প্রবাসে কোথায় কোথায় কতবার তিনি পোলাও/খিচুড়ি বেঁধেছেন তার পুরো হিসেব সংগ্রহ করা এখনও সম্ভব হয়নি। আধ্যাত্মিক চর্চার জন্যে শহর থেকে বহু দূরে শান্ত পরিবেশে তাঁবু খাঁটিয়ে সাধনা হচ্ছে। এরই মধ্যে রান্না।
আমেরিকার মাটিতে বসেহামানদিস্তা দিয়ে স্বামীজিমশলাগুঁডোকরলেন। তিনি রান্নায় ঝাল বেশি তত দিতেনই, তার সঙ্গে লাল লঙ্কা চিবিয়ে খেতেন। ভক্তিমতী আইডা অ্যানসেলকে বললেন, “খেয়ে দেখো, এতে তোমার ভাল হবে।” আইডা পরে বলেছিলেন, “স্বামীজি বিষ দিলেও খেতাম। তাই খেলাম, কিন্তু ফল হলোঅতীব যন্ত্রণাদায়ক।” মেমসায়েবদের কি অতোলঙ্কা সহ্য হয়! যদিও লঙ্কাটা এসেছে বলিভিয়া থেকে।
খিচুড়ি অথবা পোলাওতে ঝাল কম হবার যে উপায় নেই তা আমরা স্বামীজির পরিব্রাজক জীবন থেকেই দেখতে পাচ্ছি। হৃষিকেশে সেবার স্বামীজির কঠিন অসুখ হয়েছিল। একটু সুস্থ হয়ে খেতে চাইলেন স্বামীজি। নিবিড় জঙ্গলে চাল-ডাল জোগাড় করা কঠিন। প্রিয় গুরুভাই রাখাল এক ডেলা মিছরি সেবার খিচুড়িতে দেয়। ঝালখোর স্বামীজির খিচুড়ির আস্বাদ মোটেই ভাল লাগছে না। এমন সময় খিচুড়ির মধ্যে একটা লম্বা সুতো বেরুলো। অভিজ্ঞরা জানেন, তখনকার দিনে মিছরির মধ্যে এক আধটা সুতো থাকতো।সদ্য রোগ থেকে ওঠা স্বামীজির তীক্ষ্ণ প্রশ্ন, খিচুড়িতে সুতো কেন? সকলে বললো, এক ডেলা মিছরি ফেলেছেরাখাল। মহাবিরক্ত স্বামীজি সঙ্গে সঙ্গে পাকড়াও করলেন গুরুভাইকে। “শালা রাখাল, এ তোর কাজ, তুই খিচুড়িতে মিষ্টি দিয়েছিস।দুঃ শালা। খিচুড়িতে কখনও মিষ্টি দেয় রে? তোর একটা আক্কেল নেই!”
আর একবার পরিব্রাজক অবস্থায় স্বামীজি মীরাটে হাজির হয়েছেন। জনৈক আমীরসায়েব সন্ন্যাসীকে রাজোচিত সিধা পাঠিয়েছিলেন। আর কথা নেই, ঈশ্বরপ্রেরিত সুযোগের সদ্ব্যবহার করে স্বামীজি সঙ্গে সঙ্গে পোলাও রাঁধার উদ্যোগ করলেন।
মীরাটে অবস্থান সম্বন্ধে স্বামী তুরীয়ানন্দর এক চিঠিতে (১৯ ডিসেম্বর ১৯১৫) মজার বর্ণনা আছে। “স্বামীজি আমাদের জুতা সেলাই হতে চণ্ডীপাঠ পর্যন্ত সব শিক্ষা সেই সময় দিতেন। এদিকে বেদান্ত, উপনিষদ, সংস্কৃত নাটক সকল পাঠ ও ব্যাখ্যা করিতেন, ওদিকে রান্না শিখাইতেন।…একদিন পোলাও প্রভৃতি রান্না করিয়াছেন…সে যে কি উপাদেয়। হলো আর কি বলব? আমরা ভাল হয়েছে বলায় সব আমাদের খাইয়ে দিলেন, নিজে দাঁতে কাটলেন না। আমরা বলায় বলিলেন, “আমি ওসব ঢের খেয়েছি–তোদের খাইয়ে আমার বড় সুখ হচ্ছে, সব খেয়ে ফেল।”
“স্বামীজির রান্নায় সবসময় এতো ঝাল কেন?” এই প্রশ্ন উঠতে পারে। এটাই তো রাঁধুনি, ডাক্তার, মনস্তাত্ত্বিক এবং দার্শনিকদের যৌথ গবেষণার বিষয় হতে পারে। লঙ্কা দেখলেই স্বামীজির ব্রেক ফেল করতো! পরিব্রাজক জীবনে তিনি তো একবার লঙ্কাভক্ষণ প্রতিযোগিতায় নেমে পড়েছিলেন। খেতে বসেছেন গোবিন্দ বসুর বাড়িতে, আর একজন অতিথি (সাধু অমূল্য) স্বামীজিকে দেখিয়ে মনের আনন্দে একটা শুকনো লঙ্কা খেলেন। চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করে স্বামীজি সঙ্গে সঙ্গে দুটি লঙ্কা খেলেন, অমূল্য তিনটি খেলেন, স্বামীজি চারটে খেলেন, এইভাবে প্রতিযোগিতা বেড়েই চললো, শেষ পর্যন্ত সাধু অমূল্যকে পরাজয় মানতে হলো।
আর একবার আলোয়ারে বৈষ্ণব সাধু রামসানাইয়ার সঙ্গে স্বামীজির অন্তরঙ্গ পরিচয় হয়েছিল। এই সাধুও ঝাল ভালবাসতেন। মাধুকরী করে আটা এনে তাতে নুন ও লঙ্কা মেখে ধুনি জ্বালিয়ে টিক্কর বানাতেন। স্বামীজিও স্রেফ এই ঝাল টিক্কর ও জল খেয়ে দিন কাটাতেন,দু’জনে প্রায়ই মনের আনন্দে ঘটি বাজিয়ে ভজন গাইতেন।
পরবর্তীকালে কোন সময়ে স্বামীজিকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, “আপনি এতো লঙ্কা খান কেন?”
স্বামীজির উত্তরটি স্মরণীয় : “চিরজীবনটা পথে পথে ঘুরে বেড়িয়েছি আর বুড়ো আঙুলে টাকা দিয়ে ভাত খেয়েছি। লঙ্কাই তো একমাত্র সম্বল ছিল। ঐ লঙ্কাই তো আমার পুরনো বন্ধু ও মিত্র। আজকাল না হয় দু’চারটে জিনিস খেতে পাওয়া যাচ্ছে, কিন্তু চিরটাকাল তো উপোস করে মরেছি।”
রান্নার ওপর স্বামীজি কতটা গুরুত্ব দিতেন তারও ইঙ্গিত নানা জায়গায় ছড়িয়ে রয়েছে। স্বামীজি বলতেন,”যে কাজই হউক, খুব মনোযোগের সহিত করা চাই।…যে রান্নাটাও ভাল করতে পারে না, সে কখনও পাকা সাধু হতে পারে না, শুদ্ধ মনে এক চিত্তে না রাঁধলে খাদ্যদ্রব্য সাত্ত্বিক হয় না।”
পরের দায়িত্ব সম্বন্ধে তো বললেন, কিন্তু তিনি নিজে কী? শাস্ত্রই বলছে, আপনি আচরি ধর্ম অপরে শিখাইবে।
এবিষয়ে একজন গুরুভাই স্বামী তুরীয়ানন্দ (হরি মহারাজ) যা বলবার তা বলে গিয়েছেন।”দেখ নরেনের সব কাজ কি চটপট, পাগড়ী বাঁধবে তাও কি চটপট করে…অন্য লোক এক ঘণ্টায় যে কাজ করছে নরেন দুই মিনিটে সে কাজ করে ফেলে এবং এক সঙ্গে পাঁচছয়টা কাজ করে যায়।…এমন লোক জগতে খুব কম আছে। আলুর খোসা ছাড়ানো দেখ, কুটনো কোটা দেখ, পাঁচ মিনিটে সব কুটনো কুটে ফেললে। আলুর খোসা ছাড়ানো দেখ, আলুকে আঙুল দিয়ে ধরলে বঁটির গায়ে ছুঁয়াতে লাগল আর ঠিক খোসাটি উঠে গেল। আলুটা কোন জায়গায় বেধে গেল না বা চোকলা উঠে গেল না। কি আশ্চর্য তার কাজকর্ম! সব বিষয় যেন চনমন করছে, এই কুটনো কুটছে, এই হাসি তামাসা করছে, এই দর্শনের কথা বলছে, কোনটাই যেন তার পক্ষে কিছুই নয়।”
