“কী সে জিনিস?”
বুঝতে পারলেন না? গঙ্গাজল! একটা ছোট্ট শিশিতে ভরা গঙ্গাজলই ছিল বিশ্বপথিক বিবেকানন্দর চিরসাথী, তার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য শক্তি!
অতএব এইটা দিয়েই শেষ করা যাক রসনারসিক বিবেকানন্দের এই পর্বের কথা।
৩. সন্ন্যাসীর চা পান
চা বনাম কফি! যেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বনাম হরিদাস পাল! তুলনার যোগ্যই নয়। কিন্তু ঢাকঢোল নিরন্তর বাজাতে পারলে একুশ শতকের বাজারে সব অসম্ভবই সম্ভব হয়ে ওঠে! যেমন ধরুন আমরা মিষ্টি দইকে ছেড়ে দিয়ে আইসক্রিমের দিকে ঝুঁকে পড়লাম এই ক’বছরে। রসনার রণাঙ্গণে স্বয়ং স্বামী বিবেকানন্দের দেশবাসীরা এমন বেরসিক কাজ কিভাবে করে ফেলেলেন তা খোঁজবার জন্যে কমিশন বসানো যেতে পারে–মাননীয় সুপ্রিম কোর্টের মাননীয় অবসরপ্রাপ্ত বিচারকগণ হুশিয়ার!
সারাজীবন চা-প্রেমী, আমাদের হাওড়া ইস্কুলের সিনিয়র পটলাদা সেবার আমাকে বলেছিলেন, “দূরদর্শী সাহেবরা অনেকদিন আগেই কিন্তু সাবধান করে দিয়েছেন, নিরেস জিনিস সব সময়ই সরেসকে বাজার থেকে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দেয়। এইটাই ভবিতব্য, এইটাই গ্রেশাম সাহেবের আইন। প্রথমে তিনি টাকা সম্বন্ধে একথা বলেছিলেন, পরে দেখা গেল জীবনের সর্বক্ষেত্রে একই আইনের অমোঘ শাসন চলছে!”
পটলাদা উঁচু ক্লাসে হাওড়া বিবেকানন্দ ইনস্টিটিউশনে পড়তেন তা আপনাদের অজানা নয়। খাওয়াদাওয়া সম্বন্ধে তার যে একটু বাড়তি কৌতূহল ছিল তাও আপনারা জানেন। ইস্কুলের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে নেতৃত্ব দিতে গিয়ে পটলাদার ব্রেক ফেল করতো, নির্ধারিত কোটার একটু বেশি খেয়ে ফেলতেন; তাই ছাত্রমহলে একটু বদনামও ছড়িয়েছিল। আমার ভাবমূর্তিতেও কালিমা লেপন উচিত ছিল, কিন্তু পটলাদা বলতেন, তুই মুখুজ্যে বামুন, অতিভোজনে তোর তো জন্মগত অধিকার! মুশকিল হলো, তোর লোভ আছে কিন্তু সাহস নেই, তাই ইস্কুলের কোন অনুষ্ঠানে একাধিক প্রসাদ প্যাকেট তুই তুলে নিতে পারিস না, ফলে তোর নোলার নিবৃত্তি হয় না। আমি ক্ষত্রিয় তেজে যা প্রাণ চায় তা করে ফেলি। মাঝে মাঝে বিপদে পড়ে যাই।
পটলাদা ও আমার মধ্যে সেই স্কুলজীবন থেকে অবিচ্ছেদ্য ভালবাসা গড়ে উঠেছিল। পটলাদা তখন থেকেই স্বামী বিবেকানন্দের জীবনের নানা দুষ্প্রাপ্য ঘটনাবলী নিয়ে খোঁজখবর করে বলতেন, এই একটা লোকই দুনিয়ার সমস্ত অনাহারী অর্ধাহারী লোকদের মুখে অন্ন তুলে দিতে ব্যাকুল হয়ে উঠেছিলেন। পটলাদার মন্তব্য, শুধু কর্মযোগ, জ্ঞানযোগ, ভক্তিযোগ এটসেটেরা নয়, মানুষটা দুনিয়ার সবাইকে খাওয়াতে ভালবাসতেন। পটলাদাই আমাকে বলেছিলেন, এ-সংসারের কিছু স্বার্থপর লোক চিরকাল কণ্ঠা-থেকে কুঁচকি পর্যন্ত খাবারে বোঝাই করেছে, কিন্তু ভুলেও অপরের খিদের কথা একটু ভাবেনি।
পটলাদার শব্দ প্রয়োগে একটু কর্কশভাব রয়েছে বলতে গিয়ে ধাক্কা খেলাম। পটলাদাই জানালেন, কণ্ঠা-থেকে কুঁচকি শব্দটি স্বামী বিবেকানন্দই সানন্দে সৃষ্টি করেছেন।
বিমুগ্ধ আমি পটলাদাকে যে নোট বই উপহার দিয়েছিলাম, সেই বইতেই বহু বছর নিষ্ঠার সঙ্গে ধরে তিনি ভোজন, অতিভোজন ও অনাহার সম্বন্ধে নানা তথ্য সংগ্রহ করে যাচ্ছেন।
অনাহার ও অর্ধাহার সম্বন্ধে ভাবনা-চিন্তা করে অর্থনীতিতে নোবেল পাওয়ার জন্য আমাদের সমবয়সী একজন ভারতীয় যে সেই পঞ্চাশের মন্বন্তর থেকে কাজ করে যাচ্ছেন তা জানা থাকলে পটলাদা কোনোসময়ে তার নোটবইটা অমর্ত্য সেনের ঠিকানায় পাঠিয়ে দিতেন। অসুবিধাও ছিলো না, কারণ স্বয়ং পটালাদাও ভাগ্যচক্রে এন আর আই হয়েছেন, নিজের এবং পরিবারের অন্নসমস্যার সমাধান করেছেন, কিন্তু বিবেকানন্দের খাওয়া-দাওয়া এবং খাওয়ানো দাওয়ানো সম্পর্কে নানা তথ্য তিলে তিলে ইউরোপে, আমেরিকায় এবং ভারতীয় উপমহাদেশে সংগ্রহ করে চলেছেন।
পটলাদা মাঝে মাঝে অল্প সময়ের জন্য বিদেশ থেকে হাওড়ায় এসে আমার সঙ্গে ভাব বিনিময় অব্যাহত রেখেছে। ইদানীং তিনি লক্ষ্য করেছেন রামকৃষ্ণ সঙ্ঘের সন্ন্যাসীরা উদার হস্তে অতিথিদের চা-পানে আপ্যায়িত করেন। তার থেকেই পটলাদার সাজেশন, “আমাদের চা এবং চায়ের আমরা–এবিষয়ে আমিও একটু মাথা ঘামাই।”
উত্তম প্রস্তাব। উনিশ ও বিশ শতকের শ্রেষ্ঠ বাঙালিরা প্রায় সবাই চা বলতে অজ্ঞান, এমন কি যাঁরা বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিতে ‘চা-পান না বিষপান’ এই প্রশ্ন তুলতে বাধ্য হয়েছে তারাও প্রাণভরে চা খেতে থেকে তাদের চা বিরোধী বক্তব্য পেশ করেছেন। রবীন্দ্রনাথ ও বিবেকানন্দ দুজনেই চা-পান থেকে অনুপ্রেরণা লাভ করেছেন, যদিও দু’জনের চানুরাগের মধ্যে তাদের নিজস্ব ব্যক্তিত্বের ছাপ রেখে গিয়েছেন। চাইনিজ চা, জাপানী চা, ভারতীয় চা ইত্যাদির সমন্বয়ের মধ্যে বিশ্বকবি তাঁর বিশ্বপথিকের দৃষ্টিভঙ্গি অক্ষত রেখেছেন আর স্বামী বিবেকানন্দের কাছে আমাদের কৃতজ্ঞতার কারণ, তিনি যথেষ্ট চা-কে মাদকাশক্তির কালিমা থেকে মুক্তি দিয়েছেন। মুক্তিসন্ধানী সন্ন্যাসীদের কাছেও কোনোক্রমে নিষিদ্ধ পানীয় নয় এই চা। যদিও এ বিষয়ে উচ্চতম স্তরে সরসিকতা করেছেন রামকৃষ্ণানুরাগী মহাকবি গিরিশচন্দ্র ঘোষ। নিজের পানাসক্তির দুর্বলতাকে লুকিয়ে না রেখে তিনি প্রকাশ্যে বলেছেন, বিশ্ব সংসারে ‘মোদোমাতাল’-এর মতো ‘চেয়োমাতাল’ও আছেন অনেক। বিবেকানন্দ-ভ্রাতা দার্শনিক ও সুরসিক মহেন্দ্রনাথ দত্ত নিজেকে চেয়োমাতাল বলে মেনে নিতে লজ্জাবোধ করেননি।
