দরজা ঠেলে ইমাম এসে ঘরে ঢুকল।
কী ব্যাপার দরজা খোলা রেখেই ঘুমোচ্ছেন?
আমি বললাম, কী জানি ভুলে হয়ত দুয়ারটায় ছিটকিনি না লাগিয়েই শুয়ে পড়েছিলাম।
আমার কথায় ইমাম হেসে বলল, একেই বলে কবি।
আমি হেসে দ্রুত বিছানা ছেড়ে নামলাম।
হাত মুখ ধুয়ে নাস্তার জন্যে তৈরি হয়ে আসুন।
আপনার সঙ্গিনী তো অনেক আগেই জেগেছেন। আমাদেরও জাগিয়েছেন।
আমি বললাম, নন্দিনী?
হ্যাঁ। আমাদের ঘরে খবরের কাগজ দেখছেন। আপনাকে এই মুহূর্তে একটা আগাম দুঃসংবাদ দিয়ে রাখি।
আমি বললাম, সে আবার কি?
লেখক তারাশঙ্কর বন্দোপাধ্যায় মারা গেছেন।
ইমাম গম্ভীর গলায় দুঃসংবাদটি শোনাল।
আমি কতক্ষণ হতবাক হয়ে থেকে বললাম, বাংলা ভাষার সত্যই মস্তবড় অনিষ্ট হল।
ইমাম বলল, আপনি টয়লেট থেকে এসে কাগজ দেখুন। আজকের কাগজেই বিস্তারিত বর্ণনা ছাপা হয়েছে। ঢাকায় মুক্তিবাহিনীর ছেলেরা একটা পাওয়ার হাউজ উড়িয়ে দিয়েছে। আর আখাউড়ায় চলছে মুখোমুখি লড়াই। মনে হচ্ছে, একটা পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের পূর্বাভাস পাওয়া যাচ্ছে।
আমি খুশি হয়ে বললাম, আল্লার শোকর আদায় করুন।
আলহামদুলিল্লাহ।
তারাশঙ্করের মৃত্যু সংবাদ সত্ত্বেও ইমামের আনন্দ প্রকাশের কারণ যে আমাদের মুক্তিযোদ্ধাদের সাফল্য তা বুঝতে পারলাম।
আপনি ঘরে যান। আমি এক্ষুণি তৈরি হয়ে আসছি।
আসুন। একবারে নিচে চলে আসবেন। আমরা ডাইনিং হলে আপনার জন্য অপেক্ষা করব।
বলে ইমাম দরজার ভেজিয়ে দিয়ে চলে গেল।
.
আমি নাস্তার টেবিলে কিছুক্ষণের মধ্যেই এসে হাজির হলাম। নন্দিনী পট থেকে ছুরির আগায় মাখন তুলে রুটিতে মাখাতে মাখাতে একবার আমার দিকে চোখ তুলে তাকিয়েই চোখ সরিয়ে নিল। তার মুখ লাজরক্তে রক্তিম। যদিও নন্দিনী স্নান সেরে স্নিগ্ধ হয়ে নতুন শাড়ি পরে এসেছে। তাকে দেখে মনে হচ্ছে বহুদিন পরে একটু পরিপাটি হওয়ার চেষ্টা করছে। আমি টেবিলে যোগ দেওয়া মাত্র সে মাখন মাখানো রটির। স্নাইসগুলো আমার প্লেটে তুলে দিতে লাগল। নন্দিনীর এই পরিবেশনটা পারুল আড়চোখে লক্ষ্য করছে আমি বুঝতে পারলাম। আমি আমার বোনের দিকে মুখ তুলতেই সে একট কায়দা করে হাসল, ভাইয়ের বোধহয় ভাবির চিন্তায় রাতে ভালো ঘুম হয় নি।
আমি পারুলের কথায় হাসলাম, শুধু ভাবি না, নানা দুশ্চিন্তায় রাতে ঘুম আসতে চায় না।
দিদি গতরাতে ভালোই ঘুমিয়েছেন বলে মনে হচ্ছে।
পারুলের কথায় যে একটা শ্লেষের আভাস থাকতে পারে তা ছিল আমার ধারণার বাইরে।
নন্দিনীর হাত সহসা থেমে গেল। ছুরির ডগা থেকে অবশিষ্ট মাখনটুকু আমার প্লেটে রাখা একটা স্লাইসে মুছে নন্দিনী আস্তে করে ছুরিটা তার সামনের প্লেটে রাখল।
পারুল অদ্ভুত এক ধরনের মেয়েলী হাসি হেসে নন্দিনীকে উদ্দেশ্য করে বলল, যাই ভাবেন, দিদিকে কিন্তু কমদামের শাড়িতেও দারুণ লাগে। ঠিক বলি নি দিদি?
নন্দিনী সম্ভবত আর ধৈর্য রাখতে পারল না, ঠিকই বলেছেন। যেটুকু সামনা সামনি দেখছেন তাতে এর চেয়ে ঠিক আর কী বলবেন? তবে যেটুকু আন্দাজ করে কষ্ট পাচ্ছেন সে সন্দেহ আমি এক্ষুণি দূর করে দিচ্ছি। কাল রাত একাকী ঘরে ভয়ে ঘুম হবেনা ভেবে আপনার ভাইকে কাকুতি-মিনতি করে রাজি করিয়ে তার ঘরে তার খাটে গিয়ে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়েছি। বেশ ভালো ঘুম হয়েছে। কোনো দুঃস্বপ্ন দেখি নি। ঘুমে কী আর দুঃস্বপ্ন দেখব? আপনাকে বলা হয় নি, আমি হানাদারদের দ্বারা লাঞ্জিতাদেরই একজন। আপনার ভাই কবি, একজন যুক্তিসংগ্রামীও। এমন মানুষের বিছানার বা পাশটায় ক্ষণকালের জন্যে আশ্রয় পেলেও জীবন সার্থক হয়। আমি এ লোভ ছাড়তে পারছি না। ছেড়ে কোথায় যাব? প্রকৃতপক্ষে আমার যাবার কোনো জায়গা নেই দিদি। একটা যুদ্ধের সময় যে যেখানে পারে আশ্রয় নিয়ে মাটি কামড়ে ধরছে। কোনটা ভারত কোনটা পাকিস্তান এখন আর সেটা ভেবে দেখার সময় পাচ্ছে না। আমি এই মুহূর্তে বেঁচে থাকতে পারছি এটাই আমার যুক্তি। আমি যদি উটকো দখলদার হয়ে থাকি তবে প্রকৃত মালিক এলে আমাকে উচ্ছেদের নোটিশ দিয়ে দেবেন। আমি আপত্তি করব না। এখন থেকে আশা করি সন্দেহের দৃষ্টিতে দেখবেন না। সবই খুলে বললাম। ভেবে দেখুন, আমি ওপরে যাই।
মুহূর্তের মধ্যে কথাগুলো বলে নন্দিনী চেয়ার ছেড়ে দাঁড়াল। আমি কী করব বুঝতে পারছিলাম না। পারুলও নন্দিনীর এ ধরনের কথাবার্তায় অপ্রস্তুত হয়ে একেবারে কাঠ হয়ে ইমামের দিকে তাকিয়ে রইল। ইমাম সহসা দাঁড়িয়ে নন্দিনীকে বলল, আমার স্ত্রীর আচরণে আমি অত্যন্ত লজ্জিত। আপনি দয়া করে একটু বসে আমার কথাগুলো শুনবেন।
নন্দিনী বসল।
আমি আমার চাবিটা মিতুর দিকে এগিয়ে দিয়ে বললাম, যাও তো মা তুমি ওপরে চলে যাও।
মিতু চাবিটা হাতে নিয়ে এক রকম দৌড়েই ওপরে চলে গেল। মিতু ওপরের সিঁড়ির শেষ ধাপে না পৌঁছা পর্যন্ত ইমাম সেদিকে চেয়ে রইল। পরে সহসা নন্দিনীর দিকে ফিরে বলল, আপনার সাহস ও সরলতার আমি তারিফ করি মিস নন্দিনী। আমার স্ত্রী এতক্ষণ আপনাকে যেভাবে ইঙ্গিতপূর্ণ কথাবার্তা বলেছে এর যোগ্য জবাব তার পাওনা ছিল, সে তা পেয়েছে। আর সে এ পর্যন্ত আপনার সাথে যে ব্যবহার আগাগোড়া করে এসেছে তা ভালো হোক মন্দ হোক কবি সাহেবের বোন হিসেবেই করেছে। আমার স্ত্রী হিসেবে নয়। আমি আগরতলাতেই ব্যাপারটা লক্ষ্য করে আসছি। আজ আপনি খোলামেলা কথা বলে আমার ও আমার স্ত্রীর উপকারই করলেন। আপনি একজন মুক্তিযোদ্ধা। আমিও প্রবাসী মুক্তিযোদ্ধাদেরই সরকারের কর্মচারী এবং সে অর্থে মুক্তিযোদ্ধা। আপনাকে সমর্থন ও আশ্রয় দেয়াই আমার মূল কর্তব্য। আমার স্ত্রীর নির্বুদ্ধিতার জন্য আমি অতিশয় লজ্জিত ও দুঃখিত।
