হামিদা বসল।
পারুল বলল, ভাইকে এক কাপ চাপ দিই।
আমি বললাম, শুধু চাতে এখন চলবে না পারুল। দুপুরে কিছু খাওয়া হয় নি। চায়ের সাথে থাকে তো যৎসামান্য নাস্তাও দরকার।
কি কাণ্ড আপনি দুপুরে কিছুই খান নি?
ভবানীপুর থেকে আনন্দবাজার অফিসে গিয়েছিলাম। আমার বন্ধুদের সাথে দেখা হল। সেখানে অবশ্য চা-নাস্তা খেয়ে খিদে মরে গিয়েছিল। এখন আবার ভুক লেগেছে।
বললাম আমি। পারুল মিতুর দিকে ফিরে বলল, যাতো, নিচে গিয়ে জিজ্ঞেস করে আয় তো এখন হ্যাভি কিছু পাঠাতে পারবে কিনা? স্যাণ্ডউইচ থাকলেও চলবে।
মিতু বলল, আমি দেখছি নিচে গিয়ে। তুমি বরং রুম সার্ভিসে টেলিফোনে একটু বলে দাও।
পারুল রিসিভার তুলল।
আমি এই অবসরে হামিদাকে আড় চোখে একটু দেখে নিলাম। জলপাই রংয়ের ফাঁপানো পুলওভারে তাকে চমৎকার লাগছে। মিতু ঠিকই বলেছিল। এ পোশাকে হামিদাকে যে কোনো পরিচিতের পক্ষেই চেনা মুস্কিল হবে। আমি তাকে দেখছি এটা সম্ভবত হামিদা আন্দাজ করতে পেরে মুখ ফিরিয়ে তার স্বভাবসুলভ সলাজ হাসি আড়াল করার জন্যে একটু কাত হয়ে আছে।
এসময় পারুল রিসিভার রেখে আমার দিকে ফিরে বলল, পুরো লাঞ্চ না হলেও ভাত, মাটন আর ডাল পাওয়া যাবে। আমি কবি ভাইয়ের ঘরে খাবারটা পাঠিয়ে দিতে বলেছি। ভাই ভাবিকে নিয়ে গিয়ে সেখানে হাতমুখ ধুয়ে চারটা খেয়ে নিন। রাতে খাওয়ার সময় সকলে একসাথে খাব। ইমাম একটু জরুরি কাজে বেরিয়েছে। রাত সাড়ে আটটায় ফিরবে। ভাবি তো আজ থাকছেনই, কী ভাবি?
হামিদা কোনো জবাব না দিয়ে মাথা নুইয়ে নিঃশব্দে হাসল। পারুল হামিদার এই মিষ্টি লাজুকতায় একটু মজা পেয়ে টিম্পনী কাটতে ছাড়ল না, কি নতুন বৌ-এর মতো এমন ঢং করছ কেন? ট্রেনিং নিয়েও দেখছি বৌ ভাবটা যায় নি?
ট্রেনিং শেষ করলেও মোটিভেশনটা এখনও চলছে কিনা। আগে সেটা শেষ করতে দাও।
ওরে বাপরে, তখন তো তুমি পুরোপুরি ফ্রীডম ফাইটার বনে যাবে। তখন স্বামীর বুকেও রাইফেল তুলতে বাঁধবে না, কী বল?
জোরে হাসল পারুল।
হামিদা ও আমি পরস্পরের দিকে চেয়ে হাসলাম।
এসময় মিতু ছুটে এসে বলল, মামা আপনার ঘরে দুজনের খাবার পাঠিয়ে দিতে বলেছি।
হামিদা বলল, দুজনের খাবার দিয়ে কী হবে? আমি তো দুপুরে ক্যাম্প থেকে খেয়েই বেরিয়েছিলাম।
ঠিক আছে, আমার সাথে না হয় আরও দু এক লোকমা খাবে।
বলে আমি হামিদাকে নিয়ে বেরিয়ে এলাম। তালা খুলে ভেতরে ঢুকেই হামিদা বলল, মহিলাটি কে?
কোন মহিলার কথা বলছ? ও নন্দিনীর? আসার সময় পথে পরিচয়। বিপর্যয়ের মধ্যে পড়ে আমার সাথে এসেছে।
আমি যতটা পারি গলাটা হালকা করে জবাব দিলাম।
শুনলাম তোমাদের সাথেই থাকবে?
এখন আর থাকবে কিনা বলা মুস্কিল। এতদিন বিপন্ন অবস্থায় আমাদের সাথেই থাকার কথা বলত। এখন অবশ্যি ভবানীপুরে তার আপনজনদের খোঁজ পেয়েছে। তারা তাকে ফেলে দেবে বলে মনে হয় না। আর যদি ফেলেই দেয় আমি, মানে আমরা অর্থাৎ পারুলরা তাকে ফেলে দিতে পারবে না। আমি নন্দিনীকে এ প্রতিশ্রুতি দিয়েছি হামিদা।
কী ব্যাপার তোমার খুব খাতির যত্নের মধ্যেই আছেন বলে মনে হচ্ছে?
হামিদার কথায় তীব্র সন্দেহের বিদ্যুৎ ঝিলিক দিল।
আমি বললাম, তোমার কথা মিথ্যে নয়। নন্দিনীর ওপর যে ধরনের নির্যাতন গেছে আমি এর নিরুপায় সাক্ষী। আমার উচিত ছিল প্রাণ দিয়ে তার সম্ভ্রম রক্ষা করা। আমি তা পারি নি বলেই একটা কর্তব্যবোধের তাড়না আছে।
সে তাড়নাটা কিন্তু নিজের স্ত্রীর জন্য একবারও বোধ কর নি। এ পর্যন্ত একবারও জিজ্ঞেস কর নি, পঁচিশে মার্চের রাতে একদল পলায়নপর ছাত্রছাত্রীর সাথে আমাকে পালাতে বলার পর আমি কীভাবে এখানে এসেছি? আমার ওপর দিয়েও তো তোমার নন্দিনীর মতই লাঞ্ছনা যেতে পারত। যদি যেত তখন কী করতে? আমাকে নিয়েও কী তখন প্রেমে ডগমগ খেতে, না লাথি মেরে তাড়িয়ে দিতে?
হামিদার এ ধরনের উত্তেজিত চেহারা আমার কাছে নতুন।
আমি কপাটের ছিটকিনি তুলে দেব কিনা ঠিক করতে পারছিলাম না। শুধু মনে হল হামিদার কথার এখনই জবাব দেয়া অনুচিত হবে। আমি গলার স্বর নিচু করে বললাম, বিছানায় একটু শান্ত হয়ে বস হামিদা। বেয়ারা এখনই খাবার নিয়ে ঘরে ঢুকবে। খেয়েদেয়ে আগে তো আমার কথা শোনো। পরে না হয় তোমার যা বলতে ইচ্ছে করবে বলবে। তোমাকে কী পারুল কিছু বলেছে?
পারুলের দোষ দিও না তো। আমি ইমামের কাছেই তোমার বান্ধবীর বর্ণনাটা শুনেছি।
বর্ণনা মানে রূপের কথা শুনেই ভয় পেয়েছ?
আমি হাসলাম।
এ সময় কপাট ঠেলে ট্রে হাতে খাবার নিয়ে বেয়ারা ঢুকল, নমস্তে সাব। খানা।
আমি সামনের নিচু সেন্টার টেবিলটা দেখিয়ে বললাম, ওখানে রেখে দাও।
বেয়ারা দরজা ভেজিয়ে চলে গেলে আমি ছিটকিনি তুলে দিয়ে ফিরে এসে হামিদার হাত ধরলাম, আজ অন্তত ঝগড়া না করে আমার সাথে চারটা খেয়ে বিশ্রাম নাও। ইমামের কাছে শুনেছি পুরোপুরিভাবে মুক্তিযুদ্ধের সাথে জড়িয়ে পড়েছ এবং দেশের ভেতরে অপারেশন চালাতে যাচ্ছ। এ অনিশ্চিত জীবনের মধ্যে কয়েক ঘণ্টা আমরা কী সন্দেহহীন থাকতে পারি না?
আমার কথা শুনে হামিদা যেন পূর্ণ দৃষ্টিতে আমাকে একবার দেখে নিল।
তবে আমাকে বল সন্দেহের কোন কারণ ঘটে নি।
আমি তোমাকে মিথ্যে কথা বলতে পারব না। বরং বলব সন্দেহ ও অবিশ্বাসের অনেক কারণ ঘটেছে। তবুও তুমি আমার স্ত্রী। আমি তোমাকে ভালবাসি। নন্দিনী সম্বন্ধে আমি তোমাকে সব কথা খুলে বলতে চাই। এতে যদি তুমি ধৈর্য রাখতে পার ভালো কথা তা না হলে তোমার সিদ্ধান্ত তোমার কাছে।
