অনেকদিন আগে দুতিন বার এসেছি বৈকি।
হগ সাহেবের মার্কেট দেখেছেন?
তাও দেখেছি।
ঢাকার নিউ মার্কেটের চেয়েও সুন্দর?
সুন্দর কিনা জানি না তবে অনেক বড়, অনেক দোকানপাট।
আমার কথায় কিশোরীসুলভ আনন্দে মিতু এক রকম নেচে উঠল, একটু পরেই যাচ্ছি।
আমরা এসে পারুলদের কামরায় ঢুকলাম। মিতুর আনন্দের হাসিমুখ দেখে পারুল বলল, কী ব্যাপার, মামাভাগ্নির মনে হচ্ছে কলকাতায় এসে খুশির সীমা নেই।
আমি বললাম, মিতু মা সাথে থাকলে মনে হয় কলকাতায় আমাদের খুব একটা খারাপ যাবে না।
ওতো এখনও ঢাকাতেই আছে।
পারুল গম্ভীর হয়ে একবার মিতুর দিকে মুহূর্তমাত্র তাকাল। মিতু ততক্ষণে চুপসে গেছে। আমি বললাম, ওকে আর আমাদের দুঃখে, যুদ্ধের কথায় কিংবা পরিণাম চিন্তায় হাসিটা ভুলিয়ে দিয়ে লাভ কী? থাকুক ও খুশিবাসি।
না ভাই, মেয়ে আমার যত ছোটোই হোক, আমরা যে পরিস্থিতিতে নিজেদের দেশ ও ঘরবাড়ি ছেলে এলাম সে ব্যাপারে তার সচেতন থাকতে হবে।
আমি বললাম, এটা জরুরি হতে পারে পারুল, তবে বাংলাদেশের রাজনৈতিক উত্থান এবং আমাদের মুক্তি যুদ্ধের প্রতিজ্ঞা ইত্যাদি বোঝার মতো বয়েস মিতুর এখনও হয় নি। ওকে খুশি থাকতে দাও।
আমার কথা ফুরোবার আগেই নন্দিনী এসে দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকল।
ইমাম ডাকল, আসুন চা খাবেন। চা খেয়ে চলুন একটু বাজার থেকে ঘুরে আসি। আপনারা তো দুজনই এক কাপড়ে ভারতে ঢুকেছেন। আপনাদের জন্যে এখন ঢাকার মতো নিউ মার্কেট থেকে সস্তা কয়েকটা কাপড় কিনব।
আমার জন্যে দুটোর বেশি শাড়ি লাগবে না। কম দামের ছাপার কাপড় হলেই চলবে।
জবাব দিল নন্দিনী।
পারুল বলল, আপনার জন্য এত চিন্তা করছি না। আপনার পরার মতো সায়া, ব্লাউজ, শাড়ি ইত্যাদি আমার সুটকেসে যথেষ্ট আছে। অসুবিধা হচ্ছে কবি ভাইয়ের। মিতুর আব্বার জামা তার গায়ে লাগবে না। কবি ভাইয়ের জন্য কয়েকটা শার্ট প্যান্ট আর লুঙ্গি হলেই আপাতত চলে যাবে।
আমি কোনো আপত্তি না করে সাইড টেবিল থেকে জ্যাম লাগানো একজোড়া বিস্কুট তুলে নিলাম। পারুল চা ঢেলে দিলে নন্দিনী আমাকে ও ইমামকে চায়ের কাপ এগিয়ে দিল। চায়ের কাপ হাতে নিয়ে ইমাম বলল, আপনিও চলুন। দেখে শুনে দরকারি আরও কিছু জিনিষপত্র কেনা যাবে।
নন্দিনী বলল, পারুল দিদি যখন যাচ্ছেন আমার আর যেতে হবে না। তাছাড়া বাজার করার মতো শারীরিক অবস্থা আমার নেই। শরীরটা খুবই দুর্বল। আমি একটু শুয়ে থাকব। আপনারা কিছু মনে করবেন না তো?
এ-কথার ওপর আর কথা চলে না। আমি বুঝলাম নন্দিনী কেন যেতে চাইছে না। একেতো তার শরীরটা এখনও সম্পূর্ণ সেরে ওঠে নি। তার ওপর বাড়তি বোঝার মতো হ্যান্ডব্যাগটা তার মনে চেপে বসেছে। আমি বললাম, ঠিক আছে তোমার যাওয়ার দরকার নেই। তুমি বরং তোমার কামরায় গিয়ে একটু বিশ্রাম নাও। এত মালামাল যখন রয়েছে তখন হোটেলেওতো কারো থাকা দরকার।
আমার কথায় পারুলও সায় দিল। দিদির যখন যেতে ইচ্ছে করছে না তখন উনি বরং এখানেই থাকুন।
পারুলের কথায় আমি চা শেষ করে উঠে দাঁড়ালাম। আমি তা হলে একটু তৈরি হয়ে আসি।
আমি আমার কামরায় এসে ঢাকামাত্র নন্দিনীও আমার পেছনে কামরায় এসে ঢুকল।
আমার যেতে ইচ্ছে করছে না।
আমি জানি।
তোমরা চলে গেলে ব্যাগটা একটু দেখব?
কি করে দেখবে, তালা আছে না?
হোটেলের দারোয়ান ডেকে যাহোক একটা ব্যবস্থা তো করতে হবে। আমি ঠিক পারব।
কৌতূহল আর আত্মবিশ্বাসে ভরা গলা নন্দিনীর। আমি বললাম, যাই করো দারোয়ান টারোয়ানের সামনে ব্যাগটা খুলো না। কে জানে এর মধ্যে কী আছে?
কেন, মানুষের কাটা মাথা বেরিয়ে পড়বে নাকি?
হেসে একথা বললেও আমি বুঝলাম নন্দিনীর ভেতর দারুণ ভয়ের তোলপাড় চলছে। সন্দেহের দোলা থেকে নন্দিনীকে রেহাই দেয়ার জন্য আমি হেসে বললাম, শেষপর্যন্ত দেখো এর ভেতর থেকে পাট ব্যবসায়ের নথিপত্র ছাড়া আর কিছুই বেরুবে না। লোকটাকে আমরা অযথাই মিথ্যেবাদী ভাবছি কেন। লোকটাকে হয়ত অন্য কোনো কারণে সন্দেহবশত গোহাটির পুলিশ আটক করেছে। ছাড়া পেয়ে একদিন এসে তার মূল্যবান কাগজপত্রের ব্যাগটা হয়ত আমাদের কাছে দাবি করবে।
আমাদের পাবে কোথায়?
ঠিকই পেয়ে যাবে। যদি সত্যি এতে কোনো মূল্যবান কিছু থেকে থাকে।
নন্দিনীকে আশ্বস্ত করার জন্য বললাম আমি।
তুমি বলছ ব্যাগটা খোলা আমাদের অনুচিত হবে?
আরে না, তা কেন বলব। মালিকহীন বোঝায় প্রকৃত বিষয় কী আছে অবশ্যই আমাদের পরখ করে দেখতে হবে। বোঝাটা যখন আমরা বইছি তখন অবশ্যই বোঝার ভেতরটা একবার দেখা দরকার। এখন আসল প্রশ্ন হল তালা খুলবে কীভাবে?
আমি ঠিক খুলতে পারব। কেউ যখন থাকবে না তখন আর চিন্তা কি। তোমার বোনের গাট্টি বোচকায় নিশ্চয়ই তালা খোলার মতো জিনিসপত্র আছে। দেখো, ঠিক আমি খুঁজে বের করব।
অদম্য কৌতূহল আর সাহসী গলা নন্দিনীর।
আমি বললাম, আল্লাহ তোমার সহায়ক হোন। আমি তাহলে বাজার থেকে ঘুরে আসি।
০৫. মার্কেট থেকে ফিরে এসে
মার্কেট থেকে ফিরে এসে দেখি সিঁড়িতে ভিড়। ওপর তলার বাসিন্দারা ঠিক সাড়ে আটটায় ডাইনিং হলের দিকে যাচ্ছে। সকলেই বিদেশী এবং সাদা চামড়া। নেটিভ যে দুএকজন নামছেন তারাও অবাঙালি। কেউ কেউ আমাদের নতুন আগন্তুক ভেবে গুড নাইট বলে সৌজন্যও দেখাচ্ছেন। ইমামও সৌজন্য বিনিময় করে আমাদের নিয়ে তাড়াতাড়ি ওপরে ওঠে এল। তেতলায় আমাদের ঘরগুলো। বারান্দায় পৌঁছে দেখি আমাদের ঘরগুলো যথারীতি বন্ধ। বাজার থেকে সদ্য আনা প্যাকেটগুলো সবই পারুল বগলদাবা করে গাড়ি থেকে নামিয়েছে। আমি সাহায্য করতে চাইলে ও না করল। বলল, পারব। আপনি ওপরে যান আমি আপনাদের পেছনেই থাকছি। ইমাম তালা খুলে দিলে পারুল ও মিতুসহ ইমাম তাদের ঘরে ঢুকল। আমি আমার কামরায় ঢুকে দেখি ঘরে বাতি জ্বলছে। আলোর মধ্যে স্যুটকেস ও মালামালগুলোর ওপর চোখ পড়ল। সবি আছে, নেই শুধু সেই হ্যান্ডব্যাগটা। আমি দ্রুত দরজা খোলা রেখেই এলাম। মিতু ও নন্দিনীর ঘরটা ভেতর থেকে বন্ধ। নন্দিনী হয়তো এঘরে ব্যাগটা এনে খোলার জন্য ধস্তাধস্তি করছে। কিন্তু ভেতর থেকে কোনো শব্দ নেই দেখে আমি কলিং বেলটা টিপলাম। দেরি করেই নন্দিনী খুলে দিল, তোমরা এসেছ?
