এক বিন্দু অশ্রু ওর গাল বেয়ে নেমে ইউনিফর্মের উপর পড়ল।
ওকে সেখানে একা রেখে ক্লাসরুমের দরজা নিঃশব্দে বন্ধ করে বেরিয়ে গেলাম আমি।
৫. সমাধি
সমাধি
১
কৌসুকি ডাকছিল সেইকিকে। বাচ্চা ছেলেটা সবসময়ই নিষ্পাপ আর হাসিখুশি ধরনের। কিন্তু আজকে ওর গলা বিষণ্ণ শোনাল। কৌসুকি হলো পাশের বাসার ছোট ছেলেটা, যে কিনা সবেমাত্র কিন্ডারগার্টেনে ঢুকেছে।
“কি হয়েছে?”
সেইকি ওর বাগানে ছিল, মর্নিং গ্লোরির চারাতে নিড়ানি দিচ্ছিল। গ্রীষ্মের সময়, ভোরবেলা। বাগানের ভেতর হালকা একটা কুয়াশার মত ভেসে বেড়াচ্ছে, যে কারনে সবকিছু চকচক করছে। গ্রপ এক্সারসাইজের জন্য ছেলেমেয়েরা দল বেঁধে ওর বাগানের পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে। দেয়ালের কারনে সেইকি ওদের দেখতে পাচ্ছে না। দেয়ালটা ওর বুক পর্যন্ত উঁচু। কিন্তু ওদের পায়ের শব্দ আর হৈচৈ ওর কানে আসছে।
“আব্বু কি এখনো রেগে আছে?” কৌসুকি গত রাতে সেইকির বাসায় এসে হাজির হয়েছিল। কাঁদছিল ছেলেটা। এরপর আর বাসায় ফিরে যায়নি।
সেইকি যখন ওকে জিজ্ঞেস করল কি হয়েছে, কৌসুকি কাঁদতে কাঁদতে বলল ওর বাবার পুরস্কার জেতা একটা অ্যান্টিক ওর ধাক্কা লেগে ভেঙে গেল। কৌসুকিকে হাজারবার সাবধান করা হয়েছে যেন কোন অ্যান্টিকে হাত না দেয়, কিন্তু ও নিজের কৌতূহল দমিয়ে রাখতে পারেনি।
“না, আমার মনে হয় না সে আর তোমার উপর রেগে আছে।”
সেইকি ছেলেটাকে বলল কিভাবে ওর বাবা-মা গতরাতে ওকে খুঁজতে এসেছিল। সেইকি ওর দরজায় তাদের সাথে দেখা করে। তারা জানতে চায় সে কৌসুকিকে দেখেছে কিনা। ওদেরকে অনেক দুশ্চিন্তাগ্রস্ত দেখাচ্ছিল। সেইকি মাথা নাড়ল, এমন ভান করল যেন কিছু জানে না। তারপর সেইকিকে খুঁজতে ওদেরকে সাহায্য করল।
“সত্যি রেগে নেই তো?”
“সত্যি।”
সেইকির সামনে মাটিতে গেঁথে রাখা বাঁশের খুঁটির সাথে মর্নিং গ্লোরির চারা পেঁচিয়ে ছিল। বাঁশের খুঁটিটা শুকিয়ে বাদামি রঙের হয়ে গিয়েছিল।
সেইকি থাকত একটা পুরনো বাড়িতে। বাড়ির সাথে একটা বড় বাগান। বাগানটা আশেপাশের সবার বাড়ির চেয়ে বড়। জমিটা দেখতে প্রায় বর্গাকৃতির। বাড়ি আর গ্যারেজটা পুব দিকে। বাকি জমিটা পুরো খালি ছিল। সেইকি খালি জায়গাটা গাছ লাগিয়ে ভর্তি করে ফেলেছে। গ্রীষ্মে মাঝে মাঝে, যেমন আজকে, মাটি পাতা দিয়ে ঢেকে রাখা আছে।
বাগান করতে সেইকির সবসময়ই ভালো লাগে। ছোট থেকেই ভালো লাগত। বাগানের পুরো দেয়াল সে মর্নিং গ্লোরি লাগিয়ে ঢেকে ফেলেছে।
সেদিন আকাশ ছিল পরিস্কার। মেঘশূন্য আকাশে বরাবরের মত সূর্য উঠল। দেয়াল আর গাছগুলোর ভেতর দিয়ে পিছলে ঢুকে গেছে সূর্যালোক। বাঁশের খুঁটিগুলো আর মর্নিং গ্লোরি মাটিতে লম্বা ছায়া ফেলেছে।
ও শুনতে পাচ্ছিল কৌসুকি কাঁদছে।
আগের রাতে কৌসুকি যখন ওর দরজায় এসে নক করে সেইকিকে অনুরোধ করল ওকে কোথাও লুকিয়ে রাখতে। সেইকি ওকে বাসার ভেতর ঢুকতে দিয়ে আশেপাশে তাকিয়ে দেখল কেউ দেখছে কিনা।
“তুমি নিশ্চিত কাউকে বলনি যে এখানে এসেছ?” সেইকি আবার জিজ্ঞেস করল। ছেলেটা চোখ মুছতে মুছতে মাথা ঝাঁকাল। একটা বাচ্চা ছেলের কথায় কতখানি ভরসা করা যায়? অবশ্য ব্যাপারটা নিয়ে এখন আর কোন চিন্তা করার কোন মানে হয় না বলে সেইকির কাছে মনে হলো।
আগে যখন ও কৌসুকির সাথে ঝিঁঝি পোকা ধরত কিংবা ওকে কার্ড বোর্ড বক্স নিয়ে খেলতে দেখত, তখন সেইকির মাথায় একটা চিন্তা উঁকি দিতে শুরু করেছিল। একটা ফ্যান্টাসি যেটাকে প্রশ্রয় দেয়া সম্ভব নয়। এরকম ভয়াবহ কিছু চিন্তা করার জন্য সে নিজেকে ধিক্কার দিয়েছিল। কিন্তু গতকাল তার মাথা ঘোলাটে হয়ে গিয়েছিল, ঠিক মত কাজ করছিল না…
“তোমার কি মনে হয় আমার ক্ষমা চাওয়া উচিত?”
ওর জন্য বুকের ভেতর কষ্ট হতে লাগল সেইকির। সে একাই বাস করে। অনেক আগেই মারা গেছে ওর পরিবারের সবাই, তাই ও কৌসুকিকে সবসময় নিজের ছোট ভাইয়ের মতই দেখত। কৌসুকির পরিবার যখন বাইরে কোথাও গিয়েছে তখন সে ওর জন্য বেবিসিট করেছে। দু-জনে একসাথে ঘোরাঘুরি করেছে। সেইকি নিশ্চিত ছিল যে ও কৌসুকিকে ওর বাবা-মায়ের মতই ভালোবাসত। তাহলে কেন সে এরকম কিছু করতে গেল? এখন অবশ্য ফিরে আসার আর কোন উপায় নেই।
“তুমি আর বাসায় ফিরে যেতে পারবে না, কৌ,” বলতে গিয়ে সেইকির গলা কাঁপছিল। ওর বাগানের মর্নিং গ্লোরিগুলো একটা বাঁশের খুঁটি জড়িয়ে বেড়ে উঠেছে। দুটো বাঁশের খুঁটি অন্য খুঁটিগুলোর চেয়ে খানিকটা লম্বা।
কৌসুকির গলাও কাঁপছে। সে নিশ্চয়ই বুঝতে পেরেছে কিছু একটা সমস্যা হয়েছে। বাসায় ফিরতে পারব না কেন?”
মাটিতে পুঁতে রাখা বাঁশের খুঁটি থেকে ওর গলা ভেসে এল। খুঁটিটার ভেতরটা ফাঁপা। যে কারনে মাটির নিচে পুঁতে রাখা কফিন থেকে শব্দ খুঁটির ভেতর দিয়ে এসে সেইকির কানে পৌঁছাতে পারছে। কৌসুকি জানত না যে ওকে জ্যান্ত কবর দেয়া হয়েছে। কি দুঃখজনক ব্যাপার!
আগেরদিন যখন কৌসুকি ওর বাসায় এল, সেইকি তখন মনস্থির করে ফেলেছিল। সে ছেলেটাকে পেছনের একটা রুমে নিয়ে গিয়ে একটা বাক্স দেখিয়ে বলল, “বাক্সটার মধ্যে গিয়ে লুকিয়ে থাক।” রুমের মাঝামাঝি একটা বাক্স রাখা ছিল। কৌসুকির জন্য যথেষ্ট বড়, সহজেই ওটার ভেতর ঢুকে শুয়ে থাকতে পারবে।
