উৎসাহীদের পরবর্তী প্রশ্ন : “বিবেকানন্দ তোবুঝতে পারছি, দুনিয়ার সর্বত্র শত শত রান্নার মাধ্যমে বিশ্বপ্রেমের প্রকাশ ঘটিয়েছেন। কিন্তু তার ম্যাগনাম ওপাস কোষ্টা? ওঁর কোন্ রান্নাকে বিশেষজ্ঞরা এক নম্বরে ফেলবেন?”
খুবই কঠিন প্রশ্ন। তবে মানসকন্যা নিবেদিতা এবং রবীন্দ্রনাথের ভাগ্নী সরলা ঘোষালকে এক রবিবারে তিনি যে লাঞ্চ খাইয়েছিলেন তার বোধ হয় তুলনা নেই। একটা লাঞ্চের মধ্যে সারাবিশ্বের ছায়া নামিয়ে এনেছিলেন বিশ্বপথিক বিবেকানন্দ।
সময় মার্চ ১৮৯৯, স্থান বেলুড় মঠ। এই লাঞ্চের মাত্র কয়েকদিন আগে বিনা নোটিসে সিস্টার নিবেদিতাকে তিনি সাপার খাইয়েছিলেন বেলুড়ে। তার মেনু : কফি, কোল্ড মাটন, ব্রেড অ্যান্ড বাটার। স্বয়ং স্বামীজি পরম স্নেহে পাশে বসে খাইয়ে নিবেদিতাকে বোটে করে কলকাতায় ফেরত পাঠিয়েছিলেন। আর রবিবারের সেই অবিস্মরণীয় লাঞ্চের ধারাবিবরণী নিবেদিতা রেখে গিয়েছেন মিস ম্যাকলাউডকে লেখা এক চিঠিতে। “সে। এক অসাধারণ সাফল্য! তুমি যদি সেখানে থাকতে!” স্বয়ং স্বামীজি রান্না করেছেন, পরিবেশনও তিনি নিজে করলেন। “আমরা দোতলায় একটা টেবিলে বসেছি। সরলা পুবমুখো হয়ে বসেছিল যাতে গঙ্গা দেখতে পায়।”
এই ভোজনের নাম নিবেদিতা দিয়েছিলেন ‘ভৌগোলিক’ লাঞ্চ, কারণ সারা বিশ্বের রান্না একটি টেবিলে জমায়েত হতে শুরু করেছে। সব বেঁধেছেন স্বামীজি। রাঁধতে রাঁধতে তিনি একবার নিবেদিতাকে তামাক সাজতে নির্দেশ দিয়েছেন। শুনুন সেই অবিস্মরণীয় মেনুর কথা।
১। আমেরিকান অথবা ইয়াঙ্কি–ফিস্ চাউডার।
২। নরওয়েজিয়ান ফিস বল বা মাছের বড়া–”এটি আমাকে শিখিয়েছেন ম্যাডাম অগনেশন”–স্বামীজির রসিকতা।
“এই ম্যাডামটি কে স্বামীজি? তিনি কি করেন? মনে হচ্ছে আমিও যেন ওঁর নাম শুনেছি!” উত্তর : “আরও কিছু করেন, তবে সেই সঙ্গে রাঁধেন ফিস্ বল।”
৩। ইংলিশ না ইয়াঙ্কি? –ববার্ডিং হাউস হ্যাঁশ। স্বামীজি আশ্বাস দিলেন ঠিকমতন রান্না করা হয়েছে এবং পেরেক মেশানো হয়েছে। “কিন্তু পেরেক? তার বদলে আমরা পেলাম লবঙ্গ!–আহা পেরেক না থাকায় আমাদের খুব দুঃখ হতে লাগলো।”
৪। কাশ্মিরী মিনল্ড পাই আ লা কাশ্মির। (বাদাম ও কিসমিস সহ মাংসের কিমা!)
৫। বেঙ্গলি রসগোল্লা ও ফল। রান্নার বিবরণ শুনলে বিস্মিত হবারই কথা। মানুষটা কত রকমভাবে বিশ্বকে বোঝবার ও জানবার চেষ্টা করেছেন!
সোজা কথাটা হলো, রান্নার বিবেকানন্দকে না জানলে ঈশ্বরকোটি বিবেকানন্দকে জানা যায় না, প্রেমের সাগর বিবেকানন্দকে বোঝা যায় না।
ভক্তিমতি নিবেদিতাকে মহাপ্রস্থানের ঠিক আগে নেমন্তন্ন করে বিবেকানন্দ যে রান্না খাইয়েছিলেন তাতে ছিল কাঁঠালবিচি সেদ্ধ। আরও যা সব খাইয়েছিলেন তার বিবরণ যথাস্থানে লিপিবদ্ধ রয়েছে, একটু কষ্ট করলেই পাঠক-পাঠিকারা জানতে পারবেন, সব কোশ্চেনের উত্তর একসঙ্গে না লিখে দেওয়াই ভাল।
স্বামী বিবেকানন্দ কি মহাপ্রয়াণের কিছু আগে পাঁউরুটি নিয়েও প্রচণ্ড গবেষণা শুরু করেছিলেন?”
উত্তর : ইয়েস। একসময় তিনি লুচি কচুরির সঙ্গে পাঁউরুটিকেও প্রবল সন্দেহের চোখে দেখতেন। তিনি নিজের হাতে লিখেছেন : “ঐ যে পাঁউরুটি উনিও বিষ, ওঁকে ছুঁয়ো না একদম। খাম্বীর (ইস্ট) মেশালেই ময়দা এক থেকে আর হয়ে দাঁড়ান। …যদি একান্ত পাঁউরুটি খেতে হয়
তো তাকে পুনর্বার খুব আগুনে সেঁকে খেও।”
স্বামীজির মধ্যে ছিল বৈজ্ঞানিকের অনুসন্ধিৎসা ও খোলা মন, নিশ্চয় কিছু মাথায় ছিল, তাই বেলুড় মঠে তৈরি পাঁউরুটির নমুনা পাঠিয়ে দিয়েছিলেন নিবেদিতার বাগবাজারের ঠিকানায় দেহাবসানের ঠিক আগে।
৪ঠা জুলাই ১৯০২ শুক্রবার শেষ মধ্যাহ্নভোজনে স্বামীজি কি গ্রহণ করেছিলেন?
অবশ্যই ইলিশ মাছ। জুলাই মাস, সামনেই গঙ্গা, ইলিশ মাছ ছাড়া অন্য কিছু রান্না হলেই তো পৃথিবী বলতো মানুষটা বেরসিক! আসন্ন বিয়োগান্ত নাটকের পরিণতির কথা কেউ জানেনা ৪ঠা জুলাই-য়ের সকালবেলায়। স্বামী প্রেমানন্দর বর্ণনাটা পড়বার মতন:”গঙ্গার একটি ইলিশ মাছ এ বৎসরে প্রথম কেনা হল, তার দাম নিয়ে আমার সঙ্গে কত রহস্য হতে লাগল। একজন বাঙাল ছেলে ছিল তাকে বললেন-”তোরা নতুন ইলিশ পেলে নাকি পূজা করিস, কি দিয়ে পূজা করতে হয় কর।…আহারের সময় অতি তৃপ্তির সঙ্গে ইলিশ মাছের ঝোলঅম্বলভাজা দিয়ে ভোজনকরলেন।বললেন–একাদশী করে খিদেটা খুব বেড়েছে, ঘটিবাটিগুলো ছেড়েছি কষ্টে।”
আরও প্রশ্ন আছে। বিবেকানন্দর সৃজনী প্রতিভা রান্নাঘরেও কীভাবে বহুমুখী হয়েছিল তা তো জানা গেল, কিন্তু তিনি নিজে সব চেয়ে কী খেতে ভালবাসতেন?
উত্তরটা অত সহজ নয়। দিশি খাবারের মধ্যে প্রবল দাবিদার রয়েছে, বিলিতিতেও দাবিদার রয়েছে। আমিষে দাবিদার রয়েছে, নিরামিষে দাবিদার রয়েছে; ঝাল-ঝোল চচ্চড়িতে দাবিদার রয়েছে, আবার শেষপাতের মিষ্টিতেও দাবিদার রয়েছে।
যাঁদের ধারণা নিরামিষ আহারে স্বামীজির অরুচি ছিল তারা বিবেকানন্দের কিছুই জানেন না। বিশেষ করে খিচুড়ি যাতে বেলুড় মঠের সন্ধের খিচুড়ি মিস না হয়ে যায় তার জন্যে দ্বিতীয়বার পাশ্চাত্য থেকে ফিরে স্বামীজির বেলুড়ের পাঁচিল টপকে খাবার জায়গায় চলে এসেছিলেন।
