অনেকদিন পরে এই হরি মহারাজের সঙ্গে হরিদ্বারে এক প্রবীন সাধুর দেখা হয়। সাধুটি বিবেকানন্দ সম্বন্ধে তাকে বলেন,”এত সাধুর সঙ্গে মিশেছি। কিন্তু ওঁর মতন সাধু কখনও দেখিনি। হাসাতে হাসতে পেটে ব্যথা করে দিত, আর হাসির সঙ্গে এমন কথা বলত যে একেবারে বৈরাগ্য যেন আবার জেগে উঠত। অমন ইয়ার সাধু জীবনে কখন আর দেখিনি।”
শেষ কথাটি শুনে মনে একটু ভরসা জাগছে ইয়ারকির জন্য বাজারে আমার খুব বদনাম হয়ে গিয়েছে।
ব্যাপারটা যা দাঁড়াচ্ছে, যে স্রেফ নিজের ব্রেন খাঁটিয়ে রসনারসিক বিবেকানন্দকে বুঝে ওঠা সম্ভব নয়, মনে রাখতে হবে, বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন খাবারের হিসট্রি জিওগ্রাফি কেমিস্ট্রি সব তিনি জেনে বসেছিলেন। নিজে প্রায়ই কিছুমুখে দিতেন না, সেই সঙ্গে ছিল হাজাররকম ডাক্তারি বাধা নিষেধ, তবু অপরকে খাইয়ে অপার আনন্দ পেতেন। চেনা-অচেনা যারাই খেতে পাচ্ছে না তাদের জন্যে ছিল সীমাহীন উদ্বেগ–এই হচ্ছেন আমাদের বিবেকানন্দ ইন এ নাটশেল অথবা একনজরে স্বামীজি।
আমাদের পরবর্তী আলোচনার বিষয় খাদ্য ও অখাদ্যর পদবিচার। স্বামীজি যে এই বিষয় নিয়ে বিভিন্ন সময়ে যথেষ্ট মাথা ঘামিয়েছেন তার প্রমাণ রয়েছে নিজের লেখা প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যে। এবিষয়ে লিখিত মতামত দেওয়ার পরেও স্বামীজি বেলুড়ে বসে শিষ্য শরচ্চন্দ্রের সঙ্গে দ্বিতীয়বার আলোচনা করেছেন যা স্বামী-শিষ্য-সংবাদ বইয়ের অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।
স্বামী-শিষ্য-সংবাদ এতোই গুরুত্বপূর্ণ ও নির্ভরযোগ্য দলিল যে এই বইটিকে বাংলা বিবেকানন্দ রচনাবলীতে নির্দ্বিধায় স্থান দেওয়া হয়েছে।
শঙ্করশিষ্য রামানুজের মতে খাদ্যে ত্রিবিধ দোষ : (১) জাতিদোষ অর্থাৎ যে দোষ ভোজ্যদ্রব্যের জাতিগত; যেমন পাজলশুন ইত্যাদি উত্তেজক দ্রব্য খেলে মনে অস্থিরতা আসে অর্থাৎবুদ্ধি ভ্রষ্ট হয়।(২) আশ্রয় দোষ অর্থাৎ যে দোষ ব্যক্তিবিশেষের স্পর্শ থেকে আসে–দুষ্ট লোকের অন্ন খেলেইদুষ্টবুদ্ধি আসবেই এবং (৩) নিমিত্ত দোষ অর্থাৎ ময়লা কদর্য কীট-কেশাদি-দুষ্ট অন্ন খেলেও মন অপবিত্র হবে।…নিমিত্ত দোষ সম্বন্ধে বর্তমানকালে বড়ই ভয়ানক অবস্থা দাঁড়িয়েছে; ময়রার দোকান, বাজারে খাওয়া, এসব মহা অপবিত্র দেখতেই পাচ্ছ, কিরূপ নিমিত্তদোষে দুষ্টময়লা আবর্জনা পচা পক্কড় সবওতে আছেন–এর ফল হচ্ছে তাই।
অনেক ভেবেচিন্তে স্বামীজি বলেছেন, খাদ্যের আশ্রয় দোষ থেকে বাঁচা সকলের পক্ষে সহজ নয়।
মঠ থেকে বেরিয়ে পরিব্রাজক অবস্থায় এবং সাগরপারে স্বামীজি নিজে কীভাব আশ্রয়দোষের মোকাবিলা করেছেন তার এক-একটা উদাহরণ বিদেশিনীরাও সযত্নে সংগ্রহ করে রেখেছেন। এবিষয়ে তার বোধ হয় তৃতীয় নয়ন ছিল।
একবার খ্যাতনামা শিল্পী চার্লস নেলসন স্বামীজিকে স্যানফ্রানসিসকোর চায়নাটাউনে এক বিখ্যাত চাইনীজ রেস্তোরাঁয় ডিনারে নেমন্তন্ন করেছিলেন। দোকানের মালিক শিল্পী নেলসনের পরিচিত। তাই বিশিষ্ট অতিথিকে স্পেশাল খাতির করতে শেফ স্বয়ং ওঁদের টেবিলে দেখা করতে এলেন।সময় বাঁচাবার জন্য নেলসন অবশ্য আগে থেকেই খাবারের মেনু ঠিক করে দিয়েছিলেন। স্বামীজি কিন্তু চাইনিজ শেফকে একবার দেখেই সব বুঝে ফেললেন। একেই বলে তৃতীয় নয়ন। কিচেন থেকে লোভনীয় সব খাবার এলো, কিন্তু আশ্রয়দোষ আছে বুঝে স্বামীজি খাবার মুখে তুললেন না। নেলসন একটু লজ্জায় পড়লেন, কিন্তু কিছু করা গেল না।
স্বামীজি পরে বলেছিলেন, শেফের চরিত্র ভাল নয় বুঝেই তার পক্ষে খাদ্য স্পর্শ করা সম্ভব হয়নি।
আর একবার স্বামীজি আমেরিকায় এক ফ্রেঞ্চ রেস্তোরাঁয় গিয়েছিলেন। সেখানে চিংড়িমাছ মুখে দিয়ে, বাড়িতে এসেই তিনি বমি করতে আরম্ভ করলেন। ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণের কথা স্মরণ করে পরে স্বামীজি বলেছিলেন, “আমার রকমসকমও বুড়োর মতো হয়ে যাচ্ছে। কোনো অপবিত্র লোকের স্পর্শ করা খাদ্য বা পানীয় তার শরীর গ্রহণ করতে পারতো না।”
এর আগে ডেট্রয়েটে ভীষণ ব্যাপার হয়েছিল। কিছু মিশনারী তখন স্বামীজির সর্বনাশ করার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছেন। এক ডিনার পার্টি অনেকক্ষণ ধরে চলেছে। শেষপর্বেকফিএলো। গুরুভাই স্বামী বিজ্ঞানানন্দকে অনেক বছর পরে স্বামীজি বলেছিলেন, “ঠাকুর চোখের সামনে ভেসে উঠলেন, বললেন, ‘খাস না! বিষ আছে।গুরু আমার সঙ্গে সব সময় আছেন, কে কি করতে পারে আমার?”
.
খাদ্যের জাতিদোষ সম্বন্ধে স্বামীজি যে কত জায়গায় কত মূল্যবান কথা বলেছেন তার হিসেব নেই। সেসব উপদেশ এখনও মানুষকে মাঝে মাঝে মনে করিয়ে দেওয়া মন্দ নয়। স্বামীজি বলতেন, “খিদে পেলেও কচুরি জিলিপি খাবার ফেলে দিয়ে এক পয়সার মুড়ি কিনে খাওসস্তাও হবে, কিছুখাওয়াও হবে।”
ডাল সম্বন্ধে তার যথেষ্ট দুর্বলতা ছিল, বিশেষ করে কলায়ের ডাল হলে তো কথাই নেই। বহুবার প্রিয়জনদের কাছে তিনি আব্দার করেছেন, কলায়ের দাল কর। তবে বলে রাখা ভাল, তার গুরুভাই অভেদানন্দ আবার কলায়ের ডাল একেবারেই সহ্য করতে পারতেন না। বোধ হয় এলার্জি ছিল, ওই ডাল দেখলেই কালী বেদান্তীর সর্দি হতো, হাঁচতে শুরু করতেন।
সঙ্ঘজননী শ্ৰীসারদামণির কাছে গরম ছোলার ডাল দিয়ে রুটি খাবার লোভও ছিল নরেন্দ্রনাথের।
ডাল ভালবাসলেও এ সম্পর্কে স্বামীজির পরামর্শ : খুব সাবধানে “ডাল দক্ষিণীদের মতন খাওয়া উচিত, অর্থাৎ ডালের ঝোলমাত্র, বাকিটা গরুকে দিও…ডাল অতি পুষ্টিকর খাদ্য, তবে বড়ই দুষ্পচ্য। কচি কলাইশুটির ডাল অতি সুপাচ্য এবং সুস্বাদু।… কচি কলাইশুটি খুব সিদ্ধ করে, তাকে পিষে জলের সঙ্গে মিশিয়ে ফেল। তারপর একটা দুধ ছাঁকনির মতো তারের ছাকনিতে ছাঁকলেই খেলাগুলো বেরিয়ে আসবে। তখন হলুদ, ধনে, জিরে, মরিচ, লঙ্কা, যা দেবার দিয়ে সাঁতলে নাওউত্তম সুস্বাদু সুপাচ্য ডাল হল।” এই হচ্ছে শখের শেফ স্বামীজির স্পেশাল রেসিপি।
