এইমাত্র এলাম। এরা সব এদের ঘরে গেছে। ভেতরে যাবো?
আমার কথার কোনো জবাব না দিয়ে নন্দিনী দুয়ার থেকে পিছিয়ে গিয়ে আমাকে তাদের কামরায় ঢুকবার পথ ছেড়ে দিল। আমি ভেতরে ঢুকেই জিজ্ঞেস করলাম, আমাদের ব্যাগটা?
আছে। এঘরের খাটের নিচে।
খুলতে পেরেছিলে?
কেন পারব না? তোমার বোনের একটা ঝোলা থেকে বিশাল কাঁচি পেয়ে তালাগুলো খুলেছি।
কি পেলে?
আমি অতি উৎসাহে উৎসুক হয়ে নন্দিনীর মুখের কাছে নুয়ে পড়লাম।
ভয়াবহ কিছু নয়। বই আর কিছু মূল্যবান কাগজপত্র।
হেসে বলল নন্দিনী।
আমি বললাম, আমি তো আগেই বলেছিলাম লোকটা মিথ্যে বলে নি। আসলে কেন যে ওকে গোহাটিতে প্লেনে উঠতে দিল না সিকিউরিটি গার্ডরা আল্লাহ মালুম। চলো পারুলদের নিয়ে ডাইনিং হলে যাই। মার্কেট ঘুরে খিদে পেয়েছে।
নন্দিনী বলল, তুমি যাও, আমি এক্ষুণি আসছি। হাতমুখ একটু পানি ছিটা দিয়ে আসি। তার কথা শেষ হবার আগেই মিতুর আব্বা-আম্মা ও মিতু এসে এ কামরায় ঢুকল। পারুল বলল, আপা একা একা ভয় পান নি তো?
ভয়ের তো কিছু দেখি নি, শুধু শুধু ভয় পাব কেন? আমি বিছানায় শুয়ে আজকের ইংরেজি খবরের কাগজ দেখছিলাম। আপনারা বোধহয় আমার জন্যই একটু তাড়াতাড়ি বাজার শেষ করলেন। আসুন।
নন্দিনীর কথায় পারুল বলল, হ্যাঁ ঠিকই ধরেছেন। আপনাকে একা ফেলে গিয়ে একটু চিন্তিতই ছিলাম। অচেনা হোটেল। আবার না কেউ এসে আপনাকে কিছু জিজ্ঞেস করে। আপনিও তো একেবারেই এ শহরে নতুন। নাকি আগেও এসেছেন?
এক্কেবারেই নতুন না এলেও, কলকাতা শহরের সাহেবপাড়ায় একবারও আসি নি। যদিও ছোটোবেলায় এশহরেই দিদির সাথে দুবার এসেছি। ভবানীপুরে আমার পিসিদের বাসা ছিল। এখন এরা কোথায় থাকেন জানি না। ভবানীপুরের স্মৃতি এখনও খানিকটা মনে আছে। ফ্রক ছেড়ে তখনও শাড়ি ধরি নি।
বলল নন্দিনী।
শাড়ির কথায় পারুল হাতের প্যাকেট দুটো এগিয়ে দিয়ে বলল, এই নিন আপনার শাড়িজোড়া। দুটোই কিন্তু অল্পদামে কেনা।
খুব ভালো হয়েছে।
প্যাকেট না খুলেই ভালো বলছেন? খুলেই দেখুন না।
দেখতে হবে না। আপনার শাড়ি পরাইতো আছে। আপনার রুচি কেমন বুঝতে পারি। দিন রেখে দিচ্ছি, পরে পরব।
পারুলের হাত থেকে শাড়ির প্যাকেট নিয়ে নন্দিনী তার বিছানায় রাখল।
পারুল আমার দিকে ফিরে বলল, কবি ভাই চলুন রাতের খাওয়া নিচে থেকে সেরে আসি। আপনার কাপড় জামার প্যাকেটগুলো আমাদের কামরা থেকে নিয়ে নেবেন।
আমি বললাম, চল খেয়ে আসি।
.
খাওয়ার পর আমি সোজা ওপরে এসে আমার কামরায় বাতি নিভিয়ে শুয়ে পড়লাম। উডস্ট্রীটে গাড়ি চলাচলের আওয়াজ তেমন না থাকলেও অদূরে পার্কস্ট্রীট এলাকা, চৌরঙ্গীর আশপাশ এলাকা এবং রাস্তা থেকে গাড়ির শব্দ পাচ্ছি। বহুদিন পর কলকাতায় এসেছি। আজ নিউ মার্কেটে গিয়ে এল. রহমানের দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে কত কথা মনে পড়ল। মুরুব্বীদের কাছে শুনেছি এ দোকান থেকেই দেশ বিভাগের আগে আমাদের বাড়ির সকলের ঈদের জামা-কাপড় কেনা হত। দোকানটা নাকি ছিল আমার এক দাদার। দেশ বিভাগের পর হাতবদল হয়ে যায়।
যখনই কলকাতায় আসি নিউ মার্কেটে কেনাকাটার দরকার হলে আমি এল. রহমানে আসি। একবার নিজের পরিচয় দেওয়াতে এক মাড়ওয়াড়ি ভদ্রলোক খুব খাতির যত্ন করেছিলেন। বলেছিলেন, হামার ক্যায়সা খুব নসীব, আপ আব্দুল ওহাব মীরকা ওয়ালিদ, চায়ে পিজিয়ে।
সেবার কাপড়ের দাম অর্ধেক কমিয়ে রেখেছিল। আজ অবশ্য ঐসব লোককে দেখি নি। তবে আজও কাপড়চোপড় কেনার ব্যাপারে আমরা খাতির পেলাম। খাতিরটা জয়বাংলার লোক বলে।
ঘুম পাচ্ছিল না। বিছানা থেকে উঠে একটা সিগ্রেট ধরিয়ে পশ্চিম দিকের জানালার পর্দা সরিয়ে দিলাম। বাইরে দেখা যায় উডস্ট্রীটের সাথে অন্য একটা ছোটো রাস্তার সংযোগস্থল। কারো বাড়ির বাঁধানো চত্বরে দাঁড়িয়ে থাকা ঝাউগাছের ওপর ভাঙা চাঁদ। আমি জানালার কাঁচের পাল্লা দুটো না খুলেই রাতের কলকাতার একটা দৃশ্য দেখছি। আর মনে মনে ভাবছি হ্যান্ডব্যাগটা নিয়ে নন্দিনীর মানসিক উদ্বেগটা এখন নিশ্চয়ই হালকা হয়েছে। নন্দিনী কী এখন ঘুমিয়ে পড়েছে? কলকাতায় আসার পর নন্দিনীর মানসিক বল অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে তা আমি উপলদ্ধি করছিলাম। আজি অবশ্য তার মুখে একটা নতুন কথাও শুনলাম! কথাটা, এর আগেও নন্দিনীরা তাদের কৈশোরে আমার মতই কলকাতায় এসেছে। এ শহর তার কাছেও একেবারেই অপরিচিত শহর নয়। তাছাড়া এ শহরে নন্দিনীর পিসি বা ফুপুর মতো নিকটাত্মীয়রাও বাস করেন। নন্দিনী কী তার আত্মীয়স্বজনদের খোঁজ করবে না? কেন করবে না? নিশ্চয়ই করবে। শুধু আমি ও আমি যাদের সঙ্গে এসেছি অর্থাৎ আমার বোনের পরিবারই এখানে শিকড়হীন। আপন বলতে এখানে আমাদের কেউ নেই। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে আমার কর্তব্য হল পাকিস্তানী ঔপনিবেশিকতার বিরুদ্ধে আপ্রাণ লড়াই করা। আর লেখক হিসেবে আমার যুদ্ধের ধরনটা একটু আলাদা হবেই। এখন আমিও সর্বাত্মক হিংস্রতাকেই জীবনের মূলমন্ত্র হিসেবে গ্রহণ করতে দ্বিধান্বিত নই। কিন্তু দেশত্যাগ করে এ আমি কোথায় এসেছি? আমার মনে কেন কবিতার একটি স্ফুলিঙ্গও জ্বলছে না? ভারতের সহায়তায় বাংলাদেশের স্বাধীনতা কী শেষ পর্যন্ত অর্জিত হবে? নাকি আমরা তপ্ত কড়াই থেকে প্রজ্বলিত অগ্নিকুন্ডে ঝাঁপ দিয়ে পড়েছি?
