এ্যাসপ্লানেড।
এ ট্রাম কী এ্যাসপ্লানেড যাবে?
হ্যাঁ। আপনি ঠিক ট্রামেই উঠেছেন। আপনি জয় বাংলার লোক?
হ্যাঁ।
আপনারা কী পাকিস্তানের সাথে পেরে উঠবেন?
সাড়ে সাত কোটি মানুষ ওদের সাথে না থাকতে চাইলে মেরে কেটে কত দিন রাখবে?
এটা অবশ্য ঠিকই বলেছেন। তবে দেখবেন পাকিস্তানী তাড়িয়ে আবার মাড়োয়ারিদের পাল্লায় পড়বেন না।
লোকটার কথায় এবার আমি তার দিকে ভালো করে দেখলাম। মধ্য বয়ক অভিজ্ঞ বাঙালি ভদ্রলোক। চোখে মোটা কাঁচের চশমা। পরনে ধুতি-পাঞ্জাবি। গায়ের রং বেশ ফর্সা। আমি বিহ্বলের মতো তাকিয়ে আছি দেখে ফের বললেন, দেখুন না কলকাতা তথা সারা পশ্চিমবঙ্গকে মাড়োয়ারিরা কবজা করে নিয়েছে। কলকাতা প্রকৃতপক্ষে আর বাঙালিদের শহর নেই, বুঝলেন, একটু সাবধান থাকবেন।
ভদ্রলোকের কথা ফুরোবার আগেই ট্রামটা অন্য এক স্টপেজে এসে দাঁড়িয়েছে।
আচ্ছা, নমস্কার আসি। সামনের আরও একটা স্টপেজ পার হলেই চৌরঙ্গী, এ্যাসপ্লানেড।
বলতে বলতে ভদ্রলোক নেমে গেলেন। কন্ডাকটর আমার কাছ থেকে পয়সা নিয়ে টিকেট দিল। আমি এ্যাসপ্লানেডে ঢোকার মুখে চৌরঙ্গীতে নেমে একটা ট্যাকসি ধরলাম।
বেলা তিনটার দিকে আমি সুতারকিন স্ট্রীটে আনন্দবাজার অফিসের সামনে এসে নামলাম। ড্রাইভারকে ভাড়া মিটিয়ে দিয়ে পত্রিকা অফিসের কাউন্টারে কাঁচের এপাশ থেকে দেখলাম বিশাল গোফলা এক রিসেপশনিস্ট অত্যন্ত ব্যস্তসমস্ত হয়ে আগন্তুকদের সাথে কথা বলছে। আমি দর্শনার্থীদের ভিড় থেকে আলাদা হয়ে এক জায়গায় চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলাম। বুঝতে পারছিলাম না আমি কার সাথে দেখা করার কথা রিসেপশনের স্লিপে লিখব। শক্তি না সুনীলের? এখনও আমার দ্বিধা কাটছে না। এরা কী সত্যি এতদিন পরেও আমার নাম মনে রেখেছে? যদি দেখা না করতে চায়?
এসময় রিসেপশনের গোঁফঅলা ভদ্রলোক হাতের ইশারায় আমাকে কাছে যেতে ডাকলেন। আমি এগিয়ে গিয়ে বললাম, আমি বাংলাদেশ থেকে এসেছি। আমার নাম সৈয়দ হাদী মীর। সুনীর গঙ্গোপাধ্যায়ের সাথে দেখা করতে চাই।
ভদ্রলোক আমার কথা শেষ হওয়ামাত্রই টেলিফোন তুললেন। অপর প্রান্তের সাথে তার কী কথা হল আমি বুঝতে না পারলেও টেলিফোন রেখে দিয়ে বলরেন, যান।
আমি ধন্যবাদ জানিয়ে রিসেপশন হয়ে ভেতরে লিফটে এসে দাঁড়ালাম। লিফট চালককে সুনীল বাবুর কথা বলতেই সে বোতামে চাপ দিল। লিফট এসে নির্দিষ্ট তলায় থামলে সে আমাকে একটু এগিয়ে বাঁ দিকে যেতে বলল। আমি তাকে ধন্যবাদ জানিয়ে বাঁ দিকে একসারি কামরা পার হয়ে এগোতে লাগলাম। শেষে বাইরে টুলের ওপর বসে থাকা একজন পিয়নের দেখা পেতেই সুনীল বাবুর কামরাটা দেখিয়ে দিতে বললাম। ছেলেটি উঠে এসে আমাকে সুনীলের কামরায় পৌঁছে দিয়ে বলল, ভেতরে যান। বাবু ভেতরে আছেন।
আমি ভেতরে প্রবেশ করেই সুনীল বাবুকে সামনে পেলাম। আমি এর আগে কখনো সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়কে চাক্ষুষ দেখি নি। অথচ কৃত্তিবাস সম্পাদনার সময় তার সাথে কত চিঠিপত্র আদান-প্রদান ও বাংলাদেশের কবিতা সম্বন্ধে মতো বিনিময় হয়েছে। একবার তিনি আমার কবিতার উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করে একটি চিঠিতে লিখেছিলেন যে তার প্রিয় কবিদের তালিকায় তিনি আমার নামও লিখে রেখেছেন। এই তো এখন কবি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় আমার সামনে। তার মুদ্রিত ছবি আমি এর আগে কোনো কোনো পত্র পত্রিকায় দেখেছি বলেই এখন তাকে চিনতে তেমন অসুবিধে হচ্ছে না। আমাকে দেখেই হাত থেকে কলম রেখে হাত বাড়িয়ে দিলেন, আপনি হাদী মীর? কখন, কীভাবে বর্ডার ক্রস করলেন? গতকালই তো আপনার নিরাপত্তার জন্য উদ্বেগ প্রকাশ করে কবি শঙ্খ ঘোষ অল ইন্ডিয়া রেডিও থেকে একটি প্রতিবেদন পাঠ করলেন। বসুন। আপনার পরিবার-পরিজন কে কোথায়? তারা সবাই ঠিকমত আছে তো?
আমি বললাম, যতটুকু জানি আমার পরিবার-পরিজনের এখনও তেমন কোনো বিপর্যয় ঘটে নি। ঢাকা থেকে বেরুবার আগেই স্ত্রীর সাথে বিচ্ছিন্ন ছিলাম। শুনেছি তিনি নিরাপদেই এখানে, এই শহরে এসে পৌঁছেছেন এবং মুক্তিযুদ্ধে লিপ্ত আছেন। এখনও তার সাথে সাক্ষাৎ ঘটে নি। আশা করছি, দুএকদিনের মধ্যেই তার সাথে দেখা হবে। আমি ও আমার এক বোন, ভাগ্নি এবং ভগ্নিপতি গতকাল কলকাতায় এসে পৌঁছেছি। বোনের জামাই প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের বড় কর্মকর্তা, সচিব। এখন উডস্ট্রীটে একটি আর্মেনিয় হোটেলে উঠেছি। আগামীকাল ভারত সরকারের সহায়তায় পাওয়া পার্ক সার্কাসের একটা বাড়িতে গিয়ে স্থায়ীভাবে উঠব।
আমি তো ভাবতেই পারছি না আপনি পাকিস্তান ছেড়ে চলে এসেছেন। আমার সামনে সৈয়দ হাদী মীর? এটা সত্যি এক অভাবনীয় ঘটনা। আমাদের ভয় ও আফসোস ছিল আপনারা সবাই হয়ত পাকিস্তানী হানাদারদের গুলিগোলায় মারা পড়েছেন কিংবা সামরিক ক্যাম্পে আটক।
আনন্দমিশ্রিত বিহ্বল কণ্ঠে সুনীল বললেন। আমি বললাম, আপনার আন্দাজ একেবারে মিথ্যে নয়। তবে প্রথম আঘাতটা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাধীনতাকামী ছাত্রছাত্রী ও রাজনীতিকদের ওপর দিয়ে গেছে। সাংবাদিকদের ওপরও। ইত্তেফাক অফিসটিকে আমার চোখের সামনে গোলার আঘাতে জ্বলতে দেখেছি। রাজারবাগ পুলিশ লাইনে আক্রমণ করে ঢাকার একমাত্র পুলিশ অবস্থানকে তছনছ করে দেয়া হয়েছে। আসার সময় পথে-প্রান্তরে কত যে নিরীহ মানুষের লাশ আর জ্বালিয়ে দেয়া গ্রাম দেখে এসেছি তার হিসেব নেই। শুধু প্রাণ নিয়ে পালিয়ে এসেছি। জানি না আমাদের এই দলে দলে ভারতে পালিয়ে আসার রাজনৈতিক ও আন্তর্জাতিক পরিণাম কী হবে। ভারতই বা এই বিপুল উদ্বাস্তুর ভার কীভাবে সইবে? কতদিন সইবে?
