“অবশেষে এক সময় ওর দেহ নিস্তেজ হয়ে আসে, পা নড়াচড়া থামিয়ে দিল।”
ইয়ু পেছনে যেতে গিয়ে টের পেল মাটি ওর জুতো টেনে ধরেছে। পায়ের ছাপ পড়ল মেঝেতে।
“শুধু আমার একার ওজন হলে হয়তো কোন ছাপ পড়ত না।” ওর বোনের জুতো জোড়া পাশেই মাটিতে রাখা ছিল।
“ওগুলো চোখে পড়তেই আমি ঠিক করলাম সবার কাছে মিথ্যা বলব। আমার সব স্পষ্ট মনে আছে…ছোট ছাউনিটাতে…আমার বোনের মৃতদেহ হালকা দুলছিল, ঘড়ির পেণ্ডুলামের মত।”
ছোট মেয়েটার ছোট মাথাটা দ্রুত চিন্তা করল আর নিজের সামনে একটা রাস্তা দেখতে পেল। নিজের সাদা জুতো খুলে কালো জুতো জোড়া পড়ল। তারপর জায়গা মত রেখে দিল। তারপর শুকনো মাটির উপর দিয়ে হেঁটে কুকুরের গর্ত দিয়ে বেরিয়ে গেল। কালো জুতোর কারনে সবাই ওকে ইয়োরু বলে ধরে নিল। যে কারনে ও নিজেকে ইয়োৰু পরিচয় দিতে লাগল আর ইয়োরুর মত ব্যবহার করতে লাগল।
“আমি আগের মত আর হাসতে পারতাম না। আমার বোনের মত শ্য মুখ করে রাখতে হত আমাকে। আমরা সবসময় একসাথে থাকতাম বলে ও কেমন ছিল তা আমার ভালো মত জানা ছিল। সহজেই ওর মত অভিনয় করতে পারতাম। গত নয় বছরে কেউ সন্দেহ করেনি যে আমি ইয়।”
সে একটা গভীর দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল।
আট বছর বয়সে সে নিজের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া দেখল। জীবনের বেশিরভাগ সময় ওর নিজের আসল নাম ছাড়াই পার হয়ে গেল। কেউ জানতে পারল না ওর ভেতরে কি চলছিল, অনুভূতিগুলো পুঞ্জিভুত হয়ে একসময় ফেটে বেরিয়ে এল। ও নিজের হাত কেটে ফেলল…আর এ সবকিছু ঘটল ওর বোনের কারনে, আর বোনের সাথে চাপা দেয়া ওর নামটার কারনে। বাচ্চা মেয়েটা যে পথ বেছে নিয়েছিল, যার উপর ওর জীবন নির্ভর করছিল, তা ছিল কষ্ট আর একাকিত্বে ভরপুর।
জানালা দিয়ে আসা আলো কমে আসছে, সোনালি দেখাচ্ছে। মলিন হলুদ পর্দাগুলো অর্ধেক টানা থাকায় সূর্যের আলো কমে গিয়েছে। মাঠ থেকে আসা বেজবল প্র্যাকটিসের শব্দ শুনতে পাচ্ছি আমি, বাতাসে প্রতিধ্বনি তুলছে। শূন্য ক্লাসরুমের ঘড়িটা নিরবে টিকটিক করে যাচ্ছে।
একসময় মোরিনো ওর মুখ খুলল, যদিও নিশ্চিত ছিল না কি বলবে। “তোমার কি মনে আছে আমাদের কোথায় আর কিভাবে প্রথম দেখা হয়েছিল?”
আমার বিশ্বাস সেটা এই ক্লাসরুমেই হয়েছিল, হাই স্কুলের সেকেন্ড ইয়ারের শুরুতে। শুনে ও একটু আশাহত হলো মনে হয়।
“হয়নি, জুনিয়র হাই তে থাকতে। তোমাকে মিউজিয়ামে দেখেছিলাম আমি, একটা মানবদেহের টুকরো অংশগুলো আগ্রহ নিয়ে দেখছিলে। তারপরের বসন্তে যখন আমরা হাই স্কুলে উঠলাম তখন তোমাকে দেখলাম লাইব্রেরিতে বসে ময়নাতদন্তের উপর একটা মেডিক্যাল বই পড়ছ। দেখা মাত্র তোমাকে চিনেছিলাম আমি।”
সেকারনেই সে জানত আমি ক্লাসে অভিনয় করছি সবার সাথে। এখন বুঝতে পারলাম। আমরা একজন আরেকজনের লুকিয়ে রাখা রূপ ঠিকই ধরতে পেরেছি, আর কেউ না পারলেও।
“আমার বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে তুমি যখন ইয়ু ছিলে তখন আসলেই হাসতে।”
“আসলেই। একসময় আমি ওরকম ছিলাম। কিন্তু ছাউনি থেকে বেরিয়ে আসার পর ভাবলাম যদি আমি হেসে ফেলি তাহলে লোকজন বুঝে ফেলবে আমি ইয়। নয় বছর আমি চেষ্টা করেছি কোন অভিব্যক্তি প্রকাশ না করতে, আমার বোনে পরিণত হতে। আর এখন আমি হাসতে পারি না, চেষ্টা করলেও পারব না।”
ওকে খানিকটা হতাশ দেখাল। আমার থেকে অন্যদিকে তাকিয়ে সে বলল, “আমি ভেবেছিলাম তুমিই প্রথম আমাকে আমার নাম ধরে ডাকবে।”
আমি উঠে দাঁড়ালাম। “তোমার জন্য আমার কাছে একটা জিনিস আছে, গ্রাম থেকে ফেরার সময় আমি এটা তোমার বাড়ি থেকে সাথে করে নিয়ে এসেছি।”
ডেস্কের উপর রাখা আমার ব্যাগ থেকে জিনিসটা বের করলাম। “কি জিনিস?” না দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করল সে
“যে দড়িটা তুমি খুঁজছিলে। আমার ধারণা এটা নিখুঁতভাবে মিলে যাবে, চোখ বন্ধ কর-আমি পড়িয়ে দিচ্ছি।”
মোরিনো তখনও বসে ছিল, চোখ বন্ধ করল। আমি ওর পেছনে গিয়ে দাঁড়ালাম। ওর ছোট কাঁধগুলো শক্ত হয়ে গেল, টেনশনে।
আমি লাল দড়িটা ওর গলায় পেচালাম। দড়িটা নোংরা হয়ে ছিল। ছাউনির ভেতর ছিল এটা, যেখানে কুকুরটা বাঁধা থাকত।
“আমি এখন এও জানি কেন তুমি এত কুকুর ঘৃণা কর।”
আমি আস্তে করে দড়িটা টাইট করলাম।
চাপ বাড়তে ওর কাঁধ কেঁপে উঠল। এক মুহূর্ত আমি থেমে দাঁড়িয়ে থাকলাম। তারপর গেরোটা দিয়ে ছেড়ে দিলাম। দড়ির বাকি অংশ ওর কাঁধে ঝুলতে থাকল।
“হ্যাঁ…এটাই দরকার ছিল..” সে শ্বাস ছাড়ল। সেই সাথে সমস্ত টেনশন যেন ওর ভেতর থেকে বেরিয়ে গেল। ওর ভেতরটা যেন হালকা হয়ে গেল।
কুকুরের দড়িটা থেকে ইয়োরু মারা গিয়েছিল, মোরিনোর স্মৃতির গভীরে সেই তথ্য কোথাও লুকিয়ে ছিল। সে কখনো বুঝতে পারেনি যেই দড়িটা সে খুঁজছিল তা ওর বোনকে খুন করার জন্য দায়ি ছিল।
“আমি কখনো আমার বোনকে ঘণা করিনি। সে অনেক সময়ই অনেক জঘন্য কাজ করেছে, কিন্তু ওর জায়গা কখনো আর কেউ নিতে পারবে না…”
আমি আমার ব্যাগটা তুলে নিয়ে বাসার উদ্দেশে রওনা দিলাম। ওর সিটের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় একবারের জন্য ঘুরে ওর দিকে তাকালাম। ও ওর চেয়ারে বসেছে। পা সামনে ছড়ানো। হাত দুটো বুকের উপর রাখা। লাল দড়িটা গলা থেকে পিঠের উপর ঝুলছে।
ওর চোখ বন্ধ। ওর গাল সূর্যাস্তের আলোয় ঝলমল করছে, মনে হচ্ছে যেন আলো দিয়ে তৈরি।
