আরও কিছু পরে কাশীপুর উদ্যানবাটী পর্বে কচুরি ইত্যাদি জলখাবারের জয়যাত্রা অব্যাহত দেখতে পাওয়া যাচ্ছে। মেজভাই মহিমকে কাশীপুরে দেখে গুরুভাই শশী (পরে স্বামী রামকৃষ্ণানন্দ) অতি আগ্রহ সহকারে ফাগুর দোকান থেকে গরম লুচি, গুটকে কচুরি ও কিছু মিষ্টি এনে নরেন ও তাকে খাওয়ালেন।
শুনুন আরেকদিনের কথা। নরেন একদিন গায়ক পুলিন মিত্রর মেস বাড়িতে বেড়াতে গিয়েছেন। কচুরি ভেজে দেওয়া হয়েছে, খাচ্ছেন, খুব ভাল লেগেছে। একটু খেয়ে পুলিনকে দিলেন। পুলিন খাচ্ছেন। তখন নরেন আবার বলছেন–”এটা থেকেই একটু দেনা! বেশ চমৎকার, কি বলিস?”
এই বিবেকানন্দ কিন্তু জগৎ চষে বেড়াবার পর বাঙালি ময়রার দোকান সম্বন্ধে মত একেবারেই পাল্টে ফেলেছিলেন। শুধু বক্তৃতায় না, লিখিতভাবে তিনি জানিয়েছেন, “এই যে ঘরে ঘরে অজীর্ণ, ও ঐ ময়রার দোকানে বাজারে খাওয়ার ফল।…ঐ যে পাড়াগেঁয়ে লোকের তত অজীর্ণদোষ…হয় না, তার প্রধান কারণ হচ্ছে লুচি-কচুরি প্রভৃতি ‘বিষলড়ুকের’ অভাব।” এইখানেই ইতি টানা যুক্তিযুক্ত মনে না করে বিরক্ত বিবেকানন্দ নিজের হাতে লিখে চলেছেন, “ভাজা জিনিসগুলো আসল বিষ। ময়রার দোকান যমের বাড়ি। ঘি-তেল গরমদেশে যত অল্প খাওয়া যায়, ততই কল্যাণ। ঘিয়ের চেয়ে মাখন শীঘ্র হজম হয়। ময়দায় কিছুই নাই, দেখতেই সাদা। গমের সমস্ত ভাগ যাতে আছে, এমন আটাই সুখাদ্য।…ময়রার দোকানের খাবারের খাদ্যদ্রব্যে কিছুই নেই, একদম উল্টো আছেন বিষ-বিষ-বিষ। পূর্বে লোকে কালেভদ্রে ঐ পাপগুলো খেতো; এখন শহরের লোক, বিশেষ করে বিদেশী যারা শহরে বাস করে, তাদের নিত্যভোজন হচ্ছে ঐ।…খিদে পেলেও কচুরি জিলিপি খানায় ফেলে দিয়ে এক পয়সার মুড়ি কিনে খাও, সস্তাও হবে, কিছু খাওয়াও হবে।”
দীর্ঘদিনের ভ্রমকে এক ধমকে মুছে ফেলা যাবে না জেনেই সমাজসংস্কারক, জাতির মঙ্গলাকাঙ্ক্ষী বিবেকানন্দ আবার গোলাবর্ষণ শুরু করেছেন : “ধনী হওয়া, আর কুড়ের বাদশা হওয়া–দেশে এককথা হয়ে দাঁড়িয়েছে।…যেটা লুচির ফুলকো ছিঁড়ে যাচ্ছে, সেটা তো মরে আছে।…যার দু’পয়সা আছে আমাদের দেশে, সে ছেলেপিলেগুলোকে নিত্য কচুরি মণ্ডামেঠাই খাওয়াচ্ছেন!! ভাত-রুটি খাওয়া অপমান!! এতে ছেলেপিলেগুলো নড়ে-ভোলা পেটামোটা আসল জানোয়ার হবে না তো কি? এত বড় ষণ্ডা জাত ইংরেজ, এরা ভাজাভুজি মেঠাইমণ্ডার নামে ভয় খায়..আর আমাদের…আব্দার লুচি কচুরি মেঠাই ঘিয়ে ভাজা, তেলেভাজা। সেকেলে পাড়াগেঁয়ে জমিদার এককথায় দশ ক্রোশ হেঁটে দিত,…তাদের ছেলেপিলেগুলো কলকেতায় আসে, চশমা চোখে দেয়, লুচি কচুরি খায়, দিনরাত গাড়ি চড়ে, আর প্রস্রাবের ব্যামো হয়ে মরে; ‘কলকেত্তা’ই হওয়ার এই ফল!!”
পটলাদা একবার বিলেত থেকে তাঁর প্রিয় হাওড়ায় ছুটি কাটাতে এসেছিলেন। মূল্যবান সময়টুকুতে স্বামীজির এই কচুরি সম্পর্কে সাবধানবাণী সম্পর্কে দীর্ঘ আলোচনা হয়েছিল। পটলাদা বললেন, “কচুরিবিরোধী মানসিকতাটা স্বামীজির জীবনের শেষপর্বের ঘটনা, তার আগে ১৮৯৬ সালে লন্ডনে বিশ্ববিজয়ী স্বামীজি বাড়ির বেসমেন্টে গিয়ে নিজেই মাখন গলিয়ে ঘি করে আলুপুর দেওয়া কচুরি ও বেশ ঝাল ঝাল চচ্চড়ি করে–ওপরকার ডাইনিং রুমে ফিরে এলেন।”
“দুর্দান্ত খবর পটলাদা, মহামানবের পরস্পরবিরোধী ঘটনাবলী দু’একটা না উপস্থিত করলে আজকাল পাঠক-পাঠিকারা সন্তুষ্ট হতে চায় না।”
“সেবারে লন্ডনে ভীষণ ব্যাপার হয়েছিল। স্বামীজির বাড়ির কাজের মেমটির নাম মিস্ কেমিরন। কচুরি ও চচ্চড়ি খেতে খেতে স্বামী সারদানন্দ সেবার বিবেকানন্দভ্রাতা মহেন্দ্রনাথকে বললেন, “ওহে, মিস কেমিরনের জন্যে একটু তুলে রেখে দাও নইলে বিকেলে এসে ঝগড়া করবে।” পরবর্তী ঘটনা : মিস কেমিরন এলেন এবং যথারীতি জানতে চাইলেন, “তোমাদের কী রান্না রয়েছে বল। নিজেরাই সব ভাল জিনিস খাবে আর আমার জন্যে কিছু রাখবে না।” সারদানন্দকে তিনি বললেন, “ইউ কুকি সোয়ামি, তুমি কেবল খাবে, আর খেয়ে খেয়ে মোটা হবে, আর আমার জন্যে কিছু রাখবে না।” দুখানা কচুরি আর আলুচচ্চড়ি অবশিষ্ট ছিল, তাই মিস কেমিরনের হাতে গেল।
কচুরি কিভাবে খেতে হয় তা সায়েব-মেমদের অজানা। মিস কেমিরন জিজ্ঞেস করলেন, “কী দিয়ে খেতে হয়? চিনি দিয়ে না নুন দিয়ে?” মিস কেমিরন প্রথমে চিনি ট্রাই করলেন। ভাল লাগল না। সারদানন্দ পরামর্শ দিলেন, নুন দিয়ে ট্রাই করতে। এরপরে ভীষণ ব্যাপার হয়েছিল, চামচে দিয়ে আলুচচ্চড়ি মুখে দিয়ে মিস কেমিরন চিৎকার করে উঠলেন–”ও, কি ভয়ঙ্কর জিনিস। গোলমরিচকে লঙ্কা দিয়ে বেঁধেছে”, এই বলে দু’হাতে নিজের দু’গাল চড়াতে লাগলেন, ওহো! বিষ! বিষ! পয়জন!
আন্দাজ করছি, এরপরে ইংরেজনন্দিনী আর কখনও কচুরি ও চচ্চড়ি মুখে দেবে না। পটলাদা বললেন, “তুই নোট ক’র মানুষের প্রতি ভালবাসা, গরম চা, সুগন্ধী তামাক এবং মাথাখারাপ করে দেওয়া লঙ্কা এই চারটে ব্যাপারে বিবেকানন্দ ছিলেন সীমাহীন।”
.
ফরেনে ফিরবার আগে তাঁর আদি নোটবইখানা পটলাদা আমার কাছে রেখে গিয়েছিলেন।
পটলাদার সংগ্রহের দিকে একবার তাকিয়ে আমার চক্ষু ছানাবড়া। শেষের শব্দটিকে অসৌজন্যপূর্ণ ভাববেন না, স্বয়ং রামকৃষ্ণদেব একবার শিবনাথ শাস্ত্রীর ঈশ্বরভক্তি বোঝাতে গিয়ে অন্য শব্দ না পেয়ে বলেছিলেন, যেন রসে ফেলা ছানাবড়া।
