অঢেল ঠাণ্ডা খাবার সম্বন্ধে স্বামীজি স্বদেশে রিপোর্টও পাঠিয়েছেন গুরু ভাই স্বামী রামকৃষ্ণানন্দকে। “দুধ আছে, দই কদাচ, ঘোল অপর্যাপ্ত।”
ক্রিমের চমৎকার বাংলা করেছেন স্বামীজি–মাঠা, “মাঠা সর্বদাই ব্যবহার চায়ে, কফিতে, সকল তাতেই মাঠা ব্যবহার–সর না, দুধের মাঠা। মাখন তো আছেন–আর বরফ জল–এন্তের বরফ জল…আর কুলফি এন্তের নানা আকারের।”
দুধের কথা যখন উঠলো তখন বেলুড়ে কবিরাজি নির্দেশে দুধ চিকিৎসার কথাও ভোলা যাক। তখন স্বামীজির পা ফুলেছে, সমস্ত শরীরে যেন জলসঞ্চার হয়েছে। কবিরাজের নির্দেশে একুশ দিন জল ও নুন না খেয়ে থাকতে হবে, খাবার মধ্যে সামান্য একটু দুধ।
শিষ্য শরচ্চন্দ্র জিজ্ঞেস করলেন, “মহাশয়, এই দারুণ গ্রীষ্মকাল! তাহাতে আবার আপনি ঘণ্টায় ৪/৫ বার করিয়া জলপান করেন, এ সময়ে। জল বন্ধ করিয়া ঔষধ খাওয়া আপনার অসহ্য হইবে।”
স্বামীজির অবিস্মরণীয় উত্তর : “তুই কি বলছিস? ঔষধ খাওয়ার দিন প্রাতে আর জলপান করব না’ বলে দৃঢ় সংকল্প করব, তারপর সাধ্য কি জল আর কণ্ঠের নীচে নাবেন! তখন একুশ দিন জল আর নীচে নাবতে পারছেন না। শরীরটা তো মনেরই খোলস। মন যা বলবে, সেইমত তো ওকে চলতে হবে, তবে আরও কি? নিরঞ্জনের অনুরোধে আমাকে এটা করতে হ’ল, ওদের (গুরুভ্রাতাদের অনুরোধ তো আর উপেক্ষা করতে পারিনে।”
স্বদেশ ফিরেও বিবেকানন্দর আইসক্রিমের প্রতি আকর্ষণ কমছে না। সেবার মায়াবতীতে প্রচণ্ড শীত–স্বামী বিরজানন্দকে স্বামীজি বললেন, “জীবনের শেষভাগে সব কাজ ছেড়ে এখানে আসা, বই লিখব আর গান করব।” ইতিমধ্যে হ্রদে বরফ জমেছে। সেই বরফ সংগ্রহ করে প্রকাণ্ড একতাল আইসক্রিম তৈরি করলেন স্বামী বিরজানন্দ। স্বামীজিকে সন্তুষ্ট করার সহজতর পথ আর কি থাকতে পারে?
এবার একটি ছোটখাট বোমা ফাটাতে চাই। কিছুদিন আগে প্রকাশিত নিবেদিতার পত্রাবলী তো এদেশের মানুষ মন দিয়ে পড়লো না। সংবাদের সোনারখনি বলতে যা বোঝায় তাই এই পত্রাবলী। বাগবাজার থেকে ১৮৯৯ সালের মে মাসে নিবেদিতা আমেরিকায় মিস ম্যাকলাউডকে যা লিখছেন তাতেও ইঙ্গিত রয়েছে আইসক্রিমের। “আগামীকাল এস (সদানন্দ?) এবং আমি ওঁর আইসক্রিমের জন্য পাঁচটাকা খরচ করবোবেজায় বড়লোকি, কিন্তু উনি চাইছেন!” তন্নতন্ন করে খুঁজেও স্বামীজিকে কিন্তু কোথাও আইসক্রিম তৈরি করতে দেখছি না। বোধহয় কিছু যন্ত্রপাতির দরকার ছিল এবং তখনও বেলুড়ে বিদ্যুৎ আসেনি।
সময় বেশ কমে আসছে। কিন্তু এখনও দুটো-তিনটে বিষয় আমাদের খুঁটিয়ে দেখতে হবে। রাঁধিয়ে হিসেবে স্বামীজির ভূমিকা এবং আইসক্রিম ছাড়া কোন্ কোন্ দিশি খাবার তাঁর প্রিয় ছিল? দুটোই অত্যন্ত কঠিন প্রশ্ন।
ভক্তদের ব্যাখ্যা, “অন্নদানকেই তিনি তাঁর সঙ্ঘের একনম্বর কাজ হবে বলে মনস্থ করেছিলেন। রান্নার ওপর সম্পূর্ণ কনট্রোল না থাকলে এতো বড় দায়িত্ব কাঁধে নেবার কথা কে ভাবতে পারে? যায় না। রাঁধিয়ে হিসেবে আমরা দেখছিও অন্তিমপর্বে তিনি তাঁর প্রিয় শিষ্য ও শিষ্যাদের আনন্দবর্ধন করতে চাইছেন, তবে সেই সঙ্গে মাঝে মাঝে তাদের সেবাও করতে চাইছেন।
শিষ্য শরচ্চন্দ্রের কথাই ধরা যাক, পূর্ববঙ্গের ছেলে, স্বামীজির আদেশ, “গুরুকে নিজের হাতে বেঁধে খাওয়াতে হবে।”
মাছ, তরকারি ও রন্ধনের উপযোগী অন্যান্য দ্রব্য নিয়ে বেলা আটটা আন্দাজ শিষ্য শরচ্চন্দ্র বলরামবাবুর বাড়িতে উপস্থিত। তাকে দেখেই স্বামীজি নির্দেশ দিলেন, “তোদের দেশের মতন রান্না করতে হবে।…”
শিষ্য এবার বাড়ির ভেতর রন্ধনশালায় গিয়ে রান্না আরম্ভ করল। স্বামীজি মধ্যে মধ্যে ভেতরে এসে তাকে উৎসাহ দিতে লাগলেন, আবার কখনও বা “দেখিস মাছের ‘জুল’ যেন ঠিক বাঙালদিশি ধরনে হয়” বলে রঙ্গ করতে লাগলেন।
শিষ্যের মুখেই শোনা যাক পরবর্তী ঘটনা। “ভাত, মুগের ডাল, কই মাছের ঝোল, মাছের টক ও মাছের সুক্তনি রান্না প্রায় শেষ হইয়াছে, এমন সময় স্বামীজি স্নান করে এসে নিজেই পাতা করিয়া খাইতে বসিলেন। এখনও রান্নার কিছু বাকি আছে বলিলেও শুনিলেন না, আবদেরে ছেলের মতন বলিলেন, যা হয়েছে শীগগির নিয়ে আয়, আমি আর বসতে পাচ্ছিনে, খিদেয় পেট জ্বলে যাচ্ছে।…শিষ্য কোনকালেই রন্ধনে পটু ছিল না; কিন্তু স্বামীজি আজ তাহার রন্ধনের ভূয়সী প্রশংসা করিতে লাগিলেন। কলকাতার তোক মাছের সুজুনির নামে খুব ঠাট্টা তামাশা করে, কিন্তু তিনি সেই সুতুনি খাইয়া খুশি হইয়া বলিলেন, ‘এমন কখনও খাই নাই। কিন্তু মাছের জুল’টা যেমন ঝাল হয়েছে, এমন আর কোনটাই হয় নাই। টকের মাছ খাইয়া স্বামীজি বলিলেন, এটা ঠিক যেন বর্ধমানী ধরনের হয়েছে।”
এইবারেই স্বামীজি তাঁর শিষ্যকে গুরুত্বপূর্ণ কথাটা বলেছিলেন, “যে ভাল রাঁধতে পারে না সে ভাল সাধু হতে পারে না।”
এই শিষ্যকেই কয়েক বছর পরে মহাসমাধির কয়েক মাস আগে স্বামীজি কীভাবে বেঁধে খাইয়েছিলেন তা জেনে রাখা মন্দ নয়।
তখন স্বামীজির কবিরাজি চিকিৎসা চলছে। জলখাওয়া বন্ধ, শুধু দুধ পান করে পাঁচসাতদিন চলছে। এই সেই মানুষ যিনি ঘন্টায় পাঁচ-ছ বার জল পান করতেন।
শিষ্য মঠে একটি রুইমাছ ঠাকুরের ভোগের জন্য এনেছে। “মাছ কাটা হলে ঠাকুরের ভোগের জন্য অগ্রভাগ রাখিয়া দিয়া স্বামীজি ইংরেজি ধরনে রাঁধিবেন বলিয়া কতকটা মাছ নিজে চাহিয়া লইলেন। আগুনের তাতে পিপাসার বৃদ্ধি হইবে বলিয়া মঠের সকলে তাহাকে রাঁধিবার সঙ্কল্প ত্যাগ করিতে অনুরোধ করিলেও কোন কথা না শুনিয়া দুধ, ভারমিসেলি, দধি প্রভৃতি দিয়া চার-পাঁচ প্রকারে ওই মাছ রাঁধিয়া ফেলিলেন। …কিছুক্ষণ পরে স্বামীজি জিজ্ঞেস করিলেন, “কেমন হয়েছে? শিষ্য বলিল, এমন কখনও খাই নাই।…ভারমিসেলি শিষ্য ইহজন্মে খায় নাই। ইহা কি পদার্থ জানিবার জন্য জিজ্ঞাসা করায় স্বামীজি রসিকতা করিলেন, “ওগুলি বিলিতি কেঁচো। আমি লন্ডন থেকে শুকিয়ে এনেছি।”
