বোঝা যাচ্ছে, রান্না শেখাতে এবং উদ্ভাবন করতে স্বামীজি ছিলেন তুলনাহীন।
একবার তিনি বোধগয়ায় রয়েছেন, জনৈক বাঙালি ভক্ত প্রতিদিন সকালে এক কলসি তালের রস এবং এক কলসি খেজুর রস স্বামীজি অ্যান্ড পার্টিকে পাঠিয়ে দিতেন। খেজুর রস নষ্ট করতে প্রাণ চায় না। অনেক ভেবেচিন্তে স্বামীজি ভাতের হাঁড়িতে জলের বদলে রস দিয়ে তাতে চাল ফেলে দিয়ে ভাত রাঁধতেবললেন! বোধহয় ওয়ার্লডের প্রথমও শেষ খেজুরেভাত!অনুসন্ধিৎসুরা শীতকালে স্বামীজি উদ্ভাবিত খেজুর রসের এই পদটি আর একবার বেঁধে দেখতে পারেন।
বিদ্রোহী বিবেকানন্দের উপস্থিতি আমরা তার খাদ্যাভ্যাসের মধ্যেও খুঁজে পেতে পারি। শাস্ত্রে বলে দুধ ও মাংস একসঙ্গে খাওয়া উচিত নয়, কিন্তু স্বামীজি বেপরোয়া, তাই দুধ-মাংসের বিপরীত আহারে তিনি বেশ অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছিলেন।
ঠেসে ভাত খাওয়ার প্রচণ্ড বিরোধী ছিলেন আমাদের বিবেকানন্দ। একবার বেলুড়ে আহার করতে করতে বন্ধু প্রিয়নাথ সিংহকে বললেন, “দেখ সিঙ্গি, কনসেনট্রেটেড়’ ফুড খাওয়া চাই। কতকগুলো ভাত ঠেসে খাওয়া কেবল কুঁড়েমির গোড়া।…আমাদের যে দু’বার আহার কুঁচকিকণ্ঠা ঠেসে। একগাদা ভাত হজম করতে সব এনার্জি চলে যায়।”
.
দুধ সম্বন্ধেও তার সাবধানবাণী সংগৃহীত হয়েছে। “দুধ–যেমন শিশুতে মাতৃদুগ্ধ পান করে, তেমনি ঢোকে ঢেকে খেলে তবেশীঘ্র হজম হয়, নতুবা অনেক দেরি লাগে।”
দুধ থেকেই পরবর্তী প্রশ্নটা মনের মধ্যে ভেসে ওঠে। এবার আমাদের স্বাভাবিক প্রশ্ন, “আইসক্রিমের বাংলা কি?”
ওটা বহুকাল বাংলা হয়ে গিয়েছে বলেও অনুসন্ধিৎসুদের কাছ থেকে মুক্তি নেই।
অনুরাগীরা বলবেন, “বাহাদুর বাংলা লেখক! টপ করে আইসক্রিমকে কুলপি বলতে শুরু করেছিলেন স্বামীজি। কারণও ছিল। কলকাতায় যখন প্রথম বরফ এলো তখন ওই দুর্লভ বস্তুটি অতি অল্প সময়ের মধ্যে সিমলের দত্তবাড়িতে হাজির হয়েছিল। প্রাক-রেফ্রিজারেটর যুগ, তখন বরফের বাক্সে খাবার, ফল, দুধ রাখার রেওয়াজ হয়েছিল। আমরা দেখেছি, নেয়াপাতি ডাবের ভিতর চিনি দিয়ে সেই ডাবের খোলে বরফ দিয়ে খেতে খুব ভালবাসতেন স্বামীজি। বারবার বিদেশে গেলে কিছু একটার ওপর টান তো ধরবে, আমেরিকা স্বামীজির ক্ষেত্রে সেটি অবশ্যই আইসক্রিম। খাদ্যরসিকরা এখন জানেন, মার্কিন মুলুকে তিনি চকোলেট আইসক্রিমের প্রবল ভক্ত হয়ে উঠেছিলেন।”
একদিন মার্কিনদেশে তার সঙ্গিনীরা স্ট্রবেরি খাচ্ছিলেন, তাঁরা জিজ্ঞেস করলেন, “স্বামীজি আপনি কি স্ট্রবেরি পছন্দ করেন?”
স্বামীজি সঙ্গে সঙ্গে অভিযোগ করলেন, “কখনও তো চেখে দেখিনি!”
“কখনও খাননি! সে কি? রোজই তো খাচ্ছেন!”
এবার স্বামীজির জোরালো উত্তর : “তোমরা তো সেগুলো ক্রিম দিয়ে ঢেকে দাও, ক্রিম মাখানো পাথরের নুড়িও ভাল লাগতে বাধ্য!”
লেগেট পরিবারে থাকার সময় ধূমপানের লোভে স্বামীজি সান্ধ্য-আহারের পর ঝটপট ডিনার টেবিল ছেড়ে অন্যত্র চলে যেতেন। ডিনার টেবিলে স্বামীজিকে আটকে রাখার সহজতম উপায়টি স্নেহময়ী মিসেস লেগেট আবিষ্কার করেছিলেন। টেবিল ছেড়ে স্বামীজির উঠে যাবার একটু আগেই তিনি ঘোষণা করতেন, “আইসক্রিম আছে।” অমনি ছোটছেলের মতন স্বামীজিনিজের সীটেবসেথাকতেন এবং তৃপ্তিসহকারে আইসক্রিম খেতেন।
একদিন ক্যালিফোর্নিয়ায় তার সান্ধ্য বক্তৃতায় নরক সম্বন্ধে স্বামীজি অনেক কথা বললেন। বক্তৃতার শেষে সবাই মিলে রেস্তোরাঁয় খেতে বেরোলেন। বাইরে তখন হাড়কাঁপানো শীত, কাঁপতে কাঁপতে স্বামীজি সঙ্গি নীদের বললেন, “এ যদি নরক না হয় তাহলে নরক কাকে বলে জানি না।”
রেস্তোরাঁয় ঢুকে পড়ে ঐ ঠাণ্ডাতেও স্বামীজি কিন্তু খেতে চাইলেন আইসক্রিম। দোকানের মালিক একটু দেরি করতে পারেন তা আশঙ্কা করে স্বামীজি বললেন, “দয়া করে দেরি করবেন না, তাহলে ফিরে এসে এখানেই দেখবেন একতাল চকোলেট আইসক্রিম।” অর্থাৎ বাইরে থেকে আসা অতিথিরাই ঠাণ্ডায় জমে আইসক্রিম হয়ে গিয়েছেন।
আইসক্রিম নিয়ে ভ্রান্তিবিলাসও হয়েছে! একবার লেকচারের শেষে আটজনকে স্বামীজি আইসক্রিম খেতে নেমন্তন্ন করলেন।
স্যানফ্রানসিসকোর পাওয়েল স্ট্রীট ধরে হাঁটছেন তাঁরা। দোকানের সেলস গার্লটি বোধ হয় নতুন, অর্ডার নেবার তেমন অভিজ্ঞতা তার নেই। কি নেবেন জিজ্ঞেস করায় স্বামীজি নির্দ্বিধায় অর্ডার দিলেন আইসক্রিম। মেয়েটি ভুল বুঝে একটু পরে সবার জন্য যা নিয়ে এল তা আইসক্রিম নয়, আইসক্রিম সোডা। বোতলগুলো খোলা হয়ে গিয়েছে। তবু ফেরত দেওয়া হল। কারণ তারা আইসক্রিম সোডা চাননি, চেয়েছেন আইসক্রিম। দোকানের ম্যানেজার ব্যাপারটা জেনে মেয়েটিকে প্রবল বকাবকি করতে লাগলেন। মেয়েটির এই অবস্থা দেখে স্বামীজির মন একেবারে গলে গেল, ম্যানেজারকে ডেকে তিনি বললেন, “প্লিজ, ওকে বোকো না। তুমি যদি ওকে আর কিছু বলো, তা হলে আমি কিন্তু একাই এই আইসক্রিম সোডার বোতলগুলো শেষ করে ফেলবো।”
আর একবার স্বামীজিআইসক্রিম আস্বাদন করেউচ্ছ্বসিত হয়েবলেছিলেন, “ম্যাডাম, ফুড ফর গড়। আহা সত্যি স্বর্গীয়।”
আইসক্রিমের প্রতি এই অস্বাভাবিক টান দেশে ফিরে এসেও অব্যাহত ছিল। এক আধবার নিবেদিতার কাছে আইসক্রিম খাওয়ার আব্দার করেছেন স্বামীজি। বেশ চিন্তায় পড়ে গিয়েছেন নিবেদিতা, কারণ স্বামীজি তখন ডায়াবিটিসের রোগী।
