আলোচনার একটা পর্যায়ে কাজী নজরুল ইসলামে এসে ঠেকলো। তিনি কীভাবে নজরুলের রচনার সঙ্গে পরিচিত হন, সেই কাহিনী বয়ান করলেন। রাজ্জাক স্যার যা বলছিলেন তার সবটুকু আমি ভুলে বসে আছি। শুধু এটুকু মনে আছে, নজরুলকে ঢাকার জলসায় তিনি গান গাইতে দেখেছেন। এটাও জানালেন, নজরুল ইসলাম এবং দ্বিজেন্দ্রলাল তনয় দীলিপ রায়ের মধ্যে একটি প্রতিযোগিতার ভাব ছিলো। রাজ্জাক সাহেব জানালেন, কলকাতায় তারা যেখানে থাকতেন, সে জায়গাটা কাননবালার বাড়ির খুব কাছাকাছি ছিল। কাননের বাড়িতে নজরুল ইসলাম পড়ে থাকতেন। উস্তাদ জমীরুদ্দিন এবং কাজী নজরুল ইসলাম মিলে সুরের নানারকম পরীক্ষানিরীক্ষা করতেন। কোথাও আড্ডায় মজে গেলে নজরুল ইসলামের দিন রাত খেয়াল থাকতো না। মাঝে মাঝে নজরুলের শাশুড়ি গিরিবালা দেবী এসে কাননের বাড়ি থেকে নজরুলকে ধরে নিয়ে যেতেন।
কাজী নজরুল ইসলামের প্রসঙ্গ উঠলে রাজ্জার স্যার শিশুর মত উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠতেন। নজরুলের জন্য তার প্রাণে এক গভীর ভালোবাসা সঞ্চিত ছিলো। তিনি প্রায়ই বলতেন, বৈষ্ণব কবিদের পর কোনো গীতিকারই নজরুলের মতো জনচিত্তে অমন আসন লাভ করতে পারেনি। তিনি প্রেমেন মিত্তিরের একটা কবিতার লাইন আবৃত্তি করলেন, বজ্র, বিদ্যুৎ আর ফুল এই তিনে নজরুল।
রাজ্জাক স্যারের কথা শুনতে শুনতে অনেক বেলা হয়ে গেলো। এরই মধ্যে ক’জন প্রবীণ ব্যক্তি তার সঙ্গে দেখা করতে এলেন। এদের কাউকে আমি চিনি না। এক ভদ্রলোকের সঙ্গে তিনি বিলেতের গল্প করতে আরম্ভ করলেন। বিলেতের কথা উঠতেই খাওয়াদাওয়ার প্রসঙ্গ উঠলো, রাজ্জাক স্যার বললেন, ইহুদিদের মাংসের দোকানের বেশির ভাগ ক্রেতা মুসলমান। ইহুদিরাও মুসলমানের মতো আড়াই পোঁচ দিয়া পশু জবাই করে। তার নিজের অভিজ্ঞতা উল্লেখ করে বললেন, আমি জবাই করা গোশতের খোঁজ করবার লাগছিলাম, এক ইহুদি কসাইর দোকানে যাইয়া হাজির অইলাম। আমারে এক নজর দেইখ্যাই হে কইয়া বসলো, আপনে কি খুঁজতাছেন আমি টের পাইছি। আয়েন জবাই করা মাংস নিয়া যান। তারপর থেইক্যা হের কাছ থেকে গোশত কিনা শুরু করলাম। এই প্রবীণ ভদ্রলোকেরা যখন বিদায় হলেন বেলা প্রায় একটা বাজে। রাজ্জার স্যার আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, মৌলবি আহমদ ছফা, দুপুরের খাবারটাও খাইয়া যান।
০৪. প্রায় দশদিন পরে আবার
প্রায় দশদিন পরে আবার রাজ্জাক স্যারের বাড়িতে গেলাম। একটু দেরি করেই গেলাম। যদি সকালে যাই, আমাকে নাস্তা খেতে ডাকবেন। আমি এড়াতে পারবো না। উনার বাড়িতে রোজ রোজ খেয়ে যদি উপাদেয় খাবারে রসন অভ্যস্ত হয়ে যায়, ইন্টারন্যাশনাল হোস্টেলে ফজলুর নাস্তা আমার জিভে রুচবে না। স্যারের বাড়িতে গিয়ে দেখি, আধাছেঁড়া গেঞ্জিটার ওপর খদ্দরের চাদর চাপিয়ে দাবার বোর্ডের সামনে বসে আছেন। বিপবীতে নিয়াজ মানে নিয়াজ মোর্শেদ। একালের গ্র্যান্ডমাস্টার। তখনও নিয়াজ একেবারে বাচ্চা। বোধহয় স্কুলও শেষ করেনি। নিয়াজকে একজন দক্ষ দাবারু হিসেবে গড়ে তুলতে রাজ্জাক স্যার অনেক কিছু করেছেন, মায় পারিবারিক বিপর্যয় সামাল দেয়া পর্যন্ত। দেখলাম, রাজ্জাক স্যার এবং নিয়াজ দাবা খেলার টেকনিক, ফন্দিফিকির নিয়ে গভীর আলাপ করছেন। নানারকম চাল বোর্ডে দিয়ে বইয়ের সঙ্গে মিলিয়ে নিচ্ছেন।
আমাকে দেখে স্যার সেই পুরানো হাসি হেসে বললেন, মৌলবি আহমদ ছফা বয়েন। আমি বসেই রইলাম। তিনি নিয়াজের সঙ্গে দাবা নিয়ে মত্ত হয়ে রইলেন। ঘড়ির কাটা নটার ঘর থেকে দশটার ঘরে এসেছে। বসে বসে আমার পায়ে ঝিম ধরার উপক্রম। আমি উঠে গিয়ে শেলফে বই দেখতে থাকলাম। সমাজবিজ্ঞান, রাজনীতি, ইতিহাস, রাষ্ট্রতত্ত্ব ইত্যাকার নানা বিষয়ের গম্ভীর মালাটের বই। আমার মনে হল এগুলোতে দাত বসাবার ক্ষমতা আমার জন্মায়নি। খোঁজাখুঁজি করতে করতে শেলফের একটা তাকে ফরাসি সাহিত্যের কিছু বইয়ের সন্ধান পেয়ে গেলাম। বালজাকের রচনাবলী, ফ্লবেয়ারের উপন্যাস, মোপাসাঁর রচনা, ভিকটর হুগোর বই—ফরাসি সাহিত্যের এতোগুলো প্রধান লেখকের বই একসঙ্গে আমি কোথাও দেখিনি। আমার হৃৎস্পন্দন বেড়ে গেলো। ইচ্ছে হল বালজাকের রচনার প্রথম খণ্ড এখুনি ধার চেয়ে বসি। যদি ধার দিতে তিনি অস্বীকৃত হন, লাইব্রেরিতে বসে পড়ার অনুমতি প্রার্থনা করি। কিন্তু আগ্রহটা চেপে গেলাম।
বেলা এগারোটার দিকে নিয়াজ গাত্ৰোত্থান করলো। রাজ্জাক স্যার আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, মৌলবি আহমদ ছফা চইল্যা যান নাই? আমি হাসতে চেষ্টা করলাম। স্যার টেবিলে পা দুটো উঠিয়ে দিয়ে যুৎ হয়ে বসলেন, আপনে এখন কী পড়াশোনা করবার লাগছেন।
আমি বললাম, কীভাবে শুরু করবো বুঝতে পারছি না। আপনি যদি কিছু বইয়ের নাম বলে দিতেন।
স্যার শব্দ করেই হেসে উঠলেন। একই কথা মিঃ হ্যারন্ড লাস্কিরে কইছিলাম, তিনি লাইব্রেরি দেখিয়ে দিয়ে বলেছিলেন, মাই বয় গো অ্যান্ড সোক।
আমি সঠিক অর্থটা বের করতে পারছিলাম না। লাইব্রেরিতে গো করা যায়, কিন্তু সোক কী করে সম্ভব। লাইব্রেরি তো গোসলখানা নয়। মনে হল, আমার কিংকর্তব্যবিমূঢ় অবস্থাটা স্যার বুঝতে পারলেন। তিনি বললেন, প্রথম লাইব্রেরিতে ঢুইক্যাই আপনার টপিকের কাছাকাছি যে যে বই পাওন যায় পয়লা একচোটে পইড়া ফেলাইবেন। তারপর একটা সময় আইব আপনে নিজেই খুঁইজ্যা পাইবেন আপনের আগাইবার পথ। রাজ্জাক স্যার অগ্রসর হওয়ার রাজপথটা সেদিন এমনি করে চোখে আঙুল দিয়ে যদি দেখিয়ে না দিতেন হয়তো আমার আরব্ধ গবেষণাকর্মটি আমি একভাবে-না—একভাবে শেষ করতে পারতাম।
