তোমাকে এরা খুব কঠিন দায়িত্ব দিয়েছে।
কেউ দেয় নি আমি নিজেই বেছে নিয়েছি। তুমি দোয়া কর যেন সফল হই।
হামিদার কথায় আমি চুপ মেরে থাকলাম। সে খাবারের বাটিগুলা থেকে ঢাকনা সরাতে সরাতে বলল, নাও শুরু কর।
হামিদা খাসির ঝাল গরম সরুয়া থেকে একটা বড় হাড্ডিসহ মাংসের টুকরা আমার পাতে দিল। যেমন অতীতে সব সময় দিয়ে এসেছে। আমি বাষ্প-জমা দৃষ্টিতে তার পরিবেশন দেখতে লাগলাম।
হামিদা মুখ তুলে একবার আমাকে দেখল, মনে হচ্ছে কেঁদে ফেলবে। পুরুষের কান্না খুব বিশ্রি লাগে, জানো। আজ রাতটা তোমার সাথে থাকব। থাকতেই এসেছি। আর তোমার বান্ধবীর ব্যাপারেও কোনো প্রশ্ন করবো না। কেন করব? আমি স্বাধীনতার জন্য নিজেকে উৎসর্গ করেছি। আমি আর আগের মতো নেই। আমি কোনো প্রতিদ্বন্ধীকেই হিংসা করার মতো অবস্থায় এখন আর নেই হাদী। তুমি কী নন্দিনীর জন্য হৃদয়ে কোনো টান অনুভব করছ? নাকি শুধু কবির কর্তব্যবোধ?
আমি হামিদার এধরনের কথার কী জবাব দেব? একবার শুধু তাকে মুখ তুলে একটু দেখে মাথা নুইয়ে ভাতের লোকমা বাঁধতে লাগলাম।
এখন আবার কথা বলছ না কেন? আমি নন্দিনী সম্বন্ধে সবকথা তোমার বোন ও ভগ্নীপতির কাছে শুনেছি। তারা আমার ক্ষতির কথা চিন্তা করেই ক্যাম্পে খবর পাঠিয়ে আমাকে ডেকে এনেছে। আমি কোনো ঝগড়া বা ঘরকন্না করতেও আসি নি। তবে যেটুকু না জানলে নারীর হৃদয় সহজে শান্ত হয় না তা জানার জন্যই এতক্ষণ জ্বালাতন করলাম। নন্দিনী কী সত্যি আমার শূন্যস্থান পূরণ করার যোগ্য?
আমি জানি না। যখন তোমার কোনো খোঁজ পাত্তা জানতাম না তখন সে বলত তোমার ফিরে আসার শর্তে সে আমার সঙ্গে থাকবে। তুমি চলে এলে সে তার পথ দেখবে। এখন সে জানে তুমি এদেশেই আছ এবং মুক্তিযোদ্ধা।
আমি সত্য কথাই আমার স্ত্রীকে বলতে গেলাম। হামিদা ততক্ষণে খাওয়া শুরু করেছে। খেতে খেতে বলল, তাহলে তো তার সাথে সাক্ষাৎ ঘটার আগেই আমার চলে যাওয়া উচিত। আমাদের মুখোমুখি হওয়া কিছুতেই উচিত নয়। ভেবেছিলাম রাতটা তোমার সাথে থাকব।
এর মানে তুমি এখনই চলে যেতে চাও?
আমার মনে হয় এটাই ঠিক হবে।
এবেলা তুমি কোথায় গিয়ে উঠবে?
আমার ক্যাম্পে যাওয়ার গাড়ি আট নম্বর থিয়েটার রোড থেকে দিনরাত আসাযাওয়া করছে। আমার চলে যেতে কোনো অসুবিধা নেই। যদি তুমি অনুমতি দাও খেয়েই রওনা হব।
একটা রাত অন্তত আমার সাথে থাকতে পার না?
আমি একটু অনুনয় মিশিয়ে বললাম।
বেশ কিছুকাল পরে আমাকে পেয়ে তোমার লোভ জেগে উঠেছে কবি। দেশের কথা, স্বাধীনতার কথা একটু ও ভাবছ না। তুমি না কবি, একটু সেক্রিফাইসও করতে পার না?
হামিদা রহস্যময়ীর মতো হাসল।
আমি বললাম, তোমার এই মুহূর্তের রূপ, এই গোলাপি শাড়ি আর গাঢ় লাল রংয়ের ব্লাউজ, সোনাদানাহীন নিরলংকার শরীরই তো একজন কবির দেশ। সেই দেশের পক্ষে লিখব বলেই তো আমি প্রতিজ্ঞা করে এখানে এসেছি। অন্তত একটা রাত তোমার উষ্ণতা ও আলিঙ্গনের মধ্যে কাটাতে চাওয়া কী স্বামী হিসেবে আমার অপরাধ?
বেশ একটা রাত আমি এখানে থাকব। তবে একটা শর্ত তোমাকে মানতে হবে।
কী শর্ত?
আমি খুব ভোরে উঠে কাকপক্ষী জাগার আগে হোটেল ছেড়ে চলে যাব। আটকাবে না। বলো রাজি?
আমি বললাম, নন্দিনীকে দেখলে তোমার মায়া হত। হয়ত তখন এমন শত্রু ভাবতে না।
দেখো আমি শুধু তোমার স্ত্রী নই প্রতিজ্ঞাবদ্ধ যোদ্ধা। আমার সামনে হানাদার বাহিনী ছাড়া অন্য কোনো টার্গেট নেই। আমি চাইনা এখন কোনো মানসিক প্রতিদ্বন্দ্বীর ছবি আমার রক্তে মিশে যাক। যাতে দুই শত্রুর মধ্যে দিশেহারা হয়ে আমার নিশানা পড়ে যায়। জয় বাংলা।
উত্তেজিত হয়ে বলল হামিদা। মুহূর্তের মধ্যে হামিদার লাবণ্যময়ী চেহারা পাল্টে রুক্ষ রক্তবর্ণ হয়ে গেছে। এমনিতেই হামিদার কণ্ঠদেশ ও গ্রীবা অন্যান্য মেয়েদের চেয়ে একটু প্রশস্ত। এখন হার বা অন্য অলংকার না থাকায় তাকে আরও প্রশস্ত ও ফর্সা মনে হল। উত্তেজনায় শুধু কণ্ঠের হাড় দুটি থির থির করে কাঁপছে।
আমি বললাম, ঠিক আছে ভোরে তুমি চলে যাও। চল এখন খেয়ে দেয়ে গড়ের মাঠে গিয়ে সন্ধ্যাটা ঘুরে বেড়িয়ে আসি। জীবনকে যখন নিজেই তুমি এমন অনিশ্চিত করে ফেলেছ তখন একটা সন্ধ্যা অন্তত এই মহানগরীর ফাঁকা মাঠে স্মরণীয় করে রাখি। যাবে?
যাব।
আঙ্গুল চেটে জবাব দিল হামিদা।
আমরা সূর্যাস্তের সাথে সাথে পারুলকে বলে রাস্তায় এসে দাঁড়ালাম। আমি ট্যাক্সি ডাকার উদ্যোগ নিতেই হামিদা বলল, গড়ের মাঠতো কাছেই। চল হেঁটেই যাই।
আমি বললাম, খুব কাছে না। তবু চল হেঁটেই যাই। তুমি আবার হাঁপিয়ে পড়বে না তো?
পড়লামই বা, তুমি ধরে তখন পাজা কোলে করে নিয়ে গিয়ে ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালের সিঁড়িতে শুইয়ে দিও।
আমি বললাম, এর মধ্যে কলকাতার অনেক কিছু চিনে ফেলেছ মনে হচ্ছে?
শুধু চিনে ফেলি নি। একদিন জয় করতে চাই।
জয় করতে?
হ্যাঁ। যদি আমাদের লড়াইটা ব্যর্থ না হয় যদি আমরা জিতি এবং স্বাধীন ও সার্বভৌম জাতি হয়ে যাই তবে জেনো বাংলাদেশের মুসলিম কিষাণদের রক্তে ভেজা কৃষি পণ্য, পাট আর জমিদারি খাজনার তৈরি এ শহরও আমরা একদিন জয় করে নেব। এ কলকাতা জব চার্ণকের নয় ভাটি অঞ্চলের নিপীড়িত কিষাণদের উদয়াস্ত ঘামের নুনে তৈরি। এ শহর আমাদের। একদিন আমাদেরই হবে।
