কৌসুকি প্রায় সবসমই সেইকি যেরকম বলে সেরকমই করার চেষ্টা করে। তাছাড়া সে ওর বাবার ক্রোধ নিয়ে ভীত ছিল, সুতরাং কোন সন্দেহ না করেই বাক্সের ভেতর ঢুকে গেল।
সেইকি বাক্সের ঢাকনা বসিয়ে পেরেক মেরে আটকে দিল। কফিনে বাতাস চলাচলের জন্য দুটো ফুটো ছিল। একটা কৌসুকির মাথার কাছে আরেকটা পায়ের কাছে। যে কারনে ঢাকনা লাগিয়ে দিলেও ছেলেটা নিঃশ্বাস নিতে পারছিল।
কৌসুকির কফিন রুমে রেখে ও বাইরে বাগানে গেল। পোর্চের বিপরীতে দেয়ালের সামনে একটা গর্ত খোঁড়া ছিল। কৌসুকির কফিনটাকে মাটি চাপা দেয়ার জন্য ওকে শুধু গর্তটা একটু বড় করতে হবে।
গর্ত করা হলে সে রুমে ফিরে গিয়ে কফিনটা বয়ে নিয়ে এল। কৌসুকিকে বলল সে ওকে এমন এক জায়গায় লুকিয়ে রাখছে যেখানে ওর বাবা কখনো খুঁজে পাবে না। কফিনটাকে পোর্চ থেকে বাগানে নিয়ে যেতে ঘাম ছুটে গেলেও কাজটা হলো। আস্তে করে সেইকি কফিনটাকে গর্তে নামিয়ে দিল।
ফাঁপা বাঁশের খুঁটিগুলোকে সে কফিনের গর্তে ঢুকিয়ে দিল। তারপর মাটি ঢেলে কৌসুকিকে পুরোপুরি কবর দিয়ে দিল।
খালি জায়গার মধ্যে দুটো বাঁশ দাঁড়িয়ে আছে দেখতে অদ্ভুত আর সন্দেহজনক লাগতে পারে ভেবে সেইকি অন্য জায়গা থেকে কয়েকটা মর্নিং গ্লোরির চারা তুলে এনে ওখানে লাগালো। মর্নিং গ্লোরিগুলো সাবধানে খুঁটির সাথে পেঁচিয়ে দিল যেন দেখে মনে হয় বাঁশগুলো ঐ চারাগুলোর জন্যই ওখানে পোঁতা হয়েছে।
“কী বলছ এসব? আমি বাসায় যেতে চাই!” বাঁশের খুঁটি কেঁদে উঠল।
বেচারী কৌসকি, জীবন্ত কবর দেয়া হয়েছে ওকে, সেইকি ভাবল। বাঁশের খুঁটির চারপাশে মাটি দিয়ে শক্ত করে দিল যেন সোজা হয়ে থাকে।
ওর সমস্যাটা কি? এই বাচ্চা ছেলেটাকে তো ও ভালবাসত। ও একবার দেখেছিল কৌসুকি একটা গাড়ির নিচে প্রায় চাপা পড়তে যাচ্ছিল। ছেলেটা একটা বলের পেছনে দৌড়াচ্ছিল, গাড়িটাকে আসতে দেখেনি। গাড়িটা শেষ মুহূর্তে ব্রেক কষায় ও হাঁফ ছেড়ে বেঁচেছিল। উত্তেজনায় ওর পা কাঁপছিল তখন। আর এখন সেই ছেলেকে ও কিভাবে জ্যান্ত কবর দিতে পারল?
সেইকি এই বাড়িতেই বড় হয়েছে। প্রথমে ওর বাবা-মা আর দাদি এ বাড়িতে বাস করত। বেশিরভাগ সময়ই ওর বাবা-মা কাজের জন্য বাইরে থাকত, যে কারনে ওর পুরো সময় কাটত ওর দাদির সাথে। অন্য ছেলেমেয়েরা যখন বাস্কেটবল খেলা নিয়ে ব্যস্ত কিংবা মডেল বানাচ্ছে, সেখানে সেইকি দাদির সাথে বাগান করায় ব্যস্ত থাকত। টবগুলো কালো মাটি দিয়ে ভরাট করা, তার ভেতরে ফুলের বীজ বপন করা। সেইকির ক্লাসমেটরা এই নিয়ে প্রায়ই হাসাহাসি করত, ওকে মেয়ে বলে ক্ষ্যাপাত। সেইকি ছিল দূর্বল, শুকনো ধরনের। অপরিচিত লোকজন ওকে দেখে মেয়ে ভেবে ভুল করত। অবশ্যই সেটা ওর গায়ে লাগত। কিন্তু যখন ও ওর দাদির সাথে থাকত, ফুলগাছে পানি দিত, তিনি সবসময় ওকে লক্ষ্মী ছেলে বলতেন। কখনো মন খারাপ হলে ও ওর দাদির বলা কথাগুলো মনে করত, আর নিজের কাছে প্রতিজ্ঞা করত যে ওকে অবশ্যই একটা সুন্দর জীবন যাপন করতে হবে, দাদির সম্মান ধরে রাখতে হবে। কিন্তু এরপর কোনভাবে কিছু বুঝে ওঠার আগেই কাউকে জ্যান্ত কবর দেয়ার ফ্যান্টাসি ওকে দখল করে নিতে সক্ষম হয়েছে।
বাগানে পানি দিতে ওর ভালো লাগত, উজ্জ্বল পরিস্কার দিনগুলোতে এক হাতে হোস পাইপ নিয়ে আরেক হাতের আঙুল মুখে ঢুকিয়ে বাগানে পানি দিত। হাতের চাপে পানি ছিটকে যেত বহুদুর। গাছের উপর গিয়ে পড়া পানি সূর্যের আলোয় চিকচিক করত। সেটা যখন ওর চোখে পড়ত কিংবা যখন ওর দাদি হাসতেন, তখন ওর অনেক আনন্দ হতো, মনে হত যেন চারপাশের আলোর উজ্জলতা আরো বেড়ে গিয়েছে।
আবার একই সাথে, ওর ভেতরে কোথাও একটা অন্ধকার জায়গা লুকিয়ে ছিল, যেখানে সেই আলো পৌঁছাতে পারত না। ওর দাদিকে বাক্সে ভরে মাটিতে কবর দেয়ার চিন্তা ওর মাথায় আসত। প্রতিবার চিন্তাটা মাথায় আসতেই ও আতঙ্কে কেঁপে উঠত।
কিভাবে এরকম জঘন্য কোন কিছু ও চিন্তা করতে পারল? এমন সময়ও ছিল যখন ও ওর দাদির দিকে তাকাতেও পারত না। মনে হত তিনি হয়তো ওর চিন্তা ধরে ফেলবেন।
এমন কি হতে পারে যে ওর ভেতরে কোথাও কোন গভীর ক্ষত লুকিয়ে ছিল যা ওকে এরকম বানিয়েছে? সেরকম কিছু ও চিন্তা করে পেল না, কিংবা থাকলেও হয়তো ভুলে গিয়েছে। কিংবা-যেটা ওর সবচেয়ে বড় ভয় হচ্ছে ভাবতে-হয়তো ও জন্ম থেকেই এরকম।
বড় হওয়ার কয়েকবছর পর সেইকির বাবা-মা আর দাদি রোড এক্সিডেন্টে মারা যায়। ও তখন অফিসে ছিল।
এর আগ পর্যন্ত ওর বাসাকে ঘিরেই ওর পরিবার ছিল, তাদের সাথে ওর যোগাযোগ সবসময় ওকে সমাজে ওর অবস্থানের কথা মনে করিয়ে দিত। কিন্তু এক্সিডেন্টের পর পুরো বাড়িতে ও একা হয়ে পড়ল, ওর ফ্যান্টাসি আটকিয়ে রাখার মত কোন কিছুই আর অবশিষ্ট ছিল না। প্রতিদিন সে কাজে যেত, কাজ থেকে বাসায় ফিরত; বাসায় কথা বলার কেউ ছিল না, একই জিনিস নিয়ে ও বার বার চিন্তা করত, সেই ছোট বেলা থেকে যে জিনিসগুলো ওর মাথায় ঢুকে আছে। ও সেগুলো ঝেড়ে ফেলার চেষ্টাও করেছে, নিজেকে বোঝানোর চেষ্টা করেছে এসব ক্ষমার অতীত। তারপর নিজেকে ব্যস্ত রাখার জন্য বাগানের পেছনে বেশি বেশি সময় দিতে শুরু করেছে।
