বলেই চট করে চোখটা বন্ধ করে ফেললুম।
ছোটবেলা থেকেই আমার এই এক স্বভাব। বিপদ আসন্ন দেখলেই চোখটা বুজে ফেলি। মানে যা হয় হোক, আমাকে তোর আর দেখতে হচ্ছে না!
কিন্তু আমাকে চমকে দিয়ে ঈশ্বর বললেন ‘ওহে খোকা, আজ হাম তোমার উপর সুপ্রসন্ন হ্যায়। কেয়া মাংতা হ্যায় চট করে বলে ফেল দিকিনি। আজ আমার আবার একটু তাড়া আছে।’
দৈববাণীর মতই রান্নাঘর থেকে সুমধুর কণ্ঠ ভেসে এলো, ‘শুধু গাওয়া ঘিয়ে ভাজা লুচি খাবে গো? তার সঙ্গে একটু কমলালেবুর পায়েস আর রাবড়ি দিই? নাকি লুচির বদলে ঘিয়ে ভাজা পরোটাই করে দেবো? আর কালকে ওপরের মাসিমা বর্ধমানের সীতাভোগ দিয়ে গেছেন, খাবে নাকি?’
আমি তো মাইরি, ভালো বাংলায় যাকে বলে, টোটাল স্তম্ভিত ! নিজের গায়ে জোরসে চিমটি কেটে নিজেই লাফিয়ে উঠলাম। এ কি সত্য? নাকি স্বপ্ন?
জিভের জলটা সুরুৎ করে টেনে নিয়ে বললাম, ‘ইয়ে, আর দুপুরে কী হয়েছে আজ?’
রান্নাঘর থেকে সুরলহরী ভেসে এলো, ‘দুপুরে? মাখো মাখো ছানার ডালনা দিয়ে রাধাবল্লভী, তারপর দেরাদুন রাইসের সঙ্গে তেলতেলে গোটা কপি দিচ্ছি। চিতল মাছের পেটি আছে বেশ তেলঝাল দিয়ে। ও হো, তেলকইয়ের কথাটা বোধহয় বলিনি, না? তা সেই তেলকইয়ের পর কষা কষা মাটন রোগনজোশ আর আউধের পোলাও , শেষপাতে মোল্লারচকের লালদই, সূর্য মোদকের জলভরা তালশাঁস আর নলেন গুড়ের আইসক্রিম। আর হ্যাঁ, এর সঙ্গে জয়নগরের মোয়াও রাখবো কি?’
বলা বাহুল্য, এরপর কেঁদে না ফেললে কান্নাকাটি ব্যাপারটা থাকার কোনও মানেই হয় না। ফোঁপাতে ফোঁপাতে ধরা গলায় বললাম, ‘আর রাতে?’
‘রাতে তো মোর্গমসল্লম আর আরসালানের স্পেশাল বিরিয়ানির অর্ডার দিয়েছি। তারপর ফিরনি। আর শেষে রসমাধুরী, মালাই চমচম আর নাহুমের প্লাম কেক। এতে তোমার হয়ে যাবে না সোনা?’
চশমা খুলে হাতের উল্টোপিঠ দিয়ে চোখের জলটা মুছে নিলাম। আহা, আজ আকাশটা কী সুন্দর, বাতাসে কী সুমধুর ইয়ে, মধুবাতা ঋতায়তে, মধুঃক্ষরন্তি সিন্ধবাঃ..
‘আর শোনো না, অলিপাব থেকে তোমার প্রিয় ওই চিকেন আ লা কিয়েভ না কি একটা আছে না? ভাজা চিকেনের মধ্যে মাখনের পুর দিয়ে? ওইটা অর্ডার করলে বাড়িতে দিয়ে যাবে না গো?’
এবার ফেঁৎ ফেঁৎ করে নাকটা ঝেড়ে ফেলতে গিয়েই কেমন একটা কুটিল সন্দেহ হতে লাগলো, বুঝলেন। একই দিনে এত ভাগ্যোদয়, মানে এ যে সৌভাগ্যের ষাঁড়াষাঁড়ি বান ডেকেছে রে ভাই! বলি কপালটা একটু রয়েসয়ে খুললে হতো না? এই রেটে খুললে তো শেষমেষ কপাল হাতে নিয়ে ঘুরতে হবে দেখছি। সেটাই কি খুব ভালো দেখাবে, অ্যাঁ?
সন্তর্পণে প্রশ্ন ভাসিয়ে দিলাম, ‘হ্যাঁ গো, ইয়ার্কি করছো না তো?’
ওধার একটা ছোট সাইজের পরমাণু বোমা উড়ে এসে কানের কাছে ফেটে পড়লো, ‘ইয়ার্কিটা কে শুরু করেছে শুনি? যার কোলেস্টেরল দুশো আশি, ট্রাইগ্লিসারাইড চারশোর ওপর, ব্লাড প্রেশার একশো পঞ্চাশ বাই একশোয় চড়ে বসে আছে সে কোন আক্কেলে লুচির কথা বলে শুনি? আর মিষ্টি? তোমার লজ্জা করে না মিষ্টির কথা বলতে? ডাক্তার পইপই করে বলে দিয়েছে তোমার মিষ্টি খাওয়া বারণ, তা সত্ত্বেও কোন আক্কেলে তুমি কাল পাড়ার মোড়ে দাঁড়িয়ে নিতাই সুইটস থেকে দুটো সন্দেশ খেলে?’
ব্যাঘ্রগর্জনে চিঁ চিঁ করে বল্লুম, ‘কই, খাই নি তো।’
‘খাও নি? বটে? ফের মিথ্যে কথা? হ্যাংলা বাঙাল কোথাকার। আমার ন” কাকু নিজের চোখে দেখেছে তোমাকে সন্দেশ খেতে। বলো তুমি খাওনি?’
সোফার কোণে সেঁধিয়ে গেলুম একেবারে। এবার থেকে দেখছি ন” কাকু, সেজো পিসে, সিধু জ্যাঠা এইসব দেখেশুনে…
ঠকাস করে একটা প্লেট উড়ে এসে পড়লো সামনে, কড়া করে সেঁকা দুটো পাঁউরুটি, সঙ্গে দুকুচি শশা আর গাজর!
‘সেদিন যে ব্লাড টেস্ট করালে, তার রিপোর্টটা আনা হবে কবে শুনি?’
আমি উদাসমুখে পাঁউরুটি চিবোতে চিবোতে আকাশের কাক গুণতে থাকি।
‘কথা কানে যাচ্ছে না?’
‘ইয়ে, আজকে ওদের আপিস বন্ধ, হোলিতে ওদের ছুটি থাকে কি না।’
‘ফের বাজে কথা?’ চোখ পাকিয়ে বললেন তিনি, ‘ওরাই ফোন করে বলেছিলো না হোলির দিন রিপোর্ট নিয়ে আসতে?’
‘অ্যাঁ? ইয়ে, আজ কার্তিকী অমাবস্যা না অলাবু ত্রয়োদশী, কি একটা আছে না? আজ পাঁজিপুঁথি মতে ব্লাড টেস্টের রিপোর্ট আনা নিষিদ্ধ যে?’
‘দেখো, একদম কথা ঘোরাবে না। যাও গিয়ে রিপোর্ট নিয়ে এসো। আর শোনো, এই হলো বাজারের ফর্দ। দু কিলো আলু, এককিলো পেঁয়াজ, পাঁচশো শশা…’ এই বলে একটা লম্বা ফর্দ আমাকে ধরিয়ে দেন তিনি। শেষে বলেন, ‘আর হ্যাঁ, নিতাই সুইটস থেকে আড়াইশো পনীর আনবে। আর যদি শুনেছি চুরি করে মিষ্টি খেয়েছো..।’
হাঁ হাঁ করে উঠতেই হয়, ‘আহা চুরি করে খাবো কেন? ছিঃ, আমাকে তুমি এই ভাবলে? জানো আমি কোন বাড়ির ছেলে? আমি চুরি করে মিষ্টি খাবো? কভি নেহি, আমি পয়সা দিয়েই মিষ্টি খাবো। ভদ্রলোকের এক কথা।’
‘না আ আ’ ঘরের মধ্যে বজ্রপাতের কড়ক্কড় শব্দ, ‘তুমি মিষ্টি খাবে না। বুঝেছো?’
বুঝতেই হয়। বোঝা ছাড়া এই অসার জীবনে আর কীই বা বয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছি বলুন তো?
তা টুকটুক করে বাজারপত্তর সেরে নিতাই সুইটসে গিয়ে দাঁড়াতে হলো। শোকেস জুড়ে থরেথরে মিষ্টির ভাঁড়ার। আমাকে দেখে তাদের সে কি হাঁকাহাঁকি, ‘আমি নলেন গুড়ের কালাকাঁদ বলছি স্যার, একটু দেখবেন,’ ‘ওহে খুড়ো, বলি কাল ছিলে কই? এই সবে ভিয়েন থেকে এয়েচি। এট্টুসখানি হবে নাকি?’, ‘আরে দাদা যে, হেঁ হেঁ হেঁ, খবরটবর সব ভালো? তা আজ দেখছি আমার এই শ্রীঅঙ্গে এরা আবার একপরত আমসত্ত্ব দিয়েছে। চেখে দেখবেন নাকি একবার?’ রসকদমগুলো তো কেঁদেই ফেললো, ‘কী অপরাধ করেছি কত্তা, যে আপনার শ্রীপাকস্থলীতে ঠাঁই দেওয়া থেকে আমাদের এভাবে বঞ্চিত করছেন?’ ওদিকে সরভাজার প্লেট থেকে যেটা ভেসে এলো সেটাকে আপনারা খোশবাই বলে ভুল করতে পারেন, আমার তো স্পষ্ট মনে হলো বিরহী যক্ষের দীর্ঘশ্বাস!
