বললাম আমি।
তাহলে চল আমি যাব।
আমি বললাম, একটু দাঁড়াও আমি গোসল সেরে কাপড় পরে নিই। তুমি বরং এই ফাঁকে পারুলের কাছ থেকে আমার জন্য এক জোড়া বেরুবার মতো পোশাক নিয়ে এস।
নন্দিনী আমার কথায় নিঃশব্দে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলে আমি গোসলের জন্য বাথরুমে গিয়ে ঢুকলাম।
গোসল করে ফিরে এসে দেখি আমার বিছানার ওপর একজোড়া ইস্ত্রি করা সাদা পাজামা-পাঞ্জাবি। নন্দিনী পোশাক রেখে সম্ভবত নিজের কামরায় তৈরি হতে গেছে। আমি কাপড়গুলো পরে নিয়ে দরজা বন্ধ করে পারুলদের ঘরের দিকে রওনা হলাম। যাবার সময় নন্দিনীর দরজাটা ভেতর থেকে বন্ধ দেখে কলিং বেল টিপলাম। নন্দিনী দুয়ার খুলে একটু কপাট ফাঁক করে মুখ বাড়াল। আমি বললাম, আমি পারুলের সাথে কথা বলে আসছি।
নন্দিনী বলল, আমাদের বেরুতে টাকা লাগবে না? হাজার খানেক সঙ্গে নেব? আমি বললাম, দাঁড়াও, আমি পারুলের সাথে আগে কথা বলে নিই। সম্ভবত পারুল আমাকে হাত খরচের কিছু টাকা দিতেই ডেকেছে। যদি সেখান থেকেই পাই তবে গচ্ছিত টাকায় এখনই হাত দেয়ার ইচ্ছে নেই। তুমি কী বল?
কী বলব, তোমার মতই আমার মত।
বলে দরজা এঁটে দিল নন্দিনী।
আমি ঘরে ঢোকা মাত্রই পারুল বলল, আসুন ভাই। আপনাদের জামাই তার অফিসের পৌঁছেই এই মাত্র টেলিফোন করেছিল। আমাদের বাসা ঠিক হয়ে গেছে। আমরা কাল পার্ক সার্কাসের একটা বাসায় উঠব। আমাদের জন্য সেখানে তিন তলায় একটা আস্ত ফ্লাট পাওয়া গেছে। ওপরে নিচে যারা আছেন তারা সবাই বাংলাদেশী। সবাই আমাদের অফিসার ও কর্মচারী। পাঁচ কামরার ফ্লাট। আমাদের কোনো অসুবিধাই নাকি হবে না।
আমি বললাম, এখন কী আমরা বেরুব?
পারুল বলল, যান না, একটু ঘুরে আসুন। আর এই খামটা রাখুন। এতে হাজার দুয়েক টাকা আছে।
আমি হাত বাড়িয়ে খামটা নিতে গেলে পারুলের বিছানার শিথানে রাখা একটা মান্ধাতার আমলের কালো টেলিফোন সেট বেজে উঠল। পারুল টেলিফোন তুলে সাড়া দিয়েই বলল, আপনার সাথে কথা বলবে।
আমি টেলিফোনটা ধরেই বললাম, হ্যালো।
কবি ভাই, বাংলাদেশ থেকে আসা সব কবি-সাহিত্যিককে আমি আপনার আগমন বার্তা জানিয়ে দিয়েছি। এরা সবাই পার্ক সার্কাস এলাকার বালু হাক্কাক লেনে আমাদের স্বাধীন বাংলা বেতারের যোগাযোগ কেন্দ্রের সাথে জড়িত। তারা সবাই আপনার জন্য অপেক্ষায় আছে। আপনি এখনই সেখানে চলে যান।
আমি বললাম, সেখানে গেলে এখন কাদের পাবো?
শুনেছি গাফফার চৌধুরী, নির্মলেন্দু গুণ, আসাদ চৌধুরী আরও অনেকে সেখানে আসা-যাওয়া করেন। আপনি গেলে কাউকে না কাউকে তো সেখানে পেয়ে যাবেন। আমি আমাদের দফতরে আপনার জন্য একটা চাকুরির চেষ্টা করছি। আশা করছি নন্দিনীদিরও একটা ব্যবস্থা হয়ে যাবে।
খুব আত্মবিশ্বাস আর আনন্দের সাথে ইমামের কথা উপচে পড়ছে। আমি কী বলে যে ইমামকে ধন্যবাদ দেব বুঝতে পারছিলাম না। শুধু কাঁপা গলায় বললাম, আমি আর নন্দিনী এখুনি পার্ক সার্কাস রওনা হচ্ছি। আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ।
আমি টেলিফোন রেখে পারুলকে বললাম, আমরা এখুনি বেরুচ্ছি। আমাদের ঘরের দিকে একটু লক্ষ্য রাখিস।
আমরা রাস্তায় বেরিয়েই একটা পানের দোকানের সামনে দাঁড়ালাম। আমি কালেভদ্রে পান খাই। দাঁড়ালাম, কারণ বালু হাক্কাক লেনটা কোথায় তা খুঁজে বের করা দরকার। পান কেনার অছিলায় গলিটির দিশা পাওয়া যাবে ভেবে আমি দোকানিকে দুটো পান দিতে বললাম।
দোকানি মুখ তুলে আমাকে এক নজর দেখে নিয়ে জিজ্ঞেস করল, জর্দা?
আমি বললাম, একটায় একছিটে জর্দা আর খয়ের।
নন্দিনীর দিকে ফিরে জিজ্ঞেস করলাম, তোমারও জর্দা লাগবে?
দিক না একটু জর্দা।
রাস্তায় বেরুতে পেরে নন্দিনীও মনে হচ্ছে খানিকটা বেপরোয়া, একটু হেসে জবাব দিল নন্দিনী। আমি পানঅলার দিকে তাকালাম। ষাট-পঁয়ষট্টি বছরের বৃদ্ধ। কাঁচাপাকা চাপ দাঁড়ি। মাথায় টুপী। নিবিষ্ট দক্ষতায় কাটা পানপাতার ওপর খয়ের ঘষছে। এই সুযোগে আমি জিজ্ঞেস করলাম, বালু হাক্কাক লেনটা কোন্ দিকে?
সেখানে কার বাড়ি যাবেন?
চমকে প্রশ্ন করল লোকটা।
আপনারা পূর্ব পাকিস্তান থেকে এসেছেন?
আমি ও নন্দিনী একসাথে জবাব দিলাম, হ্যাঁ।
আমাদের জবাব শুনে লোকটা এক অদ্ভুত কাণ্ড করে বসল। সে হাতের পান পাতা দুটো ছুঁড়ে সামনের বালতিতে ফেলে দিল।
আমি অবাক হয়ে প্রশ্ন করলাম, কী ব্যাপার?
সামনের দোকান থেকে পান নিন। আমি আপনাদের কাছে পান বেচব না। আপনারা পাকিস্তান ভেঙে দেয়ার জন্য হিন্দুস্তানে গাদ্দারি করতে এসেছেন। আমরা হিন্দুস্তানি মুসলমানরা আপনাদের ঘৃণা করি। যান আগে বাড়েন।
মুখে চরম বিরক্তি ফুটিয়ে বৃদ্ধটি আমাদের পথ দেখিয়ে দিল। আমি হতবাক হয়ে লোকটার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলাম। নন্দিনী কিন্তু সহজে দমল না। বলল, তুমিই গাদ্দার। পাকিস্তানের দালাল। জানো এই ব্যবহারের জন্য আমরা তোমাকে পুলিশে ধরিয়ে দিতে পারি?
লোকটা ক্রুদ্ধ দৃষ্টিতে নন্দিনীর দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত আপত্তিকর ভাষায় বলে উঠল, খুব দেখেছি। রোজ দেখি। কথা বাড়াবেন না মেম সাব। এখান থেকে এক্ষুনি চলে যান। জানেন না এটা পার্ক সার্কাস। যান আগে বাড়েন।
নন্দিনী পানওয়ালাটার মুখের ওপর কী একটা জবাব দিতে যাচ্ছিল। আমি তাকে ঠেলে সামনের দিকে চালিয়ে সরে এলাম, কি দরকার কথা বাড়িয়ে? এরা এখানকার বঞ্চিত মুসলিম। পাকিস্তান ছিল এদের স্বপ্ন। যারা এই স্বপ্ন ভাঙতে উদ্যত তাদের এরা মানবে কেন?
