আমাকে বলতে হল, আমাকে বৃত্তিটা দেয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। সেটা কার্যকর হবে এমএ-র রেজাল্টের পর। এখন পরীক্ষা চলছে।
তিনি বললেন, আগে পরীক্ষা দিয়া লন। যখন রেজাল্ট বাইর অইব তখন আয়েন।
আমি সালাম করে চলে আসছিলাম। তিনি বললেন, আরেকটু বইয়েন, এক পেয়ালা চা খাইয়া যান। তিনি দীপ্তি বলে কাউকে ডাকলেন। একটি গোলগাল ফর্সা কিশোরী বেরিয়ে এলে আমাকে জিগ্গেস করলেন, কী য্যান কইলেন আপনের নাম?
আমি বললাম, আহমদ ছফা।
তিনি বললেন, মৌলবি আহমদ ছফাকে এক পেয়ালা চা দে।
প্রফেসর রাজ্জাকের বাড়ি থেকে ফিরে আসার সময় তিনটে জিনিস আমার মনে দাগ কেটে বসে গিয়েছে। প্রথমত তার চোখের দৃষ্টি অসাধারণ রকম তীক্ষ্ণ। একেবারে মৰ্মে গিয়ে বেঁধে। দ্বিতীয়ত ঢাকাইয়া বুলি তিনি অবলীলায় ব্যবহার করেন, তার মুখে শুনলে এই ভাষাটি ভদ্রলোকের ভাষা মনে হয়। তৃতীয়ত আমাকে তিনি মৌলবি আহমদ ছফা বললেন কেনো? আদর করে বললেন, নাকি অবজ্ঞা করলেন? পরের বছরগুলোতে যতোবারই তাঁর কাছে গিয়েছি প্রতিবারই প্রথম সম্বোধনে জিগ্গেস করেছেন, মৌলবি আহমদ ছফা কী খবর?
০৩. দেশ স্বাধীন হওয়ার পর
উনিশশো বাহাত্তর সালের ফেব্রুয়ারি মাসে আমি প্রফেসর রাজ্জাকের সঙ্গে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর প্রথমবার দেখা করতে গেলাম। তখন তিনি বাড়ি বদল করেছেন। ব্রিটিশ কাউন্সিলের বাঁদিকের চোঙাআলা দোতলা বাড়িটিতে উঠে এসেছেন। (বর্তমানে বাড়িটি ভেঙে ফেলা হয়েছে।) প্রফেসর রাজ্জাকের সঙ্গে বসবাস করছেন তাঁর কনিষ্ঠ ভ্রাতা-ভ্রাতৃবধূ এবং তাদের ছেলেমেয়েরা। শুধু বাড়ি-বদল নয়, অনেক কিছুরই পরিবর্তন ঘটে গেছে। প্রফেসর রাজ্জাক রাষ্ট্রবিজ্ঞানের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করতে আরম্ভ করেছেন। তা ছাড়া তাকে জাতীয় অধ্যাপকও বানানো হয়েছে। পূর্বতন চেয়ারম্যান ড. মোজাফফর আহমদ চৌধুরী উপাচার্যের পদে আসীন হয়েছেন। মোজাফফর সাহেব ছিলেন প্রফেসর রাজ্জাকের একান্ত স্নেহভাজন ছাত্র।
রাজ্জাক সাহেবের চেহারার মধ্যেও একটা উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন দেখতে পেলাম। তার থুতনিতে একগোছা দাড়ি এই সময়ের মধ্যে গজিয়ে গেছে। এই নতুন জন্মানো দাড়ির গোছাটি তার মুখের আদল একেবারে সম্পূর্ণরূপে বদলে দিয়েছে। পাঞ্জাবি পাজামার পরিবর্তে তিনি যদি কলারহীন লম্বা শার্ট এবং প্যান্ট পরতেন, অবিকল ভিয়েতনামের হোচি মিন বলে চালিয়ে দেয়া যেতো। বাস্তবিকই নতুন জন্মানো শ্মশ্রুর গোছাটিতে তাঁর মুখের রেখাগুলো অনেক ধারালো দেখায়। তিনি জানালেন, মুক্তিযুদ্ধের এই নয় মাস তাকে কেরানিগঞ্জের নানা জায়গায় পালিয়ে বেড়াতে হয়েছিলো এবং এই সময়ের মধ্যে তিনি দাড়ির গোছাটি এক রকম বিনা পরিচর্যায় গজিয়ে তুলতে সক্ষম হয়েছেন।
আমাকে কেউ-কেউ বলেছেন, এই চোঙাআলা বাড়িতে একসময় কবি-সমালোচক মোহিতলাল মজুমদার বসবাস করে গেছেন। সত্য মিথ্যা পরখ করে দেখার সুযোগ হয়নি। সিঁড়ি ভেঙে দোতলায় যখন উঠেছি। ছাঁৎ করে বুদ্ধদেব বসুর একটা গল্পের কথা মনে এল। গল্পটির নাম সবিতা দেবী। মোহিতবাবু ছিলেন তরুণ লেখক-কবিদের ওপর ভীষণ খড়গহস্ত। সুযোগ পেলেই নানাভাবে নাজেহাল করতেন। তরুণরাও মজুমদার মশায়ের ওপর বদলা নিতেন। বুদ্ধদেব বসু মোহিতলাল মজুমদারকে নিয়ে এই শ্লেষাত্মক গল্পটি লিখেছিলেন, তা নাও হতে পারে। কিন্তু আমার মনে মোহিতলাল মজুমদারের ছবিটি ভেসে উঠেছিলো। গল্পটির এক জায়গায় আছে, গল্পের নায়িকা সবিতা দেবীকে এক বৃষ্টির দিনে রচনা পাঠ করে শোনাতে গিয়েছিলেন। ঘরে প্রবেশ করার আগে ছাতাটি সিঁড়ির কাছে রেখে গিয়েছিলেন। সেই ছত্রনিঃসৃত একটি জলের রেখা এঁকেবেঁকে সিঁড়ির ওপর দিয়ে বয়ে গিয়েছিলো। প্রফেসর রাজ্জাকের বাড়ির সিড়ি ভাঙতে গিয়ে সেই জলের রেখাটি শুস্ক ফেব্রুয়ারি মাসেও আমার মনে ছলছলিয়ে জেগে উঠেছিলো। এর সবটাই হয়তো কল্পনা। হয়তো বুদ্ধদেব বসু মোহিতলালকে উপলক্ষ করে গল্পটি লেখেননি। যে সিঁড়ির কথা বুদ্ধদেব বলেছেন, সেটা তার কল্পনাতেই জন্ম নিয়েছিল। এটা সে সিঁড়ি নয়। মানুষের মন ভারি বিদঘুটে জিনিস। কত অসম্ভব বস্তুর কল্পনা করে।
আমি যখন সিঁড়ি ভেঙে রাজ্জাক সাহেবের ঘরে গেলাম, দেখি তিনি একখানি কথা গায়ে দিয়ে গুড় কি গুড় কি হঁকা টানছেন। আমাকে দেখামাত্রই তার মুখমণ্ডল ভেদ করে একটা সুন্দর হাসি বিকশিত হয়ে উঠলো। আরে মৌলবি আহমদ ছফা যে! আয়েন, আয়েন, তাইলে বাঁইচা আছেন। আত্মীয়স্বজন সকলের কী দশা?
আমি বললাম, সকলে বেঁচে আছেন।
আপনি কই আছিলেন?
আমি বললাম, পুরো সময়টা আমি ভারতে কাটিয়েছি।
তিনি ফের জিগ্গেস করলেন, দেশের বাড়িতে যাইয়া খবরটবর নিছেন?
আমি জবাব দিলাম, ঢাকা এসেই বাড়িতে চলে গিয়েছিলাম। সপ্তাহখানেক আগে ফিরে এসেছি।
আপনের বাড়িতে কে কে আছে?
মা, ভায়ের ছেলেমেয়ে এবং ভাবি। বোনদের বিয়ে হয়ে গিয়েছে।
এই সময়ে ছোটো একটি বাচ্চা এসে খবর দিল নাস্তা দেয়া হয়েছে। রাজ্জাক সাহেব আমাকে বললেন, আয়েন মৌলবি আহমদ ছফা, আমাগো লগে সামান্য নাস্তা করেন।
আমি বললাম, স্যার, হল কেন্টিনে গিয়ে নাস্তা করবো।
তিনি বললেন, আমাগো লগে সামান্য কিছু মুখে দেন, তারপর যদি পেটে ক্ষিধা থাকে। ঘরে যাইয়া আবার খাইয়েন।
পাশের রুমে গিয়ে দেখি বিরাট এক টেবিলের চারপাশে চেয়ার পাতা হয়েছে। পরিবারের সকলে জড়ো হয়েছেন। রাজ্জাক স্যারের ছোট ভাই, তাঁর বেগম, দুই কন্যা, ছেলেরা। একজন অতিথিও ছিলেন। উনাকে রাজ্জাক স্যার মামা ডাকতেন। একটা বড় চীনামাটির প্লেটে চৌকোণা সাইজের পুরু পরোটার স্তুপ। ভুনা গরুর মাংস। চিতই পিঠের সঙ্গে গাঁথা ভাজা ইলিশের টুকরা। ফালি ফালি করে কাটা পনির। ডিম ভাজা। ভাজা রূপচান্দা শুঁটকি। একপাশে গরম করা গতরাতের বাসি ভাত। আরেকটা বাটিতে দেখলাম খুদভাত। রাজ্জাক স্যার বাসি ভাতের প্লেট থেকে চামচ দিয়ে ভাত তুলে নিলেন। তারপর ভাতের সঙ্গে কিছু তাজা মুড়ি মাখিয়ে নিলেন। সেদিনই প্রথম জানতে পারি, ঢাকা জেলার কেরানিগঞ্জ এলাকার মানুষ ভাতের সঙ্গে মুড়ি মাখিয়ে তৃপ্তিসহকারে ভোজন করে থাকে। রাজ্জাক স্যার বাসি ভাতের সঙ্গে শুঁটকি ভাজা দিয়ে শুরু করলেন। ছোটোদের আকর্ষণ দেখলাম খুদভাতের দিকে। আমাদের চট্টগ্রামেও মানুষ খুদভাত খেয়ে থাকে। তবে যারা খায় তারা অত্যন্ত গরিব, চাল কেনার ক্ষমতা যাদের নেই। প্রথম দিনেই আমি অনুভব করলাম, রাজ্জাক স্যারের বাড়িতে খাওয়াটা একটা রীতিমতো পারিবারিক উৎসব। আর খাদ্যবস্তু শিল্পকলায় পরিণত হয়েছে।
