শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ লীলাপ্রসঙ্গের যশস্বী লেখক স্বামী সারদানন্দ ছিলেন চায়ের প্রবল ভক্ত। চায়ে টান না থাকলে অত শক্ত শক্ত বিষয় নিয়ে অমন জলের মতো সহজ বই লেখা যায় না।
বিবেকানন্দ-ভ্রাতা মহেন্দ্রনাথ একবার সারদানন্দকে প্রশ্ন করেছিলেন, “তুমি এতো চা খেতে শিখলে কোথা থেকে?”
এবার একটি বৃহৎ বিস্ফোরণ। স্বামী সারদানন্দের উত্তর: “তোমার ভাইয়ের পাল্লায় পড়ে। তোমাদের বাড়িতে যে চায়ের রেওয়াজ ছিল সেইটা বরাহনগর মঠে ঢুকিয়ে দিলে, আর আমাদের চাখোর করে তুললে। তোমরা হচ্ছে একটা নার্কটিকের ফ্যামিলি।”
মহেন্দ্রনাথের জন্ম ১৮৬৮ সালে। তার লেখা থেকেই দেখা যাচ্ছে, বঙ্গ জীবনের অঙ্গ হিসেবে চায়ের স্বীকৃতি মাত্র সেদিনের। “আমরা যখন খুব শিশু তখন একরকম জিনিস শোনা গেল–চা, সেটা নিরেট কী পাতলা কখনও দেখা হয়নি। আমাদের বাড়িতে তখন আমার কাকীর প্রসব হইলে তাহাকে একদিন ঔষধ হিসেবে চা খাওয়ানো হইল। একটি কালো মিসে (কেটলী) মুখে একটি নল দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে আর তার ভিতর কুঁচো পাতার মোন কি দিলে, গরম জল দিলে, তারপর ঢাললো। একটু দুধ চিনি দিয়ে খেলো।” মহেন্দ্রনাথ এরপরই জানিয়ে দিয়েছে তখন চীন থেকে চা আসতো, “ভারতবর্ষে তখন চা হয়নি।”
পটলাদা বললেন, “শেষ কথাটা ঠিক সত্যি নয়। কারণ আমরা এর আগেই দেখেছি কলকাতার দূরদর্শী বাঙালি ব্যবসায়ীরা এবং স্বয়ং প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর এর আগেই চায়ের ব্যবসার জন্যে বিখ্যাত আসাম কোম্পানির সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে। একদা ভুবনবিদিত এই কোম্পানির প্রতিষ্ঠা ১৮২০ সালে। আরও দেখা যাচ্ছে, স্বয়ং বিবেকানন্দর বয়স যখন এক তখন এদেশ থেকে তিরিশ লক্ষ পাউন্ড মূল্যের চা লন্ডনের মিনসিং লেনের নীলামে বিক্রির জন্য পাঠানো হচ্ছে।
তবে মহেন্দ্রনাথ যা বলেছেন, প্রথম পর্বে এদেশের সব চা ছিল দেবভোগ্য, অতএব তাদের গন্তব্যস্থল সোজাসুজি লন্ডনের মিনসিং লেনে।”
চায়ের গল্পে বাড়তি চিনি মেশালেন পটলাদা। বললেন, নরেন্দ্রনাথ যে অল্পয়বয়সে পাকা চাখোর হয়ে উঠছেন তার সাক্ষীও মহেন্দ্রনাথ। দ্যাখ, বড়দা একবার নিলামে ফিরিঙ্গিপাড়া থেকে পাঁচ আনা দিয়ে কেটলি কিনে আনলো। উপরটা কালিঝুলি মাখা, যেন অচ্ছেদ্দা, অবহেলার জিনিস। ওমা, ভুসোগুলো চাচতে চঁচতে দেখি, ভিতরটা খাঁটি রুপো।”
যখন নরেন্দ্রনাথের পিতৃবিয়োগের পর পরিবারে প্রবল অর্থাভাব তখনও দত্তবাড়িতে আমরা চায়ের মস্ত ভূমিকা দেখতে পাচ্ছি!– বন্ধু কালী (পরে স্বামী অভেদানন্দ)-কে নিয়ে রামতনু বসু লেনের বাড়িতে এসেছেন নরেন্দ্রনাথ। অভাবের সংসার, কিছু খাওয়ার সুযোগ জুটলো না। এদিকে প্রবল ঠাণ্ডা। গভীর রাতে ক্ষুধার তাড়নায় এবং শীতে
অতিথির প্রাণ ওষ্ঠাগত। তখন নরেন্দ্রনাথ শীত ও ক্ষুধাকে একই সঙ্গে বিতাড়নের জন্য কোথা থেকে কেটলি যোগাড় করে এনে চা বানালেন, তখনকার মতন সঙ্কট কাটলো। মনে রাখতে হবে তখন এল পি জি বা বিদ্যুৎ কোনটাই কলকাতায় আসেনি, সুতরাং মাঝরাতে চা বানানো খুব সহজ ব্যাপার ছিল না।
পটলাদা চা নিয়ে যে বিশেষ গবেষণা চালিয়েছে তাতে কিছু বিশেষ খবরও পাওয়া যাচ্ছে। পরবর্তীকালে স্বামী সারদানন্দ বলছেন, “ওহে! শিবরাত্রির উপোস করে আমাদের চা খেতে কোনও দোষ নেই। কেন জান?”
যেদিন কাশীপুরে শ্রীরামকৃষ্ণের দেহত্যাগ হয় (১৮৮৬, ১৬ আগস্ট) সকলেই বিষণ্ণ, খাওয়া-দাওয়া কিছু হলো না। কেই বা উনুন জ্বালে? আর কেই বা রান্না করে। অবশেষে দরমা জ্বালিয়ে কেটলি করে জল গরম করে চা করা হলো, আর ঢকঢক করে খাওয়া গেলো। অমন শোকের দেহত্যাগের দিনেও চা খেয়েছিলুম তো শিবরাত্রির সামান্য উপোস করে চা কেন খাওয়া চলবে না বলো?”
পটলাদা বললেন, “গয়া থেকে ফিরে স্বামীজির এক গুরুভাই চা-কে এমনই গুরুত্ব দিয়েছিলেন যে, চা দিয়ে তর্পণ করলে কেমন হয় তার এক্সপেরিমেন্টও করেছিলেন। স্বয়ং স্বামীজির পাশে বসে বরানগরে স্বামী শিবানন্দ মন্ত্রপাঠ করলেন, অনেন চায়েন।”
কিন্তু প্রশ্ন উঠলো চা স্ত্রীলিঙ্গ কিনা? সেক্ষেত্রে তো বলা উচিত, অনয়া চায়য়া!
বরানগরে ভাত জুটুক না জুটুক ত্যাগী সন্ন্যাসীদের চা খাওয়ার ধুম ছিল, গুঁড়ো চা কিছুটা সবসময় থাকতো, আর ছিল তলায় খুরো দেওয়া কয়েকটা গোল চীনামাটির বাটি। তখনকার কাপে আজকের কাপের মতন হাতল থাকতো না, এটা স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে!
আর একজন সন্ন্যাসী পরিব্রাজক আসাম ভ্রমণে বেরিয়ে চায়ের নতুন গুণাবলী আবিষ্কার করেছিলেন। “আমরা যেমন ভাতের সঙ্গে ঝোল খাই, তেমন কোথাও কোথাও ঝোলের বদলে ভাতের সঙ্গে চা মেশায়।”
আর এক পরিব্রাজক সন্ন্যাসী আরও দুঃসাহসী হয়ে তিব্বতে গিয়েছিলেন। তিব্বতীরা চা নিয়ে অনেক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছে। তারা একটি হাঁড়িতে জল দেয়, তাতে ব্রিক-টি বা জমাট করা চা খানিকটা ফেলে দেয়। তারপর শুকনো মাংসের গুঁড়ো দেয়, তারপর ছড়িয়ে দেয় ছাতু। সবটা টগবগ করে ফুটলে দেয় মাখন। ভারি রসিক জাত এই তিব্বতী, হাড়ে হাড়ে বুঝেছে চায়ের কদর, তাই সর্বদা সঙ্গে রাখে একটা গরম করার পাত্র, যার নাম ‘সামবার। খানদানি তিব্বতী যেখানে বসবে সেখানে একটু চা তৈরি হবেই।
এতো সব অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেও চায়ের কাহিনী যে শেষ হয় না তা আমরা দেখতে পাচ্ছি লন্ডনে স্বামী বিবেকানন্দের জীবনযাত্রার মধ্যে। সময় ১৮৯৬ সাল, বিবেকানন্দের সঙ্গে লন্ডনে দেখা হয়ে গেল ভ্রাতা মহেন্দ্রনাথের। তিনি ওখানে হঠাৎ গিয়েছেন ব্যারিস্টারি পড়বার বাসনা নিয়ে।
