“পটলাদা, আপনি যা যা লিপিবদ্ধ করেছেন বিভিন্ন সূত্র থেকে তার সংক্ষিপ্ত বৃত্তান্ত পেশ করতে হলে সাতশ-সাঁইত্রিশ পাতার বই লিখতে হবে।”
পটলাদা; “বিষয়টাও বিশাল, একথা ভুললে চলবে না। সেবার তোকে বলেছি, বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে রসনারসিক বিবেকানন্দকে দেখলে মাথা ঘুরে যায়! মনে হচ্ছে, সব দৃষ্টিকোণ থেকে যাচাই করতে হলে তোর আরও উনচল্লিশ বছর লেগে যাবে, তার থেকে বরং ব্যাপারটাকে কালানুক্রমিক সাজিয়ে নে, তাহলে সংক্ষিপ্তসার লিখতে
তেমন কষ্ট হবে না।”
প্রথম পর্বটাকে সুখাসনে সুখাহার পর্ব বলা যেতে পারেনরেনের বাবা যতদিন বেঁচে আছেন এবং দক্ষিণেশ্বরে ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণের সঙ্গে পরিচয়ের আদিপর্ব কেবল শুরু হয়েছে। এই পর্বে দক্ষিণেশ্বরের ঠাকুর তার প্রিয় শিষ্যটিকে দেখেই মাখন, মিছরি ও কতকগুলো সন্দেশ এনে স্বহস্তে খাইয়ে দিতে লাগলেন। “আমি যত বলিতে লাগিলাম আমাকে খাবারগুলি দিন। আমি সঙ্গীদের সঙ্গে ভাগ করিয়া খাইব। তিনি তাহা কিছুতেই শুনিলেন না।”
এই পর্বে ঠাকুর বোধ হয় নরেনকে হুঁকোও খাইয়েছিলেন। নিকটজনের সাবধানবাণী, নরেন হোটেলে খায়! পরমহংসদেবের উত্তর : “ওরে শালা তোর কি রে?…তুই শালা যদি হবিষ্যিও খাস, আর নরেন যদি হোটেলে খায়, তা হলেও তুই নরেনের সমান হতে পারবি না।”
নরেনের মধ্যে সত্যকে চেপে রাখার প্রবৃত্তি ছিল না। একবার হোটেলে খেয়ে এসে ঠাকুরকে বললেন, “মহাশয় আজ হোটেলে, সাধারণে যাহাকে অখাদ্য বলে, খাইয়া আসিয়াছি।” ঠাকুরের উত্তর, “তোর তাতে দোষ লাগবে না।”
বোঝা যাচ্ছে তরুণ বয়সে হোটেলে খাওয়ায় নরেনের প্রবল উৎসাহ ছিল। এই সময়েই বোধ হয় তিনি ভবিষ্যৎবাণী করেছিলেন : “এরপর দেখবি কলকাতা শহরে গলির মোড়ে মোড়ে, রাস্তায় রাস্তায়, পানের দোকানের মতন চপ কাটলেটের দোকান হবে!”
.
শুনুন শ্রীশ্রীমায়ের মুখে নরেনের রান্নার কথা। ঠাকুরের জন্য রান্নার কথা উঠেছে। “..আমি যখন ঠাকুরের জন্য রাঁধতুম কাশীপুরে, কঁচা জলে মাংস দিতাম। কখানা তেজপাতা ও অল্প মশলা দিতুম, তুলোর মতো সিদ্ধ হলে নামিয়ে নিতুম।…নরেন আমার নানারকমে মাংস রাঁধতে পারত। চিরে চিরে ভাজত, আলুচটকে কিসব রাঁধত,তাকে কি বলে?” বোধ হয় চপ-কাটলেট হবে।
বাবার অকালমৃত্যুর পর থেকে নরেন্দ্রনাথের জীবনে যে পর্বের শুরু হলো সেখানেই অনাহার ও অর্ধাহারের ছবি আমরা দেখতে পাই। এই পর্ব চলেছে বরানগর পেরিয়ে পরিব্রাজক বিবেকানন্দের সঙ্গে সঙ্গে মুমবাইয়ের জাহাজঘাটায় খেতড়ির দেওয়ান মুন্সি জগমোহনের কাছ থেকে বিদায় নেওয়া পর্যন্ত।
বাবার মৃত্যুর পর পারিবারিক অভাব কোন পর্যায়ে এসে পৌঁছেছিল তা স্বামীজির মুখেই শোনা যাক :”প্রাতঃকালে উঠিয়া গোপন অনুসন্ধান করিয়া যেদিন বুঝিতাম, গৃহে সকলের পর্যাপ্ত আহার নাই, সেদিন মাতাকে আমার নিমন্ত্রণ আছে’ বলিয়া বাহির হইতাম এবং কোনদিন সামান্য কিছু খাইয়া, কোনদিন অনশনে কাটাইয়া দিতাম। অভিমানে ঘরে বাহিরে কাহারও নিকট ঐকথা প্রকাশ করিতেও পারিতাম না।”
দেহত্যাগের কিছুদিন আগে প্রথম পর্বের দুঃখময় দিনগুলো ভোলা স্বামীজির পক্ষেও সম্ভব হয়নি। শিষ্যকে তিনি বলছেন “কিসব দুঃখের দিন না আমাদের গেছে! একসময় না খেতে পেয়ে রাস্তার ধারে একটা বাড়ির দাওয়ায় অজ্ঞান হয়ে পড়েছিলুম–মাথার ওপর দিয়ে এক পশলা বৃষ্টি হয়ে গেল। তবে হুঁশ হয়েছিল। অন্য একসময়ে সারাদিন না খেয়ে একাজ সেকাজ করে বেড়িয়ে রাত্রে ১০/১১টার সময় মঠে গিয়ে তবে খেতে পেয়েছি–এমন একদিন নয়।”
মঠ বলতে আদিপর্বের বরাহনগর মঠ বলেই মনে হয়। সেখানে সন্ন্যাসী ভ্রাতাদের কষ্টের অবধি ছিল না।
এই বরানগরেই একদিন হীরানন্দ নামক ভক্ত এসেছিলেন। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, “আপনাদের চলে কী করে?”
নরেন্দ্র : “সকলেই মুষ্ঠিভিক্ষা করে নিয়ে আসে, তাতেই একরকম চলে যায়।”
হীরানন্দর কাছে ছয় আনা পয়সা ছিল। তিনি তা দিয়ে বললেন, “এই পয়সায় এ বেলা চলুক।”
নরেন উত্তর দিলেন, “পয়সার আবশ্যক হবে না, এবেলার মতন চাল আছে।”
ভিক্ষার কথাটা স্বামীজি কত সহজভাবে বললেন, কিন্তু প্রকৃত অবস্থার দু’একটা নমুনা সংগ্রহ করা যাক। একদিন বরানগরে চারজন গুরুভাই ভিক্ষে করতে বেরিয়ে রিক্ত হাতে ফিরে এলেন, ঠাকুরের ভোগের জন্য কিছু দিতে পারলেন না। তখন সিদ্ধান্ত হলো অনাহারে থেকে সেদিন সারাক্ষণ ভজন করা হবে।
অনাহার বা অর্ধাহারটাই ছিল বরানগরের রেওয়াজ। স্বামী প্রেমানন্দের কথায় : “একবেলা ভাত কোনদিন জুটতো, কোনদিন জুটতো না। থালাবাসন তো কিছুই নেই। বাড়ির সংলগ্ন বাগানে লাউগাছ, কলাগাছ ঢের ছিল। দুটো লাউপাতা, কি একখানা কলাপাতা আনতে গেলে মালী যা তা বলে গালি দিত। শেষে মানকচুর পাতায় ভাত ঢেলে তাই খেতে হতো। তেলাকুচো পাতা সিদ্ধ আর ভাত–তা আবার মানপাতায় ঢালা। কিছু খেলেই গলা কুটকুট করতো।”
কচুপাতা এড়ানোর উপায় অবশেষে উদ্ভাবিত হলো। ভিক্ষার চাল সিদ্ধ করে তা একটা কাপড়ের ওপরে ঢেলে সকলে মিলে খেতে বসতেন এবং লবণ ও লঙ্কার ঝোল করে তা দিয়ে ভোজন সমাপ্ত করতেন। সকলেই একগ্রাস করে ভাত মুখে নিতেন এবং বাটিতে রাখা নুন লঙ্কার ঝোলে হাত দিয়ে তা মুখে দিতেন।
