আশেপাশে অনেকেই দেখলাম একটু সরে গেলো। মদের দোকান থেকে এদিকে উঁকিঝুঁকি শুরু। ”মওসি আ গ্যয়ি ” বলে কে যেন দুই হাতের তালুতে চাপড় মেরে চটাস চটাস আওয়াজ তুলে বিশ্রী ভাবে হাসতে লাগলো। দোকান থেকে নেমে পাশ দিয়ে যাবার সময় একজনকে দেখলাম পানছোপানো দাঁত বার করে একটু চোখ টিপে যেতে।
আমারও, বলতে নেই একটু অস্বস্তি হচ্ছিল। ট্রেনে যা অসভ্যতা করতে দেখেছি এদের, রামঃ।
এমন সময় সেই উনি কাংস্যবিনিন্দিত ন্ট্রে বললেন ‘পাঁচ রুপাইয়েকা বাদাম দিজিয়েগা কাকা, পিঁয়াজ অওর মসালা জ্যাদা’। সেই ঠেলাওয়ালাও অত্যন্ত নৈর্ব্যক্তিক স্বরে ‘তিখা বানাউঁ?’ জিজ্ঞেস করে অভ্যস্ত হাতে বাদাম, পিঁয়াজকুচি আর কাঁচালঙ্কা কুচি একটা পায়খানার মগ টাইপ দেখতে প্লাস্টিকের ইয়েতে ফেলে, তাতে মাথাফুটো ছিপি লাগানো পুরোন প্লাস্টিকের বোতল থেকে টিপে একটু সর্ষের তেল ছিড়িক ছিড়িক করে ছিটিয়ে একটা ছোট্ট সরু কাঠের ডান্ডা দিয়ে নাড়াতে লাগলো। এরপর সেই ঘ্যাঁট একটা ঠোঙায় সযত্নে সাজিয়ে দিয়ে স্তিমিত স্বরে বললেন ‘ইয়ে লিজিয়ে, ছুট্টা দিজিয়েগা’।
সেই মানুষটি ডানদিকে ঘাড় ঘুরিয়ে আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন ‘মেরে পাস শ’রুপেয়া কা নোট হ্যায়, আপকে পাস ছুট্টা হোগা জী?’
প্রায় চমকে উঠেছিলুম, মাইরি বলছি। মানে ইয়ে আর কি, এইর’ম লোকজনদের সঙ্গে কথা বলতে এট্টু কেমন কেমন লাগে না? একটু সামান্য ভয়, অনেকটা ঘেন্না মেশানো একটা ইয়ে ইয়ে টাইপের আর কি। সেই ছোটবেলায় বাচ্চুকাকুদের বাড়িতে বাচ্চুকাকুর ছেলে হওয়াতে এরা ঢোল বাজাতে এসেছিল। বাচ্চুকাকুরা দরজা খোলেনি। ক্কি খিস্তি ক্কি খিস্তি মাইরি, তাও হাঁটুর ওপর কাপড় তুলে। একজন তো ছ্যাড়ছ্যাড় করে পেচ্ছাপও করে দিলো। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে রগড় দেখছিলাম, বাবা এসে কান ধরে টানতে টানতে নিয়ে গেলো, স্পষ্ট মনে আছে।
সেই এদেরই একজন, আমার দিকে হাসিমুখে তাকাতে কেমন যেন মনে হল সেই প্রাচীন পেচ্ছাপের কয়েকটা ফেঁটা চোখেমুখে এসে লাগবে। ত্বড়িতগতিতে বলে উঠলাম ”ন্না, মানে অ্যাগদম খুজরা নেহি হ্যায়, বিশ্বাস কিজিয়ে”। আশেপাশের জটলা থেকে একটা হাসির হররা উঠলো, সিটির আওয়াজে আশপাশ মুখরিত। ইনি সামান্য অপ্রতিভ। এমন সময় সেই ঠেলাওয়ালা খুবই ক্লান্ত নিরাসক্ত স্বরে বললো, ‘ইধার দিজিয়ে, শায়েদ মেরে পাস ছুট্টা হ্যায়’। মিনিটখানেক পরে সেই মানুষটি যখন বেশি করে পিঁয়াজ দেওয়া ঝালঝাল বাদামমাখা আর পঁচানব্বই টাকা হাতে নিয়ে মাথা নিচু করে চলে যাচ্ছেন, মদের দোকানের সামনে ”লচক মচক চলে জুবনা হামার” গান শুরু হয়ে গেছে সমস্বরে। মদের দোকানির মুখেও সস্নেহ মৃদু হাসি। প্রভূত অশ্লীল হাসির গরগরাহট স্তিমিত হয়ে এসেছে, এমন সময়ে আমি আমার অর্ডার দিয়ে স্বস্তির হাঁফ ছেড়ে সেই ঠেলাওয়ালাকে জিজ্ঞেস করলাম ‘এইরকম জ্যায়সা লোগ আপনার কাছে আতা হ্যায়, আপনার খারাপ নেহি লাগতা হ্যায়?’
কোথায় একটু রঙ্গরসিকতা করবে বাকিদের মতন তা নয়, এ বাবু তেমনই নির্লিপ্ত স্বরে বললেন ‘কিঁউ? ইসমে খারাব লাগনেওয়ালি কেয়া বাত হ্যায়?’
না মানে, ছেলে না মেয়ে ঠিক বোঝা যাচ্ছে না, গলাটাও কেমন কেমন, কির”ম বিচ্ছিরি করে হাত্তালি দেয়, আশেপাশে এলে এট্টুস কেমন কেমন লাগে না?
উদাসীন ভাবে প্লাস্টিকের কৌটোয় ডান্ডা ঘোরাতে ঘোরাতে সেই নির্মোহ স্বরে উনি বললেন ‘উসমে হামরা ক্যায়া?’
তা নয়, তবে কিনা ঠিক আমাদের মতন ইয়ে, মানে নর্ম্যাল নয় কি না, দেখে এট্টুস গা” টা কেমন করে ওঠে না, অ্যাঁ?
সে ভদ্রলোক স্থিতধী বুদ্ধের প্রজ্ঞায় নির্লিপ্ততায় জিজ্ঞেস করলেন ‘ বাবুজি, এক চিজ বাতাইয়ে, আপকো ইয়া হামকো কওন বানায়া?’
সামান্য ঘাবড়ে গেসলুম, ”বানায়া” মানে? আমি কি, ইয়ে মানে বাদাম মাখা নাকি? তারপর যাকে বলে বক্তব্যটি প্রণিধান হল। হাসিমুখে বললুম ‘সব লোক তো বোলতা হ্যায় উপরওয়ালানে বানায়া হ্যায়, হ্যা হ্যা’।
‘হাম সবকো উওহি বানায়া, হ্যায় না?’
‘সে তো একশোবার হ্যায়’।
‘তো ফির উস ইনসান কো ভি উও উপরওয়ালে নে হি বানায়া হোগা। নেহি? আব ইসমে উপরওয়ালে কো কোঈ তকলিফ নেহি হুয়া, তো হামকো ক্যায়া? ইয়ে লিজিয়ে আপকা সামান, পচ্চিস রুপেয়া ছুট্টা দিজিয়েগা’।
টাকা মিটিয়ে চুপচাপ নিজের সামান নিয়ে বেরিয়ে এলুম।
ঈশ্বর যে কখন শিক্ষা দেন, কার হাত দিয়ে দেন, সে শুধু তিনিই জানেন!
