যখন ওর পরিবার বেঁচে ছিল তখন ও শুধু কিছু চারা রোপন আর আগাছা পরিস্কার ছাড়া আর কিছুই করেনি। কিন্তু এখন ও উর্বর মাটি কিনে এনে বাগানে ফেলল, নিত্য নতুন গাছ লাগাতে লাগল।
একটা পুরো বছর সেইকি দেয়ালের পাশে গর্ত করে গাছ লাগালো। ওর অফিসের কাজের বাইরের পুরো সময় এই কাজে খরচ করল। ওর বয়সি অন্যদের মত কোন কিছুতে ওর কোন আগ্রহ ছিল না।
একসময় দেয়ালের ভেতর বাড়ির চারপাশ দিয়ে গাছ লাগানো হয়ে গেল। এক ইঞ্চি জমিও খালি ছিল না। কেউ যদি দেয়ালের ওপার থেকে উঁকি দেয় তাহলে গাছপালার ভেতর দিয়ে বাড়ি প্রায় চোখেই পড়বে না। পুরো বাগানের খালি একটা অংশে কোন গাছ ছিল না, যে অংশটা সে পোর্চ থেকে দেখতে পেত। দেয়াল থেকে ঐ পুরো অংশটা খালি ছিল। সেখানে সেইকি ফুলের চারা লাগাত, যেগুলোতে সারা বছর ফুল ফুটত।
প্রথমে সেইকির ধারণা ছিল ও শুধু গাছ লাগানোর জন্যই গর্ত খুঁড়ত। কিন্তু পরে ও অনুভব করল গর্তগুলোর উপযুক্ত ব্যবহারের জন্যই আসলে গাছ লাগাত। একসময় ও খালি গর্ত খুঁড়ত আর সেগুলো আবার ভরাট করত। বাগানের গাছগুলো এত কাছাকাছি ঘেঁসে বেড়ে উঠেছিল যে ওগুলো ডালপালা বিস্তারের জায়গা পর্যন্ত ছিল না, নতুন করে গর্ত খুঁড়ে গাছ লাগানো ছিল অসম্ভব। তারপরেও সেইকি গর্ত খুঁড়ে যেতে লাগল কারণ এই একটা কাজই ওকে ওর ফ্যান্টাসি থেকে দূরে সরিয়ে রাখতে সক্ষম ছিল তখন, কাউকে কবর দেয়ার ফ্যান্টাসি থেকে। গর্ত খোঁড়ার সময় সেইকি বাকি সবকিছু ভুলে যেত। কিন্তু সেটা গর্ত খোঁড়ার যন্ত্রপাতি নামিয়ে রাখার আগ পর্যন্তই।
গর্ত খুঁড়ে আবার ভরাট করার ব্যাপারটাও একসময় অর্থহীন আর শূন্য লাগতে লাগল। গর্ত খোঁড়ার সময় ওর মনের ঘোলাটে ভাবটা দূরে সরে যেত ঠিকই কিন্তু কাজ শেষ হওয়া মাত্র সেটা আবার ফিরে আসত। ফিরে আসত আগের চেয়েও শক্তিশালী হয়ে, কিন্তু সেইকি ওর গর্ত খোঁড়াখুঁড়ি চালিয়েই যেত, যে কারনে সে রাতে কৌসুকি আসার পরে একটা গর্ত তৈরিই ছিল।
ওর প্রতিবেশিদের কাছে ওর কর্মকাণ্ড কেন জানি অদ্ভুত কিংবা অস্বাভাবিক লাগেনি। এমনকি ও যখন রাতেও খোঁড়াখুঁড়ি করত, তখনো। ওর সাথে দেখা হলে সবাই প্রথমে মাথা নিচু করে বো করত, তারপর নিজেদের বাগানের জন্য ওর থেকে পরামর্শ নিত। সবাই জানত যে ও বাগান করতে পছন্দ করে, এর মধ্যে অস্বাভাবিক কোন কিছু তারা দেখতে পায়নি। সবাই ওর প্রতি সহানুভূতিশীল ছিল, হাজার হোক বেচারা রোড এক্সিডেন্টে পরিবারের সবাইকে হারিয়েছে, বাগান করার শখটা ছাড়া ওর আর কী বাকি আছে।
একবছর আগে, ওর পরিবারের সবাই মারা যাওয়ার দু-বছর পর, কৌসুকির সাথে ওর খাতির হয়। ছেলেটা সেইকির বাগানে হারিয়ে গিয়েছিল। এরপর তারা বন্ধু হয়ে ওঠে। সেইকি অনেকবার কৌসুকির পরিবারের সাথে পিকনিকে বাইরে গিয়েছে।
কৌসুকির সাথে সম্পর্ক যখন নয়-দশ মাসের মত হলো, সেইকি তখন ওর গ্যারেজে কিছু কাঠ খুঁজে পেল যেগুলো কৌসুকির উচ্চতার মত হবে। সাথে সাথে ওর মাথায় এল যে এগুলো দিয়ে কৌসুকির জন্য চমৎকার একটা কফিন বানানো যেতে পারে।
চিন্তাটা আসার পরেই ও আতঙ্কের সাথে চিন্তাটা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলার চেষ্টা করল। কিন্তু পরদিন থেকে সে কফিনের কাজ শুরু করল। কাজ করতে করতে নিজের বোকামির জন্য নিজেকে ধমক লাগালো। কফিন বানাচ্ছে ঠিকই কিন্তু কখনো এটা ব্যবহার করা হবে না, নিজেকে সে নিজে বলল। কিন্তু তারপরেও ওর হাতগুলো নিজে থেকে পেরেকে হাতুড়ি ঠুকে গেল কোন রকম চিন্তা ভাবনা ছাড়াই, স্বয়ংক্রিয়ভাবে কাজ করে কাঠগুলো দিয়ে একটা কফিন তৈরি করে ফেলল।
“আমি বাসায় যেতে চাই। আমাকে এখান থেকে বের কর!” কৌসুকি কাঁদছিল। সেইকি ওর ফোঁপানোর শব্দ শুনতে পাচ্ছিল বাঁশের খুঁটির ভেতর থেকে। গর্তের ভেতরটা অন্ধকার। বাচ্চার গলার স্বর এর ভেতর প্রতিধ্বনি তুলছিল, কেমন চাপা শোনাচ্ছিল।
কৌসুকিকে কি বলবে সেইকি বুঝতে পারছিল না। ছেলেটার জন্য ওর অনেক খারাপ লাগছিল। অনেক খারাপ। ছেলেটার প্রতি ওর অনেক মায়া হলেও বলার কিছু ছিল না।
সেইকি একটা হোস পাইপ ধরে আছে। পাইপের আরেক মাথা বাড়ির পাশের একটা কলের সাথে লাগানো।
গ্রীষ্মের গরম বাড়ছিল, চারপাশ থেকে পোকামাকড়ের শব্দ ভেসে আসছিল। সেইকির পিঠ থেকে তাপ সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ছে।
এক ঝলক পানি এসে সেইকির স্যান্ডেলের মুখে পড়ল, কৌসুকির কবর থেকে একটা বাঁশের খুঁটি দিয়ে বেরিয়ে এসে মাটিতে পড়ছে। মর্নিং গ্লোরিগুলোকে ভিজিয়ে মাটিতে ছোটখাট পুকুরের মত সৃষ্টি করেছে। যেই বাঁশের খুঁটিটা নিঃশ্বাস চলাচলের জন্য ছিল সেটা থেকে পানি বের হচ্ছিল। আরেকটা খুঁটিতে হোস পাইপটা ঢুকানো ছিল। সেখানে সেইকির চোখ পড়তেই হঠাৎ খেয়াল হলো ও কি অঘটন ঘটিয়ে ফেলেছে। যদিও পুরো ব্যাপারটা অন্যমনস্কভাবে ঘটিয়েছে তা বলা যাবে না।
ও সজ্ঞানেই কলের চাবি খুলে হোস পাইপ দিয়ে পানি ঢুকতে দিয়েছে, মাটির নিচে চাপা দেয়া বাক্সটা পানি দিয়ে ভরিয়ে দিয়েছে। পুরোটা সময় ওর মনে হচ্ছিল যেন কোন স্বপ্ন দেখছে। যে সজ্ঞান অন্য কাউকে বাঁধা দিত তা ওর ক্ষেত্রে তখন কাজ করছিল না।
কফিনটা ভরে আর কোথাও যাওয়ার জায়গা না পেয়ে অন্য বাঁশের খুঁটিটা দিয়ে বেরিয়ে এসেছে। খুঁটি থেকে ফোয়ারার মত ছিটকে পড়া পানি সূর্যের আলো পরে চকচক করে উঠল। সেইকির কাছে দৃশ্যটা অসাধারণ সুন্দর মনে হলো। সেই সাথে যুক্ত হয়েছিল পোকামাকড়ের গান আর এক্সারসাইজ করে ফেরা ছেলেমেয়ের দলের কোলাহল। তারা এবার অন্যদিক থেকে আসছিল। ওর দেয়ালকে পাশ কাটিয়ে যাচ্ছে। কৌসুকির কাছ থেকে আর কোন সাড়া-শব্দ শোনা যাচ্ছে না। আর মর্নিং গ্লোরিগুলো মলিন হয়ে কুঁচকে যেতে শুরু করেছে।
