এ ব্যাপারে কোনো চিন্তা করবেন না। চলে যখন এসেছেন একটা ব্যবস্থা হয়েই যাবে। বললেন সুনীল।
আমি বললাম, আপনি আমাকে তুমি করেও বলতে পারেন। আপনি আমার থেকে পাঁচ ছবছরের বড়ই হবেন।
ঠিক আছে তুমিই বলব। তোমার তো একটা নতুন কবিতার বই বেরুবার কথা ছিল। বেরিয়েছে?
না। কম্পোজ হয়েছিল। প্রুফের ফর্মাগুলো সাথে নিয়ে এসেছি। হোটেলে আছে।
ভালই হল। এখান থেকেই বেরুবে। তুমি পান্ডুলিপি তৈরি করে আমাকে এনে দিয়ে যেও। তোমার কাছে টাকাকড়ি আছে তো?
আমি বললাম, আছে। প্রকৃতপক্ষে আমি বা আমার বোন-ভগ্নিপতির তেমন অসুবিধে নেই।
খুব ভালো কথা। এখন তাহলে তোমার স্ত্রীর খোঁজখবর নিয়ে শান্ত হও। লেখালেখি শুরু করে দাও। অচিরেই আশা করছি তোমাদের দুর্ভোগ কেটে যাবে। হতাশ হবার কিছু নেই। আমরা মানে আমি তোমাকে দেখব।
সুনীলদার কথায় আমার দুচোখ পানি বেরিয়ে এল। ভারতে প্রবেশের পর এই প্রথম একজন দায়িত্বজ্ঞান সম্পন্ন সুপরিচিত ব্যক্তির প্রকৃত সহানুভূতির কথা শুনে মনে হল আমি অনাত্মীয় পরিবেশে উদ্বাস্তু হয়ে পড়ি নি। এখানেও লেখক হিসেবে স্বাধীন মর্যাদা থাকবে। আমি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে আমার কলমকে ইচ্ছেমত ব্যবহার করতে পারব।
আমি বললাম, সুনীলদা আপনার কথায় সাহস পাচ্ছি। মনে হচ্ছে লিখতে পারব। এই কয়দিন ঢাকা থেকে বেরিয়ে পথে-প্রান্তরে মানুষের প্রতি মানুষের যে নিষ্ঠুরতা আর পাশবিকতা দেখে এসেছি তাতে মনে হয়েছিল বুঝি কবিতার আর মূল্য থাকবে না। মানুষের সর্বপ্রকার সুকুমার বৃত্তিরই বুঝি অবসান ঘটে গেছে। এখন আপনার সাথে কথা বলে মনে হচ্ছে, আমার ধারণা বোধ হয় একপেশে।
সুনীলদা হাসলেন, কবিদের প্রকৃত কাজ বন্দুকবাজরা যদি শেষ করতে পারতো তবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নাৎসীরাই সব শেষ করে দিয়েছিল। তোমাদের মুক্তিযুদ্ধ আমাদের রবীন্দ্রনাথকে আবার পুনরুজ্জীবিত করল। এটাই কী বড় প্রমাণ নয় যে মানুষের সুকৃতি কখনো পরাজয় মানে না?
সুনীল বললেন।
আমি বললাম, কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের সাথে পরিচিত হতে চাই। তিনি তো আনন্দবাজারেই আছেন জানি।
হ্যাঁ। এখানেই। আনন্দবাজারের ছোটদের বিভাগ দেখেন। আগে একটু চা খাও। আমি শক্তিকে খবর দিচ্ছি। এখানে আরো তোমার পরিচিতজনেরা আছেন। সবার সাথেই তোমার সাক্ষাৎ হবে। তাছাড়া ঢাকার একজন লেখক তা বেশকিছু দিন যাবতই কলকাতা প্রবাসী। বেলালকে চেনো? বেলাল চৌধুরী?
আমি বললাম, হাঁ চিনি বৈকি।
তাকেও তোমার আগমন বার্তা জানিয়ে দেব। তোমার খুঁজে বের করতে হবে না। খবর পেরে সেই তোমাকে খুঁজে বের করবে।
বলে তিনি কলিং বেল টিপলেন। একজন পিয়ন ঘরে এসে ঢুকলে বললেন, চা দাও। আর শক্তিবাবুকে বল বাংলাদেশ থেকে আমাদের বন্ধু নাম হাদী মীর এসেছেন। আমার সামনে আছেন।
লোকটা বেরিয়ে যাওয়ার একটু পরেই হন্তদন্ত হয়ে এক ভদ্রলোক ঘরে এসে ঢুকলেন, কই, আপনিই হাদী?
আমি চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালাম।
সুনীল বললেন, এই যে শক্তি। ইনি হাদী মীর।
আমি শক্তি বাবুর বাড়িয়ে দেয়া হাতখানা চেপে ধরলাম, আপনি আমার প্রিয় কবি।
আরে হাদী, তোমার কবিতা আমার যা ভালো লাগে না, ওসব কী মুখে বলে কোনো কবিকে বোঝানো যায়? বল ভাই, কীভাবে এলে? আসতে কোনো কষ্ট পাও নি তো? আমাকে তুমি বলে ডাকো। তোমার বন্ধুত্ব চাই হাদী। তোমার আত্মীয়তা চাই।
শক্তির কথায় আমিও কেমন যেন হয়ে গেলাম। তার সাথে কোলাকুলি করতে গিয়ে ছেলেমানুষের মতো কেঁদে ফেললাম। যেন বহুদিন প্রবাস যাপনের পর দুই সহোদরের সাক্ষাৎ ঘটেছে। আমাদের পরস্পরের আলিঙ্গন মুহূর্তে কখন যে আমাদের পেছনে এসে দাঁড়িয়েছেন এখানকার পরিচিত কবি, সাহিত্যিক ও সাংবাদিকগণ বুঝতে পারি নি। আলিঙ্গন থেকে মুক্ত হয়েই দেখি গৌরকিশোর ঘোষ ও নীরেন চক্রবর্তী শক্তির সাথে আমার কোলাকুলির দৃশ্যটি উপভোগ করে হাসছেন। সুনীল এদের দুজনের সাথেই আমার পরিচয় করিয়ে দিলে আমি গৌরকিশোরকে বললাম, আপনি সত্যযুগ পত্রিকায় আমার প্রথম লেখা ছেপেছিলেন। এতদিন পর আপনাকে দেখতে পেয়ে খুব খুশি লাগছে।
জানি। তোমার আসতে কষ্ট হয় নি তো? বললেন গৌরকিশোর।
কষ্ট-লাঞ্ছনা একটু হয়েছে। তবে আল্লাকে ধন্যবাদ শেষপর্যন্ত এসে এখানে পৌঁছেছি।
তোমার স্ত্রী?
তিনিও এসেছেন অন্যপথে। আমার সাথে এখনও সাক্ষাৎ হয় নি। অচিরেই দেখা পাওয়ার আশা করছি।
কোথায় উঠেছ?
আপাতত একটা হোটেল।
আমার জবাবের সাথে সাথেই সুনীল সকলকে আশ্বস্ত করার জন্য বললেন, হাদীর ভগ্নিপতি এ্যাকজাইল বাংলাদেশ সরকারের বড় কর্মকর্তা। আপাতত ওর কোনো অসুবিধে নেই।
সুনীলের কথায় সকলেই আশ্বস্ত হল। সকলেই আমাকে ঘিরে বসে চা পানে যোগ দিলেন। আমি আগরতলার পথে যেভাবে ভারতে প্রবেশ করেছি সব খুলে বললাম। নন্দিনীদের কথাও। সীমাদির করুণ মৃত্যুর কথা শুনে এরা স্তম্ভিত হয়ে থাকল। শুধু নন্দিনীর ওপর অত্যাচারের কাহিনী আমি মুখে ফুটে বলতে পারি নি। কেন যেন মনে হল এতে আমার দুর্দিনের সঙ্গিনীর অপমান হবে। গৌহাটিতে পাওয়া ব্যাগটার কথাও চেপে গেলাম।
আমার দুর্ভোগপূর্ণ পদযাত্রা ও সীমান্ত অতিক্রমের বিবরণ শুনে সকলেই সহানুভূতি জানালেন। সকলেই আবার মনস্থির করে লেখালেখিতে মনোযোগ দিতে পরামর্শ দিলেন। সকলেই আমাকে কোনো না কোনো ভাবে সাহায্য করতে চান দেখে মনটা ভরে গেল। আমি দৃঢ়তা ও সাহসে উজ্জীবিত হয়ে আনন্দবাজার অফিস থেকে বেরিয়ে এলাম।
