আবার মনে হল আমরা একটা সশস্ত্র লড়াইয়ে লিপ্ত। এ অবস্থায় ভবিষ্যৎ চিন্তা প্রকৃত মুক্তিযোদ্বার কোনো কাজে লাগে না। প্রবলের সংহার-যজ্ঞে নিরুপায়ের সহায় হল অন্য শত্রুর সহানুভূতি জাগিযে তুলতে পারা। আগামীকাল সকালেই আমাকে যেতে হবে। সেইসব সংবাদপত্রের অফিসে যেখানে আমার পরিচিত লেখক ও কবিরা আছেন। যেখানে আমার পরিচয় দিলে একেবারে অবহেলায় উড়িয়ে দেওয়া হয়ত সম্ভব হবে না। অন্তত লিখেটিখে সামান্য রোজগারের একটা ব্যবস্থা করে নিতে হবে। আনন্দ বাজারে শক্তি ও সুনীল আছেন। মধ্য পাশে আমি যখন এদের সম্পাদিত কৃত্তিবাস বা অন্যান্য লিটল ম্যাগাজিনে লেখা শুরু করি, এদের সাথে নিয়মিত চিঠিপত্র আদানপ্রদান হত। এরা নিশ্চয়ই হাদী মীরকে ভুলে যায় নি। আর আমি তো একেবারে নিঃসহায় হয়ে এখানে আসিনি। আমার বোন ও ভগ্নিপতির আশ্রয়ে আমি মোটামুটি ভালই থাকব। কিন্তু এরা কেন নন্দিনীসহ আমাকে আশ্রয় দেবে? আর দিলেই আমি কোনমুখে একটি বাড়তি মানুষকে এদের ওপর চাপিয়ে নিশ্চিন্তে কাল কাটাতে পারি?
চাঁদটা এখন তার আধখানা শরীর নিয়ে ঝাউবীথির ওপর স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ঘোলাটে জ্যোছনায় এখান থেকেই রাস্তাটা বেশ পরিস্কার দেখতে পাচ্ছি। লোক চলাচল না থাকলেও দুএকটা প্রাইভেট গাড়ি নিঃশব্দে চলাফেরা করছে। আমি বাতি নিভিয়ে বিছানায় এসে বসলাম। বেশ কিছুনি পরে একটা কামরায় একা ঘুমোবার সুযোগ পেয়েছি। আমি প্যান্টশার্ট খুলে ইমামের দেওয়া একটা লুঙ্গি পরে শুয়ে পড়লাম। যদিও আজই বাজার থেকে আমার জন্য কাপড়-জামা এবং লুঙ্গি ইত্যাদি কেনা হয়েছে, সেসব রয়েছে ইমামের ঘরে। অন্যান্য কাপড়ের সাথে প্যাকেট করা। কাল একটা নতুন জামা পরে রাস্তায় বেরুনো যাবে।
নন্দিনী নিশ্চয়ই এখন মিতুর সাথে ঘুমোচ্ছে। দুশ্চিন্তায় ও ক্লান্তিতে এমনিতেই বেচারীর যা অবস্থা তার ওপর অন্যের বোঝা হয়ে থাকার সংকোচও সে ছাড়াতে পারছে না। নন্দিনী নিশ্চয়ই তার পিসিকে খুঁজে বের করবে। আমিও তাকে সাহায্য করব। নন্দিনী কী তার স্বজনদের পেলে এই কদিনের দুঃখের কথা মনে রাখবে? মনে রাখবে আমি তার সাথে ছিলাম?
এসময় দরজার ওপর কলিং বেলের একটা ছোট্ট আওয়াজ হল। উঠে কপাট একটু ফাঁক করতেই দেখি নন্দিনী।
ঘুমাও নি?
এখনও শুই নি।
ভেতরে এসো। আমি দরজার একপাশে সরে গেলাম।
মিতু জেগে নেই?
মিতু আমার ঘরে আসেই নি। তার মা তাকে তাদের সাথেই থাকবে বলে খাওয়ার টেবিলেই আমাকে বলে ছিল।
তাহলে এরা আমাদের দুজনের জন্য দুটো ঘরই ছেড়ে দিয়েছে।
একটু বিব্রত গলায় বললাম আমি।
আমার কিন্তু লজ্জা করছে। এ অবস্থায় আমাদের অন্যত্র ব্যবস্থা করা উচিত। বলল নন্দিনী।
আমি বললাম, তুমি কী তোমার পিসির কথা ভাবছ?
না। পিসির বাড়ি খুঁজে বের করতে পারলেও পিসি আমার আসার সব কথা জানলে আমাকে আশ্রয় দেবে না। সমাজ, বিশেষ করে আমাদের সমাজে আমার কোনো ঠাঁই হবে না। এটা আমি ভালো করেই জানি। আমি অন্য আশ্রয়ের কথা বলছি।
অন্য আশ্রয়?
হ্যাঁ, আমাদের দুজনের জন্য একটা বাসা।
খুব স্পষ্ট গলায় কথা বলছে নন্দিনী।
আমি হেসে বললাম, তুমি পাগল হয়েছ।
পাগলের কী দেখলে?
পাগল না তো কি? কলকাতায় কে আমাদের জন্য বাসা দেবে? আবার আমরা টাকাই বা পাব কোথায়?
টাকা কোনো সমস্যা হবে না। আমরা এখন কয়েক লক্ষ টাকার মালিক। আসল সমস্যা হল কলকাতায় একটা বাসাবাড়ি খুঁজে পাওয়া। তোমার সাথে কাল সকালে আমিও বেরুব।
নন্দিনীর কথায় হতভম্ভ হয়ে আমি অন্ধকারে তার মুখের দিকে চেয়ে থাকলাম।
আমার অবস্থা বুঝে নন্দিনী পেছনের দুয়ারটা ভেজিয়ে দিয়ে বলল, চল বিছানায় বসে তোমাকে সবকথা খুলে বলি। তোমার আপত্তি না থাকলে আমরা বিছানায় শুয়েও আলাপ করতে পারি।
আমি বললাম, তুমি বরং শোও। আমি পাশের চেয়ারটায় বসে শুনছি। আমরা লাখ টাকার মালিক এ কথার মানে কি? তুমি কী ব্যাগটায় কোনো টাকাকড়ি পেয়েছো?
আমার কথার জবাব না দিয়ে নন্দিনী সহসা গিয়ে আমার বিছানায় চিৎ হয়ে শুয়ে পড়ল। জানালার ঘোলাটে চাঁদের আলোয়ই তার রহস্যময় মৃদু হাসি আমি খানিকটা দেখতে পেলাম।
ব্যাগটায় কত টাকা আছে নন্দিনী?
তিন লাখ।
নন্দিনীর কথার চমকে গিয়ে বললাম, বল কী নন্দিনী এত টাকা? সব কী পাকিস্তানী নোট?
সবই ভারতীয় পাঁচশত টাকার নোট। তোমাকে কারেন্সি চেঞ্জ করার কষ্টও পোহাতে হবে না। বাসা চাই। হাদী, আমরা সংসার পাতব। আমরা এদেশেই থাকব। তুমি আমাকে নিয়ে কবিতা লিখবে। আমার দুঃখ ভুলিয়ে দেবে। আমাকে ফেলে কোথাও যাবে না।
এক নিশ্বাসে কথাগুলো বলে আমার হাত টেনে দরে নন্দিনী চকিতে বিছানায় উঠে বসল। অপ্রকৃতিস্থ গলায় অত্যন্ত মিনতি মিশিয়ে বলল, বল, আমাকে ফেলে কোথাও যাবে না?
আমিতো বলেছি নন্দিনী এ লড়াইয়ের সময়, তোমাকে নিঃসঙ্গ ফেলে আমি কোথাও যাবো না।
আমি গভীর আশ্বাস বাণী উচ্চারণের মতো কথাগুলো বললাম। পর মুহূর্তেই জিজ্ঞেস করলাম, ব্যাগটায় কী শুধু তিন লাখ টাকার কারেন্সি নোটই পেলে? ব্যাগটাতো খুব ভারী আর টানটান ছিল?
রাজনৈতিক লিফলেট আর বইয়ে ভর্তি ছিল। নকশালদের লিটারেচার। বলল নন্দিনী। আমি বললাম, টাকাগুলো কী গুণে দেখেছ?
