছে যে, একটি জার্মান-সিলভার বা ঐরূপ কোন সাদা ধাতুর বাহারি চিমটার দুই দিকটা ডগাতে সরু সরু আঙুলের মতো কাঁটা দেওয়া আছে–চিনির টুকরো সেই কাটা দিয়া টিপিয়া ধরিয়া ইচ্ছামতো চায়ের বাটিতে দিতে হয়। হাত দিয়া চিনি তুলিয়া লওয়া নিষিদ্ধ।”
লন্ডনে স্বামী বিবেকানন্দ “একদিন প্রায় বেলা চারটার সময় ফিরিয়া আসিলেন এবং চায়ে দুধ না দিয়া লেবু দিয়া খাইতে লাগিলেন। সিট্রন বা গোঁড়া লেবুর মতো গোল গোল একরকম বড় লেবু হয়, তাহাকে দু’ভাগ করিয়া কাটিয়া জাপানী চার বাটিতে চা ঢালিয়া সেই লেবুর রস ও অল্প পরিমাণে চিনি দিয়া (লাম্প সুগার) স্বামীজি ধীরে ধীরে এক বাটি চা খাইতে লাগিলেন এবং বলিতে লাগিলেন, চা ভাল লাগে না খেতে। আর দুধ দিয়ে চা খাওয়া ঠিক নয়, উহাতে পেটের গোলমাল হয়। আমেরিকায় অনেকে লেবু দিয়া চা খায় সেটা বেশ।”
বিবেকানন্দ এরপর বললেন, “আরে, আমেরিকানদের সব বাড়াবাড়ি। চা খাবে লেবু দিয়ে, তাতে আবার এক চাপ বরফ দেবে। গরমকালে তারা আইস টি খুব খায়। আরে খাবে তত এইটুকু কিন্তু থালায় নেবে এতটা। ওদের সব বেয়াড়া।”
আর এক বিদেশিনী মহিলার লন্ডনে বসে তরিবৎ করে চা পানের বর্ণনা আমাদের হাতের গোড়ায় রয়েছে লেখক মহেন্দ্রনাথের দাক্ষিণ্যে। “মিস মুলার একটি জাপানী বাটিতে গরম জল ঢালিলেন এবং ঝাজরিওয়ালা ছোটদের ঝুমঝুমির মতো হাতলওয়ালা একটি জিনিস লইলেন না। ঝুমঝুমির যেখানে কৌটা থাকে তার ঢাকনি খুলিয়া দিয়া জাপানী চা বা ‘গ্রীন টি’ ভরিয়া দিয়া ঢাকনিটা আবার টিপে বন্ধ করিলেন। সেই জিনিসটি রূপার ছিল, হাতলটি ধরিয়া জাপানী চায়ের বাটিতে গরম জলে ডুবাইয়া মাঝে মাঝে নাড়া দিতে লাগিলেন। খানিকক্ষণ পর বাটির সমস্ত জল বেশ লাল হইয়া উঠিলো এবং তাহাতে দুধ চিনি মিশাইয়া খাইতে লাগিলেন এবং যন্ত্রটা অন্যত্র রাখিলেন।”
চিনি ছাড়া যারা চায়ের কথা ভাবতেও পারেন না তাদের জন্যও সেকালের লন্ডনের বেশ কিছু খবরাখবর আমাদের কাছে রয়েছে। সমসাময়িক কালের জীবনযাত্রার সুনিপুণ ভাণ্ডারী স্বামীজির সঙ্গী এই মহেন্দ্রনাথ! “ভারতবর্ষের চিনি, সাদা বা কালো হইলেও, সবই গুড়া চিনি। আর আমরা যাকে মিছরি বলি, ওরূপ পদার্থ ইংল্যান্ডে নাই। ইংল্যান্ডের চিনি লাল্চে–উহাকে ব্রাউন সুগার বলে। সাদা দোব্রা চিনিও পাওয়া যায়, কিন্তু কম।…আর একরকম চিনি আছে, উপর দিকে মোটা ও নিম্নদিকে সরু–একরকম চোঙ্গার মতো। ইহাকে বলে লোফ সুগার। এই চিনিও যথেষ্ট ব্যবহৃত হয়। লবণের ন্যায় ইহাও জল হইবার আশঙ্কায় চাপ দিয়া চাকা চাকা টুকরা বা ডেলা করিয়া রাখা হয়।”
পটলাদা জিজ্ঞেস করলেন “চিরঞ্জীব বনৌষধির অবিস্মরণীয় লেখক পণ্ডিত শিবকালী ভট্টাচার্যকে চিনতিস তুই?”
“চেনা মানে! আমি তার স্নেহধন্য ছিলাম। স্রেফ ভালবেসে প্রাচীন ভারতের কত খবরাখব্ব দিয়ে গিয়েছেন এই অধমকে। সেসব তথ্য যোগ্য পাত্রে পড়লে সারা বিশ্বে হৈ চৈ পড়ে যেত। শিবকালীই তো বলেছিলেন, একটা নয়, চায়ের পাঁচ-পাঁচটা খাঁটি সংস্কৃত নাম আছে, যা প্রমাণ করে চীনাদের প্রসাদ পেয়ে আমরা চেয়োমাতাল হইনি। এই পঞ্চ নাম আমি মুখস্থ করে রেখেছি, যদি কখনও চায়ের নতুন টি ব্রান্ড চালু করার সময়ে কেউ এই অধমের পরামর্শ চায়–শ্লেষ্মরী, গিরিভিৎ, শ্যামপর্ণী, অতন্দ্রী ও কমলরস! চা প্রসঙ্গে আর একটা শব্দ আমাকে শিখিয়েছিলেন শিবকালীবাবু—‘ফান্ট’।
বেশ উত্তেজিত হয়ে উঠলেন পটলাদা। “সাহেবরা যে ফান্টা’ পানীয় বার করেছে তার একটা প্রাচ্যদেশীয় উৎস সূত্র তাহলে পাওয়া যাচ্ছে।”
