বলেই আসাদ তার স্বভাব সুলভ কলরবময় হাসিতে ফেটে পড়লেন। আমার মুখে আর কথা সরছে না। হামিদা কলকাতায়? হামিদা সামরিক ট্রেনিং প্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা? হানাদার বাহিনীকে আঘাত হানতে দেশের ভেতর যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে?
কিছুই যেন আমার মাথায় ঢুকছে না। আমি একবার মাত্র আড় চোখে নন্দিনীকে দেখলাম। সে মাথা নত করে নখ খুঁটছে।
এবার নন্দিনীর দিকে চোখ পড়তেই আসাদ প্রশ্ন করলেন, ইনি আপনার বোন মিসেস ইমাম?
আমার জবাব দেবার আগেই নন্দিনী বলল, না, আমি কবির বান্ধবী। আমার নাম নন্দিনী ভট্টাচার্য। ভৈরববাজার থেকে এসেছি। আমি ইমাম পরিবারের আশ্রয়ে। আপনি তো কবির ভগ্নিপতিকে ভালো করেই চেনেন মনে হচ্ছে?
আসাদ বলল, হাঁ, এদের সবাইকে চিনি। আমার দিকে ফিরে বললেন, একটা দেশাত্ববোধক কবিতা স্টকে আছে নাকি? দিন, কালই প্রচার করব।
আমি বললাম, না এখনও কবিতার মতো কোনোকিছু বানিয়ে ফেলার ফুরসৎ পাই নি। একটু সময় দিতে হবে।
অফুরন্ত সময়। মনস্থির করে একটা বুক কাঁপানো কবিতা লিখে ফেলুন।
আসাদের কথায় আমি হাসলাম, দেখা যাক।
বেলাল আমার স্ত্রীকে চিনতেন না। সম্ভবত তিনি ধরে নিয়েছিলেন আমার সঙ্গিনী আমার স্ত্রীই হবেন। এখন আমার স্ত্রী ট্রেনিং প্রাপ্ত মুক্তিযোদ্বা জানতে পেরে এবং আমার সাথে এখনও তার যোগাযোগ ঘটে নি বুঝতে পেরে বিহ্বল হয়ে তাকিয়ে রইলেন।
আমি বললাম, আজ তাহলে উঠি বেলাল।
একটু বসলে গাফফার ভাই আর গুণের সাথে দেখা হয়ে যেত।
এদের সাথে আগামীকাল দেখা করব। বলবেন আমি এদের খুঁজে গেলাম।
বলে নন্দিনীকে উঠবার ইঙ্গিত করে আমি বেলাল ও আসাদের দিকে হাত বাড়িয়ে দিলাম।
.
গলিটা পার হয়ে আমরা বড় রাস্তায় পা দেয়া মাত্র নন্দিনী মুখ খুলল, কবি আমার মনে হয় বৌদির খোঁজ নেওয়ার আগেই আমার একটা ব্যবস্থা হওয়া উচিত।
আমি বললাম, আমি এখনও ঠিক ব্যাপারটা বুঝতে পারছি না। আমাকে একটু চিন্তা করতে দাও নন্দিনী। যা শুনলাম তাতে মনে হচ্ছে তোমার বৌদি ঠিক পানিতে পড়ে হাবুডুবু খাচ্ছেন না। তার ব্যবস্থা তিনি করে নিয়েছেন।
নন্দিনী বলল, তিনি বীর নারী। দেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে যোগ দিয়েছেন। এটাই স্বাভাবিক। আমরাই বরং হাবুডুবু খাচ্ছি। আর আমি তো আগেই বলেছি, তোমার বৌ ফিরে এলে আমি আমার পথ দেখব। এখন চল ভবানীপুরের দিকে একটু ঘুরে আসি। যদিও জানি সেখানে গিয়ে তেমন কোনো ফল হবে না।
সেখানে যাওয়ার আগে একবার হোটেলে গিয়ে একটু চিন্তাভাবনা করে দেখলে ভাল হয় না? এতক্ষণে ইমাম নিশ্চয়ই বাসায় ফিরেছে। বিকেলে না হয় ভবানীপুর যাওয়া যাবে।
না। তার আগেই আমরা একবার ভবানীপুর যাব। তুমি যে বলেছিলে দিদির মৃত্যুর খবরটা একবার অন্তত আমার পিসীমাকে দেয়া উচিত। এখন মনে হচ্ছে সেটাই ঠিক।
দৃঢ়তার সাথেই নন্দিনী আমার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে ট্যাক্সির জন্য এদিক সেদিক তাকাতে লাগল। আমি বললাম, আরেকটু এগিয়ে গেলে ট্রাম স্ট্যান্ডের মোড়ে ট্যাক্সি পাওয়া যাবে।
নন্দিনী আমার কথামত হাঁটতে লাগল। আমার কেন যেন মনে হল নন্দিনী যন্ত্রের মতো শুধু পা ফেলে যাচ্ছে। তার মধ্যে কোনো অনুভূতি নেই। আমি হাত বাড়িয়ে নন্দিনীর একটা হাত ধরলাম, নন্দিনী?
হঠাৎ নন্দিনী ফুটপাতে দাঁড়িয়ে পড়ল, ছেলেমানুষি করার জায়গা বুঝি এটা? দেখছ না পথচলা মানুষ আমাদের দেখছে।
আমি তার হাত ছেড়ে দিয়ে পথের দুপাশে তাকালাম। পথযাত্রীরা সংখ্যা কম হলেও, চলতে চলতে এরি মধ্যে দুচারজন আমাদের দেখছে।
আমি বললাম, নন্দিনী আমি তোমাকে ভালবাসি।
মাঝপথে আমি বুঝি তোমার ভালবাসার প্রমাণ চাইছি?
তা কেন।
এখন চল ভবানীপুর যাই।
ভবানীপুর গেলেই কী তুমি বাড়ি খুঁজে বের করতে পারবে?
মনে হয় পারব। একটা স্কুলের পাশ দিয়ে গলিটা ঢুকছে। গলির ভেতরে ১১৭ নম্বর বাড়ি। বাড়ির ভেতর অনেক ভাড়াটের সাথে আমার বিধবা পিসিমা তার এক বেকার ছেলে ও দুটি স্কুলে পড়ুয়া মেয়ে নিয়ে থাকতেন। বহু বছর আগের কথা। আমার বোন দুটি ছিল আমারই বয়েসী, নাম অঞ্জলি আর দীপালি। আমার দাদা যাকে আমি বহুদিন আগে একজন গ্রাজুয়েট বেকার দেখে গিয়েছিলাম তার নাম অনুপ মুখোপাধ্যায়। আর পিসিমার নাম রাধারাণী দেবী। আশা করি এখনও সেখানেই থাকলে এরা আমাকে চিনতে পারবেন। তবে এমন আশা করি না, এরা আমাকে আত্মীয় হিসেবে আশ্রয় দিতে চাইবেন।
বলল নন্দিনী।
আমি আর কথা না বাড়িয়ে নন্দিনীর পাশাপাশি ট্যাক্সির উদ্দেশ্যে চলতে লাগলাম। ট্রাম স্ট্যান্ডের মোড়ে এসে সহজেই ট্যাক্সি পাওয়া গেল। আমরা গাড়িতে উঠে ভবানীপুর যেতে বললাম।
ট্যাক্সি ভবানীপুর ঢুকতেই নন্দিনী বলল, ঐতো স্কুলটা, এর পাশের গলিতে ঢুকতে হবে।
আমি ট্যাক্সি ড্রাইভারের উদ্দেশ্যে বললাম, হিয়াই রোক যাইয়ে।
ড্রাইভার গাড়ি রাখলে আমরা ভাড়া মিটিয়ে নেমে গেলাম। গলিতে ঢুকে কেন জানি একটা অযথা ভয় ও বুকের ভেতর ধুকধুকানি অনুভব করছিলাম।
নন্দিনী বলল, চিনতে পারছি, এটাই সেই গলি। একটু সামনে গিয়ে ডানদিকের বাড়িটা।
আমি বললাম, আমার বুক কাঁপছে নন্দিনী। আমি বাড়ির বাইরে থাকব। তুমি ভেতরে যেও। তোমার আত্মীয়রা এখনও এখানে থাকলে পরিস্থিতি বুঝে আমাকে ডেকে নিও।
