ভারত-পরিক্রমায় বেরিয়ে বরানগরের অভিজ্ঞতা যে খুব কাজে লেগে গিয়েছিল তা বিবেকানন্দ অনুরাগীদের কাছে এখন আর অস্পষ্ট নয়। পরিব্রাজক বিবেকানন্দর একটি চিঠি গুরুভাইকে লেখা : “আমি নির্লজ্জভাবে ঘুরে ঘুরে অপরের বাড়িতে আহার করছি, আর এতে বিবেকের দংশনও হচ্ছে না–ঠিক যেন একটি কাক…আর ভিক্ষে করবো না। আমাকে খাইয়ে গরীবের লাভ কী? তারা একমুঠো চাল পেলে বরং নিজের ছেলেমেয়েদের খাওয়াতে পারে।”
পরিস্থিতি অবশ্য সর্বত্র সমান নয়। শুনুন মধ্যপ্রদেশের খান্ডোয়া ছাড়িয়ে একটা রিপোর্ট : “নিতান্ত অসভ্য ও অতিথিসকার বিমুখ, একমুঠো ভিক্ষা চাইলে দেয় না–আশ্রয় চাইলে তাড়িয়ে দেয়। কয়েক দিবস নিরস্তু উপবাস, পরে জীবনধারণোপযোগী সামান্য কিছু আহার করে শরীর রক্ষা।”
একবার বৃন্দাবন থেকে গিরিগগাবর্ধন পরিক্রমাকালে স্বামীজি সঙ্কল্প করলেন, না-চেয়ে যে ভিক্ষা মিলবে তাতেই ক্ষুধা নিবৃত্তি করবেন। তাছাড়া কারও কাছে কিছু চাইবেন না। প্রথম দিন দ্বিপ্রহরে ক্ষুধার তাড়না অসহ্য হয়ে উঠলো, আবার সেই সঙ্গে বৃষ্টি। পথশ্রমে দুর্বল সন্ন্যাসী শুনলেন, কে যেন পিছন থেকে তাকে ডাকছেন। ক্ষুধার্ত বিবেকানন্দ প্রথমে ছুটতে লাগলেন, পিছনের লোকটিও ছোটা শুরু করেছেন এবং সন্ন্যাসীকে ধরে ফেলে তাঁকে ভোজ্যদ্রব্য গ্রহণ করতে অনুরোধ করলেন!
আরও একবার স্বামীজি স্থির করেছিলেন খাদ্যভিক্ষা করবেন না। ফলে মাঝে মাঝে উপবাসে কাটাতে হতো। একবার দুদিন অনাহারে আছেন, এমন সময় এক বড়লোকের ঘোড়ার সহিস তাকে ডেকে জিজ্ঞেস করলো, “সাধুবাবা, কিছু ভোজন হয়েছে?” এরপর দয়াপরবশ হয়ে সহিস কয়েকটা রুটি ও ঝালচাটনি খেতে দিলেন। এই চাটনিতে এত ঝাল যে দু’দিন উপবাসের পর ওটা খেয়ে তিনি পেটের যন্ত্রণায় ছটফট করতে লাগলেন। সহিসও খুব বিপদে পড়ে গিয়েছে। এমন সময় একটা লোক মাথায় ঝুড়ি নিয়ে যাচ্ছিল। স্বামীজি তাকে জিজ্ঞেস করলেন, ঝুড়িতে কি আছে? লোকটি বললো, তেঁতুল। “এই তো চাই!” ঐ তেঁতুল খেয়ে স্বামীজির পেটের যন্ত্রণার নিবৃত্তি হলো।
আলমোড়ার উপকণ্ঠে ক্ষুধা ও পথশ্রমে ক্লান্ত স্বামীজিকে একবার ভূমিশয্যা নিতে হয়েছিল। সামনেই গোরস্থান। একজন ফকিরের দয়ায় সেবার স্বামীজি বেঁচে গেলেন। দয়াময় ফকিরটি একফালি শশা এনে সন্ন্যাসীর হাতে দিলেন। পরে বিবেকানন্দ স্বীকার করেছেন, “আমি আর কখনও ক্ষুধায় এতটা কাতর হইনি।”
আর সেই বিখ্যাত গল্পটি, হাতরাস স্টেশনে রেলকর্মচারী এবং ভবিষ্যৎ শিষ্য শরৎ গুপ্তর সঙ্গে প্রথম সাক্ষাৎকার। সন্ন্যাসীকে দেখে সহকারী স্টেশন মাস্টারের প্রশ্ন : “স্বামীজি আপনি কি ক্ষুধার্ত?” সাধু : “হ্যাঁ।” শরৎ: “তবে দয়া করে আমার ঘরে আসুন।” সাধু : “আপনি কি খেতে দেবেন?” শরৎ একটি উর্দু কবিতা আউড়ে বললেন, “হে প্রিয়, তুমি আমার ঘরে এসেছ, আমি সুন্দর মসলাসহ আমার কলিজাটা বেঁধে আপনাকে খাওয়াব।”
পরিব্রাজক জীবনের অবর্ণনীয় কষ্টের কথা স্বামীজি তুলনাহীন ভাষায় পরবর্তীকালে তাঁর ভক্তদের শুনিয়েছিলেন ক্যালিফোর্নিয়ায়। “কতবার আমি অনাহারে, বিক্ষতচরণে, ক্লান্তদেহে মৃত্যুর সম্মুখীন হয়েছি। কতবার দিনের পর দিন এক মুষ্টি অন্ন না পেয়ে পথচলা অসম্ভব হয়ে পড়েছে। তখন অবসন্ন শরীর বৃক্ষচ্ছায়ায় লুটিয়ে পড়তো, তখন মনে হতো প্রাণবায়ু বেরিয়ে যাচ্ছে! কথা বলতে পারতাম না, চিন্তাও অসম্ভব হয়ে পড়তো; আর অমনি মনে এই ভাব উঠতো, আমার কোনো ভয় নেই, মৃত্যুও নেই; আমার জন্ম কখনও হয়নি, মৃত্যুও হবে না; আমার ক্ষুধা নেই, তৃষ্ণা নেই। সারা প্রকৃতির ক্ষমতা নেই আমায় পিষে মারে। প্রকৃতি তো আমার দাসী। হে দেবাদিদেব, হে পরমেশ্বর, নিজ মহিমা প্রকাশ কর, স্বরাজ্যে প্রতিষ্ঠিত হও! উত্তিষ্ঠত জাগ্রত! বিরত হয়ো না। অমনি আমি পুনর্বল লাভ করে উঠে দাঁড়াতাম। তাই আমি আজও বেঁচে আছি।”
.
অনাহারের ভয় যার চলে গিয়েছে জগৎসংসার তাকে আর অন্য কোনো ভয় দেখতে পারে না। এইটাই সর্বহারা মানুষের উপরি পাওনা।
একবার উত্তরভারতে স্বামীজি একা একা ঘুরে বেড়াচ্ছেন। একজন অসৎ থানাদার তার পিছনে লাগলো, কয়েদ করবার ভয় দেখাল। পরিব্রাজক বিবেকানন্দর মন তখন অতি বিষণ্ণ, তিনি ভয়শূন্য মনে বললেন, “চলুন না। এরূপ অনিশ্চিত অনাহারে থাকার চেয়ে তবুও থানায় দু’বার খেতে পাওয়া যাবে, সেতো ভাল কথা।”
স্বামীজির দীর্ঘতম উপবাসের মেয়াদ কত? এ-প্রশ্ন উঠতেই পারে। তার সোজাসুজি উত্তরের সন্ধানও পাওয়া গিয়েছে। এক-আধদিন উপবাসকে স্বামীজি সবসময় উপেক্ষা করেছেন, তবে ঈশ্বরের দয়ায় কখনও তিনদিনের বেশি উপবাস করতে হয়নি।
অনাহারের আশঙ্কা কিন্তু সন্ন্যাসী বিবেকানন্দকে কখনও দমিয়ে রাখতে পারেনি। ১৮৯০ সালে ডিসেম্বরের এক সন্ধ্যায় পরিব্রাজক বিবেকানন্দ কয়েকজন গুরুভাইকে নিয়ে মীরাটে হাজির হলেন। মীরাট শহরের ২৫৯ নম্বর রামবাগে লালা নন্দরাম গুপ্তর বাগানবাড়িতে ক’দিন ছিলেন। আফগানিস্থানের আমীর আব্দার রহমানের জনৈক আত্মীয় সেবার সাধুদের পোলাও খাওয়ানোর জন্য কিছু টাকা দেন! স্বামীজি উৎসাহভরে পোলাও রান্নার দায়িত্ব নেন। অন্যদিনেও স্বামীজি মাঝে-মাঝে রান্নায় সাহায্য করতেন। স্বামী তূরীয়ানন্দকে খাওয়ানোর জন্য একদিন নিজে বাজার থেকে মাংস কিনে আনেন, ডিম যোগাড় করেন এবং উপাদেয় সব পদ প্রস্তুত করেন।
