ওর কথা পরে শুনব। আগে আপনাকে এককাপ চা দিই।
আমি বললাম, দিন।
দীপালি নন্দিনীকে নিয়ে পাশের কামরায় চলে গেলে স্নান সেরে অনুপ বাবু মাথা মুছতে মুছতে ঘরে এসে ঢুকলেন।
আপনাকে কী বলে ধন্যবাদ জানাব। আমার বোনটিকে আপনি এতদূর পর্যন্ত নিয়ে এসেছেন।
আমি হাসলাম, নিয়ে আসার জন্য ধন্যবাদ দিন। কিন্তু তাকে এখানে আপনার বোঝা হিসেবে রেখে যেতে চাই না। নন্দিনী এখন আমাদের পরিবারেরই একজন। সে শুধু তার একমাত্র পিসিমাকে সীমাদির মৃত্যুর খবরটা পৌঁছে দেবে বলে এসেছে।
আমার কথার মধ্যেই নন্দিনী এসে ঘরে ঢুকল, আমি এখানে কয়েকটা দিন থেকে যাই কবি। বহুকাল পরে এসেছি। এদের ওপর দিয়েও কম ঝড় বয়ে যায় নি। এইমাত্র দীপুদি বলল অঞ্জুদি কিছুদিন আগে একটি মুসলমান হকার ছেলেকে বিয়ে করে বাড়ি ছেড়ে হাওড়া চলে গেছে। এরা অঞ্জুদির সাথে, তার বরের সাথে সম্পর্ক রাখতে চায়। কিন্তু অঞ্জুদি লজ্জায় আসতে চায় না। আমার বিশ্বাস, আমি এদের লজ্জা ভাঙিয়ে ফিরিয়ে আনতে পারব।
আমি বললাম, নন্দিনী তুমি থাকতে চাইলে আমি কী আর বলতে পারি?
রাগ করলে?
না।
আমি কাল সকালে দীপুদিকে নিয়ে উডস্ট্রীটে যাব। ইমাম সাহেব আর পারুলকে আমি বুঝিয়ে বলব।
কাল ইমামরা হোটের ছেড়ে পার্ক সার্কাস এলাকায় চলে আসবে।
জানি। সে জন্যই খুব সকালে গিয়ে হাজির হব।
নন্দিনী এমনভাবে বলছে, মনে হল, তার মনের মধ্যে একটা স্বনির্ভর সিদ্ধান্ত আছে। দীপালি ততক্ষণে চা আর একটা প্লেটে সন্দেশ এনে টেবিলে রাখল। আমি বললাম, আপনার বোনকে আমি এখানে রেখে যাব ভাবি নি।
হয়ত ও নিজেই ভাবে নি এ বাড়িতে আমরা এখনও আছি। তাছাড়া আমার মা ছিলেন খুব রক্ষণশীল। একটি মুসলমান ছেলের সাথে সে দেশ ছেড়ে চলে এসেছে দেখলে মা হয়ত ওকে ঘরে ঢুকতেই দিত না। মা নেই ভালোই হয়েছে। তা না হলে তার নিজের মেয়েই মুসলমান ছেলেকে বিয়ে করে সুখে আছে শুনলে মরমে মরে যেত।
আপনাদের বুঝি এখন আর সে সংস্কার নেই?
আমাদের কেন, এ শহরে কেইবা এখন জাতপাত মানে? ঐ দেখুন আমার দাদা, অঞ্জুদির ভালবেসে গৃহত্যাগের কথা শুনে কেঁদেকেটে দুচোখ ভাসিয়ে দিলেন। এখন প্রতিদিন শিয়ালদা স্টেশনে গিয়ে অঞ্জুদির বরের সাথে চা-বিস্কুট খেয়ে আসেন। বলেন, ছেলেটি নাকি খুব ভদ্র আর শিক্ষিত। বোনের পছন্দের তারিফ করেন। বলেন, এমন একজন ধার্মিক ভগ্নিপতি পেয়ে তিনি ধন্য। সময়ই সব বদলে দিচ্ছে।
বলল দীপালি।
আমি সন্দেশ ও চা শেষ করে উঠে দাঁড়ালাম, আজ তাহলে উঠি। কাল দেখা হবে।
অনুপবাবু বললেন, দাঁড়ান আপনাকে গলির মাথায় রেখে আসি।
আমি পকেট থেকে পারুলের দেওয়া খামটা বের করে নন্দিনীকে এগিয়ে দিয়ে বললাম, খামটা রাখো। আমার কাছে হোটেলে যাওয়ার মতো ট্যাকসি ভাড়া আছে। নন্দিনী আমার মুখের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে কী ভেবে যেন খামটা নিল। আমি অনুপ বাবুর সাথে বাইরে বেরিয়ে এলাম।
০৬. রাস্তায় বেরিয়ে মনস্থির
রাস্তায় বেরিয়ে আমি মনস্থির করতে পারছিলাম না এখন কোথায় যাব। অনুপদা আমাকে গলিটা পার করে কোথায় গিয়ে ট্রাম চাপব বুঝিয়ে দিয়ে বাসায় ফিরে গেছেন। আমি হাঁটতে হাঁটতে একটা ট্রাম স্টপেজে এসে দাঁড়ালাম। কেন যেন মনে হল সুতারকিন স্ট্রীটে আনন্দবাজার অফিসে গেলে অনেক লেখক বন্ধুর সাথে আমার দেখা হবে। পঞ্চাশ দশকের গোড়ার দিকে যাদের সাথে আমি কবিতা লেখা শুরু করেছিলাম হয়ত এদের অনেকের সাথেই আমার সাক্ষাৎ হবে। শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের ও সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়কে অন্তত চাক্ষুষ দেখতে পাব। এদের সাথেই আমি একদা কবিতা পত্রিকা ও কৃত্তিবাসে লেখা শুরু করেছিলাম। এখন তো ওরাই পশ্চিমবঙ্গের শ্রেষ্ঠ লেখক। আনন্দবাজারের মতো বিশাল প্রতিষ্ঠানে এখন এরা কর্মরত। হয়ত সেখানে গেলে এরা আমাকে আমার এই দিশেহারা অবস্থায় কোনো সুপরামর্শ দিয়ে সাহায়্য করতে পারে। তাছাড়া যে কোনো অবস্থায় থাকি বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে আমার কিছু লেখা উচিত। হয়ত আমার রচনা যে কোনো রাজনৈতিক বক্তার বক্তব্যের চেয়ে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে বেশি বিশ্বাসযোগ্য বলেই বিবেচিত হবে।
ট্রাম স্টপেজ দাঁড়িয়ে নানা চিন্তায় মনটা ভার হয়ে এল। হামিদা, আমার স্ত্রী এই কালকাতাতেই কিংবা এর আশেপাশে কোথাও কোনো সামরিক ট্রেনিং ক্যাম্পে আছে। আট নম্বর থিয়েটার রোডে গেলেই তার হদিস বের করা অসম্ভব হবে না। অথচ আমার মন সেদিকে যেতে চাইছে না কেন তবে কী আমি হামিদাকে ভালবাসি না? নন্দিনীর প্রতি আমার এই পক্ষপাত কী তবে অপরাধ? অবৈধ শারীরিক আকর্ষণ মাত্র? নাকি সম্পূর্ণ অসহায় ভাবে আমি এই দুটি নারীকেই ভালবেসে ফেলেছি? দুটি নারীর প্রতি এক পুরুষ-আত্মার ভালবাসা কী পাপ? ধর্মীয়ভাবে এর সমর্থন আছে, তা আমি জানি। কিন্ত ধর্মের সমর্থন আমি খুঁজছি কী তবে আমার ব্যক্তিগত লোভকে একটা যুক্তিগ্রাহ্য সামাজিক সমাধান দিতে?
এসব এলোমেলো চিন্তার মধ্যে স্টপেজে ট্রাম এসে দাঁড়ালে আমি তাতে উঠে পড়লাম। আমিও জানি না এ ট্রাম কোথায় যাবে? খালি সীট পেয়ে আমি বসে পড়লাম। পাশের সীটের যাত্রীকে বললাম, আমি সুতারকিন স্ট্রীটে যাব। সামনে কোথায় গিয়ে নামলে আমার সুবিধে হবে?
