স্বামীজির ভোজনবিলাস সম্পর্কে আমাদের দুঃসাহসী অনুসন্ধানপর্বের শেষ এইখানে নয়। সোজাসুজি বলে রাখি, সবে তো কলির সন্ধে! স্বয়ং স্বামীজিকে এইভাবে অর্ধসমাপ্ত রেখে রণে ভঙ্গ দেওয়া যুক্তিযুক্ত হবে না।
রাঁধুনি বিবেকানন্দ সম্বন্ধে এখনও প্রাণখুলে আলোচনার সুযোগ পাওয়া যায়নি। আমরা শুধু সবিনয়ে উল্লেখ করেছি, বিবেকানন্দই একমাত্র ভারতীয় যিনি বেদান্ত ও বিরিয়ানিকে একই সঙ্গে পাশ্চাত্য দেশে প্রচারের দূরদর্শিতা অথবা দুঃসাহস দেখিয়েছিলেন। এতোদিন পরে তার দুটো স্বপ্নই সাফল্যের পথে। ইয়োগা বলতে সায়েবদের উৎসাহ এখন আমাদের থেকে শতগুণ বেশি, আর অতি সম্প্রতি আমাদের প্রাক্তন শাসক ইংরেজ নতমস্তকে এবং বিষণ্ণবদনে স্বীকার করেছে যে খোদ ইংলন্ডে চিকেনকারি শ্বেতাঙ্গদের জাতীয় খাদ্যের স্বীকৃতি লাভ করেছে। অর্থাৎ দাসের খাদ্য কারির কপালেই অবশেষেজুটেছেবহু আকাঙ্ক্ষিতরাজমুকুট। কিন্তু ইতিহাসে আমরা বিবেকানন্দ ছাড়া এক জনকেও পাচ্ছি না যিনি পশ্চিমের রান্নাঘরের দরজা প্রাচ্যের জন্য খুলে দেবার দুর্লভ কৃতিত্ব দাবি করতে পারেন। সন্ন্যাসী বিবেকানন্দ সর্বত্যাগী, কোনোরকম খ্যাতি বা স্বীকৃতির পিছনে ছোটা ছিল তার স্বভাববিরুদ্ধ, তিনি যা করেছেন তা করেছেন ভবিষ্যদ্রষ্টা হিসেবে, তিনি নিশ্চয় বুঝেছিলেন প্রাচ্যের প্রধান বাণীগুলো পাশ্চাত্যের রান্নাঘর দিয়েও পশ্চিমী মানুষের হৃদয়ে পৌঁছবে একদিন।
একটা মুখ দিয়ে স্বামীজির কত কথা আর বলা যায়! মন দিয়ে খিচুড়ি, পোলাও, বিরিয়ানি এটসেটা সম্বন্ধে স্বামীজির কাজকর্মটুকু খতিয়ে দেখা যাক। কী তার দূরদৃষ্টি, কি তার উদ্ভাবনী শক্তি, কি তার প্রচার ক্ষমতা!
এরপরে একের পর এক ছবি নোট বইতে তুলে রেখেছেন পটলাদা! “নরেন ও তাহার আলাপীরা সকলে একদিন ভুনি খিচুড়ি রাঁধিয়াছিল। কড়াইশুটি ও আলু ভাজিয়া রাখিল,চাউলগুলি একটু চমকাইয়া তাহাতেনানা প্রকার মশলা মাখাইয়া, হাঁসের ডিম ফাটাইয়া তাহাতে মাখিল এবং জলে সিদ্ধ করিয়া ঘিনুন দিল।”বলাবাহুল্য অভিনব ঝরঝরে ভুনি খিচুড়ি হয়েছিল। “অন্য পোলোয়ার চেয়ে এই রকম রন্ধন অনেক শ্রেষ্ঠ, এখবর দিয়েছেন মেজভাই মহিম।
ঠাকুরের দেহাবসানের পর দক্ষিণেশ্বরে তাঁর জন্মোৎসবে যে রান্নার মেনু নরেন্দ্রনাথ নির্ধারণ করেছিলেন, সেখানেও ব্যবস্থা হয়েছিল মুগের ডালের ভুনি খিচুড়ি–সেই সঙ্গে আলুকপির দম, দই, বোঁদে ইত্যাদি!
এটা স্পষ্ট প্রমাণিত হয়েছে যে স্বামী বিবেকানন্দই সাম্প্রতিক কালে জোরের সঙ্গে প্রমাণ করলেন পোলাটা খাঁটি ভারতীয়, বাইরে থেকে আমদানি করা মোগলাই খানা নয়। বোধ হয় এই প্রাচীন ভারতীয়ত্বের ওপর জোর দেওয়ার জন্যেই স্বামীজি মাঝে মাঝে পোলাও রাঁধবার জন্যে প্রবল উৎসাহী হয়ে উঠতেন।
প্রথমবার বিদেশ থেকে ফেরবার পরে বিশ্ববিজয়ী বিবেকানন্দ শীতের এক সন্ধ্যায় বলরাম বসু মহাশয়ের বাড়িতে বসে আছেন। স্বামীজি বলছেন, বাংলা দেশে যেমন তরকারি ব্যবস্থা এমন কোথাও নেই, তবে রাজপুতানায় বেশ আহারের ব্যবস্থা আছে।
মহিষাদলের রাজার ম্যানেজার ভক্ত শচীনবসু মন্তব্য করলেন,”মহারাজ, ওরা কি খেতে জানে? সব তরকারিতে টক দেয়।”
স্বামীজি: ”তুমি বালকের মতো কথা কইছো যে!… সিভিলাইজেশন তো ওদের দেশেই ছিল–বেঙ্গলে কোন কালে ছিল? ওদের দেশে বড় লোকের বাড়ি যাও, তোমার ভ্রম ঘুচে যাবে।…আর তোমার পোলাওটা কি? লং বিফোর ‘পাক রাজ্যেশ্বর’ গ্ৰন্থে পলান্নের উল্লেখ আছে; মুসলমানরা আমাদের নকল করেছে। আকবরের আইনি-আকবরীতে কি করে হিন্দুর পলান্ন প্রভৃতি রাঁধতে হয় তার রীতিমত বর্ণনা আছে।”
এর আগে লন্ডনেও স্বামীজি পোলাও প্রসঙ্গ নিয়ে নিজের মতামত জানিয়েছিলেন। ”পেঁয়াজকেপলাণ্ডু বলে–পল মানে মাংস। পেঁয়াজ ভেজে খেলে দুষ্পচ্য, পেটের ব্যানো হয়, সিদ্ধ করে খেলে উপকার করে এবং মাংসের যে কস্টিভনেস’ থাকে সেটা নাশ করে।”
পিঁয়াজ সম্পর্কে স্বামীজি কি শেষ পর্যন্ত তার মত পরিবর্তন করেছিলেন? মেরি লুইস বার্ক-এর ঐতিহাসিক বইতে দেখা যাচ্ছে, একজন ছাত্র স্যানফ্রানসিসকোতে প্রশ্ন করছে, পিঁয়াজ সম্বন্ধে আপনার মত? স্বামীজির উত্তর : “আধ্যাত্মপথের যাত্রীদের পক্ষে পিঁয়াজ অবশ্যই সেরা খাদ্য নয়।” সেই সঙ্গে স্বামীজির সরল স্বীকারোক্তি, “ছোটবেলায় আমি কী ভীষণ ভালবাসতাম। পিঁয়াজ খেয়ে মুখের গন্ধ দূর করবার জন্যে খোলা হাওয়ায় অনেকক্ষণ হাঁটা চলা করতাম।”
পোলাও পর্বের যেন শেষ নেই। প্রথমবার আমেরিকা যাবার আগে স্বামীজি বোম্বাইতে রয়েছেন, হঠাৎ ইচ্ছে হলো স্বহস্তে সকলকে পোলাও বেঁধে খাওয়াবেন। মাংস, চাল, খোয়া-ক্ষির ইত্যাদি সকল প্রকার উপকরণ জোগাড় হল। এদিকে আখনির জল তৈরি হতে লাগল, স্বামীজি আখনির জল থেকে সামান্য কিছু মাংস তুলে খেলেন। পোলাও তৈরি হলো। স্বামীজি ইতিমধ্যে অন্য একটি ঘরে গিয়ে ধ্যান করতে লাগলেন। আহারের সময় সকলে বারবার তাকে খেতে অনুরোধ করলেন। কিন্তু তিনি বললেন, আমার খেতে কোনো ইচ্ছে নেই, তোমাদের একটা বেঁধে খাওয়ানো উদ্দেশ্য ছিল, সেজন্য ১৪ টাকা খরচ করে এক হাঁড়ি পোলাও বেঁধেছি-খাওগে যাও।” স্বামীজি আবার ধ্যানে বসলেন।
