মীরাটে স্বামীজি তাঁর গুরুভাইদের জুতো সেলাই থেকে চণ্ডীপাঠ এবং সেইসঙ্গে পোলাও কালিয়া রান্না শেখাতেন। একদিন পোলাও বেঁধেছেন। মাংসের কিমা করিয়েছিলেন, কিছু শিক্ কাবাব করবার ইচ্ছা। কিন্তু শিক পাওয়া গেল না। তখন মাথা ঘামিয়ে স্বামীজি সামনের পিচগাছ থেকে গোটাকয়েক ছোট ডাল ছিঁড়ে নিয়ে তাতেই কিমা জড়িয়ে দিয়ে কাবাব করলেন। সবাইকে খাওয়ালেন, নিজে কিন্তু খেলেন না। বললেন, “তোমাদের খাইয়ে আমার বড় সুখ হচ্ছে।”
তবে স্বদেশের অনশন অপেক্ষা বিদেশের অনশন-আশঙ্কা যে অনেক বেশি আতঙ্কজনক তা বুঝতে কারও কষ্ট হয় না। মেরি লুইস বার্ক-এর বিখ্যাত বইতে মার্কিনপ্রবাসী বিবেকানন্দের একটি মর্মস্পর্শী টেলিগ্রামের উল্লেখ আছে। বোস্ট থেকে বিবেকানন্দ এটি পাঠাতে বাধ্য হয়েছিলেন মাদ্রাজে প্রিয় শিষ্য আলাসিঙ্গা পেরুমলকে : না খেয়ে রয়েছি! সমস্ত টাকা খরচ হয়ে গিয়েছে। অন্তত দেশে ফিরে যাবার মতন কিছু টাকা পাঠাও। Starving. All money spent. Send money to return at least.
দু’দিন পরে শিকাগোতে যিনি ঝড় তুলবেন এবং বিশ্ববিজয়ী হবেন, তিনি প্রবাসে অনাহারে মৃত্যুর মুখোমুখি। বড় ভীষণ জায়গা এই মার্কিন দেশ। এখানে ভিক্ষা করা অপরাধ, ভিক্ষা চাইলে জেলবাস অনিবার্য!
স্বামীজি অবশেষে খ্যাতি, সম্মান ও শ্রদ্ধার মুকুট পরিধান করেছেন। কিন্তু প্রবাসে অর্থসমস্যার সমাধান সব সময় হয়নি। তাঁর সহযোগী আমেরিকান সাধক কৃপানন্দ একসময় নিউইয়র্ক থেকে গোপনে মিসেস ওলি বুলকে জানাচ্ছেন : “স্বামীজি নিজেই ঘরভাড়া, বিজ্ঞাপন দেওয়া, ছাপানো ইত্যাদি খরচ বহন করছেন। এই সব খরচ বহন করতে গিয়ে অনেক সময় না খেয়ে থাকেন–হি স্টার্ভ হিমসেলফ। কিন্তু তিনি দৈত্যের মত খাটেন।”
অনাহার কাকে বলে তা জানতেন বলেই পৃথিবীর অনাহারী অর্ধ-আহারী মানুষের দুঃখের কথা বিবেকানন্দ এমনভাবে অনুভব করতে সক্ষম হয়েছেন।
দুমুঠো অন্ন সবার মুখে তুলে দেবার জন্য সর্বত্যাগী সন্ন্যাসীর সে কি ব্যাকুলতা। শেষজীবনে শত শারীরিক যন্ত্রণা সত্ত্বেও সন্ন্যাসী বিবেকানন্দ তাঁর প্রিয় শিষ্য শরচ্চন্দ্রকে অন্নসত্ৰ খোলার কথা বলেছেন। “যখন টাকা আসবে তখন একটা মস্ত কিচেন করতে হবে। অন্নসত্রে কেবল ‘দীয়তাং নীয়তাং ভুজ্যতাম’ এই রব উঠবে, ভাতের ফেন গঙ্গায় গড়িয়ে পড়ে গঙ্গার জল সাদা হয়ে যাবে। এই রকম অন্নসত্র হয়েছে দেখব তবে আমার প্রাণটা ঠাণ্ডা হবে।”
.
পটলাদা সেবার বলেছিলেন, “ওরে সন্ন্যাসীর অনাহারের পরিপ্রেক্ষিতে যদি সম্রাট বিবেকানন্দকে ফেলতে পারিস তা হলে ব্যাপারটা জমে ওঠে। কখনও এই বিবেকানন্দর পদসেবা করতে উন্মুখ এদেশের রাজা মহারাজারা এবং বিদেশের ধনপতিরা। আবার কখনও তার খাওয়া জুটছে না। যে লোক আজ অর্ধাহারে পথের প্রান্তে পড়ে আছেন, পরের দিন তাকেই আমরা দেখতে পাই তাঁর সামনে রাজপ্রাসাদের রাজভোগ সাজিয়ে রাজাধিরাজ স্বয়ং হাওয়া করছে। তার এক ভক্ত জুটেছিল পরিব্রাজক কালে। এই ভক্তটির ধারণা, সাধু-সন্ন্যাসীর স্থূলকায় হওয়া অসম্ভব। স্বামীজি তাকে বলেছিলেন, এটাই আমার ফেমিন-ইনসিওরেন্স ফান্ড যদি পাঁচদিন খেতে না পাই তবু আমার চর্বি আমাকে জীবিত রাখবে।”
মার্কিন দেশে এবং পরবর্তী সময়ে ইউরোপে স্বামীজি খাওয়ার ব্যাপারে কষ্ট এবং সুখ দুই-ই প্রবলভাবে পেয়েছেন। কখনও রাস্তায় রাত কাটাচ্ছেন, কখনও অনুরাগীদের স্নেহাশ্রয়ে তাদের প্রাসাদোপম অট্টালিকায় উঠছেন, কখনও অতি সস্তা হোটেলে, কখনও বা ভাড়া করা অ্যাপার্টমেন্টে, আবার কখনও পাঁচতারা হোটেলের লাক্সারি সুইটে তাকে আমরা দেখতে পাচ্ছি। অর্থাভাবে কখনও স্রেফ পাঁউরুটি ভরসা, আবার কখনও ব্যাংকোয়েট ভোজন।মুগ্ধবিবেকানন্দপ্রবাসের সংগ্রামের সময়নৰ্থক্যালকাটারগুরুভাইদের কাছেমাঝে-মাঝে বাংলায় যে সব বিবরণ দিয়েছেন তা বাংলা ভ্রমণসাহিত্যের অক্ষয় সম্পদ। স্বামীজি লিখছে, “কলাকৌশলে এরা অদ্বিতীয়, ভোগে বিলাসে এরা অদ্বিতীয়, পয়সা রোজগারে অদ্বিতীয়, খরচে অদ্বিতীয়।”
একটা লেকচারে “আমি ৫০০ ডলার পর্যন্ত পাইয়াছি।” তখন ডলারের দাম তিনটাকার মতন। “আমার এখানে এখন পোয়াবারো। এরা আমায় ভালবাসে, হাজার হাজার লোক আমার কথা শুনতে আসে।”
১৮৯৪ সালের গ্রীষ্মকালে মার্কিন দেশ থেকে কলকাতায় গুরুভাইদের লিখছেন : “এখানে হোটেলের কথা কি বলিব! নিউ ইয়র্কে এক হোটেলে আছি, যেখানে ৫০০০ পর্যন্ত রোজ ঘরভাড়া, খাওয়া-দাওয়া ছাড়া।…এরা হ’ল পৃথিবীর মধ্যে ধনী দেশ-টাকা খোলামকুচির মতন খরচ হয়ে যায়। আমি কদাচ হোটেলে থাকি, আমি প্রায়ই এদের বড় বড় লোকের অতিথি।”
.
বিদেশে এলাহি ডিনার কীরকম হয় তার বর্ণনা স্বামীজি নিজেই লিখে গিয়েছেন। “ডিনারটাই প্রধান খাদ্যধনী হলে তার ফরাসি রাঁধুনি এবং ফরাসি চাল। প্রথমে একটু আধটু নোনা মাছ বা মাছের ডিম, বা কোন চাটনি বা সবজি। এটা হচ্ছে ক্ষুধাবৃদ্ধি, তারপর স্যুপ, তারপর আজকাল ফ্যাশন–একটা ফল, তারপর মাছ, তারপর মাংসের একটা তরকারি, তারপর থান-মাংস শূল্য, সঙ্গে কাঁচা সবজি, তারপর আরণ্য মাংস মৃগপক্ষাদি, তারপর মিষ্টান্ন, শেষ কুলপি–মধুরেণ সমাপয়েৎ…থাল বদলাবার সঙ্গে সঙ্গে কাটা-চামচ সব বদলাচ্ছে; আহারান্তে কফি বিনা-দুগ্ধ।”
