.
এই শিষ্যই আরও পরে স্বামীজির মহাসমাধির অতি সামান্য আগে আহিরিটোলার ঘাটে গঙ্গাতীরে গুরুকে আবার দেখেছিল। স্বামীজির বাঁ হাতে শালপাতার ঠোঙায় চানাচুর ভাজা, বালকের মতো খেতে খেতে আনন্দে পথ ধরে এগোচ্ছেন।
স্বামীজি বললেন, “চারটি চানাচুর ভাজা খা না? বেশ নুন-ঝাল আছে।” শিষ্য হাসতে হাসতে প্রসাদ গ্রহণ করলেন।
অন্তিম পর্বেই আমরা জানতে পারি, ছোটবেলার স্মৃতিতে উদ্বেলিত হয়ে স্বামীজি একদিন বেলুড়ের মঠে বসে প্রকাশ্যে পাড়ার ফুলুরিওয়ালা হতে চাইলেন। উনুন জ্বললো, কড়া বসলো, তেল ঢালা হলো। ফাটানো বেসন গরম তেলে ছেড়ে, পিঁড়িতে বসে বিশ্ববিজয়ী বিবেকানন্দ হয়ে উঠলেন ফুলুরিওয়ালা নরেন। ছোটবেলায় সিমলা পাড়ায় যেমন দেখেছেন ফুলুরিওয়ালাকে। বেলুড়ের মাঠে হাঁক ছেড়ে খদ্দের ডেকে স্বামীজি মহানন্দ পেতে লাগলেন।
এসব দৃশ্য কিন্তু স্বদেশ কিংবা কলকাতায় সীমাবদ্ধ নয়। সেবার ট্রেনে যেতে যেতে একজন মুসলমান ফেরিওয়ালাকে ফার্স্ট ক্লাসের সামনে ছোলা সেদ্ধ হাঁকতে দেখে সেবককে স্বামীজি বললেন, “ছোলা সেদ্ধ খেলে বেশ হয়, বেশ স্বাস্থ্যকর জিনিস”.. ছোলাওয়ালাকে একটা সিকি দেওয়ায় স্বামীজি তার সেবককে বললেন, “ওরে ওতে ওর কি হবে? দে একটা টাকা দে।” স্বামীজি ছোলা কিনলেন, কিন্তু খেলেন না। মনে হয় ফেরিওয়ালাটিকে কিছু দেবার জন্যেই এই ছোলা কেনা।
কিন্তু বিদেশে পরিস্থিতি অন্য। লস এঞ্জেলেসে তিনি তখন একের পর এক জগৎ-কাঁপানো বক্তৃতা করে চলেছেন। সারা শহরে বেশ আলোড়ন। আয়োজকদের একজন কিছু আলোচনার জন্য স্বামীজির সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে এসে দেখলেন, তিনি আপনমনে চিনেবাদাম ভাজা চিবোচ্ছেন। মানুষটির সরলতা দেখে সায়েবটি মুগ্ধ।
শুধু সাধারণ মানুষের নয়, শিষ্য ও শিষ্যাদের সর্ববিষয়ে শিক্ষাদানের ব্যাপারে স্বামীজি যে তুলনাহীন ছিলেন একথা তাঁর কনিষ্ঠেরা পরবর্তীকালে বারবার স্মরণ করেছেন। এই শিক্ষার সিলেবাসে রান্না কখনও তার গুরুত্ব হারায়নি।
স্বামী বিরজানন্দসহ দলবল নিয়ে মায়াবতী থেকে বেরিয়ে পড়েছেন স্বামীজি। প্রথমে চম্পাবত, সেখান থেকে ডিউরির ডাক বাংলো।
রান্নার দায়িত্বে রয়েছেন স্বামী বিরজানন্দ। হাঁড়ির আকারের তুলনায় চাল বেশি হওয়ায়, ভাত আধসিদ্ধ হয়ে উথলে পড়ছে, আর ক্ষিদে পাওয়ায় স্বামীজি লোক পাঠিয়ে খবর নিচ্ছেন, রান্নার কত দেরি।
বিরজানন্দ ভাবছেন, খানিকটা ভাত নামিয়ে নিয়ে বাকি ভাত আরও জল দিয়ে ফুটোবেন। এমন সময় স্বামীজি রান্নার জায়গায় ঢুকে অবস্থা পর্যালোচনা করে প্রিয় শিষ্য বিরজানন্দকে বললেন, “ওরে ওসব কিছু করতে হবে না। আমার কথা শোন–ভাতে খানিকটা ঘি ঢেলে দে, আর হাঁড়ির মুখের সরাখানা উলটে দে, এখনই সব ঠিক হয়ে যাবে, আর খেতেও খুব ভাল হবে।”
রন্ধনবিদ গুরুর কথা শোনায় ফল খুব ভাল হল, সেদিনকার এমার্জেন্সি ঘি ভাত সবার খুব ভাল লেগেছিল।
অনেকের সবিনয় অনুসন্ধান, “খাওয়ার জন্যে অযথা দীর্ঘসময় অপেক্ষা করতে হলে স্বামী বিবেকানন্দ কি একটু অধৈর্য হয়ে উঠতেন?”
সেইটাই তো স্বাভাবিক। মা বাবা কত আদর করে মানুষ করেছিলেন, অথচ বড় কাজের আহ্বানে চব্বিশ বছরে সন্ন্যাসী হয়ে সহায় সম্বলহীন অবস্থায় বাকি জীবনটা পথে পথে কেটে গেল। পরের দিনের অন্ন কোথা থেকে কীভাবে আসবে তা সন্ন্যাসীর জানা নেই। শরীর যখন রোগ জর্জরিত, যখন দু’একজন স্নেহের মানুষ তার কাছাকাছি রয়েছে তখন মানুষের একটু-আধটু অভিমান আসতে পারে। তাছাড়া রয়েছে সময়ানুবর্তিতার প্রতি স্বামীজির প্রবল আকর্ষণ–শুধু নিজের জন্য নয়, সকলের জন্য।
সুদূর আমেরিকা থেকে স্বামী রামকৃষ্ণানন্দকে (১৮৯৫) স্বামীজি নির্দেশ দিচ্ছেন : “ভোগের নামে সকলকে পিত্তি পড়িয়ে বাসি কড়কড়ে ভাত খাওয়াবে না।”
আর এক চিঠিতে স্বামীজি সাবধান করে দিচ্ছেন, ঠাকুরের জন্মোৎসবে যেন খাওয়াতে খাওয়াতে দিন চলে না যায়। কী ধরনের আয়োজন করলে পরিস্থিতি আয়ত্তের মধ্যে থাকতে পারে যখন ভাবছেন, তখন তিনি নিজের কথা ভাবছেন না। তবে স্বামীজির ছেলেমানুষী সরলতা ছিল আপনজনদের মধ্যে। অনুরাগীরা, গুরুভ্রাতারা এবং শিষ্যরা জানতেন রাগ হলে স্বামীজি খাবার ফিরিয়ে দিতে পারেন।
স্বামীজির প্রিয় শিষ্য হাতরাস স্টেশনের প্রাক্তন সহকারী স্টেশনমাস্টার গুপ্ত মহারাজের গল্পটা অনেকের জানা। স্বামী সদানন্দর ভাষায় : “শেষের দিকে কয়েকদিন ওঁর রুচিমতো রান্না করি। তার শরীর তখন ভাঙনের পথে। একদিন চটে লাল হয়ে নিজের ঘরে বসে। মেজাজ অত্যন্ত গরম, কার সাধ্যি কাছে এগোয়। খানা তৈরি করে বাবুর্চির কায়দায় কোমরে তোয়ালে জড়িয়ে ঘরে খাবার নিয়ে সাধাসাধি, মহারাজ নরম হোন, গুস্সা ছোড় দিজিয়ে। টেমপারেচার তবু নামে না–”মেহেরবানি করুন, সব কসুর মাফ কিজিয়ে। যাঃ শালা, দূর হ, খাব না। তখন আমি দাঁত দেখালাম, তুমভি মিলিটারি হাম ভি মিলিটারি’, আমি রেগে নেমে এলাম: যাঃ শালা! ভুখা রহো, হামারা ক্যা পরোয়া!”
এর পরে কী হয়েছিল তা কোথাও লেখা নেই। কিন্তু জোর করে বলা যায়, স্বামীজির রাগ নিশ্চয় সঙ্গে সঙ্গে কমে গিয়েছিল এবং স্বামীজি শেষপর্যন্ত খেয়েছিলেন। স্বামীজি অভুক্ত থাকবেন আর মঠের অন্য সবাই অনুগ্রহণ করবেন এটা অসম্ভব ব্যাপার। ওই কালচার বা মানসিকতা থাকলে সেদিনের রামকৃষ্ণ মিশন কিছুতেই আজকের রামকৃষ্ণ মিশন হতে পারতো না।
