এজন্য কী এক খিলি পানও বিক্রি করবে না?
না করবে না। এদের ক্ষোভ কতটা গভীর তা তোমাকে সহানুভূতির সাথে বুঝতে হবে নন্দিনী। এদেরকেও পাকিস্তানে আমরা বাঙালি হিন্দু-মুসলমান কী অবস্থায় আছি তা বুঝিয়ে দিতে হবে। এরা ভাবতেই পারছে না ভারতীয় কূটনীতি ও সামরিক সহায়তায় পূর্ব পাকিস্তানের মুসলিম জনগণ স্বাধীনতার যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে পারে।
এ অবস্থায় আমরা কী সফল হব?
আমি নির্দ্বিধায় জবাব দিলাম, নিশ্চয়ই হব। দশ কোটি মানুষ যদি পাকিস্তান বা হিন্দুস্তানের পতাকার নিচে থাকতে না চায়, সামরিক দমন পীড়ন, গ্রামের পর গ্রাম জ্বালানো, অসহায় নারীর ওপর অকথ্য লাঞ্ছনা চালিয়ে কী কেউ তাদের মুক্তি সংগ্রামকে পরাজিত করতে পারে?
লোকটার ব্যবহারে আমার বুকে ভয় ধরে গেছে কবি। আমার গা কাঁপছে। বাপরে আমাদের প্রতি এখানকার মুসলিমদের এত্তো ঘৃণা? এমন ঘৃণা আর অপছন্দ নিয়ে ইন্ডিয়ার সংখ্যালঘু বিশ পঁচিশ কোটি মুসলমান বাস করে এদেশে? তাহলে তো ভারতও একদিন ভেঙে টুকরো হয়ে যাবে।
নন্দিনীর এই সহসা সরল উপলদ্ধিতে আমি কোনো বাধা না দিয়ে চুপ করে তার পাশাপাশি হাঁটতে লাগলাম।
বেশ খানিকটা এগিয়ে আমরা পার্ক সার্কাসের শেষ প্রান্তে ট্রাম লাইনের একটু আগে ঝাউবীথির নিচের ফুটপাতে এসে পড়লাম। এসময় আমাদের পাশ দিয়ে একটা খালি ট্যাকসি চলে যেতে দেখে আমি হাত তুললাম। শিখ ট্যাকসি ড্রাইভার খানিকটা পথ এগিয়ে গিয়ে গাড়ি থামিয়ে মুখ বাড়াল, কীধার যানা?
বালু হাক্কাক লেন। জয়বাংলা অফিস।
নন্দিনী বলল।
ট্যাকসিওয়ালা হাতের ইশারায় গাড়িতে উঠতে বলল। আমরা উঠলাম। গাড়িতে ওঠার অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই গাড়িটা বাঁক ঘুরে একটা বাড়ির সামনে এসে দাঁড়াল। ট্যাকসি ড্রাইভার স্টার্ট রেখে আমাদের দিকে না ফিরেই গাড়ির মিটার উল্টে দিয়ে বলল, দশ রুপেয়া।
আমি খাম থেকে একটা একশো টাকা এগিয়ে দিয়ে বললাম, চেঞ্জ দিজিয়ে সর্দারজি। ঔর মেহেরবানী করকে জয় বাংলা অফিস কোন মকানমে জরাসা সমঝা দিজিয়ে।
লোকটা আমার কথায় বেশ খুশি হয়েছে মনে হল। দ্রুত হাতে ভাংতি টাকা ফিরিয়ে দিয়ে বলল, ওতারকে ইসতরা সামনেঅলা মকানমে যাকর পুছিয়ে। এহি আপকা ঠিকানা।
আমরা নেমে সামনের একতলা একটা বাড়ির বারান্দায় এসে দাঁড়ালাম। ভেতরে লোকজনের ভিড়ের মধ্যে চেনা মানুষকে খুঁজতে লাগলাম। নন্দিনী আমার হাত ধরে থাকল। আমাদের দিকে এখানে কেউ এক নজর ফিরেও দেখছে না। আমি সাহস করে একটা টেবিলের চারদিকে ভিড় করে থাকা কয়েকজন মেয়ে পুরুষের গা ঘেঁষে ভেতরে প্রবেশ করেই চট্টগ্রাম রেডিওর এককালের নিয়মিত স্ক্রীপ্ট লেখক, আমার বন্ধু বেলাল মোহাম্মদকে চেয়ারে উপবিষ্ট দেখে সালাম বললাম। বেলাল টেবিলে উবু হয়ে ক্রমাগত কী যেন লিখে যাচ্ছে। আমার আসোলামু আলাইকুম শুনে মুখ তুলেই হেসে শ্লোগান দিল, জয় বাংলা। কী আশ্চর্য আরও একজন কবি এসে গেছে। কবি হাদী মীর।
আমি হেসে বললাম, আরও এক কবি-সাহিত্যিক এখানে আছেন জেনেই এসেছি। আপনি কেমন আছেন বেলাল?
বেলাল আমার প্রশ্নের জবাব না দিয়ে হেসে বলল, এ যুদ্ধে আমরা জিতবই। আপনার মতো নিরীহ কবিও যখন চলে আসতে বাধ্য হয়েছেন তখন বুঝতে হবে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে বুদ্ধিজীবীরাও সামিল হতে আর দ্বিধা করছে না। জয় বাংলা।
আমি বললাম, আসাদ, নির্মলেন্দু এদের সাথে দেখা হলে ভালো হত। কই, এদের তো দেখছি না।
একটু পরেই সবাইকে পাবেন। একটু ধৈর্য ধরুন। বলে বেলাল একটু দূরে সংকুচিত হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা নন্দিনীর দিকে তাকিয়ে বলে উঠল, আপনি সপরিবারেই চলে এসেছেন মনে হচ্ছে? ওকে এখানে এসে বসতে বলুন। ওখানে দাঁড়িয়ে কেন? আপনিও বসুন। এই আপনারা কবি দম্পতিকে একটু বসতে দিন তো।
সামনের কয়েকজন যুবক বেলালের কথায় চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। আমি হাতের ইশারায় নন্দিনীকে ডাকলে সে সসংকোচে পাশে এসে বসল এবং অনভ্যস্ত হাত তুলে বেলাল মোহাম্মদকে সালাম জানাল।
বেলাল বলল, আপনারা কোথায় উঠেছেন?
আমরা উডস্ট্রীটের একটা হোটেলে আছি। সাথে আমার বোন ভগ্নিপতি ও ভাগ্নি আছে। আমার বোন জামাই প্রবাসী সরকারের উচ্চপদের কর্মচারী। তার সাথে আছি বলেই ভালো আছি। আগামীকাল হয়ত হোটেল ছেড়ে অন্যত্র যাব।
যাক, আপনি ভালোই আছেন। তবে এটা জানবেন দেশ ছেড়ে আসা অধিকাংশ শিল্পী সাহিত্যিক সাংবাদিক আপনাদের মতো ভাল আশ্রয়ে নেই। সবাই আমরা সব অবস্থা মেনে নিয়েছি। ঐ যে আপনার বন্ধু আসাদ চৌধুরী এসে গেছেন।
বেলালের কথায় আমি মুখ ফিরিয়ে দেখলাম আসাদ সিঁড়ি বেয়ে এদিকেই আসছে। আমাকে দেখেই দুহাত বাড়িয়ে এগিয়ে এসে কোলাকুলি করল, জয় বাংলা।
আমিও বললাম, জয় বাংলা।
ভাবির সাথে দেখা হয়েছে?
আমি অবাক হয়ে বললাম, ভাবি? হামিদা কী কলকাতায় এসেছে?
আশ্চর্য আপনি এখনও তার খোঁজ পান নি? তিনি তো অনেক আগেই কলকাতা পৌঁছেছেন। শুধু তাই নয়, এর মধ্যে যেসব মুক্তিযোদ্ধারা প্রাথমিক ট্রেনিং শেষ করেছে। তিনিও তাদের একজন। সম্ভবত এখন তার অপারেশনে যাওয়ার প্রস্তুতি চলছে। কাল আট নম্বর থিয়েটার রোডে গিয়ে ভাবির বর্তমান অবস্থানের খোঁজ নিন। মনে রাখবেন এখন আপনার বৌ আর নিরস্ত্র গৃহিণী মাত্র নন। গুলী আর হ্যান্ড গ্রেনেড মারতে জানেন।
