একটি অসহায় মেয়ের প্রতি বিরূপ হয়ে তুমি এসব বলছ।
আমি হামিদার কথার তরঙ্গ এখন প্রতিরোধ না করে পারছিলাম না।
মোটেই না। আমার কথায় এমন ভয় পাচ্ছো কেন? কই আমি তো ভয় পাচ্ছি না? অথচ এই যুদ্ধ, এই দেশ ত্যাগে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হল আমার। সবচেয়ে ভালবেসে বিয়ে করে স্বামী সংসার মুহূর্তের মধ্যে হারাতে বসেছি। বসেছি বললে অবশ্যি খানিকটা আশা আছে বোঝায় কিন্তু আমি জানি কবি আমার আর আশা নেই। তোমার ভাগ্য ভালো যে সকল দুর্ভাগ্য ও ভাঙ্গনের মধ্যে তুমি নন্দিনীকে পেয়েছ। ভালবেসেছ। একবারও আমার কথা মনে পড়ে নি। কিংবা পড়লেও তা তোমার অপরাধ বোধেরই প্রতিচ্ছবি ছাড়া অন্য কোনো কিছু নয়। তোমার একজন স্ত্রী আছে এই দ্বিধা। অথচ দ্যাখো, আমি একবারও তোমার মুখ এ কয়দিন মুহূর্তের জন্যও মন থেকে সরাতে পারি নি। অথচ কত মানুষ কতভাবে সাহায্যের ছুঁতোয় এগিয়ে এসেছে। আর কত গায়ে পড়া অসভ্যতা দেখলাম। আসলে অন্য পছন্দ আমি সম্ভবত তোমাকে পেয়ে একদা নষ্ট করে ফেলেছিলাম। এখন, কবি সত্যি আমার আর কোনো উপায় রইল না।
কথাগুলো শেষ করে হামিদা সোজা হয়ে উঠে বসল। আমি দেখলাম তার গাল বেয়ে চোখের পানি গড়িয়ে পড়ছে। হামিদা কাঁদছে। এখন কোনোরূপ আশ্বাসের বাক্যকেই সে অপমান ভাববে। হামিদাকে আমি জানি। তাছাড়া হামিদা আমার ও নন্দিনীর সম্পর্ককে নির্ভুলভাবে ব্যাখ্যা করতে পারছে। তার উপলব্ধিতে কোনো ভুল বা মিথ্যে ছলচাতুরী নেই। বরং মিথ্যে আছে আমার মধ্যে। হামিদার প্রতি আমার এতদিন যে উদ্বেগ ছিল তা কর্তব্যবোধ ও ভয় থেকেই। আমার একজন স্ত্রী আছে অথচ অন্য একজনের প্রতি জেগে উঠেছে প্রেম। এরই বৈধতার প্রশ্ন নানা যুক্তি হয়ে আমাকে প্রবোধ দিচ্ছিল মাত্র। অথচ কত সহজেই না হামিদা এই মিথ্যে প্রবোধের হাত থেকে আমাকে মুক্তি দিতে চাইছে।
হামিদা মাঠের পূর্ব দিকের বিশাল ইমারতগুলোর চূড়োয় প্রজ্বলন্ত আলোকস্তম্ভের দিকে নিস্পলক তাকিয়ে আছে দেখে আমি বললাম, আমাকে এখন কী করতে বল?
অন্তত আমার সম্বন্ধে অযথা দুঃশ্চিন্তা ছেড়ে দিতে পরামর্শ দিচ্ছি।
এর মানে হল আমাদের স্বাভাবিক সম্পর্ক সম্বন্ধে তুমি কোনো আশাই রাখো না। এ সম্পর্ক শেষ হয়ে গেছে বলে তোমার ধারণা।
ধারণা নয়। এটাই সত্য।
এখন তাহলে তুমি কী করতে চাও।
এবার আমিও তারই মতো প্রশ্ন করলাম। যে ধরনের প্রশ্ন একদা আমার মুখ থেকে হামিদার কাছে অভাবনীয় ছিল। হামিদাও চমকে আমার দিকে তাকাল। অনেকক্ষণ আমার মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে বলল, আমি মুক্তিযোদ্ধা। দেশমুক্তি ছাড়া আপাতত আমার কোনো কর্তব্য নেই। তোমার কাছে শুধু একটা অনুগ্রহ চাইব।
বলো।
যুদ্ধের পর আমার একটা খোঁজ নিও। জান তো আমার আপন বলতে কেউ নেই। ঢাকায় ফিরে আমি কী করব, কোথায় যাব কোনো কিছু জানি না। তখন তোমার একটা সাহায্য বা অবলম্বন আমার দরকার হবে। যদি দেশে ফিরে নিজেকে চালাবার মতো কোনো অবলম্বন আমি যোগাড় করতে পারি তখন না হয় তালাকনামা পাঠিয়ে দিও। ততদিন তোমার নন্দিনীকে একটু ধৈর্যধারণ করতে হবে। এর আগে তোমাদের বিয়েতে আমার আপত্তি নেই। শুধু অনুগ্রহ করে তালাকনামাটা পাঠিও না। আমাকে কথা দাও।
ঠিক আছে, কথা দিলাম। তবে আমার ও নন্দিনীর ব্যাপারে তুমি আগাম একটু বেশি ভাবছ। নন্দিনীর সাথে আমার সম্পর্কটা যাই হোক, নন্দিনী হয়তো এ ধরনের চিন্তা করছে না। আদৌ হয়তো নন্দিনী এ ধরনের কোনো সিদ্ধান্তের সম্ভাবনা দেখছে না।
আমি একটু সান্ত্বনা দেয়ার জন্য আমার প্রকৃত সন্দেহের কথা তুললাম। হামিদা শাড়ির আঁচল দিয়ে চোখ দুটি মুছে নিয়ে বলল, তাতেও আমার তো কোনো লাভ দেখছি না। তোমরা পরস্পরকে ভালবাস। তোমাদের ভালবাসা আমার ঘর ভেঙে দিয়েছে এতে তো কোনো মিথ্যে নেই। এখন যদি তুমি ও নন্দিনী নতুন সংসার পাড়তে না পার তাতে আমার ভাঙা সংসার কী আর জোড়া লাগবে? অমন জোড়াতালি আমি সব জেনে বুঝে কেন চাইব কবি? তোমার যে দয়াটুকু চাইলাম সেটা আমি নিরুপায় বলে। তুমি তো জান আমাকে আশ্রয় দিতে পারে এমন আপনজন আমার একজনও দেশের বাড়িতে নেই। না বাপ, না ভাই। আমি তখন কোথায় এবং কার কাছে গিয়ে উঠব? আমার অসহায়তার কথা তো তোমার অজানা নেই। মনে করে দেখো, বহু বৎসর আমরা দুজনে প্রেম আর ভালোবাসার মধ্যে বাস করেছি। এর একটা কৃতজ্ঞতাবোধ উভয়ের মধ্যে আছে। আজ না হয় নন্দিনীর কাছে আমি পরাজিত। প্রেম নেই যখন মানি তখন আর কিছু চাইবার নেই আমার। কিন্তু দয়ামায়া তো আছে। সেটা কী চাইতে পারি না?
আমি তো বলেছি তুমি একটু আগাম বেশি দুশ্চিন্তায় আছ। তেমন অসুবিধেয় তুমি পড়বে না।
বললাম আমি।
এধরনের একটা প্রতিশ্রুতিই আমার দরকার ছিল। এখন চল হোটেলে ফিরি। পারুলরা খাওয়ার টেবিলে আমাদের জন্য অপেক্ষা করবে।
আমরা উঠলাম।
.
সকালে মিতুর চেঁচামেচিতে সকলের ঘুম ভাঙলে আমিও চোখ মেললাম। গতরাতে হামিদা আমার পাশে যেখানে শুয়েছিল সেখানে পারুলের কাছ থেকে চেয়ে আনা গত সন্ধ্যার শাড়ি ব্লাউজ ভাজ করে বালিশের ওপর রাখা। দরজাটা ভেতর থেকে খোলা থাকায় মিতু এসে ঘরে ঢুকল।
মামা জাগুন না। গোছগাছ করতে হবে না?
তোর মামি চলে গেছে?
