.
লন্ডনে স্বামীজির ফল নিয়ে কিন্তু এক রহস্যময় ব্যাপার ঘটেছিল। ১৮৯৬ সালে স্বামীজি যখন লন্ডনে এসেছেন তখন ওখানকার বিখ্যাত ফলের দোকানের নাম উইলিয়ম হোয়াইটলি। কোনো এক ভক্ত রহস্যজনকভাবে এই দোকানে নিজের পরিচয় গোপন করে বেশ কিছু টাকা জমা রেখে গিয়েছিলেন, প্রত্যেকদিন স্বামীজির বাড়িতে সেরা ফল হোম ডেলিভারির জন্য।
বেলা এগারোটার সময় প্রত্যেকদিন হোয়াইটলির দোকান থেকে একজন কর্মচারি এসে কাগজে মোড়া বেশ কিছু ফল স্বামীজির বাসস্থানে দিয়ে যেতো। বাজারে ফল উঠবার তিন সপ্তাহ আগেই বিভিন্ন ধরনের টাটকা ফল স্বামীজির টেবিলে পৌঁছে যেতো। আনারস তখন লন্ডনে দুপ্রাপ্য, দাম প্রায় একগিনি।যখনকার যে ফলটি পাওয়া যেতো,যতই দাম হোক, হোয়াইটলির লোকটি তাই স্বামীজিকে দিয়ে যেতো।
কার আদেশে এই ফল আসতো সে রহস্য আজও পরিষ্কার হয়নি, তবে সন্দেহের তীর রয়েছে মিস জোসেফিন ম্যাকলাউডের দিকে। কারণ তিনি লন্ডনে আসার পর থেকেই অঘটন ঘটতে আরম্ভ করে।
চোখের সামনে দুষ্প্রাপ্য আনারস দেখে স্বামীজির খুবই আনন্দ। কিন্তু সেবক গুডউইন তা ছাড়াতে পারছেনা। আনারস ছাড়ানো খুব সহজ ব্যাপার নয়। গুডউইনের অবস্থা দেখে তখন স্বামীজি নিজেই ছুরি হাতে আসরে নামলেন। টুকরো টুকরো করে, গুঁড়ো চিনি দিয়ে সবাইকে দেওয়া হলো। মহেন্দ্রনাথের স্মৃতিকথায় এসবের মনমাতানো উল্লেখ আছে।
মনে রাখতে হবে, নিত্য ফল সরবরাহের রহস্যজনক সম্পর্ক গড়ে ওঠার একটু আগে থেকেই উইলিয়ম হোয়াইটলির দোকানে বিবেকানন্দপ্রেমীদের যাতায়াত শুরু হয়েছিল। সেবার লন্ডনে হঠাৎ কাঁচা লঙ্কা খাবার সাধ হলো স্বামীজির। খুঁজতে খুঁজতে অনেক সন্ধানের পর কৃষ্ণ মেনন তিনটি খুব কঁচা লঙ্কা হোয়াইটলি থেকে সংগ্রহকরলেন।দাম শুনলেচক্ষুচড়কগাছ–তখনকার দিনে তিনটি কঁচা লঙ্কা তিন শিলিং, ঝাল নেই, তবে গন্ধ আছে। ব্রেকফাস্টে বসে লঙ্কাপ্রেমী স্বামীজি একের পর এক লঙ্কাগুলো খেয়ে নিলেন।
লঙ্কার কথা আরও দীর্ঘনাহলে স্বামীজির জীবনের প্রতি যে অবিচার করা হয় এবিষয়ে মতানৈক্য নেই।
লঙ্কাকাণ্ডটা শুরুর আগে ফলের কথাটা গুটিয়ে আনাও প্রয়োজন। আমরা জানি স্বামীজি ফল ভালবাসতেন, বিশ্বাস করতেন সাধারণ মানুষের কর্মেও যেমন অধিকার, গাছের ফলেও তেমন অধিকার! স্বামী অদ্বৈতানন্দকে (গোপালচন্দ্র ঘোষ) তিনি বলেছিলেন, “ফল দুধ বরাবর খেয়ে কেউ যদি জীবন কাটায় তাহলে হাড়ে জং ধরে না!”
এবার প্রশ্ন হলো, কোন কোন ফল স্বামীজির ভালো লাগতো? আমরা দেখেছি, কলেজ স্ট্রিট পাড়ায় কথামৃতকার মাস্টারমশায়ের কাছে গিয়ে স্বামীজি তরমুজ খাবার ইচ্ছা প্রকাশ করছেন। আমরা দেখেছি, নেয়াপাতি ডাবের মধ্যে বরফ এবং চিনি ঢেলে ঠাণ্ডা অবস্থায় খেতে খুব ভালবাসতেন। আমাদের দুর্ভাগ্য স্বামীজিকে আমরা ফ্রিজের সুখ দিতে পারিনি। আমরা দেখেছি, তিনি একাধিক ভক্তকে দীক্ষান্তে গুরুকে লিচুর গুরুদক্ষিণা দেবার পরামর্শ দিচ্ছেন। আবার আমরা দেখছি, বেলুড় মঠে যে বিশাল সাইজের কাঁঠাল ফলেছে তার প্রশস্তি গেয়ে সে সম্পর্কে বিস্তারিত বিবরণ দিয়ে বিদেশিনী শিষ্যা ক্রিশ্চিনকে তিনি চিঠি লিখছেন। ইংরিজিতে কাঁঠালমাহাত্ম্য সুললিতভাবে বর্ণনা করা অত সহজ কর্ম নয়।
শেষপর্বে আমরা দেখছি, ডায়াবিটিসে কাতর স্বামীজি বড় জাগুলিয়ায় তার বোনের বাড়ি থেকে সেরা জাম নিয়ে বেলুড় মঠে ফিরছেন। সেবার বেলুড়ে কালোজামের রসকে বোতলবন্দি করে ছিপি এঁটে পাঁচ-সাতদিন রোদ্দুর খাইয়ে রান্নাঘরের পাশে দড়ি বেঁধে রাখা হলো। ফারমেন্ট হয়ে রস তেজি হওয়ায় বেলুড়ের সেই বোতল যখন দুম করে ফাটলো, তখন উৎফুল্ল বিবেকানন্দ অনুগতদের কাছে সগর্বে ঘোষণা করলেন, “এই সিরকা ভারি হজমি–এতোদিনে ঠিক তৈরি হয়েছে, তোরা রোজ একটু একটু খাবি।”
স্বামীজির সাধক জীবনের শুরুতে আমরা এক আজব ডাক্তারের পরিচয় পাচ্ছি, যিনি খালি হাতে রোগীর কাছে যেতেন না। নরেন্দ্রনাথের একবার পাথুরি হয়েছিল, ডাক্তার রাজেন দত্ত রোগী দেখবার সময় এনেছিলেন নতুন বাজার থেকে কেনা মস্ত এক বেল। সেই বেল নরেন্দ্রনাথ মুখে দিতে পারেননি, এমন কোনো রিপোর্ট আমাদের কাছে নেই। সুতরাং ধরে নেওয়া যেতে পারে বিলেদের বেল অপছন্দ করার পথ থাকে না!
কিন্তু যতবড় ফলাহারি মহাপুরুষ হোন, দুনিয়ার সব ফল কারও ভাল লাগতে পারেনা। অনেক খোঁজখবর নিয়ে দেখা যাচ্ছে একমাত্র একটি ফলের বিরুদ্ধে স্বামীজি আকারে ইঙ্গিতে অনীহা প্রকাশ করেছেন। বারুইপুরের পেয়ারাবাগানের মালিকদের পক্ষে দুঃসংবাদ, স্বামীজি একবার বলেছিলেন, যদি কখনও দেবতাকে ফলদান করে সেই ফলটি থেকে সারাজীবন তাকে দূরে থাকতে হয় তাহলে সেটি হবে পেয়ারা! মার্কিনী মহিলা তৎক্ষণাৎ বুঝতে পেরেছিলেন, স্বামীজি পেয়ারা অপছন্দ করেন। জীবনের শেষ পর্বে অসুস্থ শরীরকে সুস্থ করার জন্য আলমোড়ায় উপস্থিত হয়ে স্বামীজি তাঁর পরমপ্রিয় গুরুভাই রাখালকে লিখছেন, “রাত্রির খাওয়াটা মনে করছি খুব লাইট করব…রাত্রে দুধ ফল ইত্যাদি।তাই তোওৎ পেতে ফলের বাগানে পড়ে আছি, হে কর্তা!” সুরসিক তো এঁকেই বলে!
সত্যিই, মানুষটার কি রসিকতাবোধ! বিশ্বসংসারে শতযন্ত্রণার মধ্যেও কৌতুকবোধ এবং মানুষের প্রতি ভালবাসা হারাতে রাজি হননি বলেই আজও স্বামীজি এদেশের এতো মানুষের হৃদয়েশ্বর হয়ে আছেন।
