যাঁরা মদ্যপান করেন তাদের জন্য খাদ্যের তালে তালে পানীয়–থাল বদলাবার সঙ্গে সঙ্গে মদ বদলাচ্ছে–শেরি, ক্ল্যারেট, শ্যামপা ইত্যাদি এবং মধ্যে মধ্যে মদের কুলপি একটু আধটু। স্বামীজি লিখছেন, “খাওয়ার রকমারি, সঙ্গে মদের রকমারি দেখাতে পারলে তবে বিড়োমানুষি’ চাল বলবে। একটা খাওয়ায় আমাদের দেশের একটা মধ্যবিত্ত লোক সর্বস্বান্ত হতে পারে, এমন খাওয়ার ধুম এরা করে।”
উনিশ শতকের শেষ প্রান্তে পৃথিবীর কোন জাত কখন কী খায়, কত বার খায় এবং তাদের সুখাসনটি কীরকম সে বিষয়ে সন্ন্যাসী বিবেকানন্দের থেকে বেশি খোঁজখবর কোনো ভারতীয় কস্মিনকালেও করেছেন বলে মনে হয় না।
একটু নমুনা চেখে দেখা মন্দ নয়। “ফরাসী চাল–সকালবেলা কফি এবং এক-আধটুকরো রুটি-মাখন; দুপুরবেলা মাছ-মাংস ইত্যাদি মধ্যবিৎ; রাত্রে লম্বা খাওয়া। ইতালি, স্পেন প্রভৃতি জাতিদের ঐ একরকম; জার্মানরা ক্রমাগতই খাচ্ছে–পাঁচবার, ছ বার, প্রত্যেকবারেই অল্পবিস্তর মাংস। ইংরেজরা তিনবার সকালে অল্প, কিন্তু মধ্যে মধ্যে কফি-যোগ, চা-যোগ আছে। আমেরিকানদের তিনবার–উত্তম ভোজন, মাংস প্রচুর।”
বিবেকানন্দ তুলনামূলকভাবে লক্ষ্য করেছেন, গরিব অবস্থায় সকল দেশের খাওয়াই ধান্যবিশেষ। বাংলায় তার সঙ্গে ডাল তরকারি, কখন কখন মাছমাংস চাটনিবৎ।
“ইউরোপের অবস্থাপন্ন লোকের এবং আমেরিকার আবালবৃদ্ধবনিতার। খাওয়া আর এক রকম–অর্থাৎ রুটি ভাত প্রভৃতি, চাটনি এবং মাছ-মাংসই হচ্ছে খাওয়া। আমেরিকায় রুটি খাওয়া নাই বললেই হয়। মাছ মাছই এল, মাংস মাংসই এল, তাকে এমনি খেতে হবে, ভাত-রুটির সংযোগ নয়।”
কোন জাত কীভাবে বসে খায় তাও বিবেকানন্দ মন দিয়ে অনুসন্ধান করেছেন : “আর্যরা একটা পীঠে বসত, একটা পীঠে ঠেসান দিত এবং জলচৌকির উপর থালা রেখে এক থালাতেই সকল খাওয়া খেত।” পাঞ্জাব, রাজপুতানা, মহারাষ্ট্র ও গুর্জর দেশে একই স্টাইল। বাঙালিরা “মাটিতেই সাপড়ান। মহীশূরে মহারাজও মাটিতে আঙট পেতে ডালভাত খান।…চীনেরা টেবিলে খায়…রোমান ও গ্রীকরা কোচে শুয়ে টেবিলের ওপর থেকে হাত দিয়ে খেত। ইউরোপীয়রা টেবিলের ওপর হ’তে কেদারায় বসে–হাত দিয়ে পূর্বে খেত, এখন নানাপ্রকার কাঁটা চামচ।”
পটলাদা সেবার আমাকে বলেছিলেন, “দেখলি লোকটার প্রতিভা। তুলির কয়েকটা টানে পৃথিবীর ভোজনসভ্যতাটা এঁকে ফেললেন। পড়লেই বোঝা যায়, টুকলিফাইং ব্যাপার নয়, নিজের চোখে দেখে, বইপত্তর কনসাল্ট করে, বাড়তি জলটুকু বার করে দিয়ে ক্ষীরটুকু আমাদের জন্যে রেখে যাওয়া। ধর্টর্ম না করেও স্রেফ রসনার রহস্যভেদে মন দিলেও চিরকাল নাম থেকে যেতো মানুষটার। মহাজনরা এরকমই হন, যা কিছু স্পর্শ করেন তাই সোনা হয়ে যায়।”
“এবার বিবেকানন্দকে পরের পর কয়েকটা পর্বে ভাগ করে নেওয়া যাকবাড়ির বিবেকানন্দ, বরানগরের বিবেকানন্দ, পথের বিবেকানন্দ, পাশ্চাত্যের বিবেকানন্দ, বিলেতের বিবেকানন্দ, বিশ্ববিজয় করে দেশে ফেরা বিবেকানন্দ এবং মহাপ্রস্থানের পথে বিবেকানন্দ। এবার তার রান্নাবান্না। খাওয়া এবং না-খাওয়া বিবেকানন্দকে প্রথমপর্বের ম্যাপটার ওপর চাপিয়ে দেওয়া যাক, তবে বুঝতে পারা যাবে একটা মানুষ কত সহ্য করতে পারে এবং এতো সহ্য করেও সমস্ত মানুষের মঙ্গল ও মুক্তির জন্যে স্বামীজি কেমন করে এতো ভাবতে পারলেন?
.
পটলাদাকে সেবার প্রশ্ন করেছিলাম, “মানুষটা যেভাবে বনবন করে ঘুরেছে, শরীর স্বাস্থ্য এবং সামর্থ্যের তোয়াক্কা না করে, তাতে কেমনভাবে খোঁজ পাবো স্বামীজির খাওয়াদাওয়ার?”
পটলাদা বললেন, “নিরুৎসাহ হবি না, ওটা হলো ডিসপেপটিক জাতির লক্ষণ, পেটের রোগে আজন্ম ভুগলে মাঝে মাঝে অমন দিশাহারা ভাব হয়।”
স্বামীজির পাশ্চাত্যপর্বটা ইদানীং খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে বিচার-বিবেচনা করা হয়েছে। আমরা যখন বিবেকানন্দ ইস্কুলে পড়তাম তখন স্বামীজির কয়েকশ চিঠিপত্তর আর খানকয়েক বক্তৃতা ছাড়া আমাদের হাতে তেমন কিছুই ছিল না। তারপর মার্কিনী-গবেষিকা মেরি লুইস বার্ক আসরে নেমে পড়ে কাগজপত্তর, চিঠিপত্তর এবং অসংখ্য পরিবারের স্মৃতিসঞ্চয় মন্থন করে ইংরিজি ভাষায় এমন আশ্চর্য কাজ করেছেন যে মাথা ঘুরে যায়। পড়তে পড়তে যেখানে ছিটেফোঁটা যা যা পাওয়া গিয়েছে নোটবইতে টুকে নিয়েছি।”
“স্বদেশীপর্বটা ব্যাকগিয়ারে পরে বিবেচনা করা যাবে। আগে আমেরিকা ও ইউরোপ-পর্বের খোঁজখবর নেওয়া যাক।
কেশব সেনের ভাগ্নে বি এল গুপ্ত তখন লন্ডনে থাকতেন। মিসেস গুপ্তের বাড়িতে প্রায়ই যে বিবেকানন্দর পদধূলি পড়তো তার প্রমাণ রয়েছে। মিসেস গুপ্ত খোদ লন্ডনে বসে ছানা কাটিয়ে পান্তুয়া তৈরি করতেন এবং অভ্যাগতদের খাওয়াতেন। আজকের কথা নয়, খোদ ১৮৯৬ সালের রিপোর্ট! ভেজিটারিয়ান মিস হেনরিয়েটা মুলারের বাড়িতে সান্ধ্য আহার–দুধ দিয়ে মোটা ম্যাকারনি স্যুপ। তাতে নুন দেওয়া ছিল–অদ্ভুত এই ইংরেজ জাত, দুধে নুন মেশাতে ভয় করে না। বিবেকানন্দ তাঁর গুরুভাই নবাগত স্বামী সারদানন্দকে শেখালেন, কেমন করে চামচ ধরতে হয় এবং কীভাবে স্যুপ খেতে হয়। একবার টেবিলের তলায় সারদানন্দের পা চেপে ধরে ইঙ্গিত দিলেন নাইফ সবসময় ডান হাতে ধরতে হয়, কখনই বাঁ হাতে নয়।
