সন্ধ্যায় হোটেলে পৌঁছে সিঁড়ির ওপর মিতুকে পেলাম। আমাকে দেখে মিতু দ্রুত ছুটে এসে আমার হাত ধরল, এই যে মামা। আজ সারাদিন কোথায় ছিলেন? নন্দিনী ফুপু কই?
তোমার নন্দিনী ফুপু ভবানীপুর তার আত্মীয়দের বাসায় গেছেন। কাল সকালে আসবেন।
বলতে বলতে আমি সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠতে গেলে মিতু আমার হাত টেনে ধরে সিঁড়ির মাঝামাঝি এক জায়গায় দাঁড় করিয়ে দিল।
দাঁড়ান না মামা। আপনার জন্য একটা সারপ্রাইজ আছে।
আমি সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে বললাম, আমার জন্য সারপ্রাইজ?
হ্যাঁ।
বেশ এখন তোমার সারপ্রাইজটা বলে আমাকে কাঠ বানিয়ে দাও তো মা।
না! অমনি বুঝি খালি খালি হবে?
আমি বললাম, বারে খালি খালি হবে কেন? তোমার ডিমান্ডটা শুনলে তো ব্যবস্থা করতে পারি।
সত্যি মামা?
সত্যি!
তাহলে আমার ডিমান্ডটা হল আগামী রোববার আমাকে ম্যাটেনি শো সিনেমা দেখাতে হবে। রিকুয়েল ওয়াজের দারুণ একটা এ্যাডভেঞ্চার ছবি চলছে চৌরঙ্গীর একটা হলে। মামা, রাজি?
আমি বললাম, চোখ বন্ধ করে রাজি।
তবে চোখ বন্ধ করে ওপরে ওঠে যান। আমাদের কামরায় গিয়ে চোখ মেলবেন। দেখতে পাবেন জিনসের প্যান্ট আর খাকি রংয়ের পুলওভার পরা এক মুক্তিযোদ্ধা আমার মায়ের সঙ্গে চা পান করছে। নাম মীর হামিদা বানু বেগম। কী মামা সারপ্রাইজ না?
আমার মুখ দিয়ে আর কথা সরতে চায় না। আমি মিতুর সামনে হকচকিয়ে ধরা পড়ে যাওয়ার ভয়ে বললাম, সত্যি সারপ্রাইজ মিতু, তোর মামি কখন এসেছেন?
তিনটের দিকে। আব্বার অফিসে এসেছিলেন। সেখান থেকে আব্বা গাড়িতে করে মামানিকে বাসায় নিয়ে এসেছেন। প্যান্ট আর পুলওভারে মামানিকে যা সুন্দর মানিয়েছে না, ওপরে গিয়ে দেখুন।
মিতুর কথায় সত্যি আমি যেন কাঠ হয়ে গেলাম। যেন তুলতে ভুলে গেছি কিংবা কেউ মন্ত্র বলে সিঁড়ির ওপর আমার পা দুটিকে জুতো সুদ্ধ পেরেক দিয়ে এঁটে দিয়েছে।
আমার অবস্থাটা মিতুকে আবার কৌতূহলী করে এই ভয়ে আমি খুব অবাক হওয়ার ভান করে বললাম, চল তো মা ওপরে গিয়ে তোমার মুক্তিযোদ্ধা মামিকে কনগ্রেচুলেট করি।
তাড়াতাড়ি চলুন মামা।
বলেই মিতু আমার হাত ধরে টেনে ওপরের দিকে চলতে লাগল। অগত্যা আমি মিতুর সাথে নিঃসাড় মানুষের মতো চলতে লাগলাম।
ইমামদের কামরার দরজায় এসে আমরা একটু দাঁড়ালাম। আমি ঠিক স্বাভাবিক ছিলাম না। প্রকৃতপক্ষে আমার পা দুটিতে এক ধরনের কম্পন অনুভব করছিলাম। এক ধরনের অপরাধবোধই আমাকে কাঁপাচ্ছিল। আমি হামিদার সামনে যাচ্ছি। যাকে আমি একদা আন্তরিক প্রেমের মধ্যেই নিজের স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করেছিলাম। পারিবারিক বোঝাপড়া নয়, ভালোবেসে বিয়ে। তাছাড়া এমন কোনো কারণও ঘটে নি যাতে হামিদার প্রতি প্রেমে কোনো সন্দেহের ছিটা লাগতে পারে। লাগলেও হামিদা তা জানে না। নন্দিনীর সাথে দৈব যোগাযোগের কথা হামিদা এখনও জানে না। জানলে তার প্রতিক্রিয়া কী হবে তা অজানা। হামিদাকে সব কথা খুলে বলার সাহস কী আমার আছে? না, নেই। তবুও হামিদা মুক্তিযোদ্ধা। যুদ্ধ পরিস্থিতির দুর্দৈব সম্বন্ধে মোটামুটি ওয়াকিবহাল। তাছাড়া আমার স্ত্রীর উচ্চশিক্ষা রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ ডিগ্রীধারী। কিন্তু নন্দিনীর সাথে দৈবাৎ সাক্ষাৎ ঘটলেও আমার যে সম্পর্ক সৃষ্টি হয়েছে এর কী ব্যাখ্যা আছে আমার কাছে? আমি কী নন্দিনীকে বলি নি আমি তাকেও ভালবাসি? আমি কী তবে কোনো সাময়িক প্রলোভনে নন্দিনীকে স্তোকবাক্যে বশীভূত করার জন্যে মিথ্যে বলেছি? নাকি অযৌক্তিকতার ভয়ে আমি স্বীকার করতে চাইছি না আমি দুজনকেই ভালবাসি? একজন পুরুষের দুটি নারীকেই একই সাথে ভালবাসা কী পাপ? এর মধ্যে কী কোনো লাম্পট্য ও লজ্জা আছে? যদি তাই হবে, ইসলাম-আল্লার ধর্ম এ বিধান দিত না। আমার কী উচিত নয় যা সত্য তাই আমার স্ত্রীকে বলা?
একি মামা, দাঁড়ালেন কেন, ভেতরে যান না।
আমি দরজার সামনে থমকে দাঁড়িয়ে আছি দেখে মিতু অবাক।
আমি বললাম, দাঁড়া না, তোর মামিকে একটা সারপ্রাইজ দেয়ার আগে তোর মার সাথে তার কী আলাপ হচ্ছে একটু শুনে নিই।
আমার কথায় মিতুও মজা পেল। মুখের ওপর তর্জনী রেখে কপাটে কান পাতল। ফিসফিস করে বলল, ভেতরে খুব হাসাহাসি চলছে মামা। বেল টিপব?
আমি মাথা নেড়ে সম্মতি জানলে মিতু বেল টিপল। কিছুক্ষণ পরেই ছিটকিনি খুলে পারুল কপাট ধরে দাঁড়াল, এই যে ভাই এসেছেন। আসুন। ভাবি কখন এসে বসে আছে। আপনার খোঁজ নেই। নন্দিনী আপা কোথায়?
সে তো ভবানীপুরে তার আত্মীয়ের বাসায় আজ থাকবে। আগামীকাল সকালে আসবে বলেছে। শুনলাম তোর ভাবি এসেছে?
হ্যাঁ। আসুন ভেতরে।
পারুল কপাট ছেড়ে সরে দাঁড়ালে আমি ভেতরে ঢুকেই হামিদার সামনে পড়ে গেলাম। হামিদা ততক্ষণে উঠে দাঁড়িয়েছে।
আরে তুমি তো দারুণ পুলওভার পরেছ? কেমন আছ?
ভাল। তুমি কেমন?
ভালই।
শুনলাম পথে নাকি দারুণ দুর্ভোগ পুহিয়েছ। ভৈরবের উদ্দেশ্য রওনা হয়েছ শুনে খুব দুঃশ্চিন্তার মধ্যে ছিলাম। পরে মুক্তিযোদ্ধাদের সূত্রে তোমার আগরতলা পৌঁছার সংবাদ পাই। আরও পরে জানতে পারি তুমি আগরতলায় পারুলদের সাথে ভাল আছ। আমি যোগাযোগের খুব চেষ্টা করেছি, বিশ্বাস করো।
বলল হামিদা।
আমি বললাম, এসব কথা এখন থাক। আল্লাহকে ধন্যবাদ দাও যে তুমি নিরাপদে এখানে পৌঁছেছ। বসো।
