সকালের নাস্তার পর রাজ্জাক স্যার তামাক টানতে টানতে বললেন, এখন আপনের কিছু কথাবার্তা কন।
আমি আমার গবেষণার কথাটি তুললাম। তিনি আমার মুখ থেকে কথা কেড়ে নিয়ে বললেন, আপনে তো লেখালেখি করেন।
আমি বললাম, এ পর্যন্ত আমার চারটি বই বেরিয়েছে।
তিনি বললেন, পরের বার আওনের সময় লইয়া আয়েন। দেখি কী লিখেন।
তার পরের দিনই আমার লেখা চারটি বইয়ের কপি নিয়ে হাজির হলাম। তিনি বললেন, আমি ত এখন বাজারে যাইবার লাগছি। শেলফের একটা কোণা দেখিয়ে বললেন, ওইহানে রাইখ্যা যান। কাইল আবার আয়েন। একটু দেরি কইরা আইবেন। বাজার থেইক্যা আওনের পর অইলে ভালা। কিছুক্ষণ কথাবার্তা কওন যাইব।
তার পরদিন গিয়ে দেখি সবে তিনি বাজার থেকে ফিরে এসেছেন। দুটি বিরাট ঝুড়িভরতি বাজারের সওদা। মাছ, মাংস, তরিতরকারি একে একে ভ্রাতৃবধুর হাতে তুলে দিচ্ছেন। আমাকে দেখে একটু হাসলেন এবং জিগ্গেস করলেন, মৌলবি আহমদ ছফা, আপনে কখনো মৌলবিবাজার গেছেন?
আমি বললাম, গিয়েছি।
তিনি ফের জানতে চাইলেন, কখনো কাঁচাবাজারে গেছেন?
আমি না-সূচক মাথা নাড়লাম।
তিনি বললেন, একটা কথা খেয়াল রাখন খুব দরকার। যখন কোনো নতুন জায়গায় যাইবেন, দুইটা বিষয় পয়লা জানার চেষ্টা করবেন। ওই জায়গার মানুষ কী খায়। আর পড়ালেখা কী করে। কাঁচাবাজারে যাইবেন, কী খায় এইডা দেখনের লাইগ্যা। আর বইয়ের দোকানে যাইবেন পড়াশোনা কী করে জাননের লাইগ্যা। আমি একবার তুরস্কের বইয়ের দোকানে যাইয়া দেখলাম, বামপন্থী বই আর ধর্মীয় বইপত্র সব দোকানে সাজাইয়া রাখছে। বইয়ের দোকান পরখ করলেই বেবাক সমাজটা কোনদিকে যাইতাছে, হেইডা টের পাওন যায়। আরেকবার কায়রো গিয়া দেখলাম, নীলনদের পাড়ে মজুরশ্রেণীর মানুষেরা বড় বড় গামলা ভরতি কইর্যা বরবরটি ভেজিট্যাবল আরাম কইরা খাইতাছে। মোটাসোটা মানুষ। খাওনের পরিমাণটাও তেমন। কী খায়, কী পড়ে এই দুইডা জিনিস না জানলে একটা জাতির কোনো কিছু জানন যায় না।
তিনি বাজার থেকে সবে এসেছেন, এখনও পায়ে প্যাঁক কাদা লেগে রয়েছে। পরনের লুঙ্গিটায়ও কাদার ছিঁটে লেগেছে। তিনি বললেন, মৌলবি আহমদ ছফা আপনে একটু বয়েন। আমার সারা গা কুটকুট করতাছে। একটু ধুইয়া আহি। বাথরুমে গিয়ে গোসল সেরে খদ্দরের সাদা পাজামা এবং খয়েরি পাঞ্জাবি পরলেন। শরীরটা ভালো করে মোছা হয়নি বলে গোছা দাড়ি থেকে দুএক ফোটা পানি ঝরে পড়ছে। চাদর দিয়ে মুছে নিয়ে গুড়গুড়িতে টান দিয়ে বললেন, মৌলবি আহমদ ছফা, ওই যে আপনের বই। তিনি বড় টেবিলটা দেখিয়ে দিলেন। আমি আমার চারটি বই দেখতে পেলাম। তিনি ধোয়া ছেড়ে বললেন, একটা কথা মনে রাখন খুব জরুরি। এই যে হবস তার লেভিয়াথান বইতে তিনটা শব্দ ‘ন্যাস্টি’, ‘ব্রুটিস’ এবং ‘শর্ট’ যেভাবে যে অর্থে ব্যবহার করেছেন, তার বদলে বেবাক ডিকশনারি খুঁইজ্যাও আপনে কোনো শব্দ পাইবেন না। যখন গদ্য লিখবেন এই কথাটি সবসময় মনে রাইখেন। আমার বুঝতে বাকি রইলো না, আমার বইতে যে দীর্ঘ আবেগসর্বস্ব বাক্য আমি লিখেছি, সেদিকে তিনি ইঙ্গিত করছেন। আমি ভীষণ শরমিন্দা হয়ে পড়লাম।
ছোটো যে বাচ্চাটা তামাক সেজে দিতো, চা এনে দিতো, নামটি এখন ভুলে গেছি। বাচ্চাটিকে ডেকে বললেন, এই দুই পেয়ালা চা দিয়া যা। তিনি এক কাপ নিজে নিলেন এবং আরেক কাপ আমার দিকে বাড়িয়ে দিলেন। মৌলবি আহমদ ছফা চা খান। চুমুক দিতে দিতে বললেন, সবসময় লেবু দিয়া চা খাইবেন, চায়ে যে দোষ আছে বেবাক এক্কেরে কাইট্যা যাইব। আমি ত সারাদিন চা খাইয়া টিক্যা আছি। চা শেষ করার পর বললেন, আপনে জসীমুদ্দীনের লেখাটেখা পড়েন। জসীমুদ্দীন শব্দটা উচ্চারণ করার সময়ে ‘স’টা ‘ছ’ এর মতো উচ্চারণ করতেন। আমি জবাব দিলাম, এক সময়ে জসীমুদ্দীন সাহেবের লেখা পড়তাম। এখন আর কোনো আগ্রহ বোধ করিনে।
রাজ্জাক স্যার বললেন, আমি জসীমুদ্দীনের লেখা খুব পছন্দ করি। আপনি কি তাঁর আত্মজীবনী পড়েছেন?
আমি বললাম, ‘জীবন কথা’র কথা বলছেন স্যার? পড়েছি।
গদ্যটি কেমন?
খুব সুন্দর।
রাজ্জাক সাহেব বললেন, এরকম রচনা সচরাচর দেখা যায় না। তারপর তিনি হুঁকো টানতে টানতে জসীমুদ্দীনের গল্প বলতে আরম্ভ করলেন। একসময় কলকাতায় আমি এবং জসীমুদ্দীন এক বাড়িতে থাকতাম। একদিন জসীমুদ্দীন আমাকে কাপড়াচোপড় পইর্যা তাড়াতাড়ি তৈয়ার অইবার তাগাদা দিতে লাগলেন। আমি জিগাইলাম, কই যাইবার চান। জসীমুদ্দীন কইলেন, এক জায়গায় যাওন লাগব। কাপড়াচোপড় পইরা তার লগে হাইট্যা হাইট্যা যখন এ্যাসপ্ল্যানেডে আইলাম, জসীমুদ্দীন ঘাড় চুলকাইয়া কইলেন, কও দেখি এখন কই যাওন যায়? এইরকম কাণ্ড অনেকবার অইছে। একটুখানি হাসলেন।
কবি জসীমুদ্দীনের প্রসঙ্গ ধরে কবি মোহিতলালের কথা উঠলো। মোহিতলাল মজুমদার পূর্ববাংলার উচ্চারণরীতিটি বরদাশত করতে পারতেন না। কবি জসীমুদ্দীনের একটি কবিতার বইয়ের নাম ছিল ধান খেত। মোহিতবাবু ব্যঙ্গ করে বলতেন জসীমুদ্দীন ধান খেতো। মোহিতলালের জিভের মধ্যে বিষ আছিল। তাঁর ঠাট্টা রসিকতা এমনভাবে ছড়াইয়া পড়ল জসীমুদ্দীন বেচারার জান যাওনের দশা। একদিন আমি মোহিতবাবুরে চ্যালেঞ্জ কইর্যা বইলাম। কইলাম, আপনে জসীমুদ্দীনরে এত ঠাট্টা করেন ক্যান। বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে যদি জসীমুদ্দীনের উপর এক অধ্যায় লেখা অয়, আপনেরে নিয়া লেখব মাত্র চাইর লাইন। এরপরে রাজ্জাক সাহেব একটি সাম্প্রতিক প্রসঙ্গের অবতারণা করলেন। দ্যাহেন বাংলাদেশ সরকার জসীমুদ্দীনরে কিছু করল না। আমারে আর জয়নুল আবেদিন সাহেবরে মুশকিলে ফেলাইয়া দিছে। আমগো দুইজনেরে ন্যাশনাল প্রফেসর বানাইছে, আর জসীমুদ্দীনরে কিছু বানায় নাই।
