হামিদার আশায় উদ্বেলিত এমন কণ্ঠস্বর আমার একেবারেই অচেনা। আমি হেসে তার একটি হাত মুঠোর মধ্যে নিয়ে ফুটপাত ধরে চলতে লাগলাম। আমি কোনো জবাব দিচ্ছি না। উপলদ্ধি করে হামিদা হঠাৎ মুখ ঘুরিয়ে বলল, তুমি বোধ হয় আমার কথায় হাসছ?
আমি হাঁটতে হাঁটতেই জবাব দিলাম, না। তোমার কথায় ঠিক হাসছি না। তোমাকে ভালোবাসি বলে বিশেষত আজ এই মুহূর্তে তোমাকে খুব ভালো লাগছে বলে হাসছি। আমি প্রকৃতপক্ষে আমাদের মুক্তির লড়াইয়ের পরিণাম সম্বন্ধে খানিকটা হতাশ। যদিও এই যুদ্ধের হারজিতের ওপর তোমার আমার সকলেরই ভাগ্য জড়িত হয়ে পড়েছে। তা ছাড়া এ ব্যাপারে আমার কোনো দ্বিধা নেই যে, পাকিস্তান আর অখণ্ড থাকছে না। বাংলাদেশ থেকে অচিরেই পাকিস্তানী বাহিনী পরাজয়ের কালিমা নিয়ে ঘরে ফিরে যাবে।
তবে আর হতাশার কথা বলছ কেন?
পাকিস্তানীরা চলে গেলেই আমরা বিজয়ী হব এমন সম্ভাবনা তো আপাতত দেখছি না। এক প্রবল পরিচিত শত্রুকে পরাজিত করতে আমরা আরেক প্রবল অপরিচিত শক্তির সাহায্য নিয়ে স্বাধীনতার নিশান উড়িয়ে ঘরে ফিরতে পারব বটে তবে বিজয়ী হব কিনা জানি না।
আমার কথায় হামিদা কোনো জবাব দিচ্ছে না দেখে আমি নিজেই আবার তাকে আশান্বিত করার জন্যে বললাম, তবে সব কথার ওপরে সত্য হল, বাংলাদেশের সমগ্র অঞ্চলের কিষাণ পরিবারের যুবকরা দলে দলে এই মুক্তিযুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছে। তারা সশস্ত্র হয়ে উঠেছে। ষড়যন্ত্র করে কেউ মাঝ পথে যুদ্ধটা থামিয়ে না দিলে এই যুদ্ধের পরিণাম আখেরে বাঙালি মুসলমানদের জন্য সুদূরপ্রসারী এবং সুফলদায়কই হবে।
এ যুদ্ধ কোনো ষড়যন্ত্রই মাঝপথে থামিয়ে দিতে পারবে না।
কণ্ঠে কোনোরূপ দৃঢ়তার আভাস না দিয়েই বলল হামিদা। আমি হাসলাম।
আমরা হাঁটতে হাঁটতে চৌরঙ্গী পার হয়ে এসে মাঠের একটা খোলা জায়গায় বসলাম। জায়গাটা সবুজ ঘাসে ছাওয়া উন্মুক্ত স্থান হলেও মানুষের গুঞ্জনে মুখর। জোড়ায় জোড়ায় নারীপুরুষ এখানে সেখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসে গল্প-গুজব করছে। ফেরিওয়ালা, চীনে বাদামওয়ালা ঘুরছে আশেপাশে। ওদিকে সারা চৌরঙ্গী এলাকার জন কোলাহল ও গাড়ি এবং বাস-ট্রাকের সম্মিলিত ধাতব শব্দে সারা প্রান্তরের ওপর দিয়ে একটা নাগরিক উত্তেজনার স্রোত বইছে। একটু একটু বাতাসে হামিদার আঁচল স্থানচ্যুত হয়ে কাঁধ থেকে সরে যাচ্ছে। আর হাত দিয়ে সে এখানে সেখানে আব্রু রক্ষার চেষ্টা করছে। আমি হেসে বললাম, চীনেবাদাম খাবে?
না।
কিছু একটা খাও।
কিছু না।
বলল হামিদা। আমি বললাম, কি ভাবে ঢাকা থেকে এ পর্যন্ত এসে পৌঁছুলে সে কথা কিন্তু শোনা হল না।
শুনতে চেয়ো না। মানুষের লোভ, হিংসা আর তার পরশ্রীকাতরতার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের গ্রামগুলো পার হয়ে এসেছি। হত্যা আর বিশ্বাসঘাতকতা, ধরিয়ে দেওয়া ও নারীর লাঞ্ছনা দেখতে দেখতে এসে পৌঁছেছি। তবে দয়ামায়া, ভালবাসা আর বীরত্বের ঘটনাও কম দেখি নি। এর বেশি আর কী শুনতে চাও? তোমার বৌয়ের বিশ্বস্ততার প্রমাণ চাও নাকি?
আমি তাড়াতাড়ি বললাম, না।
চাইলেও দিতে পারব না।
হেসে বলল হামিদা।
আগে তুমি এভাবে কথা বলতে না।
কীভাবে?
এই এখন যেমন বলছ।
বললাম আমি।
হামিদা মাঠের ঘাসের ওপর কাৎ হয়ে শুয়ে পড়ার ভঙ্গিতে পা দুটি মেলে দিয়ে হাতের উপর মাথা রেখে হাসল, তখন আমরা একটা পরিবার ছিলাম। আমাদের যেমনই হোক একটা সংসার ছিল। আমরা দুজন দুধরনের জীবিকায় ছিলাম। যতক্ষণ ঘরে ফিরে তোমাকে না দেখতাম কিংবা তোমার ফেরার অপেক্ষায় থাকতাম ততক্ষণ আর কিছুতেই আনন্দ পেতাম না। প্রকৃতপক্ষে আমরা ছিলাম সুখী। আমরা রাজনীতি কাকে বলে জানতাম না। যুদ্ধ, দেশত্যাগ, কোনোকিছুর সাথেই আমাদের কোনো পরিচয় ছিল না। আমাদের পরিশ্রম আমাদের তৃপ্তি আমাদের সুখী করে রেখেছিল। এখন রাজনীতি, যুদ্ধ আর স্বাধীনতার মর্ম আমরা বুঝতে বাধ্য হয়েছি। এ যুদ্ধ জিতলে আমরা দেশে ফিরতে পারব। হেরে গেলে কিংবা মরে গেলে সেই পুরনো সংসারে ফেরার তো প্রশ্নই আসে না। জিতলেও আমরা আর আগের অবস্থায় থাকব না। তোমার আমার একদা যে চাকুরি ছিল সে চাকুরি আর পাবো না। আমাদের শাজাহানপুরের সেই ভাড়া বাড়িটায় আমার বিবাহিত জীবনের সব পুঁজি, সব সংগ্রহ আমরা ফেলে রেখে চলে এসেছি। তুমিও এক কাপড়ে আমিও এক কাপড়ে। এতদিনে আমাদের বাসাটি নিশ্চয়ই লুট হয়ে গেছে। সাবেক জীবন, সাবেক সংসার কিছুই আর আমরা ফিরে পাবো না, কবি। আর তা ছাড়া
বল, তাছাড়া কি?
আমি কথার খেই ধরিয়ে দিয়ে অপেক্ষা করতে লাগলাম। তার কথা আমার কেন জানি না খুব ভাল লাগছিল। আমার মর্মস্পর্শ করে যাচ্ছিল আমার স্ত্রীর কথাগুলো। এ ধরনের বাস্তব সম্মত উপলদ্ধি আমার স্ত্রীর মধ্যে আমি অতীতে কখনও দেখি নি। বলা যায় আমি খুব অধীরতা নিয়ে হামিদার কথাগুলো শুনছিলাম।
তাছাড়া তখন তুমি আমাকে ভালবাসতে।
এখনও বাসি।
মিথ্যে বলে কোনো লাভ নেই কবি। এখন তোমার চোখের সামনে আমি আছি বলে আমাকে কামনা কর। অভ্যেসের টানে আমাকে চাও। আমি তোমার ধর্মপত্নী বলে। আমি না এলে কিংবা পথে কোনো দুর্ঘটনার আমি মারা পড়লে তোমার সত্যিকার কোনো ক্ষতি হত না। এতদিন হয়ও নি। হয় নি যে নন্দিনী তা তোমাকে বুঝতে দেয় নি।
