এত বড় ব্যাগ ওঠাতে গেলে এয়ার হোস্টেসরা আপত্তি করবে। আর তাছাড়া এখন এটা নাড়াচাড়া করতে গেলে সকলের চোখে পড়বে। পায়ের নিচে আছে, ওখানেই থাক।
নন্দিনীর কানে কানে বললাম।
আমার সতর্কতায় নন্দিনী মনে হয় একটু ঘাবড়ে গেল, হা ঈশ্বর, এর মধ্যে বোমা না থাকলেই হল।
নন্দিনীর কথায় আমিও একটু ভয় পেলাম। কিন্তু কথা না বলে জানালার দিকে মুখ ফিরিয়ে আকাশের নীলের ওপর জমে থাকা পুঞ্জিভূত মেঘের বিশ্রাম দেখতে লাগলাম। আমাকে বাইরের দিকে চেয়ে থাকতে দেখে নন্দিনী বলল, নিচে হিমালয়?
না। হিমালয় সম্ভবত আরও উত্তরে। আমরা মনে হয় হিমালয়ের দক্ষিণের সমতলের ওপর দিয়ে যাচ্ছি।
নন্দিনী বেশীক্ষণ বিমানের বাইরে প্রাকৃতিক শোভার দিকে দৃষ্টি রাখতে পারছে না। তার মন হ্যান্ডব্যাগটার ভিতরে কী আছে, এ নিয়ে উসখুস করছে। আমরা কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিস করে বলল, আমার ভীষণ ভয় লাগছে।
লাগারই কথা। অপরিচিত ঐ লোকটার আব্দার না রাখলেই হত।
আমি পারি না।
এখন তো মনে হয় এর চেয়েও কঠিন কাজ পারতে হবে।
কী কঠিন কাজ?
চকিত হয়ে নন্দিনী আমার হাত চেপে ধরল। ঠিক ঐ সময় একজন বিমানবালা একটি ট্রেতে করে জেলি মাখানো বিস্কুট আর কফি নিয়ে আমার পাশে এসে দাঁড়াল, টি অর কফি?
আমরা দুজন এক সাথেই বলে উঠলাম, টি।
মহিলাটি সীটের সাথে সংযুক্ত টেবিল ঠেলে দিয়ে চা ঢেলে দিতে দিতে বলল, আর কোনো অসুবিধা?
সম্ভবত নন্দিনীর চেহারায় একটা ভয় চকিত উৎকণ্ঠার আভাস পেয়ে এই প্রশ্ন। মেয়েটি তবে বাঙালি। আমি বললাম, না কোনো অসুবিধা নেই।
আমার জবাব শুনে ভদ্রমহিলা কিন্তু নিরাশ হল না। বরং গলা বাড়িয়ে আমরা যে ব্যাগটা লুকোতে ব্যস্ত সেটার দিকে তাকাল এবং পর মুহূর্তেই নন্দিনীর পায়ের তলা থেকে ব্যাগটা মুহূর্তের মধ্যে নন্দিনীর দিকে টেনে এনে বলল, ব্যাগটা সামনের ফাঁকা জায়গায় রেখে দিচ্ছি। নামার সময় স্মরণ করে নিয়ে যাবেন।
মহিলা ব্যাগ নিয়ে প্যাসেঞ্জারদের সারিগুলা পেরিয়ে একেবারে সামনের ফাঁকা জায়গায় ডান দিকে রেখে পেছন ফিরে নন্দিনীকে ইশারায় জানিয়ে দিয়ে সামনের পর্দার ভেতরে অদৃশ্য হয়ে গেল।
নন্দিনী বলল, নামার সময় ঐটা এখানেই ফেলে গেলে কী হয়?
আমি বললাম, তোমার প্রস্তাবটা মন্দ নয়।
কিন্তু লোকটা যদি পুলিশের হাত থেকে ছাড়া পেয়ে আমাদের পেয়ে আমাদের খুঁজে বের করে তার গচ্ছিত ব্যাগটা ফেরত চায়?
এ কথার আমার কাছে কোনো জবাব নেই।
এমনও তো হতে পারে ব্যাগের মধ্যে ভদ্রলোকের দরকারি কাগজপত্রই আছে খারাপ কিছু নেই।
আমি হাসলাম, এ নিয়ে আর অস্বস্তির মধ্যে থেকে লাভ নেই নন্দিনী। আমরা ব্যাগটা নিয়েই বরং নেমে যাব। কপালে যা থাক।
দমদমে আমাদের কোনো অসুবিধেই হল না। এখানেও আমাদের জন্যে ভারতীয় সামরিক বাহিনীর একজন অফিসার অপেক্ষা করছিলেন। আমরা সন্দেহজনক ব্যাগটা নিয়েই নামলাম। আমাদের মালপত্র, বাক্স প্যাটরার ওপর কোনো চেকিংই হল না। বরং সবকিছু অতিসাবধানে একটা মাইক্রোবাসে তুলে দেয়া হল। পূর্বের ব্যবস্থা মতো আমরা এসে উডস্ট্রীটের একটা হোটেলে উঠলাম। খুব বড় হোটেল না হলেও আধুনিক সমস্ত আরাম আয়েসের ব্যবস্থা আছে। মোট তিনটি কামরা আমরা পেলাম। মিতু ও নন্দিনীর জন্য একটি দুই সীটের কামরা, পারুলরাও দুজন দুসীটের একটি কামরা নিল। আর আমার জন্য পেলাম সিঙ্গেল সীটের একটি ছোট কামরা। ইমাম দম্পত্তির সমস্ত লটবহর আমার কামরায় রাখা হল।
হোটেলে ওঠার সময় ইমাম আমাকে জানিয়েছিল, এখানে আমাদের এক সপ্তাহ থাকতে হতে পারে। এর মধ্যেই বাংলাদেশের এ্যাকজাইল গভর্ণমেন্টের ব্যবস্থায় আমরা অন্যত্র উঠে যাব।
সন্ধ্যায় আমি যখন আমার কামরায় বিশ্রাম নিচ্ছিলাম, দেখলাম অন্যান্য মালামালের সাথে হ্যান্ড ব্যাগটাও এঘরেই আছে। ব্যাগটার দুপ্রান্তে দুটো ছোট চাইনিজ তালা। কৌতূহল আমাকে আর খাটে শুয়ে থাকতে দিল না। আমি উঠে ভারী ব্যাগটাকে বিশাল বিশাল বাক্স প্যাটরার স্তূপ থেকে টেনে বের করে আমার বিছানার ওপর রাখলাম। তালাগুলোতে হাত বুলিয়ে বুঝলাম তেমন মজবুত না হলেও মুচড়ে খোলা যাবে না। তালা দুটো আদৌ খোলা উচিত হবে কিনা, আমি যখন এসব ভাবছিলাম তখন মিতু এসে দরজায় বেল টিপল।
মামা, আব্বা-আম্মা চা নিয়ে বসে আছে।
আমি উঠে দরজা খুলে দিলাম।
মিতু হেসে বলল, চায়ের পর নিউমার্কেট।
নিউমার্কেট?
আপনার আর নন্দিনী খালাম্মার জন্য কাপড়জামা কিনতে আব্বা-আম্মা এখনই বাজারে যাবেন। আপনাদের তো আর বাড়তি কাপড়ই নেই। আপনাদের সাথে আমিও যাব।
খুশিতে মিতু হাসতে লাগল। হঠাৎ আমার খাটের ওপর চোখ পড়ায় বলল, ও মামা এই ব্যাগ পেলেন কোথায়?
আমি তাড়াতাড়ি জবাব দিলাম, এটা তোমার নন্দিনী খালার। কোনো রকমে নিয়ে এসেছে। এরও আবার চাবি হারিয়ে গেছে কিনা, খোলা যাচ্ছে না।
ভেঙে ফেলুন না।
না খুলতে পারলে তো ভাঙতেই হবে।
দাঁড়ান আমাদের ব্যাগের চাবিগুলো এনে দিই। মিতু তাদের চাবি আনতে যেতে উদ্যত হলে আমি বললাম, দাঁড়াও মিতু। আগে তো চা নাস্তা খেয়ে নিই পরে না হয় তোমাদের চাবিগুলো নিয়ে খোলার চেষ্টা করব। তোমার আব্বা-আম্মার ঘরে যাই।
মিতুকে আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে আমি আমার কামরার দরজা ভেজিয়ে বাইরে এলাম। মিতু আমাকে হাত ধরে নিয়ে বলল, মামা আপনি কী এর আগেও কলকাতায় এসেছেন?
