আমি সব শুনতেই এসেছি।
বেশ। এখন তাহলে পোশাকটা পাল্টে হাতমুখ ধুয়ে এস। শাড়ি পরবে?
আলনায় নন্দিনীর নতুন কেনা শাড়ি দুটোর দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলাম আমি। হামিদা বলল, শাড়িগুলো কার?
নন্দিনীর। পরবে?
না।
তাহলে পারুলের ঘর থেকে একটা চেয়ে নিয়ে আসি।
তোমার যেতে হবে না। আমিই আনছি।
বলে হামিদা দরজা খুলল।
আমি বললাম, দোহাই তোমার পারুলকে এ ব্যাপারে কোনো কিছু জেরা করো না।
আমাকে অত ছোট লোক ভেব না। অন্তত তোমার বোনের কাছে তোমাকে নোংরা করতে যাব না।
কপাট ভেজিয়ে দিয়ে হামিদা শাড়ি আনতে গেলো। আমি বুঝলাম হামিদা তার সহজাত আকুলতায় এমন কিছু আন্দাজ করতে পেরেছে যা আমার পক্ষে অস্বীকারের জো নেই। আমি মনে মনে স্থির করলাম হামিদার কাছে কোনো কিছুই গোপন করব না। এতে যে দুর্ভাগ্যই নেমে আসুক এর সামনাসামনি দাঁড়াব।
আমি এগিয়ে গিয়ে ঘরের বন্ধ জানালাগুলো খুলে দিলাম। বাতাসের সঙ্গে বিচিত্র ধরনের শব্দ তরঙ্গ এসে ঘরে ঢুকল। বাইরে গাড়ির শব্দের সাথে জমাটবাঁধা জনপদের অস্পষ্ট কলরব যেন এসে কানে শিরশিরানী তুলল। সূর্য নিশ্চয়ই এখন গড়ের মাঠের পশ্চিমপ্রান্তে অনেক দূর পর্যন্ত ঝুঁকে পড়েছে। উডস্ট্রীটের ওপরে ঝাউগাছগুলোর ধূলিধূসর পাতায় জমে থাকা আস্তরণে এখন পর্যন্ত সূর্যের তাম্ৰাভা রক্ত বর্ণের শেষ তাপটুকু বিলিয়ে মিলিয়ে যাচ্ছে। আমি টয়লেটে ঢুকে মুখে পানির ছিটা দিতে বেসিনে উবু হয়ে পড়লাম। কল খুলে চোখে পানির ঝাপটা দিতেই মনে হল, আহ্ কী আরাম। অনেকক্ষণ পর্যন্ত চোখে মুখে পানির ঝাপটা দিয়ে ফিরে এলাম। হাত মুখ মুছে আয়নার সামনে দাঁড়াতেই আমার পেছনে হামিদার ছায়া পড়ল। গোলাপি রংয়ের টাঙ্গাইল শাড়ির সাথে সে রক্ত রংয়ের ব্লাউজ পরেছে। আমি চিরুনি ফেলে দিয়ে ফিরলাম, দারুণ।
কেবল দারুণ? কবি এখন কার্পণ্য কর না। আর একটু বাড়িয়ে বল। ভয় নেই তোমার নন্দিনী শুনতেও পাবে না।
আমি হেসে বললাম, না ঠাট্টা নয় দারুণ লাগছে। তৃতীয় কেউ থাকলে কবিত্ব করেই বলতাম, জাগুন জাগুন, পাড়ায় আগুন।
এবার হামিদাও হাসল, পারুলের কাছে শুনলাম পথে কুড়িয়ে পাওয়া দেবীটিও নাকি সুন্দরী। কখন ফিরবে দর্শন করে মন প্রাণ জুড়াতে চাই।
কাল সকালে আসবে।
জবাব দিলাম আমি। বুঝলাম নন্দিনীকে না দেখা এবং তার সামনে নিজেকে হাজির না করা পর্যন্ত হামিদা মনে শান্তি পাচ্ছে না। আমি বললাম, আগামীকাল নাস্তা সেরে আমরা হোটেল ছেড়ে পার্ক সার্কাসের একটা বাড়িতে গিয়ে উঠব। এর আগেই নন্দিনী দেখা করতে আসবে। তখন না হয় একহাত দেখে নিও।
ভয় করো না হাতাহাতি হবে না। ঐ স্বাদ মেটাবার জন্য ভীষণ প্রতিজ্ঞা আছে আমার। সে কথা জানাতেই তোমার কাছে আসা।
ব্যাপারটা কী রকম?
আমি মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে একটা বাহিনীর সাথে জড়িত। এর মধ্যে আমি শপথ গ্রহণ করেছি যে পর্যন্ত বাংলাদেশ সম্পূর্ণভাবে হানাদার মুক্ত না হবে ততক্ষণ আমি আমার জান প্রাণ ইজ্জত দিয়ে হলেও শত্রুর বিরুদ্ধে লড়াই করে যাব। প্রকাশ্যে এবং অপ্রকাশ্যে এই লড়াই চলবে। অস্ত্রে, কৌশলে, সত্যে এবং প্রয়োজনবোধে মিথ্যেয় ক্রমাগত এদের আক্রমণ করে যাব। দেশমুক্ত না হওয়া পর্যন্ত কোনো সাংসারিক বন্ধন বা ব্যক্তিগত সম্পর্কে ফিরে যাব না।
তার কথা গুলি বেশ গুছিয়ে বলল হামিদা। তার কথার মধ্যে এবং মৃদু উচ্চারণ ভঙ্গিতে একটা বাড়তি দৃঢ়তা লক্ষ্য করে আমি বললাম, এ ধরনের শপথ নেওয়ার আগে কারো অনুমতি বা উপদেশ গ্রহণের সম্ভবত মুক্তিযোদ্ধাদের প্রয়োজন হয় না কী বল?
হয় কিনা আমি জানি না। হয়ত হয় না। তবে তোমার অনুমতি ছাড়া আমি একটা সামরিক ইউনিটে নাম লিখিয়ে মানসিক অনুশোচনায় ভুগছি। আমার স্বামী আছে অথচ এদের বলেছি আমি অবিবাহিত। আমাদের ক্যাম্পে সকলেই বিশ্ববিদ্যালয় বা কলেজের ছাত্রছাত্রী। অনেকেই তোমার নাম জানে। তোমার কবিতার ভক্ত। অথচ আমি বলি নি যে আমি অমুক কবির স্ত্রী। কারণ যুদ্ধের সময় তুমি কোন পক্ষ নেবে তা আমি জানতাম না। আমাদের পরিচিত অনেকেই স্বাধীনতার বিপক্ষে আছে।
তুমি কী তাদের সামনে পেলে আক্রমণ করতে পারবে?
গ্রেনেড মেরে উড়িয়ে দেব। ব্রাশ ফায়ারে ঝাঁঝরা করে দেব। এই যুদ্ধে আমাদের জিততে হবে কবি।
আমি যদি তোমার শত্রু পক্ষে থাকতাম কী করতে?
তুমি অন্যায়ের পথে থাকতে পার না।
হলফ করে বলা যায় না। তুমি তো এই ভয়েই স্বামীর পরিচয় গোপন করেছ।
দেখো আমাকে মানসিকভাবে আর পীড়ন করো না। তাহলে তোমার সাথে না খেয়ে না থেকেই আমি এক্ষুণি চলে যাব।
বলল হামিদা। উত্তেজনায় তার ঠোঁট জোড়া চড়ুই পাখির মতো কাঁপছে।
আমি বললাম, ঠিক আছে। চলো খেয়ে নেই পরে কথা হবে। এখন আর কথা বাড়িয়ে সময় নষ্ট করে লাভ নেই। আমি ক্ষুধার্ত। চল চারটা খেয়ে নিই।
হামিদা কোনো জবাব না দিয়ে খাবার ট্রে টার সামনে গিয়ে বসল। বলল, আমার ক্ষিদে নেই। তবুও তোমার সাথে সামান্য মুখে তুলব। কে জানে হয়ত বা এটাই হবে আমার প্রিয়জনের সাথে শেষ আহার্য। শেষ মিলন।
শেষ মিলন মানে?
আমি এ সপ্তাহেই কুষ্টিয়া সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে ঢুকব। যদিও বলা বারণ তবুও তোমাকে জানিয়ে যাচ্ছি আমরা ঢাকার কাছে ডেমরার একটা গ্রামে আস্তানা গেড়েছি। সেখান থেকে ঢাকায় অপারেশন চালাতে হবে। আমার কাজ হবে সংবাদ আদান-প্রদান ও আক্রমণের ধারা পরীক্ষা করে ইউনিটকে জানানো। খুব রিস্কি।
