নন্দিনী হঠাৎ দাঁড়িয়ে গিয়ে বলল, এখানে দাঁড়িয়ে বরং একটা সিগ্রেট খাও। তারপর না হয় ধীরে সুস্থে বাড়ির ভেতর ঢুকবে। এমন কাঁপতে কাঁপতে ঢুকলে এরা কী ভাববে?
আমার ভয় লাগছে।
কিসের ভয়? আমাকে হারাবার?
বুঝতে পারছি না।
আমার কথায় নন্দিনী ঠোঁট টিপে হাসল, আমি যদি তোমার মুক্তিযোদ্ধা বৌয়ের সাথে লড়াই করে জিততে চাই, বুঝতে পারছি জিতে যাব। তবে আমি এমন কাপুরুষের মতো জিততে চাই না। নাও সিগ্রেট ধরাও।
আমি পকেট থেকে প্যাকেট বের করে একটা সিগ্রেট ধরিয়েই বললাম, এখানে আর দাঁড়াতে হবে না, চল বাড়িটার ভেতরে গিয়ে ঢুকি।
নন্দিনীও আর কোনো কথা না বলে আমার আগে আগে চলতে লাগল। আমরা গলির মাথায় এসে ডানদিকে একটা অতিকায় শেওলা পড়া বাড়ির সামনে এসে দাঁড়ালাম। নন্দিনী বলল, এটাই।
বাড়ির সামনে একটা ভাঙা দেয়াল। দেয়ালের শেষপ্রান্তে একটা গেট। একতলা এই পুরানো বাড়িটাকে ঘিরে আছে স্থানে স্থানে ক্ষয়ে সুরকি ঝরে যাওয়া প্রাচীন দেয়াল।
গেটের কপাট খোলাই। আমি ও নন্দিনী ভেতরে ঢুকলাম। ভেতরের সরু গলিটা পার হতেই বাড়ির সান বাঁধানো উঠানে একজন খালি গা হাড্ডিসার লোককে বালতি থেকে মগ ভর্তি পানি নিয়ে মাথায় ঢালতে দেখলাম। পরনে একটা ধুতি লুঙ্গির মতো পেঁচিয়ে পরা। ভদ্রলোক আমার ও নন্দিনীর দিকে একবার একটু মুখ ফিরিয়ে দেখেও তেমন গা করলেন না। আবার মগভর্তি পানি মাথায় ঢালতে লাগল।
আমি নন্দিনীকে বললাম, এই ভদ্রলোককে জিজ্ঞেস করলে হয়।
জিজ্ঞেস করতে হবে না। ইনি অনুপদা। আমার পিসতুতু ভাই। চিনতে ভুল হচ্ছে না। স্বাস্থ্যটা মনে হয় একদম খুইয়ে বসেছেন।
নন্দিনীর অনুচ্চ কথাগুলোও সম্ভবত ভদ্রলোকের কানে গেছে। মগটা বালতির ভেতর রেখে তিনি নন্দিনীর দিকে ফিরলেন, কে আপনারা? কোত্থেকে এসেছেন?
আমাকে চিনতে পারছ না অনুপদা, আমি নন্দিনী। পাকিস্তান থেকে এসেছি। পিসিমা কোথায়? অঞ্জু, দীপু এদের দেখছি না যে?
ভদ্রলোক নন্দিনীর কথায় কিছুক্ষণ অত্যন্ত হতভম্ব হয়ে আমার ও নন্দিনীর দিকে তাকাতে লাগলেন। চমক ভাঙলে অকস্মাৎ বলে উঠলেন, তুই নন্দিনী, হাবুল মামার মেয়ে নন্দিনী? সীমার বোন?
তার কথায় নন্দিনীর বাঁধ ভেঙে গেল। সে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠে তার স্নানরত গুরুজনের পা ছুঁয়ে প্রণাম করতে গেলে অনুপ বাবু ভেজা শরীরেই নন্দিনীকে জড়িয়ে ধরলেন, তোরা বেঁচে আছিস বোন? সীমা কোথায়? তার জামাই?
সীমাদি নেই অনুপদা। আগরতলা ঢোকার পথে পাক হানাদারদের গুলীতে মারা গেছে। আর জামাইবাবু ২৫শে মার্চের আগেই ঢাকায় গিয়েছিলেন। ফেরেন নি। তার খোঁজখবর জানি না। বোধহয় বেঁচে নেই।
ফোঁপাতে ফোঁপাতে বলল নন্দিনী। এদিকে এদের কান্না ও কথোপকথন শুনে আশপাশের বিভিন্ন কামরা থেকে বেশ কয়েকজন নারী-পুরুষ বেরিয়ে এসেছে। আমি হাতের সিগ্রেট ফেলে দিয়ে কী করব ভেবে না পেয়ে এক পাশে সরে দাঁড়িয়ে রইলাম। জীবনে এমন মিলন দৃশ্য আমি আর দেখি নি। অনুপ বাবু নন্দিনীকে দুহাতে জড়িয়ে ধরে মেয়েদের মত বিলাপ করছেন, মা নেই, অঞ্জি পালিয়ে বেঁচেছে, তুই এই শ্মশানের আগুনে আরও সর্বনাশের খবর নিয়ে কেন এলি হতভাগী?
এসময় আমার পেছনের একটি ঘর থেকে নন্দিনীর বয়েসী একটি মেয়ে এলোচুলে ছুটে বেরিয়ে এদের মধ্যে পড়ল, কে এসেছে দাদা?
মেয়েটির ব্যাকুল প্রশ্নে নন্দিনী ও অনুপবাবু যেন সম্বিৎ ফিরে পেলেন। তিনি নন্দিনীকে বুক থেকে আলগা করে মেয়েটিকে বললেন, চিনতে পারছিস না দীপু, এ আমাদের হাবুল মামার মেয়ে নন্দিনী। পাকিস্তান থেকে পালিয়ে এসেছে। আগে এদের ঘরে নিয়ে যা। আমি একটু জল ঢেলে এক্ষুণি আসছি।
মেয়েটি এগিয়ে এসে নন্দিনীর হাত ধরে বলল, এসো। আমি দীপালি। খুব ছোটো বেলায় তুমি একবার এ বাড়িতে হাবুল মামার সাথে এসেছিলে। আমি আর অঞ্জ তোমাকে নিয়ে সারা কলকাতায় কত ঘুরে বেড়িয়েছিলাম। মনে নেই?
খুব মনে আছে দীপুদি। পিসিমা কবে মারা গেলেন?
গত ফেব্রুয়ারিতে। ক্যানসার হয়েছিল।
জবাব দিল দীপালি। আমার দিকে মুখ ফিরিয়ে বলল, ইনি বুঝি তোমাকে নিয়ে এসেছেন?
হ্যাঁ দীপুদি। ইনি আমার বন্ধু। বিখ্যাত কবি, হাদী মীর। এর সাথেই আমরা ভৈরবের কাছে নারায়ণপুর বাজার থেকে রওনা দিই। পথে সীমাদির গায়ে গুলী লেগে মারা গেলে আমি এর বোনের আশ্রয়ে আগরতলায় এসে উঠি। এর ভগ্নিপতি বাংলাদেশ সরকারের বড় কর্মকর্তা। এখন পর্যন্ত এদের সাথে পার্ক স্ট্রীটের একটা হোটেলে এসে উঠেছি। বলল নন্দিনী।
দীপালি আমার দিকে ফিরে বলল, আসুন ভেতরে।
আমি ও নন্দিনী দীপালির পেছন পেছন এদের ঘরে এসে ঢুকলাম। দু কামরার একটা পুরানো বাসা। সামনের ঘরে একটা খাটের পাশে ছোট্ট টেবিল পাতা। একটিমাত্র চেয়ার পাশে। নোংরা দেয়াল। নোনাধরা সুরকির প্লাস্টার খসে পড়ছে। খাটের মাথার দিকে দেয়ালে রাধাকৃষ্ণের যুগল বাঁধানো ছবি। ছবির গায়ে শুকনো মালা। ধুলোবালি মাখা ধূসর কড়িবর্গাঅলা ছাদ। ছাদ থেকে নেমে আসা একটা লোহার রডে নিস্তব্ধ আদিম বৈদ্যুতিক পাখা ঝুলছে। খাটের ওপর ময়লা রং ওঠা বেড কভারে ঢাকা বিছানা। বোঝা যায় একটা দীনহীন পরিবেশে প্রবেশ করেছি।
আমি চেয়ারটায় এসে বসলাম। দীপালি এখনও নন্দিনীর হাত ধরে আছে। আমি আগ বাড়িয়ে বললাম, আপনি একে ভেতরে নিয়ে গিয়ে কথা বলুন। আমরা অত্যন্ত দুর্দশার মধ্য থেকে দেশ ছেড়ে এসেছি। ওর হয়ত আপনাদের মতো আপনজনদের কাছে অনেক কিছু বলার আছে।
