***
কিছু বুঝে ওঠার আগেই তিন বছর পার হয়ে গেল।
ওকে গ্রেফতার করার জন্য কোন পুলিশ আসেনি। কৌসুকির বাবা-মা এই বাড়ি ছেড়ে অন্য কোথাও চলে গেল। যাওয়ার সময় তাদেরকে অনেক দুঃখি দেখাচ্ছিল। সেইকি ছাড়া আর কেউ তাদেরকে যাওয়ার সময় দেখেনি। কেউ কল্পনাও করেনি কৌসুকিকে সে খুন করেছে, বরং সবাই ভেবেছে ছেলেটার নিখোঁজ সংবাদ ওকে কষ্টে ফেলে দিয়েছে।
সেইকি কোন অভিনয় করেনি, ওর সত্যি সত্যি ছেলেটার জন্য কষ্ট লাগছিল। কিন্তু ও চোখ তুলে সরাসরি ছেলেটার বাবা-মায়ের দিকে তাকাতে সাহস পায়নি। তাদের চোখের অশ্রু ওকে মনে করিয়ে দিচ্ছিল কি ভয়াবহ জঘন্য একটা কাজ সে করেছে।
এই তিন বছর সেইকি সারাক্ষণ আতংকে ছিল যে কেউ একজন বের করে ফেলবে ও কি করেছে। এই পুরো সময় একবারের জন্য সেইকি ওর বাগানের সেই অংশে যায়নি, যেখানে কৌসুকিকে সে জ্যান্ত কবর দিয়েছিল। জায়গাটা এখন আগাছা ঝোপে ঢেকে আছে। কৌসুকিরা যে বাসায় থাকত সে বাসায় এখন নতুন একটা পরিবার এসে উঠেছে।
গ্রীষ্মের শুরুতে, প্রতিবেশি এক গৃহিণী এসে সেইকির বাড়িতে একটা নিউজলেটার দিয়ে গেল। দরজায় দাঁড়িয়ে মহিলাটা এক সিরিয়াল কিলারের কথা জানাল ওকে যে কিনা মেয়েদেরকে শিকার হিসেবে বেছে নিচ্ছে, সব টক শো-গুলোর আলোচনার বিষয়বস্তু এখন এই সিরিয়াল কিলিং। স্বাভাবিকভাবেই কথাবার্তা একসময় কৌসুকিতে গড়াল।
“কৌসুকি নিখোঁজ হওয়ার পর তিন বছর হয়ে গেল…ওর সাথে তো তোমার খুব খাতির ছিল, তুমি নিশ্চয়ই অনেক মিস কর ওকে?”
সেইকির টেনশন হতে লাগল, কৌসুকির হাস্যরত ছোট মুখটার কথা ওর মনে পড়ল। এক রাশ দুঃখ এসে গ্রাস করল ওকে। নিজ হাতে মাটি চাপা দিয়ে ছেলেটাকে ও পানিতে ডুবিয়ে মেরেছে, কিন্তু তারপরেও ওর গোলমেলে মাথা এখনো ব্যাপারটা নিয়ে দুঃখবোধ করতে সক্ষম। কি ভয়াবহ জঘন্য একটা ব্যাপার।
সেইকি দুঃখের সাথে মাথা ঝাঁকাল। কিন্তু এরপর মুখ তুলে মহিলাটির দিকে তাকিয়ে ও অবাক হলো। অদ্ভুত একটা ব্যাপার সে খেয়াল করল। মহিলাটিকে মোটেও দুঃখিত দেখাচ্ছিল না। সে এরই মধ্যে প্রসঙ্গ বদলে ফেলেছে। গরম বাড়ার কারনে পোকামাকড়ের আওয়াজ অনেক বেড়ে গিয়েছে এই নিয়ে সেইকির কাছে অভিযোগ করছিল। পৃথিবী ইতিমধ্যে কৌসুকির মৃত্যুশোক পার করে ফেলেছে।
কিছুদিন পর সেইকি টের পেল সে নতুন করে আবার কাঠ আর পেরেক কিনছে। আরেকটা কফিন তৈরি করার জন্য। কফিনটা ঘরের মধ্যে বসে বানালে কেউ দেখবে না। তক্তাগুলোকে করাত দিয়ে কেটে মাপমত করতে গিয়ে কাঠের সুক্ষ্ম খুঁড়োগুলো তাতামি ফ্লোরের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ল।
গ্রীষ্মকাল বয়ে চলছে। সেইকি টের পাচ্ছে ওর ভেতর শুভ আর অশুভের লড়াই চলছে। শুভ অংশটা চাইছে আবার কোন ভয়াবহ ঘটনা ঘটানোর থেকে ওকে বিরত রাখতে, আর অশুভ অংশটা নতুন শিকার খুঁজছে। কিন্তু ওর ভেতরের এই যুদ্ধ কখনো বাইরে তার চেহারা দেখায়নি। যে কারনে ওর আশেপাশের দুনিয়া ওকে আগের মতই দেখছে। স্বয়ংক্রিয় কোন যন্ত্রের মত ও কোন সমস্যা ছাড়াই দৈনন্দিন কাজগুলো করে যেতে লাগল।
তারপর একদিন, অক্টোবরের শেষের এক শুক্রবারে, সেইকি কাজ থেকে বেরিয়ে গাড়ি বের করতে পার্কিং লটে গেল। তারপর বাসার দিকে ড্রাইভ করতে লাগল। ততক্ষণে সন্ধ্যা নেমে এসেছে। হেডলাইট জ্বালানো গাড়ির সারি পার হতে গিয়ে স্বাভাবিকভাবেই ওর চোখ পড়ল রাস্তার পাশের দিকে। এক মুহূর্ত পর ও উপলদ্ধি করে কেঁপে উঠল যে ওর চোখ আসলে একজন মানুষকে লক্ষ্য করছিল, পরীক্ষা করছিল। রিয়ার ভিউ মিররে রিফ্লেক্সন দেখতে গিয়ে ওর মুখের অভিব্যক্তি সব যেন কোথাও হারিয়ে গেল, মনে হচ্ছিল চোখের কালো অংশগুলো যেন ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র গভীর গর্তে পরিণত হয়েছে।
অফিসে সবাই ওকে চুপচাপ মানুষ হিসেবেই ধরে নিয়েছে। ও বাসা থেকে ফুল নিয়ে যেত অফিসে সাজিয়ে রাখার জন্য, যা কাজ দেয়া হত কোন অভিযোগ ছাড়াই সম্পন্ন করত। সবাই ওকে ভালো মানুষ হিসেবেই জানত, পছন্দ করত, বিশ্বাস করত। তাদের কেউ ঘুণাক্ষরে কল্পনাও করতে পারবে না যে সেইকি একটা বাচ্চা ছেলেকে খুন করেছে।
বাসার কাছাকাছি গিয়ে ও বামে মোড় নিল। এই রাস্তায় ট্রাফিক কম।
আর সেখানে সেইকি মেয়েটাকে দেখল।
রাস্তার পাশ দিয়ে মেয়েটা হেঁটে যাচ্ছে। হেডলাইটের আলোয় সেইকি ওর শরীরের পেছন অংশটা দেখতে পাচ্ছিল। মেয়েটার পরনে কালো রঙের ইউনিফর্ম। লম্বা চুলগুলো কাঁধ বেয়ে নিচ পর্যন্ত নেমে গিয়েছে।
মেয়েটাকে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার সময় সেইকি কোন কিছু না ভেবেই গাড়ির গতি কমিয়ে আনল। মেয়েটার চুল যেন ওর চোখগুলোকে জ্বালিয়ে দিচ্ছিল। মনে হচ্ছিল ওকে আহবান জানাচ্ছে।
সেইকি উইন্ডসিল্ড দিয়ে উপরে তাকিয়ে দেখল রাতের আকাশে পূর্ণ চাঁদ ঝুলে আছে। কোথাও কোন মেঘের ছিটে ফোঁটাও নেই। পুরো এলাকা চাঁদের আলোয় মলিনভাবে আলোকিত হয়ে আছে। জায়গাটা একটা আবাসিক এলাকা, এলাকার সামনেই একটা পার্ক। আশেপাশের গাছগুলো ইতিমধ্যেই তাদের অর্ধেক পাতা হারিয়েছে।
সেইকি সামনের চৌরাস্তায় গিয়ে ডানে মোড় ঘুরে গাড়ি থামাল। হেডলাইট নিভিয়ে মিররের দিকে তাকিয়ে থাকল। মেয়েটার আসার জন্য অপেক্ষা করছে।
