ইমামের কথা শেষ হওয়া মাত্রই পারুল উঠে গিয়ে নন্দিনীর হাত ধরে বলল, আমিও খুব লজ্জিত। আমাকে ক্ষমা করে দিন বোন। আমি ঠিক বুঝতে পারি নি কী অবস্থা থেকে কবি ভাই ও আপনি এসেছেন। আমি শুধু অবস্থার একটা দিকই বিবেচনা করেছি। অন্য দিকটা দেখতে পাই নি। আপনারা আমার ওপর রাগ করে আমায় ছেড়ে যাবেন না।
পারুলের কথায় নন্দিনী গলে গেল। বলল, না, আর যাব না।
পারুল খুশি হয়ে আমাদের পেয়ালায় চা ঢেলে দিতে এগিয়ে এল।
চা খাওয়ার পর আমি ওপরে এসে দেখি মিতু মুখ ভার করে আমার কামরায় বসে আছে। আমি জিজ্ঞেস করলাম, কিরে মন খারাপ করে আছিস কেন?
মামা নন্দিনী ফুপু কী সব বলল, আম্মা কী ফুপুকে চলে যেতে বলেছে?
মহা উৎকণ্ঠা নিয়ে মিতু আমাকে প্রশ্ন করল। আমি তাড়াতাড়ি বললাম, না না ওসব কিছু নয়। জানিস তো তোর নন্দিনী ফুপুর এক বোন আসার সময় পথে পাক বাহিনীর গুলীতে শহীদ হয়েছে। ওর কী মাথার ঠিক আছে? তার ওপর গত রাত তুইও তোর মার সাথে শুতে গেলি। বেচারা একা একা দুঃস্বপ্নেরও ভয়ে ঘুমোতে না পেরে কাঠ হয়ে আমার ঘরে এসে মাটিতে বিছানা পেতে শুয়েছে।
নিজের অজান্তেই কিশোরী মেয়েটিকে আমি যেন কৈফিয়ত দিলাম। যদিও জানি এই মিথ্যা মেশানো সত্যে মিতুর কিছুই আসে যায় না এবং এ কৈফিয়ত না দিলেও চলত।
কেন আমাকে ডাকলেই হত।
এত রাতে তোদের জাগাতে গেলে সারা হোটেলের মানুষজন জেগে উঠত।
নন্দিনী ফুপুর আপনজন আর কেউ নেই?
হয়ত আছে। কিন্তু একটু থিতু হওয়া না গেলে তো ও আর ওর আপনজনদের তালাশ করতে পারবে না।
থাকুন না আমাদের সাথে। মামা আপনি কী আমাদের রেখে অন্য বাসায় চলে যাবেন?
আমি মিতুর কথার কোনো জবাব খুঁজে না পেলে হাসলাম, আমি আর কোথাও যাব না। এখানে কী আমার কেউ আছে?
মামিকে খুঁজে পেতে নিয়ে আসুন না মামা। মামি এলে কী নন্দিনী ফুপু রাগ করবেন?
তা কেন করবেন? তোর মামির তো সন্ধানই পাওয়া যাচ্ছে না। তিনি নিশ্চয়ই বাংলাদেশে কোথাও নিরাপদেই আছেন। তোর মামি তো আর অশিক্ষিত গাঁয়ের মেয়ে নয়, ঢাকার মেয়ে। নিজেকে বাঁচিয়ে চলতে পারবে।
আমি মিতুর সব কৌতূহল এক সাথে মেটানোর একটা দায়িত্ববোধ থেকে জবাব দিলাম।
মিতু হঠাৎ বলে বসল, আচ্ছা মামা, মুক্তি বাহিনীকে সাহায্য করতে আপনি আব্বা আপনারা যুদ্ধে যাবেন না?
এবার মিতু কিশোরী সুলভ ঔৎসুক্যে এমন এক প্রশ্ন করল যা সহজেই আঁতে ঘা লাগার মত। আমি তাড়াতাড়ি বললাম, আমরা তো যুদ্ধ করব বলেই এসেছি। যারা অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে নানা জায়গায় হানাদার বাহিনীকে ঠেকাচ্ছে আমরা তো তাদের সাহায্য করতেই দেশ ছেড়ে ভারতে চলে এসেছি। আমরা এখানে থেকে লিখে সারা বিশ্বের মানুষের মনযোগ আকর্ষণ করে এই যুদ্ধের রসদ ও অস্ত্রশস্ত্র যোগাড় করব।
আমার কথা শেষ হবার মুহূর্তেই নন্দিনী এসে ঘরে ঢুকল। পেছন থেকে পারুল বলল, মামা-ভাগ্নি কাদের জন্য অস্ত্র আর রসদের যোগান দিচ্ছেন?
আমি হাসলাম। মিতু বলল, আমরাও যুদ্ধ করব। মামা লিখবে আর আমি গেয়ে মানুষকে জাগাব, একটি ফুলকে বাঁচাব বলে যুদ্ধ করি।
ঠিক আছে, এখন আমাদের ঘরে চল। এরা চা-নাস্তা করে এসেছেন, একটু বিশ্রাম নিতে দাও।
বলল পারুল। আমি জানতে চাইলাম, ইমাম কী এখন থিয়েটার রোডে যাবে?
তাই তো বলল।
আমি কী তার সাথে যাব?
আপনি বরং আপনার লেখক বন্ধুদের সাথে ঘুরে ফিরে দেখা সাক্ষাৎ করে আসুন। বেরুবার আগে একটু আমার ঘরে আসবেন তো ভাই। চল মিতু।
পারুল মিতুকে নিয়ে চলে গেলে নন্দিনী বলল, কোথায় যাবে, আনন্দ বাজার?
কবি বন্ধুদের সাথে যোগাযোগ করতে হলে তা সেখানেই আগে যেতে হবে। কিন্তু তারাশঙ্করের মৃত্যুর সংবাদ দেখে মনে হচ্ছে সেখানে আজ কারো সঙ্গে সাক্ষাৎ হবে না।
সুতারকিন স্ট্রীটে আনন্দবাজার অফিসে যাওয়ার পর খুব ইচ্ছে থাকলেও আমার মন বলছিল আজ সেখানে পরিচিত কাউকে পাওয়া মুস্কিল হবে। তারাশঙ্করের মৃত্যু সংবাদে কলকাতার লেখকগণ স্বস্থানে থাকবে বলে আমার মনে হল না।
নন্দিনী বলল, যদি সেখানে না যাও তবে আমাকেও নিয়ে চল না। একটু ঘুরে ফিরে বেড়িয়ে আসব।
তোমার প্রস্তাবটা মন্দ নয়। বাংলাদেশের কে কোথায় কীভাবে আছেন জানা থাকলে ভাল হত। আমি তো কোনো কিছুই জানি না। বলতে গেলে এ শহরটা আমার কাছে অচেনাই। তবে তুমি যদি চাও ভবানীপুর তোমার পিসির কাছে একবার যেতে পারি। অন্তত সীমাদির মৃত্যুর খবরটা তাদের জানানো উচিত।
তারা আমাকে গ্রহণ করবে না হাদী। সেখানে গেলে তারা যদি তোমাকে যথার্থ আতিথ্য না দেয় তখন আমার খুব খারাপ লাগবে। আমার কথা না হয় ছেড়েই দিলাম।
নন্দিনী মাথা নিচু করে ধীরে সুস্থে কথাগুলো বলল।
আমি বললাম, এর উল্টোওতো ঘটতে পারে। সেখানে না গিয়ে তুমি সব জানলে কী করে? হাজার হলেও তোমার বাপের বোন তোমাকে দেখলে মুখ ফিরিয়ে নেবে এটা আমি ভাবতে পারি না নন্দিনী।
অর্থাৎ তারা গ্রহণ করলে তুমি আমাকে সেখানেই রেখে আসতে চাও?
না, তা চাই না। বরং তারা তোমাকে আত্মীয়ের দাবিতে জোর করে রাখতে চাইলেও আমি তোমাকে ফেলে আসব না।
তাদের না হয় আত্মীয়তার এবং রক্ত সম্পর্কের দাবি আছে। তুমি তাদের কোনো দাবির কথা তুলে আমাকে আনবে?
কেন, গত রাতে যে দাবিতে তুমি আমার বিছানায়, আমার পাশে শুয়ে সারা রাত কেঁদে কাটালে এটা কী কোনো দাবি নয়?
