দেখার দরকার হয় নি। টাকার বান্ডিলগুলোর মধ্যে একটা চিঠি আছে। চিঠিতে এটাকা ও বইগুলো বাংলাদেশের দর্শনায় একটা কাস্টম কলোনীর ঠিকানায় এক ছাত্রীর কাছে পৌঁছে দেওয়ার ইঙ্গিত আছে। গোহাটিতে লোকটা সেই কাজ করতে গিয়েই ধরা পড়ে গেছে। কিন্তু ব্যাগটা আমরা নিয়ে এসেছি। চিঠিতে কে এক আলীকে বলা হয়েছে। এ টাকায় অস্ত্র সংগ্রহ করে অপারেশন চালিয়ে যেতে। বান্ডিলে সর্বমোট তিন লক্ষ টাকা আছে-একথা চিঠিতেই আছে। চিঠিতে স্বাক্ষরকারী কে এক দাশগুপ্ত। স্বাক্ষরটা অবশ্য ইংরেজিতে।
আমার হাত ধরে নন্দিনী যেন রূপকথা বলে যাচ্ছে। আমি বললাম, ব্যাগ ও ঘরে নিয়ে রেখেছ কেন এক্ষুণি এখানে নিয়ে এস।
নন্দিনী এবার মুচকি হেসে বলল, ভেবো না। টাকা কেউ নিতে পারবে না। দুয়ারে চাবি দিয়ে এসেছি। এত টাকা নিয়ে ঘুমোতে আমার ভয় করে বলেই আমি দুয়ার লক করে এখানে চলে এসেছি। এখন তুমি চেয়ারে বসে রাত কাটালেও আমি এ ঘর ছেড়ে যাব না।
আমি বললাম, ঠিক আছে। তুমি দুটো বালিশের একটি আমাকে দাও। আর পায়ের নিচের বেডকভারটাও আমাকে দাও। আমি নিচে পেতে শুয়ে পড়ি। এখন আর কিছু ভাবতে পারছি না। কাল সকালে যাহোক ভেবে চিন্তে একটা কিছু করা যাবে। সকালে পারুলরা জাগবার আগেই তোমাকে এ ঘর ছাড়তে হবে। এখন শুয়ে পড়, আর কথা নয়।
আমার কথা শুনে নন্দিনী বালিশে মাথা রেখেই স্তদ্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল। আমি বিব্রত হয়ে বললাম, তুমি রাগ করলে?
নন্দিনী কোনো জবাব না দিয়ে হঠাৎ বিছানায় উঠে বসল। কতক্ষণ মাথা নিচু করে নখ খুটতে লাগল। তারপর হঠাৎ বিছানা ছেড়ে নামতে গিয়ে আমাকে একটু ঠেলে সরিয়ে খাটের নিচে রাখা স্যান্ডেল পরতে পরতে বলল, তুমি শোও। আমি বরং ও ঘরেই গিয়েই শোব।
নন্দিনী যেতে উদ্যত হলে আমি তার শাড়ির আঁচল ধরে ফেললাম, কথা শোনো নন্দিনী।
আমাকে যেতে দাও।
তুমি রাগ করে যাচ্ছ।
তুমি যদি এখন অসভ্যের মতো টানাটানি কর আমি চেঁচিয়ে লোক জড়ো করব।
নন্দিনীর হঠাৎ এমন ক্ষেপে যাওয়াতে আমি ভয় পেয়ে তার আঁচলটা ছেড়ে দিয়ে মিনতি মেশানো গলায় বললাম, ঠিক আছে আমি ছেড়ে দিলাম। অন্তত আমার একটা কথা তো শুনে যাবে?
বল।
নন্দিনী আঁচল তুলে তার একটা বাহু ঢাকল।
আমি তোমাকে সম্মান করি নন্দিনী। তোমার সম্ভ্রম রক্ষা করা কী আমার কর্তব্য নয়?
এ কর্তব্য তো বেশ কিছুদিন পালন করে এসেছ। সম্মান সম্ভ্রম আমার কতটুকু অবশিষ্ট আছে তা তুমি ভাল করেই জান। আমি চাই নিশ্চয়তা। তোমার ভালবাসা, নির্ভরতা। এ নির্ভরতা না পেলে আমি তোমার আর তোমার বোনের বোঝা হয়ে থাকব না। কেন থাকব?
তার জবাবে একটা অবজ্ঞার সুর বেজে ওঠায় আমি কতক্ষণ চুপ করে নন্দিনীর দিকে চেয়ে রইলাম। এ এক সম্পূর্ণ অচেনা নারী। যেন এ কয়দিনের আমাদের রক্তাক্ত পথের অভিযাত্রী সেই অসহায় মেয়েটি নয়।
আমি বললাম, হঠাৎ তুমি অনেক টাকার মালিক হয়ে গেছ নন্দিনী। আমার বোনের বোঝা হয়ে থাকার তোমার আর বোধহয় দরকারই হবে না। আর আমি নিজেই অন্যের বোঝা। তোমার বোঝা বইবার শক্তি কোথায়? তবুও তোমার বোঝা বইবার একটা প্রতিশ্রুতি তুমি কী আমার কাছ থেকে আদায় কর নি?
হ্যাঁ করেছি। তুমি আমাকে ভালবাসার কথা বলেছিলে বলেই আমি তোমাকে আঁকড়ে ধরে বাঁচার স্বপ্ন দেখেছি। আর টাকার কথা তুলছ কেন? টাকাটা তো একটা দৈব ব্যাপার। যদি তুমি আমাকে কোনো ভালবাসার নির্ভরতা না দাও তবে টাকার স্যুটকেসটা তোমার কাছেই রেখে যাব। মালিককে পেলে তাকে ফেরত দিও। না পেলে আমাকে বিপদে রক্ষা করার প্রতিদান ভেবে খরচ করে ফেলো।
বলেই নন্দিনী এগিয়ে গিয়ে দরজার ছিটকিনিটা শব্দ করে খুলে ফেলল। আমি লাফ দিয়ে নন্দিনীর হাত ধরে ফেললাম, আমার কথা শেষ হয় নি নন্দিনী।
ফাঁক হয়ে যাওয়া ছিটকিনিটা তুলে দিয়ে নন্দিনী ফিরে দাঁড়াল, বল, কী বলবে?
আমি তোমাকে ভালবাসি নন্দিনী। তবুও আমি বিবাহিত। আমার স্ত্রী আছে। সে কোথায় কীভাবে আছে তা জানি না এবং খোঁজও নিচ্ছি না। প্রেম, ভালবাসা, কর্তব্যবোধ, অপরাধবোধ এবং ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা আমার বুকের পাঁজর ধরে টানাটানি করছে। এ অবস্থায় আমার মানসিক টেনশনের কথা কী তুমি একটুও বিবেচনা করতে পারো না?
আমার কথার কোনো জবাব না দিয়ে নন্দিনী হাত ছাড়িয়ে নিয়ে আবার আমার বিছানার কাছে এগিয়ে গেল। সেখান থেকে একটা বালিশ ও বেড কভার তুলে নিয়ে। মেঝের ওপর ছড়িয়ে বিছানা পাততে লাগল। আমিও তাড়াতাড়ি গিয়ে হাত ধরে ফেললাম, আমরা দুজন এস একসাথেই থাকব নন্দিনী। আমার দ্বিধাকে মাফ করে দাও।
আমার কথায় একটু নির্ভরতার আশ্বাস পেয়ে নন্দিনী ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। আমি তাকে বুকের কাছে টেনে এনে কপালে চুম্বন করলাম। এবার নন্দিনী বেশ শব্দ করে কাঁদতে শুরু করায় আমি তাকে থামাবার জন্য বললাম, বাইরে দারোয়ানেরা শুনতে পাবে। চলো উপরে গিয়ে শুই।
আমি নন্দিনীকে টেনে দাঁড় করিয়ে দিলে সে সহসা গিয়ে আমার বিছানায় শুয়ে ফোঁপাতে লাগল। আমি দ্রুত হাতে মেঝে থেকে বালিশ ও চাদরটা তুলে নিয়ে বাতি নিভিয়ে দিলাম।
.
সকালে দরজায় করা নাড়ার শব্দে জেগে দেখি বেলা অনেক। নন্দিনী নেই। কব্জি উল্টে ঘড়িতে দেখি বেলা সাড়ে আটটা। দরজার ছিটকিনি খোলা। আমি জিজ্ঞেস করলাম, কে?
