নিরামিষ ঝোল, যাকে অনেকে ঝালের ঝোল বলেন, তা স্বামীজি খুব ভালবাসতেন এবং সে নিয়ে নানা সময়ে নানা এক্সপেরিমেন্ট করেছেন। জগদ্বিখ্যাত হওয়ার পরেও দলবল নিয়ে মা-দিদিমার কাছে চলে আসতেন শুকতো এবং মোচার ডানলা খাবার জন্যে। মায়ের এঁটো নিরিমিষ খেতে একদিন এমন সময় এলেন যখন মায়ের পাতে খাড়া ছাড়া আর কিছুই নেই, তাই আনন্দ করে খেলেন, যদিও স্নেহময়ী মা বললেন, একটু আগে আসতে হয়।
সুযোগ পেলে স্বামীজি বাগবাজারে এসে যোগীন-মায়ের কাছে আসতেন পুঁইশাক চচ্চড়ি দিয়ে ভাত খেতে। যোগীন মা যখন কাশীতে ছিলেন তখনও স্বামীজি তার বাড়িতে হাজির হয়ে বলতেন, “যোগীন-মা, এই তোমার বিশ্বনাথ এলোগা!” আবার কোনোদিন গিয়ে বলতেন, “আজ আমার জন্মতিথি গো! আমায় ভাল করে খাওয়াও। পায়েস করো।”
আরও পছন্দের জিনিস ছিল–কই মাছ। সিমলের দত্তবাড়ির বিখ্যাত রসিকতা কই দুরকমের, শিখ কই, গুখ কই–প্রথমটি লম্বা, দ্বিতীয়টি বেঁটে কিন্তু প্রচুর শাঁস।
প্রথমবার আমেরিকায় যাবার জন্যে বোম্বাইতে জাহাজে চড়বার আগে স্বামীজির হঠাৎ কই মাছ খাবার ইচ্ছে হলো। বম্বেতে তখন কই মাছ পাওয়া কঠিন ব্যাপার। ভক্ত কালিপদ ঘোষ ট্রেনে লোক পাঠিয়ে অনেক কষ্টে বিবেকানন্দকে কই মাছ খাওয়ানোর দুর্লভ সৌভাগ্য অর্জন করলেন। কোনো কোনো ভক্তের বাড়িতে গিয়ে তিনি নিজেই মেনু ঠিক করে দিতেন। কুসুমকুমারী দেবী বলে গিয়েছেন, “আমার বাড়িতে এসে কলায়ের ডাল ও কই মাছের ঝাল পছন্দ করেছিলেন।” . কিন্তু পুঁইশাক ও ইলিশ এক মহাপরাক্রান্ত জুটি, যাকে বলে কিনা ডেডলি কম্বিনেশন! আমেরিকান বা জার্মান স্কলার হলে পুরো একটা ডক্টরেট থিসিস হয়ে যেতো, তারপর ভক্তরা গিয়ে সেই বইয়ের ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়তেন, সায়েবদের লেখা সম্বন্ধে, ভারতীয়দের যা দুর্বলতা!
স্বামীজির পছন্দ অপছেন্দর ক্ষেত্রে কলায়ের ডাল ও কই মাছের দুর্দান্ত প্রতিযোগী অবশ্যই ইলিশ ও পুইশাক। মহাসমাধির অনেকদিন পরেও এক স্নেহময়ীর অনুশোচনা, “পুইশাক দিয়ে চিংড়ি মাছ হলেই নরেনের কথা মনে পড়ে যায়।”
যেমন চাবি আর তালা, হাঁড়ি আর সরা, হর আর পার্বতী তেমনি এই ইলিশ আর পুইশাক স্বামীজির জীবনে। কান টানলেই যেমন মাথা আসবে, তেমন ইলিশ এলেই পুইশাকের খোঁজ করবেন স্বামীজি। শুনুন এলাহাবাদের সরকারি কর্মচারী মন্মথনাথ গঙ্গোপাধ্যায়ের স্মৃতিকথা।
একবার স্বামীজি স্টিমারে গোয়ালন্দ যাচ্ছেন; একটা নৌকোয় জেলেরা ইলিশ মাছ জালে তুলছে। হঠাৎ বললেন, ‘বেশ ভাজা ইলিশ খেতে ইচ্ছে হচ্ছে। সারেঙ বুঝে গিয়েছে সব খালাসিদের খাওয়ানোর ইচ্ছে স্বামীজির। দর করে জানাল, এক আনায় একটি তিনটি-চারটিই যথেষ্ট। স্বামীজি বললেন, তবে এক টাকার কেন। বড় বড় ইলিশ ষোলটি, তার সঙ্গে দুচারটি ফাউ।
স্টীমার এক জায়গায় থামানো হলো। স্বামীজি অমনি বললেন, ‘পুঁইশাক হলে বেশ হতো, আর গরম ভাত। কাছেই গ্রাম। একটি দোকানে চাল পাওয়া গেল, কিন্তু সেখানে বাজার বসে না, কোথায় পুঁই? এমন সময় এক ভদ্রলোক বললেন, ‘চলুন, পুইশাক আমার বাড়ির বাগানে আছে। তবে একটি শর্ত। স্বামীজিকে একটিবার দর্শন করাতে হবে।
ভেবেচিন্তে দেখলে স্বামীজির প্রিয় খাদ্যতালিকায় শেষপর্যন্ত ফাঁইনাল রাউন্ডটা শুকতো-মোচার ডানলা ভারসাস ইলিশ-পুইশাক। আইসক্রিমটা সেমি-ফাইনালে হেরে গেল এই কারণে যে শেষপর্ব স্বামীজির রক্তে সুগার, আইসক্রিম খাওয়া নিশ্চয় নিষিদ্ধ।
স্বর্ণপদকটা ইলিশ-পুঁইশাকই পাবে এমন মনে হওয়াটাই স্বাভাবিক। কারণ আমরা দেখছি গোয়ালন্দের পথে স্টিমারে পুইশাক সরবরাহ করায় স্বামীজি এমনই খুশি হয়েছিলেন যে সেই দিনই ফিরবার পথে পুঁইবাগানের মালিককে তিনি দীক্ষা দিয়েছিলেন। ভাগ্যবান ভক্তটি বলেছেন, আমাকে কৃপা করবেন বলেই স্বামীজির মাছ ও পুঁইশাক খাবার কথা মনে উঠেছিল।
পুঁইশাকের বদলে দীক্ষা! মস্ত কথা, এই পদটিরই গোল্ডমেডাল পাওয়া উচিত। কিন্তু মা-দিদিমার কাছে শুকতো-মোচার ডানলা খেয়ে স্বামীজি যে মারাত্মক কথা বলেছিলেন তা গবেষকদের নজর এড়িয়ে গিয়েছে। নিরামিষ খেয়ে স্বামীজি প্রকাশ্যে বলেছিলেন, “বাংলা দেশের এই দুটোর জন্যে আবার কিন্তু জন্ম নেওয়া যায়।” গোল্ডমেডালটা ওখানেই দেওয়া ছাড়া পথ নেই, কারণ পুনর্জন্ম নিয়ে ক্ষণজন্মা পুরুষরা কখনও রসিকতা করবেন না।”
শেষমুহূর্তে আর একটা সারপ্রাইজ দেওয়া নিতান্ত প্রয়োজন। শুকতো মোচাই বলুন, কই মাছই বলুন, ইলিশ পুঁইশাকই বলুন, আইসক্রিমই বলুন, স্বামীজির কাছে সব থেকে মূল্যবান এবং বোধ হয় সবচেয়ে প্রিয় জিনিসটি এতোক্ষণ আমাদের নজরের আড়ালে থেকে গিয়েছে।
সাধক সন্ন্যাসী, জগতের হিতের জন্য তার সংসারে আসা এবং জীবনধারণ। একটি ছোট্ট জিনিস তিনি সবসময় নিজের কাছে রাখতেন, প্রবাসের মাটিতে তাকে একটি ছোট্ট শিশি থেকে কিছু পান করতে দেখা গিয়াছে। স্বদেশে এবং প্রবাসে নিত্যসাথী এই দুর্লভ বস্তুটি সম্বন্ধে সন্ন্যাসী বিবেকানন্দর একান্ত স্বীকারোক্তি : কখন প্রয়োজন হবে ঠিক নেই, তাই সবসময় সঙ্গে, যখনই সুযোগ পেয়েছি তার সদ্ব্যবহার করেছি। অগণিত মানুষের জনস্রোতে, সভ্যতার বিস্ফোরণের কছে দাঁড়িয়ে, লক্ষ লক্ষ মানুষের দুরন্ত পদক্ষেপে নিষ্পেষিত হবার সম্ভাবনাময় মুহূর্তে আমি শান্ত হয়ে গিয়েছি, আমি স্থির হতে পেরেছি, দু’একটি ফোঁটায়।
