০১. মুখবন্ধ : সংশয়বাদের মূল্যনির্ধারণ প্রসঙ্গে

সংশয়ী রচনাবলী (অনুবাদ)
উৎসর্গ – অধ্যাপক কবীর চৌধুরী
[সংশয়ী রচনা – বাট্রাণ্ড রাসেলের স্কেপটিক্যাল প্রসেজ-এর বাংলা অনুবাদ। ১৯৯০ সালে বাংলা একাডেমী প্রথম সংস্করণ প্রকাশ করেছিলো। পরে বাংলাবাজারের প্যারীদাস রোডস্থ খান ব্রাদার্স এ্যান্ড কোম্পানি একটি নতুন সংস্করণ প্রকাশ করেছে।]

মুখবন্ধ : সংশয়বাদের মূল্যনির্ধারণ প্রসঙ্গে

আমি পাঠকদের সুবিবেচনার জন্য এমন একটি মত উপস্থিত করতে চাই যা তাদের কাছে উদ্ভট এবং ধ্বংসাত্মক মনে হবে বলে আমার আশঙ্কা হয়। কোন বক্তব্য অথবা যুক্তিকে সত্য বলে স্বীকার করার পর্যাপ্ত কারণ না থাকলে তা সত্য বলে কোন ক্ষেত্রে অনুমান না-করাই হলো আমার প্রস্তাবিত মতবাদ। আমি নিশ্চিতভাবে বিশ্বাস করি যে এ রকম মতবাদ সাধারণ্যে গৃহীত হলে আমাদের সামাজিক জীবনধারা এবং রাজনৈতিক পদ্ধতি যে গুলোকে এখন নির্দোষ মনে করা হয়, তার মধ্য থেকে দোষ বের করে আমাদের রাষ্ট্রনৈতিক পদ্ধতি এবং সামাজিক জীবনধারার মধ্যে ব্যাপক পরিবর্তন আনা সম্ভব হবে। তা সম্ভব হলে ঝাঁঝালো বক্তা, বই ব্যবসায়ী, ধর্মযাজক এবং অন্যান্য যারা মানুষের অযৌক্তিক বিশ্বাসকে ভিত্তি করে বেঁচে থাকে, মানুষের ইহ-পরকালের সৌভাগ্যের জন্য কিছুই করে না, তাদের আয় যে সাংঘাতিকভাবে : কমে যাবে সে ব্যাপারেও আমি আত্মসচেতন (যা আরো বেশি বিপজ্জনক)। অনেক প্রতিকূল মারাত্মক যুক্তি থাকা সত্বেও আমি মনে করি, আমার অপ্রিয় মতবাদ সম্পর্কে বলবার মতো অনেক কিছু রয়েছে এবং বলতে আমি চেষ্টাও করবো।

প্রথমতঃ, আমি নিজেকে চূড়ান্তবাদী করে তোলার বিপক্ষে- আত্মসংযম বজায় রাখার ইচ্ছা পোষণ করি। আমি একজন বৃটিশ হুইগ, সেজন্য আমার মধ্যেও বৃটিশ আপোষমূলক এবং উদারনৈতিক মনোভাব বর্তমান। পিরহোনিজমের (pyrrohonsim) প্রবর্তক পিরহো সম্বন্ধে একটি গল্প প্রচলিত আছে। (পিরহোবাদ বা পিরহোনিজম হলো সংশয়বাদের পুরনো নাম।) এক ধরণের কর্মপন্থা যে অন্য ধরণের কর্মপন্থা অপেক্ষা নিশ্চিতভাবে বিজ্ঞোচিত একথা তিনি বিশ্বাস করতেন না। একদিন বিকেল বেলায় যখন তিনি তার প্রাত্যহিক ভ্রমণ সারছিলেন, দেখতে পেলেন তার দর্শনের অধ্যাপক একটি খানার মধ্যে পড়ে মাথাসমান ডুবে আছেন। (এই অধ্যাপকের কাছ থেকেই তিনি দর্শন শিখেছিলেন। কোনরকমেই বেরিয়ে আসতে পারছেন না। কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকার পর চলে গেলেন। তিনি চিন্তা করলেন যে এই বুড়োকে টেনে তুলে তিনি যে ভালো কাজ করবেন তার কোন প্রমাণ নেই। যাঁরা কম সংশয়বাদী ছিলেন তারা তাকে উদ্ধার করে পিরহোর হৃদয়হীনতার নিন্দা করলেন। কিন্তু তার অধ্যাপক ছিলেন নীতিতে অটল বিশ্বাসী, তিনি পিরহোর নীতিনিষ্ঠার প্রশংসা করলেন। কিন্তু বর্তমানে আমি ততখানি বাহাদুরিপূর্ণ সংশয়বাদের ওকালতি করছি না। থিয়োরি হিসেবে না হলেও বাস্তবে আমি সাধারণজ্ঞানের সাধারণ বিশ্বাসরাজীর প্রতি সংশয়ের দৃষ্টি দিতে প্রস্তুত। আমি বিজ্ঞানের কোন প্রতিষ্ঠিত ফলাফলকে সত্য বলে না স্বীকার করে যুক্তিগত কর্মের অধিকতররা সম্ভাব্য ভিত্তি বলে মেনে নিতে প্রস্তুত। যদি বলা হয় অমূক তারিখে চন্দ্রগ্রহণ হবে আমার মনে হয় গ্রহণ হচ্ছে কি না দেখা অবশ্যই উচিত। পিরহো হলে অবশ্য অন্যরকম চিন্তা করতেন। কিন্তু এ ক্ষেত্রে আমি মধ্যমপন্থার কথা বলছি, একথা দাবি করা যুক্তিসঙ্গত বলে আমার ধারণা।

এমন অনেক ব্যাপার আছে, সে সব ব্যাপারে যারা পরীক্ষা করে দেখেছেন,তারা একমত হয়েছেন। দৃষ্টান্ত হিসেবে গ্রহণের তারিখের কথা বলা যায়। এমনও অনেক বিষয় আছে, যে ব্যাপারে বিশেষজ্ঞরা একমত হতে পারেন না। আবার বিশেষজ্ঞরা একমত হলেও ভুল করতে পারেন। মধ্যাকর্ষণে আলোকের প্রতিসরণের যে গুরুত্ব আইনস্টাইন আবিস্কার করেছিলেন, বিশেষজ্ঞরা তার সঙ্গে বিশ বছর আগে একমত হন নি, কিন্তু তারপরেও তা সত্য প্রমাণিত হয়েছে। তা সত্বেও বিশেষজ্ঞরা যখন মতামতের ব্যাপারে একই মনোভাব পোষণ করেন, তখন বিরুদ্ধ কোন মতামতের চাইতে তাদের মতামতই সত্য হবে এটা আশা করা যায়। যে সংশয়বাদের পক্ষে আমি ওকালতি করতে চাই, তাহলো (১) যখন বিশেষজ্ঞরা একমত তখন বিরুদ্ধ মতামতকে নিশ্চিত বলে গ্রহণ করা হবে না। (২) যখন বিশেষজ্ঞরা একমত নন তখন অবিশেষজ্ঞের কোন মতামতকেই সত্য বলে গ্রহণ করবো না, এবং (৩) যখন নির্দিষ্ট কোন মত গ্রহণ করার পক্ষে প্রচুর যুক্তি থাকবে না তখন সাধারণ মানুষ কোন মতামত না দিলে ভালো করবে।

আপাতদৃষ্টিতে এ সকল প্রস্তাব খুবই নাজুক বলে মনে হতে পারে, কিন্তু তা সত্বেও যদি গ্রহণ করা হয়, তাহলে সামাজিক জীবনকে তা ব্যাপকভাবে বিপ্লবায়িত করবে।

যে সকল কারণে মানুষ যুদ্ধ করতে ইচ্ছুক হয় এবং অত্যাচার করে, উপরোক্ত শ্রেণীর যে কোন এক শ্রেণীর অন্তর্গত-সংশয়বাদ তাদেরকে তীব্রভাবে সমালোচনা করে। কোন মতামতের যুক্তিগত ভিত্তি থাকলে পরে মানুষ সেগুলোকে তুলে ধরে সন্তুষ্ট থাকে এবং কাজে প্রয়োগ করা পর্যন্ত ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করে। এসব ক্ষেত্রে মানুষ মতামতের সঙ্গে আবেগকে জড়ায় না এবং শান্তভাবে মতামতকে তুলে ধরে এবং ধীরস্থিরভাবে পেছনের যুক্তির সাহায্যে বিশ্লেষণ করে। যে সকল মতামতের সঙ্গে আবেগের খুবই ঘনিষ্ট সম্পর্ক, সেগুলো সাধারণতঃ যুক্তির সুদৃঢ় ভিত্তির উপর সুপ্রতিষ্ঠিত নয় এবং আবেগের আধিক্যের সাহায্যেই যুক্তির অক্ষমতা প্রমাণ করা যায়।

ধর্ম এবং রাজনীতির ক্ষেত্রে প্রায় সবসময় এমন সব মতামত গ্রহণ করা হয় যার সঙ্গে আবেগের সুগভীর অন্বয় বর্তমান চীনদেশ ছাড়া অন্যান্য দেশে এসব বিষয়ে জোরালো বক্তব্য যদি কোন মানুষের না থাকে তাহলে তাকে খুবই হতভাগ্য মনে করা হয়। মানুষ তাদের বিপরীত মনের আবেগবান সমর্থকদের যত বেশি ঘৃণা করে, তারও চেয়ে বেশি ঘৃণা করে সংশয়বাদীদের। এসব ব্যাপারে বাস্তব জীবনের দাবিতে যে সকল মতামতের প্রয়োজন হয় তা অতিযুক্তিবাদী হয়ে গেলে সামাজিক জীবন অসম্ভব হয়ে পড়বে। আমি বিশ্বাস করি এর বিপরীতে বিশ্লেষণ করলে, আমার এ মতামতকে সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরার চেষ্টা করা হবে।

১৯২০ সালের বেকার সমস্যার কথা ধরা যাক। এক পার্টির মতে ট্রেড ইউনিয়নের অন্যায়ের ফলে তা হয়েছে, অন্য পার্টির মতে মহাদেশের বিশৃঙ্খলার কারণেই তা ঘটেছিল। তৃতীয় পার্টি এ সকল কারণ মেনে নিয়ে অধিকাংশ দোষ ইংল্যাণ্ডের ব্যাঙ্কের ঘাড়ে চাপিয়েছিল, যেহেতু ইংল্যাণ্ডের ব্যাঙ্ক পাউণ্ডের মান বৃদ্ধি করেছিল। আমি জানতে পেরেছি যে এই তৃতীয় পার্টির মধ্যে সকলেই ছিলেন বিশেষজ্ঞ, আনাড়ি কেউ ছিলেন না। পার্টির বক্তৃতায় যে মতামতকে প্রকাশ করা যায় না, সে মতামতে রাজনৈতিক ব্যক্তি কোন আগ্রহ পোষণ করেন না। যে সকল মতামত বিরুদ্ধপক্ষীয়দের দুর্ভোগের কারণ হয়ে থাকে, সে সকল মতামতকেই সাধারণ মানুষ পছন্দ করে বেশি। ফলতঃ মানুষ অসার মতামতের পক্ষে-বিপক্ষে সংগ্রাম করে। পক্ষান্তরে আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না বলে অল্পসংখ্যক মানুষ, যাঁদের যুক্তিনিষ্ঠা রয়েছে, তাদের কথার কেউ কর্ণপাত করে না। মতে দীক্ষিত করতে গেলে ইংল্যান্ডের ব্যাঙ্ক যে খারাপ এ কথা বোঝাতে হবে। শ্রমিক দলীয়দের আস্থা অর্জন করতে গেলে ব্যাঙ্ক অব ইংল্যাণ্ডের ডিরেক্টরদের ট্রেড ইউনিয়নের বিরুদ্ধবাদী বলে দেখাতে হবে। লণ্ডনের ধর্মাধ্যক্ষের সমর্থন পাওয়ার জন্য এ সকল কাজকে নৈতিকতাবিরোধী দেখাতে হবে। মুদ্রা সম্পর্কে তাদের যে মতামত সত্য নয়, এমন মতবাদেও বিশ্বাস করতে হবে।

আর একটা দৃষ্টান্ত দেয়া যাক। অনেক সময় বলা হয়ে থাকে, সমাজতন্ত্রবাদ মানবপ্রকৃতির পরিপন্থী। আবার সমাজতন্ত্রবাদীরাও তাদের বিরুদ্ধবাদীর বিপক্ষে এই উত্তপ্ত অভিযোগ করে থাকেন। পরলোকগত ড. রিভার্স (Dr. Rivers) বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের একটি বক্তৃতায় এ প্রশ্নের আলোচনা করেছেন, যা পরে তার মূল্যবান বই ‘মনোবিজ্ঞান এবং রাজনীতিতে (Psychology and Politics) প্রকাশিত হয়েছে। আমার জানামতে এটিই হচ্ছে একমাত্র আলোচনা, যা বৈজ্ঞানিক বলে দাবি করতে পারে। কতিপয় নৃতাত্ত্বিক উপাদানের উপর নির্ভর করে দেখাতে চেয়েছিলেন যে মেলানেশিয়াতে (Melanesia) সমাজতন্ত্রবাদ মানবপ্রকৃতির পরিপন্থী নয়। পরে তিনি অবশ্য বলেছেন যে মানুষের প্রকৃতি মেলানেশিয়াতে যেমন ইউরোপেও তেমন কি না আমরা জানিনা। উপসংহারে তিনি মন্তব্য করেছেন যে ইউরোপের মানুষ প্রকৃতির পরিপন্থী কিনা আবিষ্কার করার চেষ্টা হলো এটি : এটি খুবই কৌতূহলপ্রদ যে এই উপসংহারের উপরই ভিত্তি করে তিনি শ্রমিকদলের প্রার্থী হতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তার সঙ্গে তিনি রাজনৈতিক বিতণ্ডার মধ্যে যে পরিমাণ উত্তাপ এবং আবেগ জড়িত থাকে নিশ্চিতভাবে তা ঘটতে দেন নি।

এখন আমি এমন একটি বিষয়ে আলোচনা করার দুঃসাহস করছি যা মানুষ নিরুত্তপ্ত আবেগে দেখতে অধিকতর অসুবিধার সম্মুখীন হয়। সে বিষয়টি হলো বিবাহরীতি। প্রতিটি দেশের অধিকাংশ মানুষ বিশ্বাস করে যে নিজের দেশের বিবাহপদ্ধতি ছাড়া আর সবরকমের বিবাহপদ্ধতি নীতিসম্মত নয়। যারা এ মতামতের বিরোধিতা করে, সাধারণতঃ আপনাপন অনিশ্চিত জীবনের খাতিরেই করে থাকে। ভারতে বিধবাদের পুনরায় বিবাহের কথা চিন্তা করাই হলো জঘণ্য অপরাধ। ক্যাথলিকপ্রধান দেশে বিবাহ বিচ্ছেদকে খুবই মন্দ কাজ বলে গণ্য করা হয়, তবে অন্ততঃ পুরুষের ব্যাপারে যৌথজীবনের সততা বজায়ের কিছু অক্ষমতাকে বরদাশত করা হয়। আমেরিকাতে বিবাহ বিচ্ছেদ খুবই সহজ, কিন্তু বিবাহ বহির্ভূত সম্পর্ক ভয়ঙ্করভাবে নিন্দিত হয়। মুসলমানেরা বহুবিবাহে বিশ্বাসী, অথচ আমরা চূড়ান্ত নিন্দনীয় মনে করি। এ সকল বিপরীত মতামতকে অপ্রতিরোধ্য এবং চূড়ান্ত বলে ধরে নেয়া হয় এবং যারা এর বিরোধিতা করেন, তাদের উপর নির্মম নির্যাতন করা হয়। কিন্তু বিভিন্ন দেশের কেউ প্রমাণ করতে চেষ্টা করে না যে তাদের আচারপদ্ধতি অন্যদের আচারের চাইতে মানুষের সুখ সমৃদ্ধির খাতিরে নতুন কিছু দান করেছে।

এ বিষয়ে যখন আমরা বৈজ্ঞানিক আলোচনা (উদাহরণস্বরূপ) ওয়েস্টার ম্যাক (Westermack) এর মানবজাতির বিবাহের ইতিহাসের (History of Human Marriage) এর মতো বইয়ের পাতা খুলে দেখি, আমরা এমন একটি আবহাওয়ার সাক্ষাৎ পাই যা সম্পূর্ণভাবে প্রচলিত কুসংস্কার থেকে ভিন্নরকম। আমরা দেখতে পাই যে যত রকমের আচার-পদ্ধতি প্রচলিত আছে, তার মধ্যে অনেকগুলো মানবপ্রকৃতির পক্ষে ক্ষতিকর বলে অনেকসময় আমরা মনে করে থাকি। বহুবিবাহ বলতে আমরা মনে করি পুরুষেরা জোর করে নারীদের উপর এ অত্যাচারের বোঝ চাপিয়ে দিয়েছে। কিন্তু তিব্বতীয়দের আচার-ব্যবহার সম্বন্ধে কি মনে করবো। তিব্বতীয় রীতি অনুসারে একজন নারীর অনেকগুলো স্বামী থাকতে পারে। তিব্বতে যারা ভ্রমণ করেছে, তারা নিশ্চিত ভাবে এ কথাই বলেছে যে সেখানে পারিবারিক শান্তি শৃঙ্খলা অন্ততঃ ইউরোপের মতো আছে। এরকম কিছু পড়াশোনার পরে যে কোন সরলমনা মানুষই সংশয়বাদীতে পরিণত হবেন, কারণ এক জাতীয় বিবাহ যে অন্য জাতীয় বিবাহের চেয়ে ভালো বা মন্দ, হাতের কাছে তার প্রমাণ করবার মালমশলা নেই। নিজেদের বিধিনিষেধের প্রতি যারা অশ্রদ্ধেয় মনোভাব পোষণ করে, সাধারণত তাদের প্রতিশোধ গ্রহণ করার সবটুকুতেই নির্মমতা এবং অসহনশীলতা বর্তমান। অন্যথা তাদের মধ্যে কোনকিছুরই মিল নেই। এ থেকে মনে হয় মানুষের পাপ ভৌগোলিক। এই উপসংহার থেকে একপদ অগ্রসর হয়ে নতুন উপসংহারে পৌঁছলে বুঝতে পারবো যে মানুষের পাপের সেই কাল্পনিক পাপীকে শাস্তি দেওয়ার জন্য যে নির্দয়তা নির্মাতা এখনো প্রচলিত আছে, তার প্রয়োজন নেই। এই উপসংহারটি অনেকের মনে তেমন আনন্দ দেবে না, কারণ সুস্থ বিবেকে নির্দয়তার চর্চা করা নীতিবাগীশদের জন্য খুবই আনন্দদায়ক। সে জন্যে তারা নরক আবিষ্কার করেছে।

সন্দেহজনক সবকিছুকে সত্য বলে জোরালোভাবে বিশ্বাস করার চূড়ান্ত নজির হলো জাতীয়তাবাদ। আমার মনে হয় এখন একজন দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের বৈজ্ঞানিক ইতিহাস লেখক যে মতামত প্রদান করতে বাধ্য হবেন, যুদ্ধের সময়ে একই মন্তব্য করলে যুদ্ধলিপ্ত যে কোন দেশ তাকে কারাগারে নিক্ষেপ করতে বাধ্য হতো। চীনদেশ ছাড়া আর কোন দেশ নেই, যে দেশের জনসাধারণ নিজেদের সম্বন্ধে সত্য কথা বললে সহ্য করে। সাধারণতঃ সত্যকে অপ্রিয় ভাবা হয়, কিন্তু যুদ্ধের সময়ে সত্য বলা ভয়ঙ্কর গর্হিত কাজ। বিপরীতধর্মী যে বিস্ফোরক বিশ্বাসের সৃষ্টি করা হয়েছে, এসকল বিশ্বাসের মূলে যে ভ্রান্তি ছাড়া কিছু নাই, তা তখনই ধরা পড়ে যখন দেখা যায় জাতীয়তাবাদীরা ছাড়া কেউ তাকে বিশ্বাস করে না। বিশ্বাসের এ সমস্ত পদ্ধতির মধ্যে বিচার বুদ্ধির প্রয়োগকে আগেকার যুগে ধর্মবিশ্বাসের ক্ষেত্রে বিচার বুদ্ধির প্রয়োগের মতো মন্দ ভেবে থাকে মানুষ। সংশয়বাদ এ সকল ব্যাপারে কেননা মন্দ হবে, এ ব্যাপারে যদি চ্যালেঞ্জ করা হয়, তারা বলে যে পৌরাণিক বিশ্বাস যুদ্ধজয়ে সাহায্য করে অথচ একটা জাতি হত্যা করার চাইতে হত হয় বেশি। সমস্ত বিদেশীদের নিন্দা করে নিজেদের মুখরক্ষা করার মধ্যে যে নিন্দনীয় কিছু আছে তা একমাত্র কোয়েকার (Quaker) শ্রেণী ছাড়া পেশাদার নীতিবাগিশদের মধ্যে তার কোন সমর্থন পাওয়া যায় না। যখন বলা হয় যে একটি যুক্তিবাদী জাতিকে যুদ্ধে জড়িয়ে না পড়ার পন্থা আবিষ্কার করতে হবে, তাহলে উত্তরে জুটবে তিরস্কার।

যুক্তিবাদী সংশয়বাদের প্রসারের কী প্রতিক্রিয়া হতে পারে? আবেগ থেকেই মানুষের কর্মের উৎপত্তি এবং তার ফলে কতেক অন্ধবিশ্বাস জন্মলাভ করে। মনঃসমীক্ষা স্বীকৃত এবং অস্বীকৃত উন্মাদের মধ্যে এর বহিঃপ্রকাশ নিরীক্ষণ করেছে। যে মানুষ লাঞ্ছিত হয়েছে, অনেক সময় একটা থিয়োরি আবিস্কার করে যে সে ইংল্যাণ্ডের রাজাধিরাজ এবং তার সপক্ষে এমন সব যুক্তি ও ব্যাখ্যা খাড়া করে তোলে যে মর্যাদা তার পাওয়া উচিত সে ততটুকু মর্যাদা পাচ্ছে না। এ ব্যাপারে তার এমন এক ধরণের চিত্তবিভ্রম ঘটেছে, যা তার প্রতিবেশীরা সহানুভূতির সঙ্গে বিচার করে দেখেন, সেজন্য তারা তাকে তালাবদ্ধ করে রাখেন। যদি শুধু নিজের মহত্ব না বাড়িয়ে জাতি, ধর্ম ঐতিহ্য ইত্যাদির মহত্ব বর্ধিত করে তাহলে সে তার আশপাশের মানুষের সমর্থন অর্জন করে এবং রাজনৈতিক অথবা ধর্মীয় নেতা বনে যায়। যদিও নিরপেক্ষ বিদেশীর কাছে তার মতামত পাগলাগারদের রোগির মতো মনে হয়, তাতে কিছু আসে যায় না। এভাবেই সমষ্টিগত পাগলামির স্বভাব গড়ে ওঠে যা ব্যক্তি-পাগলামির সমস্ত নিয়ম-কানুন মেনে চলে। সকলেই জানে যে, লোক নিজেকে ইংল্যাণ্ডের রাজা মনে করে, তার মতো উন্মাদের সঙ্গে বিবাদ করা অর্থহীন, কিন্তু তাকে বিচ্ছিন্ন করে অতিরিক্ত শক্তিশালী করা হয়। সমগ্র জাতি যখন একটা উন্মাদ স্বপ্নে মেতে ওঠে, তখন জাতির ক্রোধ অনেকটা পাগলে ক্রোধের মতো বাধা পেলে সহস্র শিখায় জ্বলে উঠে। কোনরকমের প্ররোচনাই তাকে যুক্তির কাছে নতি স্বীকার করাতে পারে না।

বুদ্ধিবাদী উপাদান মানুষের আচরণে কী কী ভূমিকা গ্রহণ করে থাকে, সে সম্বন্ধে মনস্তত্ববিদদের মধ্যে প্রচুর মতভেদ রয়েছে। তার মধ্যে দু’রকমের মতভেদই প্রধান। (১) কাজের কারণ হিসেবে ধরে নিয়ে বিশ্বাসগুলো কতদূর ক্রিয়াশীল? (২) বিশ্বাসগুলো কতোদূর যুক্তিসঙ্গত প্রমাণ থেকে উদ্ভূত অথবা কতোদূর পরিমাণ তা সম্ভব এ দু’প্রশ্নেই মনস্তত্ববিদেরা সাধারণ মানুষ বুদ্ধিবৃত্তিক উপাদানকে যতটুকু স্থান দিয়ে থাকে, তার চাইতে যে কম প্রয়োজনীয় সে সম্বন্ধে একমত। কিন্তু সাধারণ ঐক্যের অভ্যন্তরে লক্ষণীয় অনেকগুলো। বৈপরীত্য রয়ে গেছে। আমরা তার মধ্যে পরপর দু’টোকেই তুলে ধরছি। (১) কাজের কারণ হিসেবে বিশ্বাসগুলো কতোদূর ক্রিয়াশীল? থিয়োরিগতভাবে প্রশ্নটা আলোচনা করা যাক। সে জন্যে একজন সাধারণ মানুষের একটি মামুলি দিনের জীবনকে নেয়া যাক। সকালে ঘুম থেকে উঠে তিনি জীবন শুরু করেন, এতে তার বিশ্বাসের কোন প্রভাব নেই। তিনি সকালে নাস্তা করেন, ট্রেন ধরেন, পত্রিকা পড়েন, অফিসে যান-এ সকল অভ্যাসবশেই করে থাকেন। তার জীবনে অতীতে এমনও এক সময় ছিল যখন তিনি এ অভ্যাসগুলোকে গঠন করেছেন এবং অন্ততঃ তার অফিস পছন্দের ব্যাপারে তার বিশ্বাসের প্রয়োজনীয় ভূমিকা ছিল। চাকুরি গ্রহণ করার সময়ে তিনি হয়ত ভেবেছিলেন, নিজের জন্য যা ভালো মনে করেন, ঐ চাকুরিতে যোগ দিলেই তার সব কিছু পেতে পারেন। অধিকাংশ মানুষের ক্ষেত্রে মৌলিকভাবে বৃত্তি নির্বাচন করার বেলায় বিশ্বাস অসামান্য ভূমিকা পালন করে থাকে। সুতরাং পছন্দ থেকেই মানুষের সকল রকমের বিশ্বাসের উৎপত্তি।

অফিসে তাকে যদি পরের অধীনে কাজ করতে হয়, তাহলে কোন সক্রিয় সংকল্প অথবা বিশ্বাসের কোন প্রকাশ্য বাধার সম্মুখীন না হয়ে অভ্যাসবশে কাজ করে যেতে পারেন। যদি তিনি অঙ্কের সঙ্গে অঙ্ক বসিয়ে স্তম্ভ তৈরি করেন, তাহলে বলতে হবে তিনি যে গাণিতিক নিয়ম প্রয়োগ করেন, তাতে বিশ্বাস করেন;কিন্তু তা করলে এক বিরাট ভুল করা হবে, নিয়মগুলো টেনিস খেলোয়ারের স্বভাবের মতো তার শরীরের স্বভাবমাত্র। যৌবনে ওগুলোকে আয়ত্ব করা হয়েছিল, সংশ্লিষ্ট কোন বুদ্ধিবৃত্তিক বিশ্বাসের বশে নয়। কুকুর যেমন পেছনের পায়ের উপর উপবেশন করে খাবার খেতে শিক্ষা করে, তেমনি ওসব স্বভাবও স্কুল শিক্ষকদের সন্তুষ্ট করার জন্য আয়ত্ব করা হয়েছিল। আমি বলতে চাই না যে সকল শিক্ষা এক রকম, কিন্তু নিশ্চিতভাবে প্রত্যেক শিক্ষা প্রাথমিক স্তরে ঐরকম।

সে যা হোক, যদি আমাদের কোন অংশীদার অথবা ডিরেক্টার বন্ধু থেকে থাকে, তাহলে জটিল কোন নীতি নির্ধারণের বেলায় তাকে ডাকা হতে পারে। এ সমস্ত সিদ্ধান্তের বেলায় তার বিশ্বাসের কিছু প্রতিক্রিয়া অবশ্যই থাকবে। কোনকিছুর দাম বাড়বে এবং কোনকিছুর দাম কমবে। অমুক অমুক ভালো মানুষ দেউলিয়া হওয়ার আগে এই এই করতে হবে, এসবে তিনি বিশ্বাস করেন। এ সকল বিশ্বাস অনুসারেই তিনি কাজ করেন। অভ্যাস ব্যতিরেকে বিশ্বাসের বলে তিনি কেরানির বদলে আরো শক্তিশালী মানুষ হলে কাজ করতে পারেন। যদি তার বিশ্বাসগুলো সত্য হয়, তিনি বেশি টাকা রোজগার করতে পারেন।

পারিবারিক জীবনে বিশ্বাস যদি কাজের কারণ হয়ে থাকে, তাহলে এরকম সুযোগের ঘন ঘন পুনরাবৃত্তি ঘটে থাকে। সচরাচর, তার স্ত্রী এবং সন্তানের প্রতি ব্যবহার অভ্যাস অথবা অভ্যাস দ্বারা শোধিত প্রবৃত্তির বশেই নিয়ন্ত্রিত হয়। গুরুত্বপূর্ণ সময়ে তিনি বিয়ের প্রস্তাব করেন, যখন তিনি ছেলেকে কোন স্কুলে পাঠাবেন ঠিক করেন এবং যখন তিনি স্ত্রীর চরিত্রে সন্দেহের কারণ খুঁজে পান তখন তার কাজ সম্পূর্ণভাবে স্বভাবের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। বিয়ের প্রস্তাব করার সময়ে তিনি প্রবৃত্তি দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হন, অথবা ভদ্রমহিলার ধনী হওয়ার কারণেই আকৃষ্ট হন। যদি তিনি প্রবৃত্তি দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হন, তিনি নিঃসন্দেহে বিশ্বাস করেন যে, ভদ্রমহিলার সকল গুণ রয়েছে এবং তা তার কাছে প্রস্তাব করার কারণ হয়ে দেখা দিতে পারে। প্রকৃতপ্রস্তাবে প্রবৃত্তিকে কাজের একমাত্র ভিত্তি মনে করা, প্রবৃত্তিরই আরেক রকম প্রতিক্রিয়া। তার ছেলের জন্য একটা স্কুল পছন্দ করার জটিল ব্যাপারে যেমন চিন্তা করেন, তেমনিভাবে চিন্তা করে দেখেন। সাধারণতঃ এখানে তার বিশ্বাসের সবল ভূমিকা বর্তমান। যদি প্রমাণ পান যে তার স্ত্রী তার প্রতি বিশ্বাস ত্যাগ করেছে, তাহলে তিনি প্রবৃত্তিগতভাবেই ব্যবহার করবেন। কিন্তু প্রবৃত্তির নিয়মকে পরিচালিত করে আমাদের বিশ্বাস এবং বিশ্বাসই হচ্ছে প্রবৃত্তিকে চালিত করার প্রথম কারণ।

যদিও বিশ্বাসগুলি প্রত্যক্ষভাবে আমাদের কর্মের সামান্য ভগ্নাংশের সঙ্গে মাত্র। সংযুক্ত, যে সকল কাজের জন্য আমরা বিশ্বাসের কাছে দায়ী, সেগুলো খুবই গুরুত্বপূর্ণ এবং আমাদের জীবনের সাধারণ ছক নির্ধারিত করে। বিশেষভাবে আমাদের ধর্মীয় এবং রাজনৈতিক কাজগুলো আমাদের বিশ্বাসের সঙ্গে সম্পৃক্ত।

(২) আমি এখন আমাদের দ্বিতীয় প্রশ্ন সম্বন্ধে আলোচনা করছি যার দুটো স্তর। (ক) আদতে আমাদের বিশ্বাসসমূহ কতদূর প্রমাণের উপর নির্ভরশীল এবং (খ) তাদের পক্ষে কতদূর প্রমাণনির্ভর হওয়া সম্ভব অথবা উচিত?

(ক) বিশ্বাসসমূহ প্রমাণের উপর যে পরিমাণ নির্ভরশীল, তা বিশ্বাসীরা যতো মনে করে তার চেয়ে অনেক কম। যে সকল কাজ যুক্তিসঙ্গত কাজের কাছাকাছি, সেগুলোর কথা বলা যেতে পারে; যেমন একজন ধনী কিছু টাকা খাটালেন। উদাহরণস্বরূপ আপনি দেখতে পাবেন ফ্রাঙ্কের মূল্য বাড়বে কি কমবে সে সম্বন্ধে তার যে ধারণা, তা তার রাজনৈতিক সহানুভূতির উপর নির্ভরশীল। কিন্তু তা সত্ত্বেও তার বিশ্বাস এত প্রবল যে তিনি এত টাকা লোকসানের ঝুঁকি গ্রহণ করতে প্রস্তুত।

যদি কোন কারণে তিনি দেউলিয়া হয়ে যান, অনুসন্ধান করলে দেখা যাবে, কতেক আবেগপূর্ণ আকাঙ্খই তার ধ্বংসের মূল কারণ। রাজনৈতিক মতামত প্রমাণের উপর প্রায়ই নির্ভরশীল নয়। সরকারি কর্মচারীদের প্রমাণের উপর নির্ভর করতে হয়। কিন্তু নীতি সম্বন্ধে তাদের কথা বলার কোন অধিকার নেই। অবশ্য তার ব্যতিক্রম রয়েছে। দ্রব্যমূল্য সংস্কারের ব্যাপারে পঁচিশ বছর আগে যে বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছিল তাতে অনেক শিল্পপতি যে পক্ষে গেলে তাদের ব্যক্তিগত আয় বৃদ্ধি পাবে, সে পক্ষই সমর্থন করেছিলেন এবং তাদের আয় বৃদ্ধির কথাটা যতই ঢাকা-চাপা দিয়ে রাখার চেষ্টা করা হোক না কেন, যে কোন লোক তা ধরতে পারবে। এখানে একটা জটিলতার সৃষ্টি হয়েছে। ফ্রয়েডিয়রা আমাদেরকে সকল কিছু যুক্তিসম্মত করতে অভ্যস্ত করে তুলেছেন। তার মানে হলো, যে অযৌক্তিক বিশ্বাস এবং মতামতসমূহকে যুক্তিসম্মত মনে করি, তা সত্যি কি না যাচাই করার একটা পদ্ধতি আবিষ্কার করা। বিশেষতঃ ইংরেজি ভাষাভাষী জগতে তার সম্পূর্ণ বিপরীত একটা পদ্ধতি প্রচলিত আছে, তা হলো সবকিছুকে অযৌক্তিক ছাঁচে ঢালাই করা। একজন চালাক-চতুর মানুষ কমবেশি সচেতনভাবে তার স্বার্থের স্বপক্ষে একটি বিষয়ের খুঁটিনাটি সংগ্রহ করেন। (নিঃস্বার্থ বিবেচনা অবচেতনভাবে নিজের ছেলে ছাড়া অন্য কোন ক্ষেত্রে খুবই কম হয়ে থাকে)। অবচেতন মনে, একটা সোহংবাদী নির্ভুল সিদ্ধান্ত খাড়া করে, একজন মানুষ কতকগুলো উচ্চনিনাদিত শ্লোগান আবিষ্কার করে, অথবা অন্যের কাছ থেকে ধার করে দেখান যে কিভাবে জনগণের কল্যাণের জন্য তিনি আত্মোৎসর্গ করেছেন। এ সব শ্লোগানে যে মানুষ বুদ্ধি দিয়ে বিশ্বাস করে, যতক্ষণ পর্যন্ত কল্পিত জনগণের কল্যাণ তার কাজের মাধ্যমে আসবে না, ততক্ষণ পর্যন্ত তাকে প্রমাণের সাহায্যে যাচাই করা যাবে না। এ সকল বিষয়ে মানুষ যতো অনুসন্ধিৎসার বশে চলে, ততো যুক্তির অনুসরণ করে না। তার মনের সচেতন স্তর অযৌক্তিক এবং অবচেতন স্তরে যুক্তিগত বিশ্বাস বর্তমান থাকে। চরিত্রের এই বেশিষ্ট্যই হলো ইংরেজ এবং আমেরিকানদের সাফল্যের কারণ।

চালাকি যখন প্রধান হয়ে উঠে, তখন আমাদের প্রবৃত্তির অবচেতনের চাইতে সচেতন স্তরের প্রভাবেই চালিত হয় বেশি। উদাহরণস্বরূপ ব্যবসায়ে সাফল্য লাভ করতে হলে যে প্রধান গুণগুলোর প্রয়োজন, তার কথাই ধরা যাক। নৈতিকতার দৃষ্টিকোণ থেকে সবসময়ে স্বার্থপর বলে তা খুবই নমনীয় গুণ, তা সত্বেও মানুষকে তা গুরুতর অপরাধ থেকে বিরত রাখবার জন্যে যথেষ্ট। জার্মানদের যদি এ গুণটি থাকত তাহলে তারা সীমাহীন সাবমেরিন অভিযান করত না। ফরাসিদের এ গুণটি থাকলে তারা রহুরে যেমনটি করেছিল। তেমন আচরণ করত না। নেপোলিয়ন এ গুনের অধিকারী হলে এ্যামিয়েনের সন্ধির পর আবার যুদ্ধ করতে যেতেন না। যেখানে মানুষ তাদের স্বার্থ কোথায় বোঝে না, সেখানে সে পথকে তারা সত্য বলে গ্রহণ করে, ভ্রান্ত হলেও তার বিরুদ্ধে আসল পথটি দেখিয়ে দেয়া যে আরো ক্ষতিকর তা নিয়ম হিসেবে ধরে নেওয়া যেতে পারে। সুতরাং মানুষের নিজের স্বার্থের কল্যাণের পক্ষে-যা মানুষকে বিচারশীল করে তোলে, তা কল্যাণকর। ভাগ্যের পথ প্রশস্ত করার অসংখ্য দৃষ্টান্ত রয়েছে। তার কারণ নৈতিকভাবে তারা এমন কিছু করেছে, যা তারা নিজের স্বার্থের বিপরীত বলে বিশ্বাস স্থাপন করেছে। উদাহরণস্বরূপ প্রাথমিক কোয়েকারদের সময়ে কিছু সংখ্যক দোকানদার তাদের যে পরিমাণ দাবি তার চাইতে বেশি না-চাওয়ার নীতি গ্রহণ করে। অন্যান্য দোকানদারের মতো দরাদরি না করে সকলে একদরে মাল বিক্রয় করতে থাকেন। তারা এ নীতি গ্রহণ করেছিলেন, কারণ তাদের বিশ্বাস ছিল যা ন্যায্য দাবী, তার চাইতে বেশি চাইতে গেলে মিথ্যা বলা হবে। কিন্তু গ্রাহকদের সুবিধা এত বেড়ে গেল যে সকলে তাদের দোকান থেকে সওদা নিতে লাগল এবং তারা ধনী হয়ে গেলেন। (এটা আমি কোথায় পড়েছি তা ভুলে গেছি, কিন্তু আমার মনে হচ্ছে কোন বিশ্বাসযোগ্য বইতেই পড়েছিলাম।) চালাকির থেকেও একই পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়েছিল বলা যেতে পারে, কিন্তু তাদের কেউ অতিরিক্ত চালাক ছিলেন না। সচেতন বিশ্বাস আমাদের যে পরিমাণ ভালো করে তার চেয়ে বেশি ঈর্ষাপরায়ণ করে তোলে। সুতরাং মানুষ যে সকল কাজ স্বতঃস্ফূর্তভাবে করে সেগুলো নিজের স্বার্থের প্রতিকূলে। যে সকল মানুষ সচেতন বুদ্ধি দিয়ে যতটুকু সম্ভব আবেগ থেকে বিচ্ছিন্ন করে চিন্তা করে, আসে তাদের কথা। তৃতীয়তঃ তাদের কথা আসে, যারা অপরের ধ্বংস সাধন করতে গিয়ে নিজেদেরকে ধ্বংস করে। ইউরোপের শতকরা ৯০ জন মানুষ এই শেষোক্ত শ্রেণীর অন্তর্ভূক্ত।

সে যাহোক আমি আমার আসল বক্তব্য বিষয় থেকে কিছুদূর সরে পড়েছি; কিন্তু অচেতন যুক্তি চালাকিকে সচেতন চিন্তা-বৈচিত্র থেকে আলাদা করার প্রয়োজন ছিল। মামুলি শিক্ষাপদ্ধতি আমাদের সচেতন মনোবৃত্তির উপর কোন প্রতিক্রিয়া করতে পারে না, বর্তমান পদ্ধতির সাহায্যে চালাকি শিক্ষাও দেয়া যায় না। নৈতিকতা যেখানে স্বভাবের মধ্যে প্রোথিত নয়, সেক্ষেত্রে বর্তমান পদ্ধতির সাহায্যে শিক্ষা দেয়া যায় না। যারা সদাসর্বদা পরামর্শের আলোচনা করে থাকে তাদের মধ্যে কোথাও আমি কল্যাণকর প্রতিক্রিয়া দেখতে পাই নি। সুতরাং আমাদের বর্তমান ধারা অনুসারে সকল প্রকারের স্বতঃস্ফূর্ত প্রচেষ্টা বুদ্ধিবৃত্তিক পন্থার মাধ্যমে সুসম্পন্ন করতে হবে। মানুষকে ধার্মিক অথবা চালাক করার কোন পন্থা আছে বলে আমাদের জানা নেই, কিন্তু কিছুদূর পর্যন্ত তাকে যুক্তিবাদীতা কিভাবে শিক্ষা দিতে হয় তা আমরা জানি। প্রত্যেকটি বিষয়ে শিক্ষাবিভাগীয় কর্মকর্তারা যা করেন তার বিপরীতে কিছু করতে শিক্ষা দেয়া হলেই তা করা হবে। তারপরে আমরা তার সনালী গ্রন্থিগুলোর ক্ষরণ নিয়ন্ত্রণ অথবা বৃদ্ধি করে তার মধ্যে গুণের বিকাশ ঘটাতে পারি। কিন্তু বর্তমান মুহূর্তে গুণের সৃষ্টি করার চাইতে যুক্তিবাদীতার সৃষ্টি করা অধিকতর সহজ, সে যুক্তিবাদীতার অর্থ হলো, মনের এক প্রকার বৈজ্ঞানিক স্বভাব, যা আমাদের কাজের প্রতিক্রিয়া সম্বন্ধে ভবিষ্যদ্বাণী করতে পারে।

(খ) মানুষের কাজ কতটুকু যুক্তিবাদী হতে পারে অথবা কতটুকু তার যুক্তিবাদী হওয়া উচিত, এখন আমি সে প্রশ্ন আলোচনা করছি। কতটুকু যুক্তিবাদী হওয়া উচিত, তাই প্রথম আলোচনা করা যাক। আমার মতে মনের নির্দিষ্ট গণ্ডীর মধ্যে বিচারবুদ্ধি সীমিত থাকা প্রয়োজন। বিচার-বুদ্ধির আক্রমণে জীবনের কতকগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ধ্বংস হয়ে গেছে। লাইবনিজ বুড়ো বয়সে একবার খবরের কাগজের একে প্রতিনিধিকে বলেছিলেন যে তিনি পঞ্চাশ বছর বয়সে এক ভদ্রমহিলার কাছে বিয়ের প্রস্তাব করতে কিছুদিন সময় চাইলেন। এই সময়ের মধ্যে তিনি বিবেচনা করে দেখে প্রস্তাব বাতিল করলেন। তার আচরণ যে বিচারবুদ্ধিসম্পন্ন তাতে সন্দেহ করবার কোন হেতু নেই। কিন্তু আমি প্রশংসা করি তা বলতে পারব না।

শেক্সপিয়র পাগল, প্রেমিক এবং কবিদেরকে এক সূত্রে সম্পূর্ণভাবে কাল্পনিক জীব বলে অভিহিত করেছেন। এখন প্রশ্ন হলো, কিভাবে উন্মাদদের বাদ দিয়ে পাগল এবং প্রেমিকদেরকে নেয়া যেতে পারে। আমি তার একটা দৃষ্টান্ত দিচ্ছি।

ওল্ডভিক নাট্যমঞ্চে ১৯১৯ সালে ট্রোজান উ’ম্যান নাটকের অভিনয় দেখি। সে নাটকে অস্ট্রান্যাক্স দ্বিতীয় হেক্টর হয়ে যেতে পারে, সে আশঙ্কায় তাকে হত্যা করার একটি মর্মান্তিক দৃশ্য আছে। থিয়েটারে কোন দর্শকের চোখ শুষ্ক ছিল না। তবু দর্শকেরা যে গ্রিক নির্মমতা দেখেছিল, তা তাদের কাছে মোটেই বিশ্বাসযোগ্য ছিল না। তা সত্বেও যে সব লোক থিয়েটারে কেঁদেছিল, সে মুহূর্তে এমন এক হৃদয়হীনতাকে প্রত্যক্ষ করেছিল, যা ইউরিপিডিসের কল্পনায় অসহনীয় হয়ে উঠেছিল। যা জার্মানিকে বিচ্ছিন্ন করে রেখেছিল। এ সকল বিচ্ছিন্নকরণের ফলে অসংখ্য শিশুর যে মৃত্যু হয়েছে, তাতো সকলের জানা কথা। কিন্তু তারা অনুভব করেছিল তার ফলে শত্রুদেশের জনসংখ্যা হ্রাস পাবে। তা তাদের পিতৃপুরুষের গর্ব ধ্বংসকারী অস্ট্রান্যাক্সকে ধ্বংস করার মতো। ইউরিপিডিস দর্শকদের কল্পনায় প্রেমিককে জাগিয়েছিলেন কিন্তু তাদের কল্পনা থেকে প্রেমিক কবির স্মৃতি থিয়েটার হলের দরজাতেই মুছে গিয়েছিল। উন্মাদেরা (নরহত্যার রোগে যারা ভুগছে) যে সকল মানুষ নিজেদেরকে দয়ালু এবং ধার্মিক মনে করে সে সকল নরনারীর রাজনৈতিক কার্যকলাপ নিয়ন্ত্রিত করেছিল।

উন্মাদসত্তাকে বাদ দিয়ে কবি এবং প্রেমিকসত্তাকে কি অটুট রাখা সম্ভবপর? আমাদের সকলের মধ্যে এ তিন সত্তা বিভিন্নভাবে বর্তমান। কিন্তু সেগুলো কি এতই অবিচ্ছিন্ন যে, একটাকে নিয়ন্ত্রণের অধীনে আনলে অন্যটা ধ্বংস হয়ে যাবে। আমি তা বিশ্বাস করি না। আমি বিশ্বাস করি আমাদের মধ্যে কিছু শক্তি রয়েছে, যা বুদ্ধিবৃত্তির সাহায্যে অনুপ্রাণিত নয়-এমন সব কাজের মধ্য দিয়ে প্রকাশ পেতে পারে। অবস্থাভেদে শিল্পকলা আবেগময় ভালোবাসাও আবেগময় ঘৃণার মধ্যে তার প্রকাশ ঘটাতে পারে। পরস্পরা নিয়মানুবর্তিতা এবং সময়সূচি হলো আধুনিক শিল্পব্যবস্থার লৌহশৃঙ্খল, যা আমাদের ভালোবাসাকে অকেজো করে ফেলেছে, যাতে করে তা সৃজনশীল এবং প্রধান না হয়ে একদেশদর্শী হয়ে উঠেছে। যে জিনিশ সম্পূর্ণভাবে স্বাধীন এবং মুক্ত হওয়া উচিত ছিল, তার উপর বিধি-নিষেধের আরোপ করা হয়েছে। পক্ষান্তরে সমস্ত যাজকদের আশীর্বাদের এত হিংসা-দ্বেষ ঘৃণা এবং অত্যাচারকে মুক্ত করা হয়েছে। আমাদের প্রবৃত্তিগত প্রক্রিয়ার দুটি অংশ। একটি আমাদের জীবনকে আমাদের বংশধরের মধ্যে দীর্ঘতর করে, অন্যটি আমাদের কল্পিত শত্রুদের জীবনকে ধ্বংস করতে চায়। প্রথমটির মধ্যে আছে জীবনের আনন্দ ভালোবাসা এবং শিল্পচেতনা, যা আমাদের ভালোবাসার মনস্তাত্ত্বিক প্রকাশ। দ্বিতীয়টির মধ্যে আছে প্রতিযোগিতা দেশপ্রেম এবং যুদ্ধ। প্রচলিত নৈতিকতা প্রথমটাকে অবদমন করে দ্বিতীয় প্রবৃত্তিকে ত্বরান্বিত করে। কিন্তু সত্যিকারের নৈতিকতার ক্রিয়া হবে এর বিপরীত। আমরা যাদেরকে ভালোবাসি তাদের সঙ্গে আমরা প্রবৃত্তিগতভাবে আচরণ করতে পারি এবং যাদেরকে ঘৃণা করি তাদের বেলায় আমাদের যুক্তিসম্মত আচরণ করা উচিত। আধুনিক বিশ্বে যাদেরকে আমরা সক্রিয়ভাবে ঘৃণা করি তারা হলো দূরবর্তী মানুষ, বিশেষ করে বলতে গেলে বিদেশী জাতিসমূহ। আমরা তাদের সম্বন্ধে বিমূর্তভাবে ধারণা পোষণ করি এবং যেসব কাজ ঘৃণ্য এবং জঘণ্য সেগুলোর বিচারে প্রেম অথবা তেমন উচ্চাদর্শের বশবর্তী হয়ে তাদের ক্ষতি করে নিজেদেরকে প্রতারিত করি। একমাত্র অধিকমাত্রায় সংশংয়বাদই, যে-আবরণের অন্তরালে সত্য লুকিয়ে থাকে তা দূরীভূত করে আমাদের চোখে সত্যকে জাজ্বল্যমান করে তুলতে পারে। তাতে সফলতা অর্জন করতে পারলে আমরা নতুন নৈতিকতার জন্ম দিতে পারব, যার ভিত্তি প্রতিবন্ধকতা এবং হিংসার মধ্যে প্রোথিত নয়, বরং তা সম্পূর্ণ জীবনের আকাক্ষার রূপায়নে দেদীপ্যমান। হিংসার রোগ থেকে আরোগ্যলাভ করলে মানুষকে তার পথের বাধা মনে না করে সহায়ই মনে করবে। এটা কোন কাল্পনিক আকাক্ষা নয়, রাণী প্রথম এলিজাবেথের যুগে অংশতঃ এর বাস্তবায়ন হয়েছিল ইংল্যাণ্ডে এবং যদি মানুষ অন্যের ক্ষতি না করে নিজের আনন্দ খুঁজে নিতে পারে তাহলে আগামীকাল তার বাস্তবায়ন সম্ভব। এটা, আয়ত্ব করা অসম্ভব-এমন কোন নৈতিকতা নয়। কিন্তু তা গৃহীত হলে আমাদের পৃথিবীর স্বর্গরাজ্যে পরিণত হবে।

 ০২. স্বপ্ন এবং বাস্তব

আমাদের বিশ্বাসসমূহে আমাদের আকাঙ্ক্ষার প্রভাব যদিও সধারণ জ্ঞান এবং পর্যবেক্ষণের বিষয়, তবু এ সকল বিশ্বাসের গতি-প্রকৃতি নির্ধারণ করতে গিয়ে বিস্তর ভুল ধারণা পোষণ করা হয়েছে। রীতিগতভাবে আমরা ধরে নিই যে আমাদের বেশির ভাগ বিশ্বাসের পেছনে সত্যের অকুণ্ঠ সমর্থন রয়েছে, যদিও আমাদের আকাঙ্ক্ষাগুলো সাময়িক বিরোধসৃষ্টিকারী শক্তি ছাড়া আর কিছুই নয়। কিন্তু সোজাসুজি বিপরীত বিন্দুর কাছাকাছি কোথাও আসল সত্যের অবস্থিতি। যে সব বিশ্বাস আমাদের দৈনন্দিন জীবনধারণের প্রধান অবলম্বন, তাতে অনেক আকাক্ষা বিম্বিত হয়ে ওঠে, আবার সে আকাক্ষা সমূহই এখানে-সেখানে রূঢ় বাস্তবের কঠিন আঘাতে পরিশুদ্ধি লাভ করে। আদতে মানুষ স্বাপ্নিক, তবে বাইরের পৃথিবীর বিচিত্র সংঘাতে মাঝে মাঝে জেগে ওঠে, কিন্তু খুব শিগগীরই আবার কল্পনার সুখের জগতে স্বেচ্ছায় ঝাঁপ দেয়। ফ্রয়েড দেখিয়েছেন স্বপ্নের চিত্রায়নের মধ্যে আমাদের অপূর্ণ কামনারা পরিতৃপ্তি লাভ করে। দিবাস্বপ্ন সম্বন্ধেও তার কথা একইভাবে সত্য। তার উপসংহারে তিনি যেগুলোকে দিবাস্বপ্ন বলে আখ্যায়িত করেছেন, সেগুলোকে আমরা বিশ্বাস বলে ধরে নিতে পারি।

তিনটি নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে আমাদের মনের অচেতন স্তরের অন্বিষ্ট বিশ্বাসের বিশ্লেষণ সম্ভব। মনঃসমীক্ষণ (Psycho analysis) মনের উন্মাদ হিষ্টিরিয়াগ্রস্ত জটিল পরিস্থিতি বিশ্লেষেণ করে মনের ধ্রুব প্রকৃতির দিক দিয়ে সুস্থ ও রোগাক্রান্ত ব্যক্তির তফাৎ কত স্বল্প তাই দেখানো হয়। (Sceptical) সংশয়াত্মক পদ্ধতিতে দার্শনিকেরা আমাদের অন্তরলালিত বিশ্বাসসমূহের প্রমাণপঞ্জী যে কত দুর্বল তাই স্পষ্ট করে তোলেন। সর্বশেষ হলো সাধারণ পর্যবেক্ষণ (common observation) পদ্ধতি। এই সর্বশেষ পদ্ধতিটিই আমার বিবেচ্য বিষয় হিসেবে ধরে নিচ্ছি।

নৃতত্ত্ববিদদের পরিশ্রমের কল্যাণে আমরা সভ্যতার সৌরভবর্জিত আদিম অসভ্যদের সম্বন্ধেও জানতে পেরেছি। তারাও সজ্ঞানে অজ্ঞানতার অন্ধকারে বিচরণ করে না একথা সত্য; কিন্তু কোন কিছু সুস্পষ্টভাবে বুঝে ওঠার মতো তেমন প্রখরও নয় তাদের চেতনা। পক্ষান্তরে তাদের কাছে অসংখ্য সংস্কার, যা চেতনার গভীরে এত সুদৃঢ়ভাবে প্রোথিত যে জীবনের প্রায় সব প্রয়োজনীয় কার্যক্রম নিয়ন্ত্রিত করে সে অন্ধবিশ্বাস। তাদের অনেকেরই ধারণা, কোন প্রাণী কিংবা যোদ্ধার মাংসভক্ষণ করলে ঐ প্রাণী বা যোদ্ধা জীবদ্দশায় যে-সকল গুণের অধিকারী ছিল তা আয়ত্ব করা যায়। আবার অনেকে দলপতির নাম মুখে আনাকে মৃত্যুদণ্ডনীয় পবিত্রতা হানিকর কাজ বলে মনে করত। এমনকি তারা রাজা বা দলপতির নামের কোন অংশের সংগে সামঞ্জস্যপূর্ণ নাম উচ্চারণ করবার বেলায় ঐ অংশটির পরিবর্তন করে ফেলত। যেমন তাদের রাজার নাম জন, সুতরাং তারা জনকুইলকে উচ্চারণ করবে জর্জ কুইল ইত্যাদি ইত্যাদি। কৃষিভিত্তিক সমাজে পদার্পণ করার সঙ্গে সঙ্গে যখন তাদের খাদ্যের জন্য আবহাওয়ার ওপর নির্ভর করতে হলো অত্যধিক পরিমাণে, তখন থেকে মন্ত্রোচ্চারণ এবং হোমাগ্নি জ্বালিয়ে রোদবৃষ্টির সঞ্চার করা যায় বলে তারা বিশ্বাস করতে থাকে। তারা আরো বিশ্বাস করত খুনী ব্যক্তির প্রেতাত্মা প্রতিশোধস্পৃহায় হত্যাকারিকে খুঁজে বেড়ায়। আবার অতি সহজ ছদ্মবেশে যেমন মুখ রাঙ্গিয়ে অথবা শোকের লেবাস পরে প্রতিশোধকামী প্রেতাত্মাকে ফাঁকি দেয়া যায়। খুনে ভীতুদের কাছ থেকে বিশ্বাসের অর্ধাংশের উৎপত্তি এবং বাকি অর্ধাংশের জন্ম দিয়েছে খুনীরা।

অযৌক্তিক বিশ্বাস শুধুমাত্র অসভ্যদের মধ্যে সীমিত নয়। মানব সমাজের অধিকাংশ মানুষ, যাদের ধর্মমত আমাদের মতো নয়, আমরা বলতে পারি ওগুলো অযৌক্তিক ভিত্তিহীন। রাজনীতিবিদ ছাড়া আর যারা রাজনীতিতে আগ্রহশীল, অসংখ্য প্রশ্নে তারা সংস্কারমুক্ত একজন মানুষ সম্পর্কে কোন যুক্তিসম্মত ধারণা পোষণ করতে পারে না। পরাজয়ের যতই ন্যায়সঙ্গত কারণ থাকুক না কেন, নির্বাচনের সময় স্বেচ্ছাসেবকেরা আশা পোষণ করে যে আপন পক্ষের জয় অবশ্যম্ভাবী। ১৯১৪ সনে জার্মানির অধিকাংশ নাগরিক বিন্দুমাত্র সন্দেহ না রেখে জার্মানির সর্বৈব বিজয় সম্পর্কে নিশ্চিত আশা পোষণ করেছিল, সে ক্ষেত্রে বাস্তব সত্যের সঙ্গে সংঘাতে স্বপ্ন মার খেয়েছে। অজার্মান ঐতিহাসিকেরা যদি কোনকারণে সে ইতিহাস রচনা থেকে বিরত থাকেন, তাহলে স্বপ্নের আবার পুনর্জাগরণ ঘটবে। প্রারম্ভিক বিজয়ের কাহিনী বারবার নিনাদিত হবে এবং অন্তিম পরাজয়ের কথা বেমালুম ভুলে যাবে।

শিষ্টাচার হলো মানুষের বিশ্বাসের সেই স্তরের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করা, বিশেষভাবে যা তার অথবা তার দলের অন্যান্যদের মেধার পরিচিতি বহন করে। যেখানেই থাকুক না কেননা বিশ্বাসের একটা বেষ্টনী প্রত্যেক মানুষকে ঘিরে থাকে। গ্রীষ্মের দিনে মাছির মতো এ সবও মানুষের সঙ্গে সঙ্গে গমন করে। এরই মধ্যে কতেক ব্যক্তিগত, তাতে ব্যক্তির গুণাবলী সূতাবোধ,বন্ধুপ্রীতি পরিচিতজনের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ চরিত্রের গোলাপি সুষমা ইত্যাদি পরিচয় বিধৃত থাকে। তারপর আসে পারিবারিক সংস্কৃতিচেতনার কথা। ইদানীংকালে দুর্লভ তার বাবার ঋজু মনোভঙ্গী, ছেলেমেয়েদের মানুষ করার ব্যাপারে তারা অসম্ভব কড়াকড়ি, যা বর্তমানে পিতামাতার কাছে স্বপ্নের মতো মনে হবে। স্কুলের খেলাধুলায় তার ছেলেরা কিভাবে আর সকলকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে এবং তার মেয়েরা যেমন যাকে তাকে বিয়ে করে না বসে ইত্যাদি, ইত্যাদি। তার ওপরে আসে তার শ্রেণীগত বিশ্বাসের কথা, যা তার সামর্থের মধ্যে সবচেয়ে বেশি সামাজিক এবং অথবা সবচেয়ে বেশি বুদ্ধিমান কিংবা নৈতিকতার দিক দিয়ে অন্যান্য সম্প্রদায়ের তুলনায় সবচেয়ে বেশি কাক্ষিত। যদিও সকলে একবাক্যে স্বীকার করে যে প্রথমটি দ্বিতীয়টির চেয়ে এবং দ্বিতীয়টি তৃতীয়টির চেয়ে অধিকতর কাম্য। জাতিগতভাবে মানুষ কতগুলো আনন্দিত কল্পনাকে বিশ্বাস বলে গ্রহণ করে। মানবমনের গভীর আকুতির ভাষারূপ দিতে গিয়ে একটি কথার মধ্যে মি. পডস্ন্যাপ (Mr. Podsnap) বলেছেন, ওহ্ বিদেশী জাতিগুলো, তাদের সম্পর্কে কিছু বলতে আমরা দুঃখিত, তারা এই করে, এই তাদের রীতি। নিরঙ্কুশ মানবিক অথবা পাশব সৃষ্টির তুলনায় সর্বনরের সাধারণ পরিচয়বিধৃত থিয়োরিসমূহে শেষপর্যন্ত আমাদের আসতে হয়। মানুষের আছে আত্মা, পশুর তা নেই। মানুষ বিবেচনাসম্পন্ন জীব বলেই তার কোন বিশেষ নির্দয় এবং প্রকৃতিবিরুদ্ধ কাজকেই পাশবিক বলা হয়, যদিও সেসকল কাজ আদতে মানবিক। স্রষ্টা তো আপন স্বরূপের প্রতিরূপেই যদিও মানুষ সৃষ্টি করেছেন। সুতরাং মানুষের কল্যাণই হলো ব্রহ্মাণ্ড সৃষ্টির চরম উদ্দেশ্য।

.

সুতরাং আনন্দদায়ক বিশ্বাসসমূহের অনুকূলে কাজ করে যাই আমরা। কারো সঙ্গে প্রীতির সম্পর্ক রাখতে হলে এ সকল বিশ্বাস যেগুলো তার নিজস্ব, পারিবারিক জাতীয় এবং যেগুলো সকল মানুষের জন্য সমানভাবে আনন্দদায়ক তার প্রতি অবশ্যই শ্রদ্ধাশীল হতে হবে। কোন মানুষকে সামনে কিছু না বলতে পারলে তার পেছনেও কিছু বলা উচিত নয়। মনের সঙ্গে মনের দূরত্ব যত বেশি বাড়ছে মতের বিভিন্নতাও বাড়ছে তত বেশি। নিজের ভায়ের সঙ্গে কথা বলার সময় তার পিতামাতার প্রতি সচেতন শ্রদ্ধাশীলতা পোষণ করার প্রয়োজন নেই। কিন্তু বিদেশীদের সঙ্গে কথা বলার সময় শিষ্টাচার প্রদর্শনের প্রয়োজন হয় সর্বাপেক্ষা বেশি, যা উগ্র স্বদেশীদের কাছে অসম্ভব, যেহেতু তারা তাতে অভ্যস্ত নয়। বাইরে ভ্রমণ করেনি, এমন একজন আমেরিকানের সঙ্গে একবার আমার দেখা হয়েছিল। সামান্য কয়েকটি বিষয় ছাড়া বৃটিশ সংবিধানের সঙ্গে আমেরিকান সংবিধানের কোন প্রভেদ নেই, একথা শুনে ভদ্রলোক ভয়ানক চটে গিয়েছিলেন। পূর্বে তিনি কখনো এরকম মতামত শোনেন নি এবং কেউ যে সে মতামত গ্রহণ করতে পারে তাও ছিল তার কল্পনার অতীত। আমরা দুজনেই শিষ্টতা দেখাতে অক্ষম হয়েছিলাম বলে ফল দাঁড়ালো মারাত্মক।

সামাজিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে শিষ্টাচার প্রদর্শনের অক্ষমতা খুবই খারাপ, কিন্তু প্রাচীন কুসংস্কারকে ছেদন করবার কারণে শিষ্টাচার প্রদর্শন না করাটা খুবই প্রশংসনীয়। দু’উপায়ে আমাদের স্বভাবজ বিশ্বাসই সমূহ পরিশুদ্ধি অর্জন করে। প্রথম হলো বস্তুর সঙ্গে বিশ্বাসকে যাচিয়ে নেয়ার পদ্ধতি, যেমন অনেকে বিছুটিকে ব্যাঙের ছাতা বলে মনে করে কষ্ট পেয়ে থাকে। দ্বিতীয়তঃ আমাদের বিশ্বাস সোজাসুজি বস্তুর সঙ্গে সংঘাত না বাধিয়ে ভিন্নমতের কারো সঙ্গে যখন সংঘাত বাধায় তা যাচাই করা। কেউ মনে করে শুকরের মাংস খাওয়া আইনানুগ আর কেউ গরুর মাংস খাওয়াকেই আইনানুগ মনে করে না। মতামতের এই বিভিন্নতার স্বাভাবিক পরিণতি হলো রক্তপাত। কিন্তু সে সঙ্গে বেরিয়ে আসবে একটি বিবেচনাপ্রসূত মাঝামাঝি পথ এবং তা অনেকটা এরকম, দুটোর কোনটাতেই দোষ নেই। শিষ্টাচারের সঙ্গে তার সম্বন্ধ হলো খুবই সুনিবিড়। তার মানে হলো যাদের সঙ্গে কথা বলছি তাদের চেয়ে নিজেদেরকে এবং নিজেদের ধনসম্পদকে নগণ্য দেখার ভান করা। একমাত্র চীনদেশেই এ নীতি সর্বত্র ব্যাপকভাবে অনুসৃত হয়। আমাকে বলা হয়েছে যদি কোন চীনাকে তার স্ত্রী এবং সন্তানের স্বাস্থ্য পানের উদ্দেশ্যে কোন মান্দারিন যদি আক্রমণ করেন, তিনি বলবেন, আমার স্ত্রীর মতো একজন কৃপাকাঙ্খীনি রোগাক্রান্তা খর্বাঙ্গীনির স্বস্থ্যোলাসে আপনার মতো একজন মহানুভব ব্যক্তি আহবান করেছেন, সেহেতু আমার আনন্দের অবধি নেই। এ ধরণের লেহাজ দুরস্ত করে বলার জন্যে জীবনের আয়েশ এবং সম্মান দুইয়েরই প্রয়োজন। কিন্তু বর্তমান ব্যবসা আর রাজনীতির দ্রুত সংযোগের ব্যাপারে তা একেবারে অসম্ভব। ধাপে ধাপে অন্য মানুষের সঙ্গে সংসর্গের ফলে সবচেয়ে কার্যকরী ধারণা ছাড়া আর সবগুলো ধ্বংস হয়ে যায়, ব্যক্তিগত বিশ্বাস ভাইয়ের সঙ্গে মেলামেশার ফলে নষ্ট হয়ে যায়, পারিবারিক সংস্কার স্কুলের সতীর্থদের প্রভাবে নষ্ট হয়, শ্রেণীগত সংস্কার রাজনীতির প্রভাবে এবং জাতিগত সংস্কার যুদ্ধে পরাজয় অথবা অর্থনীতিতে মার খাওয়ার ফলে ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। কিন্তু মানবিক ধরণা সবসময়ে অটুট তাকে এবং মানুষের আদানপ্রদানের যে ক্ষেত্র তাতে নতুন সংস্কার জন্ম নেয়ার যথেষ্ট সম্ভাবনা বিদ্যমান থাকে। এ ধরণের ভ্রান্তধারণার আংশিক পরিশুদ্ধি মিলে বিজ্ঞানে, কিন্তু তা কখন আংশিকের বেশি হতে পারে না। কিছু সংখ্যক বিশ্বাসের ভিত্তির উপর দাঁড় না করালে পরে বিজ্ঞান নিজের আঘাতে ধ্বংসপ্রাপ্ত হবে।

.

০২.

মানুষের ব্যক্তিগত অথবা দলগত স্বপ্ন হাস্যাস্পদ হতে পারে, কিন্তু যারা সামগ্রিকভাবে মানবিকতার স্বপ্নে বিশ্বাসী তারাও মানবিকতার পরিমণ্ডলে ছাড়িয়ে যেতে পারে না। জ্যোতির্বিদ্যার মাধ্যমে অন্তত ব্রহ্মাণ্ডের সম্বন্ধে আমাদের পরিচয় হয়েছে। টেলিস্কোপের মাধ্যমে যতটুকু দেখতে পারি তার বাইরে কি আছে কেউ বলতে পারে না। কিন্তু যেটুকু সম্বন্ধে আমরা জ্ঞান লাভ করতে পারি তা-ও অসীম অনন্ত। দৃশ্যমান ব্রহ্মাণ্ডের এক ভগ্নাংশ হলো ছায়াপথ, সৌরজগত হলো ছায়াপথের ক্ষুদ্রতর ভগ্নাংশ এবং এ সৌরজগতের ভগ্নাংশে আমাদের গ্রহটি হলো অনুবীক্ষণ। যন্ত্রের সাহায্যে প্রতীয়মান একটি কৃষ্ণকার বিন্দুমাত্র। এই ক্ষুদ্রবিন্দুতে একজাতীয় জলজ পদার্থের সঙ্গে পদার্থগত এবং রাসায়নিক গুণে সমৃদ্ধ অস্বাভাবিক গঠনের একজাতীয় কয়লার চাঙর নির্দিষ্ট কোন অবয়ব পরিগ্রহ করার আগ পর্যন্ত, কয়েক বছর ধরে নড়ে-চড়ে বেড়াত। তারা সময়কে বিভক্ত করে একদিকে নিজেরা অবয়ব রক্ষার এবং অপরদিকে সবকিছুকে তাদের মতো করে গড়ে তুলবার মানসে প্রচণ্ড সংগ্রাম পরিচালনা করতে থাকে। সাময়িক প্রাকৃতিক বিপর্যয় তাদেরকে হাজারে হাজারে ধ্বংস করে ফেলল। রোগ অকালে অনেককে ছিনয়ে নিয়ে গেল। এগুলোকে দুর্ভাগ্য বলে গণ্য করা হতো। কিন্তু মানুষ যখন নিজের চেষ্টায় সমপরিমাণ ক্ষতিসাধন করতে সক্ষম হলো তখন তারা আনন্দিত হয়ে বিধাতাকে ধন্যবাদ দিল। সৌরজগতের বয়সের তুলনায় মানুষের যখন সশরীরে বসবাস সম্ভব হলো তা অকিঞ্চিৎকর। কিন্তু এমন বিশ্বাস করারও অবকাশ রয়েছে যে বর্তমানের আগেও মানুষ পৃথিবীতে বসবাস করে নিজেদের মধ্যে দ্বন্দ্ববিবাদের ফলে ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছে। বাইরে থেকে দেখলে এভাবেই মনবজীবন সম্বন্ধে চিন্তা করা যায়।

আমাদের বলা হয়েছে যে জীবন সম্পর্কে এরকম দৃষ্টিভঙ্গি অসহনীয়, কেননা তার ফলে যে প্রবৃত্তির বলে মানুষ বেঁচে আছে, তারই ধ্বংসসাধন হবে। দর্শন এবং ধর্মের মধ্যে তারা এ প্রবৃত্তিকে এড়িয়ে যাবার পথ খুঁজতে চেষ্টা করেছেন। বাইরের পৃথিবীতে যথেষ্ট অরাজকতা ও বিশৃঙ্খলা থাকলেও তাদের কল্যাণে জানতে পেরেছি, পৃথিবীর মর্মমূলে একটা শৃঙ্খলাবোধ অবশ্যই আছে। আদি নিহারিকার যুগ থেকে প্রত্যেকটি দীর্ঘস্থায়ী পরিবর্তনের মাধ্যমে মানুষের উন্নতি সাধিত হয়েছে একথা ধরে নেয়া হয়। ‘হ্যামলেট খুবই জনপ্রিয় নাটক, তাহলেও অল্পসংখ্যক পাঠকের মনেই প্রথম নাবিকের সংলাপ মনে থাকার কথা। যা মাত্র চারটি শব্দের মধ্যে সীমাবদ্ধঃ আল্লাহ্ আপনার মঙ্গল করুন। কিন্তু ধরুন একটা সমাজ, যেখানে প্রত্যেক মানুষের জীবনের একমাত্র কর্তব্য হলো এই ভূমিকায় অভিনয় করা, হোরেসিও কিংবা হ্যামলেটের সঙ্গে তাদেরকে বিচ্ছিন্ন করে দেখুন; তাহলে তারা কি বিশেষ ধরনের সাহিত্য সমালোচনা আবিষ্কার করবে না, যেখানে প্রথম নাবিকের চারটি শব্দই হবে নাটকের একমাত্র উপজীব্য বিষয়। তাদের সমাজে কোন লোক যে অন্যান্য অংশকেও সমান প্রয়োজনীয় মনে করে তাকে শাস্তি অথবা নির্বাসনদণ্ড কি দেবে না? হ্যামলেট নাটকে প্রথম নাবিকের উক্তি যেমন তেমনি ব্রহ্মাণ্ডের তুলনায় মানুষের পরমায়ুও ততটুকু সংক্ষিপ্ত। আমরা নাটকের অন্যান্য দৃশ্য, চরিত্র এবং ঘটনা সম্পর্কে কিছুই জানতে পারি না।

যখন আমরা মানুষের সম্পর্কে চিন্তা করি তখন প্রাথমিকভাবে নিজেদেরকে মানবজাতির প্রতিভূ হিসেবে ধরে নেই এবং তারপরে বিবেচনা করি যে তার নিরাপত্তার প্রয়োজন অপরিহার্য। ধরে নেয়া যাক, মি. জোনস হলেন এমন একজন মুদী দোকানদার, যিনি কোন গীর্জার শাসন মানেন না, কিন্তু তিনি তার অনন্ত জীবন সম্পর্কে একেবারে স্থির নিশ্চিত; তাই যে কেউ তার বিরোধিতা করলে তিনি তা মোটেই সহ্য করবেন না। কিন্তু তিনি যখন তার প্রতিদ্বন্দ্বী এ্যাঙ্গলিকান গির্জার মি. রবিনসন, যিনি চিনিতে বালি মিশান, তার সম্পর্কে ভাবেন তখন তার অনুভূতিতে জেগে ওঠে যে ব্রহ্মাণ্ডের এখন সুবিচার পুরামাত্রায় বিরাজমান। তখন তার সুখের জন্য মি. রবিনকে আগুনে পোড়াবার প্রয়োজন হয়ে পড়ে। এভাবে মানুষের মহাজাগতিক প্রয়োজনসমূহকে রক্ষা করা হয়। কিন্তু বন্ধুত্ব এবং শত্রুতার মধ্যবর্তী প্রভেদগুলো দুর্বল এবং সার্বজনীন প্রীতির আবরণে ঢেকে রাখা যায় না। মি. রবিনসনও অংশতঃ বাদ দিয়ে মানুষের সুখ-সন্তুষ্টি মতবাদে বিশ্বাস করেন।

কোপার্নিকাসের পূর্ববর্তী সময়ে দর্শনে পৃথিবীর কেন্দ্রাভিমূখীতা রক্ষা করার কোন প্রয়োজন ছিল না। দৃশ্যমানভাবে জ্যোতিষ্কমণ্ডলী পৃথিবীর চারপাশে ঘুরে বেড়াত। কিন্তু পৃথিবী যখন কেন্দ্রীয় অবস্থান থেকে বিচ্যুত হলো মানুষও তার প্রাধান্য থেকে ছিটকে পড়ল। তাই বিজ্ঞানের স্থূলতা নিরসনের জন্য একধরনের মননশীল শক্তির প্রয়োজন দেখা দিল।

যারা এ মহৎ কর্তব্য করার গৌরব অর্জন করলেন, তাদেরকে বলা হয়ে থাকে আদর্শবাদী। বিশ্বে যা কিছু চোখে দেখা যায়, তাঁদের মতে সব কিছুই অলীক। পক্ষান্তরে, আমাকেই তারা একমাত্র সত্য হিসেবে ধরে নিলেন। এই আত্মিক শক্তিতে বলবানেরা সাধারণের উপর প্রভাব বিস্তার করলেন। গৃহের চেয়ে ভালো কোন স্থান খুঁজে না পেয়ে তারা শেখালেন সব জায়গা গৃহের মতো হেগেল পৃথিবীকে তার সমকালীন প্রাশ্যান সাম্রাজ্যের সঙ্গে তুলনা করেছেন বেশি জোর দিয়ে। এসব মতবাদের স্বপক্ষে এত ফাপান-ফোলান যুক্তি প্রদান করা হয়েছে, স্বয়ং মতবাদ প্রণেতারা নিজেদেরকে মানুষের আশা আকাঙ্ক্ষা থেকে বিযুক্ত করে রেখেছেন। তর্কের নীরস কচকচি থেকে উপসংহার হিসেবে এসব মতবাদের সৃষ্টি। ভুলভ্রান্তি দিয়েই আকাঙ্খর ঐকান্তিকতাকে যাচাই করা হয়। হিসাবের বেলায় একজন মানুষ তার স্বার্থের বিপক্ষের বদলে স্বপক্ষেই ভুলটা করে বেশি। যখন একজন মানুষ যুক্তির মাধ্যমে অগ্রসর হয়, তখন তার আশা-আকাঙ্ক্ষা যে দিকে নাগাল পায় না, সে দিকে অগ্রসর হওয়ার চেয়ে আকাক্ষার স্বপক্ষে ভুলত্রুটির মধ্যে জড়িয়ে যাওয়া খুবই স্বাভাবিক।

অনেকে বলতে পারেন, আবিস্কৃত পদ্ধতিগুলো যদি অসত্য হয় তাহলেও সেগুলো তো কারও ক্ষতি করে না বরঞ্চ উপভোগ্য, সেজন্য ওসবের বিরোধিতা করা উচিত নয়। প্রকৃত ক্ষতিকারক না হয়ে আনন্দ দিতে সক্ষম হলে এর ঋণ শোধ করতে হয়। আংশিকভাবে নৈসর্গিক অবস্থা থেকে এবং আংশিকভাবে পরস্পরের প্রতি বিদ্বেষের ফলেই জীবনে দুঃখ বেদনার সৃষ্টি হয়। সাবেক যুগে মানুষকে খাবারের প্রতিযোগিতায় যুদ্ধে নামতে হতো এবং জয়ী হতে না পারলে তারা খাবার পেত না। বর্তমানে বিজ্ঞানের উৎকর্ষের ফলে প্রকৃতি যা দিতে শুরু করেছে, একজন দু’জন না করে সামগ্রিকভাবে সকলে যদি একসঙ্গে বিজ্ঞানের সাধনায় আত্মনিয়োগ করে, তাহলে মানবসমাজকে অধিকতর সুখী এবং সমৃদ্ধিশালী করে গড়ে তোলা যাবে। অন্য মানুষের সঙ্গে সংগ্রামে প্রকৃতিকে সহায় অথবা, শত্রু হিসেবে ব্যবহার করার মধ্যে পৃথিবীতে মানুষের আসল অধিকার সূচিত হয় না। তা হলে, শক্তির বৈজ্ঞানিক প্রতীতি থেকে তার দৃষ্টি ভিন্ন দিকে ধাবিত হয়, অথচ বৈজ্ঞানিক সংগ্রামের মাধ্যমেই পৃথিবীতে স্থায়ী কল্যাণ প্রতিষ্ঠা করা যায়।

ব্যবহারিক যুক্তিসমূহ বাদ দিলে সুখের সন্ধান করার যে প্রবৃত্তি তা অসত্য বিশ্বাসের উপর প্রতিষ্ঠিত হয়, যা মহৎ গৌরবান্বিত দু’টার কোনটাই নয়। পৃথিবীতে মানুষের সত্যিকারের স্থান কোথায় তা চিন্তা করে যারা সংস্কারের দেয়ালে আত্মরক্ষা করে এটা তাদের কাজে দুর্লভ জীবনের বলিষ্ঠ আনন্দের আস্বাদ। পক্ষান্তরে যারা চিন্তা দুর্ণাব্য সমুদ্রে পাড়ি জমাতে সাহস করে, তারাই আপন শক্তিহীনতার মুখোমুখি নির্ভয়ে দাঁড়াতে পারে। সর্বোপরি এতে ভয়ের পীড়ন থেকে মুক্তি মেলে-যে ভয় দিনের আলোকে ঢেকে রাখে এবং মানুষকে অত্যাচারী ও নিষ্ঠুর করে। যে মানুষ পৃথিবীতে তার স্থান কোথায় খুঁজে পায় না সে কখনও ভয় থেকে মুক্তি পায় না, সে কখনও সম্ভাব্য মহত্ব অর্জন করতে পারে না।

০৩. বিজ্ঞান কি কুসংস্কারাচ্ছন্ন?

আধুনিক জীবন দু’ভাবে বিজ্ঞানের উপর প্রতিষ্ঠিত। একদিকে আমাদের সকলকে দৈনন্দিন রুটি-রোজগার এবং আরাম-আয়েশের জন্য বিজ্ঞানের উপর নির্ভর করতে হয়। অন্যদিকে মনের কতেক স্বভাব যা বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সংযুক্ত, বিগত তিনশ বছর ধরে কয়েকজন প্রতিভাবানের কাছ থেকে সমাজের বৃহত্তর অংশে ছড়িয়ে পড়েছে। বিজ্ঞানের এ দু’রকমের প্রভাব যে পরস্পর অনিষ্ট তা সুদীর্ঘকাল ধরে বিচার বিশ্লেষণ করলে ধরা পড়ে, কিন্তু একটা অন্যটাকে ছাড়া কয়েকশ বছর পর্যন্ত চলে যেতে পারে। অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষের দিক ছাড়া মনের বৈজ্ঞানিক স্বভাব আমাদের দৈনন্দিন জীবনে তেমন প্রভাব ফেলতে পারে নি। কারণ তার আগে বিরাট বিরাট আবিষ্কারের ফলে শিল্পোৎপাদন পদ্ধতিতে বিপ্লবের সঞ্চার হয় নি। অন্যদিকে বিজ্ঞান যে ধরণের জীবন পদ্ধতির সৃষ্টি করেছে তা তারাই গ্রহণ করল শুধু বিজ্ঞান সম্বন্ধে যাদের সামান্য বাস্তব জ্ঞান আছে এবং এ সমস্ত লোকেরা যেখানেই আবিষ্কৃত হোক না কেন যন্ত্র তৈরি, ব্যবহার এমনকি অল্পস্বল্প উৎকর্ষ সাধনও করতে পারে। মানবজাতির সামগ্রিক বুদ্ধিবৃত্তি যদি লোপও পায় তাহলেও যে কারিগরি এবং দৈনন্দিন জীবনের সৃষ্টি করেছে তা সমগ্র সম্ভাবনাসহ কয়েকপুরুষ ধরে অক্ষয়ভাবে বিরাজ করবে। কিন্তু চিরদিনের মতো স্থায়ী হতে পারবে না, কেননা কোন আকষ্মিক বিপত্তির ফলে ধ্বংস হয়ে গেলে এর পূণর্নির্মাণ অসম্ভব হয়ে পড়বে।

সুতরাং ভালোর জন্য হোক, মন্দের জন্য হোক বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি মানবজাতির একান্তই প্রয়োজন। শৈল্পিক দৃষ্টিভঙ্গীর মতো বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গীও দু’ভাবে বিভক্ত। স্রষ্টা এবং সমালোচক, দু’জনেই আলাদা মানুষ এবং তাদের প্রত্যেকেরই মনের আলাদা স্বভাব। অন্যান্য স্রষ্টার মতো বৈজ্ঞানিক স্রষ্টারাও আবেগে উদ্দীপিত হন, যার ফলে তারা অপ্রকাশিত সত্যের বুদ্ধিগ্রাহ্য বর্ণনা দিতে পারেন। এ না হলে কিন্তু তিনি কিছুই করতে পারবেন না। সমালোচকের এ ধরনের বিশ্বাস বা প্রত্যয় না থাকলে চলে। তিনি প্রয়োজন মতো আনুপাতিকভাবে জ্ঞাত হয়ে সংরক্ষণ করেন এবং নিজের তুলনায় স্রষ্টাকে একজন কদর্য বর্বরব্যক্তি হিসেবেও ভাবতে পারেন। যখন সভ্যতা অত্যধিক পরিব্যপ্ত এবং ঐতিহ্যাশ্রয়ী হয়ে পড়েছে তখন সমালোচকদের মনে স্রষ্টাদের মন জয় করবার প্রবৃত্তিও দেখা গেছে। এর ফলে সভ্যতার প্রশ্ন বাইজানটাইনের মতো পুরনো এবং বহিদর্শনের ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিজ্ঞানেও অনুরূপ কিছু বোধকরি ঘটতে শুরু করেছে। যে সরল বিশ্বাসের রজ্জু ধরে পুরোধা ব্যক্তিরা অগ্রসর হচ্ছিলেন তার মর্মমূল এখন শুকিয়ে গেছে। বাইরের জাতিগুলো যেমন রাশিয়ান জাপানি এবং তরুন চীনারা এখনও বিজ্ঞানকে সপ্তদশ শতাব্দীর বৈশিষ্ট্যেমণ্ডিত হিসাবে দেখতে চান, তেমনি চান প্রতীচ্যের অনেকগুলো জাতি। কিন্তু ধর্মযাজকেরা এখন তাদের আনুষ্ঠানিকভাবে নিবেদিত ধর্ম-কর্মে আস্থা স্থাপনে ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন। ধার্মিক তরুণ লুথার একজন মুক্তবুদ্ধিসম্পন্ন পোপকে শ্রদ্ধা নিবেদন করেছিলেন। তিনি তার রোগমুক্তি কামনা করে রোমের মন্দিরে জুপিটার দেবতার কাছে ষাঁড় বলি দিয়েছিলেন। বর্তমানে সভ্যতা সংস্কৃতির পীঠস্থান থেকে যারা দূরবর্তী তারাও বিজ্ঞানের প্রতি তেমনি শ্রদ্ধাশীল হয়ে উঠেছেন। জার্মান প্রোটেস্টানিজমের মতো বলশেভিকদের বৈজ্ঞানিক বস্তুবাদও হলো পুরনো শ্ৰেয়োবোধকে রক্ষা করার প্রচেষ্টা, যা বন্ধু এবং শত্রু সমানভাবে গ্রহণ করতে পারে নতুন মতবাদ হিসাবে। নিউটনের মৌলিক আনুপ্রেরণা পশ্চিমের বুর্জোয়া বৈজ্ঞানিকদের মধ্যে বৈজ্ঞানিক সংশয়বাদের জন্ম দিয়েছে। বিজ্ঞানকে ক্রিয়াপদ্ধতি হিসাবে রাষ্ট্র স্বীকার করে নিয়েছে এবং রাষ্ট্র বিজ্ঞানের উৎসাহদাতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। টেনেসি রাজ্যের মতো রাষ্ট্র যেখানে প্রাকবৈজ্ঞানিক স্তর অতিক্রম করতে পারে নি, সেখানে ছাড়া রাজনৈতিকভাবে অন্যান্য রাষ্ট্র রক্ষণশীল হয়ে পড়েছে। পূর্বের অবস্থা রক্ষা করাই আজকের বিজ্ঞানের অধিকাংশ মানুষের বিশ্বাসের মূল কেন্দ্রবিন্দু হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলতঃ তারা বিজ্ঞানের যা প্রাপ্য তার চেয়ে বেশি কিছু দাবি করতে ইচ্ছুক নন। ধর্মের মতো রক্ষণশীল শক্তির চাইতে বিজ্ঞানের দাবি যে বেশি, তা তারা স্বীকার করেন না।

সে যা হোক তারা এক মস্ত বিপদের সম্মুখীন হয়ে পড়েছেন। বিজ্ঞানের মানুষেরা এখন মুখ্যতঃ রক্ষণশীল হলেও বিজ্ঞান আজ পর্যন্ত পৃথিবীর দ্রুত পরিবর্তনের শ্রেষ্ঠতম মাধ্যম।

.

এ পরিবর্তনের ফলে আফ্রিকা, এশিয়া, ইউরোপের শিল্পাঞ্চলের মানুষের মনে যে আবেগের সঞ্চার করেছে তা অনেক সময় রক্ষণশীল মনোভাবাপন্ন মানুষদের অসন্তে ষের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। সুতরাং বিজ্ঞানের মূল্য সম্বন্ধে এক ধরনের গড়িমসি মনোভাবের সৃষ্টি হয়েছে, যার ফলে পুরোত এবং ধর্মযাজকদের মধ্যে সংশয়বাদের উদয় হয়েছে। তা যদি একা হতো তা হলে তত বেশি প্রয়েজনীয় হতো না, কিন্তু প্রধান বুদ্ধিবৃত্তিক অসুবিধাগুলো এর সঙ্গে যুক্ত এবং তা যদি অনতিক্ৰমণীয় হয়ে দেখা দেয়। তাহলে বৈজ্ঞানিক আবিস্ক্রিয়ার উপর যবনিকাও টেনে দিতে পারে। একথার মানে আমি এ বলতে চাচ্ছি যে খুব শিগগিরই তেমন কিছু ঘটবে। প্রতীচ্য যে বিশ্বাস হারিয়ে ফেলেছে, এশিয়া এবং রাশিয়া আরো শতবছর হয়ত সে বৈজ্ঞানিক বিশ্বাসকে আঁকড়ে থাকতে পারে। শিগগির হোক অথবা দেরিতে হোক এ বিশ্বাস বর্জন করার বিরুদ্ধে যুক্তি প্রবল হয়ে দেখা দেবে এবং লোকসাধারণকে যে কোনভাবেই প্রভাবিত করবে; তার ফলে তারা ক্ষণিকের জন্য ক্লান্ত হয়ে পড়লেও পূর্বের সে আনন্দিত বিশ্বাসে ফিরে আসতে পারবে না। সুতরাং বিজ্ঞানের বিশ্বাসের বিরুদ্ধে যুক্তিগুলো সযত্ন পরীক্ষার দাবি রাখে।

বৈজ্ঞানিক বিশ্বাসের নামে আমি এ কথা বলছি না যে তা শুধু যুক্তিগতভাবে প্রয়োগক্ষম, শুধু যে অর্থে বিজ্ঞান সত্য; কিন্তু আমি বলছি এমন কিছু যা অধিকতর উৎসাহব্যঞ্জক এবং কম যুক্তিনির্ভর। নাম করে বলতে গেলে সে সমস্ত আবেগ এবং বিশ্বাসের পদ্ধতি যা মানুষকে শ্রেষ্ঠ বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারক হতে অনুপ্রাণিত করে। এখন কথা হলো এ সমস্ত বিশ্বাস এবং আবেগ বুদ্ধিবৃত্তিসম্পন্ন মানুষের মধ্যে স্থায়ীভাবে বিরাজ করতে পারে কিনা এবং বুদ্ধিবৃত্তিক মুক্তি ছাড়া কি বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার অসম্ভব?

এ সমস্যার প্রকৃতি অনুধাবন করতে হলে সাম্প্রতিক দুটো চিত্তাকর্ষক বই আমাদেরকে প্রভূত সাহায্য করবে। বই দুটো হলো বার্ট এর ‘মেটাফিজিক্যাল ফাউণ্ডেশানস অব মডার্ন সায়েন্স’; প্রকাশকাল ১৯২৬ এবং হোয়াইটহেডের সায়েন্স অ্যাণ্ড দ্যা মডার্ন ওয়ার্ল্ড’; প্রকাশকাল ১৯২৬। এ দুটোর প্রত্যেকটাতেই আধুনিক পৃথিবী কোপার্নিকাস, কেপলার, গ্যালিলিও এবং নিউটনের কাছ থেকে যে ধারণা পদ্ধতি পেয়েছে তার সমালোচনা করেছে। প্রথমটা ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকেই লেখা হয়েছে। ড. হোয়াইটহেডের বইটিই অধিকতর দরকারি, কেননা তা শুধু সমালোচনা নয় ওতে গঠনমূলকও অনেক কিছু রয়েছে, ভবিষ্যতের বিজ্ঞানের জন্য বুদ্ধিবৃত্তিসম্মত ভিত্তি দেওয়ার চেষ্টাও তাতে করা হয়েছে। অধিকন্তু বইটাতে বিজ্ঞানবাদে মানুষের সাধারণ আশা-আকাঙ্ক্ষা সম্পর্কে আবেগদীপ্ত অনেক কিছুই রয়েছে। ড. হোয়াইটহেড তার থিয়োরির যে অংশকে আনন্দদায়ক আখ্যা দিয়ে যুক্তির অবতারণা করেছেন, আমি তা সমর্থন করতে পারি না। বৈজ্ঞানিক ধারণাক্রিয়ার বুদ্ধিবৃত্তিসঞ্জাত ধারণা গঠনের প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করে নিয়েও আমি মনে করি যে আমাদের বুদ্ধিবৃত্তির সঙ্গে সম্পর্কহীন আবেগ বিজ্ঞানের দিকে প্রবল টান ব্যতিরেকে পুরনো ধারণার মতো নতুন ধারণাকেও গ্রহণ করতে পারবে না এর সমর্থনে কি যুক্তি আছে, এখন আমরা তা তলিয়ে দেখছি।

.

ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতে গিয়ে, ড. হোয়াইটহেড নির্দিষ্ট প্রাকৃতিক পদ্ধতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বস্তুপুঞ্জে সুসমঞ্জস সমাহারের প্রতি প্রবৃত্তিগত ব্যাপক বিশ্বাস ব্যতিরেকে জীবন্ত বিজ্ঞান বলতে কিছুই থাকতে পারে না। বিজ্ঞানের জন্ম দিয়েছেন একমাত্র তারাই যাদের এ বিশ্বাস ছিল। সুতরাং বিশ্বাসের মৌল উৎস প্রাক-বৈজ্ঞানিক। নিশ্চিতভাবে বিজ্ঞানের আবির্ভাবের জন্য যে মিশ্র মনোভাবের প্রয়োজন ছিল তাতে অন্যন্য উপাদানও মিশ্রিত হয়েছিল। তার মতে জীবন সম্বন্ধে গ্রিকদের ধারণা ছিল নাটকীয়, সূচনার চাইতে সমাপ্তিকেই জোর দেয়া হতো বেশি। বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে বিচার করতে গেলে এটাও একটা বিচ্যুতি। অন্যদিকে গ্রিক বিয়োগান্ত নাটকে নিয়তির ধারণা থেকে প্রত্যেকটা ঘটনার যে প্রাকৃতিক নিয়মের উপর নির্ভরশীল তার উদ্ভব হয়। গ্রিক নাটকের নিয়তির ধারণা আধুনিক চিন্তায় প্রাকৃতিক বিধান বলে রোমান সরকার (অন্ততঃ থিয়োরিগতভাবে হলেও) প্রাচ্যের স্বেচ্ছাচারী শাসকদের মতো খেয়ালখুশী মতো শাসনকার্য পরিচালনা করে নি, বরঞ্চ পূর্বনির্ধারিত আইনকানুন অনুসারেই তারা শাসন-শৃঙ্খলা পরিচালনা করেছে। অনুরূপভাবে খ্রিস্টধর্মও আইনানুসারে ভগবানের ধারণা করেছে যদিও সে আইনগুলো ভগবানেরই স্থিরীকৃত। এসবের ফলে প্রাকৃতিক আইনের সৃষ্টির পথ পরিষ্কার হয় এবং তা বৈজ্ঞানিক মনোভঙ্গীর একটা অত্যন্ত প্রয়োজনীয় বৈশিষ্ট্য।

যে সমস্ত অবৈজ্ঞানিক বিশ্বাস ষোড়শ এবং সপ্তদশ শতাব্দীর অগ্রদূতদের অনুপ্রাণিত করেছিল, ড. বার্ট সেসব খুবই প্রশংসনীয়ভাবে অজ্ঞাত অনেক মৌলিক উৎসের সাহায্যে উপস্থাপন করেছেন। উদাহরণস্বরূপ, কেপলারের অনুপ্রেরণার মূলে ছিল জরথুস্ত্রীয়দের সূর্য উপাসনা যা তিনি যৌবনের গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে বরণ করে নিয়েছিলেন। প্রাথমিকভাবে সূর্যকে দেবতা জ্ঞান করে ব্রহ্মাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দুতে স্থাপন করার পদ্ধতি হিসাবে গ্রহণ করতে অনুপ্রাণিত করেছিল। রেনেসাঁর যুগে খ্রিস্টিয় ধর্মবিশ্বাসের প্রতি বিরোধ প্রাথমিকভাবে প্রাচীন আদিমতার প্রশংসার মধ্যে যার অঙ্কুর নিহিত ছিল, সর্বত্রই পরিলক্ষিত হতো। নিয়মের মাধ্যমে এর বহিঃপ্রকাশ ঘটেনি খোলাসাভাবে, কিন্তু জ্যোতির্বিদ্যা ইত্যাদির যে পুণঃপ্রচলন হয়েছে, তার ফলে তা উদাহরণ হিসেবে নেয়া যেতে পারে। গির্জা শারীরিক নির্যাতন করে তার বিরুদ্ধে উঠে পড়ে লেগেছিল। খ্রিস্টধর্মের বিরুদ্ধে যে বিদ্রোহ তার সঙ্গে মিশেছিল কুসংস্কার যেমন বিজ্ঞানে কেপলারের ব্যাপারেও ছিল অঙ্গাঙ্গীভাবে কুসংস্কার বিজড়িত।

কিন্তু তার একটি অসুবিধা আছে, তাহলো অপ্রতিরোধ্য এবং কর্কশ সত্যের প্রতি স্পৃহা, যার প্রয়োজন একইভাবে অপরিহার্য, মধ্যযুগে তা অনুপস্থিত ছিল এবং প্রাচীনকালে তা সাধারণত দৃষ্টিগোচর হতো না। রেনেসাঁর আগে বস্তুর প্রতি অনুসন্ধিৎসা ব্যক্তিবিশেষের মধ্যে দেখা যেত। উদাহরণস্বরূপ সম্রাট দ্বিতীয় ফ্রেডারিক এবং রোজার বেকনের নাম করা যেতে পারে। কিন্তু রেনেসাঁর সময়ে তা বুদ্ধিমান লোকদের মধ্যে পরিব্যাপ্ত হয়ে পড়ে। প্রাকৃতিক আইনের প্রতি অনাসক্ত মতের লেখার মধ্যেও তা দেখা যায়; অথচ মতে বিজ্ঞানের মানুষ ছিলেন না। সাধারণ অথবা বিশেষ আকর্ষণের আশ্চর্য রসায়ন ঘটেছিল বিজ্ঞানের ব্যাপারে। বিশেষ বিশেষ বিষয় এই আশায় পড়া হতো যে তার ফলে সাধারণ বিষয়সমূহের উপর আলোকসম্পাত করা যাবে। মধ্যযুগে এটা ভাবা হতো যে সাধারণ নীতি মেনে বিশেষ সিদ্ধান্তে আসা যায়। রেনেসাঁর সময়ে তা প্রবল সমালোচনার সম্মুখীন হলো। ঐতিহাসিক পুরাতত্ত্ব সম্পর্কে আগ্রহ তাদেরকে বিশেষ বিশেষ ঘটনার প্রতি প্রবল আগ্রহী করে তোলে। মনের এই স্পৃহা যা গ্রিক রোমান এবং ঐতিহ্যাশ্রয়ী জ্ঞানের মাধ্যমে শিক্ষিত এবং সঞ্জীবিত হয়ে উঠেছিল, যা গ্যালিলিও কেপলারের অভ্যুত্থানকে সম্ভবপর করে তুলেছিল! স্বভাবতঃই এই আবহাওয়ার কিছুটা তাদের কাজকে বেষ্টন করেছিল এবং তা তাদের আজকের দিনের উত্তরাধিকারীর মধ্যে চলে এসেছে। বিজ্ঞান কখনও পরবর্তী রেনেসাযুগের ঐতিহাসিক বিদ্রোহ যা বিজ্ঞানের উৎসমূল তাতে নাড়া দেয় নি। প্রধানতঃ তা ছিল অবিবেচনাপ্রসূত একটি আন্দোলন এবং যা জনসাধারণের প্রচলিত বিশ্বাসেরই উপর ছিল প্রতিষ্ঠিত এবং যে অনুমানের অভাব ছিল, তাতে আর অভাব মিটান হলো অঙ্কবিদ্যা হতে ধার করে। এ অনুমান ছিল অবরোহপদ্ধতি অনুসারে গ্রিক হেতুবাদের প্রচলিত অপভ্রংশ। বিজ্ঞান দর্শনের সম্পর্ক অস্বীকার করল। অন্য অর্থে বলতে গেলে এর বিশ্বাসকে যাচিয়ে দেখা অথবা অর্থ ব্যাখ্যা করার এত যত্ন নেয় নি, হিউমের দ্বারা বর্জিত হয়েও আড়ালে অগোচরে রয়ে গেল।

শৈশবে যে যে কুসংস্কারের ক্রোড়ে লালিত হয়েছে তা থেকে বিচ্ছিন্ন করলে বিজ্ঞান টিকে থাকতে পারবে কিনা? অবশ্য দর্শনের প্রতি বিজ্ঞানের নিস্পৃহতার কারণ হচ্ছে বিজ্ঞানের অত্যাধিক সাফল্য, তা মানবশক্তির ধারণাকে বহুগুণে বাড়িয়ে দিয়েছে। মাঝে মাঝে গোড়া ধর্মমতের সঙ্গে সংঘাত ছাড়া প্রায় সর্বাংশে মানুষের কাছে গ্রহণীয় হয়ে উঠেছে। তাহলেও হালে বিজ্ঞান নিজের সমস্যার গরজেই দর্শনের প্রতি আগ্রহশীল হয়ে পড়েছে, যা থিয়োরি অব রিলেটিভিটির মধ্যে সত্য হিসেবে দেখা দিয়েছে; বিশেষভাবে যার ফলে স্থান এবং কালকে স্থান-কাল একক সত্তা বলে স্বীকার করা হয়েছে। গতির বিচ্ছিন্নতার আপাতঃ প্রয়োজনীয়তার মধ্যে কোয়ান্টামতত্ত্বেও তা সত্য বলে স্বীকার করা হয়েছে। অন্যদিকে শারীরবিদ্যা এবং জৈব রসায়নবিদ্যা মনস্তত্ত্বের শিকড় প্রসারণের সঙ্গে সঙ্গে দর্শনেরও ভয়ঙ্কর ভীতির কারণ হয়ে পড়েছে। ড. ওয়াটসনের ব্যবহারবাদ হলো তার মধ্যে সবচেয়ে তীক্ষ্ণতম, তাতে দর্শনের ঐতিহ্যের প্রতি শুধু অসম্মান দেখান হয় নি। পক্ষান্তরে ব্যবহারবিদ নিজস্ব একটি নতুন দর্শনের উপর প্রতিষ্ঠিত। এ সকল কারণে বিজ্ঞান ও দর্শন দীর্ঘকাল ধরে সশস্ত্র নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে পারবে না। তাদেরকে পরস্পরের বন্ধু অথবা শত্রু দু’টোর একটা হতেই হবে। বিজ্ঞান যতদিন দর্শনের বক্তব্যের মধ্যে যে-সকল প্রশ্ন তুলে ধরবে, পাশ না করা পর্যন্ত একে অপরের পরিপূরক অথবা বন্ধু হতে না পারলে, একে অপরকে অবশ্যই ধ্বংস করবে; কিন্তু একা একটি যে প্রভুত্ব করবে তারও কোন সম্ভাবনা নেই।

ড. হোয়াইটহেড বিজ্ঞনের দার্শনিক বিচারের জন্য দু’টি বিষয়ের অবতারণা করেছেন। একদিকে তিনি নতুন ধারণা দিয়েছেন, যার সাহায্যে রিলেটিভ বা আপেক্ষিক পদার্থবিদ্যা এবং কোয়ান্টামকে অতীতের নিরেট পদার্থবাদ দিয়ে গঠন করার চাইতে অধিকতর সন্তোষজনক বুদ্ধিগ্রাহ্য উপায়ে গঠন করবার পদ্ধতি বাতলে দিয়েছেন। তার কীর্তির এ অংশে যা আমরা প্রত্যাশা করেছিলাম, সম্পূর্ণভাবে বিকশিত হয়ে উঠে নি, যদিও বিজ্ঞানের ব্যাপক ধারণার মধ্যে ভূণ হিসাবে তা রয়ে গেছে। সাধারণ পদ্ধতি সমূহের সাহায্যে যাচাই করা যায়, যা কিছু বস্তুর সঙ্গে অন্য বস্তুর সম্বন্ধের থিয়োরিগত বিশ্লেষণের দিকে আমাদের প্রচেষ্টাকে পরিচালিত করে। কারিগরি দিক দিয়ে দেখলে তা খুব জটিল এবং এ সম্পর্কে আর কিছু বলছি না। আমাদের বর্তমান দৃষ্টিভঙ্গি অনুসারে ড. হোয়াইটহেডের গ্রন্থের উল্লেখযোগ্য দিক হলো এর অতিদার্শনিক অংশ: তিনি শুধু উৎকৃষ্টতর বিজ্ঞানকে দেন নি, এমন একটি দর্শন দিয়েছেন যা বিজ্ঞানকেও যুক্তিসিদ্ধ করতে সক্ষম; কিন্তু তা এই অর্থে যে ঐতিহ্যিক বিজ্ঞান হিউমের পূর্বে কখনো যুক্তিনির্ভর ছিল না। তার দর্শন অধিকাংশ ক্ষেত্রে বের্গসঁনের দর্শনেরই সমগোত্রীয়। আমি নিজে অসুবিধা বলে যা মনে করছি তা হলো এ পর্যন্ত ড. হোয়াইটহেডের যে ধারণা তাকে ফর্মুলাবদ্ধ করে যে কোন সাধারণ বৈজ্ঞানিক বা যুক্তির পরীক্ষায় ফেলে যাচাই করা যায়, কিন্তু তার দর্শনের মধ্যে তার কোন উল্লেখ নেই। সুতরাং দর্শনের অন্তর্নিহিত তাৎপর্যকে অবশ্যই গ্রহণ করতে হবে। বিজ্ঞান সত্যকে স্বীকার করে শুধু এ কারণে আমরা তা গ্রহণ করব না, এ কারণেও গ্রহণ করব যে তা বিজ্ঞানকেও যুক্তিসম্মত করে তোলে। প্রত্যক্ষভাবে আমাদের পরীক্ষা করে অবশ্যই জেনে নিতে হবে যা সত্য মনে হয় আদতে তার বাস্তব সমর্থন আছে কিনা এবং এখানেই আমরা পুরনো সকল রকমের হতবুদ্ধির শিকার হয়ে পড়ি।

আমি শুধু একটা বিষয়কে নিচ্ছি, তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সকলেই জানেন, বের্গসঁন মনে করতেন স্মৃতিতে অতীত জীবিত থাকে এবং মনে করতেন আদতে মানুষ কিছুই ভুলতে পারে না। এ সকল দিকে তার সঙ্গে ড. হোয়াইটহেডের মতের মিল রয়েছে। এ হলো কাব্যের জন্য খুবই সুন্দর কিন্তু বৈজ্ঞানিকভাবে তার সাহায্যে যথাযথ বাস্তব কিছু নির্দেশ করা যায় না (অন্তত আমার তাই-ই চিন্তা করা উচিত)। আদি যদি অতীত কোন ঘটনাকে স্মরণ করি, উদাহরণস্বরূপ যেমন আবার চীনে আগমন, তাহলে তা শুধু কথার কাঠামো যে আমি আবার চীনে আগমন করছি। যখন আমি স্মরণ করি তখন কিছু সংখ্যক শব্দ বা প্রতাঁকের প্রয়োজন হয়। কার্যকারণ সূত্র এবং যৌক্তিক সমতার চাইতে কিছু বেশি অংশে কী স্মরণ করছি তার সঙ্গে সম্পর্কশীল। স্মৃতিকে যদি আমরা অতীত ঘটনার অনুরণন বলতে চেষ্টা করি, তাহলেও কিন্তু অতীত ঘটনা স্মরণ করবার বৈজ্ঞানিক সম্বন্ধ অটুট থেকে যায়। যদি আমরা তা বলি তা হলেও স্বীকার করে নিতে বাধ্য হব সময়ের ব্যবধানে ঘটনাটির পরিবর্তন হয়েছে এবং এ পরিবর্তন কেননা হয় তার কারণ আবিষ্কার করতে গিয়ে বৈজ্ঞানিক সমস্যার সম্মুখীন হব। আমরা স্মৃতিতে নতুন ঘটনা অথবা বহুলাংশে পরিবর্তিত পুরনো ঘটনা বললেও তাতে বৈজ্ঞানিক সমস্যাটির কিছুই হয় না।

হিউমের সময় পর্যন্ত বিজ্ঞানের দর্শনের প্রধানতম আপবাদ ছিল কার্যকারণ এবং আরোহ পদ্ধতি। আমরা সকলেই দুটোতেই বিশ্বাস করি। কিন্তু হিউম দেখিয়ে দিলেন যে আমাদের বিশ্বাসসমূহে অন্ধতার কোন যৌক্তিক ভিত্তি নেই। ডঃ হোয়াইটহেড বিশ্বাস করেন তার দর্শন হিউম দর্শনের একটি জবাববিশেষ। কান্টও তাই করেছেন। আমি নিজে কিন্তু এ দু-উত্তরের কোনটাকেই গ্রহণ করতে পারিনে। তা সত্ত্বেও অন্যান্য মানুষের সঙ্গে মত মিলিয়ে বিশ্বাস করতে বাধ্য হই যে অবশ্যই একটা উত্তর থাকতে হবে। এ জাতীয় ক্রিয়াকলাপ মোটেই সন্তোষজনক নয়, বিজ্ঞানের মতো দর্শনের সঙ্গে জড়িত হয়ে পড়ে। আমাদেরকে অবশ্যই বিশ্বাস করতে হবে যে একটা জবাব পাওয়া যাবে, কিন্তু সে জবাব পাওয়া গেছে একথা মানতে আমি মোটেই রাজি নই।

বর্তমানের বিজ্ঞানের কিছু অংশ আমাদের প্রিয় এবং কিছু অংশ প্রিয় নয়। পরিবেশকে নিয়ন্ত্রণ করার শক্তি দান করে বলে প্রায় বুদ্ধিবৃত্তিক সন্তষ্টি দান করতে পারে বলে খুবই অল্প সংখ্যক মানুষের কাছে তা গ্রহণীয় হয়ে থাকে। তা অপ্রিয়, এ কারণে যে, যতই আমরা সত্যকে ঢেকে রাখতে চেষ্টা করি না কেন, থিয়োরি গতভাবে মানুষের কাজকে পূর্বাহ্নে নির্ধারিত করার শক্তিতে বিশ্বাস করে থাকে এবং এ ক্ষেত্রে দেখা যায় যে তা মানুষের শক্তির স্বল্পতা সাধন করেছে। সভাবতঃই মানুষ বিজ্ঞানের অপ্রিয় দিকটিকে বাদ দিয়ে প্রিয় দিকটিকে গ্রহণ করতে চায়। সে জন্যে এ পর্যন্ত যতরকমের চেষ্টা করা হয়েছে তার প্রত্যেকটিই বিফলমনোরথ হয়েছে। যদি আমরা এ সত্যের উপর জোর দেই যে আরোহ এবং কার্যকারণ পদ্ধতির উপর আমাদের যে বিশ্বাস তা সম্পূর্ণ অযৌক্তিক, তাহলে আমাদের অনুমান করতে হয় যে আমরা-বিজ্ঞানকে সত্য বলে মানি না এবং যে কারণে বিজ্ঞান আমাদের কাছে প্রিয় যে কোন মুহূর্তে প্রকৃতিকে নিয়ন্ত্রণ করার শক্তি এর পরিবর্তে যে মতবাদ এখন সম্পূর্ণভাবে থিয়োরিগত আধুনিক মানুষ তা এখন বাস্তবে প্রয়োগ করতে পারে না। পক্ষান্তরে যদি আমরা বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির দাবিকে মেনে নেই তাহলে আমরা এ উপসংহার কিছুতেই এড়াতে পারব না যে আরোহ এবং কার্যকারণ পদ্ধতিকে অন্যান্য সবকিছুর মতো মানুষের সংকল্পেও প্রয়োগ করা যায়। বিংশশতাব্দীর পদার্থ, শারীরবিদ্যা এবং মনস্তত্ত্ব যা কিছু ঘটেছে সবকিছু একসঙ্গে এই উপসংহারকে বলবৎ করেছে। এর ফলাফল সম্ভবত এ দাঁড়াতে পারে যে, যদিও বিজ্ঞানের যুক্তিসম্মত মূল্যায়নের থিয়োরি অপর্যাপ্ত, তবু বিজ্ঞানে এমন কোন পদ্ধতি নেই যাতে করে বিজ্ঞানের অপ্রিয় দিকটি বাদ দিয়ে প্রিয় দিকটি গ্রহণ করা যায়। অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে যে যুক্তি তা দিয়ে হয়ত আমরা তা করতে পারি, কিন্তু তা করলে বিজ্ঞানের উৎসমূলকে আমরা শুকিয়ে ফেলব অথচ তাই হলো পৃথিবীকে বুঝবার একমাত্র আকাঙ্ক্ষা’ ভবিষ্যতে এ জটিল সমস্যার সন্তোষজনক সমাধান পাওয়া যাবে এটা আশা করা যায়।

০৪. মানুষ কি বিচারবুদ্ধিসম্পন্ন হতে পারে?

আমি নিজেকে একজন বিচার বুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ হিসেবে ভাবতে অভ্যস্ত এবং আমি চাই সব মানুষই বিচার বুদ্ধির অধিকারী হোক। বিচারবুদ্ধিসম্পন্ন সকল ব্যক্তিই স্বভাবতঃ এরূপ কামনা করবেন। এ যুগে বিচারবুদ্ধি নানাভাবে মার খেয়েছে বলে এর স্বরূপ জানতে পারলেও মানব-সাধারণ তা আয়ত্ব করতে পারে কিনা? বিচারবুদ্ধির দুটো দিক; ভাগ্যগত এবং বাস্তব। কিন্তু বিচারবুদ্ধিসম্মত মতামত এবং আচরণ বলতে কী বোঝায়? প্রয়োগবাদ (Pragmatisom) মতামতের অযৌক্তিকতার ওপর প্রাধান্য দিয়ে থাকে উভয়দিকের অনেকে শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন। মতামত এবং আচরণকে একসঙ্গে ধরে রাখার এত আদর্শ বিচারবুদ্ধির কোন মাপকাঠি নেই। ধরুন আমি আর আপনি দুজন যদি দু মতের সমর্থনে ঝগড়া করতে থাকি তাহলে যুক্তি অথবা তৃতীয় ব্যক্তির সালিশীর মাধ্যমে সমাধান করার কথা অর্থহীন, গলাবাজি বিজ্ঞাপন এমনকি আমাদের অর্থনৈতিক এবং সামরিক শক্তি অনুসারে শেষপর্যন্ত যুদ্ধের মাধ্যমে নির্ধারণ করা ছাড়া গত্যন্তর থাকে না। আমার মতে এ-ধরণের দৃষ্টিভঙ্গি খুবই ক্ষতিকর এবং শেষপর্যন্ত সভ্যতার পক্ষে মারাত্মক হয়ে দাঁড়াবে। সুতরাং আমি দেখাতে চেষ্টা করব, যে সব ধারণাকে বিচারবুদ্ধিবিরুদ্ধ বলে গণ্য করা হতো, তাও বিচারবুদ্ধিকে খর্ব করতে পারে না, পূর্বের মতো জীবন এবং চিন্তার একমাত্র পথনির্দেশক হিসেবে বিচারবুদ্ধিই থাকে ক্রিয়াশীল।

মতামতের খাতিরে বলতে হলে বিচারবুদ্ধির সজ্ঞায়ন করার ব্যাপারে সত্যে উপনীত হওয়ার জন্যে প্রয়োজনীয় প্রমাণপঞ্জীর সাহায্য গ্রহণ করা উচিত। যেখানে নিশ্চিত করে কিছু বলা সম্ভব নয়, সেখানে একজন বিচারবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ সর্বাধিক সম্ভাব্য মতামতের উপর সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব প্রদান করেন এবং কম সম্ভাবনাসম্পন্ন মতামতগুলোকে মনে মনে রেখে দেন, উপযুক্ত প্রমাণের সাহায্যে সেগুলোও সম্ভাবনাময় হয়ে উঠতে পারে। বস্তুনিরপেক্ষ পদ্ধতিতে ঘটনার এবং ঘটনার সম্ভাব্যতা নির্ধারণ করা হয়। বস্তুনিরপেক্ষ পদ্ধতি অনুসারে দুজন মানুষ সতর্কভাবে এগুলো একই সিদ্ধান্তে আসতে পারে; কিন্তু অনেক সময় তাতে সন্দেহ পোষণ করা হয়। অনেকের মতে ব্যক্তির আকাঙ্ক্ষা এবং প্রয়োজনের সন্তুষ্টি বিধানই হলো বুদ্ধিবৃত্তির একমাত্র কাজ। ‘দ্যা প্লেবস টেক্সটবুক কমিটি, তাদের দর্শনের সীমারেখা গ্রন্থে বলেনঃ ‘সর্বোপরি বুদ্ধিবৃত্তি হলো একটি পক্ষপাতমূলক অস্ত্রবিশেষ (পৃষ্ঠা ৬৮) এর কর্ম হলো কোন ব্যক্তি অথবা শ্ৰেণীবিশেষের পক্ষে উপকারী কাজগুলোর সম্পাদন এবং অনুপকারী কাজগুলো বর্জন করা।

কিন্তু একই গ্রন্থকার একই গ্রন্থে আবার বলেছেন মার্কসবাদীদের বিশ্বাস ধর্মীয় বিশ্বাসের চেয়ে ভিন্নতর ধর্মীয় বিশ্বাস, কামনা এবং ঐতিহ্যের উপর প্রতিষ্ঠিত। পক্ষান্তরে মার্কসীয় বিশ্বাসে নৈর্ব্যক্তিক বস্তুবাদের বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণের উপর প্রতিষ্ঠিত। মার্কসীয় মতবাদ গ্রহণে বুদ্ধিবৃত্তি যদি তাদেরকে পরিচালনা না করে থাকে, তা হলে বুদ্ধিবৃত্তিসম্বন্ধে তাদের মতবাদ সামঞ্জস্যহীন। যে ভাবেই হোক, যখন তারা নৈর্ব্যক্তিক বস্তুবাদের বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণকে গ্রহণ করেছেন, নৈর্ব্যক্তিক বস্তুবাদের বিচারবুদ্ধিসম্মত মতবাদকেও তারা অবশ্যই গ্রহণ করবেন।

.

প্রয়োগবাদী ও দার্শনিকদের মতো অনেক পণ্ডিত গ্রন্থকারও রয়েছেন যারা বিচারবুদ্ধিবিরুদ্ধ দৃষ্টিভঙ্গিকেই প্রাধান্য দিয়ে থাকেন। তাদেরকে চেনাও খুব সহজসাধ্য ব্যাপার নয়। তারা বলে থাকেন যে, সত্য হলেও আমাদের মতামতের সঙ্গে সঠিকভাবে মিলে যাওয়ার মতো কোন বস্তুবাদী সত্যের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার সংগ্রামের অস্ত্র হিসাবে অভিহিত করবেন। এর মধ্যে যেগুলো মানুষকে বেঁচে থাকতে সাহায্য করে সেগুলোকেই বলা হয় সত্য। খ্রিস্টিয় ষষ্ঠ শতাব্দীতে ধর্ম যখন সর্বপ্রথম জাপানে এসে পৌঁছে তখন জাপানে এই মতবাদ প্রচলিত ছিল। সরকার নতুন ধর্ম গ্রহণের আদেশ দিলেন। তিনি যদি অন্যান্যের চেয়ে অধিকতর উন্নতি করেন তাহলে সর্বজনীনভাবে নতুন ধর্ম গ্রহণ করা হবে। তারা এই মতবাদ অনুসারে (আধুনিক যুগে খাপ খাওয়ার মতো পরিবর্তন সাধন করে। বিভিন্ন ধর্মীয় মতবাদের বিভিন্নতা স্বীকার করে নিয়ে থাকেন কিন্তু তবু তাদের কাউকে অন্যান্য ধর্মের চাইতে দ্রুত উন্নতি বিধান করতে সক্ষম ইহুদী ধর্ম গ্রহণ করতে আমি এ পর্যন্ত শুনি নি।

প্রয়োগবাদীদের সত্যের সংজ্ঞা যাই হোক না কেন সব সময় তারা নিতান্ত সাধারণ জীবনযাপন করে থাকেন। এমন কি বাস্তবে যতটুকু প্রয়োজন তারও চেয়ে ভয়াবহ দারিদ্রের মধ্যে দিয়ে তারা জীবন অতিবাহিত করে থাকেন। একজন প্রয়োগবাদীকেও যদি জুরিতে বসিয়ে দেয়া হয়, তিনিও অন্যান্যদের মতো প্রমাণের ওপর গুরুত্ব প্রদান করে খুনের মামলার তদন্ত করবেন। কিন্তু তার প্রচারিত মতবাদ অনুসারে বিচার করতে হলে তাকে ভেবে দেখতে হবে। জনসমষ্টির মধ্যে কাকে ফাঁসিতে লটকানো লাভজনক হবে। তার সংজ্ঞা অনুসারে জ্ঞানের আসামীর অপরাধ অন্যান্যের তুলনায় অধিকতর সত্য। এ ধরনের প্রয়োগবাদ মাঝে মাঝে ঘটে থাকে বলে আমার ভয় হয়। আমি রাশিয়া এবং আমেরিকার ফ্রেম আপ’ (frame up) এর বর্ণনা শুনেছি যা এ ধরনের বহু ভয়ের বর্ণনা দিয়েছে। এসব ব্যাপারে গোপন করবার সকল সম্ভাব্য প্রচেষ্টা করা হয় এবং তাতে বিফল হলে বিষময় ফল ফলে। এই জাতীয় গোপন করার পদ্ধতি থেকে প্রমাণিত হয় যে ফৌজদারি মামলা পরিচালনা করার সময় পুলিশও এক জাতীয় বস্তুবাদী সত্য মেনে চলে। বিজ্ঞানে যাকে সেকেলে এবং পায়ে হাঁটা বলে। এটাও সে ধরনের বস্তুবাদী সত্য ধর্মের মধ্যে যা এতদিন সমাধান অনুসন্ধান করে আসছে। তারপর মানুষ, ধর্ম ঝজুভাবে সত্য এ বিশ্বাস পরিত্যাগ করে অন্য কোন নতুন দৃষ্টিভঙ্গি অনুসারে এর সত্যতা প্রমাণ করতে আত্ননিয়োগ করল। প্রমাণহীন কিছুর প্রতি বিশ্বাস এবং পর্যাপ্ত প্রমাণ যুক্ত কিছুকে অবিশ্বাস করা থেকে বস্তুবাদী সত্যের প্রতি অবিশ্বাসের উৎপত্তি, এটা খুব স্পষ্টভাবে দেখান যায়। নিরপেক্ষ বস্তুবাদে বিশ্বাস সবসময় চাকর নিয়োগ করার এত বিশেষ বিশেষ প্রশ্নের প্রতি সর্বাধিক গুরুত্ব প্রদান করে থাকে। যদি ঘটনা অনুসারে আমাদের বিশ্বাস কোথাও সত্য প্রমাণিত হয়, তা হলে অজ্ঞেয়বাদ অনুসারে সর্বত্রই তা পরীক্ষা করা যেতে পারে।

উপরোক্ত আলোচনা আমাদের আলোচনার মূল বিষয়বস্তু অনুসারে খুবই অপর্যাপ্ত, তাতে সন্দেহ নেই। নিরপেক্ষ বস্তুবাদকে দার্শনিকেরা খুবই ঘুরালো প্যাঁচালো করে ফেলেছেন। সে জন্য আমি স্থানান্তরে খুবই সহজভাবে বিশ্লেষণ করতে চেষ্টা করেছি। এক্ষণে আমি ধরে নেব কতকগুলো ঘটনার সম্ভাব্যতা সম্পর্কে ধারণা করা যায়। আমাদের বিশ্বাস অনেক সময় আসল সত্যের বিপরীত, এমনকি যখন আমরা প্রমাণের সাহায্যে কোনকিছুর সম্ভাব্যতা সম্পর্কে নিশ্চিত ধারনা পোষণ করি, একই প্রমাণে তা অসম্ভবও প্রমাণিত হতে পারে। আমাদের বিশ্বাসসমূহ আমাদের কুসংস্কার, আকাঙ্খ এবং ঐতিহ্যের উপর স্থাপন করা উচিত নয়। কারণ বিশ্বাসসমূহের মধ্যেই বিচার-বুদ্ধির ভাষ্যগত অংশ নিহিত। বিষয়বস্তু অনুসারের একজন বিচারবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষকে হয়ত একজন বিচারক অথবা একজন বৈজ্ঞানিকের দৃষ্টিভঙ্গি সম্পন্ন হতে হবে।

.

অনেকে চিন্তা করেন, মনঃসমীক্ষা মানুষের মনের বিচিত্র ধারণা এবং উন্মত্ত বিশ্বাসের উৎপত্তির দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করে আমাদেরকে দেখিয়ে দেয় যে বিশ্বাসের ক্ষোত্রে বিচারবুদ্ধিসম্পন্ন হওয়া অসম্ভব। মনঃসমীক্ষার প্রতি আমার যথেষ্ট শ্রদ্ধাবোধ আছে এবং প্রভত উপকার করতে পারে বলেও আমি ধারণা পোষণ করি ফ্রয়েড এবং তার শিষ্যবর্গকে কিসে অনুপ্রাণিত করেছিল সে সম্পর্কে অনেকেই কোন ধারণা রাখে না। উন্মত্ত রোগের এই পদ্ধতি অনেকাংশে চিকিৎসা সম্বন্ধীয় হিস্টিরিয়া এবং অন্যান্য উন্মত্ত রোগের নিরাময়ের জন্য আবিস্কৃত। যুদ্ধকালীন সময়ে মনঃসমীক্ষা যুদ্ধের ভীতিসঞ্জাত নিউরোসিস রোগীদের আরোগ্যের ক্ষেত্রে অনেকগুণে বেশি ফলপ্রসু প্রমাণিত হয়েছে। রিভার্স-এর প্রকৃতি এবং অচেতন (Instinct and unconscious) বহুলাংশে বোমায় আহত রোগীদের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে ভয়ের ফলে রোগ উৎপত্তির একটা চমৎকার বিশ্লেষণ, যা সোজাসুজিভাবে দেখানো সম্ভবপর নয়। রোগীকে বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় অবশ ইত্যাদি করে মানসিক চিকিৎসা করা হয়; এজন্য অনেকে বুদ্ধিবৃত্তিসম্মত বলে স্বীকার করেন না। বর্তমান মুহূর্তে সে সবের সঙ্গে আমাদের কোন সংশ্রব নেই, এটা হচ্ছে বুদ্ধিবৃত্তিক বিচ্যুতি! প্রবৃত্তিগত বাধাই পাগলের মতিভ্রমের কারণ এবং তাতে খাঁটি মানসিক পদ্ধতিতে চিকিৎসা করে আরোগ্যও করে তোলা যায় এবং এই চিকিৎসার দৃষ্টিভঙ্গি অনুসারে পূর্বনির্ধারিত মতে এক জাতীয় আদর্শ সুস্থতার কল্পনাও করা হয়, যে অবস্থা থেকে রোগীর পরিস্থিতি ভিন্ন পথে ধাবিত হয়েছে, তাকে এই পরিবর্তনের সমকালীণ সব ঘটনা সে ভুলে যেতে চায় তাও অবগত করিয়ে পূর্বের সুস্থ অবস্থায় ফিরিয়ে আনা হয়। যারা মাঝে মাঝে ভুল করে অথবা সংক্ষিপ্ত করার জন্য নির্দিষ্ট চিকিৎসা পদ্ধতি আখ্যা দিয়ে বিচারবুদ্ধিবিরুদ্ধ বিশ্বাসের প্রচলন দেখাবার অলস অভিযোগ করে থাকেন, মনঃসমীক্ষণ ঠিক তার বিপরীত। এর সঙ্গে সম্বন্ধযুক্ত সাদৃশ্যাত্মক পদ্ধতিতে যারা বদ্ধপাগল নয়, তাদেরও চিকিৎসা করা যেতে পারে, যদি তারা তাদের পাগলামির লক্ষণের সঙ্গে পরিচিত নয় এমন চিকিৎসকের কাছে স্বেচ্ছায় আত্মনিয়োগ করে।

প্রেসিডেন্ট, কেবিনেট মন্ত্রীবৃন্দ এবং বিখ্যাত ব্যক্তিরা কোন চিকিৎসকের কাছে আত্মসমর্পণ করেন না বলে রোগমুক্তও হতে পারেন না।

.

এতক্ষণ পর্যন্ত আমরা বিচারবুদ্ধি ভাষ্যগত অর্থ নিয়ে পর্যালোচনা করেছি। এর বাস্তব দিকটি অধিকতর কষ্টসাপেক্ষ এবং সে দিকেই আমাদের দৃষ্টি ফেরাতে হবে। বাস্তব ক্ষেত্রে মতের বিভিন্নতা দ্বিতীয়তঃ আকাক্ষার বাস্তবায়নের উপায় পরিকল্পনার বিভিন্নতা। কিন্তু দ্বিতীয় প্রকারে বিভিন্নতা শুধুমাত্র থিয়োরিতে সীমাবদ্ধ এবং বুৎপত্তিগত অর্থে বাস্তব। উদাহরণস্বরূপ কোন কর্তৃপক্ষের মতে আমাদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার প্রথম লাইন যুদ্ধ জাহাজ দিয়ে গঠিত হওয়া উচিত। এখানে যে প্রস্তাবিত লক্ষ্য জাতীয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ক্ষেত্রে কোনও রকমের মতদ্বৈততা নেই, শুধু উপায় পরিকল্পনার বিভিন্নতার বিবাদ। যে পর্যন্ত বর্তমানে অথবা ভবিষ্যতে নিশ্চিত অথবা সম্ভাব্য ঘটনাবলীর ক্ষতি করার সম্ভাবনা থাকে, সে পর্যন্ত যুক্তিকে পুরোপুরি বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে পরিচালনা করা যায়। এ সমস্ত ক্ষেত্রে বিচারবুদ্ধির সঙ্গে বাস্ত বের সংযোগ থাকা সত্ত্বেও আমি ভাষ্য অথবা থিয়োরিগত অর্থেই বিচারবুদ্ধিকে ব্যবহার করেছি।

সে যা হোক, বেশির ভাগ ক্ষেত্রে এই পরিমণ্ডলে এমন কিছু আসবে যা জটিল কিন্তু ফলিত দিক দিয়ে অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। একজন মানুষ যখন নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে কাজ করবার আকাঙ্ক্ষা পোষণ করে, তখন নিজেকে এই বিশ্বাসে অনুপ্রাণিত করে যে, তা করলে তার অভীষ্ট সিদ্ধি হবে, কিন্তু যখন তার কোনও লক্ষ্য থাকে না তখনও সে তার কাজের পেছনে যে বিশ্বাস তার মর্মমূল অনুসন্ধান করে দেখে না। বাস্তবে যা ঘটেছে এবং যা ঘটবার সম্ভাবনা রয়েছে সবকিছুকে সে তার চেয়ে ভিন্ন আকাঙ্খ পোষণকারী একজন যে ভাবে দেখে সে দেখে তার উল্টো। সকলেরই জানা কথা জুয়াড়িরা সবসময় বিচারবুদ্ধিরহিত বিশ্বাসে নির্ভর করে, সব সময় আশা পোষণ করে যে তারা জয়ী হবেই। রাষ্ট্রনীতিতে অংশগ্রহণকারী লোকদের স্থির ধারণা তাদের দলের নেতৃবৃন্দ বিপক্ষদলের নেতাদের এত কখন দুর্নীতি কলা-কৌশল অবলম্বন করে না। শাসকশ্রেনী বিশ্বাস করে জনগণের কল্যাণের জন্য তাদের সঙ্গে ভেড়ার পালের মতো ব্যাবহার করা উচিৎ! ধূমপায়ীরা ধূমপানের স্বপক্ষে যুক্তি প্রদান করে বলে, ধূমপানের ফলে স্নায়ুতে স্নিগ্ধতা আসে। মদ্যপায়ীদের মতে মদ রসবোধক সঞ্জীবিত করে। এ সকল কারণে সৃষ্ট একঘেঁয়েমীর ফলে ঘটনা সম্বন্ধে মানুষের মতামত মিথ্যা প্রতিপন্ন হয়ে পড়ে, যা এড়িয়ে যাওয়া খুবই কঠিন।

স্নায়ুতন্ত্রের প্রক্রিয়া সম্বন্ধে বৈজ্ঞানিকদের জ্ঞানগর্ব আলোচনাতেও অনেক অন্তঃস্থ প্রমাণপঞ্জীর অনেককিছু বাদ পড়ে যায়। লেখক মদ্যপায়ী অথবা মদ্য অভ্যাসের যৌক্তিকতা প্রমাণ করবেন। ধর্ম এবং রাজনীতির ক্ষেত্রেও এ জাতীয় মনোভাব অপরিহার্য। রাষ্ট্রনীতিতে যারা অংশ নেন তারা ভাবেন জনগণের কল্যাণের আকাঙ্খই তাদেরকে মতবাদ স্থির করতে অনুপ্রাণিত করেছে। কিন্তু দশবারের মধ্যে নয় বার বলে দেয়া যায় যে একজন মানুষের রাষ্ট্রনীতিতে অংশগ্রহণ তার বাস্তব জীবনধারা থেকে উদ্ভূত। এর ফলে কিছু সংখ্যক মানুষ মনে করে এবং কিছুসংখ্যক মানুষ দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে যে এসব ব্যাপারে বস্তুনিরপেক্ষ হওয়া অসম্ভব এবং পক্ষপাতমূলক শ্রেণীসমূহের মধ্যে টাগ অব ওয়ার ছাড়া এর কোন সমাধান নেই।

.

ঠিক এইরকম ক্ষেত্রে মনঃসমীক্ষণ অত্যাধিকভাবে কার্যকর, কারণ তা মানুষের অচেতন মনে যে পক্ষপাতিত্ব বোধ আছে সে সম্বন্ধে ওয়াকেফহাল করে। অন্যেরা যেমন আমাদেরকে দেখে এই পদ্ধতিতে, ঠিক তেমনি আমরাও নিজদেরকে দেখতে পাই এবং আমাদের মতামতের কারণ বিশ্লেষণ করে জানতে পারি ওসবে যত গুরুত্ব আমরা দিয়ে থাকি আদতে তত গুরুত্বপূর্ণ নয়। বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি অনুসারে এই পদ্ধতি ব্যাপকভাবে শিক্ষা দিলে মানুষকে বাস্তবে ঘটনা এবং প্রস্তাবিত কোন কর্মের ক্রিয়াশীলতার প্রতি অধিকতর বিচারবুদ্ধিসম্পন্ন করা যায়। এসবে মানুষ যদি দ্বিমত পোষণ না করে তাহলে যে ধরনের মতদ্বৈধতার অবকাশ থাকে, শান্তিপূর্ণ উপায়ে তার মীমংসা সম্ভবপর।

এরপর যে অবশিষ্টাংশটুকু বর্তমানে থেকে যাবে তার সমাধান নিখুঁত বুদ্ধিবৃত্তিক পদ্ধতিতে সম্ভব নয়। একজন মানুষের আকাঙ্ক্ষা সর্বাংশে অন্য একজন মানুষের সঙ্গে মিল খায় না। স্টক এক্সচেঞ্জের দুজন প্রতিযোগী এ ব্যাপারে সে ব্যাপারে সম্পূর্ণ এক মত হলেও যতক্ষণ একে অন্যের বদৌলতে ধনী হওয়ার আকাঙ্খ। পরিত্যাগ না করবে, ততক্ষণ পর্যন্ত তাদের মধ্যে ঐক্যের প্রতিষ্ঠা হতে পারে না। এরকম বহু বিপত্তি এই বিশেষ স্থানে এড়িয়ে যেতে পারে। ভাবাবেগের তাগিদে মুখের আক্রোশে নাক কেটে ফোল এরকম একজন মানুষকে আমরা বিচারবুদ্ধি রহিত বলে আখ্যা দিতে পারি। সে বিচারবুদ্ধিরহিত, কেননা বর্তমান মুহূর্তের উগ্র আকাঙ্খা চরিতার্থ করার জন্য ভবিষ্যতের প্রয়োজনীয় আকাঙ্ক্ষাকে ভেঙ্গে চুরমার করে ফেলে। মানুষ যদি বিচারবুদ্ধিসম্পন্ন হতে পারে তা হলে বর্তমানে যা করে ভবিষ্যতে তার চেয়ে নির্ভুল সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে। যদি প্রত্যেক মানুষ জ্ঞাতভাবে নিজের স্বার্থের অনুকূলে কাজ করে যায় তা হলে পৃথিবীতে যা আছে তার তুলনায় স্বর্গরাজ্য হয়ে যেত। আমি এও বলতে চাইনি যে মানুষের নিজের স্বার্থের কাজ করার চেয়ে কাজের আর কোনও মহত্ত্বর উদ্দেশ্য নেই। কিন্তু আমি মনে করি অজ্ঞাতভাবে কাজ করার চেয়ে জ্ঞাতভাবে নিজের স্বার্থের অনুকূলে কাজ করা পরার্থপরতার মতো মহত্তর। এ সুশৃঙ্খল সমাজে অন্যের স্বার্থে আপত্তি করার মতো এমন কাজ করবে কদাচিত খুব কম লোককে দেখা যায়। একজন কম বিচারবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ, অন্যের পক্ষে যা ক্ষতিকর, তা তারও ক্ষতির কারণ একথা মনে করতে পারেনা, কারণ ঘৃণা এবং প্রতিহিংসা তাকে অন্ধ করে রাখে।

যদিও আমি জ্ঞাতভাবে কাজ করাকে সর্বোচ্চ নৈতিকতা বলার ধৃষ্টতা পোষণ করি না, তবু মানুষ যদি জ্ঞাতভাবে নিজের স্বার্থের অনুকূলে কাজ করে পৃথিবীটা যা আছে তার চেয়ে অনেকগুণে ভালো হয়ে যাবে।

এ মুহূর্তে যেটা তীব্রভাবে অনুভব করছি সেটা নয়, একসঙ্গে সমস্ত প্রয়োজনীয় আকাক্ষার প্রতি দৃষ্টি রাখাকেই ফলিত বিচারবুদ্ধির সংজ্ঞা বলা যেতে পারে। বিচারবুদ্ধি অনেকটা আনুপাতিক মতামতের ওপর নির্ভর করে, এবং তা সম্পূর্ণ আয়ত্ব করা অসম্ভব। তাই বলে যখন কিছু মানুষকে পাগল বলি, তখন এটা পরিস্কার। যে কিছু সংখ্যককে অন্যান্য মানুষের চেয়ে অধিক বিচাররবুদ্ধিসম্পন্ন এ কথা বলে থাকি। আমি বিশ্বাস করি ভাষ্যগত এবং বাস্তব বিচারবুদ্ধির ফলেই পৃথিবীর প্রকৃত উন্নতি হয়েছে। পরার্থপরতার নীতি প্রচার করা আমার কাছে অর্থহীন, কারণ তা একমাত্র তাদের কাছে সক্রিয় যারা পরার্থপরতাকে জীবনের নীতি হিসেবে গ্রহণ করেছেন। কিন্তু বিচারবুদ্ধি সম্পর্কে প্রচার করার অর্থ ভিন্নতর, কেননা বিচারবুদ্ধির সাহায্যে আমাদের আশা-আকাঙ্ক্ষা, তা যাই হোক না কেন, বাস্তবে রূপায়ণ করতে সক্ষম হয়ে থাকি। একে অন্যের ক্ষতি করার বিভিন্ন পদ্ধতি যখন বিজ্ঞান আবিস্কার। করেছে তখন আমি বিশ্বাস করি, শিক্ষাব্যবস্থা, সংবাদপত্র, ধর্ম এক কথায় পৃথিবীর প্রধান শক্তিগুলো বিচার বুদ্ধির বিরুদ্ধে। ওসব শক্তিগুলো এমন লোকের কর্তৃত্বাধীনে যা ধর্মরাজ ডেমোগোকেও ভুলিয়ে পথ ভ্রষ্ট করে। বীরত্বের হুংকারে নয়, আত্মীয় প্রতিবেশী এবং পৃথিবীর প্রতি ব্যক্তির সুস্থ এবং নিয়ন্ত্রিত ব্যবহারের মধ্যেই নিহিত এর প্রতিবিধান। একমাত্র ব্যাপক বিস্তৃতিশীল বুদ্ধির কাছেই আমাদের পৃথিবী যে দূর্ভোগে ভুগছে তার নিরসন কামনা করব।

০৫. বিংশ শতাব্দীর দর্শন

মধ্যযুগের শেষ দিক থেকে রাজনৈতিক এবং সামাজিক প্রাধান্যের মধ্যে দর্শনের অবলুপ্তি ঘটে। ওকহামের উইলিয়াম ছিলেন মধ্যযুগের শ্রেষ্ঠতম দার্শনিকদের একজন। তাঁকে কাইজার পোপের বিরুদ্ধে বিজ্ঞাপন লেখার জন্যে ভাড়া করেছিলেন। কারণ সে যুগের জ্বলন্ত সমস্যাসমূহের সঙ্গে সাম্প্রদায়িক বিরোধের প্রত্যক্ষ সম্বন্ধ ছিল।

সপ্তদশ শতাব্দীতে দর্শনের অগ্রগতির সঙ্গে ক্যাথলিক গির্জার বিরুদ্ধে রাজনৈতিক সংগ্রামের সম্পর্ক ছিল, তবে তা কোথাও কম কোথাও বেশি। সত্যিকার অর্থে মেইল ব্রাঁসেও ছিলেন একজন পুরোত, কিন্তু পুরোতদেরকে তার দর্শন পড়তে দেয়া হতো না। অষ্টাদশ শতাব্দীতে ফরাসিদেশে লকের শিষ্যবর্গ এবং উনবিংশ শতাব্দীতে ইংল্যাণ্ডে বেনথাপন্থীরা ছিলেন রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি অনুসারে সম্পূর্ণরূপে বামপন্থী এবং তাদেরই প্রভাবে আধুনিক বুর্জোয়া উদারনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গীর প্রসার ঘটেছে। কিন্তু অগ্রগতির ব্যাপারে দর্শন এবং রাজনীতির মধ্যে পারস্পরিক সম্বন্ধের কোন সুনির্দিষ্ট রূপ আভাসিত হয়ে ওঠে নি। দর্শনের দিক দিয়ে যদিও হিউম ছিলেন বামপন্থী কিন্তু ব্যক্তিগতভাবে তিনি ছিলেন একজন টোরি সমর্থক। একমাত্র রাশিয়াতেই প্রাক-বিপ্লব আমল পর্যন্ত মধ্যযুগীয় দর্শনের ভাঙাগড়া অথবা কোন রূপান্তর ঘটেনি। ফলে দর্শন এবং রাজনীতির যে-কোন সম্পর্ক দীর্ঘকাল ধরে আলাদা আলাদাভাবে অস্তিত্ব বজায় রাখতে পেরেছিল! বলশেভিকরা হলো বস্তুবাদী এবং সাদা মানুষেরা আদর্শবাদী। তিব্বতে এদুয়ের সম্পর্ক অতি নিবিড়, এমনকি দার্শনিক প্রধানকেই রাষ্ট্রের দ্বিতীয় ব্যক্তি বলে গণ্য করা হয়। তাছাড়া অন্য কোনও দেশে দর্শনকে এত সম্মান দেয়া হয় না।

বিংশ শতাব্দীতে দর্শন আনুষ্ঠানিকভাবে তিনটি শাখায় বিভক্ত হয়ে গেছে। প্রথম শাখা জার্মান ধ্রুপদ দর্শনের অনুসারীদের নিয়ে গঠিত। দ্বিতীয় দলটা বের্গসঁ এবং প্রয়োগবাদীদের নিয়ে গড়ে উঠেছে। তৃতীয় দলে যারা আছেন, তারা দর্শনে বিশেষ সত্য লুকিয়ে আছে এবং সে সত্যে উপনীত হওয়ার জন্য বিশেষ পদ্ধতির প্রতি শ্রদ্ধাজ্ঞাপন না করে সরাসরি বিজ্ঞানের সঙ্গে সংযোগ রক্ষা করেন। চিহ্নিত করবার জন্য তাদেরকে বস্তুবাদী আখ্যা দেয়া যেতে পারে; তার পরেও তাদের অনেককে সে পরিচয়ে পরিচিত করা যায় না।

বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে যে পার্থক্য তা খুব তীক্ষ্ণ নয়। অংশতঃ এ গোষ্ঠী এবং অংশতঃ ও গোষ্ঠী বলে পরিচিত হয়ে থাকেন দার্শনিকেরা। উইলিয়াম জেমসকে প্রয়োগবাদ এবং বস্তুবাদের প্রতিষ্ঠাতা বলা যেতে পারে। ডক্টর হোয়াইটহেড তার সাম্প্রতিক গ্রন্থে কমবেশি বের্গসিয় দর্শনের স্বপক্ষে ওকালতি করেছেন। অনেক দার্শনিক আছেন যারা উপযুক্ত যুক্তি না দেখিয়ে আইনষ্টাইনের বৈজ্ঞানিক মতবাদকে কার্যের স্থান কাল পাত্রের ভিত্তিভূমি বলে ধারণা করে থাকেন। যুক্তির পার্থক্যের চেয়ে বাস্তবের পার্থক্য অধিকতর সুস্পষ্ট। তা সত্বেও মতামতের শ্রেণীবিন্যাসের প্রয়োজনে যুক্তির বিভিন্নতার প্রয়োজন রয়েছে।

জার্মান আদর্শবাদ বিংশ শতাব্দীব্যাপী প্রতিরক্ষা ভূমিকা পালন করে আসছে। অধ্যাপক ছাড়া আর যারা নতুন গ্রন্থের বিচার করেন, তারাই নতুন নতুন গোষ্ঠীকে তুলে ধরেছেন। সমালোচনাকে সম্বল করে গ্রন্থের বিচার করেন বলে তারা ভাবেন যে এ সমস্ত গোষ্ঠী এখন অত্যাধিক প্রতিপত্তিশালী; কিন্তু প্রকৃত প্রস্তাবে জার্মানি, গ্রেটবৃটেন, ফ্রান্স (আমেরিকা নাও হতে পারে) এখন দর্শনের ক্লাসিক ঐতিহ্যকেই আঁকড়ে ধরে রয়েছে। একজন যুবক তার সমালোচনা না করে সমর্থন করলে হোমরা চোমরা কেউকেটা একটা হয়ে যেতে পারে।

বিরুদ্ধবাদীরা এর মধ্যে অনেক জার্মান দোষ বের করবার চেষ্টা করেছেন; কিছু অংশে তা জার্মানির বেলজিয়াম আক্রমনের জন্য দায়ীও বটে। এই দলের সমর্থকেরা। বিখ্যাত এবং সম্মানিত ছিলেন তাই তাদেরকে আক্রমণ করে ঘায়েল করা খুব সহজসাধ্য ব্যাপার ছিল না। ইমাইল বেজোস্ক এবং বানাল্ড বেসানকোয়েট মৃত্যুর পূর্বমুহূর্ত পর্যন্ত আন্তর্জাতিক কংগ্রেসে ফরাসি এবং বৃটিশ দর্শনের মুখপাত্র ছিলেন। এই সম্প্রদায়ের ধর্মীয় মোহগ্রস্থ এবং রক্ষনশীল দৃষ্টিভঙ্গি ধর্মের স্বপক্ষে এবং বিপ্লবের প্রতিকূলে সদাসর্বদা আত্মপক্ষ সমর্থনে তৎপর ছিল। এ গোষ্ঠীর মধ্যে যারা পূর্বাবস্থা অক্ষুণ্ণ রাখতে চাইতেন, তাদের দুর্বলতা এবং ঐতিহ্যের শক্তি দুই-ই ছিল। কিন্তু নতুন চিন্তাধারার সজীবতা তাদের ছিল না। বিশংশতাব্দীর ঠিক পুর্বমুহূর্তে ইংরেজি ভাষাভাষি অঞ্চলসমূহে এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। ১৮৯৩ খ্রিস্টাব্দে যখন মি. ব্রাডলের এপিয়ারেন্স আ্যন্ড রিয়ালিটি (Appearence and reality) গ্রন্থ প্রকাশিত হয় তখন থেকে আমি দর্শন পাঠে গভীরভাবে মনোনিবেশ করি। ইংল্যাণ্ডে জার্মান। দর্শনের প্রকৃত স্বীকৃতি আদায় করার ব্যাপারে যাদের সংগ্রাম করতে হয়েছিল মি. ব্রাডলে তাদের একজন। ঐতিহ্যগত গোঁড়ামির সমর্থকদের তুলনায় তার দৃষ্টিভঙ্গি ছিল উর্ধ্বে। অন্যান্য সমসাময়িকের মতো তার এ্যাপিয়ারেন্স অ্যাণ্ড রিয়ালিটি আমার মধ্যে গভীরভাবে আবেদন সৃষ্টি করেছিল, যদিও সেসব গ্রন্থের মতামতের সঙ্গে আমি ভিন্ন ধারণা পোষণ করি, তবু সেগুলোকে আমি এখনো খুবই সম্মানের চোখে দেখে থাকি।

হেগেলপন্থীদের দৃষ্টিভঙ্গীর বৈশিষ্ট্য হলো একমাত্র ন্যায়শাস্ত্রই আমাদেরকে বাস্তব পৃথিবীর সব কিছু সম্পর্কে ওয়াকিবহাল করে তুলতে পারে। মি. ব্রাডলেও অংশতঃ তাই বিশ্বাস করতেন। তার মতামত হলো যেহেতু পৃথিবীটা বাইরের দিক থেকে দেখতে গেলে স্ববিরোধী এবং সে জন্য মায়াময়, সুতরাং ন্যায়শাস্ত্রের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হলে আশ্চর্যজনক কোন বৈশিষ্ট্য এর থাকতে পারে না। তার মধ্যে পরস্পর-সংশ্লিষ্ট বিচিত্র কিছু থাকতে পারে না এবং তার পৃথক পৃথক সত্তা এমনকি জানার জন্য কর্তা কর্মের মধ্যেও কোন বিভিন্নতা থাকতে পারে না সুতরাং একটি শর্তহীন সত্তার মধ্যেই সামাজিক বৈশিষ্ট্যটি নিরবধিকাল থেকে বিরাজমান এবং আকাক্ষা ও চিন্তাকে বাদ দিয়ে অনুভূতিরই সমগোত্রীয়।

ঘটনাগুলো ঘটনা নয়, আদতে আমাদের ভূপৃষ্ঠের যা কিছু ঘটে সব মায়া। এই মতবাদের ফলে নৈতিকতার ধ্বংসসাধন হওয়া উচিত; কিন্তু নৈতিকতা হলো প্রবৃত্তিগত এবং ন্যায়শাস্ত্রের আওতার বাইরে। হেগেলপন্থীরা যে আবেদন করে থাকেন প্রকৃত প্রস্তাবে তার মূলনীতি হলো যেহেতু হেগেলিয় দর্শন সত্য, সুতরাং আমাদের সে অনুসারে কাজ করা উচিৎ। কিন্তু তাদের জানা উচিত যে এ দর্শন সত্য হলে আমরা যেভাবে গ্রহণ করেছি সেভাবে না করে ভিন্নভাবে গ্রহণ করতাম।

এই দর্শনকে দু’দিক থেকে আক্রমণ করা হয়েছে। একদিকে আছেন নৈয়ায়িকেরা, যারা হেগেলের মধ্যে ভ্রান্তিকে সুস্পষ্টভাবে দেখিয়ে দিয়েছেন; তাছাড়াও সংযোগ, বহুত্ব, স্থান-কাল ইত্যাদি অনেক স্ববিরোধী তথ্যের অসারতা প্রমাণ করেছেন। অন্যদিকে ছিলেন তারা যারা চিন্তাকে ন্যায়শাস্ত্রের সৃষ্ট মতে সীমিত এবং অনুগত রাখতে অস্বীকার করলেন। তাদের মধ্যে উইলিয়াম জেমস এবং বেগ ছিলেন প্রধান। এই দু’মুখো আক্রমণের দু’একটি বিস্ফোরণকে বাদ দিলে দর্শন ন্যায়শাস্ত্র অনুসারে সঙ্গতিবিহীন ছিল না। ভিন্নরকমের জ্ঞানের প্রভাবে অনুপ্রাণিত বলে দু’য়ের মধ্যে প্রকৃতিগত প্রভেদ ছিল বিস্তর। দু’দলের আবেদনও দু’রকম। একদলের আবেদন ছিল আনুষ্ঠানিক এবং অন্য দলের মানবিক। আনুষ্ঠানিক আবেদন হেগেলিয় যুক্তি দেখিয়ে হেগেলিয় দর্শনকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করল; স্বভাবতঃই মানবীয় আবেদন অধিকতর সফলতা অর্জন করে।

ইংরেজি ভাষাভাষী জগতে জার্মান আদর্শবাদের নাগপাশ যার প্রভাবে ছিন্ন হয় তিনি হলেন উইলিয়াম জেমস। মনস্তত্ত্বে তার যে পরিচয় বিধৃত ছিল সে হিসেবে নয়, ছোট ছোট যে পুস্তকগুলো তার শেষ জীবনে এবং মৃত্যুর পরে ধারাবাহিকবাবে প্রকাশিত হয়েছে সেগুলো তাকে নতুন পরিচয়ে চিহ্নিত করেছে। মাইণ্ড (Mind) কাগজে ১৮৮৪ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত একটা প্রবন্ধে তিনি তার প্রবৃত্তিগত পক্ষপাতিত্ববোধকে অপূর্ব সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন প্রবন্ধটি তার মৃত্যুর পরে প্রকাশিত গ্রন্থাবলী র‍্যাডিক্যাল এমপিরিসিজমে সংযোজিত হয়েছে।

যেহেতু আমরা প্রধানত সংশয়বাদী, সেজন্য আমাদের কিছু সংখ্যক বিশ্বাসের অভিপ্রায় পরস্পরের কাছে অকপটভাবে স্বীকার করতে পারি। আমার সম্পর্কে আমি যা অকপটভাবে স্বীকার করতে পারি মূলতঃ সেগুলো সৌন্দর্যতত্ব সম্বন্ধীয় ন্যায়শাস্ত্রের সঙ্গে তার সম্পর্ক নেই। ব্রহ্মাণ্ডের নিখুঁত ত্রুটিহীন সর্বব্যাপ্ততা আমাকে সম্পূর্ণরূপে শ্বাসরুদ্ধ করে ফেলে। সম্ভাবনাহীন প্রয়োজনীয়তা, সম্বন্ধহীন বিষয়পুঞ্জ আমাকে অনুভব করতে বাধ্য করে যে কোন সংরক্ষিত অধিকার ব্যতিরেকেই আমি এমন একটা চুক্তিতে আবদ্ধ হয়েছি, তা যেন ব্যক্তিগত শয়নকক্ষহীন সমুদ্রতীরে বিরাট একটি বোর্ডিং হাউজে বাস করার মতো; যেখানে আমি সে অঞ্চলের সমাজ থেকে আত্নগোপণ করে থাকতে পারব। অধিকন্তু আমি তীক্ষ্ণভাবে সজাগ যে ঐ বিষয়ে আচারনিষ্ঠ ইহুদী এবং প্রাচীন ঝগড়াটে পাপীদের কিছু করার আছে। আমার ব্যক্তিগত জ্ঞান থেকেই বলছি, সব হেগেলপন্থীরা দাম্ভিক নয়, কিন্তু আমি অনুভব করি হেগেলপন্থী হওয়ার মধ্যেই সকল দাম্ভিকের পরিণতি। একটি গল্প আছে, দু’জন যাজককে ভুলক্রমে একটি শেষকৃত্য অনুষ্ঠান পরিচালনা করার জন্য নিমন্ত্রণ করা হয়েছিল। একজন এসেই শুরু করে দিল আমিই ধ্বংস আমিই জীবন, তখন অন্যজন প্রবেশ করে চিৎকার করে বলল আমিই ধ্বংস আমিই জীবন। দর্শন আমাদের অনেককে সে বিবদমান দু’যাজকের কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়।

দর্শন বলতে অত্যন্ত সুরক্ষিত, বেদনাদায়ক এবং নিখুঁতভাবে নির্দেশিত এমন কিছুকে বোঝায় যা বিশাল অচেতন মৃদু নিঃশেষিত সঙ্গতির অতলান্ত গভীরতা এবং অজানা আবর্তের হয়ে কথা কয়।

উইলিয়াম জেমস হেগেলিয় দর্শনের সঙ্গে সামুদ্রপারের বোর্ডিং হাউজের তুলনা করেছেন, তিনি সেখানে কখনো বাস করেছেন বাজি রেখেও কেউ কখনো স্বীকার করবে না। ১৮৮৪ সালে এই প্রবন্ধের তেমন কোন প্রভাব ছিল না, কারণ তখন হেগেলিয় দর্শনের প্রাধান্য পুরোমাত্রায় বিরাজমান ছিল এবং প্রবৃত্তি যে তাদের মতামতের উপর প্রতিক্রিয়া করে তা দার্শনিকদের জানা ছিল না। ১৯৮২ সালে (প্রবন্ধে পুনঃমুদ্রণকালে) পরিস্থিতি বিভিন্ন কারনে পরিবর্তিত আকার ধারণ করে,তার মধ্যে হেগেল শিষ্যদের ওপর উইলিয়াম জেমসের প্রভাবকে অন্যতম ধরা যেতে পারে। তার লেখা ছাড়া তাকে ভাসাভাসার চেয়ে বেশি জেনেছি এ দাবি আমি করতে পারিনে। আমার ধারণা তার চরিত্রের তিনরকম বৈশিষ্ট্য যে-কেউ আবিষ্কার করতে পারে। এ তিনরকম বৈশিষ্ট্যের সমন্বয়ে তার দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে উঠেছিল। মনস্তত্ব এবং চিকিৎসাবিদ্যায় অধ্যয়নের প্রভাব শেষবার কিন্তু দর্শনের স্ফুরণে প্রথম তার মধ্যে মুকুলিত হয়ে উঠেছিল। খাঁটি সাহিত্যিক দার্শনিক প্লেটো, এ্যারিস্টোটল এবং হেগেল থেকে অনুপ্রেরণা-লব্ধ দার্শনিকদের তুলনায় বৈজ্ঞানিক এবং বস্তুবাদের প্রতি সামান্য পক্ষপাতসম্পন্ন রূপে তার দর্শন আত্নপ্রকাশ করেছিল। স্বাধীন ইচ্ছাশক্তির আলোচনার এত কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অনুচ্ছেদে ছাড়া সর্বত্রই এ ধারণা প্রাধান্য বিস্ত রি করেছে। তার দর্শনের কাঠামোর দ্বিতীয় উপাদান হলো মরমী এবং ধর্মীয় পক্ষপাত তা তিনি তার ভ্রাতার মতো পিতার কাছ থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে অর্জন করেছিলেন। এই পক্ষপাতই তার বিশ্বাস করার ইচ্ছা অথবা উইল টু বিলিভকে এবং আত্মা সম্বন্ধে গবেষণা করতে অনুপ্রাণিত করেছিল। তৃতীয়তঃ তিনি তার ভাইসহ নিউইংল্যাণ্ডের বিবেকের সমস্ত আন্তরিকতা সহযোগে স্বাভাবিক আড়ম্বরকে নস্যাৎ করে তার স্থলে ওয়াল্ট হুইটম্যানের গণতান্ত্রিক ভাবধারার প্রসার ঘটাতে চেয়েছিলেন। ওপরে উদ্ধৃত অনুচ্ছেদটির মধ্যে রুচিবাগীশতার প্রমাণ পাওয়া যায়, তিনি ব্যক্তিগত শয়ন কক্ষ ছাড়া সাগর পাড়ে বোর্ডিং হাউজের প্রতি তীব্র ঘৃণা প্রকাশ করেছেন (হয়তো হুইটম্যান যা ভালোবাসতে পারতেন) আচারনিষ্ঠ ইহুদী বলে নয়, পাপী এ দাবীতেই তিনি গণতান্ত্রিক হওয়ার ইচ্ছা পোষণ করেন। কিন্তু তিনি নিশ্চিতভাবে একজন আচারনিষ্ঠ ইহুদী ছিলেন না এবং সম্ভবতঃ তিনিও অন্যান্য মানুষের এত কিছু পাপ করে থাকবেন। এ ক্ষেত্রে তিনি স্বভাবসুলভ বিনয় প্রকাশ করতে অকৃতকার্য হয়েছেন।

বিভিন্ন রকমের গুণাবলীর মিশ্রণের মধ্যেই শ্রেষ্ঠ মানুষদের বিশেষত্ব ফুটে ওঠে, যা অনেকসময় অসঙ্গত রূপও ধারণ করতে পারে, উইলিয়াম জেমসের ক্ষেত্রেও তাই হয়েছিল, তার সমসাময়িকেরা যা মনে করত তার তুলনায় তার ছিল অনেকগুণ বেশি। ধর্মীয় আশা-আকাঙ্ক্ষাকে বৈজ্ঞানিক অনুমানের মতো করে ব্যক্ত করার পদ্ধতি হিসেবে তিনি প্রয়োগবাদের স্বপক্ষে ওকালতি করেছিলেন। মন এবং পদার্থের বিরোধ দু’টোর কোনটাকেই না খর্ব করে, নিস্পত্তি করার পদ্ধতি হিসেবে চেতনা বলে কোনকিছু নেই এ বৈপ্লবিক মতবাদের প্রবর্তন করেন। তার দর্শনের দু’পর্যায়ে বহু সহমর্মী তার ছিল। শিলার এবং বেগর্স ছিলেন প্রথম পর্যায়ের মিতা এবং নিওরিয়ালিস্ট, যা নব্য বস্তুবাদীরা ছিলেন পরবর্তী পর্যায়ে। প্রধান ব্যক্তিদের মধ্যে একমাত্র ডিউয়ি উভয়পর্যায়ে তার সঙ্গে ছিলেন। প্রধান ব্যক্তিদের মধ্যে স্বীকৃত রয়েছে, সে জন্য অবশ্যই আলাদা আলাদাভাবে পর্যালোচনা করতে হবে।

জেমসের বিশ্বাস করার ইচ্ছা (Will to believe) ১৯৮৭ সালে প্রয়োগাদ (Pragmatisom) ১৯০৭ সালে শিলারের মানবতাবাদ (Humanism) এবং ডিউয়ির ন্যায়শাস্ত্র (Studies in logical theory) ১৯০৩ সালে প্রকাশিত হয়। বিংশশতাব্দীর প্রথম বছরসমূহে দর্শনজগত প্রয়োগবাদের গুণগানে মুখরিত ছিল। তার পরে বেগর্স কতিপয় পরীক্ষায় ফেলে তা অকেজো করে ফেললেন। প্রযোগবাদের তিনজন প্রতিষ্ঠাতার মধ্যে বিস্তৃত পার্থক্য রয়েছে, আমরা জেমস, শিলার এবং ডিউয়িকে যথাক্রমে ধর্মীয় সাহিত্যিক এবং বৈজ্ঞানিক অভিনেতা হিসেবে ধরে নিতে পারি। যদিও জেমস ছিলেন বহুমুখী, কিন্তু তার একমাত্র ধর্মীয় বোধেরই প্রয়োগবাদে উক্রান্তি ঘটেছে। চলুন আমরা এ সকল পার্থক্যের কথা ভুলে গিয়ে সম্পূর্ণমতবাদকে একীভূত সূত্র হিসেবে উপস্থিত করি।

এক রকমের সংশয়বাদ হলো এ মতবাদের ভিত্তিভূমি। ঐতিহ্যগত দর্শন ধর্মের ক্ষেত্রে মতবাদকে প্রমাণ করার অক্ষমতা প্রচার করল এবং বিরুদ্ধবাদীরা ধর্মকে অপ্রমাণ অথবা নিদেন পক্ষে স্পেনসারের মতো ধর্মবিশ্বাসকে প্রমাণ করা যায় না একথা প্রমাণ করার কথা ঘোষণা করল। সে যাহোক, ধর্মীয় মতবাদকে প্রমাণ অথবা অপ্রমাণ কিছুই করা যায় না। অনেক মতবাদের ক্ষেত্রে একই ফলশ্রুতি দেখা গেল; যাকে স্পেনসারের মতো মানুষেরা পরিবর্তনীয় মনে করলেন। সেগুলো হলো কার্যকারণ, সম্বন্ধ, আইনের সীমানা, স্মৃতির সাধারণ বিশ্বাস, অযোগ্যতা, অবরোহ পদ্ধতির যথার্থতা ইত্যাদি। প্রকৃত বিবেচনাসম্পন্ন দৃষ্টিভঙ্গি অনুসারে নিরীশ্বরবাদের উৎকণ্ঠিত রায়ের মধ্যে এ সকল উপাদানের বিলুপ্তি ঘটা উচিত! যতদূর পর্যন্ত আমরা দেখতে পাই ততদূর এগুলো প্রমাণ অপ্রমাণ কিছুই করা যায় না। জেমস বলেন বস্তুজ্ঞানসম্পন্ন মানুষ হিসেবে যদি আমরা বেচে থাকতে চাই, তাহলে এসব বিষয়ে আমাদের সন্দিহান থাকলে চলবে না। দৃষ্টান্তস্বরূপ আমরা অবশ্যই কল্পনা করতে পারি, যে খাদ্য অতীতে আমাদের পুষ্টিবৃদ্ধি করেছে ভবিষ্যতে তা আমাদের শরীরে বিষক্রিয়া করবে না। অনেক সময় তা আমরা ভুলে যাই এবং মারা পড়ি। জীবনের উন্নতি এবং আকাক্ষার প্রতিফলন ঘটানোর মধ্যেই বিশ্বাসের পরীক্ষার সাফল্য প্রমাণিত হয় এবং যে পর্যন্ত না আমরা বস্তুজগত সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট ধারণা পোষণ করতে না পারি সে পর্যন্ত আমাদের বিশ্বাস বস্তুর সঙ্গে যাচাই করার সঙ্গতি রক্ষা করবে না। এ দৃষ্টিভঙ্গি থেকে জেমস বিভিন্ন ধর্মীয় অভিজ্ঞতা (The varieties religious experiance) বইতে দেখাতে চেয়েছেন, অনেক সময় ধর্মবিশ্বাস পরীক্ষার পরে টিকে থাকে, সুতরাং তাকে সত্য বলে গ্রহণ করা উচিত। তিনি শুধু এ অর্থে বলেছেন যে বিজ্ঞানের সবচেয়ে বিশ্বাসযোগ্য থিয়োরিকে বাস্তবে প্রয়োগ করা যায় যখন তখনই আমরা তা সত্য বলে গ্রহণ করি এবং সে সম্পর্কে বই-ই হলো আমাদের জানাশোনার মাধ্যম।

বিজ্ঞান এবং ধর্মের সাধারণ অনুমানের মধ্যে প্রয়োগ করা যায় বলেই এই মতবাদ সম্পর্কে বলার মতো অনেক কিছু রয়েছে। কর্মক্ষম বলতে কি বুঝায় সে সম্পর্কে একটি সাবধানী সংজ্ঞা নিরূপণ এবং যে যে ক্ষেত্রে আমরা সত্য সম্পর্কে ওয়াকেবহাল নই, তা পূর্বাহ্নে নির্ধারণ করতে পারলে ধর্মীয় মতবাদের সঙ্গে ঝগড়া বাধাবার কোন প্রয়োজন পড়ে না। যেখানে আসল সত্য উদঘাটন করা দূরূহ নয় সে সম্পর্কে চলুন আমরা মামুলি দৃষ্টান্তের অবতারণা করি। যেমন ধরুন আপনি এক ঝলক বিজুলী শিখা দেখতে পাওয়ার পর বজ্রপাতের শব্দ আশা করবেন অথবা বজ্রপাত অতি দূরে হওয়ার শব্দ আপনার কর্ণগোচর হলো না অথবা আপনি সে ব্যাপারে মোটেই চিন্তা করলেন না। সাধারণতঃ এই শেষেরটা অত্যন্ত ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য ব্যাপার, ধরুন আপনি উপরের দুটোর যে কোন একটিকেই গ্রহণ করলেন। যখন আপনি বজ্রপাতের শব্দ শুনলেন, আপনার বিশ্বাস তখন সত্য প্রমাণিত হলো না। তা বিচার করবেন একটি বাস্তব ঘটনা-বজ্রপাতের শব্দ শোনার প্রতিক্রিয়া অনুসারে, কিন্তু উদ্ভুত সুবিধা অসুবিধা হিসেবে নয়। প্রয়োগবাদীদের কারবার প্রধানতঃ সে সকল বিশ্বাস নিয়ে যা আমাদের অভিজ্ঞতার মধ্যে যে সকল ঘটনা ঘটে তার সাহায্যে যাচাই করা যায় না। আমাদের দৈনন্দিন বিশ্বাসের অনেকগুলো জাগতিক অভিজ্ঞতার মধ্যে সীমিত, যেমন অমুক অমুকের ঠিকানা হলো এই এই ইত্যাদি। আমাদের অভিজ্ঞতার সাহায্যে তা যাচাই করা যায় এবং এ সকল ক্ষেত্রে প্রয়োগবাদীদের বিচারপদ্ধতি অপ্রয়োজনীয়। অনেক ক্ষেত্রে বজ্রপাতের উপরোক্ত দৃষ্টান্তের এত তা মোটেই প্রয়োগশীল নয়, যেহেতু সত্যবিশ্বাস মিথ্যাবিশ্বাসের চাইতে কোন বাস্তব সুযোগ দান করে না এবং তা কোনকিছু সম্পর্কে যেমন চিন্তা করা হয়, তেমনি সুবিধাজনকও নয়। দৈনন্দিন জীবনের থেকে উদাহরণ না নিয়ে আড়ম্বরপূর্ণ উদাহরণ গ্রহণ করেন, এটা দার্শনিকদের একটি সাধারণ দোষ।

প্রয়োগবাদ চূড়ান্ত দার্শনিক সত্যের উদঘাটন করতে না পারলেও এর কতেক প্রয়োজনীয় গুণাবলী রয়েছে। প্রয়োগবাদই প্রথম উপলব্ধি করতে পেরেছে, যে সত্য আমরা আয়ত্ব করতে পারি তা প্রত্যেক মানবিক ধারণার মতো প্রমাদসাপেক্ষ এবং পরিবর্তনশীল। মানুষের জীবনের ঘটনাচক্রের বাইরে যা আছ তা সত্য নয়, সত্য হলো বিশ্বাসসমূহের গুণগত নির্যাস এবং বিশ্বাস হলো আত্নিক ঘটনাপুঞ্জ। অধিকন্তু ওদের সঙ্গে ঘটনার সম্বন্ধ ন্যায়শাস্ত্র যেভাবে কল্পনা করে তেমন সরল সহজ নয় এবং তা নির্দেশ করে দেয়া ন্যায়শাস্ত্রের প্রয়োগবাদের দ্বিতীয় গুণ। বিশ্বাসসমূহ অনেক সময় স্পষ্টতঃ জটিল, একটি বিশেষ ঘটনার দিকে সোজাসুজি না তাকিয়ে অনেকগুলো ঘটনার ধূসর জগতে নিয়ে যায় টেনে। সুতরাং বিশ্বাসসমূহ ন্যায়শাস্ত্রের পরিকল্পিত প্রস্তাবের মতো তীক্ষ্ণভাবে সত্য এবং মিথ্যার বিরোধিতা করে না সেগুলো হলো সত্য এবং মিথ্যার সুস্পষ্ট ছাপ বিশেষ। ওগুলো ধূসর কালো এবং বহুবর্ণের হতে পারে কিন্তু সাদা নয় কখনো। যে সকল মানুষ সত্যের সম্পর্কে শ্রদ্ধাসহকারে কথা বলে, ঘটনা সম্পর্কে তা মনে করলে তারা অধিকতর ভালো করত এবং জানতে পেতো মানুষের যে শ্রদ্ধেয় গুণগুলোর প্রতি তারা সম্মান পোষণ করে, মানুষের বিশ্বাসের মধ্যে তা পাওয়া যায় না। এর বাস্তব এবং থিয়োরিগত সুবিধা রয়েছে, যেহেতু মানুষ সত্য জানতে পেরেছে এ অজুহাতে পরস্পর পরস্পরের উপর অত্যাচার করে। মনঃসমীক্ষার দৃষ্টিকোণ থেকে বলতে গেলে তা এভাবে বলা যায় যে সকল মানুষ উচ্চতর আদর্শের কথা বলে তা শত্রুদের নির্যাতন করার একটা অজুহাতমাত্র। ভালো জিনিসের যেমন প্রচার লাগে না, তেমনি ভালো নৈতিকতার জন্য কোন বাজি রাখার প্রয়োজন পড়ে না।

সে যাহোক, বাস্তবে প্রয়োগবাদের একটি অত্যন্ত ক্ষতিকর দিক রয়েছে। এ মতবাদ অনুসারে বিশ্বাসের আকারে যা পুরস্কৃত করে, তাই সত্য। এখন কথা হলো ফৌজদারি আইনের প্রয়োগ করেও একটি বিশ্বাসের দাম হাসিল করা যায়। সপ্তদশ শতাব্দীতে ক্যাথলিক মতবাদ ক্যাথলিক দেশে এবং প্রোটেস্টান্ট মতবাদ প্রোটেস্টান্ট দেশে দাম পেয়েছে। উৎসাহী মানুষ রাষ্ট্রের সরকারযন্ত্র করায়ত্ব করে নিজস্ব মতামত ছাড়া অন্যন্য মতবাদকে নির্যাতন করে সত্যের উৎপাদন করতে পারে। বাড়াবাড়ির ফলে এ পরিণতি ঘটে এবং প্রয়োগবাদ সম্পূর্ণবাবে এ আওতায় পড়েছে।

প্রয়োগবাদীরা যা স্পষ্টভাবে নির্দেশ করে, সত্য পরিমাণ মতো এবং মানবিক ঘটনাবলীর সম্পদ বিশেষ তা মেনে নেয়ার পরও সম্পূর্ণভাবে মানবিক পরিস্থিতি থেকে উদ্ভূত বিশ্বাসে যে পরিমাণ সত্য থাকে অন্যান্য রকমের বিশ্বাসে সে পরিমাণ সত্যের নির্যাস থাকে না। আমাদের বিশ্বাস সমূহে সত্যের পরিমাণ বাড়াতে হলে আমাদেরকে একটা আদর্শের কল্পনা করতে হয় এবং যদি বাস্তব ঘটনার সাহায্যেই আদর্শের প্রতিষ্ঠা করা হয় তবে এ ব্যাপারে আমাদের নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতার পরিধি খুবই সঙ্কীর্ণ; কোন গ্রহপূষ্ঠের অথবা গ্রহের নিকটস্থ কোন ঘটনার খুঁটিনাটির মধ্যেই সীমাবদ্ধ। বিজ্ঞাপনদাতাদের কৌশল থেকেই প্রয়োগবাদের উৎপত্তি, যারা বারবার তাদের একবাক্স পিনের দাম এক গিনি প্রচার করার ফলে মানুষ ছয় পেন্স প্রদান করতে রাজি হয়। কম আত্নবিশ্বাস নিয়ে প্রচার করলেও তাদের কথা প্রায়ই সত্যের আকার ধারণ করে। এ রকম মানুষের সৃষ্ট সত্যগুলো কৌতূহলোদ্দীপক যদিও সেগুলোর পরিধি খুবই সংকীর্ণ। এ সত্যের পরিধি বিস্তৃত করবার বাড়াবাড়িতেই মানুষ প্রোপাগাণ্ডার তাণ্ডবলীলায় মেতে ওঠে, যুদ্ধ ও মহামারী এবং দুর্ভিক্ষের রূঢ়তম আঘাতে তার সমাপ্তি ঘটে। ইউরোপের সাম্প্রতিক ইতিহাস এরকমভাবে প্রয়োগবাদের অসারতারও নিরপেক্ষ দৃষ্টান্ত।

প্রয়োগবাদীরা বেগর্সকে কেননা মিত্র বলে অভিনন্দিত করেছিলেন তা আশ্চর্য ব্যাপার, যেহেতু তার দর্শন তাদের দর্শনের সম্পূর্ণ বিপরীত ছিল প্রয়োগবাদীরা প্রয়োজনীয়তাকে সত্যের আসল সংজ্ঞা বলে শিক্ষা দিয়ে থাকেন। পক্ষান্তরে বেগর্স শিক্ষা দিয়েছেন, আমাদের মেধা বাস্তব প্রয়োজনের উপযোগী হিসেবে গড়ে ওঠে এবং পৃথিবীর যাবতীয় বস্তুর প্রতি দৃষ্টিপাত করে না, অগ্রাহ্য করে এবং প্রকৃতপ্রস্তাবে সত্যের ধারণা পোষণ করার প্রধান প্রতিবন্ধক। তিনি মনে করতেন, আমাদের এরকমের সজ্ঞা বা (Intuition) নামে একজাতীয় ইন্দ্রিয়বৃত্তি আছে; কষ্ট করলে পরে আমরা তা ব্যবহার করে যদিও আপাতঃদৃষ্টিতে ভবিষ্যৎ সম্পর্কে নয় থিয়োরিগতভাবে অতীত বর্তমানের প্রত্যেক জিনিস সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করতে পারব। অনেক বেশি জ্ঞান নিয়ে অসুবিধায় পড়তে হয় বলে আমার মগজের উৎকর্ষ সাধন করেছি, ভুলে যাওয়াই হলো যার কাজ। কিন্তু মগজের কারণেই আমরা সবকিছু মনে করতে পারি এবং মগজ চালুনির মতো ঠেলে দেয় বলে আমরা শুধু প্রয়োজনীয় সবকিছু ও ভ্রান্তিসমূহকে মনে করতে পারি। বের্গসের মতে প্রয়োজনীয়তা হলো ভুলের উৎসবিশেষ। পরম্ভ মরমীর ধ্যান থেকে যে সত্যে পৌঁছনো যায় তাতে বাস্তব সুবিধার সকল চিন্তা অনুপস্থিত থাকে। তা সত্বেও বেগর্স প্রয়োগবাদীদের এত যুক্তির চেয়ে কর্মকেই বেশি প্রাধান্য দিয়েছেন, হ্যামলেটের চেয়েও যে লোককে তিনি ভালো মনে করতেন এবং বুদ্ধিবৃত্তিক কারণে রাজাকে বাঁচাতে দেয়ার চাইতে, স্বতস্ফূর্ত স্বজ্ঞায় অনুপ্রাণিত হয়ে ভেসডিমোনাকে হত্যা করা অধিকতর শ্রেয় মনে করেনে। একারণেই প্রয়োগবাদীরা তাকে মিত্র বলে মনে করেছিলেন।

বের্গসঁর ডনিস ইমিডিয়েট দ্যালা ক’সাস ১৮৮৯ সালে, মেটেরিয়েল এট মেমোয়ার ১৮৯৬ সালে প্রকাশিত হয়। ১৯০৭ সালে (L Evalution Creatrice) ল্যা ইভসন ক্রিটিজ প্রকাশিত হবার সঙ্গে সঙ্গে তিনি বিখ্যাত হয়ে পড়েন। তার এই বইটি অন্যান্য বইয়ের চেয়ে উৎকৃষ্ট ছিল না, কিন্তু তাতে উপাদানের তুলনায় ছন্দ হিল্লোল বেশি ছিল বলে অতি সহজে মানুষকে অভিভূত করেছিল। বইটির শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত কোন যুক্তি ছিল না। সুতরাং কুযুক্তিও ছিল না। বইটিতে কল্পনাকে উজ্জীবিত করার এত ভাবাবেগপূর্ণ কবিত্বের একটি মনোরম বর্ণাঢ্য ছবি ছিল। যে দর্শনের পক্ষে ওকালতি করেছেন, তা সত্য কি মিথ্যা সে সম্পর্কে একটি বর্ণও উচ্চারণ করেন নি; কিন্তু প্রশ্ন বের্গসঁ অন্যের ওপর ছেড়ে দিয়েছেন, তা কোনমতেই অপ্রয়োজনীয় নয়। তার আপন থিয়োরি মতে তিনি এক্ষেত্রে যথার্থ, কেননা সত্যকে স্বতঃস্ফূর্ত আবেগ দিয়েই জানা যায়, বুদ্ধিবৃত্তি দিয়ে নয়; সুতরাং যুক্তি-প্রমাণের কেনো প্রয়োজন পড়ে না।

বের্গসঁর দর্শনের বেশিরভাগই ঐতিহ্যিক দর্শনকে একটু উন্নত ধরনের ভাষায় ব্যক্ত করা হয়েছে। পরস্পরব্যাপ্ত মতবাদ অনুসারে (The doctrine of interpenetration) বিভিন্ন বস্তু পরস্পর প্রকৃত সম্পর্কশূন্য নয় বিশ্লেষাত্মক বুদ্ধিবৃত্তি অনুসারে সে গুলোকে খণ্ডিত হিসেবে চিন্তা করা হয়, পারমেনাইডস (Pamenides) থেকে ব্রাডলে (Bradley) পর্যন্ত প্রাচী প্রতিটির সকলের তাই ধারণা। বের্গ দু’উপায়ে এ মতবাদকে মহিমামণ্ডিত করেছেন। প্রথমতঃ তিনি বস্তুর সজ্ঞা বা স্বতস্ফূর্ত আবেগের সঙ্গে প্রবৃত্তির সংযোগ সাধন করেছেন। বোলতা ডিম পাড়ার পূর্বে শুক কীটকে হত্যা না করে হুল ফুটিয়ে অবশ করে ফেলে এবং তাই হলো বোলতার ইনট্যুইশন বা স্বতঃস্ফূর্ত আবেগ। (যেহেতু ড. পেকহাম এবং মিসেস পেকহাম দেখিয়েছেন যে বেচারা বোলতা বিজ্ঞানের মানুষের চাইতে তার বুদ্ধিবৃত্তিকে ভুল পথে পরিচালনা করছে না, সুতরাং দৃষ্টান্তটি ধোপে টিকে না। এজন্য তার মতবাদে আধুনিক বিজ্ঞানের প্রভাব পড়েছে এবং তাকে উদ্ভিদসম্বন্ধীয় উদাহরণ দিতে অনুপ্রাণিত করেছে, তার মতবাদ জীববিজ্ঞানসম্বন্ধীয় সর্বাধুনিক গবেষণার উপর প্রতিষ্ঠিত বলে তিনি অসতর্কভাবে চিন্তা করেছেন। দ্বিতীয়তঃ বুদ্ধিবৃত্তিক বিশ্লেষণে যেমন দেখা যায় তেমনি তিনি বস্তুর আলাদা আলাদা অস্তিত্বকে পাত্র বা বিস্তৃতি এবং কাল বা স্থায়ীত্বের ব্যাপ্ততাকে সজ্ঞা বা ইনটুইশান আখ্যায় আখ্যায়িত করেছেন। তা তাকে কাল ও পাত্র সম্পর্কে অনেক অভিনব তথ্য পেশ করতে অনুপ্রাণিত করেছে। এ শব্দগুলোর মামুলি অর্থ চিন্তা করলে সেগুলোকে খুবই যুক্তিযুক্ত এবং মৌলিক বলে মনে হয়। পাত্র অথবা বিস্তৃতির মধ্যে স্থিত যা তাকেই পদার্থ বলা যায়। আমরা সজ্ঞা বা ইনটুইশানের দৃষ্টিকোণ থেকে দৃষ্টিপাত করলে দেখতে পাব, তা হলো বুদ্ধিবৃত্তির সৃষ্ট একটি উপকথা মাত্র।

নির্বচিত শব্দগুলোকে বাদ দিলে বের্গসঁ তার দর্শনের এ অংশ প্লাটিনাসের (Plotinus) সঙ্গে নতুন কিছু সংযোজন করেন নি। নির্বাচিত শব্দসম্ভার আবিষ্কার করা নিঃসন্দেহে ক্ষমতার পরিচায়ক, কিন্তু দার্শনিকের চাইতে কোম্পানির পদোন্নতিতে ইচ্ছুক ব্যক্তিরাই সেজন্যে অধিক লালায়িত। যা তাকে ব্যাপকভাবে জনপ্রিয় করেছিল, তা তার দর্শনের কোনও অংশবিশেষ নয়। তিনি তার মতবাদকে প্রাণবন্ত এবং অবশ্যম্ভাবী বলে মনে করতেন। তার শ্রেষ্ঠতম এবং উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট হলো, তিনি মরমীবাদের সঙ্গে সময়ের প্রগতির বিশ্বাসের সংশ্লেষ ঘটিয়েছেন। এতে তিনি কি পরিমাণ সাফল্যলাভ করেছেন তা আমাদের দেখা উচিত। প্রাত্যহিক মরমীবাদ ধ্যানশীলতার উপর নির্ভরশীল, যা সময়ের অনিত্যতা সম্পর্কে দৃঢ় বিশ্বাস পোষণ করে, তা নিঃসন্দেহে অলস মানুষের দর্শন বলে আখ্যা পেতে পারে। আত্মার গহণ রাত হলো মরমীবাদের উজ্জ্বল গৌরচন্দ্রিকা, যা কোন মানুষের মধ্যে তখনই উদয় হয় যখন একজন মানুষ নৈরাশ্যজনকভাবে কর্মবিমুখ হয়ে পড়ে অথবা আকস্মিকভাবে বাস্তবকর্মের প্রতি আকর্ষণ হারিয়ে বসে। কর্মচাঞ্চল্য দ্বারা চালিত হলে কোন ধ্যানের দরকার পড়ে না। আমাদের সাধারণ নিয়ম হলো, সম্ভব হলে আমরা সে সকল বিশ্বাসকে আঁকড়ে থাকি যা আমাদের আত্মসম্মানকে অক্ষণ রাখে। মনঃসমীক্ষা সাহিত্য এ ধরনের উদ্ভট দৃষ্টান্তে ভরপুর। যে ব্যক্তি ধ্যানে আত্মনিয়োগ করেছে আপাততঃ তাদের চোখে ধ্যানই জীবনের সত্যিকার পরিণতি এবং যারা জাগতিক ক্রিয়াকর্মে লিপ্ত থাকে তাদের দৃষ্টিকোণ সত্যিকার জগতের ছবি উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে না। এই ভিত্তিতে ঐতিহ্যিক মরমীবাদের বাকি মতবাদসমূহ সম্বন্ধে স্থির সিদ্ধান্তে আসা যায়। শ্রেষ্ঠ মরমীদের মধ্যে বোধহয় লাওসে প্রথম, যিনি কাস্টম হাউজে তার মালপত্র পরীক্ষার জন্য অপেক্ষা করার সময় বই লিখে ফেলেছিলেন। যেমনটি প্রত্যাশিত ছিল তার বইয়ের সর্বত্র-কর্ম যে কিছু নয়, সে মতবাদে ভরপুর।

কিন্তু বের্গসঁ মরমীবাদকে কর্ম এবং জীবন বিশ্বাসীদের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে চেষ্টা করেছিলেন, যারা বাস্তবতার প্রগতিতে বিশ্বাসী কোন ক্রমেই ধরাপৃষ্ঠে তাদের অস্তিত্ব সম্পর্কে নিস্পৃহ ধারণা পোষণ করতে পারে না। মরমীরা হচ্ছে প্রবৃত্তিগতভাবে নিষ্ক্রিয়তার মধ্যে ডুবে যাওয়া সক্রিয় মানুষ আর প্রাণবাদীরা হচ্ছে কর্মের প্রতি রোমান্টিক প্রশংসা পোষণকারী নিষ্ক্রিয় মানুষ। ১৯১৪ সনের আগে পৃথিবী এরকম মানুষে পরিপূর্ণ ছিল। তাদের প্রবৃত্তির ভিত্তিস্থল ছিল বিতর্কিত এবং সংশয়বাদ ভালোবাসার উত্তেজনা এবং অযৌক্তিক একটি ধর্মের আকাঙ্ক্ষা পোষণ করত, তারা মনে করত তাদের কর্তব্য হলো মানুষকে মানুষ হত্যা করার জন্য অনুপ্রাণিত করা এবং তাদের এ লালিত বিশ্বাসের ক্ষেত্রভূমিতেই সে ধর্মের সন্ধান পেয়েছিল। ১৯০৭ সালে তাদের কোন নির্গমণ পথ ছিল না, কিন্তু বের্গ একটি উত্তম বিকল্পের ব্যবস্থা করেছিলেন।

বের্গসঁর মতবাদ মাঝে মাঝে এমন ভাষায় ব্যক্ত করা হয়েছে যা ভুলপথে নিয়ে। যেতে পারে, তার কারণ হলো, যে সকল জিনিসকে তিনি কাল্পনিক মনে করেছেন তা অনেক সময় বাস্তবের মতো মনে হবে। তার মতামতের ভুল বোঝাবুঝির সম্ভাবনা এড়িয়ে যেতে পারলে সময় সম্পর্কে তার মতামত নিম্নরূপঃ ধারাবাহিকভাবে কতকগুলো মুহূর্ত অথবা ঘটনার সমাহার নয়, সময় নিরবচ্ছিন্নভাবে প্রসারমান, যার মধ্যে ভবিষ্যৎকে পূর্বাহ্নে দেখা যায় না; কেননা তা সম্পূর্ণভাবে নতুন এবং অকল্পনীয়। যা কিছু সত্যিকারভাবে ঘটে থাকে তার সমস্ত কিছু গাছের কাণ্ডের প্রত্যেকটি বলয়চিহ্নের মতো রক্ষিত থাকে। (এটা তার বাড়িয়ে বলা নয়। সুতরাং পৃথিবী চিরাচরিত ভাবে পূর্ণতা এবং সমৃদ্ধির পানে এগিয়ে যাচ্ছে। সমাজের অবাস্তব স্মৃতির তুলনায় যা কিছু বাস্তব জীবনে ঘটে থাকে প্রকৃত সজ্ঞা বা ইনটুইশনের দর্পণে বর্তমান তাকে। অপরিবর্তনশীলতা হলো ব্যাপ্তি এবং নতুন কিছু করার উত্তেজনাকে বলা হয় প্রাণশক্তি-সজ্ঞা যা ইনটুইশনের সত্যিকারের স্মৃতির অন্বেষণ করা আত্মশৃঙ্খলার ব্যাপার; তা কিভাবে করা হবে, তা তিনি আমাদেরকে বলে দেননি। যোগীরা যে পদ্ধতিতে তা করে থাকেন, তিনি ওরকম কোন পদ্ধতির কথা বলে থাকবেন, এরকম সন্দেহ করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে।

যদি কেউ ন্যায়শাস্ত্রের মতো সামাজিক বিষয়ে বের্গসঁর দর্শনকে প্রয়োগ করার দুঃসাহস করে তাহলে পরিবর্তিত দর্শনের মধ্যে কতিপয় অসুবিধা দেখা যাবে। সময়কে ধারাবাহিক অনুক্রম এবং বিভিন্ন অংশকে বাহ্যিক বলে বিবেচনা করার জন্যে বের্গসঁ অঙ্কবিদদের অক্লান্তভাবে তিরষ্কার করেছেন। আদতে যদি পৃথিবীতে সত্যিকার মহত্ত্ব বলতে যেমন তিনি বলেছেন তেমন কিছু থাকে (যে দিকটি ছাড়া তার দর্শন আকর্ষণীয় গুণপনা থেকে বঞ্চিত হয়ে পড়বে। পৃথিবীতে যা আসে স্থায়ী হয়। (যা তার ব্যপ্তিবাদ দর্শনের সরল তাৎপর্য) তাহলে অতীতের যে কোন অস্তিত্বের যোগফল পরবর্তীকালের যে কোন যোগফলের সমান হবে। সম্পূর্ণ এবং অংশবিশেষের সম্বন্ধ অনুপাতে বিভিন্ন যুগে পৃথিবীর সমূহ অবস্থার মধ্যে এ গুণের অনুক্রম প্রকাশিত এবং এই অনুক্রমের মধ্যে অংকবিদেরা আকাক্ষিত গুণসমূহ খুঁজে পান। কিন্তু বের্গসঁ সেগুলোকে নির্বাসনে পাঠাতে চান। পৃথিবীর পরবর্তী অবস্থার যে সকল উপাদান সংযোজিত হয়েছে, তা যদি প্রাচীন উপাদানের বাহ্যিক সংযোজন না হয়, তাহলে বলতে হয় সত্যিকারের কোন মহত্ব নেই, সৃষ্টিশীল বিবর্তন কিছুই সৃষ্টি করে নি এবং আমরা আবার প্লাটিনাসের পদ্ধতিতে ফিরে এসেছি। অবশ্য এ দ্বিমূখী সমস্যার বের্গসঁ উত্তর দিয়েছেন যে জন্মের ফলে সবকিছুতে পরিবর্তন আসে কিন্তু তারপরেও তা একই রকম থেকে যায়। সে যা হোক, তার এ ধারণা বড় রহস্যময়; তা ভেদ করা বিধিনিন্দুক মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়। মূলত বের্গর্সর আবেদন মরমি ধর্মে, যুক্তিতে নয়, কিন্তু যেখানে তার ধর্ম যুক্তির দিগন্তের বাইরে সেখানে আমরা তাকে অনুসরণ করতে পারিনে।

ইতিমধ্যে বিভিন্ন দিক দিয়ে একটি দর্শন গড়ে উঠেছে, যাকে অনেক সময় বস্তুবাদ বলে অবিহিত করা হয়েছে, কিন্তু আদতে তা বহুত্ববাদ পদ্ধতি বিশ্লেষণের মাধ্যমে আলাদা দর্শন হিসেবে বিশেষিত করা হয়েছে। কোনক্রমেই তা বস্তুবাদী দর্শন নয়, বরঞ্চ কোন কোন অংশে বার্কলের আদর্শবাদের সঙ্গে তার মিল বর্তমান। যে যুক্তিতর্কের উপর কান্ট এবং হেগেলের দর্শন প্রতিষ্ঠিত, সেগুলোকে অস্বীকার করে গেলে কান্টিয় এবং হেগেলিয় মতবাদের সঙ্গেও তার কোন মিল নেই। পৃথিবীর মৌলিক উপাদান মানসিক এবং বস্তুগত দু’টোর কোনটাই নয়, বরঞ্চ এমন কিছু, যা অধিকতর মৌলিক এবং সরল, যার থেকে মন এবং পদার্থ দুটোই গঠিত হয়েছে, জেমসের এ মতবাদ গ্রহণ এবং এর বিকাশের দিকে উত্তরোত্তর অধিকভাবে সে দর্শন ঝুঁকে পড়েছে।

১৮৯০ সালে খুব প্রাচীনেরা ছাড়া জার্মান আদর্শবাদের বিরুদ্ধে যারা দাঁড়িয়েছিলেন, তার মধ্যে জেমস ছিলেন বলতে গেলে একমাত্র খ্যাতিমান পুরুষ। ডিউয়ি এবং শিলার তখনো গভীরভাবে অনুভব করেন নি, এমনকি জেমসকেও একজন মনস্তত্ববিদ বলে ধরা হতো। দর্শনের ক্ষেত্রে তার আবেদনের কথা কেউ গুরুত্ব সহকারে চিন্তাও করেননি। ১৯৭০ সালে প্রয়োগবাদের দৃষ্টিকোণ থেকে নয়, বরঞ্চ কড়াকড়িভাবে বাস্তবদৃষ্টিভঙ্গি থেকে জার্মান আদর্শবাদের বিরুদ্ধে একটি বিদ্রোহ সংগঠিত হয়। জার্মানিতে, Frege-এর রচনাবলী (যা শুরু হয় ১৮৭৯ সালে, কিন্তু সাম্প্রতিক কালে ছাড়া পঠিত হয় নি, Husser এর উল্লেখযোগ্য রচনা Logische Unter Such ungen ১৯০০ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত হওয়ার পর ব্যাপকভাবে প্রভাব বিস্তার করে। Meinong এর Ueber Annahmen ১৯০২ সালে Gogen Stands theoric এবং Psychologic ১৯০২ সালে প্রকাশিত হয় এবং একই দিকে বিশেষ প্রভাবশালী ছিল। ইংল্যাণ্ডে G. E Moore এবং আমি এ মতবাদের সমর্থনে ওকালতি করতে শুরু করি। তার প্রবন্ধ The nature of judgement ১৮৯৯ সালে Principia Ethica ১৯০৩ সালে ও আমার Principles of Mathematics ১৯০৩ সালে ফরাসিদেশে Conturat একই ধরনের দর্শন প্রবলভাবে প্রধান্য বিস্তার করে। আমেরিকাতে উইলিয়াম জেমসের Redical Empricism (তার প্রয়োগবাদকে বাদ দিয়ে) নতুন ন্যায়শাস্ত্রের সঙ্গে সংমিশ্রণে কিছু পরবর্তী সময়ে সম্পূর্ন ভিন্ন একটি নতুন দর্শনের জন্ম দেয়। উপরে যে সব ইউরোপিয় দর্শনগ্রন্থের কথা বলা হলো ওগুলোর তুলনায় আরো বেশি বিদ্রোহ ছিল এ নব-বস্তুবাদ। যদিও Mach এর Analyseder Emfindungen-এর অংশবিশেষের শিক্ষাকে জোরদার করেছিল।

যে নতুন দর্শনের সূচনা হলো এখনো কোন চূড়ান্ত রূপ পরিগ্রহ করে নি এবং কোন অংশে এখনো অপরিপক্ক রয়ে গেছে। তাছাড়াও বিভিন্ন সমর্থকের মতামতের মধ্যে প্রচণ্ড পার্থক্য রয়ে গেছে। তার আবার কোন অংশে দুর্বোধ্য। এ সকল কারণে কতকগুলো প্রয়োজনীয় বৈশিষ্ট্যকে তুলে ধরা ছাড়া এ সম্পর্কে আর কিছু বলা একরূপ অসম্ভব।

নতুন দর্শনের প্রথম বৈশিষ্ট্য হলো কোন কোন বিশেষ দার্শনিক পদ্ধতি এবং দর্শনকে বিশেষ কোন মার্কামারা জ্ঞান অর্জনের উপায় বলে স্বীকার করে না। নতুন মতবাদ বিশেষ বিজ্ঞানে সমস্যার সাধারণীকরণের পার্থক্য এবং অভিজ্ঞতালব্ধ প্রমাণ যেখানেই নেই, সেখানে অনুমান করা ছাড়া আর সকল ব্যাপারেও দর্শনকে বিজ্ঞানের সঙ্গে এক করে দেখে। এ দর্শন মতে সব রকমের জ্ঞান বিজ্ঞানভিত্তিক, বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে অর্জন এবং প্রমাণ করতে হয়। পূর্ববর্তী দর্শনের বেলায় যেমন ব্রহ্মাণ্ডকে দেখা এবং ধারণাতে প্রতিভাস রচনার পদ্ধতি প্রচলিত ছিল, নতুন দর্শনের তা অচল হয়ে দাঁড়াল। নিজস্ব ন্যায়শাস্ত্রের মতে পৃথিবীর যে আপাতঃ বিখণ্ডিত এবং বিশৃঙ্খল প্রকৃতি বর্তমান তা অস্বীকার করার কোনও কারন নেই। ধ্বংসপ্রাপ্ত দৈত্যের বিশেষ হাড় থেকে যেমন কঙ্কাল সম্পর্কে ধারণা করা যায়, তেমনি পৃথিবীকে কোন বিশেষ অনুষঙ্গ থেকে ভালোভাবে জানার এত আঙ্গিক বিশিষ্ট্য কোন কিছু মনে করে না। জার্মান আদর্শবাদের যেমন লব্ধজ্ঞানের প্রকৃতি থেকে বিশ্বের প্রকৃতি সম্বন্ধে একক ধারণা পোষণ করা হতো, এ দর্শনে তেমন কোন বিশেষ প্রচেষ্টায় মনে করে, তার কোন মরমি তাৎপর্য এবং মহাজাগতিক গুরুত্ব নেই।

জ্ঞানতত্ব, ন্যায়শাস্ত্র এবং অঙ্কের নিয়মনীতি হলো নতুন দর্শনের তিনটি প্রধান মৌলিক উৎস। কান্টের সময় থেকে জ্ঞানকে অভ্যন্তরীণ ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার পারস্পরিক ধারণা বলে মনে করা হতো। সে অনুসারে জ্ঞাত বস্তুকে আমাদের সে বিষয়ে জ্ঞান দ্বারা শোধিত করে নেয়া হয়, যা সকল অবস্থাতেই আমাদের জ্ঞানের কারণে নতুন বৈশিষ্ট্যে মণ্ডিত হয়ে দেখা দেয়। জানা না হলে কোন বস্তুর অবস্থিতি ন্যায়শাস্ত্রানুসারে অসম্ভব, তাও বিশ্বাস করা হতো। (যদিও কান্ট তা করেন নি। সুতরাং যথাযথ জানার পরে যে গুণগুলো আবিষ্কার করা গেলো, প্রত্যেক ব্যাপারে সেগুলোর উপস্থিতি অবশ্যম্ভাবী। পক্ষান্তরে নতুন দর্শন জানা বস্তু এবং কোন মনের অগোচর কোনো বস্তুর অবস্থিতির কি সামান্য কারণ থাকতে পারে, সে সম্বন্ধে কোন পার্থক্য করে না। ফলতঃ জ্ঞানতত্ব বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের রহস্য দ্বারা উদঘাটন করার যাদুকরি চাবিকাঠি থেকে যায় এবং আমাদেরকে বিজ্ঞানের শ্রমসাপেক্ষ অনুসন্ধানের জগতে নিক্ষেপ করা হয়েছে।

একইভাবে ন্যায়শাস্ত্রে আঙ্গিক মতবাদের স্থলে পরমাণুবাদকে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। কোন বিষয়ের সঙ্গে কোন বিষয়ের সম্বন্ধের ফলে তার অভ্যন্তরীণ প্রকৃতিতে পরিবর্তন আসে, সে কারণে ভাবা হতো কোন বিষয়ে পুঙ্খানুপুঙ্খ জ্ঞান থাকলে সমগ্র বিশ্ব সম্পর্কে পুঙ্খানুপুঙ্খ জ্ঞান অর্জন করা যায়। নতুন দর্শন অনুসারে কোন বস্তু সম্পর্কে প্রাজ্ঞ ধারণা ন্যায়শাস্ত্রমতে সে বস্তুর সঙ্গে অন্য বস্তুর সম্বন্ধ নিরূপন করতে আমাদের অনুপ্রাণিত করে না। একটি দৃষ্টান্ত দিলে বিষয়টি পরিষ্কারভাবে বোঝা যাবে। লাইবনিজ Leibnitz মনে করতেন (এ ব্যাপারে তিনি আধুনিক আদর্শবাদীদের সঙ্গে একমত) কোনো লোক ইউরোপে থাকলে এবং ভারতে তার স্ত্রীর মৃত্যু হলে স্ত্রীর মৃত্যুর মুহূর্তে তার মধ্যে অভ্যন্তরীণ প্রতিক্রিয়ার সঞ্চার হবে। সাধারণ জ্ঞান বলে যে মৃত্যুর সংবাদ না শোনা পর্যন্ত তার মধ্যে কোন গভীরতর পরিবর্তন অসম্ভব। নতুন দর্শনে এই মতবাদকে গ্রহণ করা হয়েছে এবং এর ফলাফল প্রথমে যা মনে হয়েছিল তার চেয়ে অনেক সুদূরপ্রসারী।

অঙ্কের মৌলনীতির সঙ্গে সবসময়ে দর্শনের একটা গুরুত্বপূর্ণ সম্বন্ধ রয়েছে। অঙ্ক দৃশ্যতঃ অধিক পরিমাণে পূর্ববর্তী নিশ্চিত জ্ঞান পরিবেশন করে এবং অধিকসংখ্যক দর্শনে পূর্ববর্তী জ্ঞানের প্রাধান্য বর্তমান। জেনোর (Zeno) সময় থেকে একটি আদর্শবাদী সম্প্রদায়ের দার্শনিকেরা, অঙ্ক সত্যিকার দার্শনিক উপনিত হতে সমর্থ এবং দার্শনিকেরা অধিকতর সুস্থ জ্ঞান পরিবেশন করতে পেরেছে বলে মনে করত। এর মধ্যে কান্টের দর্শন অনেক পরিমাণে এবং হেগেলের দর্শন আরো বেশি পরিমাণে প্রতিফলিত হয়েছে। উনবিংশ শতাব্দীতে অঙ্কবিদেরা কান্টের দর্শনের এ অংশকে সম্পূর্ণভাবে নাকচ করে ফেলেন। লোবাত চেভস্কি (Lavat Chvoski) নন ইউক্লিডিয়া জ্যামিতির আবিষ্কার করে কান্টের অঙ্কভিত্তিক যুক্তির লোকোত্তর সৌন্দর্যতত্ত্বের প্রাধান্য খর্ব করে ফেলেন। ওয়েবার স্ট্রস (Wabre strass) প্রমাণ করলেন অতি ক্ষুদ্রতম রাশির মধ্যে নিরবচ্ছিন্ন প্রসারমানতা অনুপস্থিত। জর্জ কেন্টোর একটি প্রসারমানতা এবং একটি অসীমতার থিয়োরি আবিষ্কার করে প্রাচীন আপাতঃবিরোধী সত্য, যেগুলোর উপর দার্শনিকেরা পরস্পর বিতর্কে প্রবৃত্ত হয়েছিলেন, তা সমাধান করে ফেলেন! ফ্রেজ (frege) দেখালেন যে পাটিগণিত ন্যায়শাস্ত্রকেই অনুসরণ করে, কিন্তু কান্ট তা অস্বীকার করেছেন। সাধারণ আঙ্কিক পদ্ধতিতে এ ফলসমূহ অর্জিত হয়েছে এবং গুণের টেবিলে করলে যেমন হতো তেমনি নিখুঁত এবং নির্ভুল। গ্রন্থাকারদের লেখা পড়ে দার্শনিকেরা এ পরিস্থিতির সম্মুখীন হননি। নতুন দর্শন শুধু নতুন ফলশ্রুতির সমন্বয় সাধন করে ধারাবাহিক অজ্ঞতার ধারক বাহকদের উপর সহজ বিজয় অর্জন করতে সমর্থ হয়েছে।

নতুন দর্শন শুধু সমালোচনামূলক নয়, বিজ্ঞান যেমন পুঙ্খানুপুঙ্খ পরীক্ষা মূলকভাবে গঠনমূলক, এও তেমনি গঠনমূলক। আঙ্কিক ন্যায়শাস্ত্র নামে এর একটা আলাদা গঠনপদ্ধতি রয়েছে, যা অন্যান্য ঐতিহ্যিক শাখার চাইতে অধিকতর দর্শনেরই সমগোত্রীয়। কোন বৈজ্ঞানিক মতবাদের দার্শনিক প্রতিক্রিয়া কি, আগে তা নিরূপন করা সম্ভব ছিল না। তাদের মধ্যে বাস্তব ভিত্তি কি এবং সম্পর্ক কি তার নির্ধারণ আঙ্কিক ন্যায়শাস্ত্র সম্ভব করে তুলেছে। এই পদ্ধতির সাহায্যে পদার্থবিদ্যা এবং অঙ্কবিদ্যার দর্শনের প্রচুর অগ্রগতি সাধিত হয়েছে। ডক্টর হোয়াইটহেড তার সাম্প্রতিক তিনটি গ্রন্থে পদার্থবিদ্যার ক্ষেত্রে যে পরিবর্তন ঘটেছে তা পেশ করেছেন। অন্যন্য বিষয়েও পদ্ধতি যে সমানভাবে ফলপ্রসু প্রমাণিত হবে তা বিশ্বাস করার কোন সঙ্গত কারণ নেই, এবং তা অত্যন্ত ঘঘারালো প্যাচালো বলে এখানে উদ্ধৃত করা গেল না।

অনেক আধুনিক বহুবাদী দার্শনিক বক্তব্যের ন্যায়শাস্ত্রীয় বিশ্লেষণের দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়েছেন। প্রথমে এ পদ্ধতি অত্যন্ত শ্রদ্ধাসহকারে ব্যাকরণে প্রয়োগ করা হয়েছিল। মেনং (Meinong) দৃষ্টান্ত দিয়ে বলেছেন, যখন আমরা গোলাকার এবং বর্গাকার কোনকিছু একথা বলতে পারি সহজে তখন অস্তিত্বহীন হলেও গোলাকার এবং বর্গাকার কোনকিছু সম্পর্কে নিশ্চিতভাবে আমরা ধরণা পোষণ করি। বর্তমান প্রবন্ধের লেখকও এ ধরণের ধারণা পোষণ করা থেকে মুক্ত ছিলেন না, কিন্তু ১৯০৫ সালে বর্ণনাতত্ত্বের সাহায্যে কিভাবে সে ধরণার নিরসন ঘটাতে হয় তা আবিষ্কার করে। গোলাকার এবং বর্গাকার কোন কিছুকে নির্দেশ করা হয় না। একইসঙ্গে গোলাকার বর্গাকার কোন হাস্যকর বস্তুতে সময় নষ্ট করা উদ্ভট ঠেকে কিন্তু এরকম বিষয়সমূহ অনেক সময় ন্যায়শাস্ত্রের পরীক্ষার পরও টিকে থাকে। অধিকাংশ ন্যায়শাস্ত্রীয় তত্ত্বের নিন্দা করা হয়; কারণ সেগুলো অস্পষ্টতার দিকে টেনে নিয়ে যায় সুতরাং নৈয়ায়িকদের অস্পষ্টতা সম্বন্ধে সজাগ এবং নিরসনের উপায় সম্বন্ধে হুঁশিয়ার হতে হবে। যাদের প্রাসঙ্গিক জ্ঞান নেই তাদের কাছে গবেষণাগারে পরীক্ষালব্ধ ফলকেও তুচ্ছ মনে হবে এবং অস্পষ্টতা হলো নৈয়ায়িকদের জন্য হাতে-কলমে পরীক্ষা নিরীক্ষা বিশেষ।

বক্তব্যের নৈয়ায়িক বিশ্লেষণের পূর্ববর্তী প্রভাবের দরুন সর্বপ্রথম নতুন দর্শনে নিষ্কাম দর্শন এবং মধ্যযুগীয় বস্তুবাদের জোরাল একটি সংমিশ্রণ ঘটেছিল যা বাস্ত বের মতো বিমূর্ত সবকিছুর অস্তিত্বেও বিশ্বাস করত। এই ভঙ্গি থেকে ন্যায়শাস্ত্র অধিকতর পরিপূর্ণতা লাভ করে এবং অধিকতর স্বাধীন হয়ে পড়ে। বাকি যা থাকে তা আমাদের সাধারণজ্ঞানকে মুছাহত করার এত মারাত্মক তেমন কিছু নয়।

যদিও শুরুতে নতুন দর্শনের সঙ্গে অন্য যে কোন বিজ্ঞানের চাইতে বিশুদ্ধ গণিতের সম্বন্ধ ছিল অনেক বেশি, তবু বর্তমানে এতে পদার্থবিজ্ঞানের প্রভাবই অধিক। তা হয়েছে আইনস্টাইনের কর্মের মাধ্যমে। যা স্থান কাল এবং পাত্রের ধারণার মৌলিক পরিবর্তন আনতে সক্ষম হয়েছে। আপেক্ষিক তত্ব বিশ্লেষণ করবার স্থান এ নয়, কিন্তু এর কতিপয় দার্শনিক ফলাফল এড়িয়ে যাওয়া অসম্ভব। দর্শনের দৃষ্টিকোণ থেকে দু’টো বিশেষ আপেক্ষিকবাদ তত্বে দুরকমের বিশেষ উপাদান বর্তমান (১) সর্বব্যাপ্ত এবং সবকিছু ধারণক্ষম এমন কোন কাল নেই যার মধ্যে ব্রহ্মাণ্ডের সকল ঘটনার স্থান সংকুলান হতে পারে। (২) প্রাকৃতিক বস্তুকে পর্যবেক্ষণ করার সনাতন অথবা আত্মগত ক্ষমতা আগে যেমন কল্পনা করা হতো, যদিও তার চেয়ে অনেক ব্যাপক এবং টেনসর ক্যালকুলাস (Tensor Calculas) নামে একজাতীয় আঙিক পদ্ধতিতে তা দেখানো যেতে পারে। আমি পরবর্তী বিষয় সম্পর্কে কিছু বলতে চাইনে, কারণ তা অসহনীয়ভাবে দুর্বোধ্য এবং বিষয়াগত।

গবেষণালব্ধ ফলাফলের প্রয়োজনে গাণিতিক ফর্মূলানির্ভর একটি থিয়োরির মাধ্যমেই সময়কে হৃদয়ঙ্গম করতে হবে, প্রাথমিকভাবে দর্শনের দূরবীক্ষণের ওপর নির্ভর করলে আমাদের চলবে না। মন্টেসকুর (Montesquieur) থিয়োরি এবং আমেরিকার সংবিধানের মধ্যে যে পার্থক্য এ দুয়ের পার্থক্যও তেমনি। দৃষ্টিতে যা পড়ে তা হলো, কোন নির্দিষ্ট পদার্থে যখন কোন ঘটনা ঘটে তখন যে দর্শক তার গতিতে অংশগ্রহণ করে তার দৃষ্টিভঙ্গীতে একটি নির্দিষ্ট সময় সঙ্গতি ধরা পড়ে। কিন্তু বিভিন্ন পদার্থের বিভিন্নস্থানে যে ঘটনা ঘটে সকল অবস্থার সময় সঙ্গতি মেনে চলে না। সংক্ষেপে বলতে গেলে পৃথিবী থেকে সূর্যে আলোক সঙ্কেত প্রেরণ করে আবার যদি পৃথিবীতে ফেরত আনতে হয়, তা হলে তা প্রেরণ করার প্রায় ষোল মিনিট পরে ফিরে আসবে। এই ষোল মিনিট সময়ের মধ্যে পৃথিবীতে যে সকল ঘটনা ঘটবে তা আলোক সঙ্কেত ফিরে আসার পরে বা পূর্বে ঘটবেনা। আমরা যদি কল্পনা করি পর্যবেক্ষকেরা সূর্য এবং পৃথিবীর সকল সম্ভাব্য দিকে ঘুরে ঘুরে ঐ ষোল মিনিটে পৃথিবীর যাবতীয় ঘটনা এবং সূর্যের থেকে প্রত্যাগত আলোক সঙ্কেতের দিকে লক্ষ্য করছে, এবং আমরা যদি ধরে নেই যে আলোর গতিবেগ সম্পর্কে হিসেবে রাখার জন্য নিখুঁত ক্রনোমিটার যন্ত্র ব্যবহার করতে দেয়া হলো তাহলে কোন কোন পর্যবেক্ষক ঐ ষোল মিনিটের মধ্যে পৃথিবীর কোন ঘটনাকে সূর্যপ্রত্যাগত আলোকসঙ্কেতের পূর্ববর্তী, কেউ একই সময়ে এবং কেউ পরে ঘটেছে বলে বিচার করবে। তারা সকলেই সমানভাবে সত্য অথবা সমানভাবে মিথ্যা। কিন্তু পদার্থবিজ্ঞানের নের্ব্যক্তিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বিচার করলে পৃথিবীর ঘটনা সূর্য থেকে আলোক সঙ্কেত নিয়ে আসার আগে পরে, কিংবা এক সময়েও ঘটেনি। ঘটনা কোন পদার্থের আগে ঘটল এবং যে ঘটনা অন্য কোন পদার্থে পরে ঘটল যদি ক থেকে খ তে আলোক সঞ্চালিত হতে না পারে তা হলে আমরা বলতে পারবো না ক এর ঘটনা (ক এর সময়ক্রম অনুসারে) পূর্বে ঘটেছে খ এর ঘটনা ক এর ঘটনার প্রতিক্রিয়ার ফলে (খ এর সময়ক্রম অনুসারে) পরে ঘটেছে। তা না হলে দুটো ঘটনার প্রতিনিধিত্ব করতে পারবেনা।

আমরা আলো সম্পর্কে যে মামুলি ধারণা পোষণ করি গতি যদি তার সঙ্গে তুলনীয় হতো তাহলে বস্তুবিশ্বকে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে বিচার করা অসম্ভব হয়ে দাঁড়াত এবং আজকের যুগ পর্যন্ত আমাদের প্রারম্ভিক যুগের চিকিৎসকদের নিয়ে সন্তুষ্ট থাকতে হতো! পদার্থ বিদ্যার কিছু আবিষ্কার হয়েছে একথা বললে আইনস্টাইনের নাম না করে উপায় নেই, কেননা তার আবিষ্কার ব্যতিরেকে নিউটনিয় পদার্থবিদ্যা অফলিত থেকে যেত। তেজস্ক্রিয় পদার্থের যে কণিকাসমূহ বিচ্ছুরিত হয় তার গতিবেগ প্রায়ই আলোর গতিবেগের সমান এবং এ কণিকাসমূহের প্রকৃতি পদার্থ বিদ্যার নতুন আপেক্ষিক গুরুত্বের সাহায্য ছাড়া বোধগম্য হয়ে উঠে না। পুরনো পদার্থবিদ্যা যে প্রমাদপূর্ণ তাতে কোন সন্দেহ নেই এবং দর্শনের দৃষ্টিকোণ থেকে দোষ অল্প বলাটা কোন একটা কৈফিয়ত নয়। আমাদের মনকে কিছু অংশে এ বিশ্বাসে তৈরি করে নিতে হবে যে, বিভিন্নস্থানে যে বিভিন্ন ঘটনা ঘটে তার মধ্যে নির্দিষ্ট কোন সময় সঙ্গতি নেই। এই একটি কারণে কাল এবং পাত্র দু’টো আলাদা বহুবিন্যাসের বদলে কালপাত্র একটি বহুবিন্যাসের (Multifold) প্রবর্তন করা হয়েছে। যে সময়কে আমরা মহাজাগতিক মনে করি আদতে তা লোক্যাল টাইম বা স্থানীয় সময় যা পৃথিবীর সঙ্গে আটলান্টিক পাড়ি দেয়া জাহাজ যেমন ঘড়ি বদলায় না তেমনি একান্তভাবেই সম্পৃক্ত।

আমাদের স্বাভাবিক ধারণাতে সময়ের ভূমিকাই সকল কিছু বলে যখন আমরা বিবেচনা করি, আমরা কাল্পনিকভাবে হলেও পদার্থবিদেরা যা করেছে, তা বুঝতে পারি যদি, তাহলে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গীতে যে আমূল পরিবর্তন আসবে তাতে কোন সন্দেহ নেই। প্রগতির ধারণার কথাই বলা যাক না, যদি সময়সঙ্গতি কোন নিয়ম মেনে না চলে তাহলে সময়কে মাপার যে পদ্ধতি অবলম্বিত হবে সে অনুসারে প্রগতি অথবা প্রতীপগতি নির্ধারিত হবে। যদি দু’জন পর্যবেক্ষক দু’স্থান থেকে একটি নির্দিষ্ট স্থানের দূরত্ব নিখুঁতভাবে নির্ণয় করার জন্য সম্ভাব্য সকল উপায় অবলম্বন করে থাকে এবং তাদের গতি আপেক্ষিকভাবে দ্রুত হয়, তাহলে পর্যবেক্ষকরা দূরত্ব সম্পর্কে আলাদা আলাদা সিদ্ধান্তে উপনীত হবে, এভাবে দূরত্বের ব্যাপ্তির ধারণারও তারতম্য ঘটে। দূরত্ব নিশ্চিতভাবে বাস্তব পদার্থের মধ্যবর্তী শূন্যের মধ্যে নয় বলে দূরত্বের ধারণাও ঝাপসা হয় এবং তা পরিষ্কার বোঝা যায়। দূরত্বটা কোন বিশেষ সময়ের কেননা দুটি পদার্থের মধ্যে ক্রমাগত দূরত্বের পরিবর্তন ঘটেছে এবং নির্দিষ্ট সময় হলো আত্মগত ধারণা, পর্যবেক্ষক যে পথে প্রথম ভ্রমণ করেছে তার উপর নির্ভরশীল।

আমরা কোন নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে অনেকগুলো ঘটনার সমাহারের কথা বলতে পারিনে, আমাদেরকে শুধু একটি মাত্র ঘটনা সম্পর্কে বলতে হবে। এই বিরতিকে একজন পর্যবেক্ষকের পর্যবেক্ষণ থেকে সম্পূর্ণভাবে মুক্ত দুটো ঘটনার পরস্পরের মধ্যবর্তী কিছুটা সম্বন্ধ রয়েছে, যাকে বিরতি বলা যেতে পারে। পর্যবেক্ষক বিভিন্নভাবে নির্দিষ্ট সময় এবং সাময়িক গঠনের নিরিখে ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করবে কিন্তু বিশ্লেষণের নিরপেক্ষ মূল্যমানের দাবীদার নয়। বিরতি হলো নিরপেক্ষ বাস্তব ঘটনা কিন্তু তাকে বিভিন্ন উপাদানে খণ্ডিত করলে নিরপেক্ষ বজায় থাকে না।

এটা স্পষ্ট যে, আমাদের নিরেট পদার্থ সম্পর্কে আনন্দিত ধারণা টিকতে পারে না। একখণ্ড পদার্থ নির্দিষ্ট কতেক নিয়মানুসারে সংঘটিত ঘটনা পরম্পরা ছাড়া আর কিছু নয়। পদার্থ সম্পর্কে ধারণা তখনই জাগলো যখন দার্শনিকদের ‘বস্তুর ধারণা সম্বন্ধে কোন সন্দেহ ছিল না! কাল এবং পাত্রের ব্যাপ্তিতে পদার্থ পদার্থসার এবং শুধু কালের ব্যাপ্তিতে মন বস্তুর সারভাগ রূপে বর্তমান ছিল। দিন গত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দর্শনে এই সারভাগের ধারণা ক্রমে ঝাপসা হয়ে আসে কিন্তু আপেক্ষিকতত্ত্ব আবিষ্কার না হওয়া পর্যন্ত পদার্থবিজ্ঞনে তা ক্ষতিজনক নয় বৃলে টিকে রইল। বস্তুসারের যে ঐতিহ্যিক ধারণা তা দুরকমের উপাদানে গঠিত হয়েছে। প্রথমতঃ বস্তুসারের ন্যায়শাস্ত্রীয় গুণ অনুসারে কোন প্রতিজ্ঞার কর্তা হিসেবে আসতে পারে, কিন্তু কর্ম হিসেবে নয়। দ্বিতীয়তঃ তা এমন কিছু যা বহুকাল আগে থেকে বর্তমান অথবা ভগবানের ক্ষেত্রে সময়েরও অতীত। এ দুরকমের গুনের মধ্যে কোন প্রয়োজনীয় সম্বন্ধ নেই এবং তা ধারণাও করা হয়নি। কারণ পদার্থবিদ্যা শিক্ষা দিয়েছে প্রত্যেক খণ্ড পদার্থের মৃত্যু নেই, কিন্তু ধর্মতত্ত্ব শিক্ষা দিয়েছে আত্মার মৃত্যু নেই। সুতরাং উভয় ধারণাতেই সারভাগের বৈশিষ্ট্য বিরাজিত, সে যা হোক বর্তমানে পদার্থবিজ্ঞান আমাদের ভাবতে বাধ্য করে যে নৈয়ায়িক অর্থে সারবস্তু হলো ক্রমবিলীয়মান ঘটনা। তার মানে সেগুলোকে কর্তা হিসেবে ব্যবহার করা যায় কিন্তু কর্ম হিসেবে নয়। একখণ্ড পদার্থকে আমরা একটি সত্তা বলে মনে করলেও তা ছায়াছবিতে স্থায়ী লক্ষ্যের মতো অনেকগুলো সত্তার মাখামাখির সৃষ্টি ছাড়া আর কিছু নয়।মনের সম্পর্কেও একই কথা কেনো বলবোনা আমরা, তার কোন সঙ্গত কারণ নেই। স্থায়ী অহং-এর ধারণা অণুর মতই অলীক। কিন্তু দুটোর মধ্যে শুধু কতকগুলো কৌতূহলোদ্দীপক সম্বন্ধের জট বর্তমান।

আধুনিক পদার্থবিদ্যা ম্যাক (Mach) এবং জেমস (James) এর পরামর্শমতে আমাদের ভাবতে অনুপ্রাণিত করল যে পদার্থজগৎ এবং মানসিকজগৎ একই উপাদানে গঠিত। নিরেট পদার্থ স্পষ্টতঃ ধারনা এবং স্থায়ী অহং থেকে ভিন্নতর ছিল। কিন্তু যদি পদার্থ এবং অহং দুটোর পরস্পর সুবিধাজনক সংমিশ্রণ থেকে সৃষ্টি হতো তাহলো, ও দুটো যে একই উপাদানে সৃষ্টি তা কল্পনা করতে বিশেষ বেগ পেতে হয় না। অধিকন্তু আজ পর্যন্ত আত্মগত ধারনা অথবা দৃষ্টিভঙ্গি চিহ্নিত বৈশিষ্ট্যটি বিদ্যমান তা পদার্থবিদ্যাকে যে আক্রমণ করেছে, কিন্তু মনের তেমন চিহ্নিত বৈশিষ্ট্য ধরা পড়েনি। বিভিন্ন স্থান থেকে ফটো ক্যামেরার সাহায্যে একই জিনিসের ছবি তোলা হলেও কিন্তু ছবি ভিন্ন ভিন্ন ধরনের হবে। এমনকি ক্রনোমিটার, এবং মাপন দণ্ড ও আধুনিক পদার্থবিদ্যার কর্তপদীয় ভুমিকা গ্রহন করে, সেগুলো প্রাকৃতিক ঘটনার হিসেব না রেখে, প্রাকৃতিক ঘটনার সঙ্গে সম্বন্ধের হিসেব রাখে। এভাবে পদার্থবিদ্যা এবং মনস্তত্ত্ব পরস্পরের দিকে পরস্পর এগিয়ে এসেছে; মন এবং বস্তুর দ্বৈতবাদ ভেঙে পড়েছে

এটা উল্লেখ করা বোধহয় উচিত যে আধুনিক পদার্থবিদ্যা প্রাচীন অথবা পরিচিত অর্থে কোন শক্তিকে স্বীকার করেনা! আমরা আগে চিন্তা করতাম যে সূর্য পৃথিবীতে শক্তি বিকিরণ করছে। এখন আমরা চিন্তা করি কালপাত্রকে সূর্যের আশেপাশে এমনভাবে সাজিয়ে রাখা হয়েছে, যাতে করে অন্য কোন কিছুর বদলে পৃথিবীর ঘুরতে বেশি সুবিধা হয়। আধুনিক পদার্থবিদ্যার অবিসংবাদিত নীতি হলো Principal of least action নীতি। তাহলে এক স্থান থেকে অন্যস্থানে যেতে হলে কোন কিছুর যে পথে ভ্রমণ করতে নূন ক্রিয়া করতে হবে সে পথই পছন্দ করবে। (ক্রিয়া হলো একটি বিষয়গত শব্দ বর্তমান মুহূর্তে তার অর্থের কোন প্রয়োজন আমাদের নেই।) খবরের কাগজের সাংবাদিক এবং অন্যান্য লেখক নিজেদের শক্তিমন্ত দেখতে চায় যারা, তারা গতি শব্দটার খুবই ভক্ত। গতিবিজ্ঞানে গতি বলে কোনকিছুর অস্তিত্ব নেই। পক্ষান্তরে চিরন্তন অলসতা থেকেই সমস্ত কিছু উৎসারিত সুতরাং অন্যকে নিয়ন্ত্রণ করার মতো অবয়ব বিশিষ্ট তেমন কিছুর অস্তিত্ব নেই। আধুনিক বিজ্ঞানের যে প্রমাণ তা যারা বিরাট আইন এবং প্রাকৃতিক শক্তির দোহাই পাড়ে তার চেয়ে লাউসের ধারণার অধিকতর নিকটবর্তী। বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে সমূহবাদী দর্শনের তুলনায় আধুনিক বস্তুবাদী এবং বহুবাদী দর্শনের অবদান অনেক কম। মধ্যযুগে দর্শন ছিল ধর্মতত্বের সেবাদী এবং বর্তমানে দর্শন এক কথায় বই বিক্রেতাদের তালিকায় এসে পৌঁছেছে। সাধারণতঃ ধর্মের মহাসত্যকে প্রমাণ করাই দর্শনের কর্তব্য বলে মনে করা হয়। কিন্তু নব্যবস্তুবাদ সেগুলোকে প্রমাণ অপ্রমাণ কিছুই করার কথা বলে না। শুধুমাত্র বিজ্ঞানের মুল ধারণাগুলো বুঝিয়ে দেয়া, বিভিন্ন বিজ্ঞানের সংশ্লেষ সাধন করে পৃথিবীর যে সকল ক্ষেত্রে বিজ্ঞান নানা অভিযানে সাফল্য অর্জন করেছে তা একটিমাত্র বোধগম্য যুক্তিতে ধরে দেয়াই নব্য বস্তুবাদের লক্ষ্য। পিছনে পড়ে রইল কি, তার সম্পর্কে মাথা ঘামায় না। অজ্ঞতার জ্ঞানে, রূপান্তরিত করার মতো কোন তাবিজ-কবজও নতুন দর্শন দেয় না। যারা বোঝে দাম দেয়, তাদের বুদ্ধিবৃত্তিক আনন্দ দিয়ে থাকে, কিন্তু অন্যান্য দর্শনের এত বৃথা অহংকার করে তোষামোদী করে না। যদি তা নীরস এবং বিষয়গত হয়ে থাকে তাহলে ব্রহ্মাণ্ডের উপরে দোষ চাপায় না, কেননা কবি এবং মরমীরা যে রকমটি চায় তার চেয়ে গাণিতিক পদ্ধতিতেই তার ক্রিয়া-কর্ম চলে। হতে পারে তা দুঃখময় কিন্তু একজন গাণিতিক তাতে দুঃখের কিছু খুঁজে পাবেনা।

 ০৬. যন্ত্র এবং আবেগ

যন্ত্র কি আবেগ সমূহকে হত্যা করবে? না আবেগসমূহ যন্ত্রপাতিকে বিনষ্ট করবে? অনেক আগে স্যামুয়েল বাটলার তার (EREWHON) এয়ার হোন-এ প্রশ্নটির অবতারণা করেছেন। যন্ত্রযুগের ব্যাপক প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে এ প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

যন্ত্র এবং আবেগের মধ্যে কোন বিবাদ কেনো থাকবে, আপাতঃদৃষ্টিতে তা ধরা পড়ার কথা নয়। প্রত্যেকটি শিশু স্বাভাবিকভাবে যন্ত্র ভালোবাসে। অত্যাধিক শক্তিধর এবং প্রকাণ্ড যন্ত্রের প্রতি তার আকর্ষণ প্রচণ্ড। জাপানিদের মতো যে জাতির ঐতিহ্য শৈল্পিক বিশেষত্ব আছে, সংস্পর্শে আসা মাত্রই প্রতীচ্যের যন্ত্রের, যান্ত্রিক পদ্ধতির প্রতি আকৃষ্ট হয়েছে এবং যত শিগগির সম্ভব অনুকরণ করার জন্যে উঠে পড়ে লেগেছে। (ইউরোপ) ভ্রমণ করেছেন এমন একজন শিক্ষিত, এশিয়ান প্রাচ্যের জ্ঞানরাজির প্রশংসা এবং এশীয় সভ্যতার ঐতিহ্যগত উৎকর্ষের কথা শুনতে যত বিরক্ত হবেন, তেমনটি আর কিছুতেই হবেন না। বালককে পুতুলের বদলে খেলনা মোটর দিলে যে পরিমাণ খুশী হয়ে ওঠে, তিনিও আসল মোটর পেলে তার শরীরের উপর দিয়ে চলে যেতে পারে সে কথা উপলব্ধি না করে খেলনা মোটর পাওয়া শিশুর মতো খুশী হয়ে উঠবেন।

প্রতীচ্যে মুষ্টিমেয় কবি এবং নন্দনতাত্বিক ছাড়া অন্য সকলের চোখে প্রথমাবস্থায় যন্ত্র একই রকমের আনন্দদায়ক ছিল। উনবিংশ শতাব্দীকে পূর্ববর্তী শতাব্দীগুলোর তুলনায় যান্ত্রিক উৎকর্ষের জন্য উল্লেখযোগ্য বিবেচনা করা হয়। প্রথম জীবনে পিকক (peacock) gosto giusreo syfaro (Steam intellect society) Pos GT করতেন। তিনি ছিলেন সাহিত্যের মানুষ, তার কাছে গ্রিসিয় এবং লাতিন গ্রন্থকারেরা ছিলেন সভ্যতার প্রতীক। কিন্তু তিনি ছিলেন তার যুগের বহতা ভাবধারার প্রতি অত্যধিক সচেতন, কিন্তু যুগের মানুষের কাছে অপাংক্তেয় হওয়ার ভয়ে তা করেছিলেন। রুশোর শিষ্যদের সঙ্গে হ্রদের তীরের কবিরা মধ্যযুগীয় সমস্ত বৈশিষ্ট্যসমূহ প্রকৃতিতে ফিরে গেলেন। উইলিয়াম মরিস (William Morris) তার নিউজ ফ্রম নো হোয়ার (News from nowhere) কাব্যগ্রন্থে এমন একটি দেশের বর্ণনা দিয়েছেন (যেখানে সারাবছর জুন মাস, লোকজন পরমানন্দে তাদের কাজকর্ম গুছিয়ে নিচ্ছে) সবকিছুর মধ্যে একটি খাঁটি আবেগময়তা এবং যান্ত্রিকতার ভাব পরিদৃশ্যমান।

স্যামুয়েল বাটলার ছিলেন একমাত্র ব্যক্তি যিনি সর্বপ্রথম নিরুত্তর আবেগে যন্ত্রের বিরোধিতা করেছিলেন, তবে তা তার মধ্যে দ্রুণরূপে বর্তমান ছিল। অন্তরের গভীর শেকড় প্রসার করতে পারেনি। তার সময় থেকে যন্ত্ৰোন্নত জাতিগুলোর কিছুসংখ্যক মানুষ (EREWHONLAN) এরয়ারহোনিয় মতবাদের সমগোত্রীয় একটা মতবাদের দিকে ঝুঁকে পড়েছে। এই মতবাদ শিল্পোৎপাদন পদ্ধতির প্রতি বিদ্রোহ মনোভাবাপন্ন অনেকের দৃষ্টিভঙ্গীতে প্রচ্ছন্ন অথবা প্রকাশ্যে ক্রিয়াশীল। যন্ত্রকে পূজা করা হয়, যেহেতু যন্ত্র সুন্দর, দাম দেয়া হয় শক্তিধর বলে, বিকট ভীষণ বলে ঘৃণা করা হয় এবং দাসত্ব ব্যবস্থা কায়েম করে বলে যন্ত্রের প্রতি বিতৃষ্ণা জ্ঞাপন করা হয়। এর মধ্যে কোন সিদ্ধান্তটা ভালো সে বিষয়ে মন্তব্য করব না, তা করলে মানুষের পা থাকা ভালো, মাথা থাকা খারাপ তাও আমাদের ধারণা করতে হয়। যদিও আমরা সহজে কল্পনা করতে পারি লিলিপুটের মানুষেরা গ্যালিভারের পা মাথা নিয়ে ঝগড়ায় মেতে উঠেছে। যন্ত্র হলো, আরব্যোপন্যাসের সে জ্বীনের মতো প্রভুর কাছে উপকারী এবং সুন্দর, শত্রুর কাছে ভয়াল ভীষণ। কিন্তু আমাদের যুগে কোন কিছুকে উলঙ্গ করে সহজভাবে দেখতে দেয়া হয় না। এটা সত্য যে যেখানে যন্ত্রের ঘর্ঘর শব্দ পৌঁছায়না, অবর্জনার নোংরা স্তূপদৃষ্টিগোচর হয়না, যেখানে দুর্গন্ধ বাতাসে নিশ্বাস নিতে হয় না, যন্ত্রের মালিকেরা তেমনি নিরাপদ ব্যবধানে বাস করেন। যদি কখনো আসেন তাহলে যন্ত্র চালু হওয়ার আগে যখন তিনি যন্ত্রের শক্তির প্রশংসা করতে পারেন, ধূলোবালি আর উত্তাপে অতিষ্ঠ না হয়ে খুঁটিনাটি দেখে মোহিত হতে পারেন। যারা যন্ত্রের সঙ্গে বাস করেন এবং যন্ত্রে কাজ করে তাদের দৃষ্টিতে যন্ত্রকে বিচার করতে চ্যালেঞ্জ করা হলে সব সময় তারা একই রেডিমেড জবাব দেবেন। তারা বলবেন, যন্ত্র চালু থাকার ফলে তারা বেশি পরিমাণে জিনিসপত্র কিনতে পারছেন। সুতরাং তারা তাদের পিতা পিতামহের চেয়ে অনেক অনেক বেশি সুখী। তা যদি সত্য হয়, সব মানুষে করে এমনি একটা ধারণাকে আমাদের স্বীকার করে নিতে হয়।

ধারণাটা হলো বস্তুগত পণ্যদ্রব্যের অধিকারী হতে পারলে জীবনে সুখী হওয়া যায়। এটাও ধারণা করা যায় যে মানুষের দুটো কক্ষ, দুটো বিছানা এবং দুটো করে রুটি আছে সে মানুষটি একটি কক্ষ, একটি রুটি একটি বিছানা যে মানুষটির আছে তার তুলনায় ঢের বেশি সুখী। মানুষ সব সময়ই ভাবে মানুষের সুখ রুজি রোজগারের উপর নির্ভরশীল। মাত্র কিছু সংখ্যক মানুষ, সেও সব সময় আন্ত রিকতার সঙ্গে নয়, ধর্ম এবং নৈতিকতার নামে এ ধারণার বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জ করে থাকেন, আবার তারাও উচ্চ কণ্ঠ প্রচারের মাধ্যমে আয়ের পরিমাণ বাড়াতে পারলে মনে মনে খুব খুশী হন। কোন ধর্ম কিংবা নৈতিকতার বশে নয়, মনস্তত্ত্ব এবং জীবন পর্যবেক্ষণের দৃষ্টিকোণ থেকে আমি এ ধারণার প্রতিবাদ করতে চাই। জীবনের সুখ যদি রুজি-রোজগারের অনুপাতে হয়ে থাকে তাহলে যন্ত্রের বিপক্ষে বলার আমার কিছু নেই। তা যদি সত্য না হয়ে থাকে তাহলে আগাগোড়া সমস্ত প্রশ্নটা পরীক্ষা করে দেখার অপেক্ষা রাখে।

মানুষের যেমন শারীরিক প্রয়োজন আছে, তেমনি তার মধ্যে আবেগ আছে। যেখানে মানুষের প্রথমটির অভাব মিটেনা সেখানে দ্বিতীয় অভাবগুলোই প্রথম এবং প্রধান হয়ে দাঁড়ায়। শারীরিক প্রয়োজন মিটলে পরে প্রয়োজনের সঙ্গে সম্পর্কহীন আবেগরাশি মানুষ সুখী কি অসুখী তা নির্ধারণ করতে তৎপর হয়ে ওঠে।

আধুনিক শিল্পাঞ্চলসমূহের অনেক মানব-মানবী এবং শিশু প্রয়োজন মতো শারীরিক অভাব মিটাতে পারেনা। আয় বৃদ্ধি হলো তাদের সুখবৃদ্ধির প্রথম সোপান একথা আমিও স্বীকার করি। সেগুলো অতিরিক্ত নয় সংখ্যার সে জন্যে সকলের শারীরিক প্রয়োজনের উপকরণাদি সরবরাহ করা অসম্ভব কিছু নয়। আমি তাদের কথা বলছি না, বলছি তাদের কথা, যাদের বেঁচে থাকার প্রয়োজনের তুলনায় বেশি আছে, প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশি যাদের আছে তাদের নয়, সামান্য পরিমাণ বেশি যাদের আছে তাদের কথাও বলছি। আমরা সকলে উপার্জন বাড়াতে চাই, তার কারণটা কী? প্রথম দৃষ্টিতে মনে হতে পারে আমাদের আকাঙ্ক্ষা পরিতৃপ্ত করতে পণ্যদ্রব্যের প্রয়োজন। আদতে আমরা প্রতিবেশীদের উঁট দেখাবার জন্যে পণ্যদ্রব্য কামনা করে থাকি। যখন একজন মানুষ পুরনো খারাপ বাসা ছেড়ে একটি রুচিসম্মত ঘরে উঠে আসে, তখন সে মনে করে এবার উন্নত ধরনের লোকেরা তার স্ত্রীকে নিমন্ত্রণ করবে, বিগত অসচ্ছল দিনের চিহ্ন জীবন থেকে এভাবে বুঝি মুছে যাবে। ছেলেকে ভালো স্কুলের অথবা ব্যয়বহুল বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠিয়ে বেশি মাইনে দিয়ে সামাজিক মর্যাদার আসন দখল করে নিলো বলে আত্মপ্রসাদ অনুভব করে। ইউরোপ, আমেরিকার বড় শহরে কোন কোন অঞ্চলের ভালো ঘরের ভাড়া অন্যান্য অঞ্চলের ভালো ঘরের ভাড়ার চাইতে অনেক বেশি এ কারণে যে সেগুলো অত্যন্ত সৌখিন। আমাদের মনের গভীরে সম্মানিত এবং প্রশংসিত হওয়ার আকাঙ্খ অত্যন্ত প্রবল। স্বাভাবিকভাবেই ধনীলোকেরা অত্যধিক শ্রদ্ধা এবং সম্মান পেয়ে থাকে। মানুষের ধনী হওয়ার আসল কারণ হলো এটি। টাকা দিয়ে তারা যে সকল জিনিস ক্রয় করে, তার ভূমিকা সেখানে প্রথম নয়, দ্বিতীয়। দৃষ্টান্তস্বরূপ বলা যেতে পারে, যে কোটিপতি এক ছবি থেকে আরেক ছবির পার্থক্য পর্যন্ত বোঝে না সেও বিশেষজ্ঞদের সাহায্য নিয়ে ওল্ড মাষ্টারদের ছবি কিনে আর্ট গ্যালারি রচনা করে। অন্যেরা কত খরচ করেছে তা অবাক হয়ে ভাববে-ছবিগুলো শুধু এই আনন্দই তাকে দিয়ে থাকে। নিজের শ্লাঘা বোধ থেকে এই আনন্দ সে কখনো পেতে পারে না।

এই বোধ বিভিন্নভাবে প্রকাশ পেতে পারে এবং বিভিন্ন সমাজে এর প্রকাশভঙ্গী বিভিন্ন। অভিজাত সমাজে মানুষকে জন্মের জন্যে সম্মান করা হয়। প্যারির কোন কোন মহল মানুষকে, তার জীবন যতই বিচিত্র হোকনা কেনো শিল্পপ্রতিভার জন্যেই সম্মান করা হয়ে থাকে। জার্মান বিশ্ববিদ্যালয়ে একজন মানুষ তার জ্ঞানের জন্য সম্মানিত হয়। ভারতে সন্নাসীদের সম্মান করা হয়। চীনদেশে সাধুদের। বিভিন্ন সমাজ পর্যবেক্ষণ আমাদের বিশ্লেষণের যথার্থতাই প্রমাণ করে। সকল সমাজের মধ্যে এমন কতক মানুষের দেখা পাওয়া যায় তারা যতক্ষণ পর্যন্ত টাকা পয়সা ছাড়া বেঁচে থাকা যায় ততক্ষণ পর্যন্ত টাকা পয়সার প্রতি চরম ঔদাসীন্য প্রদর্শন করে। কিন্তু যে গুণটির বলে পরিবেশকে মুগ্ধ করে সম্মানিত হয় সে গুণটির পরিচর‍্যা করে তারা।

এসব বাস্তব সত্যের প্রাধান্য এটা প্রমাণ করে যে সম্পদের প্রতি আধুনিক মানুষের আকাঙ্ক্ষা তার প্রবৃত্তির গভীরে প্রোতিত নয়। ভাসা ভাসা আকাঙ্ক্ষাকে বিভিন্ন সামাজিক সংস্থার মাধ্যমে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দেয়া যায়। যদি আইন করে সকলের আয় সমান করে বেঁধে দেয়া হয়, তাহলে প্রতিবেশীদের চাইতে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করবার জন্য অন্য পথের সন্ধান করতে হবে। পণ্যদ্রব্য হস্তগত করার আকুলি বিকুলির অনেকাংশে নিরসন হবে। যতদিন প্রতিযোগীদের মধ্যে তীব্র আকাক্ষা বিরাজ করবে ততদিন আমরা প্রতিবেশীদের হারিয়ে দিয়ে তাদেরকে যতটুকু বেদনার্থ করতে পারব নিজেরাও ততটুকু পুলকিত হব। সম্পদের বৃদ্ধির ফলে প্রতিযোগিতামূলক কোন সুবিধা যেমন আসেনা, তেমনি দিতে পারে না প্রতিযোগিতামূিলক কোন সুখের সন্ধান। পণ্যদ্রব্য ক্রয় করে উপভোগ করার মধ্যে সত্যিকারের কিছুটা আনন্দ আছে। কিন্তু আমরা দেখেছি, যে বস্তু আকাঙ্ক্ষা করি এ তার কিয়দংশ মাত্র। এতদূর পর্যন্ত যখন দেখা গেলো আমাদের আকাঙ্ক্ষাগুলো প্রতিযোগিতামূলক এবং সে অনুসারে অতিরিক্ত ধনাগমের ফলে মানুষের সাধারণ অথবা বিশেষ কোন সুখের বৃদ্ধি সাধন করেনা।

যন্ত্র মানুষের সুখ বৃদ্ধি করে। এর সমর্থনে যদি যুক্তি দেখাতে হয় তারপরেও যে পরিমাণ উন্নতি বিধান করে থাকে চরম দারিদ্রের নিরোধক হিসেবে ব্যবহৃত হওয়া ছাড়া এর সমর্থনে যন্ত্র কোন মূল্যমানের প্রতিষ্ঠা করে না। কোন যন্ত্র সেভাবে ব্যবহৃত হবে তার কোনও সংগত কারণ নেই। যেখানে জনসংখ্যা স্থির সেখানে যন্ত্র ছাড়াও দারিদ্রের নিরসন করা যায়। উদাহরণস্বরূপ বলা যেতে পারে, ফরাসিদেশে দারিদ্র খুবই কম, যদিও সে দেশে কল-কারখানা আমেরিকা, ইংল্যাণ্ড এবং যুদ্ধপূর্ব জার্মানির তুলনায় অনেক কম,পরোক্ষভাবে কল-কারখানা যেখানে বেশি সেখানে অভাবও বেশি। একশ বছর আগেকার ইংল্যাণ্ডের শিল্পাঞ্চলগুলো এবং বর্তমান জাপানকে তার দৃষ্টান্ত হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে। যন্ত্রের সাহায্যে নয় শুধু, অভাব দূর করতে হলে আমাদেরকে অন্যকিছুর উপর নির্ভর করতে হবে। অভাবকে বিজয় করা ছাড়া সম্পদ বৃদ্ধি করার মূল্য তেমন বেশি কিছু নয়।

ইতোমধ্যে যন্ত্র আমাদের দুটো জিনিস থেকে বঞ্চিত করেছে। মানুষকে সুখী হতে হলে তার চরিত্রে এ দুটোর অতীব প্রয়োজন। উপাদান দুটো হলো বৈচিত্র এবং স্বতঃস্ফূর্ততা। কলের নিজস্ব ক্ষুধা আছে এবং ক্ষুধা নিবৃত্তির জন্য নিজস্ব দাবি আছে। যে মানুষ কলের মালিক সে তা অবশ্যই চালু রাখবে। আবেগসমূহের দৃষ্টিকোণ থেকে যন্ত্রের নিয়মতান্ত্রিকতাই হচ্ছে সবচেয়ে বড় বিপত্তি। যে সব মানুষ নিজেদের সিরিয়াস বলে ধারণা করে তাদের যন্ত্রের সবগুলো বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত বলে প্রশংসাও করা হয়। উদাহরণস্বরূপ তারা বিশ্বাসযোগ্য, সময়নিষ্ঠ, যথার্থ ইত্যাদি ইত্যাদি। এর কারণ হলো যন্ত্র মানুষের চিন্তাকে নিয়ন্ত্রণ করেছে। একটি খারাপ জীবন এবং একটি অনিয়মিত জীবনে বর্তমানে বিশেষ প্রভেদ নেই। বের্গসঁর দর্শন এ ধরনের দৃষ্টিভঙ্গীর বিরুদ্ধে প্রবল প্রতিবাদ। যদিও আমার মনে হয়, তিনি শুধু মানুষকে সর্বতোভাবে যন্ত্রে রূপায়িত হতে দেখে আতংকে অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন।

জীবনে আমাদের চিন্তার প্রতিকূল বিদ্রোহী প্রবৃত্তিগুলো যন্ত্রের দাসত্বে অস্বীকৃতি জানিয়ে একটি চরম অশুভ দিকে মোড় নিয়েছে। সমাজবদ্ধভাবে জীবনযাপনের শুরু থেকে যুদ্ধস্পৃহা বর্তমান ছিল কিন্তু আমাদের যুগের এত তা ভয়াল ভয়ংকর রূপ ধারণ করেনি কখনো। অষ্টাদশ শতাব্দীর প্রারম্ভে বিশ্বে নেতৃত্ব করার আকাঙ্ক্ষায় ইংল্যাণ্ড এবং ফরাসি দেশের মধ্যে অসংখ্য যুদ্ধ-বিগ্রহ সংঘটিত হয়েছে। কিন্তু সকল সময়ে তারা পরস্পর পরস্পরকে পছন্দ করত এবং পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধাবোধও তাদের অক্ষুণ্ণ ছিল। বন্দী অফিসারেরা সামাজিক ক্রিয়াকাণ্ডে যোগদান করতেন এবং ডিনার পার্টিতে সম্মানীয় অতিথি বলে গণ্য হতেন। ১৬৬৫ খ্রিস্টাব্দের প্রারম্ভে যখন আমাদের সঙ্গে হল্যাণ্ডের যুদ্ধ হয় তখন ওলন্দাজলের নিষ্ঠুর কার্যকলাপের গল্পসহ একজন মানুষ এলেন আফ্রিকা থেকে। আমরা বৃটিশ দ্বীপপুঞ্জের অধিবাসীরা উৎসাহিত হয়ে ধারণা করেছিলাম যে গল্পগুলো অলীক, তাকে শাস্তি দিয়েছিলাম এবং ওলন্দাজদের অস্বীকৃতি ছাপিয়ে প্রকাশ করেছিলাম। গতযুদ্ধে হলে আমরা তাকে নাইট উপাধিতে ভূষিত করতাম এবং তার সত্যনিষ্ঠায় কেউ সন্দেহ করলে আমরা তাকে জেলখানায় পাঠাতাম। যন্ত্রের কারণে আধুনিক যুদ্ধ জঘণ্যভাবে নৃশংস এবং এ নৃশংসতা তিনটি উপায়ে সক্রিয়। প্রথমতঃ যন্ত্র অধিক সংখ্যক সৈন্য রাখার সুযোগ দিয়ে থাকে। দ্বিতীয়তঃ খবরের কাগজের সস্তা প্রচার মানুষের অপকৃষ্ট বৃত্তিসমূহ আগুন ধরিয়ে দেয়। তৃতীয়তঃ মানব চরিত্রের স্বতঃস্ফূর্ত স্বৈরাচারী দিকটি যা অন্তঃশীলা স্রোতে অস্পষ্ট একটা অতৃপ্তির ভাব সৃষ্টি করে, যার ফলে যুদ্ধের আবেদন মানুষের চোখে অতৃপ্তি থেকে রক্ষা পাওয়ার একটা পন্থার এত ঠেকে। এই তৃতীয় পন্থাটিকে ঘিরেই আমাদের আলোচনা। গতযুদ্ধের এত বিরাট একটা রদবদলকে শুধুমাত্র রাষ্ট্রনৈতিকদের দুরভিসন্ধি মনে করা আমাদের পক্ষে ভুল হবে। রাশিয়ার মানুষের মধ্যে এ বোধ পর্যাপ্ত পরিমাণে ছিল বলে তারা বোধ হয় সর্বান্তঃ করণে যুদ্ধ না করে একটা বিপ্লবের মধ্য দিয়ে শান্তি প্রতিষ্ঠা করেছে। কিন্তু ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দের জার্মানি ইংল্যাণ্ড এবং আমেরিকার কোন সরকার যুদ্ধের জনপ্রিয় দাবিকে ঠেকিয়ে রাখতে পারত না। এরকম জনপ্রিয় দাবির পেছনে অবশ্যই একটা প্রাকৃকিত ভিত্তি আছে। আমার মতে আধুনিক নিয়মনিষ্ট একঘেঁয়ে জীবনের অসন্তোষ, অতৃপ্তি (যা অনেকাংশে অচেতন) এই যুদ্ধপ্রিয় মনোভাবের সহায়ক হয়েছে।

এটা স্পষ্টতঃ সত্য যে, আমরা যন্ত্রপাতিকে বিদায় করে পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে পারিনে। এরকমের প্রচেষ্টা প্রতিক্রিয়াশীল এবং সর্বক্ষেত্রে অবাস্তব প্রমাণিত হবে। কল-কারখানা জীবনে যে দুর্বিসহ অভিশাপ বয়ে এনেছে, দুঃসাহসিক অভিযানের অনুপ্রেরণায় বেড়িয়ে পড়ে একঘেঁয়েমী ভঙ্গ করা হলো তা এড়িয়ে যাওয়ার একমাত্র পথ। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে যারা আল্পস পর্বতের শিখরে আরোহন করেছে তারা তখনও যুদ্ধকে কামনা কররেব কি? শান্তির একজন উৎসাহী এবং কর্মক্ষম কর্মীর সঙ্গে পরিচিতি হবার সৌভাগ্য আমার হয়েছিল, যিনি অভ্যাসবশে আল্পসের সবচেয়ে বিপদ-সংকুল শৃঙ্গে আরোহণ করে সারা গ্রীষ্মকাল অতিবাহিত করেন। যদি প্রত্যেক শ্রমজীবী মানুষকে তাদের ইচ্ছানুসারে উড়োজাহাজ চালানো শিক্ষা দেয়া যায় অথবা সাহারায় নীলকান্ত মণির সন্ধানে পাঠানো হয় অথবা তার আবেগে নাড়া দিতে সক্ষম তেমন কোন উত্তেজনাপূর্ণ কাজে পাঠানো হয় তাহলে যুদ্ধের জনপ্রিয় দাবি প্রতিযোগিতায় এসে দাঁড়াবে এবং ধীরে ধীরে সময়-প্রীতি লোপ পেয়ে যাবে। বিবদমান শ্রেণীসমূহকে শান্ত করার কোন পদ্ধতি আমার জানা নেই, একথা আমি স্বীকার করি। কিন্তু আমি বিশ্বাস করি একটা বৈজ্ঞানিক দর্শনের আঙ্গিকে অন্তরঙ্গভাবে অনুসন্ধান করলে একটা পদ্ধতির সন্ধান অবশ্যই মিলবে।

যন্ত্র আমাদের জীবনধারায় পরিবর্তন বয়ে এনেছে, কিন্তু প্রবৃত্তিকে নয়। ফলতঃ অসামঞ্জস্য ঘটেছে। আবেগ এবং দর্শন এখন পর্যন্ত শৈশবাবস্থায় রয়ে গেছে। মনঃসমীক্ষা সবেমাত্র সে দর্শনের সূত্রপাত করেছে, কিন্তু তাও আগে যেখানে ছিল বর্তমানেও সেখানে স্থির অনড়ভাবে রয়ে গেছে। মানুষ এমন অনেক কাজ করে, এমন অনেক কিছু চায় যা তার আসল কাম্য নয়। অযৌক্তিক বিশ্বাসের বশে না জেনে মানুষ জীবনের ভিন্নরকম পরিণতি কামনা করে অন্তত আমরা এটুকু মনসমীক্ষা থেকে গ্রহণকরতে পারি। কিন্তু গোঁড়া মনঃসমীক্ষা অন্যায়ভাবে আমাদের সচেতন উদ্দেশ্যেরও সরলীকরণ করে ফেলেছে এবং তা অসংখ্য আর ব্যক্তিতে ব্যক্তিত্বে বিভিন্ন। এটা আশা করা যায় যে শিগগির এমন রাজনৈতিক এবং সামাজিক পরিস্থিতির উদ্ভব হবে যখন এই দৃষ্টিকোণ থেকে মানবচরিত্রের উপর আলোকপাত করা সম্ভব হবে।

শুধু নৈতিক আত্মনিয়ন্ত্রণ এবং আমাদের বাহ্যিক ক্ষতিকর কাজ বন্ধ করাকে আমাদের স্বৈরাচারী প্রবৃত্তিগুলোর নিরসনের পক্ষে পর্যাপ্ত বলে মনে করা উচিত নয়। এ কারণে নিরসন হয় না যে আমাদের প্রবৃত্তির মধ্যে কতকগুলো মধ্যযুগীয় শয়তানের মতো এমন ছদ্মবেশ ধরতে সক্ষম যে সবচেয়ে সতর্ক তা ফাঁকি দিতে পারে। আমাদের চরিত্রগত প্রবৃত্তিকে পরিতৃপ্তি বিধান করার একমাত্র পন্থা হলো ওগুলোর কিসের প্রয়োজন তা জানা এবং কিভাবে যথাসত্বর কম ক্ষতিকর উপায়ে তার পরিতৃপ্তি বিধান করা যায় তা আবিষ্কার করা। যেহেতু যন্ত্র স্বতঃস্ফূর্ততাকে বিনষ্ট করেছে, একমাত্র সুযোগকেই তার স্থলাভিষিক্ত করতে হবে এবং তা ব্যক্তিক অভিরুচির এখতিয়ারে ছেড়ে দেয়া উচিত। সন্দেহ নেই, এতে বিস্তর খরচ পড়বে, কিন্তু সে খরচ কোনক্রমেই একটা যুদ্ধের ব্যয়ের সঙ্গে তুলনা করা যায় না। মানবচরিত্রের সম্পর্কে সুস্পষ্ট জ্ঞান অবশ্যই মানবজীবনের যে-কোন রকমের উন্নতির ভিত্তি হবে। বহির্বিশ্বের প্রাকৃতিক আইনকে আয়ত্ব করে মানুষ অসাধ্য সাধন করেছে। এ পর্যন্ত আমরা ইলেকট্রোন এবং নক্ষত্রলোক সম্বন্ধে যতটা জানতে পেরেছি নিজেদের চরিত্রের সম্বন্ধে জানাশোনার পরিমাণ তার চেয়ে অনেক স্বল্প। যখন বিজ্ঞান মানবচরিত্র জানতে শুরু করেছে তখন আমাদের জীবনের সুখ সন্তুষ্টি বিধান করতে সক্ষম হবে যা এতকাল প্রকৃতি বিজ্ঞান কিংবা যন্ত্রপাতি দিয়ে বারবার অকৃতকার্য হয়েছে।

 ০৭. আচরণবাদ এবং মূল্যবোধ

একখানি আমেরিকান উন্নত ধরনের সাময়িকীতে আমি একদিন এ বক্তব্য দেখতে পেলাম যে পৃথিবীতে একজন মাত্র আচরণবাদী আছেন, তার নাম হলো ড. ওয়াটসন। কিন্তু পৃথিবীতে আধুনিকমনা মানুষের সংখ্যা বেশি বলে আমার মতে তাদের সংখ্যাও বেশি। তার অর্থ আমি এ বলছি না যে বিশ্ববিদ্যালয়ে যত্রতত্র আচরণবাদীদের দেখা মেলে। তা সত্ত্বেও আমি ছিলাম আচরণবাদী, কিন্তু রাশিয়া এবং চীন না দেখা পর্যন্ত, আমি যে আধুনিক নই সে কথা আমি হৃদয়ঙ্গম করতে পারিনি। নিরপেক্ষ আত্মসমালোচনা আমাকে এ সত্য বিশ্বাস করতে বাধ্য করল যে, যদি আমি তা হই তাহলে মঙ্গলজনক হবে। এ প্রবন্ধে আমার মতো মানুষেরা অনুভব করে এমন কতক অসুবিধা সম্বন্ধে আলোচনা করতে চাই। বিজ্ঞানে আধুনিকতা কী তা গ্রহণ করতে গিয়ে মধ্যযুগীয় ধারণা থেকে আলাদা করার বেলায় জীবনধারণের ক্ষেত্রে বিপদের সম্মুখীন হতে হয়। মূল্যবোধের উপর আচরণবাদের কি যুক্তিগত প্রভাব পড়েছে আমি শুধু সে সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করতে চাইনে; কিন্তু সাধারণ মানব-মানবীর উপর এর যা প্রতিক্রিয়া হতে পারে, যদি তাও ব্যাপকভাবে অশোধিত উপায়ে গৃহিত হয়, আমি সে সম্বন্ধেও প্রশ্ন জিজ্ঞেস করতে চাই। আচরণবাদ মনঃসমীক্ষার এত উম্মত্ত হয়ে এখনো ওঠেনি, তা যদি কখনো তেমন হয়ে ওঠে তাহলে ড. ওয়াটসনের শিক্ষার সঙ্গে তার আসমান জমিন তফাৎ হবে। যেমন প্রচলিত ফ্রয়েডবাদ বহুলাংশে ফ্রয়েডের চেয়ে ভিন্নতর।

আচরণবাদের মোদ্দাকথা হলো আমার মতে, অতীতে মন বলে একটা জিনিস ছিল যা অনুভব, জানা এবং ইচ্ছা এই তিনরকম ক্রিয়া করতে সক্ষম ছিল। মন বলে যে কিছু নেই বর্তমানে তা উদঘাটিত হয়েছে, শরীরটাই সব। শারীরিক ক্রিয়া প্রতিক্রিয়ার মধ্যেই আমাদের সকল রকম কর্মপ্রক্রিয়া নিহিত। অনুভূতি হচ্ছে অন্তর যন্ত্র সম্পর্কিত ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া, বিশেষ করে গ্রন্থির সঙ্গে সংযোগশীল যে সকল প্রতিক্রিয়া। জানা হচ্ছে গলঃনালীর সঙ্গে সম্পর্কশীল ক্রিয়া প্রতিক্রিয়া। ইচ্ছা হচ্ছে আমাদের শরীরের ডোরাকাটা পেশীর আর সকল ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া। সম্প্রতি একজন বিখ্যাত নর্তকী যখন একজন বিখ্যাত বুদ্ধিজীবীকে বিয়ে করলেন, তাদের মধ্যে সমতার অভাব দেখতে পেলেন কেউ কেউ। কিন্তু আচরণবাদে এ ধরণের সন্দেহের কোন অবকাশ নেই। নৃত্যপটিয়সী ভদ্রমহিলা হাত এবং পায়ের চর্চা করেছেন এবং ভদ্রলোক গলঃনালীর পেশীসমূহের চর্চা করেছেন, সুতরাং আলাদা পেশার আলাদা পদ্ধতি হলেও তারা দুজনেই পেশীসঞ্চালনকারী। আমরা একমাত্র শরীরসঞ্চালন করতে পারি বলে সাধারণের পক্ষে স্থির ধারণা পোষণ করা খুবই স্বাভাবিক, যে আমরা শরীরকে যদৃচ্ছা সঞ্চালন করতে পারি। এ ক্ষেত্রে আপেক্ষিকতত্ত্ব অথবা রিলেটিভিটি সম্বন্ধীয় অসুবিধার সৃষ্টি হবে। প্রশ্ন হলো, শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের কি পরস্পর আপেক্ষিকভাবে কাজ করা উচিত? না শরীর সামগ্রিকভাবে শরীরযন্ত্রের নিয়মানুসারে কাজ করে অথবা পৃথিবীর সঙ্গে সম্পর্কশীল যে গতি তাই কি এ গুণের একমাত্র বৈশিষ্ট্য। প্রথম মতামত অনুসারে অঙ্গ সঞ্চালনকারী দড়িবাজিকর হবে আদর্শ মানুষ; দ্বিতীয় মতানুসারে আদর্শ মানুষ হবে ক্রমশ নিম্নে অবতরণকারী মই বেয়ে উঠে যাওয়া মানুষ; তৃতীয় মতানুসারে যে মানুষ সারাজীবন উড়োজাহাজে কাটিয়ে দেয় সে আদর্শ মানুষ হিসেবে বিবেচিত হবে। ফলশ্রুতিস্বরূপ যে বিতর্কের সৃষ্টি হবে কোন নীতি অবলম্বন করলে পরে তার নিষ্পত্তি হবে তা বলা খুব সহজ হবে না। সে যাহোক শেষমেষ আমি শূন্যচারীদের কথা বলছি।

সবচেয়ে শক্তিশালী দেশের সবচেয়ে শক্তিশালী সম্প্রদায়কে যে উৎকর্ষ সাধিত ধারণাসমূহ পরিচালিত করে সে সব বিবেচনা করলে আমরা এ উপসংহারে আসতে বাধ্য হব যে আচরণবাদকে সত্য বলে বিশ্বাস করে নেয়া হয়েছে তা শুধুমাত্র থিয়োরিগত যৌক্তিকতাই প্রদান করে। যারা শরীরচর্চায় বিশ্বাসী এবং যাদের মতে খেলোয়ারদের উপর জাতির পৌরুষ নির্ভরশীল, অঙ্গ সঞ্চালনকারী দড়িবাজিকররা তাদের নিকট আদর্শ মানুষ হিসেবে বিবেচিত হবে। বৃটিশ শাসকশ্রেণীর অনুসৃত মতবাদ হলো তাই। নিম্নে অবতরণকারী মইয়ে চড়ে উপরে উঠে যাওয়া মানুষ পেশীবান খ্রিষ্টানদের আদর্শ মানুষ বলে স্বীকৃতি অর্জন করবে। তারা মনে করে পেশীর উৎকর্ষ সাধন করা চূড়ান্ত মঙ্গলজনক কিন্তু তার সঙ্গে আনন্দের কোন সংযোগ থাকতে পারবে না। এই মতবাদ ওয়াই. এম. সি. এ চীন দেশে প্রবর্তন করার চেষ্টা করেছে এবং শাসকেরা শাসিত সকল জাতি এবং শ্রেণীর জন্য নির্দিষ্ট করে দেয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। শূন্যচারীরা, যান্ত্রিক শক্তি ব্যবহারকারীদের জন্য সংরক্ষিত অভিজাত আদর্শ। কিন্তু এসবের উর্ধ্বে একটি সর্বোচ্চ ধারণা রয়েছে যা এরিস্টটলের আনমুভড মুভার (Unmoved mover) বা অচলা চালকের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। সে হলো কেন্দ্রের শাসনকর্তা আর সকলে তার চতুর্দিকে বিভিন্ন গতিতে পরিভ্রমণ করে তার জন্য সর্বোচ্চ গতিসঞ্চয় করবে। এই ভূমিকা আমাদের অতিমানুষ, বিশেষ করে পুঁজিপতিদের জন্য সুনির্দিষ্ট। আমাদের কল্পনার উপর যন্ত্রের ক্রমশ জবরদখলের ফলে মানবোকর্ষের যে ধারণা গ্রিকযুগ এবং মধ্যযুগ থেকে আমরা পেয়েছি, তার চাইতে আলাদা একটি দৃষ্টিভঙ্গি যুক্তিগতভাবে আচরণবাদের সঙ্গে খাপ খেতে পারে, কিন্তু মনস্তাত্ত্বিক ভিত্তিতে গড়পড়তা নাগরিকের ক্ষেত্রে তা অচল। সে প্রাচীন দৃষ্টিভঙ্গি অনুসারে অনুভূতি এবং জানাকে কর্মের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা করা হতো। শিল্পকলা এবং ধ্যান-ধারণাকে বিশাল পরিমাণ পদার্থের পরিবর্তন সাধন করার মতো প্রশংসনীয় জ্ঞান করা হতো। নিষ্কাম ঈশ্বরপ্রেম এবং নির্মল ঈশ্বরভক্তিই তাদের দৃষ্টিতে মানবের সর্বোচ্চ উৎকর্ষ করা হতো। আদর্শের সবটাই ছিল স্থির অনড়। স্বর্গে সঙ্গীত গাওয়া হয় এবং বীণা বাজানো হয় একথা সত্য, কিন্তু প্রত্যেকদিন একই সঙ্গীত গাওয়া হয় বীণা যন্ত্রের কেননা উন্নতি সহ্য করা হয় না। এরকম কিছুর অস্তিত্ব আধুনিক মানুষের কাছে বিরক্তিকর। মিলটন নরকে যন্ত্রপাতি পাঠাতে পারলেও স্বর্গে তার পক্ষে উন্নত ধরণের যন্ত্রপাতি পাঠানো সম্ভব হয় নি। ধর্ম মতের মার খাওয়ার কারণসমূহের মধ্যে এটি হলো একটি।

প্রত্যেক নৈতিক পদ্ধতি কতকগুলো বিশ্লেষণাতীত বিষয়ের উপর প্রতিষ্ঠিত, একথা ধরে নেয়া যায়। দার্শনিক প্রথমে বস্তুর প্রকৃতি সম্বন্ধে একটা মিথ্যা থিয়োরি আবিষ্কার করে, তারপরে উপসংহারে, যে সকল কর্ম সে থিয়োরিকে মিথ্যা বলে দেখিয়ে দেয়, সে গুলোকে খারাপ কাজ বলে আখ্যায়িত করে। ঐতিহ্যবাদী খ্রিস্টানদের দিয়ে শুরু করা যাক। তাদের মতে প্রত্যেক জিনিস ঈশ্বরের হুকুম মেনে চলে, সুতরাং ভগবানের হুকুম অমান্য করাটাই হলো গর্হিত কাজ। তারপরে ধরা যাক হেগেলপন্থীদের কথা, তাদের মতে ব্রহ্মাণ্ড হলো বিভিন্ন অংশের সমন্বয়ে সৃষ্টি একটি পরিপূর্ণ জীবদেহ বিশেষ, সুতরাং তাদের মতে সে সমস্ত হলো মন্দস্বভাব যে গুলো ব্রহ্মাণ্ডের মৃসণগতিকে খাট করে দেখে, কি রূপে এ জাতীয় ব্যবহারের উৎপত্তি হয় যদিও তা তলিয়ে দেখা কষ্টসাধ্য ব্যাপার, কেননা এ তাদের থিয়োরির জন্যে ব্রহ্মাণ্ডের নিরংকুশ সঙ্গতি বিজ্ঞানের প্রয়োজন। ফরাসি জনগণের জন্য লিখবার সময় বের্গসঁকে যারা সমর্থন করেন নি তাদের তিনি ভয় দেখিয়েছেন যা নৈতিকভাবে ঘৃণা করার চাইতেও মারাত্মক। আমি তার হাস্যাস্পদ করার ভয়ের কথাই বলছি। তিনি দেখিয়েছেন যে মানুষ কখনো যান্ত্রিকভাবে ব্যবহার করে না এবং হাসি (Laughter) বইতে তিনি বলেছেন কোন মানুষকে যান্ত্রিকভাবে ব্যবহার করতে দেখলেই আমাদের হাস্যোদ্রেক হয়। সুতরাং বের্গসঁর দর্শনকে যখন আপনি ভ্রান্ত বলবেন তখনই আপনি হাস্যাস্পদ ব্যক্তিতে পরিণত হবেন। দর্শনের কোন নৈতিক ফলশ্রুতি যে মিথ্যার উপর ভর করা ছাড়া থাকতে পারে না, এই উদাহরণগুলো তা পরিষ্কারভাবে বুঝিয়ে দেবে বলে আমি আশা করি, বরঞ্চ সত্যিকারের নৈতিক ভিত্তি বলে কোন কিছু থাকলে যে কাজগুলো তা পাপ বলে সংজ্ঞায়িত করে কখনো সে সব করা সম্ভব হতো না।

আচরণবাদের ক্ষেত্রে এসকল মন্তব্য প্রয়োগ করে, আমি এ সিদ্ধান্তে এসেছি যে, এর যদি কোন নৈতিক ফলাফল থেকে থাকে তা ভ্রান্ত। পক্ষান্তরে সত্যিকারের কে” নৈতিক ভিত্তি থাকলে আচরণের উপর এর কোনও প্রভাব নেই। প্রচলিত আচরণবাদের ক্ষেত্রে (যদিও কড়াকড়ি বৈজ্ঞানিকভাবে নয়) এগুলো প্রয়োগ করে আমি ভ্রান্তির কয়েকটা প্রমাণ পেয়েছি। প্রথমতঃ কোন নৈতিক ফলাফল নেই একথা মানুষ জানতে পেলে সবরকমের বিশ্বাসের প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলবে। এক্ষেত্রে আলাদা করার প্রয়োজন আছে। সত্য মতবাদের নৈতিক ফলাফল না থাকলেও বাস্তব ফলাফল রয়েছে। যদি কোন স্বয়ংক্রিয় যন্ত্র যেটাতে দুটো মুদ্রা দিয়ে জিনিস নেয়া যায় এত করে তৈরি করা হয়েছে, একটাকে দিয়ে নিতে চাইবার চেষ্টা করে যখন বিফল হবেন, সেখানে সত্যের বাস্তব ফলাফল মানে আপনাকে আর একটা মুদ্রা দিতেই হবে। কেউ একে নৈতিক বলবে না, কিভাবে আপনার ইচ্ছাকে সন্তুষ্ট করতে হবে তার সঙ্গেই এর সম্বন্ধ। একইভাবে ড. ওয়াটসনের বইয়ে এমন সব বিষয় বিকশিত করা হয়েছে, যেগুলো বিশেষ করে শিক্ষাব্যবস্থার মধ্যে রাজনৈতিক গুরুত্বপূর্ণ ফলাফল রয়েছে। আপনি যদি একটি শিশুর ব্যবহার বিশেষভাবে চালিত করতে চান, তাহলে ফ্রয়েডের চেয়ে ড. ওয়াটসনের উপদেশ অনুসরণ করা আপনার পক্ষে বুদ্ধিমানের কাজ হবে। কিন্তু তা নৈতিক নয়। বৈজ্ঞানিক ব্যাপার, যখন কতেক কাজকে তাদের ফলাফলের চাইতে স্বাধীনভাবে করা উচিত বলে আপনি মনে করেন, তখনই আসে নৈতিকতা।

আমরা এখন দেখতে পাচ্ছি যে আচরণবাদ যতই অযৌক্তিক হোকনা কেননা প্রকৃত অর্থে একটা নীতিশাস্ত্রের অনুমোদন করে। এর যুক্তি হতে পারে, আমরা শুধুমাত্র পদার্থকে গতিশীল করতে পারি, সুতরাং আমাদের পক্ষে যতটুকু সম্ভব সে পরিমাণ পদার্থ গতিশীল করা উচিত এবং শিল্পকলা ও চিন্তাভাবনা যে পর্যন্ত বস্তুর গতিকে ত্বরান্বিত করতে পারে, সে পরিমাণ মূল্যবান। সে যাহোক, এ হলো দৈনন্দিন জীবনধারণের একটি অতি দার্শনিক বৈশিষ্ট্য। এর বাস্তব বৈশিষ্ট্য হলো উপার্জন। ড. ওয়াটসনের থেকে নিম্নোক্ত অনুচ্ছেদটি নেয়া যাক।

“চরিত্র এবং ক্ষমতা ব্যক্তির বার্ষিক সাফল্যের নিরিখে পরীক্ষা করাই হলো আমার মতে ব্যক্তিত্ব বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ উপাদানসমূহের মধ্যে একটি। আমরা তা নিরপেক্ষভাবে সময়ের দীর্ঘতা অনুসারে যে বিভিন্ন পরিস্থিতিতে তার আয়ের বৃদ্ধি সাধন করেছে বার্ষিক হিসাব যে অনুসারে করতে পারি। যদি ব্যক্তিটি একজন লেখক হয় তাহলে বছর বছর গল্প লেখার সে টাকা পেয়েছে একটি বক্ররেখা এঁকে তা দেখাতে পারি। আমাদের প্রধান সাময়িকী থেকে তিরিশ বছর বয়সে গড়পড়তা যা পাচ্ছে, চল্লিশ বছর বয়সেও সে একই টাকা পেয়েছিল তাহলে আমাদের ধরে নিতে হবে সে একজন বাজে লেখক, এছাড়া আর কিছু সে করতে পারবে না!”

বুদ্ধ, খ্রিস্ট, মুহম্মদ, মিলটন এবং ব্লেক সম্পর্কে একই বৈশিষ্ট্য আরোপ করলে আমাদের ব্যক্তিত্বের স্বরূপ নির্ধারণের বেলায় একটি আকর্ষণীয় পুনঃসামঞ্জস্য বিধানের দেখা পেয়ে থাকি। উল্লিখিত অনুচ্ছেদে ব্যক্ত বিষয় ছাড়া আরো দু’টো মতামত সংগোপনে বিরাজমান। তার একটা হলো উৎকর্ষকে সহজে অনুধাবনশীল হতে হবে, অন্যটা আইনত তাতে একটা পারস্পর্য বজায় থাকতে হবে। এ দুটো হলো পদার্থবিজ্ঞানের থেকে উপসংহার হিসেবে নীতিশাস্ত্রে অবতরন করার পদ্ধতি। কিন্তু আমার মতে, উল্লেখিত অনুচ্ছেদে ড. ওয়াটসন যে নীতিশাস্ত্রের বর্ণনা করেছেন তা আমার পক্ষে গ্রহণযোগ্য নয়। গুণ যে আয়ের অনুপাতে নির্ধারিত হয় একথা আমি কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারিনে। অথবা দলের সঙ্গে না মিশতে পারার অসুবিধাকেও আমি দোষ মনে করিনে। এসব বিষয়ে আমার মত যে একপেশে তাতে সন্দেহ নেই, কেননা আমি হলাম গিয়ে দরিদ্র এবং যান্ত্রিক। তারপরেও এ সত্য আমি স্বীকার করি যে, সেগুলো আমারই মতামত, নির্দ্বিধায় তা আমি বলতে পারি। এখন আমি আচরণবাদের আরেকটি দিক-নাম করে বলতে গেলে এর শিক্ষাগত দিকটি সম্পর্কে আলোচনা করব। এখানে আমি ড. ওয়াটসনের উদ্ধৃতি দেবো না, কারণ শিক্ষাক্ষেত্রে তার মতামতসমূহকে আমার খুবই সুন্দর মনে হয়েছে। কিন্তু তিনি তার বইতে শিক্ষার পরবর্তী স্তর সম্পর্কে কিছুই বলেননি এবং সেখানেই আমার ঘোরতর সন্দেহ। আমি একটা বই নিচ্ছি যা সম্পূর্ণভাবে আচরণবাদী না হলেও আচরণবাদ সম্পর্কিত দৃষ্টিভঙ্গীর অনুপ্রেরণায় লেখা হয়েছে। বইটির নাম ‘শিশু, তার প্রকৃতি এবং প্রয়োজন।’ (The child, his nature and his needs) বইটির প্রতি আমার শ্রদ্ধাবোধ রয়েছে। কেননা মনস্তত্ব বইটিতে খুবই প্রশংসনীয়ভাবে ব্যক্ত করা হয়েছে; কিন্তু নীতিশাস্ত্র এবং সৌন্দর্যের তত্ত্বে সমালোচনার প্রচুর অবকাশ রয়ে গেছে বলে আমি মনে করি। তত্ত্বের অপর্যাপ্ততা দেখাবার জন্য আমি নীচের অনুচ্ছেদটির উদ্ধৃতি দিচ্ছি। (পৃঃ সংখ্যা ৩৮৪)

“পঁচিশ বছর আগে ছাত্রেরা দশ থেকে পনের হাজার শব্দ বানান করতে শিখতো। পরের দু’দশকে অনুসন্ধান করে দেখা গেলো যে উচ্চবিদ্যালয়ের ছাত্রদের পড়াশোনার জন্য কোন গ্রাজুয়েটের দরকার হয় না, এমনকি ভবিষ্যৎ জীবনের জন্যও দরকার পড়ে না, যদি না তার বিশেষ ধরনের কারিগরী কথাবার্তা রপ্ত করতে হয়। সাধারণ আমেরিকানরা চিঠি-পত্র লেখা এবং সংবাদপত্রের জন্য লিখবার সময় পনেরশ’র বেশি শব্দ ব্যবহার করে না। এসকল বিষয় বিবেচনা করে, দৈনন্দিন জীবনে যে-সকল শব্দের প্রয়োজন তার উপর ভিত্তি করে উচ্চারণ শিক্ষার কোর্স নির্ধারণ করা হয়েছে এবং অতি প্রয়োজনীয় শব্দসমূহ স্বাভাবিকভাবে উচ্চারণ করার এত দক্ষ করে তোলা হবে। প্রচলিত কারিগরী শব্দসমূহ আগে শিক্ষা দেয়া হতো এবং যেগুলোর ভবিষ্যতে ব্যবহৃত হবার সম্ভাবনা নেই থিয়োরিগতভাবে যা অন্ততঃ স্মৃতিশক্তির পরীক্ষায় মূল্যবান বলে বিবেচিত হতে পারে।”

শেষ বাক্যে প্রথম বাক্যের মুখস্ত করার যুক্তির বিপক্ষে একটি সুষ্ঠু মনস্তত্ত্ব সম্মত আবেদন লক্ষ্য করেছি। তার থেকে মনে হয় যে বাস্তবকে জানা ছাড়া আর কোন ক্ষেত্রে মুখস্ত করা উচিত নয়। তা মেনে নিয়ে আমরা অনুচ্ছেদটির অন্যন্য বক্তব্যসমূহের দিকে নজর দিচ্ছি।

প্রথমতঃ কোন কিছু উচ্চারণ করতে পারা সম্বন্ধে কিছুই বলা হয়নি। অনেকে শেক্সপিয়র এবং মিলটন উচ্চারণ করতে পারতেন না। আবার মেরি করেলি এবং আলফ্রেড অস্টেন উচ্চারণ করতে পারতেন। অশিক্ষিত আর শিক্ষিতের মধ্যে সহজে ভেদ রেখা টানা যায় মতো আংশিকভাবে হামবড়ামী, আংশিক নিখুঁত পোশাক পরে দলে বৈশিষ্ট্য অর্জন এবং অংশত প্রাকৃতিক আইনের অনুরাগীরা ব্যক্তির স্বাধীনতার আওতার মধ্যে অন্ততঃপক্ষে আনুষ্ঠানিকভাবে উচ্চারণ করার জন্য হয়, তাহলে সব সময়ে পাঠকদেরকে উদ্দেশ্যের প্রতি সজাগ রাখা সম্ভবপর।

দ্বিতীয়তঃ চীনা ছাড়া অন্য সকল লিখিত ভাষা কথা বলার ভাষার প্রতিনিধিত্ব করে, যার মধ্যে ভাষার যাবতীয় সৌন্দর্য-তত্ত্ব নিহিত, যে যুগে মানুষ অনুভব করল যে ভাষাকে সুন্দর করা যায় এবং ভাষা সুন্দর হওয়া উচিত; তখন থেকেই তারা উচ্চারণ করতে সাবধানী এবং লিখতে অসাবধানী হয়ে উঠলো। আজকের দিনে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রেরাও সাধারণ শব্দ ছাড়া অন্যান্য শব্দ উচ্চারণ করতে পারে না। সে জন্য তারা অনেক কবিতার অর্থ হৃদয়ঙ্গম করতে পারে না। বিশ্ববিদ্যালয়ের সাহিত্যের পেশাগত ছাত্র ছাড়া আজকের আমেরিকায় চল্লিশ বছরের নিচে এমন একজন মানুষও খুঁজে পাওয়া যাবে না যে শব্দ ক’টির অর্থ বের করতে পারে।

Scattering unbeholden
Its aerial hue.
ছড়িয়ে আছে না দেখা তার
বায়বীয় রঙ

শিক্ষার মধ্যে যদি সৌন্দর্যতত্ত্ব সম্বন্ধীয় কোন প্রচেষ্টা গ্রহণ করা উচিত বলে বিবেচনা করা হয়, তাহলে শিশুদের উচ্চারণ শেখানোর চাইতে উচ্চস্বরে আবৃত্তি শিক্ষা করতে দেয়া উচিত। আগে উচ্চস্বরে বাইবেল আবৃত্তি করা হতো যা সে উদ্দেশ্য সাধন করত, বর্তমানে তার প্রচলন একেবারে নেই বললেই চলে।

উচ্চারণ করতে জানাই শুধু প্রয়োজন নয়। সৌন্দর্যতত্বের জন্য অপর্যাপ্ত শব্দসম্ভার থাকাও উচিত। যারা পনেরশ শব্দ শুধু ব্যবহার করতে জানে তারা কখনো নিজেদের সংক্ষিপ্ত অথবা সুন্দরভাবে সহজ সরল বিষয় ছাড়া প্রকাশ করতে পারবে

এবং তাও অনেক সময় কপাল গুণে। আজকের আমেরিকার অর্ধেক জনসাধারণ শেক্সপিয়র যত সময় স্কুলে কাটিয়েছেন, তত সময় ব্যয় করেন, কিন্তু তাদের শব্দসম্ভার শেক্সপিয়রের দশভাগের একভাগও নয়। তা সত্বেও তাকে সেম যুগের সাধারণ মানুষ বুঝতে পেরেছিল, কেননা তা তার নাটকসমূহের বাণিজ্যিক সফলতা লাভের প্রয়োজন ছিল। আধুনিক মতামত হলো যে মানুষ নিজেকে ভাষার মধ্যে অপরকে বোঝাতে পারার এত প্রকাশ করতে পারে, ভাষার ওপর তার যথেষ্ট অধিকার আছে বলে স্বীকার করা হয়। পুরনো মতামত ছিল, কথা এবং লেখায় সৌন্দর্য এবং আনন্দ দেয়া তার উচিত।

আধুনিক লেখকের মতো যে বাস্তব বিষয় বর্ণনার ব্যাপারে ছাড়া অন্যান্য বিষয় বর্ণনার ক্ষেত্রে অনুমিত নৈতিকতা এবং সৌন্দর্য তত্ত্বকে বর্জন করে আচরণকে গ্রহণ করেছে তার সম্বন্ধে কোন সিদ্ধান্তে আসা যায়? ড. ওয়াটসনের প্রতি আমার প্রগাঢ় শ্রদ্ধাবোধ রয়েছে এবং তার বইগুলো অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। আমার বিবেচনায় পদার্থবিজ্ঞান হলো থিয়োরিটিক্যাল বিদ্যার মধ্যে সবচেয়ে প্রয়োজনীয় এবং শিল্পায়ন ব্যবস্থা হলো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সমাজতান্ত্রিক লক্ষণ। তাই বলে আমি অকেজো জ্ঞান এবং শিল্পকলা, যেগুলো শুধুই আনন্দ বিতরণ করে, তার প্রশংসা করা থেকে বিরত থাকতে পারিনে। সমস্যাটা যুক্তিভিত্তিক নয়, যেহেতু আমরা দেখেছি। আচরণবাদ সত্য হলে অপ্রধানভাবে কোন একটা নির্দিষ্ট কাজের সমাপ্তির কারণে কী পদ্ধতি অবলম্বন করা উচিত তা দেখিয়ে দেয়া ছাড়া মূল্যবোধের প্রশ্নে আচরণবাদের কোনও প্রভাব নেই। ব্যাপক অর্থে এটা হলো রাজনৈতিক প্রশ্ন, যেহেতু এটা ধরে নেয়া যেতে পারে যে অধিকাংশ মানুষ ভুল করতে বাধ্য, সে ক্ষেত্রে অসত্য বিষয় থেকে সত্য সিদ্ধান্ত টানা ভালো? এ জাতীয় কোন প্রশ্নের সমাধান সম্ভব নয়। এর ন্যায়শাস্ত্র শিক্ষা দেয়া উচিত, যাতে করে তারা যেন-তেন বক্তব্য থেকে উপসংহার টানতে বিরত থাকে। উদাহরণস্বরূপ যখন বলা হয় যে ফরাসিরা যুক্তিবাদী, তারা তখন সামগ্রিকভাবে একজন মানুষের যুক্তি বহির্ভূত সূক্ষতা যা ভুলবশতঃ আসল বক্তব্য থেকে উদ্ভূত হয়েছে তাও হিসেবের মধ্যে গণ্য করে। তাহলো একটি সর্বশ্রেষ্ঠ অনভিপ্রেত গুণ, তা থেকে সার্বিকভাবে ইংরেজি ভাষাভাষী জাতিগুলো অন্যান্যের তুলনায় অধিকতর স্বাধীন ছিল। কিন্তু তার অনেকগুলো লক্ষণ রয়েছে যে তারা যদি এ বিষয়ে স্বাধীন থাকতে চায় তাহলে তাদের পক্ষে অতীতের চাইতে অধিকতর দর্শন এবং ন্যায়শাস্ত্রর প্রয়োজন রয়েছে। আগে ন্যায়শাস্ত্রকে অনুমান করার পদ্ধতি বলে বিবেচিত করা হতো।

কিন্তু এখন ন্যায়শাস্ত্র অনুমান করা থেকে বিরত হওয়ার পদ্ধতিতে পরিণত হয়েছে; যেহেতু এটা দেখা গেছে যে, যে সকল অনুমানের প্রতি আমরা স্বভাবতইঃ অনুরক্ত সেগুলো ধোপে টিকার মতো নয়। সুতরাং উপসংহারে আমি বলতে চাই যে, স্কুলে এমনভাবে ন্যায়শাস্ত্র শিক্ষা দেয়া উচিত, যাতে করে মানুষকে অনুমান না করতে শিক্ষা দেয়া হয়, যদি তারা অনুমান করে, তাহলে তারা ভুল অনুমান করবে।

০৮. সুখের আদর্শ ও প্রাচ্য-প্রতীচ্য

ওয়েলস এর ‘টাইম মেশিন’ এর কথা সকলেই জানে-যার সাহায্যে ঐ যন্ত্রের অধিকারী ইচ্ছে করলে সময়ের সামনে পিছে ভ্রমণ করে অতীত ভবিষ্যত সম্পর্কে ওয়াকেবহাল হতে পারে। বর্তমান পৃথিবীতে ভ্রমণ করেও ওয়েলস সাহেবের উদ্ভাবিত যে যান্ত্রিক পদ্ধতি তার অনেকগুলো সুফল ভোগ করা যায়, একথা মানুষ সকল সময় হৃদয়ঙ্গম করতে পারে না। একজন ইউরোপিয় নিউইয়র্কে গিয়ে অর্থনৈতিক বিপত্তি এড়িয়ে গেলে ইউরোপের যে সম্ভাব্য পরিণতি তা দেখতে পাবেন। এশিয়াতে গেলে তিনি ইউরোপের অতিভ্রান্ত অতীতকেই দেখতে পাবেন। আমাকে বলা হয়েছে ভারতে তিনি প্রাচীন যুগ এবং চীন দেশে অষ্টাদশ শতাব্দীর দেখা পাবেন। জর্জ ওয়াশিংটন যদি আবার পৃথিবীতে ফিরে আসেন তাহলে তার সৃষ্ট দেশটি তাকে এক্কেবারে হতবুদ্ধি বানিয়ে দেবে। ইংল্যাণ্ডকে দেখে তিনি অপেক্ষাকৃত কম আশ্চর্যান্বিত হবেন, ফ্রান্সকে দেখে আরো কম। চীনে না-পৌঁছা পর্যন্ত তিনি পরিপূর্ণ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে পারবেন না। একমাত্র চীনেই তার প্রেতাত্মা যে সব মানুষের দেখা পাবে যারা জীবন, স্বাধীনতা এবং সুখের আদর্শে এখনো বিশ্বাসী। আমেরিকানরা স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় যে সকল আদর্শ আকড়ে ধরেছিল, চীনারাও সে আদর্শসমূহকে আকড়ে ধরে আছে। আমার ধারণা চীনা প্রজাতন্ত্রের প্রেসিডেন্ট তিনি না হওয়া পর্যন্ত চীনারা সে অধিকার অর্জন করতে পারবে না।

পশ্চিমা সভ্যতাকে উত্তর-দক্ষিণ আমেরিকা, রাশিয়াসহ ইউরোপ এবং বৃটিশ শায়ত্ত্বশাসিত অঞ্চলগুলো বরণ করে নিয়েছে। এ ব্যাপারে আমেরিকার যুক্তরাষ্ট্র কাফেলার পুরোভাগে রয়েছে। প্রাচ্য ও প্রতীচ্যের মধ্যে যত রকমের পার্থক্য, তার সবগুলো আমেরিকাতেই সর্বাপেক্ষা সুস্পষ্ট এবং চূড়ান্তভাবে বিকশিত হয়েছে। আমরা কোনরকমের সন্দেহ ব্যতিরেকে স্বতঃসিদ্ধ হিসেবে প্রগতিকে মেনে নিয়েছি, আরো মেনে নিয়েছি গত একশ বছরের মধ্যে যেসকল পরিবর্তন হয়েছে, ভালোর জন্যই হয়েছে, অধিকতর অনির্দিষ্ট পরিবর্তন অবশ্যই অধিকতর সুফল প্রসব করবে। গত প্রথম মহাযুদ্ধ এবং মহাযুদ্ধের আনুষঙ্গিক ফলাফল ইউরোপ মহাদেশের মানুষের এ নির্ভরশীল বিশ্বাসে প্রচণ্ডতর আঘাত করেছে। সম্প্রতি ইউরোপের মানুষ ১৯১৪ সনের পূর্ববর্তী বছরগুলোতে ইতিহাসে পরবর্তী শতাব্দী ধরে পূনরায় ফিরে পাওয়া অসম্ভব জ্ঞান করে স্বর্ণযুগ হিসেবে ভাবতে আরম্ভ করেছে। ইংল্যান্ডে আশাবাদীতা ভয়ংকরভাবে মার খায়নি। আমেরিকাতে আঁচড়ও লাগেনি। আমাদের মধ্যে যারা প্রগতিকে স্বতঃসিদ্ধ বলে ভাবতে অভ্যস্ত তাদের উচিত বিশেষ করে চীনের মতো একটি দেশে ভ্রমণ করা, যারা আমাদের থেকে তুলনামূলকভাবে একশ পঞ্চাশ বছর পিছিয়ে আছে। তাদের দেখে বিচার করা, যে সকল পরিবর্তন আমাদের দেশে ঘটেছে তাতে করে পৃথিবীর সত্যিকার কোন উন্নতি সাধিত হয়েছে কিনা।

সকলেই জানে কনফুসিয়াসের শিক্ষার উপর চীনা সভ্যতার বুনিয়াদ প্রতিষ্ঠিত। তিনি যিশুখ্রিস্টের জন্মের পাঁচ হাজার বছর আগে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। গ্রিক রোমানরা যেমন ভাবতো মানব-সমাজ স্বভাবতঃই প্রগতিশীল তিনি তা ভাবতেন না। পক্ষান্তরে তার ধারণা সুদূর অতীতে শাসনকর্তারা ছিলেন জ্ঞানী এবং মানুষ এমন এক পর্যায়ের সুখী ছিল যা শ্রদ্ধাহীন বর্তমানকে প্রসংশা করলেও সে সুখ ভোগ করতে সমর্থ হবে না। আসলে এটা এক প্রকারের মোহ। কিন্তু এর প্রত্যক্ষ ফল হলো দূর অতীতের অন্যান্য শিক্ষকের মতো কনফুসিয়াসও সব সময় নতুন সাফল্যের পানে ধাবিত না হয়ে নৈতিকতার উৎকর্ষের উপর একটি স্থায়ী সমাজ গঠন করতে চেয়েছিলেন। এতে তিনি অন্যান্যের চেয়ে অধিক সাফল্য লাভ করেছেন। তার ব্যক্তিত্ব চীন সভ্যতার উপর এমনভাবে ছাপ মেরেছে যা তার কাল থেকে আমাদের কাল পর্যন্ত প্রসারিত সময়ে অটুটভাবে সংরক্ষিত আছে। তার জীবদ্দশায়, চীনারা বর্তমান চীনের সামান্য ভূখণ্ড মাত্র দখল করেছিলেন এবং কয়েকটা বিবদমান রাষ্ট্রের মধ্যে তা বিভক্ত ছিল। পরবর্তী তিনশ বছরের মধ্যে বর্তমান চীনের সবটুকু তারা দখল করে নিলো এবং আয়তন বিস্তৃতির দিক দিয়ে এমন এক বিশাল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠা করল গত পঞ্চাশ বছর বাদ দিলে বাদবাকি সময়ের মধ্যে তার কোন জুড়ি ছিল না। বর্বর জাতির আক্রমণ, মোঙ্গল এবং মানচু সাম্রাজ্যের মধ্যে ক্ষণস্থায়ী এবং দীর্ঘস্থায়ী বিরোধ ও গৃহযুদ্ধ সত্ত্বেও কনফুসিয় শিল্পকলা এবং সাহিত্য সমৃদ্ধ দ্র জীবন যাপন পদ্ধতি অক্ষতভাবেই বর্তমান ছিল। একমাত্র আমাদের কালে পশ্চিমা এবং পশ্চিমাদের অনুকারক জাপানিদের সঙ্গে সংঘর্ষের ফলে এ জীবন যাপন ব্যবস্থায় ভাঙন ধরতে আরম্ভ করেছে।

যে জীবন যাপন পদ্ধতি এত দীর্ঘকাল ধরে টিকে থাকবার অসম্ভব শক্তি রয়েছে তার মধ্যে অবশ্যই এমন কোন উৎকর্ষ আছে যা আমাদের শ্রদ্ধা এবং সুবিবেচনার দাবি রাখে। ধর্ম বলতে আক্ষরিক অর্থে যা বুঝি কনফুসিয়াসের শিক্ষা সঠিক অর্থে তা নয়। যেহেতু এর সঙ্গে অতিলৌকিক অথবা কোন মরমি বিশ্বাস সম্পর্কশীল নয়। এ হচ্ছে খাঁটি নৈতিক একটা পদ্ধতি। কিন্তু এর নীতিমালা খ্রিস্টান ধর্মের অস্পষ্ট নীতিমালার মতো সাধারণ লোকের পক্ষে মেনে চলা মোটেই অসম্ভব নয়। সূক্ষ অর্থে। বলতে হলে কনফুসিয়াস যা শিক্ষা দিয়েছেন তা অষ্টাদশ শতাব্দীর সেকেলে মনোভাবসম্পন্ন ভদ্রলোকের আদর্শের এত অনেকটা। তার একটা বক্তব্যের মধ্যে এর প্রমাণ পাওয়া যাবে। আমি লায়নেল গিলস (Lionel giles) এর কনফুসিয়াসের বাণী থেকে উদ্ধৃত করছি। “সত্যিকারের ভদ্রলোক কখনো কলহপরায়ন হতে পারে না। একমাত্র বন্দুক ছোঁড়ার প্রতিযোগিতা ছাড়া আর কোথাও বিবাদ বিসম্বাদ ঘটতে পারে না। সেখানেও তিনি স্থান বেছে দাঁড়াবার পূর্ব প্রতিদ্বন্দ্বীকে অভিবাদন করেন যাতে তিনি, প্রতিযোগিতার সময়েও সত্যিকারের ভদ্রলোক থাকতে পারেন।”

নৈতিক শিক্ষকের পক্ষে যা অবশ্য করণীয়, তিনি কর্তব্য নীতি এবং ধর্ম সম্পর্কে প্রচুর বলেছেন। কিন্তু মানুষের বিরুদ্ধেও স্বাভাবিক স্নেহ প্রদর্শনের বিপক্ষে কোন কিছুর সীমারেখা নির্দেশ করে দেননি। নিম্নোক্ত কথোপকথনের মধ্যে তার যথাযথ প্রমাণ পাওয়া যাবে।

শিল্প অঞ্চলের সামন্ত কনফুসিয়াসকে সম্বোধন করে বললেন, আমাদের দেশে একজন সাহসী মানুষ আছেন। তার বাবা একটি ভেড়া চুরি করেছিলেন, তিনি বিরুদ্ধে সাক্ষ্য প্রদান করেন। কনফুসিয়াস বললেন, আমাদের দেশের সাহসিকতার ধরন ভিন্নতর। পিতা পুত্রের দোষ ঢেকে রাখে এবং পুত্র পিতার গোপনীয়তা রক্ষা করে। এ-ধরনের আচরণের মধ্যেই সত্যিকারের সাহসিকতার সন্ধান মিলবে।

কনফুসিয়াস ছিলেন সব ব্যাপারে, এমনকি নীতির দিক দিয়েও সহনশীল। খারাপ ব্যবহারের বদলে আমাদের ভালো ব্যবহার দেখানো উচিত, একথা তিনি বিশ্বাস করতেন না। তাকে এক সময় প্রশ্ন করা হয়েছিল, “খারাপ ব্যবহারের বদলে ভালো ব্যবহার প্রদর্শনের নীতি সম্পর্কে আপনার কী অভিমত”? তিনি জবাবে বলেছিলেন, “তাহলে ভালো ব্যবহারের বদলে কী রকম ব্যবহার করা হবে? বরঞ্চ তোমরা অবিচারের বদলে সুবিচার এবং ভালোর বদলে ভালো ব্যবহার করবে।” তার সময়ে তাওপন্থিরা মন্দের বদলে সুবিচার এবং ভালো ব্যবহার এবং প্রদর্শনের শিক্ষা প্রচার করতেন যা কনফুসিয়াসের শিক্ষার চেয়ে খ্রিস্টধর্মের সঙ্গে অধিকতর সাদৃশ্যাত্মক। তাওবাদের প্রতিষ্ঠাতা লাওসে (অনুমান করা হয়ে থাকে তিনি কনফুসিয়াসের সমসাময়িক ছিলেন) বলেন, “আমি ভালো ব্যবহার করবো, যারা ভালো নয় তাদের সঙ্গেও আমি ভালো ব্যবহার করব, যেন আমি তাদেরকেও ভালো করতে পারি। অবিশ্বাসীদের সঙ্গেও আমি বিশ্বাস রক্ষা করব, যেন আমি তাদের বিশ্বাসী করতে তুলতে পারি। যদি একজন মানুষ খারাপও হয়ে থাকে তাকে পরিত্যাগ করা কি এমন ভালো কাজ। আঘাত পেলে হাসিমুখে সহ্য করব।” লাওসের কিছু কথা আশ্চর্যভাবে পর্বত থেকে প্রদত্ত বক্তৃতার এত। যেমন তিনি বলেছেন,”যে ব্যক্তি বিনয়কে রক্ষা করে, সে অক্ষতভাবে রক্ষিত হবে। যে (শ্রদ্ধায়) নুয়ে পড়তে জানে তাকে সোজা করা হবে। যে খালি আছে তাকে ভর্তি করা হবে। যার অল্প আছে সে সফলতা অর্জন করবে এবং যার বেশি আছে সে কুপথে গমন করবে।”

চীনের বৈশিষ্ট্য অনুসারে লাওসে নয়, কনফুসিয় চীনের জাতীয় ঋষি বলে স্বীকৃতি অর্জন করেছেন। যাদুমন্ত্র হিসাবে অশিক্ষিত মানুষদের মধ্যে তাওবাদ স্থায়িত্ব লাভ করেছিল। তার নীতিসমূহ সাম্রাজ্য শাসনকারী বস্তুতান্ত্রিক রাজপুরুষদের কাছে কাল্পনিক বলে প্রতিভাত হয়েছিল। পক্ষান্তরে কনফুসিয়াসের নীতিগুলো বিবাদ বিসংবাদ এড়িয়ে যাবার এত অধিকতর নির্ধারিত এবং স্থিরিকৃত ছিল। লাওসে নিষ্ক্রিয়তার নীতিকেই প্রচার করেছেন। তিনি বলেছেন, “ঘটনাপ্রবাহের সুযোগ গ্রহণ করে যারা সাম্রাজ্য দখল করে তারা সব সময়ে সাম্রাজ্য রক্ষার জন্য নিজেদের অসমর্থন করে। কিন্তু চীনের রাজপুরুষবৃন্দ স্বভাবতঃই কনফুসিয়াসের আত্মনিয়ন্ত্রণ, উপচিকীর্ষা এবং সে সঙ্গে ভদ্রতার মিশ্রিত নীতির অনুসরণে কল্যাণধর্মী সরকার যে ভালো কাজ করতে পারে তার উপর সর্বাধিক গুরুত্ব প্রয়োগ করতেন।

শ্বেতাঙ্গ জাতিসমূহের ন্যায় চীনা জাতি কখনো থিয়োরিতে এক নীতি ব্যবহারিক জীবনে আরেক নীতিকে গ্রহণ করেনি। আমি এ কথার মানে এ বলতে চাই না যে তারা সবসময়ে থিয়োরি অনুসারে জীবন ধারণ করেছে। তা না-হলেও তাদের লক্ষ্য ছিল সে দিকে, থিয়োরিকে বাস্তবায়িত করার চেষ্টা তারা করে থাকে। অন্যদিকে দেখতে গেলে খ্রিস্টিয় নীতিশাস্ত্রের অধিক সংখ্যক নীতিই এ মন্দ জগতের জন্য অত্যন্ত উপকারী বলে সর্বজনীন স্বীকৃতি লাভ করেছে।

মোদ্দা কথায় আমাদের মধ্যে পাশাপাশি দু’রকমের নীতিবোধ বর্তমান। একরকম হলো, যা আমরা প্রচার করি কিন্তু পালন করি না। অন্যটি আমরা দৈনন্দিন জীবনে মেনে চলি কিন্তু কদাচিৎ প্রচার করি। খ্রিষ্টধর্ম ও ধর্ম ছাড়া অন্যান্য এশীয় ধর্মের মতো ব্যক্তিস্বাতন্ত্রবোধ এবং পারলৌকিক বিষয়ে প্রথম দিকের শতাব্দীগুলোকে তারা সর্বাধিক গুরুত্ব দান করত। অন্য জগতের প্রতি গুরুত্ব দান করাই হলো এশীয় মরমীদের বৈশিষ্ট্য। এ দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে বাধ্যবাধকতার মূলনীতি বুদ্ধি গ্রাহ্যতা অর্জন করেছিল। কিন্তু খ্রিস্টান ধর্ম যখন ইউরোপের অত্যুৎসাহী রাজপুরুষদের আনুষ্ঠানিক ধর্ম হিসেবে বর্ধিত হলো, তখন তারা এর কতকগুলো নীতি আক্ষরিক অর্থে বর্জন করার প্রয়োজনিয়তা অনুভব করল, পক্ষান্তরে অন্য কতেক নীতি যেমন ‘সিজারের প্রাপ্য সিজারকে দাও’ ইত্যাদি ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে। আমাদের প্রতিযোগীতামূলক শিল্পায়নের যুগে বাধা না দেয়ার সামান্যতম আবেদনকেও ঘৃণা করা হয় এবং মানুষকে জীবিকা বিজয়ে সমর্থ বলে ধরে নেয়া যায়। বাস্তবে আমাদের কার্যকরী নৈতিকতাবোধ হলো সংগ্রাম করে যে পরিমাণ বাস্তব সাফল্য অর্জন করা যায় তারই নিরিখে ব্যক্তিবিশেষ এবং জাতিবিশেষের পরিচয়। এর বাইরে কোমল কিছু থাকলে তা আমাদের কাছে। বোকামি বলে মনে হয়।

চীনারা আমাদের থিয়োরিগত অথবা ব্যবহারিক কোন নৈতিকতাকে গ্রহণ করেনি। চীনারা থিয়োরিগতভাবে বিশ্বাস করে যে এমনও সময় আসে যখন যুদ্ধ করা যুক্তিযুক্ত, কিন্তু বাস্তবে সে সময় আসে কদাচিৎ। আর আমরা থিয়োরিতে বিশ্বাস করি, কোন অবস্থাতেই যুদ্ধ করা যুক্তিযুক্ত নয়, কিন্তু বাস্তবে প্রায়ই যুদ্ধে লিপ্ত থাকি। চীনারা মাঝে মাঝে যুদ্ধ করে, তবে যুদ্ধা জাতি তারা নয়, যুদ্ধে জয়লাভ অথবা ব্যবসায়ে সফলতাকে খুব প্রশংসার চোখে তারা দেখে না। ঐতিহ্যগতভাবে জ্ঞানকে তারা সব কিছুর চেয়ে বেশি প্রশংসা করে। তারপরে প্রায়শঃ এর সঙ্গে সঙ্গে তারা নাগরিকতা এবং ভদ্রতাকে প্রশংসার চোখে দেখে। যুগযুগ আগে চীনদেশে শাসনবিভাগীয় পদগুলো প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার ফলাফলের উপর নির্ভর করেই প্রদান করা হতো। দু’হাজার বছর ধরে চীনদেশে একমাত্র কনফুসিয়াসের পরিবার, যার প্রধান ছিল একজন সামন্ত তিনি ব্যতীত আর কোন বংশগত আভিজাত্যের রেওয়াজ ছিল না। সামন্ততান্ত্রিক ইউরোপে ক্ষমতাবান সামন্তদেরকে যেরকম শ্রদ্ধা সম্মান দেখানো হতো, চীনদেশ জ্ঞানবানদের একই রকম শ্রদ্ধা সম্মান নিজস্ব পদ্ধতিতে নিবেদন করত। প্রাচীন জ্ঞান যার পরিধি খুবই সীমিত শুধুমাত্র অসমালোচিত চীনের ধর্মীয় জ্ঞান এবং স্বীকৃতি প্রাপ্ত ভাষ্যকারদের টীকা-ভাষ্যের মধ্যেই সীমবিদ্ধ ছিল। পাশ্চাত্যের সংস্পর্শে এসে ভূগোল, অর্থনীতি, প্রাণীবিদ্যা, রসায়নবিদ্যা শিক্ষা করছে চীনারা, যা বিগত যুগের নীতি শিক্ষার চেয়ে বাস্তব প্রয়োজন মিটাতে অনেক বেশি সক্ষম। নতুন চীনা-তার মানে যারা ইউরোপিয় পদ্ধতিতে শিক্ষা দীক্ষা পেয়েছে, আধুনিক প্রয়োজনের সম্পর্কে সবিশেষ ওয়াকেবহাল বোধ হয়। তাদের প্রচীন ঐতিহ্যের প্রতি তেমন বিশেষ শ্রদ্ধাবোধ নেই। তারপরেও কিছু বাদ দিলে অত্যাধুনিকেরাও সহনশীলতা, ভদ্রতা এবং মেজাজের স্নিগ্ধতা রক্ষা করে চলছে। পাশ্চাত্য এবং জাপানিরা তাদের যে হারে প্রভাবিত করেছে, তাতে করে এ বৈশিষ্টগুলোও আগামী কয়েক দশক পর্যন্ত অক্ষত অটুট রাখতে পারবে কিনা সন্দেহ। চীনা এবং আমাদের মধ্যে যে পার্থক্য তা যদি একটি মাত্র বাক্যের মধ্যে আমাকে বলতে হয়, তাহলে আমি বলবো, তারা প্রধানতঃ আনন্দের প্রতি আগ্রহশীল আর আমরা মুখ্যতঃ ক্ষমতার প্রতি লালায়িত। আমরা আমাদের সমধর্মীমানুষের উপর ক্ষমতা বিস্তার করতে চাই, ক্ষমতাবলে প্রকৃতিকে দাস করতে চাই। মানুষের উপর ক্ষমতার শাসন চালু রাখার জন্যে আমরা বিজ্ঞানকে উন্নত করেছি। এসব ব্যবহারে চীনারা ভয়ঙ্কর অলস, এবং অত্যধিক খোসমেজাজী। রাশিয়ানরা যে অর্থে অলস চীনারা সে অর্থে অলস নয়। তারা জীবন ধারণের জন্য কঠোর পরিশ্রম করে। শ্রমিক মালিকদের চোখে তারা কঠোর পরিশ্রমী। আমেরিকান কিংবা পশ্চিম ইউরোপের লোকেরা যে অর্থে পরিশ্রমী তারা সে অর্থে পরিশ্রমী নয়। কাজ না করলে মেজাজের প্রফুল্লতা হারিয়ে ফেলবে বলেই তারা কাজ করে, অনাবশ্যক তাড়াহুড়া পছন্দ করে না। জীবন ধারণ করার মতো অপর্যাপ্ত ব্যবস্থা তাদের থাকলে তারা তার উপর নির্ভর করে। সঞ্চয়ের জন্য তারা কঠোর পরিশ্রম করে না। অবসর সময়ে চিত্তবিনোদনের জন্য তাদের অবিশ্বাস্য ক্ষমতা রয়েছে। থিয়েটারে গিয়ে, চা খেতে খেতে গল্প-গুজব করে, প্রাচীন চীনা শিল্পকলার প্রশংসা করে অথবা সুন্দর সুন্দর দৃশ্যাবলীর উপর দিয়ে পায়চারী করতে করতে তারা সময় কাটায়। আমদের চিন্তাধারা অনুসারে জীবনকে এভাবে খরচ করার মধ্যে একরকমের অহেতুক নিশ্চেষ্ট শিষ্টতার সন্ধান পাওয়া যাবে। যে লোক প্রত্যেকদিন ঠিক সময়ে তার অফিসে যায়, সেখানে যা করে সব ক্ষতিকর হলেও আমরা তাকে শ্রদ্ধান্বিত দৃষ্টিতে দেখে থাকি।

প্রাচ্যদেশে বাস করলে সাদা মানুষদের চরিত্র বোধহয় প্রাচ্যের ক্ষতিকর প্রভাবে প্রভাবিত হয়। কিন্তু চীন সম্বন্ধে জানার পর আমি অবশ্যই বলব যে, অলসতা মানুষের শ্রেষ্ঠতম গুণসমূহের একটি, যা মানুষকে সমষ্টিগত জীবনে অভ্যস্ত করে তোলে। আমরা অত্যুৎসাহী হয়ে কিছু অর্জন করতে পারি, কিন্তু প্রশ্ন করা যেতে পারে-যা আমরা অর্জন করি তা সত্যিকারের কোন মূল্য বহন করে কিনা। আমরা উৎপাদনব্যবস্থার অত্যাশ্চর্য পরিবর্তন সাধন করেছি যার অংশবিশেষ জাহাজ, মোটরগাড়ি টেলিফোন এবং সৌখিনভাবে বেঁচে থাকার বিভিন্ন উপায় উদ্ভাবন করেছি। আমাদের নিখুঁত উৎপাদনব্যবস্থার অপরাপর হুনুর হেকমত আমরা বন্দুক, বিষাক্ত গ্যাস, উড়োজাহাজ এবং পরস্পরকে পাইকারি হারে হত্যার অভিপ্রায়ে নিয়োজিত করেছি। আমাদের প্রথম শ্রেণীর শাসনব্যবস্থা এবং ট্যাক্স আদায়ের ব্যবস্থা রয়েছে, যার অংশবিশেষ শিক্ষা, স্বাস্থ্যরক্ষা প্রভৃতি হিতকর কাজে ব্যয়িত হয়, কিন্তু বাকিটুকু যুদ্ধের জন্য ব্যয় করা হয়। বর্তমান ইংল্যাণ্ডের জাতীয় রাজস্বের বেশীর ভাগ যুদ্ধের ঘাটতি পূরণের অথবা ভাবী যুদ্ধের সম্ভাবনায় ব্যয়িত হয়। তাছাড়া বাদবাকি যা থাকে তাই জনহিতকর কাজে ব্যয় করা হয়। মহাদেশের অধিকাংশ দেশে লোকহিতকর কাজে ব্যয়িত অর্থের অনুপাত অনেক ক্ষেত্রে ইংল্যাণ্ডের চেয়েও কম। আমাদের পুলিশব্যবস্থার যোগ্যতার তুলনা নেই কোথাও। তার অংশবিশেষ অপরাধ অনুসন্ধান এবং অপরাধ বন্ধ করার কাজে তৎপর; বাকি অংশ কারো কোন নতুন গঠনমূলক রাজনৈতিক আদর্শ থাকলে তাকে কারারুদ্ধ করার কাজে নিয়োজিত। সাম্প্রতিক কাল ছাড়া চীনদেশে এসবের কিছুই ছিলনা। তাদের কারখানা তাদের জন্য মোটর গাড়ি এবং বোমা তৈরি করতে পারত না রাষ্ট্র নিজস্ব নাগরিককে পরদেশের নাগরিক হত্যার জন্য শিক্ষিত করে তুলতে অক্ষম ছিল। তাদের পুলিশে বলশেভিক অথবা ডাকাত পাকরাও করার কাজে সম্পূর্ণরূপে অযোগ্য ছিল! এর ফল হলো চীনদেশে শ্বেতাঙ্গ মানুষের দেশসমূহের তুলনায় ঢের বেশি স্বাধীনতা ভোগ করত এবং অল্প সংখ্যক মানুষ ছাড়া প্রায় দারিদ্র লাঞ্ছিত মানুষও একধরনের পরিব্যাপ্ত সুখের আস্বাদ পেত।

গড়পড়তা চীনাদেশের সঙ্গে গড়পড়তা পশ্চিমাদের আসল দৃষ্টিভঙ্গীর মধ্যে দু’জাতীয় উল্লেখ্য পার্থক্য বর্তমান। প্রথমতঃ চীনারা কোন লোকহিতকর উদ্দেশ্য সাধিত না হওয়া পর্যন্ত কোন কাজকে প্রশংসা করেনা। দ্বিতীয়তঃ তারা মনে করে নিজস্ব প্রবৃত্তি দমন করা এবং অন্যের ব্যাপারে নাক গলানোর মধ্যে নৈতিকতার মৌল পরিচয় নিহিত নয়। এ দু’রকমের পার্থক্যের মধ্যে প্রথমটা প্রসঙ্গে আলোচনা করা হয়েছে দ্বিতীয় পার্থক্যটা সম্পর্কে আলোচনা করাটাও সমানভাবে প্রয়োজনীয়। খ্যাতনামা চীনা পণ্ডিত অধ্যাপক গাইলস তার কনফুসিয়াস এবং তার বিরুদ্ধবাদীদের উপর গিফোর্ড বক্তৃতার উপসংহারে বলেছেন, আদি পাপের নীতিই (The doctrine of original sin) চিনদেশে খ্রিস্টান প্রচারক মণ্ডলীর প্রধান প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়িয়েছিল। দূর প্রাচ্যে এখনো গোড়া প্রচারকেরা প্রচার করে তাকে যে আমরা সকলে পাপী হিসেবে জন্ম গ্রহণ করেছি, যে পাপের কারণে আমাদেরকে চিরন্তন শাস্তি ভোগের অধিকারী হতে হবে। যদি শ্বেতাঙ্গ মানুষদের জন্যও এ নীতি কার্যকরী হতো তাহলে সম্ভবতঃ চীনাদের খ্রিস্ট ধর্ম গ্রহণে কোন আপত্তি থাকত না। কিন্তু যখন তাদেরকে বলা হয় তাদের পিতামাতা এবং প্রপিতামহেরা দোজখের আগুনে জ্বলছে। তখন তারা ক্ষিপ্ত না হয়ে পারে না। কনফুসিয়াস শিক্ষা দিয়েছেন মানুষ পবিত্র হিসেবে জন্ম গ্রহণ করে। একমাত্র খারাপ দৃষ্টান্তের শক্তি অথবা দুর্নীতিপূর্ণ ব্যবহার তাদেরকে কুপথে নিয়ে যায়। পাশ্চাত্যের ঐতিহ্যিক গোঁড়ামির সঙ্গে এ-পার্থক্য চীনাদের দৃষ্টিভঙ্গিকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে।

আমাদের মধ্যে যাদেরকে নৈতিকতার উজ্জ্বল নিদর্শন বলে গণ্য করা হয়, তারা জীবনের ছোটোখাটো আনন্দ ভুলে গিয়ে অন্যের আনন্দ নিয়ে অধিকতর মাথা ঘামান। আমাদের মধ্যে গুণ সম্পর্কে যে ক্রিয়াশীল ধারণা রয়েছে তা হলো কোন মানুষ যদি নিজেকে খুব বেশি সংখ্যক মানুষের ক্ষতির কারণ না হতে পারে, তাহলে তাকে আমরা খুব বেশি ভালো মানুষ বলে স্বীকৃতি দেইনা। পাপের ধারণা থেকে আমাদের মধ্যে এ মনোভাবের উদয় হয়েছে। তার ফলে শুধু অন্যের স্বধীনতার উপর হস্তক্ষেপ করতে হয় না, কপটতার আশ্রয় গ্রহণ করতে হয়, যেহেতু চিরাচরিত পদ্ধতিতে জীবনধারণ করা অধিকাংশলোকের পক্ষে অসম্ভব। চীনের ব্যাপারে কিন্তু আলাদা। নৈতিক ধারণাগুলো না-বাচক নয়, হাঁ বাচক। সেখানে এটা আশা করা হয়ে থাকে যে একজন মানুষ তার মা বাপের প্রতি শ্রদ্ধাশীল, সন্তান সন্তুতির প্রতি স্নেহশীল, দরিদ্র প্রতিবেশীর প্রতি দয়ার্দ্র এবং সকলের প্রতি দ্র হবে। এ সকল খুব কষ্টকর কর্তব্য নয়, আসলে বেশি কর্যকরী।

আদিপাপের বোধ না থাকার আরেকটা সুফল হলো মানুষেরা তাদের বিভিন্নতা যুক্তির আলোকে যাচিয়ে নিতে অধিকতর আগ্রহশীল হয়ে উঠতে পারে প্রতীচ্যের তুলনায়। আমাদের মধ্যে মতের বিভিন্নতা খুব শিগগির নীতির প্রশ্ন হয়ে দেখা দেয়। পরস্পর পরস্পরকে দোষী সাব্যস্ত করে আমাদের মধ্যে তিক্ত সম্পর্কের সৃষ্টি হয় যার বাস্তব সমাধান খুঁজতে হলে শক্তি প্রয়োগ ছাড়া আর কোন খোলা পথ থাকেনা। চীনে যদিও অতীতে সামরিক নায়ক ছিল কিন্তু তাদের কেউ অত সাংঘাতিক মনে করত না এমনকি তাদের নিজস্ব সৈনিকরাও না। তারা যুদ্ধ করত, কিন্তু সে সব যুদ্ধে বলতে গেলে একেবারে রক্তপাত হতো না। পাশ্চাত্যের কঠোর শক্তির সংঘাতের যে অভিজ্ঞতা আমাদের আছে সে তুলনায় তারা অল্পস্বল্প ক্ষতি করত। সৈন্যাধ্যক্ষের অবর্তমানেও অধিকাংশ নাগরিক বেসামরিক পদ্ধতিতে আপন আপন কাজকর্ম চালিয়ে যেত। সাধারণতঃ ঝগড়া বিবাদ তৃতীয় ব্যক্তির বন্ধুত্বপূর্ণ সালিশের মাধ্যমে নিস্পন্ন করা যেত। আপোষে মিটমাট করা ছিল চীনের নির্ধারিত নীতি, যদিও বিদেশীর হাসি উদ্রেক করে, তবু এ এমন একটা পদ্ধতি যা সামাজিক এবং রাষ্ট্রীয় জীবনে আমাদের এত ভাঙন সৃষ্টি করেনা।

চীনা জীবন যাপন পদ্ধতির গুরুতর দোষ হলো একটি; তা চীনাকে কলহপরায়ণ জাতিগুলোর বিরুদ্ধে বাধা দেবার মতো শক্তিশালী করেনি। সমগ্র পৃথিবী চীন দেশের মতো হলে আরো সুখময় হতে পারত। যে পর্যন্ত অন্যান্য জাতিসমূহ যুদ্ধপ্রিয় এবং উৎসাহী থাকবে সে পর্যন্ত চীনদেশ যা এখন আর বিচ্ছিন্ন নয়, তাদের জাতীয় স্বাধীনতা অটুট রাখতে চাইলে আমাদের কিছু দোষের অনুকরণ করতে হবে। এ অনুকরণ যে উন্নতি তা ভেবে আমাদের আত্মপ্রসাদ লাভ করা একদম অনুচিত।

০৯. ভালো মানুষদের কথা

একশ বছর আগে জেরেমি বেনথাম নামে একজন দার্শনিক সর্বসাধারণের কাছে মন্দলোক হিসেবে পরিচিত ছিলেন। ছোটবেলা যেদিন সে নামটির সঙ্গে আমার সর্বপ্রথম পরিচয় হয় সেদিনটির কথা এখনো আমার খেয়াল আছে। রেভারেণ্ড সিডনি স্মিথ বলেছিলেন। বেনথামের মতে মৃতা মাতামহীর মাংস দিয়ে স্যুপ তৈরি করা উচিত। নীতিগতভাবে এ ধরণের ব্যঞ্জন তৈরি করার কাজকে তখন আমার কাছে রীতিমতো বিগর্হিত ঠেকেছিল। সুতরাং আমার মনেও বেনথাম সম্পর্কে খারাপ ধারণা বদ্ধমূল হলো। এর অনেক পরে আমি আবিষ্কার করলাম, যেভাবে প্রচলিত পদ্ধতি অনুসারে শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিরা সতোর সুফল ভোগ করার জন্যে যে ধরণের বেপরোয়া মন্তব্য করে থাকে, উক্ত মন্তব্যটিও ছিল সেরকমের একটি। তার বিরুদ্ধে সাংঘাতিক অভিযোগের কারণও আমি অনুধাবন করতে সমর্থ হলাম। তাহলে তার প্রদত্ত সংজ্ঞা সেখানে তিনি বলেছেন, সেই-ই ভালো মানুষ যে ভালো কাজ করে। সৎ পাঠকের মনে সংজ্ঞাটা পড়ার সঙ্গে সঙ্গে যে ধারণা জন্মাবে তা সকল রকমের বিশুদ্ধ নৈতিকতার পরিপন্থী। যেখানে কান্ট বলেছেন, শুধুমাত্র উপকৃত জনের প্রতি স্নেহাধিক্যবশত কৃতকর্মসমূহ ধর্মীয় আখ্যা পেতে পারেনা, সেখানে তিনি কিরকম অভিভূত। কিন্তু নৈতিক নিয়মের প্রেরণায় কৃতকর্মসমূহ অপ্রিয় হলেও ধর্মীয়। এও আমরা সকলে জানি যে, ধর্মই ধর্মের শেষ পুরস্কার: কিন্তু গভীরভাবে অনুসন্ধান করলে তেমনি এটাও স্পষ্ট হয়ে ওঠে, যেমন একজন রোগী নিজেই নিজের শাস্তি ভোগের কারণ। সুতরাং কান্ট বেনথামের চেয়ে আরো একজন বিনম্র চিন্তাবিদ এবং তিনি তাদেরই কল্যাণ কামনা করেন যারা ধর্মকে ধর্মের কারণেই ভালোবাসেন।

বেনথাম ভালো মানুষের পুরোপুরি সংজ্ঞায়ন করে প্রভূত কল্যাণ করেছেন। উনবিংশ শতাব্দীর মধ্যবর্তী চল্লিশটি বছর বাস্তব বুদ্ধিবৃত্তিক এবং নীতির দিক দিয়ে অবিশ্বাস্য রকমে উন্নততর যুগ। এই সময়েই হয়েছিল সংস্কার আইন, যার ফলে পার্লামেন্ট সদস্যপদের আসন অধিকার করল মধ্যবিত্ত সম্প্রদায়, পূর্বের মতো অভিজাত শ্রেণী নয়। এই আইনটি ছিল ইংল্যাণ্ডে গণতন্ত্রের প্রবর্তন করার পদক্ষেপসমূহের মধ্যে সবচেয়ে বিপজ্জনক এবং এরই সঙ্গে সঙ্গে উল্লেখযোগ্য সংস্কারও সাধিত হলো! যেমন উদাহরণ স্বরূপ বলা যেতে পারে জ্যামেইকার দাস বৃত্তির অবসান। এ সময়ে ছাৈটখাট চুরির অপরাধেও মানুষকে ফাঁসিকাষ্ঠে ঝুলানো হতো, কিন্তু অতি অল্প সময়ের মধ্যে মৃত্যুদণ্ডকে শুধু খুন অথবা অনুরূপ অপরাধের ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ করা হলো। যে শস্য-আইনের ফলে খাদ্যবস্তু দুর্মূল্য হয়ে গেল এবং দুর্ভিক্ষ ভয়াবহ আকার ধারণ করল, ১৮৪৬ সালে তা রহিত করা হলো। ১৮৭০ সালে বাধ্যতামূলক শিক্ষাব্যবস্থা প্রবর্তিত হলো। ভিক্টোরিয় যুগের নিন্দা করা এখন প্রায় ফ্যাশনে দাঁড়িয়েছে; কিন্তু আমার ধারণা সে যুগের মহৎ গুণাবলীর যে প্রমাণ আমরা পেয়ে থাকি, আমাদের যুগে তার অর্ধেকও বিরল। সে যা হোক, তার আলোচনা এখানে অপ্রাসঙ্গিক কিন্তু আমার যা বলবার বিষয়, তাহলো ঐ বছরগুলোতে যে উন্নতি সাধিত হয়েছিল তার অধিকাংশ অবশ্যই বেনথামের প্রভাবে হয়েছিল। এ ব্যাপারে কোনও সন্দেহ নেই যে শতাব্দীর শেষভাগে ইংল্যাণ্ডের জনসাধারণ যে রকম সুখ-সন্তষ্ট দিন যাপন করত তেমনটি আর কখনো ছিল না। বেনথামের দর্শন এত অগভীর ছিল যে, সে অগভীরতাকে তিনি তার সাফল্য জ্ঞান করতেন। আমাদের আলোকিত যুগে অনায়াসে বলে দিতে পারি যে, ও জাতীয় মতবাদ কিংবা ধারণা অবিশ্বাস্য এবং অযৌক্তিক হলেও বেনথামের মত আমাদের উপযোগবাদ পরিহার করার ক্ষেত্রে আবিষ্কার করতে সাহায্য করবে।

ভালোমানুষ বলতে কি বোঝায় তা আমরা সকলেই জানি। আদর্শ ভালোমানুষ মদ খান না, ধুমপান করেন না, খারাপ বাক্য পরিহার করেন, ভদ্রলোকের সঙ্গে এমন সংযতভাবে আলাপচারী করেন যেন সেখানে ভদ্র মহিলা আছেন। নিয়মিত গির্জায় যান এবং সব বিষয়ে সঠিক ধারণা রাখেন। অন্যায় করার ব্যাপারে তার হৃদয়ে প্রবল ভীতি বিরাজিত এবং তিনিও জানেন যে, পাপ বাঁচিয়ে জীবন ধারণ করা হলো আমাদের বেদনার্ত কর্তব্য, তার পরেও পাপের ব্যাপারে তার আতঙ্কিত মনোভাব থেকে যায়। মধ্যবয়স্ক নাগরিকেরা যে সকল মতামত অবলম্বন করে সাফল্যের স্বর্ণশিখরে আরোহণ করেছেন, যখন তাদের জ্ঞানের পরিপক্কতা সম্বন্ধে প্রশ্ন করে বসেন কেউ তাদের অজ্ঞতা থেকে তরুণদেরকে রক্ষা করাকে নিজেদের পবিত্র কর্তব্য বলে মনে করেন। পেশাগত কঠোর পরিশ্রম ছাড়াও ভালো লোকেরা ভালো কাজে প্রচুর সময় ব্যয় করেন। যেমন তিনি দেশকে সামরিক শিক্ষায় শিক্ষিত করে তোলার উৎসাহ দিতে পারেন, কারখানার উন্নতি বিধান করতে পারেন। কারখানার মজুর এবং তাদের সন্তান-সন্ততিদের মধ্যে সহনশীলতা এবং ধর্মের বাণী প্রচার করতে পারেন, যাতে তারা আসল পথ থেকে বিচ্যুত হয়ে শাস্তি ভোগের কারণ না হয়। অথবা তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রাস্টি হয়ে বিপরীত আদর্শের অধ্যাপক নিযুক্ত করে জ্ঞানের উদ্দেশ্য প্রণোদিত পক্ষপাতমূলক শ্রদ্ধার নিরসন করতে পারেন, সর্বপরি তার নৈতিকতা সংকীর্ণ হলেও অবশ্যই অক্ষত থাকা চাই।

উল্লিখিত অর্থে একজন ভালো লোক একজন মন্দ লোকের তুলনায় অধিকতর ভালো করতে পারে কিনা, সে ব্যাপারে সন্দেহের অবকাশ রয়েছে। আমি মন্দ বলতে যা বুঝি তা এতক্ষণ যা বলে আসছি তার বিপরীত। একজন মন্দ লোক মদ খায়, ধুমপান করে, তার কাজে ব্যাঘাত ঘটালে মন্দ কথাও উচ্চারণ করে এবং তার কথোপকথন সবসময় ছাপার অক্ষরে প্রকাশিত হবার উপযুক্ত নয়। রোববারে গির্জায় যাওয়ার পরিবর্তে অন্য কোথাও গিয়ে সে বেশ মজা করে কাটায়। তার কতকগুলো মতামত খুবই মারাত্মক। যেমন, ধরুন, সে মনে করে, আপনি যদি শান্তি কামনা করেন তাহলে আপনাকে শান্তির প্রস্তুতি নিতে হবে, যুদ্ধের নয়। মন্দকাজ করার ব্যাপারে সে বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করে যেমন সে করে, থাকে তার মোটর গাড়ির কলকজা বিগড়ে গেল তার যুক্তি হলো খোতবা এবং কারাগার ফাটা টায়ার মেরামত করার চেয়ে পাপের বিশেষ কিছু করতে পারে না। মন্দ চিন্তা করার ব্যাপারেও সে অধিকতর বিকৃত রুচির পরিচয় দিয়ে থাকে। তার মতে মানুষ স্বাভাবিকভাবে যে সব চিন্তা করে তাকে বলা হয় মন্দ চিন্তা। আর যেগুলোকে সৎ চিন্তা বলা হয়ে থাকে, তা তোতা পাখির মতো এক বুলিকে বারবার আওড়ানো ছাড়া আর কিছু নয়। এরই ফলে কতকগুলো অনভিপ্রেত বদ্ধমূল ধারণার প্রতি সহানুভূতি আকর্ষিত হয়। তার কাজের সময়ের বাইরের কার্যাবলী তার কাছে খুবই উপভোগ্য হতে পারে অথবা ক্ষমতাসীন গোষ্ঠীর গায়ে আঁচড় লাগেনা এমন কতকগুলো প্রতিকারসাপেক্ষ অপরাধের আধিক্যবশতঃ চরম অসন্তেষের মধ্যে জীবন কাটায়। আবার এটাও খুব সম্ভব যে, একজন ধার্মিক যেমন করতে পারে তেমনিভাবে সে নৈতিক বিচ্যুতিগুলো গোপন করে উঠতে পারে না। বরঞ্চ বিকৃত মানসিকতার উপর নির্ভর করে কিছু দৃষ্টান্ত স্থাপন করার চাইতে সৎ হওয়াটাকে অনেক বেশি ভালো মনে করেন। একজন লোক যখন এক বিশেষ কোন অথবা কতকগুলো দিকে কৃতকার্যতা অর্জন করতে ব্যর্থ হয়, তখন সম্মানীয় নাগরিকেরা তাকে জজ ম্যাজিষ্ট্রেট, ইত্যাদি পদ এমনকি মাস্টারের চাকুরি পর্যন্ত অধিকার করতে দেয় না। এসকল পদ শুধুমাত্র ভালো মানুষের জন্যই অবারিত।

এ সকল ব্যাপার কমবেশি আধুনিক। অনুরূপ ব্যবস্থা ক্রমওয়েলের সময়ে পিউরিটানদের অল্পসময় কালীন রাজত্বকালে ইংল্যাণ্ডে স্বল্পকালের জন্য বিদ্যমান ছিল এবং পরে তাদের দ্বারা ঐগুলো আমেরিকাতে প্রবর্তিত হয়। ফরাসি বিপ্লবের পরে যখন জেকোবিনবাদের বিরোধিতা (Jacobinism) করা আজকের যুগের বলশেভিকদের বিরোধিতা করার মতো ভালো কাজ বিবেচিত হতো, তখন সারা ইংল্যাণ্ডে এর পুনরাবির্ভাব হয়নি। ওয়ার্ডসওয়ার্থের জীবনে এ পরিবর্তনকে সুস্পষ্টভাবে প্রত্যক্ষ করা যায়। যৌবনে তিনি ফরাসি বিপ্লবকে সমর্থন করে ফরাসিদের চলে গেলেন, কন্যা সন্তাটিকে পরিত্যাগ করলেন, সুনীতি অনুসরণ করে জীবন অতিবাহিত করতে থাকেন এবং খারাপ কবিতা লিখতে থাকেন। কোলরিজের জীবনেও অনুরূপ পরিবর্তন ঘটে, যখন তিনি খারাপ ছিলেন তখন ‘কুবলা খান কবিতা লিখেন, পরে ভালো হয়ে লিখলেন ধর্মতত্ত্ব।

ভালো থাকার সময় ভালো কবিতা লিখছেন, এমন দৃষ্টান্ত কোন কবির জীবনে খুঁজে পাওয়া একরূপ অসম্ভব। রাষ্ট্রবিরোধী প্রচারণার দায়ে দান্তেকে নির্বাসনে যেতে হয়েছিল। শেক্সপিয়রকে তার সনেট দ্বারা বিচার করা হলে আমেরিকার স্বরাষ্ট্রবিভাগের কর্মচারীরা সেগুলোকে নিউইয়র্ক শহরে ঢুকবার অনুমতি দিতো না। ভালোমানুষের আসল পরিচয় হলো তিনি সরকারকে সমর্থন করেন। সুতরাং ক্রমওয়েলের সময়ে মিলটন ভালো মানুষ ছিলেন, তার আগে কিংবা পরে নয়, কিন্তু এই পূর্ববর্তী এবং পরবর্তী সময়েই তিনি অধিকাংশ কবিতা রচনা করেছেন। প্রকৃত প্রস্তাবে তার তখনই অধিকাংশ কবিতা লিখিত হয়েছে যখন তিনি রাষ্ট্রদ্রোহিতার অপরাধে ফাসী থেকে অল্পের জন্য রেহাই পান। কবি ডান সেন্টপলের ডিন হওয়ার পরে ধার্মিক হয়ে যান, কিন্তু তার অধিকাংশ লেখা হয় তার আগে। সে সকল কবিতা লিখেছেন বলে তার নিয়োগকে কেন্দ্র করে প্রচুর কেলেংকারীর সৃষ্ট হয়েছিল। যৌবনে সুইনবার্নও ছিলেন মন্দ লোক, তখনই তিনি স্বাধীনতার জন্য যারা সংগ্রাম করে, তাদের উদ্দেশ্যে’ দ্য সংস বিফোর সানরাইজ (The songs before) সূর্য উঠার আগের গান লিখেছিলেন। বুড়ো বয়সে তিনি ধার্মিক হয়ে গিয়েছিলেন এবং তখনই তিনি বোয়ারদের উপর বর্বরোচিত আক্রমনের প্রতিবাদের কলম ধরেছিলেন এবং তাদের স্বাধীনতার উপর হস্তক্ষেপের নিন্দা করেছিলেন। আর দৃষ্টান্ত বাড়িয়ে কোন লাভ নেই। ভালো সম্বন্ধে যে ধারণার মানের কথা সমাজে প্রচলিত রয়েছে তা যে ভালো কবিতা জন্ম দিতে পারেনা, সে সম্বন্ধে অনেক কিছুই বলা হয়েছে।

অন্যদিক দিয়ে দেখতে গেলেও ব্যাপারটা সত্যি। আমরা সকলে জানি যে ডারউইন এবং গ্যালিলিও উভয়ে মন্দ লোক ছিলেন। মৃত্যুর পর একশ বছর অতীত না হওয়া পর্যন্ত স্পিনোজাকেও মন্দ লোক ভাবা হতো। নির্যাতনের ভয়ে দেকার্তে বিদেশ চলে যান। রেনেসাঁ যুগের সকল শিল্পী ছিলেন খারাপ লোক। সাধারণভাবে বলতে গেলে, যারা দমন করা যায় এমন সব দোষের বিরোধিতা করতেন তাদেরকেই মন্দ লোক ভাবা হতো। আমি লণ্ডনের এমন এক অংশে বাস করি যার অংশবিশেষ ধনী এবং অংশবিশেষ দরিদ্র। শিশু মৃত্যুর হার অস্বাভাবিক ভাবে বেশি এবং ধনীরা দুর্নীতি এবং জোরের মাধ্যমে স্থানীয় সরকারকে (Local Government) নিয়ন্ত্রণ করে। তারা শিশুকল্যাণ এবং জনস্বাস্থ্যের খাতে ব্যয় কমিয়ে দেবার জন্যে ক্ষমতা ব্যবহার করে। একজন চিকিৎসককে কম দামেই এ শর্তে নিয়োগ করা হয়েছে যে তিনি শুধু অর্ধেক সময়ের জন্য রোগীদের দেখবেন। গরীবের ছেলের জীবনের চাইতে ধনীদের জন্য ভালো ডিনারকে অধিক গুরুত্বপূর্ণ মনে না করলে কেউ স্থানীয় প্রভাবশালী লোকদের শ্রদ্ধাভাজন হতে পারে না। একই ব্যাপার আমার পরিচিত পৃথিবীর সর্বত্রই সত্য। এ থেকে আমরা ভালো লোকের গুণাগুণ কি তা অতি সহজে বুঝতে পারি, ভালো লোক হলেন তিনি যার মতামত এবং কার্যাবলী সরকারের কাছে প্রিয়।

অতীতের যে সকল খারাপ মানুষ দুর্ভাগ্যবশত প্রসিদ্ধি লাভ করেছেন, তাদের সহ্য করা ভয়ঙ্করভাবে বেদনাদায়ক। সুতরাং ভালো লোকদের ভালো ধ্যান-ধারণার দিকে নজর দেয়া যাক।

স্বভাবতই তৃতীয় জর্জ ছিলেন একজন ধার্মিক ব্যক্তি। পিট যখন তাকে দিয়ে ক্যাথেলিকদের মুক্তি ঘোষণা করাতে চেষ্টা করলেন। (তখন ক্যাথোলিকদের ভোটের অধিকার ছিলনা) তখন এ অজুহাতে তার সঙ্গে একমত হননি যে তা করলে তিনি রাজ্যাভিষেকের সময় যে শপথ করেছেন তা ভঙ্গ করবেন। ন্যায়ত তিনি তাদের মুক্তি ঘোষণার দ্বারা ভালো হবে, এ যুক্তি দ্বারা পরিচালিত হতে চাননি! তা ভালো হবে কিনা তার চাইতে তা ন্যায় কিনা এই বিমূর্ত প্রশ্নই তাকে আলোড়িত করেছিল বেশি। প্রধানতঃ রাজত্বের জন্যই তাকে রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করতে হয়েছিল, যে কারণে আমেরিকা স্বাধীনতার দাবি করতে লাগলো। কিন্তু তার হস্তক্ষেপ সবসময় সর্বোচ্চ লক্ষ্যের দ্বারা পরিচালিত হয়েছিল। ভূতপূর্ব কাইজার সম্বন্ধেও একই কথা বলা যায়, তিনি ছিলেন খাঁটি ধার্মিক, পতনের পূর্বমুহূর্ত পর্যন্ত ভগবান তার পক্ষে ছিলেন। এবং (আমি যতটুকু জানি) ব্যক্তিগত কোন পাপ থেকে তিনি সম্পূর্ণ রূপে মুক্ত ছিলেন না। তা সত্ত্বেও আমাদের যুগে এমন একজন মানুষ খুঁজে পাওয়া যাবে না, যিনি মানুষের এত বেশি দুর্ভাগ্যের কারণ হয়েছেন।

রাজনৈতিকদের মধ্যে ভালো লোকের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে, যাতে করে নামের ধুম্রজালের আড়ালে অন্যেরা তাদের কাজ নিঃসন্দেহে চালিয়ে যেতে পারে। একজন ভালো লোক তার বন্ধুদেরকে নোংড়া কাজের জন্য কখনো সন্দেহ করে না এবং এটাই হচ্ছে তার ভালোত্বের একটা অংশ। জনসাধারণ কখনো ভালো লোকের কার্যকলাপের অন্তরালে যে খারাপ মানুষের খারাপ কাজ থাকতে পারে তা কখনো সন্দেহ করেনা, এটাই হলো ভালো মানুষের প্রয়োজনীয় যোগ্যতা। এটা সুস্পষ্ট যে এ সকল গুণের সমন্বয়ের ফলে জনসাধারণের কাছে প্রিয় বিবেচিত হন এবং ধনী হতে ইচ্ছুক ব্যক্তিদের তুলনায় তাদের কাছে জনসাধারণের তহবিল গচ্ছিত রাখা উপযুক্ত মনে করেন। যদিও আমি কোনক্রমে মেনে নিতে পারছিনে, তবু আমাকে বলা হয়েছে, খুব বেশি দিনের ইতিহাস নয়, আমেরিকাতে একজন প্রেসিডেন্ট ছিলেন, যিনি এ উদ্দেশ্য সাধন করেছিলেন। ইংল্যাণ্ডের হুইটটেকার (Whittaker) যখন তার যশের মধ্যগগনে অবস্থান করছিলেন, তখন তিনি অকলঙ্ক ওমরাহগণ কর্তৃক পরিবেষ্টিত হয়েছিলেন, তার ধার্মিকতার কারণে তারা তার অঙ্কজ্ঞানের সঙ্গে পরিচিত লাভ করতে পারেনি অথবা পরিচয় থাকলেও তার অঙ্ক সম্পর্কে উচ্চবাচ্য কিছুই করেননি।

ভালো মানুষদের আরেকটা ব্যবহারযোগ্যতা হলো কাদা ঘাটাঘাটির কারণে অনভিপ্রেত ভদ্রলোকদেরকে রাজনীতির বাইরে রাখা যায়। শতকরা নিরানব্বই জন মানুষ নৈতিক আইন ভঙ্গ করে, কিন্তু সাধারণ্যে প্রকাশ পায়না। নিরানব্বই জনের বেলায় যখন তা প্রকাশ পায় কোন ব্যক্তির সম্বন্ধে, একশর মধ্যে যে একজন মানুষ নির্দোষ তিনি প্রচণ্ড রাগে ফেটে পড়েন এবং অন্যান্য আটানব্বই জন নিজ নিজ অপরাধ প্রকাশ পাবার ভয়ে তার অনুসরণ করে। যখন কোন জঘণ্য মতামতের মানুষ রাজনীতিতে অংশ গ্রহণ করেন, তখন যারা আমাদের প্রাচীন মতামতে মনে প্রাণে বিশ্বাসী তাদেরকে তার ব্যক্তিগত জীবনের কার্যাবলীর প্রতি এমনভাবে নজর রেখে অপেক্ষা করতে হবে যে পর্যন্ত না তারা এমন কিছু আবিষ্কার করতে পারে যা প্রকাশ পেলে তার রাজনৈতিক জীবন ধ্বংসপ্রাপ্ত হবে। তারপরে তাদের জন্য তিনটি পথ খোলা রয়েছে। তার ব্যক্তিগত জীবনের জঘণ্য কার্যাবলী প্রকাশ করে দিয়ে তাকে বিস্মৃতির অতলে ডুবিয়ে দেয়া অথবা প্রকাশ করার ভয় দেখিয়ে তাকে অবসর গ্রহণ করতে বাধ্য করা অথবা তাকে ব্ল্যাকমেইল করে প্রচুর অর্থোপার্জন করা-এ তিনটির যে কোন একটি পথ সে অনুসরণ করতে পারে। এ তিনটির মধ্যে প্রথম দু’টি জনসাধারণকে রক্ষা করে এবং তৃতীয়টি যারা জনসাধারণকে রক্ষা করে তাদেরকে রক্ষা করে থাকে। সুতরাং এই তিনটি পথের কথা বলা যায় এবং ভালো মানুষদের দ্বারা ত্রয়ীপন্থানুসারে ইস্পিত ফল লাভ সম্ভব হয়।

আবার বিবেচনা করে দেখতে গেলে এ সকল ব্যাপার হলো যৌন-রোগের মতো, পূর্বাহ্নে উপযুক্ত নিরোধক ব্যবহার করলে সমূলে ধ্বংশ হয়ে যায়, কিন্তু ভালো লোকদের জন্য এই জ্ঞান খুব অল্পই বিতরণ করা যায় এবং তার সাফল্যের পথে সব রকমের বাধা-বিপত্তির সৃষ্টি করা হয়েছে। বাইবেলের ধারণা অনুসারে পাপ এখনো তার প্রকৃতিক দণ্ড ভোগ করে থাকে। পিতামাতার পাপের কারণে সন্তানকে কষ্ট দেয়া হয়। এরকম না হয়ে অন্যরকম হলে কি ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করত। যদি পাপীকে শাস্তি দেয়ার ব্যবস্থা না থাকতো তাহলে মানুষ পাপ বলে কিছু নেই মনে করত এবং যদি নির্দোষেরা শাস্তি ভোগ না করত তা হলে তা ভয়ঙ্কর হতো না। সুতরাং সে ভালো মানুষদের প্রতি যারা বৈজ্ঞানিকদের ধর্মবহির্ভূত জ্ঞানকে অস্বীকার করে এখনও তারা প্রাকৃতিক আইনের প্রতি আত্মসমর্পনের নামে অজ্ঞানতাকে চালু রাখতে চান, আমাদের কি রূপ কৃতজ্ঞ থাকা উচিত। সৎ চিন্তাকারী ব্যক্তি মাত্রই জানে যে কষ্ট দেয়া অথবা না দেয়ার সঙ্গে খারাপ কাজের কোন সংযোগ নেই। যেহেতু সব মানুষকে বিশুদ্ধ নৈতিক আইনানুসারে পরিচালিত করা যায় না বলে এ সিদ্ধান্তে আসা যায় যে দুঃখের আগুনে পাপকে শুদ্ধ করে পূণ্য অর্জন করতে হয়। প্রাক বৈজ্ঞানিক যুগে যেভাবে পাপাত্মক কাজের শাস্তি বিধান করা হতো ঠিক সেভাবে এখনো করা হয় এবং মানুষ যাতে এড়িয়ে যেত না পারে সেজন্য তাদেরকে অজ্ঞানতার অন্ধকারে রাখার প্রয়োজন হয়ে পড়ে। আমাদের ভালো মানুষেরা মেহেরবানী করে যে বিপদজনক জ্ঞান আমাদের মধ্যে বিতরণ করেন, তা থেকে আত্মরক্ষা করে মানবিক এবং শারীরিক স্বাস্থ্য বজায় রাখার জন্য কি পরিমাণ জ্ঞান আবশ্যক তা ভাবতেও আমি কেঁপে উঠি।

আরেক উপায়ে ভালো লোকেরা কাজে আসতে পারে, তাহলে খুন হয়ে। দু’জন যাজক খুন হওয়ার সুবাদে জার্মানি চীনের কাছ থেকে সানতুং প্রদেশ কেড়ে নিয়েছিল। সারাজেভোতে যে আর্কডিউক নিহত হয়েছিলেন, আমার বিশ্বাস তিনিও ছিলেন ভালো মানুষ, তার প্রতি আমরা অসীম কৃতজ্ঞ। তিনি মারা না-গেলে যুদ্ধ লাগত না, যুদ্ধ না-লাগলে জঙ্গীবাদকে কখনো সরানো যেত না; তাহলে একদিকে গণতন্ত্রকে যেমনি নিরাপদ করা যেতনা তেমনি অন্য দিক দিয়ে ইটালি, স্পেন, বুলগেরিয়া, রাশিয়া এবং হাঙ্গেরিতে সামরিক কর্তৃত্বও প্রতিষ্ঠিত হতো না।

প্রকৃত প্রস্তাবে, সাধারণত জনমত যে ধরণের ভালোত্বের মান নির্ধারণ করেছে তা পৃথিবীকে অধিকতর সুখকর বাসস্থান হিসেবে গড়ে তোলার এত সুপরিকল্পিত মানবিক গুণাবলী নয়। এর সর্বপ্রধান কারণ হলো ঐতিহ্য এবং দ্বিতীয় প্রধান কারণ হলো পবিত্রতা এবং বিধি-নিষেধের নিরিখেই আদিম নৈতিকতার উৎকর্ষ ঘটেছে। বলতে গেলে আগে যা ছিল কুসংস্কার, তাতে কতক নিরাপদ কাজকেও নিষিদ্ধ ঘোষনা করা হয়েছে। যেমন সর্দারের থালা হতে খাওয়ার পেছনে তাদের কাল্পনিক বিশ্বাসের ভিত্তি ছিল, তা করলে যাদুর প্রভাবে প্রচণ্ড বিপদ ঘটতে পারে। এভাবে তাদের মধ্যে নিষেধগুলো শিকড় গেড়ে বসলো। তারা কাল্পনিক বিশ্বাসের কথা কালক্রমে ভুললো বটে কিন্তু ওগুলো তাদের চেতনায় অস্পষ্ট স্বাক্ষর রেখে গেলো। প্রচলিত নৈতিকতার অনেকগুলিই এ জাতীয়। বিশেষ বিশেষ আচরণ, কার্যকলাপ অথবা উক্ত কার্যকলাপের ফলশ্রুতি মানুষের মধ্যে উদ্দাম আবেগের সঞ্চার করে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এই আরেগজনিত উদ্দাম ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এটা যদি না হয়ে থাকে, নৈতিক মানদণ্ডকে পুখানুপুঙ্খভাবে বিচার করা হলে তা জনসাধারণের স্বীকৃতি আদায় করতে সমর্থ হবে।

উদাহরণস্বরূপ বলতে গেলে সভ্য সমাজে কখনো খুনকে বরদাশত করা হয় না, তা সত্ত্বেও খুন নিষিদ্ধ ঘোষণার মর্মমূলে রয়েছে কুসংস্কার। এই বিশ্বাস তখন প্রবল ছিল যে খুনী ব্যক্তির রক্ত অথবা প্রেতাত্মা প্রতিশোধের নেশায় শুধু ঘাতককে নয়, তার প্রতি যারা করুণা প্রদর্শন করে তাদেরকেও শাস্তি দিতে পারে। খুন নিষিদ্ধ করার মূলেও যে ছিল কতক কুসংস্কারমূলক অন্ধ অনুপ্রেরণা কতক বাস্তব বিষয়ে নজর দিলে তা স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে। যেমন কতকগুলো গোত্রগত উৎসবের মাধ্যমে ঘাতককে ছদ্মবেশ পরালে বা নিহত ব্যক্তির প্রেতাত্মা না চিনতে পারে মতো রক্ত ধুয়ে দেয়া হতো। স্যার জে, জি ফ্রেজার তার থিয়োরিতে অন্তত এটুকু বলেছেন। রক্তের দাগ মুছে ফেলার জন্য প্রাচীনকালে যে অনুষ্ঠান করা হতো তাকে আমরা রূপক হিসেবে অনুতাপ এবং পাপ ধৌত করার প্রতীক হিসেবে এখনও গ্রহণ করে থাকি। এবং অপরাধ বোধের অন্তরালে রয়েছে অতীতের পূঞ্জীভূত কুসংস্কার। এমনকি একটা খুনের ব্যাপারেও বিবেক বুদ্ধি সম্পন্ন নৈতিকতা ভিন্নতর মতামত দিয়ে থাকে যা অপরাধ, শাস্তি এবং প্রায়শ্চিত্তের চাইতে আরোগ্য এবং প্রতিকারের সঙ্গে অধিকতর সম্পর্কশীল।

আমাদের বর্তমান নৈতিকতা কুসংস্কার এবং বিচার-বুদ্ধির সমাহারে সৃষ্ট। খুন করা হলো একটি প্রাচীন অপরাধ যা আমরা যুগান্তরের সঞ্চিত কুসংস্কারের ধুম্রজালের মধ্য দিয়ে অবলোকন করে থাকি। আমরা জুয়াচোরদেরকে শাস্তি দিয়ে থাকি বটে কিন্তু খুনীদের এত তাদের আলাদা করে রাখি না। থিয়োরিতে আমরা যাই বলি না কেন, এখনো আমাদের কাজকর্ম সামাজিক রীতিনীতির নিরিখেই করে থাকি। আমাদের ধর্ম আমরা যা করি তার চেয়ে আমরা যা করিনা তার মধ্যেই বহুলাংশে নিহিত। একজন মানুষ অন্য একজন মানুষের কোন উপকার না করেও পাপ বলে কথিত এক শ্রেণীর কাজ করা থেকে বিরত থেকেও ভালোমানুষ আখ্যা পেতে পারে; কিন্তু তা হলেও খ্রিস্টের প্রচলিত বাণী, প্রতিবেশীকেও নিজের এত ভালোবাসো এ ধারণাতে সে সত্যেরই সমর্থন মেলে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় সমগ্র খ্রিস্টান বিশ্বে যিনি এ ধারণা মেনে চলেন তার উপর চালানো হয় সবচেয়ে বেশি নির্যাতন। তাকেই দারিদ্রের আগুনে জ্বলতে হয় বেশি, সময়ে, অসময়ে কারাবরণ এমন কি মৃত্যুদণ্ড বরণ করতে হয়।

পৃথিবীটা অবিচার পরিপূর্ণ, যারা এ অবিচারের দ্বারা লাভবান হয় তাদের হাতেই পুরস্কার এবং শাস্তি দেয়ার ক্ষমতা সংরক্ষিত। যারা এ অসাম্য এবং অবিচারকে চালু রাখার উপায় উদ্ভাবন করে তাদের ভাগ্যে জোটে শিরোপা এবং যারা প্রতিকার করতে আসে তাদেরকে সইতে হয় কঠোরতম নির্যাতন। আমি এমন একটা দেশও জানিনে যে দেশের মানুষ কুটিলতা পরিহার করে দীর্ঘকালের জন্য প্রতিবেশীদের সঙ্গে সদ্ভাব রক্ষা করেছে। যুদ্ধ শুরু হওয়ার অব্যবহিত পূর্বে ফরাসি দেশের শ্রেষ্ঠ নাগরিক জ্যা জ্বরসকে হত্যা করা হয় এবং হত্যাকারী জনসাধারণের জন্য কি একটা কাজ করেছে এ সুবাদে তাকে হত্যার দায় হতে অব্যাহতি দেয়া হয়। এ জাতীয় ঘটনা পৃথিবীর সব জায়গায় অহরহ ঘটছে।

যারা ঐতিহ্যাশ্রয়ী নৈতিকতার স্বপক্ষে তারাও মাঝে মাঝে বলেন যে তা সম্পূর্ণ নিখুঁত নয়, কিন্তু তারাই আবার কোনোও সমালোচনা উঠলে নৈতিকতার ভিত্তিভূমি রসাতলে গেল বলে হায় হায় করেন। প্রত্যক্ষ এবং গঠনমূলক আলোচনা হলেও তাতে কিছু হবেনা যদি ক্ষণিকের আনন্দের উল্লম্ফনে হয়ে থাকে। আমরা এখন বেথামে ফিরে আসি, যিনি সর্বাধিক সংখ্যক মানুষের জন্য যে সুউচ্চ নৈতিকতার প্রয়োজন তার জীবন যে মানুষ প্রচলিত অর্থে জীবন ধারণ করে তার চেয়ে ঢের বেশি পরিশ্রমের। স্বভাবতঃই তিনি বঞ্চিত এবং হতাশার দলের সর্বাগ্রগণ্য হবেন এবং মহত বৃহৎদের কোপদৃষ্টিতে পতিত হবেন। শাসকেরা যেসব ঘটনা গোপন করতে চায় তিনি সে সব তারস্বরে জানিয়ে দেন। তার সহানুভূতি যাদের কাম্য তাদেরকে দূরে সরানো মিথ্যাচার থেকে তিনি স্বভাবতঃই বিরত থাকেন। এ জাতীয় জীবন ধারার আসল নৈতিকতা কখনো ধ্বংশপ্রাপ্ত হবে না। শাসক সম্প্রদায় নৈতিক দিক দিয়ে সব সময়ে অত্যাচারী এবং বিয়োগাত্মক হয়ে থাকে। তারা সবসময় বলে যে, যা কিছু নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে তার বিরুদ্ধে কষ্ট করে অনুসন্ধান করে তুমি কিছু বলবেনা। এই ধরণের নৈতিকতার বিরুদ্ধে অতীন্দ্রয়বাদীরা বৃথাই প্রতিবাদ করেছেন, তাদের শিষ্যেরা প্রচারিত বাণীর সার সত্যকেই উপেক্ষা করে গেছেন। তাদের প্রচলিত পদ্ধতি অনুসারে কোন স্থায়ী কল্যাণ আসতে পারে, একথা আশা করাও অন্যায় এবং অযৌক্তিক।

আমার মনে হয়, বিজ্ঞান এবং প্রগতির কাছ থেকে আমরা অনেক বেশি কিছু আশা করতে পারি। ধীরে ধীরে মানুষ হৃদয়ঙ্গম করতে সক্ষম হবে যে পৃথিবীর ভিত্তিভূমি যেখানে হিংসা, বিদ্বেষ এবং অত্যাচারের মধ্যে প্রোথিত সেখানে সুখের আশা করাই অযৌক্তিক। অতি অল্প সংখ্যক মানুষের মনে গত মহাযুদ্ধ এ শিক্ষা দিয়ে গেছে। যদি আরো বেশি মানুষকে তা প্রভাবিত করত তাহলে এতদিনে তার আবেদন ম্লান হয়ে যেত। আমাদের এখন এমন একটা নীতির প্রয়োজন যা জীবনের প্রতি প্রগাঢ় ভালোবাসা থেকে উদ্ভূত এবং যা প্রসারতা এবং প্রত্যক্ষ কীর্তির আনন্দবোধ বেড়ে ওঠে, নিষেধ এবং অত্যাচারের ভিত্তিভূমিতে নয়। অন্যেরা সুখে থাকলে যে মানুষের আনন্দ হয়, অর্থ ব্যয় করতে দ্বিধা করেনা, মনের দিক দিয়ে এমনিতর উদার মানুষকেই আমাদের ভালো মানুষ বলা উচিত। যদি তাই হয়ে থাকে পৃথিবীতে অল্পসংখ্যক সুখী ব্যক্তির কোন দাম নেই। যে মানুষ অপরকে প্রতারিত করে অথবা নির্দয়তার মাধ্যমে সৌভাগ্যের স্বর্ণ তোরণে আরোহণ করেছে বর্তমানে আমাদের নীতিজ্ঞানহীন লোক বলতে তাদেরই বলা উচিত। যদিও তারা রীতিএত গির্জায় যায় এবং অসদুপায়ে অর্থের কিছু অংশ জনসাধারণের তহবিলে দান করে, তবুও তারা নীতিজ্ঞানহীন মানুষ ছাড়া আর কিছু নয়।

এই দৃষ্টিভঙ্গীকে প্রসারিত করতে হলে আমাদের নৈতিকতাকে কুসংস্কার এবং নির্যাতন যা এখনো আমাদের সমাজের দিকপালদের কাছে ধর্মীয় অনুশাসনের এত তা থেকে মুক্ত করতেই হবে এবং শাণিয়ে তুলতে হবে আমাদের বিচারবুদ্ধিকে। আজকালকার যুগে বিচারবুদ্ধি খুবই সীমিত হলেও আমি সবসময় অননুতপ্তচিত্তে বিচারবুদ্ধিকেই সমর্থন করে যাবো। হতে পারে বিচারবুদ্ধির শক্তি অল্প কিন্তু তা স্থির এবং একমূখী। অন্যদিকে বিচারবুদ্ধি বহির্ভূত শক্তিগুলো একটা আরেকটাকে নির্মূল করে। সুতরাং প্রত্যেক রকমের বিচারবুদ্ধি বহির্ভূত গুপ্ত উপাসনা এবং সমধর্মী প্রবৃত্তিগুলোর সহায়ক হয় এবং উজ্জ্বলভাবে দেখিয়ে দেয় যে ওসবই বিচারবুদ্ধির পরম সুহৃদ।

 ১০. গোঁড়া মতবাদের পুনরাবির্ভাব

যুদ্ধের সময়ে সকলদেশের ক্ষমতাশালীরা জনতাকে অস্বাভাবিক রকমের সুযোগ সুবিধা ঘুষ হিসেবে দেয়ার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করতে লাগল। মজুরদের বেঁচে থাকার মতো মজুরি দিতে স্বীকার করা হলো, হিন্দুদের বলা হলো তারাও মানুষ, সুতরাং পরস্পর ভাই ভাই। মহিলাদের ভোটদানের অধিকার প্রদান করা হলো এবং যুবকদের সে সকল নির্দোষ আনন্দ উপভোগ করার অধিকার দেয়া হলো যা বুড়োরা নৈতিকতার নামে সব সময় লুণ্ঠন করতে তৎপর ছিল। যুদ্ধজয়ের শেষে বিজেতারা সাময়িকভাবে সাধারণ্যে যে সুযোগ সুবিধাদান করেছিল তাদেরকে যুদ্ধে পাঠিয়ে জয়লাভ করার জন্যে, তা থেকে বঞ্চিত করার মানসে আবার সক্রিয় সংকল্প গ্রহণ করতে শুরু করে দিলো। ১৯২১ এবং ১৯২৬ সনের কয়লাখনির ধর্মঘটের মাধ্যমে মজুরদের সম্পূর্ণরূপে বঞ্চিত করা হলো। বিভিন্ন সিদ্ধান্তের বলে আবার হিন্দুদের তাদের পূর্বের স্থানে ফিরে যেতে বাধ্য করা হলো। মেয়েদের ভোটাধিকার যদিও হরণ করা হয়নি, তবুও বিয়ের পরে তাদের চাকুরি থেকে বরখাস্ত করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হলো, যদিও পার্লিয়ামেন্টে তা করা হবে না বলে একটা আইন পাশ করা হয়েছিল। খোলাসা করে বলতে গেলে এগুলো হচ্ছে রাজনৈতিক বিষয়ের আওতাভূক্ত। ইংল্যাণ্ডে শ্রেণী সমূহের স্বার্থরক্ষার জন্যে যেমন সুশৃঙ্খল ভোটদাতাদের সংঘবদ্ধ প্রতিষ্ঠান রয়েছে। তেমনি ভারতে রয়েছে ইংরেজ শ্রেণীসমূহের স্বার্থের পরিপন্থী অনুরূপ সংঘবদ্ধ প্রতিষ্ঠান। কিন্তু কোন সংঘবদ্ধ প্রতিষ্ঠান একজন নারী এবং একজন পুরুষ কারো কোন ক্ষতি না করে সুখী জীবনযাপন করার স্বাধীনতায় বিশ্বাসের দৃষ্টিকোণ থেকে এ প্রশ্নের বিচার করেনি বলে পিউরিটানেরা এ পর্যন্ত তেমন কোন প্রবল প্রতিবন্ধকের সম্মুখীন হয়নি এবং তাদের অত্যাচারের ক্রমবিকাশমান একটি রাজনৈতিক প্রশ্ন বলে বিবেচিত হয়নি।

এক গোঁড়া অথবা পিউরিটানকে এভাবে আমরা চিহ্নিত করতে পারি, তার ধারণা কিছু কাজ, যদিও কর্তা ছাড়া অন্যকারো উপর তা দৃশ্যমান কোন খারাপ প্রভাব বিস্ত রি করতে পারে না, তবুও সেগুলো অন্তর্নিহিতভাবে পাপময় সুতরাং যে কোন সক্রিয় উপায়ে ফৌজদারি আইনের বলে অথবা অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করে জনমতের সাহায্যে তা দমন করা কর্তব্য বলে মনে করে। কিন্তু মুলতঃ এ হচ্ছে উপযোগবাদী বিচারব্যবস্থার সঙ্গে সম্পর্কশীল, তাহলে কোন সম্প্রদায় বিশেষ বিশেষ অপরাধকে সহ্য করে নিলে সম্প্রদায়ের দেবতাদের কোপ দৃষ্টিতে পড়তে হয়, সুতরাং সে জন্যে সে কাজগুলো সামাজিকভাবে অনিষ্টকর সোডম (Sodom) এবং গোমোরাহর কাহিনীর মধ্যে এ দৃষ্টিভঙ্গীর পূর্ণ সমর্থন পাওয়া যাবে। যারা এ সকল কাহিনা সত্যি বলে বিশ্বাস করে তারা উপযোগবাদের দৃষ্টিভঙ্গীতে যথাযথ ভাবে অপরাধের বিরুদ্ধে প্রতিষ্ঠিত আইনকে বিচার করতে পারবে-যার ফলে ঐ সকল নগরী ধংসস্তূপে পরিণত হয়েছিল। আজকের দিনে পিউরিটানেরা কদাচিৎ ঐ দৃষ্টিভঙ্গিকে সত্য বলে গ্রহন করে থাকে। এমনকি লণ্ডনের প্রধান যাজকও বলেন না যে টোকিওর ভূমিকম্প এর অধিবাসীদের বিশেষ কোন অপরাধের কারণে হয়েছে। সুতরাং যে আইনগুলো সমাজে চালু আছে এবং যে সব আইনের সম্বন্ধে কথা উঠেছে সেগুলোকে একমাত্র প্রতিহিংসামূলক শাস্তিদানের যুক্তিতে ছাড়া আর কিছুতেই সমর্থন করা যায়না, যে অনুসারে কিছু পাপ একমাত্র কর্তাকে ছাড়া আর কারো কোন ক্ষতি করে না, সেগুলো এত জঘণ্য যে পাপীকে শাস্তি প্রদান করা আমাদের পবিত্র কর্তব্য হয়ে দাঁড়ায়। উনবিংশ শতাব্দীতে বেনথামের মতবাদের প্রভাবের ফলে এ মনোভাবের অপসৃতি ঘঠে। কিন্তু সাম্প্রতিককালে উদারনৈতিক মনোভাবের অবক্ষয়ের ফলে পিউরিটান মতবাদ আবার হারানো ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং মধ্যযুগের যে কোন নৃশংসতার এত নতুন অত্যাচারের হুমকী দর্শন করেছে।

আমেরিকাতে এ নতুন আন্দোলন পরিপুষ্টি লাভ করেছে। এর প্রধান কারণ মহাযুদ্ধে একমাত্র বিজয়ী শক্তি হলো আমেরিকা। পিউরিটান মতবাদের ইতিহাস খুবই কৌতূহলোদ্দীপক। সপ্তদশ শতাব্দীতে খুবই সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য তারা ইংল্যাণ্ডের ক্ষমতা দখল করেছিল, কিন্তু জনসাধারণ তাদের অত্যাচারে এত বীতশ্রদ্ধ হয়ে পড়েছিল যে পুনরায় তাদেরকে ক্ষমতায় আরোহন করার কোন সুযোগ দান করেনি। পিউরিটানেরা ইংল্যাণ্ডের অত্যচার নির্যাতন চালিয়েছে, নিউ ইংল্যাণ্ড এবং মধ্যপ্রাচ্যকে উপনিবেশে পরিণত করেছে। আমেরিকার গৃহযুদ্ধ ইংল্যাণ্ডের গৃহযুদ্ধের ফলে হয়েছিল, যেহেতু দক্ষিণাঞ্চলে অধিকাংশ স্টেট পিউরিটানদের প্রতিদ্বন্দ্বীদের দ্বারা উপনিবেশে পরিণত হয়েছিল। কিন্তু ইংল্যাণ্ডের এত আমেরিকাতে পিউরিটান দল পরাজিত হয়নি, বরং চিরতরে জয়লাভ করেছিল। এর ফল দাঁড়াল এই যে শ্রেষ্ঠতম শক্তিকে যারা নিয়ন্ত্রণ করার অধিকার পেল তাই ক্রমওয়েলের চরিত্রের লৌহ কঠিন দিকটার উত্তরাধিকারী।

পিউরিটান মতবাদ যে মানুষের কল্যাণ করেছে সেটুকু ঢেকে রেখে শুধু দোষগুলো দেখালে অবিচার করা হবে এবং তা শোভনও নয়। ইংল্যাণ্ডের সপ্তদশ শতাব্দী থেকে আধুনিক যুগের পূর্বপর্যন্ত পিউরিটান মতবাদ রাজকীয় আমলাতন্ত্রে জুলুম নির্যাতনের বিরুদ্ধে গণতন্ত্রের সমর্থনে সংগ্রাম করেছে। আমেরিকাতে দাস প্রথা রহিত করার স্বপক্ষে অংশ নিয়েছে এবং আমেরিকাকে সমগ্র বিশ্বের গণতন্ত্রের পীঠস্থান হিসেবে রূপ দিতে পিউরিটান মতবাদ অবিস্মরনীয় ভূমিকা গ্রহণ করেছে। এগুলো হচ্ছে এ মতবাদের লোকহিতৈষী কার্যাবলী, কিন্তু এসব ঘটেছিল অতীতে। বর্তমানে সংখ্যালঘুদের প্রতি শাসনমিশি, উদারতার মতো রাজনৈতিক গণতন্ত্রের সমস্যা তেমন প্রখর নয়। বর্তমানে যে সমস্যা তা বিচার করতে হলে পিউরিটানদের চাইতে ভিন্নতর দৃষ্টিভঙ্গির প্রয়োজন। নৈতিকতার বন্ধনের চাইতে সহানুভূতির প্রসারতা এবং সহনশীলতাই এজন্য অত্যধিক প্রয়োজনীয়। কিন্তু পিউরিটানদের মধ্যে প্রসারিত সহানুভূতির বেগ খুব বেশি জোরালো নয়।

আমেরিকাতে প্রবেশের বিরুদ্ধে জারীকৃত নিষেধাজ্ঞার ফলে পিউরিটান মতবাদের যে সর্বাপেক্ষা শ্রেষ্ঠ বিজয় সূচিত হয়েছে সে সম্পর্কে আমি কিছু বলব না। যদি কোন ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞায় প্রতিদ্বন্দ্বীদেরকে নীতিগতভাবে কাবু করতে না পারে। তাহলে তারা অঙ্গপ্রত্যঙ্গ অবশকারী কোকেনকে নিষিদ্ধ ঘোষণার সমর্থন করবে, যেহেতু তাতেও একই নীতিগত প্রশ্ন বিজরিত।

অন্যান্য ধর্মোম্মত্ততার মতো পিউরিটন মতবাদের বাস্তব প্রতিবন্ধক হলো, সবগুলো দোষকে না দেখিয়ে দমন করার জন্য সর্বশক্তি নিয়োগ করে। ধর্মোম্মাদেরা বোঝেনা যে প্রকৃত দোষীর উপর নির্দয় চাপ প্রয়োগ করলে ফলাফল যা হবে তা আরো ভয়াবহ। উদাহরণস্বরূপ আমরা অশ্লীলতা প্রচারের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইনকে নিতে পারি। কেউ অস্বীকার করেনা যে অশ্লীলতা নিকৃষ্ট ধরণের আনন্দ বিতরণ করে এবং যারা অশ্লীলতার প্রচার করে তারাও নিঃসন্দেহে ক্ষতি করে। কিন্তু আইন যখন তা দমন করতে অগ্রসর হয় তখন অনেক প্রত্যাশিত গুণাবলীকেও দমন করে। কয়েক বছর আগে একজন প্রখ্যাত ওলন্দাজ শিল্পী ডাকযোগে কিছু ছবি ইংরেজ ক্রেতাদের কাছে পাঠিয়েছিলেন। পোস্ট অফিসের কর্মচারীরা ছবিগুলো আগাগোড়া ভালোভাবে দেখে রায় দিলো যে ওগুলো অশ্লীল। (শৈল্পিক উৎকর্ষের প্রশংসা রাষ্ট্রীয় কর্মচারীদের কাছে থেকে প্রত্যাশা করা যায় না। সুতরাং তারা সেগুলো বিনষ্ট করে ফেলল, ক্রেতা তার ক্ষতিপূরণ পাননি। ডাকযোগে কিছু এলে তা যদি কর্মচারীরা অশ্লীল মনে করে, নষ্ট করে ফেলার অধিকার আইন পোষ্টাফিসকে দিয়েছে এবং তাদের গৃহিত সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আর কোথাও কোন নালিশ করা চলবেনা।

জন্মনিয়ন্ত্রণ সম্পর্কে পিউরিটানদের বিচারের যা বক্তব্য তাহলে আর একটি দোষের জ্বলন্ত উদাহরণ। এটা স্পষ্ট যে অশ্লীলতাকে আইনের পরিভাষায় প্রকৃতভাবে সংজ্ঞাবদ্ধ করা সম্ভব নয়, তবে বাস্তবে আদালতে যা বিচারকের স্নায়ুতে আঘাত করে তাকেই অশ্লীল বলে গণ্য করা হয়। জন্মনিয়ন্ত্রণের সংবাদ শুনে গড়পড়তা বিচারকের যে স্নায়ুতে আঘাত লাগবে তেমন কোন কথা নেই; যদি জন্মনিয়ন্ত্রণ সম্পর্কে একটা ব্যয় বহুল গ্রন্থ রচনা করে প্যাচালো বাক্য এবং লম্বাচওড়া বাগ্বিদির মাধ্যমে তা প্রকাশ করা হয়। কিন্তু তা কি অশিক্ষিত লোকে বুঝতে পারে এত সরল বাক্য বিন্যাসের মারফত প্রকাশ করা হলে বিচারকের স্নায়ুতে আঘাত লাগবে। ফলতঃ বর্তমান ইংল্যাণ্ডে শ্রমিকদের কাছে জন্মনিয়ন্ত্রণের সংবাদ দেয়া বেআইনি যদিও শিক্ষিত লোকের কাছে এ সংবাদ দেওয়াটা আইনতঃ অসিদ্ধ নয়। তা সত্ত্বেও খেটে খাওয়া মজুরদের জন্য এ খবরের দরকার অনেক বেশি। সমস্ত বিষয়কে এখন একটি মাত্র প্রশ্নের নিরিখে বিচার করে দেখতে হবে। যদি এর প্রচারপত্র কোন নোংরা মনোভাবসম্পন্ন বালকের হাতে পড়ে, তাহলে তা কি তাকে কোনরকমের আনন্দ দিতে পারবে? যদি তা পারে, যতই সামাজিক প্রয়োজনীয়তা থাকুক না কেননা অবশ্যই বিনষ্ট করতে হবে। জোর করে আরোপিত অজ্ঞতার কি ফলাফল হতে পারে তা বলা যায় না। অভাব, নারীদের পুরনো রোগ, রোগাক্রান্ত শিশু প্রসব, জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং যুদ্ধ এসবকে পিউরিটান আইন স্রষ্টারা কতক বোকা বালকের কাল্পনিক আনন্দের চাইতে কম দোষাবহ বলে মনে করে।

আইন যত কঠিন মনে হয় প্রয়োগ করলে পরে ঐ কঠিনতা বা কড়াকড়ি থাকে না। লীগ অব ন্যাশনস এর উদ্যোগে ১৯২৩ সনের ১৭ ই সেপ্টেম্বরের দি টাইমস এর মতে আমেরিকার যুক্তরাষ্ট্র, অশ্লীল প্রকাশনা বন্ধ করবার মানসে লীগ অব ন্যাশন এর অন্তর্ভুক্ত রাষ্ট্রগুলোসহ এক আন্তর্জাতিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৃটিশ প্রতিনিধি স্পষ্টতঃ ঐ ভালো কাজটির প্রতি ঈর্ষা পোষণ করেছেন।

অন্য একটি ব্যাপার, তাহলো সাদামানুষ এবং দাসদের জন্য আলাদা যানবাহন ব্যবস্থা, প্রণীত আইনের সুদূরপ্রসারী ভিত্তি হিসেবে ধরে নেয়া হয়েছে, তার ক্ষতির গুরুত্ব অপরিসীম এবং ফৌজদারি আইনের উপযুক্ত বিষয়। অরো ক্ষতির কারণ হয় তখন যখন অজ্ঞ তরুণীদের মিথ্যা আশ্বাসে ভুলিয়ে অর্থ দাসত্বের বাঁধনে জড়িয়ে ফেলা হয় যাতে তাদের স্বাস্থ্য সম্পূর্ণরূপে নিঃশেষিত হয়ে যায় এবং তারা চরমতম দুর্দিনের সম্মুখীন হয়। শ্রমিকদের জন্য এটা হলো একটা অপরিহার্য প্রশ্ন, ফ্যাক্টরি আইন এবং ট্রাক আইনের মতো তাদেরকে এরও সমাধান খুঁজে বের করতে হবে। যেখানে দাস এবং সাদা মানুষদের জন্য আলাদা যানবাহনের ব্যবস্থা সম্পূর্ণরূপে অচল, সেখানে ব্যক্তিস্বাধীনতার নামে সর্ব সাধারণ খোঁড়া যুক্তি প্রয়োগ করার হস্ত ক্ষেপ থেকে বিরত থাকতে সম্পূর্ণরূপে বাধ্য হয়। কয়েক বছর আগে ইংরেজি সংবাদ পত্রে একটি খবর প্রকাশিত হয়। একজন মানুষ একটি গণিকার প্রেমে পড়ে তাকে বিয়ে করে। কয়েক বছর সুখী জীবন যাপন করার পর উক্ত মাহিলা তার পূর্বে পেশায় ফিরে যাবার জন্য মনস্থির করে ফেলে। স্বামী যে স্ত্রীকে তার পূর্বের ব্যবসায়ে ফিরে যেতে পরামর্শ দিয়েছে বা কোন উপায়ে তার কাজকে অনুমোদন করেছে তার কোন সঙ্গত কারণ নেই। কারণ সে হঠাৎ ঝগড়া করে স্ত্রীকে ঘর থেকে তাড়িয়ে দেয়নি। তার এ অপরাধের জন্যে তাকে বেত্রাদণ্ড দান করা হয় এবং কারাগারে নিক্ষেপ করা হয়। এমন একটা আইনের বলে তাকে শাস্তি দেয়া হয়েছিল যা ছিল তখনকার দিনে প্রচলিত এবং যা এখন পর্যন্ত আইনের সংবিধানে পরিষ্কারভাবে লিখিত আছে।

আমেরিকাতে এই রকমভাবে যদিও গৃহকত্রী নিয়োগ করা বেআইনী নয় তবু তাকে নিয়ে এক স্টেট থেকে অন্য স্টেটে ভ্রমণ করা বেআইনী। নিউইয়র্কবাসী তার গৃহকত্রীকে নিয়ে বরুকলিনে যেতে পারে কিন্তু জার্সি শহরে যেতে পারে না। বিভিন্নতার মধ্যে নৈতিকতার এমন কি ইতর বিশেষ পার্থক্য রয়েছে তা স্পষ্টতঃ সরল মানুষের কাছে বোধগম্য নয়।

এ সমস্ত ব্যাপার লীগ অব ন্যাশনসও অধিকতর কঠোর বিচার-ব্যবস্থার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করার চেষ্টা করেছে। কিছুদিন আগে লীগ অব ন্যাশনস-এর কমিশনে কানাডার প্রতিনিধি বলেছেন যে, যে বয়সেরই হোক না কোন স্বামী অথবা বাপ-মা দু’জনের একজন সঙ্গে না থাকলে কোন মহিলাকে স্টিমারে ভ্রমণ করতে দেয়া উচিত নয়। তার এ প্রস্তাব গৃহিত গয়নি, কিন্তু তার ফলে আমরা যে দিকে মোড় ঘুরছি যে দিকে উজ্জ্বল সংকেত দান করা হয়েছে। এটা স্পষ্টতঃ প্রতীয়মান সে এ ব্যবস্থার ফলে শ্বেতাঙ্গ রমণীদেরকে অর্ধদাসে পরিণত করা হবে। নারীরা যতদিন পর্যন্ত কেউ তাদেরকে নৈতিকতাবহির্ভূত উদ্দেশ্যে ব্যবহার করবে, তার জন্য ঝুঁকি গ্রহণ করতে পারবে না। এ সকল সংস্কারের একমাত্র যুক্তিযুক্ত লক্ষ্য হলো পর্দা।

পিউরিটান মতবাদের বিপক্ষে আরো একটি সর্বজনীন যুক্তি রয়েছে। মানবজীবনের ধর্ম হলো-মানুষ জীবন থেকে কিছু অনন্দ আহরণ করতে চায়। সাধারণভাবে বাস্তব প্রয়োজনের জন্য মানুষ প্রবৃত্তি থেকে যে আনন্দ আহরণ করে তা আনন্দের প্রাথমিক স্তর এবং তা মনের থেকে আহরিত আনন্দের চাইতে ভিন্নতর। ঐতিহ্যবাহী নীতিবাগীশেরা প্রথম প্রকারের আনন্দের মূল্যে দ্বিতীয় প্রকারের আনন্দের প্রশংসা করে। বরঞ্চ দ্বিতীয় প্রকারের আনন্দকেও সে বাহ্য জ্ঞান করে, কারণ সে তা আনন্দ বলে স্বীকার করে না। ভাবে তার বিশ্লেষণ বৈজ্ঞানিকভাবে নির্ভরযোগ্য নয় এবং অনেকগুলো ক্ষেত্রে সে নিজে নিজের উপর সন্দেহপরায়ন। তাহলে কি শিল্পের আনন্দ ইন্দ্রিয়গ্রাম থেকে উদ্ভূত? না মন থেকে? যদি সে অধিকতর কঠোর হয় তাহলে একবাক্যে এ্যরিস্টটল অথবা পাদরিদের এত শিল্পকে অবজ্ঞা করে উড়িয়ে দেবে। আর যদি সে কম বেশি ধর্মমত সম্বন্ধে উদার মনোভাব পোষণ করে, আর্টের মধ্যে কোন উদ্দেশ্য থাকলে তা সে সহ্য করে এবং স্বভাবতঃই শিল্প হিসেবে তা হবে নিকৃষ্ট ধরণের। এটা টলস্টয়ের মতবাদ। বিয়ে হলো আরেকটা জটিল সমস্যা। কড়া নীতিবাগীশেরা মনে করে থাকে যে বিয়েটা হলো বড়ো দুঃখজনক। অধিকতর কম কড়া নীতিবাগীশেরা বিয়ের প্রশংসা করে এ কারণে যে সাধারণতঃ তা নিরানন্দময় হয়ে থাকে এবং তা হয় যখন তারা বিচ্ছেদটা অসম্ভব হিসেবে ভাবতে থাকে।

সে যা হোক তা আমার বুলবার বিষয় নয়। আমার বলবার বিষয় হলো, যেগুলোকে আনন্দ বলে পিউরিটানেরা সর্বশক্তি প্রয়োগ করে প্রচার করে থাকে তার চাইতে তারা যেগুলোকে খারাপ বলে নিন্দা করে থাকে তা কম ক্ষতি করে। নিজেদের আনন্দ উপভোগ করার পরেই অন্যকে আনন্দ উপভোগে বাধাদানের মধ্যেই সর্বাপেক্ষা বেশি আনন্দ। অধিকতর খোলামেলাভাবে বলতে গেলে তা হলো ক্ষমতা অধিকার করার আনন্দ। মদ খাওয়া এবং অন্যান্য যে দোষগুলোর বিরুদ্ধে আপত্তি করে তার চেয়ে বর্তমানের পিউরিটানদের ক্ষমতা প্রীতি অনেক বেশি অনিষ্টকর। যারা পিউরিটান মতবাদের আওতাভূক্ত তারা অত্যধিকভাবে ক্ষমতা প্রেমিক হয়ে থাকে। কিন্তু মানুষের ক্ষমতাপ্রীতিকে ঘন্টা করে কল্যানেচ্ছা বলে চালিয়ে দেয়া হয়। এর প্রতিক্রিয়া সমাজে অত্যন্ত মৃদু। এ থেকে এটুকু প্রমাণিত হয় যে আমরা আমাদের বিরুদ্ধে শত্রুতা করার জন্য নয় শুধু খারাপ হওয়ার কারণেই বিজিতের শাস্তি দিয়ে থাকি। এর প্রত্যেকটার ফল স্বরূপ অত্যাচার এবং যুদ্ধের সৃষ্টি হতে পারে। নৈতিকভাবে ঘৃণা করা আধুনিক পৃথিবীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ক্ষতিকর শক্তির একটি, যার মন্দ প্রভাবে প্রোপাগাণ্ডা যারা নিয়ন্ত্রণ করে থাকে তাদের দিকে জনসাধারণের দৃষ্টি ঘোরানো হয়।

শিল্পোৎপাদনের সাথে সাথে অপ্রতিরোধ্যভাবে রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানের বৃদ্ধি সাধন ঘটেছে এবং শিল্পোৎপাদন ব্যবস্থা সম্পূর্ণ রূপে ধ্বংস না হওয়া পর্যন্ত আরো বৃদ্ধি পেতে থাকবে। পৃথিবী আরো জনবহুল হয়ে উঠেছে; সে কারণে প্রতিবেশীদের উপর আমাদের নির্ভরশীলতা ঘনিষ্ট রূপ পরিগ্রহ করেছে। সমাজের সঙ্গে সম্পর্কিত যে সকল অস্পষ্ট এবং অপ্রত্যক্ষ সমস্যা বর্তমান তাও যদি পরস্পর পরস্পরকে খুব ভালোভাবে জ্ঞাত না করাই তাহলে জীবন অসহ্য বোঝা হয়ে দাঁড়াবে। আমাদের অবশ্যই অন্যের ব্যক্তিগত ব্যাপারে শ্রদ্ধা পোষণ করতে জানতে হবে এবং একজনের নৈতিক বোধ অন্যের উপরে চাপানো মোটেই সমীচীন হবেনা। পিউরিটানেরা কল্পনা করে যে, তাদের নৈতিক মানদণ্ডই আসল মানদণ্ড। তারা অনুভব করে যে অন্যযুগে, দেশে এমনকি তাদের নিজের দেশের বিভিন্ন সম্প্রদায়ের নিজস্ব নৈতিক মানদণ্ড রয়েছে যা তারা পিউরিটানদের মতো খাঁটি এবং আসল মনে করে। দুর্ভাগ্যবশতঃ পিউরিটানদের আত্নবিরুদ্ধনীতির মধ্যে যে স্বাভাবিক ক্ষমতা প্রীতি রয়েছে তা তাদের অন্যান্যদের পক্ষে তাদেরকে বাধা দান করা অসম্ভব হয়ে পড়ে। চলুন আমরা উদার শিক্ষাব্যবস্থা এবং মানুষের বিস্তৃত জ্ঞান কামনা করি যা আমাদের অতি ধার্মিক শিক্ষকদের কঠোর পরিশ্রমকে দুর্বল করতে পারে।

 ১১. রাজনৈতিক সংশয়বাদের প্রয়োজনীয়তা

ইংরেজি ভাষাভাষী জগতের একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো তাদের রাজনৈতিক দলের প্রতি সুপ্রচুর আগ্রহ এবং বিশ্বাস বর্তমান। শতকরা বেশীরভাগ ইংরেজি ভাষাভাষী লোক বিশ্বাস করে, যে রাজনৈতিক দলের আদর্শে তারা বিশ্বাসী সে দলের হাতে ক্ষমতা এলে যে সমস্ত অসুবিধায় তারা ভুগছে, নিরসন ঘটবে। ঘড়ির পেন্ডুলামের মত দোদুল্যমানতা থেকে এ অবস্থার সৃষ্টি। একজন লোক বিশেষ পার্টিকে ভোট দেয়ার পরও যখন তার দুঃখের অবসান হয় না, তখন এ সিদ্ধান্তে এসে পৌঁছোয় যে বিপক্ষ দল হাজার হাজার বছর ধরে যে অন্যায়ের সৃষ্টি করছে তার নাগ পাস থেকে মুক্তি অসম্ভব। এরি মধ্যে সে সবগুলো রাজনৈতিক পার্টির প্রতি অনাগ্রহী হয়ে পড়েছে এবং এখন সে একজন বৃদ্ধ লোক। তার সন্তানেরা তার যৌবনের বিশ্বাসের ধ্বজা উঁচিয়ে ধরে, এভাবে আবর্তন বিবর্তনের মধ্যদিয়ে সময় বয়ে যেতে থাকে।

এস্থলে আমার বক্তব্য হলো, যদি আমরা রাজনীতির মারফত ভালো কিছু করতে চাই আমাদের অবশ্যই রাজনৈতিক প্রশ্নসমূহ আলাদা পদ্ধতিতে বিচার করতে হবে। গণতান্ত্রিক উপায়ে কোন পার্টিকে ক্ষমতায় আরোহণ করতে হলে তাকে জাতির অধিকাংশ নাগরিকের সমর্থন অবশ্যই আদায় করতে হবে। এজন্য প্রচলিত গণতন্ত্রের স্বার্থহানি না করে জনসাধারণের কাছে ব্যাপক অর্থে সফল যুক্তির অবতারণা করতে হবে যা তাদের মধ্যে বিশেষ আবেদন সৃষ্টি করতে সক্ষম হবে। সুতরাং কোন প্রভাবশালী রাজনৈতিক দলের এমন কোন ভালো কর্মসূচী আছে বলে আমার মনে হয় না যা পার্টি সরকার ছাড়া আর কাউকে দিয়ে বাস্তবায়ন করা যেতে পারে। অন্যান্য যে সকল লোকহিতের যন্ত্র রয়েছে তার সঙ্গে গণতন্ত্রের কিভাবে সমন্বয় ঘটান যেতে পারে তা আমাদের যুগের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য, সবচেয়ে প্রয়োজনীয় একটি প্রশ্ন।

বর্তমানে রাজনৈতিক প্রশ্নে দু’জাতীয় আলাদা ধরণের রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞ রয়েছে। তার একটি হলো প্রত্যেক রাজনৈতিক দলে সক্রিয় রাজনৈতিক রয়েছে। এবং অন্যটিতে বিশেষজ্ঞ যাদের অধিকাংশই সরকারি চাকুরে অর্থনীতিবিদ, বৈজ্ঞানিক, ডাক্তার ইত্যাদি। এ দু’শ্রেণীর প্রত্যেকের আবার নিজস্ব কলা-কৌশল রয়েছে। রাজনীতিবিদদের কৌশল হলো কীভাবে সুবিধাজনকভাবে জনসাধারণকে নিজেদের দিকে আকর্ষণ করা যায় তা অনুমান করা। বিশেষজ্ঞদের পদ্ধতি হলো জনতার বুদ্ধিবৃত্তিতে সাড়া জাগাতে পারার মত সত্যিকারের সুবিধাজনক কি হবে তা নির্ধারণ করা। (এ শর্তগুলো বিশেষজ্ঞদের অপরিহার্যভাবে চিন্তা করতে হয়, তা না হলে যতই কল্যাণকর হোক না কেননা এর বিরুদ্ধে প্রবল প্রতিবাদের ঝড় উঠতে পারে।) গণতন্ত্রে রাজনীতিবিদদের শক্তি হলো গড়পড়তা জনসাধারণ যে নীতিতে বিশ্বাস করে সে নীতি নির্ধারণ করা। অলোকসম্পন্ন ব্যক্তিরা যা ভালো মনে করে তার স্বপক্ষে সমর্থন করার মত রাজনীতিবিদেরা যে উচ্চ মনোবৃত্তি সম্পন্ন হতে পারে তা প্রত্যাশা করা বৃথা কেননা তা করলে তাদেরকে অন্যদের জন্য ক্ষমতার আসন ছেড়ে দিতে হবে। সুতরাং তারা স্বতঃস্ফূর্তভাবে বক্তব্য প্রকাশ করার ব্যাপারে যে কৌশল অবলম্বন করে (নিজস্ব পার্টির দৃষ্টিকোণ থেকে) অনেক সমর্থ রাজনীতিবিদদের বেলায় অধিকাংশ মানুষ যা ভালো বলে গ্রহণ করেছে তারই সৎ প্রকাশ; যদিও বিশেষজ্ঞদের মতে তা ঘোরতর ক্ষতি ডেকে আনবে। নোংড়াভাবে ঘুষ নেয়া ছাড়া যে কোন রকমের নৈতিক অধঃপতন এবং বিচ্যুতির প্রতি রাজনীতিবিদদের অনাসক্ত হলে চলবে না।

যেখানে পার্টিগত রাজনীতি বর্তমান সেখানে একজন রাজনীতিবিদের আবেদন মাত্র একটি শ্রেণীর কাছে। পক্ষান্তরে তার বিপক্ষ রাজনীতিবিদের আবেদন অন্য আরেকটি শ্রেণীর কাছে। নিজস্ব দলকে সংখ্যাগরিষ্ঠ রূপে পরিণত করতে পারলেই তার সাফল্য প্রমাণিত হয়। যে প্রচেষ্টা পূর্ব নির্ধারিত ভাবে সাধারণ ক্ষেত্রে সকল শ্রেণীর কাছে আবেদন সৃষ্টি করে রাজনীতিবিদদের কাছে তার কোন দাম নেই। অধিকন্তু রাজনীতিবিদেরা যে সকল প্রশ্নের ওপর দৃষ্টি সন্নিবেশ করে তা একটা শ্রেণীর বিপক্ষে এবং এ শ্রেণীর বৈরিতা থেকেই তার বিপক্ষ রাজনৈতিক দলের সমর্থকদের মধ্যে বিরুদ্ধ রাজনীতির প্রাণ সঞ্চার হয়। এ ছাড়াও কোন প্রচেষ্টা তা যতই প্রশংসনীয় হোক না কেননা যদি মঞ্চের বক্তৃতার মাধ্যমে জনসাধারণকে তা বুঝিয়ে তুষ্ট করতে পারা যায়, রাজনীতিবিদদের কাছে তার কানাকড়িও দাম নেই।

পার্টিগত রাজনীতিবিদেরা যে সব বিষয়ের ওপর জোর দিয়ে থাকে তা পূরণ করতে হলে আমাদের সামনে দু’টি ভোলা পথ রয়েছে। (১) তাদের অবশ্যই জাতির একটা সম্প্রদায়ের প্রতি দৃষ্টিশীল হতে হবে (২) তার জন্য তারা যে যুক্তি গ্রহণ করবে তা অবশ্যই সরল হতে হবে। অবশ্য যুদ্ধের সময়ে এ নীতি অচল, কেননা বহিঃশত্রুর সঙ্গে সংগ্রাম করবার জন্যে পার্টিগত কোন্দলকে তখন বন্ধ রাখতে হয়। যে রাজনীতিবিদেরা শান্তির সময়ে সাধারণ ভোটারদের স্বীকৃতির ব্যাপারে সন্দিহান থাকে সে সকল রাজনীতিবিদেরাও যুদ্ধের সময়ে নিরপেক্ষতার মুখোস পরে আহ্বান করে, আমরা যেমন আশা করেছিলাম গত যুদ্ধে তার প্রমাণ পাওয়া গিয়াছে যে গণতন্ত্র নিরপেক্ষ জনতার কাছে আবেদন করার প্রশংসনীয় ট্রেনিং দান করেছে। এই একমাত্র কারণেই গণতন্ত্র গতযুদ্ধে জয়লাভ করতে পেরেছে। কিন্তু এটা সত্য যে এতে শান্তি বিঘ্নিত হয়েছে। কিন্তু তা আরেকটি ভিন্নতর প্রশ্ন।

কিভাবে সহজে আবেগকে জাগানো যায়, জাগালে তা তার এবং বন্ধুবান্ধবদের না ক্ষতি করতে পারে মতো কিভাবে দমন করা যায় তা জানা হলো রাজনীতিবিদদের সে বিশেষ কৌশল। মুদ্রায় যেমন গ্রেসাম আইন আছে তেমনি রাজনীতি একটি আইন মেনে চলে। যে লোকের একটি উন্নত আদর্শ আছে যা

অন্যান্য সবকিছু থেকে আলাদা, তার জন্যে ঐ দুর্লভ মুহূর্তগুলো (বিশেষতঃ বিপ্লবকালে) যখন আদর্শবাদের সঙ্গে মানুষের স্বার্থপর আবেগের সমন্বয় ঘটে তখন ছাড়া তাকে বারবার নাজেহাল হতে হবে। তাছাড়াও রাজনীতিবিদেরা বিভিন্ন বিরোধী দলে বিভক্ত, তারা রাষ্ট্রকেও বিভিন্নভাবে বিভাগ করতে চায়, তবে মাঝে মাঝে অন্যদেশের সঙ্গে যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে তারা আবার দেশকে একত্রিত করার সুযোগ লাভ করে। এ সকল লোক সব সময় হুংকার পরিপূর্ণ তাৎপর্যহীন জীবন যাপন করে। তারা জটিল কিছু ব্যাখ্যা করার দিকে মনোযোগ দিতে পারেনা। তারা যার মধ্যে ভাগাভাগি নেই, তেমন কিছু ব্যাখ্যা করতে পারে না (তারা হয়ত দেশ বিভক্ত করে অথবা জাতিতে বিভেদ ডেকে আনে। অবশ্য তারা এমন কিছু ব্যাখ্যা করে না যা শ্রেণী হিসেবে রাজনীতিবিদদের ক্ষমতাকে সীমিত করে ফেলে।

কিন্তু বিশেষজ্ঞরা কৌতূহলোদ্দিপকভাবে ভিন্ন ধরণের। আইন কানুন মত বিশেষজ্ঞরা এমন এক ধরণের মানুষ যাদের রাজনৈতিক ক্ষমতার প্রতি কোন লোভ নেই। কোন একটা রাজনৈতিক সমস্যা তার ভেতরে যে প্রতিক্রিয়ার সঞ্চার করে তা হলো জনপ্রিয়তার চেয়ে কোনটা অধিকতর উপকারী। কোন কোন ব্যাপারে তার ব্যাপক খুঁটিনাটি জ্ঞান রয়েছে। তিনি যদি সরকারি চাকুরে অথবা কোন ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানের বড় কর্তা হয়ে থাকেন, তাহলে ব্যক্তি বিশেষ সম্বন্ধে সুপ্রচুর অভিজ্ঞতার অধিকারী এবং তিনি কিভাবে কাজ করেন সে সম্বন্ধেও তিনি ধুরন্ধর বিচারক। এসব হলো তার নিজস্ব বিষয়ে নির্ভরযোগ্য মতামত গঠনের অনুকূল প্রেক্ষিত।

সে যাহোক, নিয়মানুসারে তার কতেক পরস্পর সম্বন্ধশীল দোষ রয়েছে। তার যে জ্ঞান তা হলো বিশেষজ্ঞের জ্ঞান, সে জন্যে নিজের বিভাগের প্রয়োজনীয়তাকে তিনি বাড়িয়ে দেখেন। যদি আপনি ক্রমাগতভাবে কোন দন্ত চিকিৎসক, অথবা বৈজ্ঞানিক, চক্ষু বিশেষজ্ঞ অথবা হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ অথবা ফুসফুস বিশেষজ্ঞের কাছে যান, তাদের প্রত্যেকেই আপনাকে তাদের আপন আপন বিষয়ে আরোগ্যের সুন্দর সুন্দর উপদেশ দেবেন। যদি আপনি তাদের সকলের উপদেশ মেনে নিয়ে থাকেন তাহলে চব্বিশ ঘন্টা সময় আপনার স্বাস্থ্য রক্ষার কাজে ব্যয়িত হয়ে যাবে এবং স্বাস্থ্যকে ব্যবহার করবার কোন ফুরসৎ আপনি পাবেন না। রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের নিয়েও একই রকমের ব্যাপার হতে পারে। যদি তাদের সকলের কথা মেনে নেয়া হয় তাহলে জাতির সাধারণভাবে বেঁচে থাকবার কোন সুযোগ থাকবে না।

সরকারি চাকুরের আরেকটা বিরাট দোষ হলো পর্দার অন্তরাল অবস্থান করে তিনি প্রভাবিত করার পদ্ধতিকে চালু করেন। তিনি হয়ত অধিক পরিমাণে মানুষকে প্রভাবিত করাকে অধিকতর গুরুত্ব দিয়ে থাকেন অথবা চোরা গলির পথ অনুরণ করাকে অধিকতর পছন্দ করেন, যার ফলে রাজনীতিবিদেরা কি করছে না জেনে তাদের সিদ্ধান্ত অনুসারে মত দিতে বাধ্য হন। নিয়মানুসারে তিনি অল্পবয়সে প্রথম ভুল করেন এবং মধ্য বয়সে দ্বিতীয় ভুলটি করেন।

বিশেষজ্ঞদের তৃতীয় দোষ হলো যার হাতে শাসন ক্ষমতা তাকে তিনি জনপ্রিয় আবেগের বিচারক হতে পারেন না। তিনি সাধারণতঃ একটা কমিটি সম্পর্কে ভালো জ্ঞান রাখেন, কিন্তু উন্মত্ত জনতাকে তিনি বুঝতে পারেন না। কতেক সুবিবেচনা সম্পন্ন মানুষ এক সঙ্গে বসে যা ভালো বলে গ্রহন করলেন, তা সাধারন্যে প্রচারিত হলে কতকগুলো প্রভাবশালী লোকের জনতার ভাবাবেগের আগুনে নিহত হওয়ার এমন কি সম্ভাবনা রয়েছে সেকথা তিনি বুঝতে পারেন না। আমেরিকার কর্তাব্যক্তিরা যে সব লোককে না পছন্দ করে তাদের বিরুদ্ধে গোয়েন্দা নিয়োগ করেন এবং যদি সে অত্যন্ত ধূর্ত হয় তা হলে কৌশলে তার সঙ্গে মিটমাট করে ফেলে। তখন থেকে হয়ত সে রাজনৈতিক মত পরিবর্তন করে নয়ত নীতিহীন লোক বলে পত্রিকায় তার নিন্দা করা হয়। ইংল্যান্ডে এ পদ্ধতি এখনো তেমন উল্লেখযোগ্যভাবে বিকাশ লাভ করেনি, কিন্তু তার আর বেশি দেরি নাই। যেখানে মন্দ বলতে কোন কিছুই নেই, সেখানে চেতনাহীন মানুষ জনপ্রিয় আবেগকে অনেক সময় আশ্চর্য বস্তু বলে গ্রহন করে। প্রত্যেকেই কামনা করে যে সরকার ব্যয়ভার লাঘব করুক কিন্তু বিশেষ অর্থনীতি সব সময়েই অপ্রিয় হয়ে থাকে। যেহেতু এর ফলে মানুষ বেকার হয়ে পড়ে এবং বেকারেরা মানুষের সহানুভূতি অর্জন করে।একাদশ শতাব্দতে চীনদেশে ওয়ং এন শি নামে একজন সরকারি চাকুরে ছিলেন যিনি সম্রাটকে রাজি করিয়ে সমাজতন্ত্রবাদ প্রয়োগ করার কাজে আত্ননিয়োগ করলেন। এক কর্মব্যস্ত মুহূর্তে তিনি দেশের পণ্ডিত সমাজকে অপমান করলেন এবং ক্ষমতা থেকে বিচ্যুত হলেন। তখন থেকে আজ পর্যন্ত বিস্মৃতির অন্তরাল থেকে কোন চীনা ঐতিহাসিক তাঁর নাম বের করে আনেননি।

বিশেষজ্ঞের চার নম্বরের দোষ হলো তিনি যাদের শাসন করবেন তাদের মতামতকে বিশেষ দাম দেন না এবং জনসাধারণের অপ্রিয় এমন একটি আইনকে চালু করতে হলে তাকে যে বিপদের সন্মুখীন হতে হবে সে সম্বন্ধে তিনি মোটেই ওয়াকেবহাল নন। ডাক্তারদের হাতে যদি ক্ষমতা দেয়া হয় এবং তাদের কথা প্রতিপালিত হলে সংক্রামক রোগের মার্কা মেরে দেয়ার পদ্ধতি তারা আবিষ্কার করতে পারেন। কিন্তু তাদের প্রবর্তিত আইন যদি জনমতের ওপরের স্তরে চলে যায় তাহলে কৌশলে তা ফাঁকি দেয়া হবে। যুদ্ধের সময়ে শাসনের সুবিধা ছিল কারণ জনতা বেশি পরিমাণে যুদ্ধ জয়ের ব্যাপারে আত্মনিয়োগ করেছিল। পক্ষান্তরে তেমন জোরাল আবেদনের মত কোন লক্ষ্য শান্তির আদালত প্রতিষ্ঠা করতে পারেনা।

কোনো বিশেষজ্ঞ কদাচিত অলসতা এবং উদাসীনতাকে বরদাশত করে। যে সকল বিপদ স্পষ্টতর সম্ভাব্য বলে আমাদের চোখে প্রতীয়মান তা এড়িয়ে যাবার জন্যে কিছু কষ্ট স্বীকার করি, কিন্তু বিশেষজ্ঞের চোখে যে সকল বিপদ সম্ভাব্য সেগুলো পরিহার করার জন্যে মোটেই কষ্ট স্বীকার করি না বললেই চলে। আমরা মনে করি টাকাকে আমরা পছন্দ করি এবং হিসেবের বেলায় দিনের আলোর মত পরিস্কার দেখতে পাই বছরে বছরে লাখ টাকা সঞ্চিত হচ্ছে। তা সত্ত্বেও যদি না সমরাস্ত্র হিসেবে টাকাকে না ভাবতাম আমরা এ নীতিকে গ্রহণ করতে পারতাম না। আমরা আমাদের স্বভাবকে আমাদের আয় এবং অনেক সময় আমাদের জীবনের চেয়ে অত্যাধিক ভালোবাসি। যখন কোন ব্যক্তি আমাদের চরিত্রের কোন কোন দোষত্রুটি দেখিয়ে দেয় তখন আমরা তাকে বিষনজরে দেখে থাকি।

সম্ভবতঃ বিশেষজ্ঞেরা বুঝেন না যে যাদের হাতে শাসন কর্তৃত্ব থাকে অত্যাচার করার দিকে তাদের স্পৃহা দ্রুত বর্ধিত হবে, তারা বর্তমানে যেমন অমায়িক আছেন তেমন উচ্চ মানসিকতা সম্পন্ন থাকতে পারবেন না। খুব অল্পসংখ্যক লোকই তাদের চার দিকের যে প্রভাব তাদের চরিত্রের ওপর পড়ে তা অস্বীকার করতে পারেন।

এ সব কারণে, আমরা শুধু সরকারি চাকুরেদের হাতে ক্ষমতা তুলে দিয়ে বর্তমান রাজনীতিবিদদের কৃত দোষ থেকে বাঁচতে পারিনা। সে যাহোক আমাদের ক্রমবর্ধমান জটিল সমাজে বিশেষজ্ঞদের যে প্রভাব রয়েছে, তার চাইতে বেশি প্রভাব থাকা উচিত। বর্তমানে প্রবৃত্তিগত আবেগ এবং শিল্প ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তার মধ্যে এক ঘোরতর সংঘাতের সৃষ্টি হয়েছে। আমাদের মানসিক এবং বস্তুগত পরিবেশ হঠাৎ শিল্পায়নের ফলে রাতারাতি পরিবর্তিত হয়ে গেছে। কিন্তু তার সঙ্গে তাল রেখে আমাদের প্রবৃত্তির পরিবর্তন হয়নি। পরিবর্তিত অবস্থার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেয়ার জন্যে আমাদের স্বভাবের কিছুই করা হয়নি। কিছুসংখ্যক অজ্ঞলোক এখনো আর্দ্র আবহাওয়ার দিনে লাইব্রেরিতে বীবরের লোম রাখে এবং বীবরের লোমে তাদের লাইব্রেরি ঘর ভরে উঠে। এর কারণ একসময় তারা নদীর তীরে বসবাস করত। আমরাও আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা এখনো আমাদেরকে হোমারের যুগের জীব বিজ্ঞানের সঙ্গে খাপ খায় মত যে সকল গুণপনা সেগুলোকে প্রশংসা করতে শিক্ষা দিয়ে থাকে; যদিও সেগুলো হাস্যকর এবং চরম ক্ষতিজনক। প্রত্যেকটা সার্থক রাজনৈতিক আন্দোলনের প্রবৃত্তিগত যে আহ্বান তার মধ্যে হিংসা, ঘৃণা, বিরুদ্ধতার রসায়ন বর্তমান; কখনো পারস্পরিক সহানুভূতির প্রয়োজন নেই। আমাদের প্রাকশিল্পযুগের যে স্বভাব আমরা উত্তরাধিকারসূত্রে লাভ করেছি তার সঙ্গে আমাদের বর্তমান রাজনৈতিক পদ্ধতির মধ্যেও পুরানো সবগুলো স্বভাব আমরা উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছি। এ ব্যাপারে স্বতঃপ্রণোদিত চেষ্টার দ্বারাই আমাদের স্বভাবের মধ্যে পরিবর্তন আসতে পারে।

নিজের দুর্ভাগ্যের জন্য কাউকে ঘৃণা করা আমাদের স্বভাবগত প্রবণতা। যখন দাম বাড়ে তখন আমরা মুনাফালোভীদের দোষ দেই, যখন কমে তখন আমরা পুঁজিপতিদের দোষ দেই। কিন্তু পুঁজিপতিরা যখন দাম বাড়ে তখন কিছু করতে পারেনা কেন এবং দাম কমলে মুনাফলোভীরা কিছু করেন না কেনো, সে খবর পথের মানুষ রাখেনা। সে এটাও নজর করেনা যে মজুরি এবং দাম একসঙ্গে বাড়ে এবং একসঙ্গে পড়ে। যদি সে একজন পুঁজিপতি হয় তাহলে সে চায় মজুরি কমুক এবং দাম বাড়ক। আর যদি সে একজন মজুর হয় তাহলে বিপরীতটাই হবে তার কাঙ্খিত। যখন একজন মুদ্রা বিশেষজ্ঞ বোঝাতে চেষ্টা করেন যে মুনাফাখোর, ট্রেড ইউনিয়ন এবং সাধারণ শ্রমিকদের নাম বড় করার ব্যাপারে খুব বেশি হাত নেই? তখন তিনি জার্মান বর্বরতার প্রতি সন্দেহপরায়ন ব্যক্তির মত সকলেরই নিন্দাভাজন হয়ে পড়েন। আমাদের একজন শত্রুকে কেউ লুণ্ঠন করুক তা আমরা চাইনে। কিন্তু আমরা যখন কষ্ট পাই তখন আমরা কাউকে ঘৃণা করতে চাই। আমরা বোকা বলে কষ্ট পাই, এটা ভাবা খুবই কষ্টকর, কিন্তু সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রে তাই-ই আমরা সত্য বলে মেনে নিয়ে থাকি। সেজন্য ঘৃণা ব্যতিত কোন রাজনৈতিক পার্টির চালিকা শক্তি অর্জন করতে পারেনা; তা কাউকে ঘৃণা করবার জন্য অবশ্যই বের করে আনবে। যদি অমুক অমুক আমাদের দুঃখের কারণ হয়ে থাকে তাহলে চলুন অমুক অমুককে শাস্তি দিয়ে আমরা সুখী হই। ভার্সাই চুক্তি হলো এরকমের রাজনৈতিক ধারণার প্রকৃষ্ট উদাহরণ। তা সত্ত্বেও কেউ কেউ জার্মানদেরকে তাদের পূর্বের স্থানে প্রতিষ্ঠিত করা যায় কিনা সে জন্যে পন্থা অনুসন্ধান করেছে।

আন্তর্জাতিক সমাজতন্ত্রবাদের স্বপক্ষে দুটো গ্রন্থের সঙ্গে মিলিয়ে আমার বক্তব্যবিষয়টিকে স্পষ্ট করে তুলবো। একটা হলো কার্ল মার্কসের ক্যাপিটাল (পুঁজি) অন্যটা সালটারের (SALTER) ALLIED SHIPPING CONTROL (মিত্র শক্তির নৌযান নিয়ন্ত্রণ) স্যার আর্থার সালটার নিজেকে আন্তর্জাতিক সমাজতন্ত্রীবাদী বলে ঘোষণা করেননি; তাহলেও তার এ পরিচয় অসংগত নয়।) দুটো গ্রন্থকে আমরা যথাক্রমে রাজনীতিবিদ এবং সরকারি চাকুরেদের পদ্ধতির প্রতিনিধি হিসেবে ধরতে পারি-যারা অর্থনৈতিক পদ্ধতিতে পরিবর্তন কামনা করেন। মার্কসের লক্ষ্য একটা রাজনৈতিক দলের সৃষ্টি করা, যে দল কালে সবকিছুকে নিয়ন্ত্রণ করবে। সালটারের লক্ষ্য হলো প্রচারিত আইন কানুনের গণ্ডীর ভেতর থেকে শাসকদের প্রভাবিত করা এবং জনসাধারণের সুবিধার দিকে নজর রেখে জনমতের ওপর প্রভাব বিস্তার করা। মার্কস উপসংহারে প্রমাণ করেছেন যে পুজিবাদী পদ্ধতিতে মজুরেরা ভয়ঙ্কর ভাবে শোষিত এবং নির্যাতিত হয়েছে। কমিউনিজমে যে তারা কম ভুগবে একথা তিনি প্রমাণ করেননি নয় শুধু প্রমাণ করতে চেষ্টাও করেননি; তার বলার ভঙ্গি এবং অধ্যায় বিন্যাসের মধ্যে অন্তর্নিহিতভাবে এ বক্তব্যটুকু ব্যক্ত করা হয়েছে। সর্বহারাদের শ্রেণীসংগ্রামের প্রতি দরদ রেখে পড়ে বলে তার ধারণা পাঠককে প্রভাবিত করে পাঠকও নজর করে দেখেনা যে সে কথা প্রমাণ করা হয়নি। আবার মার্কস পরিষ্কারভাবে সামাজিক বিকাশের ধারা থেকে নৈতিকতার প্রশ্নকে একেবারে বর্জন করেছেন, রিকার্ডো এবং ম্যালথাসের এত তিনিও বলেছেন অর্থনীতির অপ্রতিরোধ্য নিয়মের ধারা অনুসারে সমাজের বিকাশ হয়েছে। কিন্তু রিকার্ডো এবং ম্যালথাস মনে করেছেন যে অপ্রতিরোধ্য অর্থনৈতিক আইন অপ্রতিরোধ্যভাবে ধনিক শ্রেণীর সুখ সম্পদের বৃদ্ধি এবং মজুরদের জন্য অফুরন্ত দুঃখের আমদানি করেছে। পক্ষান্তরে টালিয়ানের (Tertullian) মতো মার্কসের একটি গোপন বক্তব্যময় ভবিষ্যতের কল্পনা ছিল, যে ভবিষ্যতে তার শ্রেণীর লোকেরা সার্কাস দেখবে আর বুর্জোয়ারা চিৎকার করতে করতে মারা যাবে। যদিও মার্কস মানুষকে ভালো অথবা মন্দ হিসেবে না দেখে, শুধুমাত্র অর্থনৈতিক প্রতীক হিসেবে দেখতে ভবিষ্যদ্বাণী করে গেছেন তা সত্ত্বেও তিনি বুর্জোয়া সমাজকে নষ্টের মূল এবং তার শানানো আক্রোশ মজুরদের মধ্যে অনুপ্রবিষ্ট করবার জন্যে তিনি কাজ করতে বলেছেন। মার্কসের পুঁজি বা ক্যাপিটাল, ব্রাইস রিপোর্টের মত অনেকগুলো হিংসাত্মক গল্পের সংকলন যেগুলো এমন ভঙ্গিতে রচনা করা হয়েছে যা পড়লে পড়ে শত্রুর বিরুদ্ধে সামরিক চ্যালেঞ্জ করার স্পৃহা জাগরিত হয় এবং অত্যন্ত স্বাভাবিক যে শক্রর সামরিক মনোবৃত্তিতে তা ঘা দেয়। এভাবে তা শ্রেণীতে শ্রেণীতে সংগ্রাম ডেকে আনে, যা আগে ভবিষ্যদ্বাণী করা হয়েছে। গভীরতর ঘৃণা এবং জিঘাংসা তাঁকে অনুপ্রাণিত করেছিল বলে কার্ল মার্কস এমন একটা প্রচণ্ড শক্তিধর রাজনৈতিক শক্তির কথা প্রমাণ করতে পেরেছিলেন। বাস্তব উদাহরণ দিয়ে তিনি পুঁজিপতিদেরকে নৈতিকতাবিহীন ঘৃণ্য জীব বলে প্রমাণ করেছিলেন।

সালটার সাহেবের ‘মিত্র শক্তির নৌযান নিয়ন্ত্রন’ গ্রন্থে আমরা সোজাসুজি এর বিপরীত ভাবাদর্শের সন্ধান পাই। সালটার আন্তর্জাতিক সমাজতন্ত্রবাদের একটা পদ্ধতিকে শাসন করার যে সুযোগ পেয়েছিলেন, মার্কসের তা ছিল না। এই পদ্ধতির উদ্ভব হয়েছিল জার্মানদের হত্যা করার জন্য পুঁজিবাদীদের হত্যা করার জন্য নয়। যেহেতু তারা অর্থনৈতিক সমস্যার প্রতি উদাসীন ছিল সে জন্য সালটারের বই তাদের ওপর ভিত্তি করে লেখা হয়েছে। তখন অর্থনৈতিক সমস্যাটি ছিল এ রকম যে সৈন্যেরা, যুদ্ধাস্ত্র নির্মাতারা, যুদ্ধাস্ত্র নির্মাণের কাঁচামাল সরবরাহকারীরা সকলেই অলসভাবে সময় কাটাচ্ছে এবং বাকি সকলকে সব কাজ করতে হচ্ছে অথবা যেনো হঠাৎ ঘোষণা করা হলো যে আগে যে পরিমাণ কাজ করা হতো, এখন থেকে তার অর্ধেক কাজ করা হবে। যুদ্ধের অভিজ্ঞতা আমাদের এ সমস্যার একটি কারিগরী সমাধান দিয়েছে কিন্তু কোন মনস্তাত্ত্বিক সমাধান এ পর্যন্ত দেয় নি। তার কারণ হলো জার্মানদের প্রতি ঘৃণা এবং জার্মানদের ভয়ের দরুন যুদ্ধের সময়কালীণ বছরগুলোতে যে সহানুভূতি এবং পরস্পর নির্ভরশীলতা দেখা গেছে, শান্তির সময় কী রকম ক্রিয়া করবে তা এখনো পরীক্ষিত হয়নি।

সালটার বলেন (পৃঃ ১৯)

“সম্ভবত পেশাদার অর্থনীতিবিদদের দৃষ্টি আকর্ষন করার মতো এ মুহূর্তে অন্য কোনো কাজ নেই, রাষ্ট্রায়ত্ব করার নীতি পক্ষ অথবা বিপক্ষের প্রতি কোন রকম মোহ না রেখে বর্তমান যুদ্ধের সময়ে প্রকৃত অবস্থা কী তা বৈজ্ঞানিক দৃষ্টি ভঙ্গীসহকারে বিচার করাই তাদের কর্তব্য হয়ে পড়েছে। প্রথমতঃ দৃশ্যমান যে বাস্তব কাজ তাদের করতে হবে, তা এতই মারাত্মক যে অন্ততপক্ষে তার ফলে স্বাভাবিক অর্থনৈতিক জীবনযাত্রার সঙ্গে একটা সংঘাত অনিবার্য। একটি মোহমুক্ত পেশাদার অনুসন্ধান এসব উপাদান এবং অন্যান্য কারণের প্রতি যথেষ্ট প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। যুদ্ধের সময়ে এ সব পদ্ধতির সাফল্য আসলেই যৌক্তিক মতভেদের বাইরে। ব্যক্তি উৎপাদনের ক্ষেত্রে খসড়া হিসাবে দেখা গেছে যে যুদ্ধের আগে যে সকল লোক বেকার ছিল তারা এবং দেশের তিন ভাগের দু ভাগ উৎপাদন শক্তিকে সৈন্য বিভাগে অথবা অন্যান্য যুদ্ধের কাজে নিয়োগ করা হয়েছে। তার পরেও গ্রেটবৃটেন তার সম্পূর্ণ সামরিক শক্তিকে পুষে বেসামরিক জনসাধারণের জন্য যে জীবনযাত্রার মান বজায় রেখেছিল অসহনীয়ভাবে তা নিম্নতর ছিল না এবং কিছুদিনের জন্য কিছু শ্রেণী শান্তির সময়ে যেমন জীবনযাপন করত তেমনি আরামের সঙ্গে জীবনযাপন করেছে। এর জন্য বৃটেন বাইরের কোন দেশ থেকে কোন সাহায্য আনয়ন করেনি, নিজের সংগ্রহ থেকেই চালিয়েছে। ধার করা টাকায় আমেরিকা থেকে যত আমদানি করেছে ঋণ দেয়া টাকায় সে তার চেয়ে বেশি মিত্র দেশ সমূহকে দিয়েছে। তার যুদ্ধসম্ভার এবং জনসাধারণের প্রয়োজন চলতি উৎপাদনের সামান্য অংশমাত্র নিয়োজিত ছিল।” শান্তিকালীন বাণিজ্যনীতি প্রসঙ্গে তিনি আরো বলেছেন, শান্তির সময়ে অর্থনৈতিক পদ্ধতি কোন উপযুক্ত নিয়ন্ত্রণের অধীন ছিল না। যুদ্ধের সময়ের এ পদ্ধতি ঐ অবস্থাতেই যতই অপ্রচুর এবং দোষাবহ হোকনা কেন, যে ভাবে যুদ্ধের বিচিত্র প্রয়োজন মেটাতে পেরেছে তা স্মর্তব্য। কিন্তু নতুন মান অনুসারে তা অন্ধ এবং অপচয়শীল বলে প্রমাণিত হয়েছে। উৎপাদন করেছে খুবই স্বল্প খারাপ জিনিস এবং খারাপ মানুষের মধ্যে তা বিলি বন্টন করা হয়েছে।” (পৃঃ ১৭)

যে পদ্ধতি যুদ্ধের ফলে ধীরে ধীরে জন্মলাভ করল, ১৯১৮ সালে তা সম্পূর্ণ প্রয়োজনীয় বৈশিষ্ট্যসহ আন্তর্জাতিক সমাজতন্ত্রবাদের রূপ পরিগ্রহ করে। মিত্র সরকার যৌথভাবে খাদ্য এবং কাঁচামালের একমাত্র ক্রেতা ছিল এবং তাদের দেশে নয় শুধু ইউরোপের নিরপেক্ষ দেশগুলোতেও কি কি আমদানি করা হবে, তা নির্ধারণ করার একমাত্র বিচারক ছিল তারাই। কাঁচামালের নিয়ন্ত্রন করে উৎপাদনব্যবস্থাকে নিরঙ্কুশভাবে তারাই নিয়ন্ত্রণ করেছিল এবং ফ্যাক্টরির ব্যাপারে পর্যন্ত রেশনিং ব্যবস্থা প্রবর্তন করেছিল। খাদ্য বস্তুর খুচরা বিক্রয়ও তারা নিয়ন্ত্রণ করেছিল। তারা খাদ্যবস্তু বিক্রয়ের পরিমাণ এবং দর বেঁধে দিয়েছিল। সমুদ্র তীরবর্তী পরিবহন সংস্থার মাধ্যমে তাদের আদেশ প্রতিপালিত হতো এবং যুদ্ধের শেষাশেষি তারা বিশ্বের সমস্ত জাহাজ চলাচল ব্যবস্থার দণ্ডমুণ্ডের কর্তা হয়ে বসল। সে কারণে আমদানি রপ্তানি বাণিজ্যের হুকুম দেয়ার অধিকার তারা লাভ করল। পদ্ধতিটি সমস্ত রকমের বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত একটি আন্তর্জাতিক সমাজতন্ত্রের মত ছিল, প্রাথমিকভাবে যা বৈদেশিক বাণিজ্যের ব্যাপারে প্রয়োগ করা হয়েছে। কিন্তু একই পদ্ধতি আবার রাজনৈতিক সমাজতন্ত্রবাদীদের বিরাট অসুবিধার সৃষ্টি করেছিল।

এই পদ্ধতির সবচেয়ে বিদঘুঁটে বৈশিষ্ট্য হলো এই পদ্ধতি ধনিক পুঁজিবাদী, শ্রেণীর কোন বিরুদ্ধাচরণ না করেই প্রবর্তন করা হয়েছিল। যুদ্ধকালীন রাজনীতির একটি উল্লেখ্য বৈশিষ্ট্য হলো কোন রকমেই জনসংখ্যার কোন শ্রেণীকে বিরুদ্ধাচরণ করতে দেয়া হয় না। দৃষ্টান্তস্বরূপ জাহাজ চলাচলের সঙ্কটময় পরিস্থিতিতে যুক্তি দেখানো হয়েছিল যে সাধারণ মানুষের হাতে অসন্তোষের ভয়ে অস্ত্রশস্ত্র দেয়ার বেলায় খাদ্যের চেয়েও অধিকতর কড়াকড়ি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। পুঁজিবাদীদের হাত থেকে কিছু হস্তান্তর করা খুব বেশি কষ্টকর এবং প্রকৃত প্রস্তাবে পরিবহণ ব্যবস্থা কোন গুরুতর সংঘর্ষ ব্যতিরেকে সার্থকভাবে শেষপর্যন্ত চালু রইল। বিশেষ বিশেষ শ্রেণীর মানুষ দুষ্ট তাদেরকে অবশ্যই শাস্তি দেয়া উচিত এর পেছনে তাদের এ উদ্দেশ্য ছিল না। তাদের উদ্দেশ্য ছিল শান্তিকালীন পদ্ধতি যুদ্ধের সময় সক্রিয় নয়, সুতরাং সবদিক দিয়ে কম পরিশ্রম করে একটি নতুন পদ্ধতি প্রতিষ্ঠা করা। যুদ্ধের সময়ে জাতির যখন দুর্দিন, সরকার যা করা প্রয়োজনীয় মনে করল তাতে জনসাধারণের সমর্থন আদায় শান্তির সময়ে যত কষ্টকর এখন অত কষ্টকর হবে না বিবেচনা করল। কিন্তু শান্তির সময়েও সমর্থন আদায় খুব কষ্টকর হতোনা। যদি শ্ৰেণীবৈরিতা না-দেখিয়ে শাসনতান্ত্রিক দৃষ্টিকোণ হতে উপযুক্তভাবে সবকিছু তুলে ধরা হতো।

যুদ্ধকালীন শাসনের অভিজ্ঞতা হতে দেখা গেছে যে সরকার কাঁচামাল, বৈদেশিক বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করলে এবং ব্যাঙ্কসমূহে রাষ্ট্রীয়করণ করলে সমাজতান্ত্রিকীকরণের অনেকগুলো সুবিধা প্রত্যাশিত (Stabilization) স্থিরীকরণের ওপর লয়েড যে মূল্যবান বইখানা লিখেছেন তাতে এ মতবাদের সম্পূর্ণ বিকাশ ঘটেছে, তা সমস্যাকে বৈজ্ঞানিকভাবে বিশ্লেষণের একটি নির্দিষ্ট প্রচেষ্টা বলে আমরা ধরে নিতে পারি, যা পরীক্ষা করার ভার যুদ্ধ সরকারি কর্মচারীদের ওপর চাপিয়েছে।

বাস্তব দৃষ্টিকোণ থেকে স্যার আর্থার সাল্টার এর বইটির প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো তাতে তিনি আন্তর্জাতিক সহযোগিতার পদ্ধতি সম্বন্ধে যে বিশ্লেষণ করেছেন তার বাস্ত ব প্রয়োগ খুবই ফলপ্রসূ প্রমাণিত হয়েছে যে কোন দেশের পক্ষে আলাদাভাবে কোন সমস্যা বিচার করবার রেওয়াজ তখন ছিল না এবং অন্যান্য শক্তির সঙ্গে দরকষাকষি করে কতো বেশি সুবিধা অর্জন করা যায় সে জন্যে দেশে দেশে কূটনৈতিক সম্বন্ধ স্থাপন করা হয়েছিল। গৃহীত পরিকল্পনার প্রত্যেকটি খুঁটিনাটি প্রশ্ন বিচার করার জন্যে আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ কমিটি নিয়োগ করা হলো, যাতে করে জাতিতে জাতিতে সংঘাত না-বাধিয়ে পণ্যে পণ্যে সংঘাত বাধায়। হুইট কমিশন কয়লা কমিশনের সঙ্গে দরকষাকষি করত এবং অন্য সব ব্যাপারেও এরকম দরকষাকষি চলতো। প্রত্যেক কমিশনের সুপারিশ হলো মিত্র শক্তির দেশগুলোর বিশেষজ্ঞ প্রতিনিধির আপোষ আলোচনার ফল। প্রকৃতপ্রস্তাবে সর্বোচ্চ যুদ্ধ পরিষদের অপরিহার্য ক্ষমতা ছাড়া সর্বত্র আন্তর্জাতিক শ্রমিকতন্ত্রবাদের মত রূপ পরিগ্রহণ করল। এর তাৎপর্য হলো কোন সার্থক আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানে প্রত্যেকটা কর্ম অবশ্যই আলাদা আলাদাভাবে সম্পন্ন করবে এবং শুধুমাত্র জাতিভিত্তিক সংগঠনের বিরোধ ফয়সালা করার জন্যে একমাত্র আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান থাকলেও চলবেনা।

যে কেউ সালটারের বই পড়ে জানতে পারবে যে মিত্রশক্তির মধ্যে যুদ্ধকালীন সময়ে যে আন্তর্জাতিক সরকারের প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল, শান্তির সময়েও যদি তা করা হতো সর্বত্র, তাহলে পৃথিবীর অধিবাসীদের বাস্তব মানসিক এবং নৈতিক প্রভূত উন্নতি সাধিত হবে। এ ব্যবস্থার প্রবর্তন করা হলে ব্যবসায়ীদের কোন ক্ষতি হবে না, বরঞ্চ তাদেরকে স্থায়ীভাবে প্রতিশ্রুতি দেয়া যাবে যে গত তিন বছরের মুনাফা পেনশনের মত করে নিশ্চিতভাবে তাদের দেয়া হবে। এর ফলে বেকার সমস্যা, যুদ্ধভীতি, অভাব-দুর্ভিক্ষ কমবে এবং বেশি উৎপাদন সম্পূর্ণভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যাবে। মি. লয়েড-এর বইতে এর স্বপক্ষের যুক্তি এবং পদ্ধতি যথাযথভাবে সন্নিবেশিত হয়েছে। এ সকল স্পষ্ট সার্বিক সুযোগ সুবিধা থাকা সত্ত্বেও এ ধরণের প্রতিষ্ঠানের সম্ভাবনা আন্তর্জাতিক বিপ্লবী সমাজতন্ত্রবাদের চেয়েও অনেক কম। বিপ্লবী সমাজতন্ত্রবাদের বিপদ হলো তা প্রবল বিরোধীতার জন্ম দেয় এবং সরকারি চাকুরেদের সমাজতন্ত্রবাদের কোন সমর্থন পাওয়া যাবে না। কোন রাজনৈতিক প্রচেষ্টার প্রতি মানুষ তখন বিরোধিতা করে যখন সে মনে করে তা তাকে ধ্বংস করবে এবং তখনই সমর্থন করবে। (এগুলো সাধারণতঃ মনের অবচেতনে থাকে) যখন সে আশা করে এর ফলে তার শত্রুরা ধ্বংসপ্রাপ্ত হবে। সুতরাং কোন নীতি যদি কাউকে আঘাত না করে তাহলে কারো সমর্থন পাবেনা। যে নীতি অধিকাংশ মানুষের সমর্থন পাবে তাকে প্রবল অসুবিধারও সম্মুখীন হতে হবে। শিল্পতন্ত্রবাদ বিশ্বভিত্তিক সহযোগিতার নতুন প্রয়োজনের জন্ম দিয়েছে এবং সে সঙ্গে একে অন্যকে শত্রুতা করে ধ্বংস করার উন্নত কৌশলেরও জন্ম দিয়েছে। পার্টি রাজনীতিতে একমাত্র প্রতিহিংসার আবেদনই প্রবৃত্তিগত সাড়া জাগাতে সক্ষম; কিন্তু যে মানুষ পারস্পরিক সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তার কথা বলে তার হাতে কোন শক্তি নেই। যদি শিক্ষাব্যবস্থাকে পুরুষানুক্রমে নতুন খাতে চালনা না করা হয়, পত্রিকাতে ঘৃণা বিদ্বেষের বাণী ছড়ানো বন্ধ না করা হয়, তাহলে আমাদের বর্তমান রাজনৈতিক পদ্ধতিতে ক্ষতিকর নীতি প্রয়োগের কখনো অবসান ঘটবে না। তাহলেও শিক্ষাব্যবস্থার পরিবর্তন করার কোন উল্লেখযোগ্য পন্থা আমাদের জানা নেই, আমাদের রাজনৈতিক পদ্ধতিতে পরিবর্তন না আনা পর্যন্ত সংবাদপত্রে কোন পরিবর্তন আনা সম্ভবপর নয়। এই শখের-করাতের মত অবস্থা থেকে সাধারণভাবে কাজ করে রক্ষা পাওয়ার কোন উপায় নেই। আমার মতে, আমরা যত বেশি লোক পারি; সময়ে অসময়ে যে পার্টির আকর্ষণীয় কর্মসূচী আমাদের সামনে তুলে ধরা হয় তাতে বিশ্বাস স্থাপন না করে রাজনৈতিক সংশয়বাদী হয়ে পড়লেই সবচেয়ে বেশি লাভের সম্ভাবনা। অনেক স্নিগ্ধমস্তিষ্ক বিবেকবান মানুষ, এইচ, জি, ওয়েলসও বিশ্বাস করেছিলেন যে গত যুদ্ধই যুদ্ধের শেষ। তাদের এ বিশ্বাস যে অলীক মরীচিকা তা এখন তারা হৃদয়ঙ্গম করতে পেরেছেন। আবার অনেক বিবেকবান শান্ত মানুষ বিশ্বাস করেন যে মার্কসীয় শ্রেণী সংগ্রমই হবে শেষ সংগ্রাম। যদি সে দিন কখনো আসে তাঁরাও যে অলীক মরীচিকায় বিশ্বাস স্থাপন করেছেন সে সময়ে যদি বেঁচে থাকেন তাহলে বুঝতে পারবেন। কোন সুবিবেচক ব্যক্তি যদি জোড়াল কোন রাজনৈতিক আন্দোলনে বিশ্বাস করেন,তাহলে তিনি সে সুসংগঠিত অমঙ্গলকে দীর্ঘস্থায়ী হতে সাহায্য করছেন যা আমাদের সভ্যতাকে ধ্বংস করেছে। অবশ্য এটাকে আমি চূড়ান্ত আইন বা নিয়ম বলে স্থাপন করতে চাইনে, কারণ আমাদের সন্দেহবাদ সম্বন্ধেও সন্দেহ পরায়ন হতে হবে। কিন্তু যদি একটি রাজনৈতিক পার্টির একটি নীতি থাকে। যেমন অনেকরই আছে তা যখন একটি ভালো করতে গিয়ে অনেক গুলো ক্ষতি করে, তখন রাজনৈতিকদের সন্দেহাত্নক কর্ম সম্বন্ধে সংশয়বাদী হওয়ার গুরুত্ব অপরিসীম। মনঃসমীক্ষার দৃষ্টিকোণ থেকে আমরা খুবই সহজে সন্দেহ করতে পারি যে নীতিকে আকর্ষণীয় করে তোলার জন্যে প্রচুর ক্ষতি করা হয়, প্রকৃত মঙ্গল প্রকৃতিকে বিচারবুদ্ধিসম্মত করে রচনার মধ্যেই নিহিত।

ব্যাপকভাবে রাজনৈতিক সংশয়বাদ সম্ভবপর। মনস্তাত্ত্বিক দিক দিয়ে জাতি অথবা সামাজিক শ্রেণীর প্রতি বিদ্বেষ না পোষণ করে রাজনৈতিকদের প্রতি আমাদের শত্রুতার দৃষ্টি নিবদ্ধ করতে হবে। রাজনৈতিকদের সাহায্য ব্যতিরেকে শত্রুতা ক্রিয়াশীল হবে না, যে শক্রতার লক্ষ্য তারা তা হতে পারে কারো মনস্তাত্ত্বিক সন্তষ্টির পরিচায়ক কিন্তু সামাজিকভাবে ক্ষতিকর নয়। উইলিয়াম জেমসের অনুভূত অভাব পূরণ করার জন্য যেমন প্রয়োজন তেমনি নৈতিকতাকে এমন উর্ধ্বে প্রতিষ্ঠিত করা উচিত বলে আমি মনে করি “নৈতিকভাবে যা হবে যুদ্ধের সমার্থক” হতে পারে সত্য, এর ফলে রাজনীতি দুষ্ট লোকদের হাতে পরতে পারে (যে সব লোককে আমি এবং আপনি না পছন্দ করি। কিন্তু তারও একটা সুফল থাকতে পারে। আমি ১৯২৩ সনের ২৬শে সেপ্টেম্বরের ফ্রিম্যান কাগজে একটা গল্প পড়েছিলাম যা রাজনৈতিক বাটপারির প্রয়োজনীয়তার একটা চূড়ান্ত নজির বলে বিবেচিত হতে পারে। একজন ইংরেজ একজন বয়স্ক “জাপানি রাজনীতিবিদের সঙ্গে বন্ধুত্বের সম্বন্ধ পাতানোর পর জিজ্ঞেস করলেন “জাপানি ধনীরা অসাধু এবং চীনারা সাধু কারণ কি? তিনি জবাব দিলেন, কিছুদিন আগে থেকে চীনা রাজনীতিতে ভয়ঙ্কর রকমের দুর্নীতি অনুপ্রবেশ করেছে এবং চীনা আদালতে হঠকারিতা ন্যায়বিচারের স্থান দখল করেছে। সুতরাং তখন থেকে উজ্জ্বলতা এবং ধ্বংসের হাত থেকে ব্যবসাকে রক্ষা করার জন্যে চীনা ব্যবসায়ীরা কঠোর নৈতিকতা বজায় রাখতে বাধ্য হলো। তখন থেকে চীনা ব্যবসায়ীদের মুখের কথা তার হাতে লেখা দলিলের মতো হয়ে দাঁড়াল। কিন্তু জাপানের ব্যবসায়ীরা এরকম কোন অবস্থার সম্মুখীন হয়নি কারণ পৃথিবীতে একমাত্র আমাদেরই সবচেয়ে সৎ আইন ব্যবস্থা রয়েছে। সুতরাং যখন আপনি একজন জাপানির সঙ্গে ব্যবসা করেন হুঁশিয়ার হয়ে করবেন।” এই গল্প থেকে প্রমাণিত হয় যে অসাধু রাজনৈতিকরা সাধু রাজনৈতিকদের চেয়ে বেশি ক্ষতি করে।

একজন সৎ রাজনৈতিক সম্বন্ধে ধারণা পোষণ করা খুব সহজ নয়। সৎ রাজনৈতিকের খুব সহনশীল সংজ্ঞা হলো তিনি ব্যক্তিগত লাভ লোভের বশবর্তী হয়ে কোন রাজনৈতিক কর্মে আত্মনিয়োগ করেন না। এই অর্থে মি. লয়েড জর্জকেও সৎ বলা যায়। তার পরবর্তী পর্যায়ে যে লোকের কথা আসবে সে লোক কেবলমাত্র অর্থনৈতিক লক্ষ্য ছাড়া ক্ষমতা লাভ এবং ক্ষমতা অটুট রাখার জন্য রাজনৈতিক কর্মে আত্মনিয়োগ করেন না। এই অর্থে লর্ড গ্রেকেও একজন সৎ রাজনৈতিক বলে অভিহিত করা যায়। শেষ এবং কঠোর অর্থে তিনি একজন সৎ রাজনৈতিক, যিনি জনসাধারণের কাজ নিস্পৃহতাসহকারে করে থাকেন। কিন্তু সত্যবাদিতা এবং সম্মানের জন্য পরিচিতরা তাকে কখনো নীচ দৃষ্টিতে দেখে না। এই অর্থে স্বৰ্গতঃ লর্ড মর্লি ছিলেন একজন সৎ রাজনৈতিক। সতোর কারণেই রাজনীতি থেকে তিনি বিতাড়িত হয়েছিলেন। কিন্তু যে রাজনীতিবিদ সৎ উচ্চতর অর্থে তিনিও ক্ষতি করেন, তৃতীয় জর্জকে এর দৃষ্টান্ত হিসেবে গণ্য করা যায়। বোকামি এবং অচেতন পক্ষাপাতিত্ব প্রতিহিংসার চেয়েও বেশি ক্ষতি করে। অধিকন্তু একজন সৎ রাজনৈতিক গণতন্ত্র সহ্য করেনা যদি না তিনি ডেভোনশায়ারের ডিউকের মতো ধড়িবাজ হতে না পারেন। কেবলমাত্র ধড়িবাজেরা জাতির অর্ধেক মানুষের কুসংস্কারে অংশগ্রহণ করতে পারে। সুতরাং যে লোক সক্ষম ও জনগণ সম্বন্ধে উৎসাহী তাকে রাজনীতিতে সাফল্য লাভ করতে হলে অবশ্যই কপট হতে হবে। কিন্তু সময়ে তার কপটতা তার প্রতি জনগণের ভালোবাসাকে হত্যা করবে।

গণতন্ত্রের বর্তমানে দোষত্রুটিকে দূরীভূত করতে হলে এখন যে পদ্ধতিটি আমাদের প্রধানতঃ অবলম্বন করা উচিত, তাহলে প্রতিটি বিষয়ে প্রচারের জন্যে সরকারি কর্মচারীদের আরো উৎসাহী হতে হবে এবং এব্যাপারে তাদের আরো উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। সময় সময়ে তাদের নিজের নামে বিল পাশ করাবার অধিকার থাকা উচিত এবং জনসাধারণের সামনে তার সমর্থনে যুক্তি পেশ করা তাদের কর্তব্য হওয়া উচিত। অর্থ এবং শ্রমের ওপর আন্তর্জাতিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়ে গেছে এবং তাদের উচিত একটি আন্তর্জাতিক সংস্থা গঠন করে, তার মাধ্যমে এ পদ্ধতি বিভিন্ন দেশের মধ্যে ব্যাপকভাবে প্রয়োগ করার চেষ্টা করা, যাতে করে পদ্ধতিটি দীর্ঘকালব্যাপী টেকসই হতে পারে। আলোচনার মাধ্যমে একটি সার্বজনীন পদ্ধতি গ্রহণ করতে হবে। এইভাবে সব সমস্যার সমাধান করতে হবে। এটা সম্ভব নয় এবং আশা করাও উচিত নয় যে গণতান্ত্রিক পার্লামেন্টে বিতর্ক করে সব সমস্যার সমাধান করতে হবে। কোন চেষ্টাকে ফলবতী করে তুলতে হলে পরিপূর্ণ আলোচনার সঙ্গে বিশেষজ্ঞদের মতামতের সমন্বয় বিধান করে সাধারণ নাগরিকদের মধ্যে তা প্রচার করতে হবে। কিন্তু এখন অনেক ব্যাপারে বিশেষজ্ঞদের সুচিন্তিত মতামত কী তা জনসাধারণ জানতে পারে না, এর কারণ তাদের সমষ্টিগত অথবা অধিকাংশের সমর্থন আলাদা করার মতো কোন যন্ত্র এখন পর্যন্ত সম্পূর্ণভাবে চালু করা হয়নি। বিশেষ করে সরকারি কর্মচারীদেরকে তাদের মতামত বিশেষ বিশেষ অরাজনৈতিক ক্ষেত্র ছাড়া জনসাধারণকে জানতে দেয়া হয় না। আন্তর্জাতিক আলোচনার পর পার্টিগত বিভেদের বিরুদ্ধে তাকে প্রয়োগ করলে পরে যে সকল মতভেদ আমরা এখন স্বতঃসিদ্ধ বলে ধরে নিয়েছি তার কড়াকড়ি অনেকটা হ্রাস পাবে। আমি বিশ্বাস করি, আন্তর্জাতিক শ্রম এবং আন্তর্জাতিক অর্থ সম্মেলন যদি জাতিসমূহের পারস্পরিক অবিশ্বাস নিরসন করতে সক্ষম হয় তাহলে এমুহূর্তে এমন একটি সিদ্ধান্ত এরকম হতে পারে যা পার্লামেন্টে চালু করা যাবে। কয়েক বছর পর এবং জগতের প্রভূত উপকার করা যাবে এ সম্মিলিত প্রচেষ্টার বিরোধিতা করা খুবই কষ্টকর হয়ে দাঁড়াবে। •

মানুষের দৈনন্দিন সমস্যা বিভিন্নমুখী এবং গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু আমাদের রাজনৈতিক যন্ত্র বিভিন্ন পার্টি এবং জাতির ক্ষমতার দ্বন্দ্বে এ সমস্যাকে খুবই লঘু দৃষ্টিতে দেখে। আইনতঃ অথবা সংবিধানগত কোন পরিবর্তন না ঘটিয়ে একটি ভিন্নরকম যন্ত্র সৃষ্টি করা অসম্ভব নয়। যা জাতির অথবা পার্টিগত ভাবাবেগ নিরোধ করে শুধুমাত্র শত্রুদের নিপাত না করে যে সকল প্রচেষ্টা সকলের জন্য উপকারী তার উদ্যোগ গ্রহণ করতে সমর্থ হবে। আমার পরামর্শ হলো, স্বদেশে পার্টি সরকার এবং বিদেশে বৈদেশিক অফিসে কূটনীতির মাধ্যমে না করে, যেমন বলেছি তেমনি স্বতঃস্ফূর্তভাবে অনুসন্ধান করলে বর্তমান সভ্যতাকে যা ধ্বংস করেছে, তা নিরোধের একটি পন্থা পাওয়া যাবে জ্ঞান সব সময়েই তাকে, সদিচ্ছাও সবসময়ে থাকে, কিন্তু যে পর্যন্ত না জ্ঞান এবং সদিচ্ছা প্রচারের মধ্যেই শক্তি অর্জন করে।

১২. স্বাধীন চিন্তা এবং সরকারী প্রচারণা

মন কিউর কনওয়ে যার সম্মানার্থে আজ আমরা সকলে এখানে সমবেত হয়েছি, তিনি চিন্তার স্বাধীনতা এবং ব্যক্তিস্বাধীনতা এই দুই মহান লক্ষ্যের জন্য প্রাণপাত করেছেন। এ দু’ বিষয়ে তাঁর সময় থেকে এ পর্যন্ত অনেক নতুন কিছুর প্রকাশ এবং অনেক কিছুর বিলোপ ঘটেছে পুরনো যুগের তুলনায় নতুন বিপদ আলাদাভাবে এ দু’জাতীয় স্বাধীনতা হরনের ভীতি প্রদর্শন করেছে। এ দু’রকমের স্বাধীনতা সংরক্ষণ করার জন্য যদি অতন্দ্র জনমতকে জাগরিত করা না হয় তাহলে আজ থেকে একশ বছর পর্যন্ত এ-দুরকমের স্বাধীনতার ঘাটতি পূরণ হবে না। আমার এ প্রবন্ধের উদ্দেশ্য দোষগুলোকে দেখানো এবং কিভাবে সেগুলোর সঙ্গে মোকাবেলা করা যায় তা বিবেচনা করা।

স্বাধীন চিন্তা বলতে কি বোঝায় তাই নিয়ে আমাদের আলোচনা শুরু করা যাক। এ বক্তব্যের আবার দু’রকম তাৎপর্য আছে। সংকীর্ণ অর্থে স্বাধীন চিন্তা বলতে প্রাচীন ধর্মসমূহের মতবাদকে অস্বীকার করা বোঝায়। এ অর্থে যে লোক মুসলমান, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান, সিন্টো ধর্মমত অথবা উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত অন্য কোন মতবাদকে সত্য বলে বিশ্বাস করেন না তাঁকে স্বাধীন চিন্তাবিধ বলা যায়। খ্রিষ্টান অধিবাসীদের দেশে যে মানুষ আল্লাহকে বিশ্বাস করেন না তাঁকে স্বাধীন চিন্তাবিদ বলা হয়, আবার বৌদ্ধদের দেশে শুধুমাত্র স্রষ্টার প্রতি অবিশ্বাসই স্বাধীন চিন্তাবিদ হওয়ার প্রয়োজনীয় গুনাবলী নয়।

এ অর্থে স্বাধীন চিন্তার প্রয়োজনীয়তা আমি কম করে দেখতে চাইনে। আমি নিজে সর্ব প্রকার ধর্মমতকে অধিকার করি এবং বিশ্বাস করি যে সব প্রকারের ধর্ম বিশ্বাসের বিলয় ঘটবে। ধর্মীয় বিশ্বাস আল্লাহকে পাওয়ার শক্তি বিশেষ একথায় আমি সম্পূর্ণরূপে বিশ্বাস করি না। আমি সব সময় স্বীকার করতে রাজি আছি বিশেষ বিশেষ যুগের বিশেষ বিশেষ স্থানে ধর্মের কিছু সুফল ফলেছে, তখন ছিল মানুষের বিচার বুদ্ধির শৈশব অবস্থা আমরা এখন সে স্তর অতিক্রম করে যাচ্ছি।

কিন্তু এ ছাড়াও স্বাধীন চিন্তার বৃহত্তর দিগন্ত রয়েছে, আমি তার প্রয়োজন আরো তীক্ষ্ণতম বলে মনে করি। প্রকৃত প্রস্তাবে পুরনো ধর্মগুলো যে মানুষের উদারতার দিগন্ত সম্বন্ধে চিন্তার পথ রুদ্ধ করেছে এ সত্য অনুসন্ধান করলে জানা যাবে সংকীর্ণ অর্থে স্বাধীনচিন্তাকে যত সহজে সংজ্ঞায়ন করা তত সহজ নয় এবং এর মূল তাৎপর্যে পৌঁছুতে হলে কিছু সময় ব্যয় করা সুবিধাজনক হবে।

যখন আমরা কোন কিছুকে স্বাধীন বলি তা কী এবং কিসের থেকে স্বাধীন তা–বলা পর্যন্ত কোন সুনিদিষ্ট অর্থ ফুটে উঠেনা। কোন কেউ অথবা কোন কিছু যখন বাহ্যিক বাধ্যবাধকতা থেকে মুক্ত তখন তাকে স্বাধীন বলা যায়। সংক্ষেপে বলতে গেলে আমাদের বলা উচিত তা কী ধরনের বাধ্যবাধকতা। সব সময় বর্তমান কিছু পরিমাণ বাহ্যিক বাধা থেকে মুক্ত যখন তখনই চিন্তাকে স্বাধীন বলা যায়।এর মধ্যে কতেক স্পষ্ট প্রতিবন্ধক আছে, চিন্তার স্বাধীনতা রক্ষা করতে হলে সে গুলোর অপসৃতি একই প্রয়োজন। কিন্তু এ ছাড়া আরো বাধা আছে, যেগুলো সূক্ষতর এবং সহজে ধরা যায় না।

স্পষ্টতর প্রতিবন্ধক সমূহকে নিয়ে শুরু করা যাক। চিন্তা তখন স্বাধীন থাকতে পারে না, যখন কোন মতামতকে বিশ্বাস বা অবিশ্বাস করলে দণ্ড দিতে হয় অথবা কোনো বিষয়ে বিশ্বাস করা বা বিশ্বাস না করার জন্যে কৈফিয়ত দিতে হয়। পৃথিবীর খুব স্বল্পসংখ্যক দেশে এখন পর্যন্ত এ সামান্য স্বাধীনতাটুকু পর্যন্ত নেই। ইংল্যাণ্ডে আল্লাহর আইনানুসারে খ্রিস্টান ধর্মের প্রতি অবিশ্বাসের কথা উচ্চারণ করা বেআইনী; যদিও সঙ্গতিপন্নদের বিরুদ্ধে সে আইন কখনও কার্যকরী নয়। খ্রিষ্ট যা শিক্ষা দিয়েছেন এবং যে বিষয়গুলো খ্রিস্টের শিক্ষার পরিপন্থী সেগুলো শিক্ষা দেওয়াও বেআইনী। সুতরাং যে কেউ অপরাধী হতে না চাইলে তাকে বলতে হবে তিনি যীশুখ্রিস্টের শিক্ষার সঙ্গে একমত কিন্তু খ্রিস্ট কী বলে গেছেন তা মুখ ফুটে বলতে পারবেন না। নৈরাজ্যবাদ এবং বহুবিবাহে বিশ্বাস করে না এবং একবার অভ্যন্তরে প্রবেশ করলে তাকে সাম্যবাদকেও অবশ্যই অবিশ্বাস করতে হবে। জাপানে মিকাডোর স্বর্গীয় উত্তরাধিকারীত্বের প্রতি অবিশ্বাস প্রকাশ করা বেআইনী। সুতরাং দেখা যাচ্ছে পৃথিবীর চারদিকে ভ্রমণ করে আসাটা বিপজ্জনক অভিযানের মতো। একজন মুসলমান একজন তলস্তয় পন্থী একজন বলশেভিক অথবা একজন সাম্যবাদী কিছু অংশে অপরাধী না হয়ে এ কাজ করতে পারে না অথবা তিনি গুরুত্বপূর্ণ সত্য বলে মনে করেন সে ব্যাপারে তার জিহ্বা একেবারে বন্ধ রাখতে হবে। কিন্তু এ ব্যবস্থা তৃতীয় শ্রেণীর যাত্রীদের জন্য সেলুনে যারা ভ্রমণ করেন তারা গায়ে পড়ে কোন ক্ষতিকর কিছু না করে যা ইচ্ছে তা বিশ্বাস করতে পারেন।

এটা পরিস্কার যে চিন্তাকে স্বাধীন করতে হলে প্রথমতঃ মতামত প্রকাশের জন্য যে আইনতঃ দণ্ডের ব্যবস্থা রয়েছে তা প্রত্যাহার করতে হবে। কোন বিশাল দেশ এখনো এই স্তরের স্বাধীনতাও অর্জন করেনি, যদিও অনেক দেশ মনে করে যে তারা জনসাধারণকে অনুরূপ স্বাধীনতা দিয়েছে। যে মতবাদগুলো এখন মানুষকে ভয়ঙ্করভাবে পীড়ন করছে সেগুলোর প্রকোপ এত ভয়ানক এবং এগুলো এতই নীতিহীন যে তার প্রতি অধিকাংশ মানুষকে সহনশীলতার নীতি গ্রহণ করতে বলা এরকম অসম্ভব। যে কারণে মনের অনুসন্ধিৎসু প্রবৃত্তি নিপীড়ত, একই কারণে এ সকল দৈত্যের মতো প্রতিবন্ধকের সৃষ্টি হয়েছে। আজকের যুগের বলশেভিক মতবাদকে যে রকম ভাবা হয়, এমন এক সময় ছিল যখন প্রোটেষ্টান্ট মতবাদকেও তেমনি মারাত্মক ভাবা হতো। দয়া করে এ মন্তব্য থেকে আমাকে কেউ বলশেভিক অথবা প্রোটেষ্টান্ট ভাববেন না।

সে যাহোক আধুনিক পৃথিবীতে আইনতঃ শাস্তি হলো চিন্তার স্বাধীনতার প্রাথমিক প্রতিবন্ধক। আর অন্য দুটো বাধা হলো অর্থদণ্ড এবং প্রমাণকে বিকৃত করবার বাধা। যদি কোন মতবাদের ফলে মানুষের জীবনধারণের পেশা মুক্ত হতে না পারে তাহলে চিন্তার যে স্বাধীনতা থাকতে পারে না সে কথা দিনের আলোর মতো পরিষ্কার। আরো পরিষ্কার যে কোন বিতর্কিত বিষয়ে অন্যদিকের যুক্তি শ্রমসাধ্য অনুসন্ধানের দ্বারা আবিস্কার না করে একদিকের যুক্তিকে পুনঃ পুনঃ সুন্দরভাবে আকর্ষণীয় করে তুললে সেখানেও চিন্তার স্বাধীনতা বিঘ্নিত হয়। আমার জানা মতো চীনদেশ ছাড়া সকল বড় দেশে এ দুরকমের প্রতিবন্ধক বর্তমান স্বাধীনতার শেষ আবাসস্থল ছিল (বা আছে) চীনদেশ। এ সকল বাধা তাদের বর্তমান ব্যাপকতা বৃদ্ধির সম্ভাবনা, এবং তা হ্রাস কিভাবে করা যায় তাই হলো আমার আলোচনার বিষয়।

বিশ্বাসসমূহের সঙ্গে স্বাধীন প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হতে পারলে আমরা চিন্তাকে স্বাধীন বলতে পারি। তার মানে, যখন সকল রকমের বিশ্বাস নিজস্ব বা কোন প্রকার আইনগত অথবা অর্থনৈতিক সুবিধা বা অসুবিধা থেকে মুক্ত হয়ে প্রকাশ করতে সক্ষম। এটা হচ্ছে একটা আদর্শ, বিভিন্ন কারণে তার পুরোপুরি কখনো অর্জন করা যাবে না। আমরা বর্তমানে যেমন করি তেমনি না হাতড়ে অধিকতর সন্নিকটে এর আহবান গিয়ে পৌঁছবে।

আমার জীবনের তিনটি ঘটনা প্রমাণ করবে যে আধুনিক ইংল্যাণ্ডে খ্রিষ্টান ধর্মের স্বপক্ষেই সকল কিছু করা হয়। প্রকাশ্যে নিরীশ্বরবাদে বিশ্বাস করবার যে কি বিপদ অনেক মানুষ এখনো জানে না বলেই আমার ব্যক্তিগত জীবনের ঘটনার কথা উল্লেখ করলাম।

প্রথম ঘটনাটি ঘটেছিল আমার জীবনের খুবই শৈশবকালে। আমার বাবা ছিলেন স্বাধীন চিন্তাবিদ। আমার তিন বছর বয়সের সময় তিনি মারা যান। তার ইচ্ছে ছিলনা যে আমি কোনরকমের কুসংস্কারের মধ্যে বেড়ে উঠি; এজন্য দু’জন স্বাধীন চিন্তাবিদকে তিনি আমার অভিভাবক নিযুক্ত করেছিলেন। আদালত তার উইলকে অগ্রাহ্য করে আমাকে খ্রিষ্টধর্মে শিক্ষা দিলো। আমি ভয় পেয়েছিলাম কিন্তু এর কোন প্রভাব আমার ওপর পড়েনি; তা বলে সে দোষ আইনের নয়। যদি তিনি আমাকে খ্রিস্টমতে লফিয়ান, মিউগলটোনিয়ান অথবা সেভেনথডে এডভেটিষ্ট হিসেবে শিক্ষিত করার কথা বলে যেতেন তাহলে আদালত স্বপ্নেও আপত্তি করার কথা ভাবতোনা। একজন বাবার মৃত্যুর পরে তার ছেলেকে কল্পিত কুসংস্কারে দীক্ষিত করার জন্যে বলে যাবার অধিকার আছে, কিন্তু তার ছেলে কুসংস্কার মুক্ত হিসেবে বেড়ে উঠবে একথা বলে যাবার অধিকার নেই।

দ্বিতীয় ঘটনা ঘটে ১৯১০ সালে। উদারনৈতিক পার্টির থেকে তখন আমার পার্লিয়ামেন্টের নির্বাচনে দাঁড়াবার ইচ্ছে ছিল। পার্টি হুইপ বিশেষ একটি নির্বচনী এলাকা থেকে আমার নাম সুপারিশও করেছিলেন। আমি উদারনৈতিক সভায় বক্তৃতা দান করলাম। তারা সকলে আমার সম্বন্ধে সন্তুষ্টি প্রকাশ করলেন, সুতরাং আমার অংশ গ্রহণ করার সবকিছু এরকম ঠিকঠাক হয়ে গেলো। এর পরে আভ্যন্তরীণ ক্ষুদ্র একটি অভিসন্ধিপরায়ন দল আমার কাছে জিজ্ঞেস করলেন, আমি নিরীশ্বরবাদী কিনা। জবাবে আম স্বীকার করলাম যে, আমি একজন নিরীশ্বরবাদী। তারা আরো জিজ্ঞেস করলেন যে মাঝে মাঝে গির্জায় যেতে রাজি আছি কিনা। জবাবে আমি রাজি নই বলে জানিয়ে দিলাম। তারপরে তারা আরেকজন সদস্যকে মনোনয়ন দান করলেন, যিনি ঠিকমত পাশ করে গেলেন এবং তখন থেকে পার্লামেন্টের সদস্য। তিনি বর্তমান সরকারে ও (১৯২২) একজন সদস্য।

এর অল্প কিছুদিন পরেই তৃতীয় ঘটনাটি ঘটল। আমাকে কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ট্রিনিটি কলেজে লেকচারারের পদ গ্রহণ করার জন্য আমন্ত্রণ জানানো হলো, কিন্তু ফেলো হিসেবে নয়। ফেলো এবং লেকচারারের মধ্যে মাইনের কোন প্রভেদ নেই। প্রভেদ হলো কলেজের পরিচালনা ব্যবস্থায় ফেলোর ভূমিকা আছে, খুব গুরুতর নৈতিকতাহীনতার অপরাধ ছাড়া মেয়াদ ফুরাবার আগে ফেলোকে বরখাস্ত করা যায় না। কেরাণি-গোষ্ঠীর অকেরাণি সুলভ একটি ভোট বাড়ানোর ইচ্ছে না-থাকার জন্যেই আমাকে ফেলোশিপ প্রদান করা হয়নি। এর ফল হলো ১৯১৬ সালে যুদ্ধ সম্বন্ধে আমার মতামতের সঙ্গে তাদের যখন মিল হলো না তখন তারা আমাকে বরখাস্ত করতে সক্ষম হলো। আমাকে যদি লেকচারারশিপের আয়ের ওপর নির্ভর করতে হতো, তাহলে আমাকে অনাহারে মরতে হতো।

এমনকি আধুনিক ইংল্যান্ডেও এ তিনটি ঘটনা প্রতিজ্ঞাবদ্ধ স্বাধীন চিন্তার সঙ্গে সম্পৃক্ত তিনরকমের অসুবিধার দৃষ্টান্ত। অন্যান্য প্রতিজ্ঞাবদ্ধ স্বাধীন চিন্তাবিদেরা ব্যক্তিগত জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে আরো ভয়াবহ দৃষ্টান্তের কথা বলতে পারবেন। নগদ ফল হলো, যে লোক পয়সাওয়ালা নয়,ধর্মীয় বিশ্বাস সম্পর্কে তার অকপট ভাবে কথা বলার সাহস করা উচিত নয়। শুধু মাত্র ধর্মীয় কারণে যে স্বাধীনতার ঘাটতি ঘটেছে অথবা ধর্ম স্বাধীনতাকে বাধা দিয়েছে এটা সম্পূর্ন সত্য নয়। নিরীশ্বরবাদীতার চাইতেও সাম্যবাদের বিশ্বাস অথবা স্বাধীন ভালোবাসা একজন মানুষকে অধিকতর বিপদের সম্মুখীন করে। বিশ্বাস করার চাইতেও এদের সমর্থনে যুক্তি দেখিয়ে প্রচার করা ঢের বেশী বিপজ্জনক পক্ষান্তরে রাশিয়াতে প্রকৃতভাবে এর সুবিধা অসুবিধাগুলো সম্পূর্ণভাবে আমাদের বিপরীত, সেখানে নাস্তিকতা, সাম্যবাদ এবং স্বাধীন ভালোবাসার কথা প্রচার করলে আরাম আয়েশ এবং সুযোগ সুবিধা ভোগ করা যায়। এর বিরুদ্ধে অন্য কোন রকমের মতামত প্রচার করার কোন সুযোগ সেখানে নেই। এর ফল হলো, রাশিয়াতে একদল গোঁড়া লোক কতেক সন্দিগ্ধ বিশ্বাসকে চূড়ান্ত সত্য বলে বিশ্বাস করার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে, অন্যদিকে পৃথিবীর বাকি অংশে এর বিপরীত কতেক বিশ্বাসকে অন্য কোন রকমের মতামত প্রচার করার কোন সুযোগ সেখানে নেই। এর ফল হলো, রাশিয়াতে একদল গোড়া লোক কতেক সন্দিগ্ধ বিশ্বাসকে চূড়ান্ত সত্য বলে বিশ্বাস করার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে, অন্যদিকে পৃথিবীর বাকি অংশে এর বিপরীত কতেক বিশ্বাসকে অন্য অবস্থার ফলে দু’দিকেই অনিবার্যভাবে যুদ্ধ, নির্যাতন এবং তিক্ততার সৃষ্টি হয়।

উইলিয়াম জেমস বিশ্বাস করার ইচ্ছে (Will to believe) প্রচার করতেন, আমি ‘সংশয় পোষণ করার ইচ্ছে’ (Will to doubt) প্রচার করতে চাই। আমাদের কোন বিশ্বাসের সঙ্গে সত্যের সঠিক মিল নেই। প্রত্যেক রকমের বিশ্বাসে কিছু পরিমাণ অস্পষ্টতা, এবং ভুলের মরীচিকা বুৰ্তমান। আমাদের বিশ্বাসে অধিক পরিমাণ সত্যের আমদানি কি করে ঘটাতে হয় তা সকলেরই জানা পদ্ধতি। সবদিকের বক্তব্য মনোযোগ পূর্বক শ্রবণ করে, আমাদের নিজস্ব গোঁড়ামিকে বিপরীতধর্মী গোঁড়ামিসম্পন্ন মানুষের সঙ্গে আলাপ করে, নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা অর্জন করে এবং যে সমস্ত অনুমান এবং যুক্তি অসিদ্ধ প্রমাণিত হয়েছে সে সমস্ত যুক্তিকে বর্জন করার মনোভাব গড়ে তুললে আমাদের বিশ্বাসকে সত্যের নিকটবর্তী করে তুলতে পারি। এ সকল পদ্ধতি বিজ্ঞানে অনুসৃত হয়ে বৈজ্ঞানিক জ্ঞানের প্রতিষ্ঠা করেছে। বিজ্ঞানের প্রত্যেক মানুষ যার প্রকৃত বৈজ্ঞানিক জ্ঞামের দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে, অবশ্যই স্বীকার করতে রাজি হবেন সে সম্বন্ধে বৈজ্ঞানিক জ্ঞান লাভ করতে হবে নব-আবিস্কারে প্রগতির সঙ্গে সঙ্গে সে বিষয়কেও সংশোধন করে নিতে হবে। সংশোধন করে না নেয়া হলে সকল ক্ষেত্রে অসমর্থ হলেও বিশেষ বিশেষ ব্যাপারে তা বাস্তব সত্যের কাছাকাছি পৌঁছুতে সমর্থ হবে। বিজ্ঞানে যখন অনুমানে নির্ভরশীল কোনো জ্ঞানের সন্ধান পাওয়া যায় তখন তা পরীক্ষামূলক এবং সন্দেহে পরিপূর্ণ।

ধর্ম এবং রাজনীতি যদিও পক্ষান্তরে বৈজ্ঞানিক জ্ঞানের কোন আবেদন নেই তবুও প্রত্যেকে চায় যে ক্ষুধা, কারাবাস এবং যুদ্ধের ওপর নির্ভরশীল এমন একটা গোড়া নীতি তাতে থাকা প্রয়োজনীয়তাকে অন্যান্য মতামতের সঙ্গে যুক্তির আলোকে ঝালিয়ে পৃথক করে দেখবার কোন প্রয়োজন নেই। এ সমস্ত ব্যাপার মানুষ যদি পরীক্ষামূলকভাবে নিরীশ্বরবাদী ধাঁচের মনের অধিকারী হতে পারে তাহলে আধুনিক পৃথিবী দশভাগের নয় ভাগ দোষমুক্ত হতে পারত। এক পক্ষ যখন হৃদয়ঙ্গম করতে সমর্থ হবে যে উভয়পক্ষের দোষ আছে তখন যুদ্ধ করা অসম্ভব হয়ে দাঁড়াবে। তখন নির্যাতনের অবসান হবে। শিক্ষার লক্ষ্য হবে মনকে প্রসার করা সংকীর্ণ করা নয়। ক্ষমতাসীনদের অযৌক্তিক খেয়ালের অনুসারে না হয়ে মানুষকে তার ক্ষমতানুসারে কাজের জন্য বাছাই করা হবে। সুতরাং একমাত্র বিচারবুদ্ধিসম্পন্ন সংশয় যদি প্রবর্তন করা হয় তাহলে লক্ষ লক্ষ বছর ধরে পৃথিবীর সুখ সন্তুষ্টি বিধান করা যাবে।

আপেক্ষিক গুরুত্ব মতবাদের (Theory of relativity) প্রবর্তন এবং পৃথিবীতে তার ব্যাপক প্রসারে মনের বৈজ্ঞানিক মেজাজের উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত সাম্প্রতিক বছরগুলোতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। জার্মান সুইস শান্তিবাদী ইহুদী আইনস্টাইনকে যুদ্ধের প্রাথমিক বছরগুলোতে জার্মান সরকার গবেষণা অধ্যাপক হিসেবে নিয়োগ করলেন। একটি ইংরেজ অভিযাত্রীদল ১৯১৯ সনে অস্ত্র সংবরণ চুক্তির পরে একটি সূর্যগ্রহণে তার মতামতের সত্যতা যাচাই করলেন। তার থিয়োরি পদার্থবিদ্যার পুরোনো থিয়োরিগত ধারণাতে এক বিপ্লবের সঞ্চার করে। ডারউইনের মতবাদ যেমন সৃষ্টিতত্ত্বের ধারণাকে চুরমার করে ফেলে তেমনি তার মতবাদও গোড়া গতিবাদের ধারণার সম্পূর্ণ নিরসন করে। তা সত্ত্বেও তার মতবাদের সমর্থনে যখন ব্যাপক প্রমাণ প্রদর্শিত হলো পদার্থবিজ্ঞানীরা সর্বত্র তা গ্রহণ করতে কোন রকমের উষ্ম প্রকাশ করেননি। তাদের কেউ, এমন কি আইনস্টাইন নিজে দাবি করতে পারবেন না যে তিনি শেষ কথা বলেছেন, একথা তিনি নিজেও বলবেন না। তিনি সমাধান করতে পারেন নি, এমন বহু সমস্যা রয়ে গেছে। সুতরাং নিউটনের মতবাদকে তিনি যেমন বিশুদ্ধ করে নিয়েছেন, তার মতবাদেরও তেমনি বিশুদ্ধিকরণের প্রয়োজন রয়েছে। এই বিশ্লেষণাত্মক গোঁড়ামিমুক্ত মনের গ্রহণশীলতা হলো সত্যিকারের বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি।

ধর্ম এবং রাজনীতির ক্ষেত্রে আইনস্টাইন কিছুর উদ্ভাবন যদি করতেন তাহলে কি হতো? ইংরেজরা তার মধ্যে প্রশিয়ান উপাদান খুঁজে পেতো, ইহুদী বিরোধীরা তার মধ্যে ইহুদী ষড়যন্ত্রের গন্ধ পেতো। সমগ্র বিশ্বের জাতীয়তাবাদীরা তার মধ্যে পুষ্প সৌগন্ধময় শান্তিবাদের কীট এবং সামরিক পেশা এড়িয়ে যাবার ফন্দী আবিষ্কার করতো। পুরনো মতাবলম্বী অধ্যাপকবৃন্দ তাঁর লেখা আমদানী নিষিদ্ধ করার জন্যে স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডের গোয়েন্দা বিভাগকে আবেদন করত। কোন শিক্ষক তার লেখাকে সমর্থন করলে চাকুরি থেকে বরখাস্ত করা হতো। এই সময়ের মধ্যে তার মতাবলম্বী দল যদি কোন অনুন্নত দেশের সরকার পদে বরিত হতো, যেখানে তার মতবাদ ছাড়া আর কিছু শিক্ষা দেয়া বেআইনী হয়ে দাঁড়াত এবং ধীরে ধীরে তা রহস্যময় বিশ্বাসে রূপ লাভ করত, আসল তাৎপর্য কেউ বুঝতে পারত না। স্বপক্ষে বিপক্ষে টাটকা যুক্তির অনুসরণ না করে তার মতামতের সত্যতা অথবা অসারতা যুদ্ধক্ষেত্রেই নির্ধারিত হবে। এই পদ্ধতি হলো উইলিয়াম জেমসের বিশ্বাস করার ইচ্ছা করার (Will to believe) যুক্তিসঙ্গত ফলাফল থেকে উদ্ভূত।

বিশ্বাস করার ইচ্ছা বা (Will to believe) আমাদের কাঙ্খিত বিষয় নয়, যা আমাদের প্রয়োজনীয় তা হলো খুঁজে নেয়ার ইচ্ছে বা উইল টু বিলিভ বা বিশ্বাস করার ইচ্ছা সম্পূর্ণ বিপরীত।

যুক্তিগত সংশয়ের কিছু প্রয়োজনীয়তা যে রয়েছে সে কথা অস্বীকার করা যায় না। পৃথিবীতে অনেক বেশি যে অযৌক্তিক নিশ্চয়তা রয়েছে সে সম্বন্ধে অনুসন্ধান করা জরুরী প্রয়োজন হয়ে দাঁড়িয়েছে। গড়পড়তা মানুষের চরিত্রের বিশ্বাস প্রবণতা এবং উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত অযৌক্তিক বিশ্বাস থেকে এর অনেকগুলো উদ্ভব। বুদ্ধিবৃত্তিক পাপের এ আদি বীজগুলো যে বিভিন্ন উপায়ে অঙ্কুরিত এবং বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয় তার মধ্যে শিক্ষা, প্রোপাগাণ্ডা এবং অর্থনৈতিক চাপই প্রধান। আমরা সেগুলো আলাদাভাবে আলোচনা করছি।

(১) শিক্ষাঃ প্রত্যেক প্রাগ্রসর দেশে প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থার ভার রয়েছে রাষ্ট্রের হাতে। কতেক জিনিস যে মিথ্যা সে কথা সকল সরকারি চাকুরেরা পাঠ্যসূচী নির্ধারণ করেন তাঁরাও জানেন। আর কিছু যে মিথ্যা নিদেনপক্ষ অত্যন্ত সন্দেহাত্মক তা সংস্থার মুক্ত মানুষের দৃষ্টিতে ধরা পড়ে। উদাহরণস্বরূপ ইতিহাস শিক্ষাদানের ব্যাপারে ধরা যাক। স্কুলপাঠ্য বইয়ে প্রত্যেক জাতির লক্ষ্য থাকে নিজস্ব ইতিহাসের গৌরব বৃদ্ধি করা। একজন মানুষ আত্মজীবনী রচনা করার সময় কিছু বিনয় প্রকাশ করবেন এটা আশা করা স্বাভাবিক, কিন্তু একটা জাতি যখন আত্মজীবনী লেখে তখন এর গর্ব এবং দম্ভের সীমা থাকেনা। আমি যখন ছোট ছিলাম তখন পড়ানো হতো ফরাসিরা খারাপ, জার্মানেরা ভালো। এখন তারা উল্টো শিক্ষা দিয়ে থাকেন। এ দু’য়ের মধ্যে কোথাও সত্যের লেশমাত্র নেই। জার্মান স্কুলপাঠ্য বইতে ওয়াটার যুদ্ধ প্রসঙ্গে লেখা হয়েছে ওয়িলংটন যখন প্রায় পরাজিত তখন বুচার এসে পরাজয়ের হাত থেকে আত্মরক্ষা করলেন। কিন্তু ইংরেজি স্কুলপাঠ্য বইতে বুচারের কথা কদাচিৎ উল্লেখিত হয়েছে। এখানে ইংরেজ এবং জার্মান ঐতিহাসিকদের দু’জনের কেউ সত্য কথা বলছেন না। আগেকার আমেরিকান স্কুলপাঠ্য বইয়ের বৃটিশের প্রবল নিন্দা করা হতো। যুদ্ধের পর থেকে আমেরিকান স্কুলপাঠ্য বইগুলো কোন ব্যাপারে আসল সত্য উদ্ঘাটন না করে ভয়ঙ্কর ভাবে বৃটিশভক্ত হয়ে পড়েছে। আগে এবং বর্তমানে আমেরিকান শিক্ষাব্যবস্থার প্রধান উদ্দেশ্য হলো বাইরে থেকে আগত বিচিত্র ছেলেদেরকে খাঁটি আমেরিকান হিসেবে গড়ে তোলা। যে অর্থে জার্মানেরা ভালো জার্মান হিসেবে গড়ে ওঠে, জাপানিরা গড়ে ওঠে ভালো জাপানী হিসেবে সে অর্থে আমেরিকানরা ভালো আমেরিকান হিসেবে গড়ে ওঠেনা; বরঞ্চ গড়ে ওঠে খারাপ মানুষ হিসেবে। যে ভদ্রলোক অথবা ভদ্রমহিলা সব সময় আমেরিকা পৃথিবীর সুন্দরতম দেশ এ বিশ্বাসে গদগদ এবং যে কোন ঝগড়ায় উৎসাহের সঙ্গে তা সমর্থন করে, সে ভদ্রলোক অথবা ভদ্র মহিলাকে ভালো আমেরিকান বলা যেতে পারে। এ বিশ্বাসগুলো যদি সত্য হতো তাহলে একজন বিচারবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষের তাদের সঙ্গে ঝগড়া করার কিছু থাকতো না। কিন্তু এগুলো সত্য হলে সেগুলো শুধু আমেরিকায় কেননা সর্বত্র শিক্ষা দেয়া উচিত। কোন বিশেষ দেশ যে সকল প্রস্তাবনার মাধ্যমে আত্মগৌরব বৃদ্ধি করে সে বিশেষ দেশের বাইরে কোথাও সে প্রস্তাবনা সমূহ যে বিশ্বাস করা হবে এতে প্রচুর সন্দেহের অবকাশ রয়েছে।

বস্তুতঃ সকল দেশই ছেলেদেরকে বিনা বাধায় উদ্ভট কুসংস্কারে দীক্ষিত করার দিকে ঝুঁকে পড়েছে। এর প্রতিক্রিয়া হলো সত্যের নামে কতকগুলো দুষিত স্বার্থের সমর্থনে মৃত্যুবরণ করবার জন্য মনকে দৃঢ় করা। অথচ তারা জানতে পারে না যে ন্যায় এবং সত্যের নামে কি মন্দ সংকল্পে আত্মসমর্পণ করে বসে আছে। যে অসংখ্য পদ্ধতিতে শিক্ষাব্যবস্থাকে নির্দেশ দেয়া হয়, এ হচ্ছে তার মধ্যে একটি; যার উদ্দেশ্য সত্যিকারের জ্ঞানদান করা নয়, মানুষকে শাসকদের ইচ্ছানুসারে নতিস্বীকার করানো। প্রাথমিক বিদ্যালয়সমূহের শিক্ষার নামে যে প্রবঞ্চনা করা হয় একটি ব্যাপক পদ্ধতির মাধ্যমে তার নিরসন না ঘটালে গণতন্ত্রের প্রচলন অক্ষুণ্ণ রাখা যাবে না।

শিক্ষা সম্বন্ধে বক্তব্য শেষ করার আগে আমি আমেরিকা থেকে আরেকটি দৃষ্টান্ত তুলে ধরব, তুলে ধরবো এ কারণে যে আমেরিকা অন্যান্য দেশের চাইতে খারাপ। তারপরেও হলো সর্বাধুনিক দেশ; সে-কারণে বিপদগুলোর নিরসনের চাইতে বৃদ্ধিপ্রাপ্তি ঘটছে অত্যাধিক হারে। নিউইয়র্ক স্টেটে জনসাধারণের পয়সায়ও রাষ্ট্রের অনুমতি ছাড়া কোন স্কুল খোলা যায় না। সাম্প্রতিক একটি আইনের ঘোষণা হলো “প্রতিষ্ঠিত সরকারকে শক্তিবলে, প্রতিহিংসা বলে অথবা অন্য কোন বেআইনী পদ্ধতিতে উৎখাত করার মতবাদ শিক্ষা দেয়ার মত কিছু পাঠ্যসূচীতে যোগ করা হলে তেমন কোন প্রতিষ্ঠানকে সরকার স্কুল খোলার অনুমতি দেবে না। নিউ রিপাবলিক পত্রিকা ঘোষণা করেছে আরো, এ সরকার সে সরকারের প্রভেদের কোনো সীমারেখা নেই। সুতরাং যুদ্ধের সময়ে কাইজারের সরকারকে উৎখাত করা যাবে না। এ মতবাদ শিক্ষা দেয়াকে বেআইনী করা উচিত। সোভিয়েত সরকারের বিরুদ্ধে ডেনিকিন এবং কেলচাকদের সমর্থনকেও উচিত বেআইনী ঘোষণা করা। এরকম ফলাফল অপ্রত্যাশিত, তবে খারাপ খসড়ার দরুণ মাঝে মাঝে প্রকৃত ফলাফল প্রকাশিত হয়ে পড়ে। এই আইন অনুসারে কেবল সে সমস্ত লোক এই সমস্ত স্কুলে শিক্ষকতা করতে পারবে যারা বিশেষ বিশেষ স্টেটের সরকার এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্যের প্রমাণ দেখাতে পারবে। যারা সে বিশেষ স্টেটের সরকার এবং যুক্তরাষ্ট্রের সরকারের বদলে অন্য ধরণের সরকারের বিরুদ্ধে কথা বলেছে, কখন বলেছে, এবং কোথায় বলেছে তার কোন হদিশ না জেনেও তাদেরকে স্টেটে চালিত স্কুলে শিক্ষকতা করতে দেয়া হবেনা। যে কমিটি এ সমস্ত আইন প্রণয়ন করেছে, সে সম্বন্ধে নিউ রিপাবলিক কাগজ লিখেছে যে শিক্ষক, বর্তমান সামাজিক পদ্ধতির সঙ্গে একমত নয় তাকে অবশ্যই চাকুরি ছেড়ে দিতে হবে। যে লোক সামাজিক পরিবর্তনের থিয়োরির ব্যাপারে ঝগড়া করতে রাজি নয়, তাদের ওপরই যুবক এবং বুড়োদেরকে দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার ভার দেয়া হয়। সুতরাং নিউইয়র্ক স্টেটের নিয়মানুসারে যিশুখৃষ্ট নিউইয়র্কে গিয়ে বলতেন, “ছোট ছেলেমেয়েরা আমার কাছে আসার জন্য কষ্ট পাচ্ছে। নিউইয়র্কের স্কুল বোর্ডের প্রেসিডেন্ট তখন তাকে জবাব দিতেন, “জনাব আপনি সামাজিক পরিবর্তন সম্পর্কে বাদানুবাদে যে আগ্রহী তার কোনো প্রমাণ আমি দেখছিনে। আমি ঠিকই শুনেছি আপনি স্বর্গরাজ্যের ওকালতি করেন, কিন্তু খোদাকে অশেষ ধন্যবাদ এ দেশ হচ্ছে প্রজাতন্ত্র। নিউইয়র্ক রাজ্যের সরকারের সঙ্গে আপনার স্বর্গরাজ্যের সরকারের আকাশ পাতাল প্রভেদ। সুতরাং কোনো ছেলেমেয়েকে আপনার কাছে যেতে দেয়া হবে না।“ যদি তিনি উপরোক্ত উত্তর দিতে অসমর্থ হন তাহলে আইনের শাসন তার কাঁধে যে দায়িত্ব চাপিয়েছে তা ঠিক ঠিকভাবে পালন করছেন না।

এ ধরণের প্রতিক্রিয়া খুবই ভয়ঙ্কর। যুক্তির খাতিরে ধরে নেয়া যাক নিউইয়র্ক রাজ্যের সরকার এবং সমাজব্যবস্থা আমাদের এ গ্রহে সবচেয়ে উত্তম, কিন্তু তা সত্ত্বেও ও দুটোকে আরো ভালো করা যেতে পারে একথা আমরা সত্য বলে ধরে নিতে পারি। যদি কোন ব্যক্তি এ স্পষ্ট যুক্তিকে বিশ্বাস করে তাহলে তাকে স্টেট চালিত স্কুলে শিক্ষকতা করার সুযোগ দেয়া হবে না। সুতরাং আইনের ঘোষণা অনুসারে শিক্ষকদেরকে হয়ত কপট নয়ত বোকা হতে হবে। একই সংস্থা তা রাষ্ট্র অথবা ট্রাষ্টের ফেডারেশন যাই হোক না কেননা একচেটিয়াভাবে ক্ষমতাকে কুক্ষিগত করে রাখার ফলে নিউইয়র্ক রাজ্যের আইন ব্যবস্থার মধ্য থেকে ক্রমবর্ধমান বিপত্তির দৃষ্টান্ত সমূহের কয়েকটা তুলে ধরা হলো। শিক্ষার ক্ষেত্রে সমস্ত ক্ষমতা রাষ্ট্রের হাতে থাকায় রাষ্ট্রের না পছন্দ কোন মতবাদ শিশুদেরকে শুনতে নিবৃত্ত করা হয়। আমার বিশ্বাস এখনো কিছু সংখ্যক মানুষ আছে যারা গণতন্ত্রকে জনসাধারণের চাইতে আলাদা করে দেখে। সে যাহোক তাহলো এক ধরণের অবাস্তব পরিকল্পনা। রাষ্ট্র হলো বিভিন্ন চাকুরেদের দ্বারা গঠিত যারা বিভিন্ন উদ্দেশ্যে বিভিন্ন পদে অধিষ্ঠিত, এবং সুখে স্বচ্ছন্দে বেঁচে থাকার মতো টাকা পয়সা আয় করে থাকে। আমলাদের ক্ষমতা বৃদ্ধি করে আমলাতান্ত্রিকতার মধ্যে পরিবর্তন আনাই হলো তাদের একমাত্র সম্ভাব্য পরিবর্তনশীল পন্থা। সমর উত্তেজনার সুযোগ গ্রহণ করে অধীনস্থ কর্মচারীদের ওপর দমননীতি যে চালাবে তাদের পক্ষে এটা খুবই স্বাভাবিক। অধীনস্থ কোন কর্মচারী যদি তাদেরকে বাধা দেয় তাহলে এ সুযোগে অনাহারে রাখার ক্ষমতাও তারা করায়ত্ত করে থাকে। শিক্ষার মতো অন্যান্য যে সমস্ত উপাদানে এভাবে মনকে গড়ে তোলে তা ভয়ঙ্কর। এর ফলে প্রগতি স্বাধীনতা এবং বুদ্ধিবৃত্তিক প্রচেষ্টার সম্ভাবনার অবসান ঘটে। তাহলেও সমস্ত প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থাকে একচেটিয়াভাবে একটি সংস্থার অধীনে আনয়ন করার স্বাভাবিক পরিণতি আলাদা হতে পারে না।

ধর্মের ব্যাপারে সহনশীলতার পরিমাণ কিছু বৃদ্ধি পেয়েছে আগের তুলনায়, সেহেতু মানুষ ধর্মকে এখন তেমন প্রয়োজনীয় উপাদান মনে করে না। বর্তমানে রাজনীতি এবং অর্থনীতি ধর্মের পূর্বতন স্থান অধিকার করেছে, অত্যাচার নির্যাতনের মাত্রা ক্রমশঃ বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং তার পরিধি শুধুমাত্র একটি পার্টির মধ্যে সীমাবদ্ধ কোন কারণেই নয়। যে কোন ধর্মতান্ত্রিক দেশের তুলনায় রাশিয়াতে মতামতের ওপর নির্যাতন করা হয় সবচেয়ে বেশি। পেত্রোগ্রাদে আলেকজাণ্ডার ব্লক নামে একজন বিখ্যাত রাশিয়ান কবির সঙ্গে আমার দেখা হয়েছিল, যাকে কারাবাসে মৃত্যুবরণ করতে হয়। বলশেভিকরা তাকে সৌন্দর্যতত্ত্ব সম্বন্ধে শিক্ষাদান করতে নিয়োগ করেছিল কিন্তু তারা তার শিক্ষা পদ্ধতিকে মার্কসীয় দৃষ্টিভঙ্গীতে রূপ দেয়ার জন্যে চাপ দিচ্ছিলো বলে তিনি অভিযোগ করেছিলেন। সে যা হোক অনাহার এড়িয়ে যাবার জন্যে ছন্দের সঙ্গে মার্কসবাদের সম্বন্ধ আবিষ্কার করার জন্যে তিনি যারপর নাই চেষ্টা করলেন। বলতে গেলে তা ছিল অসম্ভব, কেননা, একবছর পূর্বে বলশেভিক সরকার ক্ষমতায় আরোহণ করেছে, যে বিশ্বাসের ওপর তাদের রাজত্ব কায়েম হয়েছে সে বিশ্বাসের সঙ্গে সাযুজ্য রক্ষা করে সবকিছুর সমালোচনা তখনো মুদ্রিত হয়নি।

আমরা আমেরিকা এবং রাশিয়ার কথা বর্ণনা করে যে সিদ্ধান্তের দিকে অগ্রসর হচ্ছিলাম, তা হলো মানুষ যতদিন রাজনীতির প্রয়োজনে এ গোড়া বিশ্বাসকে পরিহার না করবে ততদিন রাজনীতিতে স্বাধীন চিন্তার স্ফুরণ অসম্ভব। রাশিয়াতে যেমন তেমনি অন্যান্য ব্যাপারে স্বাধীনতার ঘাটতি হলে সমূহ বিপদের সম্ভাবনা রয়েছে। কিছু পরিমাণ রাজনৈতিক সংশয়বাদ আমাদেরকে এ দুর্ভাগ্য হতে রক্ষা করতে পারে।

শিক্ষা বিভাগীয় কর্তারা যে তরুণেরা শিক্ষিত হোক এ কামনা করে তা কখনো বিশ্বাস করা উচিত নয়। পক্ষান্তরে তাদের যা সমস্যা তা হলো বুদ্ধি বৃত্তির বিকাশ সাধন না করে তাদেরকে সংবাদ বিশেষজ্ঞ করে তোলার সমস্যা। শিক্ষার দু’রকমের লক্ষ্য থাকা উচিত। প্রথমতঃ পড়া, লেখা, ভাষা শিক্ষা, অঙ্ক ইত্যাদি ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট জ্ঞান দান করা। দ্বিতীয়তঃ যে সকল মানসিক অভ্যাস মানুষকে জ্ঞান অর্জন এবং সুস্থবৃত্তি গঠন করতে অনুপ্রাণিত করে মানুষের মধ্যে সে সকল অভ্যাসের সঞ্চার করা। এর প্রথমটিকে সংবাদ এবং দ্বিতীয়টিকে আমরা মেধা বলে অভিহিত করতে পারি সংবাদের থিয়োরিগত প্রয়োজনীয়তা যেমন আছে, বাস্তবেও তার কি তেমন প্রয়োজন? শিক্ষিত মানুষ ছাড়া বর্তমান রাষ্ট্র ব্যবস্থা চলতে পারেনা। কিন্তু মেধার থিয়োরিগত প্রয়োজনীয়তা আছে, তবে তা তেমন কাজে আসেনা। সাধারণ মানুষ যে নিজের জন্য চিন্তা করবে এটা আশা করা যায়না, কারণ যে সকল লোকে তাদের নিজেদের জন্য চিন্তা করে তারা নিজেদেরকেই বিপজ্জনক অবস্থায় নিয়ে যায় এবং শাসকদের বিষ নজরে পতিত হয়। প্লেটোর ভাষায় বলতে গেলে একমাত্র অভিভাবকেরাই চিন্তা করবে এবং বাকি সকলে তা মেনে নেবে অথবা একপাল মেষের মতো নেতার অনুসরণ করবে। অবচেতনভাবে এই মতবাদ খুব ক্ষীণভাবে হলেও রাজনৈতিক গণতন্ত্রের পরেও টিকে আছে এবং সোজাসোজি সমস্ত রকমের জাতীয় শিক্ষা ব্যবস্থা পদ্ধতির আইন কানুন অগ্রাহ্য করেছে।

বুদ্ধিবৃত্তি ছাড়া সংবাদ পরিবেশন করতে পুরোপুরি যে দেশটি সাফল্য অর্জন করেছে, আধুনিক সভ্যতার ইতিহাসের শেষ পৃষ্ঠায় যার নাম সম্প্রতি লিখা হলো, সে দেশটি জাপান। পদ্ধতিগত দিক দিয়ে জাপানের প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থাকে প্রসংশনীয় বলা যেতে পারে, কিন্তু তাতে একটি বিশেষ উদ্দেশ্য রয়েছে, সে উদ্দেশ্যটি হলো মিকাডোকে পূজা করার শিক্ষা দেয়া, যার প্রবণতা আধুনিক জাপানে পূর্বাপেক্ষা অনেক গুণে বৃদ্ধি পেয়েছে। সুতরাং স্কুল সমূহকে একই সঙ্গে জ্ঞান বিস্তার এবং কুসংস্কার প্রচারের কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে। মিকাডোকে পূজা করার কোন যৌক্তিকতা আমাদের কাছে নেই বলে জাপানি শিক্ষা ব্যবস্থার উদ্ভট দিকটি আমরা পরিষ্কার চোখে দেখতে পাই। আমাদের নিজস্ব জাতীয় কুসংস্কারগুলো আমাদের কাছে এত স্বাভাবিক এবং আবেগসহ হয়ে দাঁড়িয়েছে যে জাপানিদের সম্বন্ধে অত সহজে আবিস্কার করা যায় না। একজন ভ্রমণকারী জাপানি আমাদের স্কুলে সমূহে মিকাডোর স্বর্গীয় উত্তারাধিকারিত্বের মতো বুদ্ধিবৃত্তি বিরোধ কুসংস্কারগুলো আবিস্কার করে যদি থিসিস লিখেন, আমার মতো তিনি ঠিক কাজই করবেন। যদি আমি একজন ছোট দোকানদারকে গিয়ে বলি, ”দেখো তোমার প্রতিযোগী রাস্তার ওপাশে। সে তোমার ব্যবস্থা কেড়ে নিচ্ছে, সুতরাং তোমার ব্যবস্থা বাঁচাতে চাইলে রাস্তায় দাঁড়িয়ে সে তোমাকে গুলি করার আগে তুমি তাকে গুলী করে হত্যাকর “ তাহলে সে ক্ষুদ্র দোকানদার আমাকে পাগল ঠাওরাবে। সরকার যখন একই কথা জোড় দিয়ে ঢাক পিটিয়ে ঘোষণা করে তখন ছোট ছোট দোকানদারেরা পরম উৎসাহিত হয়ে ওঠে, কিন্তু পরে তারা দেখতে পায় তার ফলে তাদের ব্যবস্থা ক্ষগ্রিস্থ হয়েছে।

বিজ্ঞাপনদাতারা যে পদ্ধতি অনুসারে সাফল্য অর্জন করে একই পদ্ধতিতে সকল উন্নতদেশে, মতামত প্রচারে উপযুক্ত পন্থা বলে স্বীকার করে নেয়া হয়েছে; বিশেষ করে এ পদ্ধতিতে গণতান্ত্রিক মতবাদ সৃষ্টি করা হয়।

হালে যে প্রচার প্রোপান্ডা চলছে তাতে দু’ধরনের আলাদা দোষ বর্তমান। এক ধরনের দোষ হলো, এর আবেদন সাধারনতঃ বিশ্বাসের অযৌক্তিক কারণে, সুচিন্তিত যুক্তির ধার দিয়েও ঘেঁষেনা। আরেক ধরণের দোষ হলো সম্পদ অথবা ক্ষমতার মাধ্যমে প্রেপাগান্ডা কতেক মানুষকে অন্যায় সুযোগ দান করে থাকে। প্রেপাগান্ডার বাক্য জাল যুক্তির চেয়ে আবেগের প্রধান্য বেশি দেয় বলে আমি মনে করি। অনেক মানুষ যেমন ভাবে যুক্তি এবং আবেগের তেমন কোন সুনির্দিষ্ট ব্যবধান নেই। অধিকন্তু একজন চালাক মানুষ কোন সুযোগে প্রতিষ্ঠিত কোন কিছুর সমর্থনে প্রচুর ভালো যুক্তি তৈরি করে নিতে পারে। কোন বিষয়ের স্বপক্ষে-বিপক্ষে দুপক্ষেই ভালো যুক্তি থাকে। নির্দিষ্ট ভাবে বিষয়কে না ব্যক্ত করলে আইনমতে আপত্তি করা যেতে পারে, কিন্তু তার বিশেষ প্রয়োজন নেই। নাশপাতি, সাবান এসব শব্দ কিছু না বোঝালেও মানুষ ও সকল জিনিস ক্রয় করে। শ্রমিক পার্টি যদিও এ শব্দের মধ্যে কোনও আকর্ষণ নেই-তবু লক্ষ লক্ষ শ্রমিক শুধু নামের জন্য শ্রমিক পার্টির সমর্থনে ভোটদান করবে। দুপক্ষের বিরোধ নিস্পত্তি করার জন্যে আইন করে প্রখ্যাত নৈয়ায়িকদের একটি কমিটি যদি দোষগুণ বিচারার্থে নিয়োগ করা হয়, তাহলেও বর্তমান প্রোপাগাণ্ডার আসল দোষ দূর করা যাবে না। ধরা যাক দুদলের অবস্থা একই রকম আশাপ্রদ, একপক্ষের প্রোপাগাণ্ডার হাতে ব্যয় করার জন্য হয়েছে লক্ষ পাউণ্ড অন্য পক্ষের হাজার পাউণ্ড। গরিব পার্টির তুলনায় অপেক্ষাকৃত ধনী পার্টির বক্তব্য অধিক সংখ্যক মানুষ জানতে পারবে। সুতরাং নির্বাচনে ধনী পার্টিই জয়যুক্ত হবে। এরকম অবস্থা সাধারণতঃ যে সকল দেশে একপার্টি সরকার বর্তমান সে সকল দেশে হয়ে থাকে, তবে তার দরকার নেই। এমনিতে প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে যে সকল সুযোগ সুবিধা পেয়ে থাকে জয়লাভ করাবার জন্যে তাই যথেষ্ট, যদি না পরিস্থিতি ভিন্নরকম রূপ পরিগ্রহ করে।

অযৌক্তিক বিশ্বাসকে ফাঁপিয়ে ফেনিয়ে তোলে বলে প্রোপাগাণ্ডার বিরুদ্ধে আপত্তি নয়; ধনী এবং ক্ষমতাবানদের অন্যায় সুযোগ দান করে তা সবচেয়ে বেশি ক্ষতি সাধন করে। সত্যিকারের চিন্তার স্বাধীনতার জন্য চিন্তার সাম্যের প্রয়োজন অপরিহার্য। সকল মতামতকে সমান সুযোগ দেয়ার জন্য ঐ উদ্দেশ্যে প্রণীত প্রাঞ্জল আইনের প্রয়োজন রয়েছে। এরকম আইন ক্রিয়াশীল হবেনা। এমন আশা করা যুক্তিসঙ্গত নয়। প্রাথমিকভাবে এ সমস্ত আইনের মধ্যে প্রতিবিধান মিলবে না, আরো ভালো শিক্ষা এবং অধিক হারে সংশয়াপন্ন জনমতের মধ্যে এর আরোগ্যের উপাদানগুলো নিহিত। বর্তমান মুহূর্তে আমি আরোগ্যের ব্যাপারে কোন আলোচনা করবনা।

অর্থনৈতিক চাপ-আমি চিন্তার স্বাধীনতার বিভিন্নদিকের বাধাগুলো সম্পর্কে কিছু আলোচনা করেছি, এখন আমি আসল দিকে আলোকপাত করতে চাই যে দিকের বিপদ সম্পর্কে সঠিক পন্থা অবলম্বণ না করলে বিপদ আরো বাড়তে বাধ্য। চিন্তার স্বাধীনতার বিরুদ্ধে চূড়ান্ত অর্থনৈতিক চাপ যে সকল দেশ সৃষ্টি করে সোভিয়েত রাশিয়া তার শ্রেষ্ঠতম দৃষ্টান্ত। যে দেশে বাণিজ্য, চুক্তি সম্পাদিত হওয়ার আগে পর্যন্ত কোন লোকের মতামত না পছন্দ হলে তাকে অনাহারে রাখার নিয়ম ছিল। উদাহরণ স্বরূপ ক্রোপেটিকিনের নাম বলা যেতে পারে। কিন্তু এ ব্যাপারে রাশিয়া একমাত্র দেশ যে অন্যান্য দেশের চেয়ে অগ্রসর। ফরাসিদের ড্রিফাস (Dreyfus) মামলার শুরুতে তাকে যে সমস্ত শিক্ষক সমর্থন এবং শেষের দিকে বিরোধিতা করেছেন তাদের সকলকে চাকুরি থেকে বরখাস্ত করা হয়েছে। বর্তমানে আমার সন্দেহ, একজন অধ্যাপক তিনি যতই খ্যাতনামা থোক না কোন, ষ্ট্যান্ডার্ড তেল কোম্পানির সমালোচনা করলে চাকুরি পাবেন, কেননা সকল কলেজের প্রেসিডেন্টরা মি. রাফেলারের দ্বারা উপকৃত হয়েছেন অথবা উপকৃত হওয়ার আশা রাখেন। সমগ্র আমেরিকাতে সমাজবাদীরা মার্কা মারা মানুষ খুব মহান অবদান না থাকলে তাদের পক্ষে চাকুরি পাওয়া অসম্ভব হয়ে পড়ে। যেখানে শিল্পের প্রসার ঘটেছে ব্যাপকভাবে সেখানে কিছু সংখ্যক বিশ্বাসী কর্মচারী রাখার মনোভাব খুবই প্রবল যাতে করে তাদের সাহায্যে সমস্ত শিল্প একচেটিয়াভাবে নিয়ন্ত্রণ করা অনায়াসসাধ্য হয়ে পড়ে। এ জন্য তারা গোপনে কৃষ্ণ মলাটের বইতে সে সব কর্মচারির নাম লিখে রাখে যাদেরকে বৃহৎ ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানের যন্ত্র করতে পারা না যায় এবং অনুগত কর্মচারীদের উপোষ থাকতে বাধ্য করা হয়। আমেরিকার একচেটিয়া পুঁজিবাদে রাশিয়ার রাষ্ট্র মালিকানাধীন সমাজতন্ত্রের অনেকগুলো দোষকে পুণঃ প্রবর্তন করা হচ্ছে। স্বাধীনতার দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে মানুষের নিয়োগকর্তা রাষ্ট্র বা অছি কমিটি যাই হোকনা কেন, দূয়ের মধ্যে বিশেষ তফাৎ নেই।

শিল্পের দিক দিয়ে সবচেয়ে উন্নত আমেরিকাতে এবং অন্যান্য উন্নত দেশগুলোতে, যেগুলো ভবিষ্যতে আমেরিকার পর্যায়ে পৌঁছুবার আশা রাখে, সেখানে গড়পড়তা নাগরিককে বিশেষ বিশেষ বৃহৎ মানুষের বিদ্বেষ পরিহার করে বেঁচে থাকতে হয়। আমেরিকাতে এ আবহাওয়া সর্বাধিক। আবার এসব বড় মানুষদের যে ধর্মীয়, নৈতিক এবং রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি আছে তাদের কর্মচারীরা তার সঙ্গে অন্ততঃ বাহ্যিক দিকে হলেও একমত হবে এ প্রত্যাশা তারা করে খুব বিখ্যাত লেখক না হয়ে কোন মানুষ যদি খ্রিষ্টান ধর্মে অবিশ্বাস পোষণ করে অথবা বিবাহ আইনের শিথিলতায় বিশ্বাসী অথবা কোন বৃহৎ ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের বিষ নজরে পড়ে তার কাছে আমেরিকা সব চেয়ে অপ্রিয় দেশ হয়ে দাঁড়াবে। যে সকল দেশে অর্থনীতি বাস্তবে একচেটিয়াভাবে পরিচালিত হয়, একই ভাবে সে সকল দেশেও চিন্তার স্বাধীনতা বাধা প্রাপ্ত হয়। উনিশ শতকে অন্ততঃ পক্ষে স্বাধীন প্রতিযোগিতা চলতো কিন্তু এখন চিন্তার স্বাধীনতাকে রক্ষা করার কাজ তখনকার চেয়ে ঢের বেশি বিপজ্জনক। যে লোক মনের স্বাধীনতায় বিশ্বাসী, তাকে অবশ্যই পুরোপুরি অকপট ভাবে পরিস্থিতির মোকাবেলা করতে দাঁড়াতে হবে; সেই সঙ্গে হৃদয়ঙ্গম করতে হবে শিল্পযুগের শৈশবে যে সকল পদ্ধতি অবলম্বন করে সব প্রশ্নের জবাব পাওয়া গেছে এখন সেগুলো বাতিল হয়ে গেছে।

এ ব্যাপারে, দুটো সরল নীতি অবলম্বন করলেই প্রায় সকল সামজিক সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। তার প্রথমটা হবে শিক্ষা ব্যবস্থায় অভীষ্ট সমূহের একটা হবে যখন কোনো বিষয়ের পেছনে যুক্তির জোর থাকবে তা সত্য বলে গ্রহণ করা। দ্বিতীয়তঃ দক্ষতার ভিত্তিতে সকলের কর্মসংস্থান করা।

দ্বিতীয় নীতিটি সম্পর্কে প্রথমে আলোচনা করা যাক। কোন মানুষকে চাকুরিতে বহাল করার আগে তার রাজনৈতিক, নৈতিক এবং ধর্মীয় বিশ্বাস সম্পর্কে জানার অভ্যাস হলো আধুনিক কায়দার নির্যাতন। তার এসব জানার অনুসন্ধিৎসা দিয়ে তো তার কর্মদক্ষতা যাচাই করা হয় না। পুরনো স্বাধীনতা বিন্দুমাত্র ব্যবহার না করে আইনমতো যাচাই করা হয় না। পুরনো স্বাধীনতা বিন্দুমাত্র ব্যবহার না করে আইনমতে সহি সালামতে রক্ষা করা যায়। কোন মতামতে বিশ্বাস করার জন্যে কোন মানুষকে অনাহারে থাকতে হলে তার মতবাদ আইনতঃ শাস্তিযোগ্য নয়, জানা তার কাছে আরামপ্রদ কিছু নয়। ক্ষুধার্ত মানুষেরা ইংল্যাণ্ডের গির্জার অধীনে নয় বলে অথবা রাজনৈতিক মতবাদে গোঁড়ামিমুক্ত বলে তাদের জন্য অনুভূতি দিয়ে ভাবে অনেক মানুষ। নাস্তিক মর্মন ধর্মাবলম্বী, গোঁড়া সাম্যবাদী অথবা স্বাধীন ভালোবাসার প্রচারকদের সম্বন্ধে কোমল ধারণা কদাচিত পোষণ করা হয়। এ ধরণের মানুষকে সব সময় খারাপ বলে ধরে নেয়া হয় এবং স্বাভাবিক ভাবে চাকুরি দেয়ার অযোগ্য বলে পরিগণিত করা হয়। মানুষ এই প্রত্যাখ্যানের বিরুদ্ধে এখনো ভাবনা-চিন্তা করেনি। পরিপূর্ণরূপে শিল্পায়িত রাষ্ট্রে এ ধরণের ব্যাপক অত্যাচার করা হয়।

মানুষ যদি এ বিপত্তি সম্বদ্ধে ব্যাপকভাবে ওয়াকেবহাল হয়, তাহলে তা জনমত জাগাতে সমর্থ হবে এবং তা করতে হলে মানুষের বিশ্বাসকে তার চাকুরির নীরিখ হিসাবে গণ্য করা উচিত নয়। সংখ্যালঘুদের রক্ষা করার দায়িত্ব অপরিসীম। আমাদের যারা খুব ভয়ঙ্কর গোঁড়া তারাও কোনদিন সংখ্যালঘুতে পরিণত হতে পারে, সুতরাং আমাদের সংখ্যাগরিষ্ঠের অত্যাচারের বাধা দান করা একান্তই উচিত। জনমত ছাড়া আর কোন কিছু এ সমস্যার সমাধান দিতে পারবে না। ব্যতিক্রমী মালিকদের কাছে যে সুবিধা পাওয়া যায় সমাজতন্ত্র তার নিরসন করে সমস্যা আরো ঘোলাটে করে তুলবে। শিল্পের ক্ষেত্রে প্রত্যেক নতুন হস্তক্ষেপের ফলে অবস্থা অধিকতর সঙ্গীন হয়ে দাঁড়াবে, যেহেতু এর ফলে স্বাধীন বিনিয়োগ কর্তার সংখ্যা, কমতে থাকবে। একচেঠিয়া মালিকানায় যেমন তেমনি সমাজতন্ত্রেও বিশ্বাসের অবক্ষয় চূড়ান্ত সত্য বলে প্রমাণিত হবে। মানুষ যখন ক্যাথলিক অথবা প্রোটেষ্টান্ট মতবাদের চূড়ান্ত সত্যতায় বিশ্বাস করে,তাহলে একে অপরকে অত্যচার করার ইচ্ছা পোষন করে। মানুষ যখন তাদের আধুনিক ধর্মমত সম্বন্ধে জেনে ফেলেছে তারাও বিরুদ্ধবাদীদের নিজস্ব পদ্ধতিতে নির্যাতন করবে। থিয়োরিতে না হলেও প্রয়োগিক ক্ষেত্রে সহনশীলতার জন্য কিছু পরিমাণ সংশয়ের প্রয়োজনীয়তা আছে। এর সঙ্গে আমার দ্বিতীয় দফার সংযোগ রয়েছে, শিক্ষার অভীষ্ট ছিল যার আলোচ্য বিষয়।

পৃথিবীতে সহনশীলতা আনতে হলে স্কুল সমূহে যা যা শিক্ষা দিতে হবে তার একটি হলো প্রমাণের গুরুত্ব বিচার সম্পূর্ন ভাবে বিশ্বাস করার যুক্তি না থাকলে কোন বক্তব্যকে সত্য বলে মেনে না নেয়ার অভ্যাস শিক্ষা দেয়া। উদাহরণস্বরূপ সংবাদপত্র পাঠ করার কায়দা কসরত শিখিয়ে দেয়া উচিত। অনেকদিন আগে ঘটে গেছে এবং ঐ সময় আবেগ জড়িয়ে তুলেছিল, শিক্ষকদের এমন কতক ঘটনা বেছে নেয়া উচিত। একপক্ষের সংবাদ পত্র বিশেষ একটি ঘটনার ওপর কি মন্তব্য করেছিল এবং অন্য পক্ষের সংবাদপত্রের সে ঘটনার ওপর কি বক্তব্য ছিল তা ছাত্রের কাছে পড়ে শুনিয়ে নিরপেক্ষ ভাবে কি ঘটেছিল ছাত্রদের কাছে বলে দেয়া শিক্ষকের উচিত। প্রত্যেক দিকের পক্ষপাতিত্ব সম্বন্ধে আলোচনা করা সংবাদপত্রে যা লেখা হয় কম বেশী তাতে মিথ্যা থাকে একথা বুঝিয়ে দেয়া উচিত। এর ফলে ছেলে মেয়ের মনে যে বিদ্রুপাত্নক সংশয়ের সৃষ্টি হবে তার দরুন চালবাজদের পরিকল্পনায় ভালো লোকদের যে ভাবে ব্যবহার করা হয়, তার থেকে পরবর্তী জীবনে ছাত্রেরা বেঁচে থাকতে সক্ষম হবে।

এই পদ্ধতিতে ইতিহাস শিক্ষা দেয়া প্রয়োজন। উদাহরণ স্বরূপ নেপোলিয়ানের ১৮১৩-১৪ সালের অভিযানসমূহকে পাঠ্য তালিকায় অন্তর্ভূক্ত করা যেতে পারে। নেপলিয়ান কর্তৃক প্রত্যেক যুদ্ধে পরাজিত মিত্রশক্তির সৈন্যেরা যখন প্যারি নগরীর প্রাচিরে এসে হানা দিলো তখন প্যারির নগরবাসীরা কি রকম বিস্ময় অনুভব করেছিল। মৃত্যুর প্রতি ঘৃণা জাগাবার জন্যে লেনিন কতোবার টটস্কি কর্তৃক নিহত হয়েছিলেন উচ্চশ্রেণীর ছাত্রদেরকে তা জানতে অনুপ্রাণিত করা উচিত। ছেলেমেয়েদেরকে এমন এক স্কুলে দেয়া উচিত যে স্কুলে সরকার অনুমোদিত ইতিহাস পাঠ্য তালিকার অন্তর্ভুক্ত এবং আমাদের সঙ্গে ফরাসিদের যুদ্ধের ইতিহাস ফরাসি স্কুলে কি রকম তা অনুমান করতে নির্দেশ দেয়া উচিত। কতেক মানুষ যেমন বিশ্বাস করে নৈতিকতার বাণী প্রচার করে নাগরিক কর্তব্য শিক্ষা দেয়ার দায়িত্ব শেষ করা হয়। তার চেয়ে এরকমের শিক্ষা পদ্ধতি অনেক বেশি নাগরিক কর্তব্যের শিক্ষা সহায়ক হয়ে দাঁড়াবে।

আমার মতে এটা স্বীকৃত সত্য যে পৃথিবীর অশান্তির মূলে যতটুকু নৈতিক বিচ্যুতি রয়েছে অবশ্যই ততটুকু বুদ্ধিহীনতার প্রভাব বর্তমান। কিন্তু মানব সম্প্রদায় আজ পর্যন্ত নৈতিক দোষ সংশোধন করবার কোনও পন্থা আবিষ্কার করতে পারেনি। প্রচার এবং কপটতা,শুধু পুরনো পাপের তালিকায় নতুন দোষের সংখ্যা বাড়ায়। পক্ষান্তরে প্রত্যেক দক্ষ শিক্ষাবিদদের জানা পদ্ধতি অনুসারে সহজে বুদ্ধিবৃত্তি উৎকর্ষ সাধন করা যায়। সুতরাং নৈতিকতা শিক্ষার কোন পদ্ধতি না অবিষ্কার হওয়া পর্যন্ত প্রগতিকে নীতির বদলে বুদ্ধিবৃত্তি বিকাশের ওপরেই নির্ভর করতে হবে। বিশ্বাস প্রবণতা হলো বুদ্ধিবৃত্তির প্রধান প্রতিবন্ধক সমূহের একটি এবং প্রচলিত পদ্ধতিতে মিথ্যা খবর নিরসন ঘটিয়ে বিশ্বাস প্রবণতার পরিমাণ হ্রাস করা যেতে পারে। বিশ্বাস প্রবণতা বর্তমান দুনিয়াতে আগের তুলনায় অনেক সহজ হয়ে পড়েছে এবং গণতন্ত্রের জন্যে আগের চাইতে অনেক বেশি মিথ্যা খবর প্রচারের প্রয়োজনীয়তা বেড়েছে, সে কারণে সংবাদপত্রের পাঠক সংখ্যাও বৃদ্ধি পেয়েছে।

যদি আমাকে জিজ্ঞেস করা হয় পৃথিবীতে পূর্বোক্ত দুটো পদ্ধতি (১) উপযুক্ততার ভিত্তিতে চাকুরিতে বিনয়োগ করা। (২) শিক্ষার একটি লক্ষ্য হওয়া উচিত প্রমাণহীন বিষয়ে বিশ্বাস করার অভ্যাস পরিহার করা কি ভাবে প্রয়োগ করা উচিত, তাহলে আমি শুধু বলব সুশিক্ষিত জনমত গঠনের দ্বারাই তা সম্ভব। যারা এ পদ্ধতি চালু হোক কামনা করবে একমাত্র তাদের চেষ্টার ফলেই সুশিক্ষিত জনমত গঠন করা সম্ভব হবে। সমাজতন্ত্রবাদীরা অর্থনৈতিক পরিবর্তনের মাধ্যমে যে আরোগ্যের কথা বলেন, তাতে আলোচ্য দোষগুলোর কিছু হ্রাসপ্রাপ্তি ঘটবে বলে আমি বিশ্বাস করিনে। রাজনীতিতে যাই ঘটুক না কেন, অর্থনৈতিক বিকাশের ফলে মানসিক স্বাধীনতা অটুট রাখা বরঞ্চ অত্যাধিক বিপজ্জক হয়ে দাঁড়াবে যদি জনমতের চাপে পড়ে বিনিয়োগকর্তা কর্মচারীদের শুধু কাজ ছাড়া জীবনের বিশ্বাস সমূহ নিয়ন্ত্রণ করার ইচ্ছা পরিহার না করে। রাষ্ট্রের ক্ষমতা পরিদর্শন, টাকা পয়সা দেয়া এবং বিশেষ পদ্ধতির রক্ষণাবেক্ষণ করার মধ্যে সীমিত করার পর ইচ্ছে করলেই শিক্ষার স্বাধীনতা অর্জন করা যায়। কিন্তু তাতে করে শিক্ষা ব্যবস্থার ভার এসে পড়বে গির্জাগুলোর ওপর। দুর্ভাগ্যবশতঃ স্বাধীন চিন্তাবিদেরা তাদের সংশয় সমূহ শিক্ষা দিতে যতটুকু সচেষ্ট তারা তাদের বিশ্বাস সমূহের প্রচারের জন্যে অনেক বেশী তৎপর। সে যা হোক সত্যিকার ভাবে চাইলে উদারনৈতিক শিক্ষা ব্যবস্থা প্রবর্তন করার একটি ক্ষেত্র আবিষ্কার করা অসম্ভব হবে না। কিন্তু তা যতদূর সম্ভব আইনের আওতামুক্ত থাকবে।

এ প্রবন্ধে সর্বত্র আমি বলতে চেয়েছি বৈজ্ঞানিক গবেষণার উদ্ভূত ফলাফল থেকে সম্পূর্ণরূপে পৃথক, বৈজ্ঞানিক মেজাজের মাধ্যমে মানুষের মনের সজীবতা ফিরে পাওয়া যায় এবং আমাদের সকল রকমের অসুবিধা দূর করার পদ্ধতি প্রদান করতে সক্ষম। বিজ্ঞাপনের ফলাফল যান্ত্রিক পদ্ধতিতে, বিষাক্ত গ্যাসে, সংবাদপত্রের প্রচারে আমাদের সভ্যতাকে ধ্বংস করার হুমকী প্রদর্শন করেছে। যুদ্ধবাজেরা খণ্ডিত আনন্দে বিভোর হয়ে যা করে সভ্যতার পক্ষে তা অত্যন্ত মারাত্মক। কিন্তু আমাদের কাছে তা জীবন মরণের শামিল। এরই ওপর নির্ভরশীল আমাদের পৌত্র পৌত্রেরা অধিকতর সুখী পৃথিবীতে বসবাস করবে না বিজ্ঞাপনের উদ্ভাবিত পদ্ধতিতে একে অপরের বিনাশ সাধন করবে। মানব গোষ্ঠীর মধ্যে বোধ হয় শুধু নিগ্রো এবং পেপুয়ানেরাই বেঁচে থাকতে পারবে।

১৩. সমাজে স্বাধীনতার পরিধি

সামাজিক মানুষের জন্য কি পরিমান স্বাধীনতার প্রয়োজন এবং কতোদূর স্বাধীনতা সমাজে আচরনকরা সম্ভব এ সাধারন সমস্যাটি হলো আমার আলোচনার বিষয়।

‘স্বাধীনতা‘ এমন একটি শব্দ যাকে বিভিন্ন অর্থে ব্যবহার করা যায়। বিভিন্ন রকমের সংজ্ঞার মধ্যে যুক্তিসহকারে আলোচনা করে লাভবান হতে হলে একটি বিশেষ সংজ্ঞার ওপর আমাদের নির্ভর করতে হবে। সুতরাং স্বাধীনতার সংজ্ঞাসমূহের সম্বন্ধে আমাদের আলোচনা শুরু করা অধিকতর সুবিধাজনক হবে। ‘সমাজ’ শব্দটির মধ্যে দু রকমের কোন অর্থ নেই। কিন্তু তার সংজ্ঞায়ন প্রচেষ্টার মধ্যে যে কোন রকমের গলদ থাকতে পারেনা এমন কোন কথা নেই।

আমিও শব্দগুলোকে মামুলি অর্থে ব্যবহার করা উচিত মনে করি না; দৃষ্টান্তস্বরূপ বলা যেতে পারে, হেগেল এবং তার শিষ্যবেন্দর ধারনা ছিল, পুলিশের হুকুম যা তারা নৈতিক আইনে মনে করত, তামিল করার অধিকারের মধ্যেই সত্যিকারের স্বাধীনতার পুরোপুরি তাৎপর্য বিদ্যমান। অবশ্য পুলিশকেও বাধ্যতামূলক ভাবে তাদের উচ্চপদস্থ অফিসারদের মেনে চলতে হয়। সরকারের কি কর্তব্য এ সংজ্ঞার মধ্যে তার কোন সুনির্দিষ্ট সীমারেখা ব্যক্ত করা হয়নি। প্রচলিত মতানুসারে এ মতবাদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট যে বক্তব্য সে অনুসারে রাষ্ট্র হলো সংজ্ঞামতে নিরংকুশ নিষ্পাপ একটি প্রতিষ্ঠান। যে দেশে গণতন্ত্র এবং পার্টি সরকার বর্তমান সেখানে এ সংজ্ঞা বলতে গেলে অচল। কেননা ওসব দেশে অর্ধেক মানুষ সরকারকে মন্দ বলে বিশ্বাস করে। সুতরাং আমরা ওপরে বর্ণিত সত্যিকারের স্বাধীনতাকে স্বাধীনতার বদলে গ্রহণ করে সন্তুষ্ট থাকতে পারিনা।

মূলতঃ বিমূর্ত অর্থে আকাঙ্খর রূপায়নে বাহ্যিক বাধার অভাবকেই স্বাধীনতা বোঝায় এ বিমূর্ত অর্থ মেনে নিলে ক্ষমতা বৃদ্ধি করে অথবা অভাব কমিয়ে স্বাধীনতার হ্রাস বৃদ্ধি ঘটান সম্ভবপর। একটি পতঙ্গ কয়েকদিন জীবন ধারণ করে ঠাণ্ডায় মারা গেলে উল্লেখিত সংজ্ঞানুসারে বলতে হবে তার পরিপূর্ণ স্বাধীনতা রয়েছে। শীতের কারণে মারা গেলে পতঙ্গের সকল ইচ্ছার পরিসমাপ্তি ঘটবে, তখন অসম্ভবকে সম্ভব করা তার দ্বারা হয়ে উঠবে না। মানুষ এ পদ্ধতি অনুসরণ করে স্বাধীনতা অর্জন করতে পারেনা। একজন রাশিয়ান, অভিজাত যিনি সাম্যবাদী হওয়ার পর লাল ফৌজের কমিশনার নিযুক্ত হয়েছিলেন আমার কাছে ব্যখ্যা করেছিলেন, ইংরেজদের রাশিয়ানদের মতো বাহ্যিক কোন সোজা জ্যাকেট পরতে হয় না; যেহেতু তাদের আত্মা সকল সময় মানসিক জ্যাকেটের আবরণে আবৃত থাকে। সম্ভবতঃ এ বক্তব্যের মধ্যে কিছুটা সত্যতা আছে। ডষ্টয়েভস্কির উপন্যাসের চরিত্রগুলোর সঙ্গে আসল রাশিয়ানদের কোনও সাদৃশ্য নেই; কিন্তু ওসব চরিত্রগুলো আবিষ্কার একমাত্র রাশিয়ানদের দ্বারাই সম্ভব হয়েছিল। তাদের আশ্চর্য দুর্দান্ত সকল রকমের মারাত্মক আকাঙ্খ রয়েছে, অন্ততঃপক্ষে সচেতনভাবে গড়পড়তা ইংরেজেরা যার থেকে মুক্ত। সুতরাং যে সমাজের সকল মানুষ একে অন্যকে হত্যা করতে চায় সে সমাজের মানুষ শান্ত ইচ্ছাসমপন্ন সমাজের মানুষ থেকে বেশি পরিমাণে স্বাধীনতা ভোগ করতে পারে না। ক্ষমতার বৃদ্ধি সাধন করার মতো আকাঙ্খকে বিশুদ্ধ করে নেয়ার মধ্যেই স্বাধীনতা ভোগ করার অধিকাংশ সুযোগ সুবিধা নিহিত।

এ পরিপ্রেক্ষিতে বিচার করার ফলে যে আরেক রকমের প্রয়োজন আমরা অনুভব করি সব সময় রাজনৈতিক চিন্তা ধারার আলোক সম্পাতে তা সন্তুষ্টি বিধান করা যায় না। আমি সে প্রয়োজন সমূহের কথাই বলছি যেগুলোকে মনস্তাত্ত্বিক গতিবিজ্ঞান বলা যেতে পারে। বাহ্যিকভাবে যে অবস্থার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে হয়, তার মানে রাজনীতির স্বীকৃত সত্য তার সঙ্গে মানুষের প্রকৃতির কোন মিল নেই। কিন্তু বাহ্যিক অবস্থা যে মানুষের আকাঙ্খকে পরিশুদ্ধ করে এটা স্বীকৃত সত্য। বাহ্যিক অবস্থা এবং মানব প্রবৃত্তির মধ্যে পারস্পরিক ক্রিয়া প্রতিক্রিয়ার মাধ্যমে সঙ্গতি রক্ষা করা হয়। একজন মানুষকে তার চির পরিচিত পরিবেশ থেকে বিচ্ছিন্ন করে হঠাৎ অচেনা পরিবেশে ফেলে দেয়া হলে কিছুতেই স্বধীনতা অনুভব করবেনা। কিন্তু তা সত্ত্বেও নতুন পরিবেশে অভ্যস্থ মানুষ স্বাধীন অনুভব করতে পারে। সুতরাং নতুন পরিবেশের ফলে মানুষের বিভিন্ন আকাঙ্ক্ষার মধ্যে যে পরিবর্তন আসে তা স্মরনে না রেখে আমরা স্বাধীনতার সম্পর্ক আলোচনা করতে পারি না। এর অনেকগুলো ক্ষেত্রে স্বাধীনতা অর্জন অত্যন্ত কষ্টসাপেক্ষ, কেননা নতুন পরিবেশ পুরনো আকাঙ্ক্ষার সন্তুষ্টি বিধান করে কিন্তু নূতন জাগা আকাঙ্ক্ষাগুলো অপরিতৃপ্ত থেকে যায়। শিল্পায়নের মনস্তাত্ত্বিক প্রতিক্রিয়ার ফলে এর অনেকগুলো ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে কিন্তু তা আবার অনেকগুলো নতুন স্বভাবের জন্ম দিয়েছে। যেমন একজন মানুষ মোটর গাড়ি কিনতে পারেনা বলে অসন্তুষ্ট এবং খুব শিগগির ব্যক্তিগত এ্যারাপ্লেন পেতে চাইবে। আবার একজন মানুষ তার অবচেতন মনের অভাব বোধের জন্য অসন্তুষ্ট হতে পারে। উদাহরণ স্বরূপ আমেরিকানদের প্রয়োজন বিশ্রাম, কিন্তু বিশ্রাম কি জিনিস তা আমেরিকানরা জানেনা। আমার বিশ্বাস যুক্তরাষ্ট্রের যে অপরাধের ঢেউ এসেছে তার প্রধান কারণ অস্থিরতা।

যদিও মানুষের আকাঙ্খার মধ্যে বিভিন্নতা আছে তবুও কতিপয় মৌলিক প্রয়োজন রয়েছে যে গুলোকে সার্বজনীন অভাবের পর্যায়ে দেখা যায়। খাদ্য, পানীয়, স্বাস্থ্য পোশাক, বাসস্থান, যৌন প্রয়োজন এবং পিতৃত্ব ইত্যাদি তার মধ্যে প্রধান। (গ্রীষ্মমণ্ডলীয় দেশ সমূহে পোশাক এবং বাসস্থানের অভাব এত তীব্র এবং প্রখর নয়, বিষুবীয় অঞ্চল ছাড়া অন্যান্য দেশের মানুষের প্রয়োজনের তালিকায় এ দুটোকেও অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।) স্বাধীনতা বলতে যাই বোঝাক না কেননা; ওপরের তালিকায় যে সকল প্রয়োজনের কথা বলা হয়েছে, কোন মানুষ তার একটি থেকে বঞ্চিত হলেও তাকে স্বাধীন বলা যায় না; যেহেতু উপরের তালিকার মধ্যে স্বাধীনতার ন্যূনতম প্রয়োজনের কথাই বলা হয়েছে।

এজন্যে আমাদের সমাজের সংজ্ঞায় ফিরে আসতে হয়। ওপরে যে ন্যূনতম স্বাধীনতার কথা বলা হলো রবিনসন ক্রুশোর মতে নির্জন বাসের চাইতে সামাজিক জীবনে তার রূপায়ন অধিকতর সহজ। যৌন প্রয়োজন এবং পিতৃত্ব এ উভয় প্রয়োজন নিতান্তই সামাজিক। একদল মানুষ কতেক নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যে পরস্পরের সাথে সহযোগিতার ফলশ্রুতিই যে সমাজ, যে কোন লোক সমাজের এ সংজ্ঞায়নই দান করবে। মানুষের আদিমতম সামাজিক সংগঠন হলো পরিবার। অর্থনৈতিক সামাজিক সংগঠনের উৎপত্তিও আদিম যুগে হয়েছিল। আপাততঃ দৃষ্টিতে দেখা যায় যে সকল সংগঠন যুদ্ধ করার জন্যে পরস্পরের সঙ্গে সহযোগিতা করে তার উৎপত্তি তত আদিম কালে নয়। আধুনিক যুগে অর্থনীতি এবং যুদ্ধ হলো সামাজিক সংঘর্ষের প্রধান কারণ। পরিবার এবং গোত্রের চাইতে বৃহত্তর সামাজিক সংগঠন না থাকলেও আমরা সকলে আমাদের শারীরিক প্রয়োজন খুবই ভালোভাবে মিটাতে পারত। ঐ অর্থে সমাজ আমাদের স্বাধীনতা বৃদ্ধি করার কাজে নিয়েজিত রয়েছে। সুসংগঠিত রাষ্ট্রে বসবাস করলে আমাদের শত্রু কর্তৃক নিহত হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম, তা হলো একটি সন্দেহজনক বক্তব্য।

একজন মানুষের আকাঙ্খা সমূহকে যদি আমরা সত্য বলে গ্রহণ করি তার মানে, তার মনস্তাত্ত্বিক গতিবাদকে অস্বীকার করি তাহলে তার স্বাধীনতার দুরকম প্রতিবন্ধক আমরা স্পষ্টভাবে দেখতে পাব; সেগুলো তার শারীরিক এবং সামাজিক প্রতিবন্ধক। স্কুল দৃষ্টান্তের সাহায্যে তা দেখানো যায়, যেমন, পৃথিবী তার বেঁচে থাকার মতো খাদ্য উৎপাদন করে অথবা অন্য মানুষ তার খাদ্য সংগ্রহে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। সমাজ স্বাধীনতার শারীরিক বাধায় অবসান ঘটিয়ে সামাজিক বাধার সৃষ্টি করেছে। সে যাহোক, এখানে আমরা আকাঙ্খর ওপর সামাজিক প্রভাবের প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে সবিশেষ ওয়াকেবহাল না হলে ভুল পথে যেতে বাধ্য হব। একজন মানুষ ধরে নিতে পারে যে, পিঁপড়ে এবং মৌমাছি যদিও সংঘবদ্ধ সমাজে বাস করে তবুও স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে সামাজিক কর্তব্য করে যায়। উন্নত শ্রেণীর প্রাণী যেগুলো সমাজবদ্ধভাবে বাস করে, তাদের প্রত্যেকটি সম্বন্ধে একই কথা সত্য। রিভার্সের মতে কম বুদ্ধিবৃত্তিসম্পন্ন মানুষের সম্পর্কেও একই কথা প্রযোজ্য। তা আবার দেখা যায় অধিক পরিমাণ ইঙ্গিতময়তার উপর নির্ভরশীল কম বেশি ইন্দ্রজালে যা ঘটে থাকে সে সমস্ত উপাদানের সমগোত্রীয়। এ ভাবে মানুষের সমাজ গঠিত হলে মানুষ পরস্পরের সঙ্গে স্বাধীনতা বিসর্জন না দিয়ে সহযোগিতা করতে পারে এবং আইনের খুব বেশি প্রয়োজন পড়ে না। কি আশ্চর্য যদিও সভ্য মানুষের অসভ্যদের থেকে অধিকতর উন্নত সামাজিক সংগঠন রয়েছে, কিন্তু প্রবৃত্তির দিক দিয়ে তাদেরকে অসভ্য মানুষের তুলনায় কম সামাজিক আচরণ করতে দেখা যায়, যা তাদের উপর সমাজের প্রতিক্রিয়া অসভ্যদের তুলনায় অধিকতর বাহ্যিক এবং পোশাকী। সে কারণে তাদেরকে স্বাধীনতার সমস্যা সম্পর্কে আলোচনা করতে হয়।

সবচেয়ে সভ্য সম্প্রদায়েও সামাজিক সহযোগিতার মর্মমূলে যে প্রবৃত্তিগত ভিত্তি বর্তমান তা আমি তা স্বীকার করতে চাইনে। মানুষ প্রতিবেশীকে ভালোবাসতে এবং তাদের ভালোবাসা পেতে আগ্রহ পোষণ করে। তারা পরস্পরের অনুকরণ করে এবং ইঙ্গিত মারফত মনোভাব বুঝতে পারে। তা সত্বেও সভ্য হওয়ায় চরিত্রের এ উপাদান নিচয় শক্তি হারিয়ে দুর্বল হয়ে পড়েছে। স্কুলের ছাত্র থাকার সময়ে তাদের যে পরিমান শক্তি তাদের থাকে না, সামগ্রিকভাবে কম বুদ্ধিবৃত্তি সম্পন্ন মানুষের ওপর তারা ক্ষমতা বিস্তার করে সামাজিক সহযোগিতার ফলে যে সুবিধা পাওয়া যায়, ক্রমশঃ জ্যান্ত প্রবৃত্তির ঢিলে ঢালা স্তর অতিক্রম করে বিচার বুদ্ধির উপর নির্ভর করতে শুরু করছে। অসভ্যদের সমাজে ব্যক্তি স্বাধীনতার কোন প্রশ্ন জাগতে পারে না। যেহেতু তারা এর কোন প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে না। সভ্য মানুষেরা আরো সভ্য হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ব্যক্তি স্বাধীনতার প্রয়োজনীয়তা তীব্র হতে তীব্রতর রূপে অনুভব করেছে। একই সঙ্গে মানুষের জীবন নিয়ন্ত্রণে সরকারের ভূমিকা ধারাবাহিক ভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং সরকার শারীরিক প্রতিবন্ধকতা থেকে যে আমাদের স্বাধীনতাকে মুক্ত করতে পারে আগের তুলনায় তা অধিকতর স্পষ্ট হয়ে উঠছে। সুতরাং সামাজিক স্বাধীনতা সমস্যার দিকে নজর দেয়া খুবই প্রয়োজনীয় হয়ে উঠছে, তা না হলে আমরা অধিকতর সভ্য হয়ে উঠতে পারব না।

এ কথাও পরিস্কার যে শুধু মাত্র সরকারি শাসনের কড়াকড়ি হ্রাস করে স্বাধীনতা বৃদ্ধি করা যাবে না। একজন মানুষের আকাঙ্ক্ষা অন্য একজন মানুষের আকাক্ষার সঙ্গে মিলে না। সে জন্য অরাজকতা বলতে বেঝায় শক্তিমানের স্বাধীনতা এবং দুর্বলের দাসত্ব। আজকে পৃথিবীর যে জনসংখ্যা সরকারি শাসন না থাকলে অনাহার এবং শিশুমৃত্যুর ফলে, দশভাগের এক ভাগও থাকত কিনা সন্দেহ। শারীরিক দাসত্বের স্থলে সভ্য সমাজ স্বাভাবিক অবস্থায়ও যে জঘন্য সামাজিক দাসত্বের প্রবর্তন করেছে তা আরো ভয়াবহ এবং মারাত্নক। এখন আমাদের যে সমস্যাটি বিবেচ্য, তা হলো কি করে সরকার ছাড়া চলতে হয় তা নয়, বরঞ্চ স্বাধীনতার ওপর বিন্দুমাত্র হামলা না হয় মতো এর সুবিধা গুলো ভোগ করা। তাহল শারীরিক এবং সামাজিক স্বাধীনতার মধ্যে সামাঞ্জস্যবিধান করা। সুলভাবে দেখতে হলে তা এই দাঁড়ায় যে, বেশী খাদ্য এবং ভালো স্বাস্থের জন্য আমরা কি পরিমান সরকারি চাপ সহ্য করতে রাজি থাকব?

এ প্রশ্নের জবাব বাস্তবে দিতে গেলে একটা সহজ বিবেচনা আমাদের করতে হবে; আমাদের কি খাদ্য এবং স্বাস্থ্য দুটোই চাইতে হবে না কোন বিশেষ একটি চাইলে আমাদের চলবে? কোন লোক বন্দী অবস্থায় অথবা ১৯১৭ সনের ইংল্যান্ডে মানুষ যে কোন ধরনের সরকারি চাপ সইতে রাজি ছিল, কেননা স্পষ্টতঃ তা ছিল সকলের স্বার্থের অনুকুলে। কিন্তু কাউকে যদি সরকারি চাপ সহ্য করতে হয় এবং কাউকে যদি খাদ্য গ্রহণ করতে হয়, তাহলে প্রশ্নটা দাঁড়ায় সম্পূর্ন ভিন্ন রকম। এতে আমরা সমাজতন্ত্রবাদ এবং ধনতন্ত্রবাদের মাঝামাঝি এক অবস্থার সম্মুখনি হই। ধনতন্ত্রের সমর্থকরা স্বাভাবিক ভাবেই স্বাধীনতার পবিত্র নীতির নামে আবেদন করবে যার সবটুকু একটি মাত্র নীতিবাক্যের অন্তরালে নিহিত। নীতিবাক্যটি হলো, “ভাগ্যবানদেরকে হতভাগ্যদের ওপর অত্যাচার করতে অবশ্যই বাধা দিতে হবে।”

এই নীতির ওপর প্রতিষ্ঠিত স্বাধীনতাই হলো হস্তক্ষেপহীন অবাধ স্বাধীনতা, তাকে কোনমতেই অরাজকতা বলে গ্রহন করা চলে না। হস্তক্ষেপহীন স্বাধীনতা আইন বলে খুন-জখম দমন করে এবং দুর্ভাগাদের সশস্ত্র বিপ্লব দমন করতে যত কাল পর্যন্ত সাহস করছে ততকাল টেড ইউনিয়ন করতে বাধা দান করছে। এই ন্যূনতম সরকারি সুবিধা ছাড়া বাদবাকিগুলো অর্থনৈতিক ক্ষমতার দ্বারা পূরণ করাই ছিল অভীষ্ট লক্ষ্য। স্বাধীনতার সুযোগ নিয়ে একজন মালিক কর্মচারীদের বলতে পারে, “তোমরা তিলে তিলে অনাহারে মরবে।” কিন্তু স্বাধীনতা এমন কোন সুযোগ কর্মচারীদের দেয়নি যার ফলে তারা দাঁতভাঙ্গা জবাব বলতে পারে মালিককে,”তার আগে তোমাকে আমাদের গুলিতে মরতে হবে। কোন রকমের আইনের পাণ্ডিত্যের কচকচি ছাড়া এ দুপ্রকার ভীতির মধ্যে কোনরকম ইতর বিশেষ করা অনেকটা হাস্যাস্পদ। দুটোর প্রত্যেকটাই স্বাধীনতার ন্যূনতম প্রয়োজনকে সংকুচিত করে রাখে, এতে শুধু একটা নয় দু’টা কারণই সক্রিয় সমানভাবে। একমাত্র অর্থনৈতিক দিগন্তে এ অসাম্য সীমাবদ্ধ নয়। স্বাধীনতার পবিত্র নীতি স্বামীকে স্ত্রীর ওপর পিতাকে পুত্রের ওপর নির্যাতন করার আইনতঃ অধিকার দান করেছে, কিন্তু প্রচার করেছে স্বাধীনতা অবশ্যই সর্বপ্রথম এ বিরোধ সমূহের নিস্পত্তি করবে। কারখানাতে কাজ করতে বাধ্য করতে পুত্রের পিতা যে নির্যাতন করেছে উদারনৈতিকদের উপস্থিতি সত্ত্বেও তার ফয়সালা হয়ে গেছে।

কিন্তু বিষয়টি হলো আলোচিত, সে জন্যে আমি এর ওপর বিশেষ কিছু বলে সময় নষ্ট না করে সাধারণ প্রশ্নের প্রতি আলোকপাত করতে চাই তাহলো সমাজ কতকাল ব্যক্তির ওপর, ব্যক্তির কারণে নয় সামাজিক কারণে হস্তক্ষেপ করবে? এবং কি উদ্দেশ্যের জন্য হস্তক্ষেপ করবে?

শুরুতেই আমাদের বলা উচিত, স্বাধীনতার ন্যূনতম প্রয়োজন খাদ্য, পানীয়, স্বাস্থ্য, বাসস্থান, পোশাক জৈবিক প্রয়োজন এবং পিতৃত্বের দাবিকে অন্যান্য সকল রকমের দাবীর উর্ধ্বে স্থান দিতে হবে। ওপরে বর্ণিত ন্যূনতম প্রয়োজন সমূহ মানুষের জৈবিক প্রয়োজন এবং পিতৃত্বের দাবিকে অন্যান্য সকল কর্মের দাবীর উর্ধ্বে স্থান দিতে হবে। ওপরে বর্ণিত ন্যূনতম প্রয়োজন সমূহ মানুষের জৈবিক বেঁচে থাকার জন্য অপরিহার্য। একটু আগে যে সকল বিষয়ের কথা বলেছি সেগুলো প্রয়োজনীয়তার বাইরে যে বিষয় সমূহ আছে সেগুলো অবস্থানুসারে স্বাচ্ছন্দ্য এবং বিলাসিতার পর্যায়ে পড়ে। একজন মানুষকে স্বাচ্ছন্দ্য থেকে বঞ্চিত করে অন্য একজন মানুষের প্রয়োজনে সাড়া দেয়াকে আমি প্রাথমিকভাবেই যুক্তিযুক্ত মনে করি। কোন বিশেষ সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে কোন বিশেষ সমাজে রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক অবস্থানুসারে তা হয়ত প্রয়োগক্ষম নাও হতে পারে। কিন্তু স্বাধীনতার ক্ষেত্রে তা কখনো আপত্তিজনক নয়। একজন মানুষকে তার প্রয়োজনীয় দাবি থেকে বঞ্চিত করলে তার স্বাধীনতার ওপর যে হস্তক্ষেপ করা হয়, বাড়তি দাবি থেকে বঞ্চিত করা হলে ব্যক্তি স্বাধীনতার ওপর তার চেয়ে বেশি হস্তক্ষেপ করা হয়।

যদি একথা স্বীকার করে নেয়া হয়, তাহলে তা আমাদেরকে অনেক দূরে নিয়ে যায়। দৃষ্টান্ত স্বরূপ স্বাস্থ্যের কথা ধরা যাক ব্যুরো কাউন্সিলের নির্বাচনের সময় সরকারি অর্থের কি পরিমাণ জনস্বাস্থ্য, প্রসূতি সদন এবং শিশু মঙ্গলের কাজে ব্যয়িত হবে, সে প্রশ্ন খুবই উল্লেখ্য ভূমিকা গ্রহণ করে থাকে। হিসাব করে দেখা গেছে এ সকল কাজে ব্যয়িত অর্থ জীবন রক্ষার কাজে প্রচুর উপকারে আসে। লণ্ডনের প্রায় প্রত্যেক ব্যুরোর ধনীরা একযোগে এসবে যাতে ব্যয় বৃদ্ধি না হয়, বরঞ্চ ব্যয় সঙ্কোচের জন্য উঠে পড়ে লেগেছে। তাদের অভিপ্রায় হলো, হাজার হাজার মানুষকে মৃত্যু গহবরে ঠেলে দিতে তারা প্রস্তুত যার বদৌলতে তারা মোটর গাড়িতে চড়তে পারে এবং নৈশভোজের ব্যবস্থা করতে পারবে। তারা সমস্ত সংবাদ পত্র নিয়ন্ত্রণ করবে বলেই তাদের কীর্তি কলাপের কাহিনী তারা যে সকল মানুষকে নির্যাতন করে তারা জানতে পারে না। মনঃসমীক্ষকদের কাছে পরিচিত এমন এক পদ্ধতি অবলম্বন করে তারা নিজেরাও সত্যকে এড়িয়ে যায়। তাদের কার্যকলাপের মধ্যে বিস্মিত হওয়ার কোন কিছু নেই; সকল যুগের অভিজাতদের এইই পরিচয়। আমার যা বক্তব্য তা হলো স্বাধীনতার প্রশ্নে তাদের সকল কীর্তি কলাপ কোন ক্রমেই সমর্থন যোগ্য নয়।

আমি যৌন প্রয়োজন এবং পিতৃত্বের অধিকার সম্বন্ধে কোন আলোচনা করব না। আমি শুধু বলব যে দেশে নরনারীর মধ্যে এক শ্রেণী অন্য শ্রেণীর তুলনায় ব্যাপক সংখ্যাগরিষ্ঠ, প্রচলিত ব্যবস্থা মতে কদাচিত যৌন প্রয়োজন এবং পিতৃত্বের দাবি মিটানো যায় সে দেশে, তদৃপরি কঠোর খ্রিষ্ঠান ঐতিহ্যের অশুভ প্রতিক্রিয়া মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে না। রাজনৈতিকদের পক্ষে মানব প্রবৃত্তি সম্পর্কে অবগত হওয়ার কোন সময় নেই যে বিশেষ বিশেষ আকাঙ্খ সাধারণ নরনারীকে চালিত করে সে বিষয়ে তাদরেকে একেবারে অজ্ঞই বলতে হবে। রাজনৈতিক পার্টির নেতাদের সামান্য মাত্র মনস্তাত্ত্বিক জ্ঞান থাকলেও তারা সমগ্র দেশকে পরিষ্কার অনাচারমুক্ত করে গড়তে পারত।

সকলের জৈবিক প্রয়োজন সরবরাহ করার জন্যে সমাজ ব্যক্তির ওপর যে হস্তক্ষেপ করে বিমূর্ত ভাবে তা স্বীকার করলেও একজন মানুষ অন্যজনের বদৌলতে কিছু অর্জন করলে তার ওপর যে সমাজ হস্তক্ষেপ করবে, এটা আমি স্বীকার করতে পারি নে। আমি এসকল বিষয়কে মতামত, জ্ঞান এবং শিল্পের বিষয়বস্তু হিসেবে চিন্তা করি। যেহেতু অধিকাংশ মানুষ অন্যের অধিকারের যা আছে তার ওপর যে মতবাদ হস্তক্ষেপ করে না সে মতবাদকে পছন্দ করেনা। সমাজের অধিকাংশ মানুষ কতেক বিষয় সম্বন্ধে জানতে অনাগ্রহী, কিন্তু যারা জানতে চায় তাদেরকে কারাগারে প্রেরণ করার কোন অধিকার তাদের নেই। আমি একজন মহিলাকে জানি যিনি টেক্সাসের পারিবারিক জীবনের ওপরে একটি বই লিখেছেন এবং বইটিকেও আমি সমাজতান্ত্রিক দৃষ্টিকোণ থেকে খুবই প্রয়োজনীয় মনে করি। ব্রিটিশ পুলিশ মনে করে যে কোন বিষয়ের সত্য জানার কারো অধিকার নেই, সুতরাং ডাক যোগে ঐ বই প্রেরণ করাকে বেআইনী ঘোষণা করল। সকলেরই জানা কথা অনেক সময় মনঃসমীক্ষকেরা অন্তরের মধ্যে চীর ধরা অবদমিত স্মৃতিকে জাগরিত করে রোগীকে আরোগ্য করে তোলে। সমাজও কিছু অংশে মনোবিকল রোগীর এত। কিন্তু অরোগ্য লাভ করার চাইতে যে চিকিৎসকেরা অপ্রিয় সত্যকে দিনের আলোকে প্রকাশ করে, সে চিকিৎসকদেরকে কারারুদ্ধ করে রাখে। স্বাধীনতার ওপর এ হামলা কোনক্রমেই সমর্থন করা যায় না। একই যুক্তিতে ব্যক্তিগত নৈতিকতার উপর হস্তক্ষেপ করা হয়, যেমন একজন মানুষ যদি দুটি স্ত্রী গ্রহণ করতে চায় অথবা একজন স্ত্রীকে দু’জন স্বামী, এটা তার বা তাদের ব্যক্তিগত ব্যাপার, এর বিরুদ্ধে কারো কোন ব্যবস্থা গ্রহণের প্রয়োজন পড়ে না।

এতক্ষণ পর্যন্ত বিমূর্ত যুক্তির আলোকে স্বাধীনতার ওপর ন্যায় সঙ্গত হস্তক্ষেপের সীমারেখা সম্পর্কে আলোচনা করেছি, এখন আমি কতকগুলো অধিকতর মনস্তাত্ত্বিক বিষয়ে আলোচনা করব।

আমরা দেখেছি, স্বাধীনতার প্রতিবন্ধক দুরকমের। সামাজিক এবং শারীরিক। বাধা তা সামাজিক এবং শারীরিক যে রকমই হোক না কেননা স্বাধীনতার ঘাটতি হলো প্রত্যক্ষ ফলশ্রুতি। কিন্তু সামাজিক বাধা অধিকতরো ক্ষতিজনক কেননা এর ফলে অতৃপ্তির সৃষ্টি হয়। একটা ছেলে গাছে চড়তে চায়, আপনি তাকে বারণ করলে সে ভয়ঙ্কর হিংস্র হয়ে উঠবে; কিন্তু যদি তার শারীরিক কারণে চড়তে না পারে তাহলে সে শরীরকেই দোষী করবে। সময়ে গীর্জায় যাওয়া; সেগুলো করতে দেয়া উচিত। অতৃপ্তিকে অবদমন করার জন্যে সরকার দুর্ভাগ্যের সঙ্গে প্রাকৃতিক দুর্যোগের যোগসুত্র আবিষ্কার করে এবং অতৃপ্তি সৃষ্টি করার জন্যে বিরোধীদলীয় মানুষের কাজকেই দায়ী করে। রুটির দাম বেড়ে গেলে সরকার বলে খারাপ শস্যোৎপাদনের কারণে হয়েছে, বিরোধীদল বলে মুনাফাখোরদের চক্রান্তেই রুটির দাম বেড়েছে। শিল্পের প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে মানুষ মানুষের অসীম শক্তিতে বিশ্বাসী হয়ে উঠেছে। তারা ভাবে, প্রাকৃতিক দুর্যোগ নিরসন করার জন্যে মানুষ যা করতে পারে তার কোন সীমারেখা নেই। সমাজতন্ত্রও ঠিক তেমনি এক ধরণের বিশ্বাস, দারিদ্র্য, আল্লাহতাআলা প্রেরণ করে বলে আমরা মনে করি না, বরঞ্চ মনে করি মানুষের নিষ্ঠুরতা এবং বোকামির ফল। এই বিশ্বাস সঙ্গতিবানদের প্রতি সর্বহারার দৃষ্টিভঙ্গিকে বদলে দিয়েছে। মানুষের অসীম ক্ষমতাকে অনেকদূর নিয়ে বেশী বড় করে দেখানো হয়েছে। ভূতপূর্ব স্বাস্থ্যমন্ত্রী সহ অনেক সমাজতন্ত্রী বিশ্বাস করেন যে সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থায় প্রত্যেক মানুষ প্রচুর খেতে পাবে, যদি ভূ-পৃষ্ঠে জনসংখ্যা প্রবলভাবে বেড়ে যায় তবুও কেনো খাদ্য ঘাটতি হবে না। এরকমের বাড়াবাড়িকে আমি ভয় করি। সে যাহোক, মানুষের অসীম শক্তিতে আধুনিক কালে যে বিশ্বাস জন্মেছে, পরিস্থিতি খারাপ দিকে মোড় নিলে তা অতৃপ্তিকে আরো বাড়িয়ে তুলবে। দায়ী করার উপযুক্ত কারণ থাকা সত্ত্বেও এখন দুর্ভাগ্যের জন্য প্রকৃতি এবং খোদা ইত্যাদিকে দায়ী করা হয় না। তার ফলে অতীতের সমাজকে যত সহজে শাসন করা যেতো বর্তমান সমাজকে তত সহজে শাসন করা যায় না; এর কারণ হলো শাসক শ্ৰেণী অত্যধিকভাবে ধার্মিক এবং তাদের কৃত অপরাধের ফলে যে দুর্ভাগারা ভোগে তাদের তারা আল্লাহর নির্দেশ বলে চিহ্নিত করে। আধুনিক যুগে পূর্বকালের এত নূন্যতম প্রয়োজনীয় স্বাধীনতার উপর হস্তক্ষেপ করা যুক্তিসঙ্গত তা প্রমাণ করা যাবে না, কেননা হস্তক্ষেপ ক্রিয়াকে অপরিবর্তনীয় আইনের ছদ্মবেশ পরিয়ে আত্নগোপন রাখা সম্ভব নয়। তা সত্ত্বেও পুরাতনেরা প্রত্যেকদিন দৈনিক টাইমসে চিঠি লিখে এ পুরনো পদ্ধতি টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করে। তা ছাড়াও আরো দুটো কারণে সামাজিক স্বাধীনতার বিরোধিতা করা হয়। প্রথমটা হলো মানুষ অন্যের উন্নতি কামনা করে না বরং দ্বিতীয়টি হলো কিসে পরের উন্নতি হয় তা তারা জানে না। বোধহয় মূলতঃ দুটো কারণই, একটি কারণের এপিঠ ওপিঠ। যখন আমরা আন্তরিকভাবে কোন মানুষের ভালো কামনা করি তখন আমরা তার আসল অভাব কি সে সম্বন্ধেও অবগত হই। মানুষ প্রতিহিংসা বশতঃ ক্ষতি করুক অথবা অজ্ঞতার কারণেই ক্ষতি করুক বাস্তবে তা একই রকমের ফলদান করে। সুতরাং আমরা একসঙ্গে দুটো কারণকে নিয়ে বলতে পারি একটি মানুষকে অন্য একটি মানুষের একটি শ্রেণীকে অন্য একটি শ্রেণীর স্বার্থের সংরক্ষক বলে এখনো বিশ্বাস করা যায় না। অবশ্য গণতন্ত্রের ভিত্তি এ যুক্তির ওপরেই প্রতিষ্ঠিত। কিন্তু আধুনিক রাষ্ট্রের গনতন্ত্রকে বিভিন্ন কর্মচারীর মাধ্যমে কাজ করতে হয় বলে ব্যক্তিসাধারণের কাছে এর আবেদন অপ্রত্যক্ষ এবং ভাসাভাসা।

কর্মচারীদের নিয়ে আবার বিশেষ ধরণের বিপত্তি হতে পারে, কারণ সাধারণতঃ তারা যে সকল লোককে নিয়ন্ত্রণ করে তাদের থেকে দূরে অফিসে বসে কাজ করে। শিক্ষার কথাই ধরা যাক না কেননা, শিক্ষকেরাই সর্বাঙ্গীনভাবে ছেলেমেয়েদের সঙ্গে দীর্ঘকালের মেলামেশার পর তাদেরকে বুঝতে পারে এবং তাদের সম্পর্কে যত্নবান হতে পারে। তাদেরকে যে সরকারি অফিসারেরা নিয়ন্ত্রণ করে তাদের কোনও বাস্তব অভিজ্ঞা নেই এবং তাদের কাছে শিশুরা নোংড়া ছোকরা ছাড়া আর কিছু নয়। সুতরাং শিক্ষকদের স্বাধীনতার ওপর অফিসারদের হস্তক্ষেপ ক্ষতিজনক। সব ব্যাপারে ক্ষমতা তাদের হাতেই কুক্ষিগত যাদের টাকা আছে কিন্তু তাদের হাতে নয় যারা কোথায় টাকা খরচ করতে হবে তা ভালোভাবেই জানে। সুতরাং যাদের হাতে ক্ষমতা আছে সাধারণতঃ তারা অজ্ঞ এবং প্রতিহিংসাপরায়ন; তাদের হাতে যত কম ক্ষমতা থাকে ততই মঙ্গল।

যেখানে বাধতামূলকভাবে নৈতিক স্বীকৃতি আদায় করা যায়, সেখানে বাধ্যতার শক্তিও খুব প্রচণ্ড; যদিও সম্ভব হলে যা তার কর্তব্য বলে ধরে দেয়া হয়, সে ইচ্ছা করলে, তা ফাঁকি দিতে পারে। কোন খোলা পথ না পেলে আমরা বরঞ্চ কর দিতে রাজি হই, যদিও কর আদায়কারী যাদু-মন্ত্র বলে আমাদেরকে উপেক্ষা করে চলে যায়, তখন আমাদের অনেকেই তাকে আমাদের অস্তিত্বের কথা স্মরণ করিয়ে দেবার প্রয়োজনীয়তা পর্যন্ত অনুভব করিনা। এ সকল ক্ষেত্রে আমরা কোকেন বন্ধের জন্য তাড়াহুড়া করি, যদিও সময়-সময়ে তারা বিদ্রোহের খেলা খেলতে ভালবাসে। ছেলেদের অনুপম বৈশিষ্ট্য হলো তাদের ওপর যাদের শাসন চলে তাদেরকে তারা ভালোবাসে মাঝে মাঝে; যেখানে এ অবস্থা, সেখানে শিশুরা সাধারণতঃ শাসনকর্তাদের সম্পর্কে কোন অশ্রদ্ধা পোষণ করেনা, যদিও তারা মাঝে মাঝে তাদের বিরোধিতা করে থাকে। শিক্ষাবিভাগীয় কর্তাদের শিক্ষকদের মত এ গুণ নেই। তারা যেভাবে রাষ্ট্রের ভালো হবে মনে করে সেভাবে দেশপ্রেম শিক্ষা দিয়ে শিশুদের কোরবান করে। তাহলে সামান্যতম কারণে হত হওয়ার এবং হত্যা করার ইচ্ছাকে শাণিয়ে তোলা। যারা শাসিতদের হিত কামনা করে তাদের হাতে ক্ষমতা থাকলে তুলনামূলকভাবে কম ক্ষতি সাধিত হতো। কিন্তু এ ব্যাপারে সফলতা লাভ করার কোন পদ্ধতি আমাদের জানা নেই।

শাসিতেরা যখন দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে যে, আইনের বলে তাদেরকে শাসন করা হচ্ছে তা দূরভিসন্ধিমূলক এবং ক্ষতিকর, তখন বাধ্যবাধকতার বিষময় ফল হবে। একজন মুসলমানকে শুকরের মাংস অথবা একজন হিন্দুকে গোমাংস বাধ্য করে খাওয়ান সম্ভব হলেও কাজটা যে চূড়ান্ত ঘৃণ্য হবে তাতে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই। যারা টিকা দেওয়া অন্যায় মনে করে তাদেরকে টিকা নিতে বাধ্য করাও উচিত নয়, তবে প্রশ্নটা স্বাধীনতার সঙ্গে সম্পর্কিত নয়, কেননা দু’ব্যাপারে কোনটাতেই তাদের সঙ্গে আলোচনা করা হয় না। প্রশ্নটি পিতামাতার সঙ্গে রাষ্ট্রের কোন সাধারন নীতি অনুসারে তা সমাধান করা যাবেনা। যে পিতামাতার সন্তানকে শিক্ষা দেয়ার বিরুদ্ধে সুচিন্তিত মতবাদ রয়েছে, তাদের শিশুদেরও অশিক্ষিত করে রাখবার কোন অধিকার নেই। তার পরেও সাধারণ নীতি যতদূর যায়, দুটি ব্যাপারই পরস্পর সাদৃশ্যাত্মক।

একজন মানুষ যে জিনিস সমূহ অন্যের বদৌলতে লাভ করে এবং একজনের যে জিনিস লাভের ফলে পরের কোন অনিষ্ট হয় না, এ দুয়ের মধ্যবর্তী প্রভেদটুকুই হলো স্বাধীনতার ব্যাপারে অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। আমি যদি খাদ্যদ্রব্যের ন্যায্য অংশের চাইতে বেশি দাবি করি তাহলে অন্য একজন মানুষকে সেজন্য উপোষ করতে হবে, কিন্তু যদি আমি অসাধারনভাবে গণিতশাস্ত্রে আত্ননিয়োগ করি তাহলে শিক্ষাব্যবস্থাকে সুযোগ সুবিধা একচেটিয়া না করে ফেললে কারো কোন ক্ষতি করবে না। এখানে আরো একটি প্রসঙ্গ রয়ে গেছে খাদ্য, বাসস্থান এবং পোষাক হলো জীবনের জন্য প্রয়োজনীয়, সে ব্যাপারে একজন মানুষের সঙ্গে অন্য মানুষের বিশেষ কোন মতভেদ নেই। সুতরাং গণতন্ত্রে সরকারি কার্যপরিচালনার পক্ষে সেগুলো খুবই উপযুক্ত এবং প্রয়োজনীয়। এসব ব্যাপারে ন্যায়বিচার শাসনতান্ত্রিক রীতি হওয়া উচিত। একটি আধুনিক গণতান্ত্রিক দেশে ন্যায়বিচারের অর্থ হলো সমতা। কিন্তু যে দেশে উত্তরাধিকারসূত্রে শ্রেণীসমূহের পরম্পরা বর্তমান, উচ্চ-নীচ সকলের দ্বারা স্বীকৃত সে দেশে ন্যায়বিচারের অর্থ সমতা নয়। এমনকি ইংল্যাণ্ডের অধিকাংশ মজুরদের কাছেও যদি বলা হয় তাদের এত রাজারও কোন জাকজমক থাকা উচিত নয়, তাহলে তারা মূচ্ছা যাবে। সুতরাং একেবারে কম ঈর্ষার সঞ্চার করে মত ন্যায় বিচারের সংজ্ঞায়ন করতে চাই। কুসংস্কার, মুক্ত সমাজে সমতাই হলো ন্যায়বিচার, কিন্তু যে সমাজ দৃঢ়ভাবে সামাজিক অসামোর উপর বিশ্বাস প্রবণ সে সমাজে নয়।

কিন্তু নীতি, চিন্তা, শিল্প ইত্যাদির দিক নিয়ে একজন মানুষ অন্যের বদৌলতে, নিজের অধিকার অর্জন করতে পারে না। অধিকন্তু এ ক্ষেত্রে কোনটা ভালো তাও যথেষ্ট সন্দেহজনক। কেননা কেউ পোলাও-কোর্মা খায় আর কেউ পান্তাভাতও খেতে পায় না। যদি সুখি পোলাও কোরমা খাওয়া মানুষ দারিদ্রের সুফল প্রচার করে তখন তাকে একজন কপট ভাবা হবে। যদি আমি অঙ্ক পছন্দ করি এবং অন্য একজন মানুষ গান পছন্দ করে, তখন আমরা পরস্পরের ওপর কোন হস্তক্ষেপ করিনা, যখন আমরা পরস্পরের প্রশংসা করি তখন আমরা পরস্পরের প্রতি ভদ্রতা পোষণ করি। মতামতের ক্ষেত্রে স্বাধীন প্রতিযোগিতা হলো সত্যে পৌঁছুবার একমাত্র পন্থা। প্রাচীন উদারনৈতিক নীতি বাক্যগুলো অর্থনীতির ক্ষেত্রে প্রয়োগ করে অপব্যবহারই করা হয়েছে। মানসিক ক্ষেত্রেই সেগুলো সত্যিকারভাবে প্রযোজ্য। আমরা ব্যবসায়ে নয় আদর্শের ক্ষেত্রেই স্বাধীন প্রতিযোগিতা কামনা করি। মুশকিল হলো, ব্যবসায়ের ক্ষেত্রে স্বাধীন প্রতিযোগিতা মারা গেলে বিজয়ীরা মানসিক ও নৈতিক ক্ষেত্রে উত্তরোত্তর অর্থনৈতিক ক্ষমতা বিস্তার করে এবং সৎচিন্তা এবং সজীবনধারণের নামে সকলকে মজুর বানিয়ে ছাড়ে। এটা খুবই দুর্ভাগ্যজনক, কেননা চিন্তার অর্থ হলো কপটতা এবং সৎজীবন ধারণের অর্থ হলো বোকামি। সমাজতন্ত্র অথবা গণতন্ত্রে শ্রেষ্ঠতম বিপদ হলো, অর্থনৈতিক নির্যাতনের জন্য সর্বপ্রকার মানসিক এবং নৈতিক উন্নতি উভয় পদ্ধতির মধ্যেই অসম্ভব। কোন মানুষের ধর্ম যতক্ষণ পর্যন্ত ব্যক্তিস্বাধীনতার প্রতি হস্তক্ষেপ শ্রদ্ধা পোষণ করা উচিত। তা না হলে আমাদের নির্যাতনকারী প্রবৃত্তিসমূহ ষোড়শ শতাব্দীর স্পেনের মতো একটি ছাঁচে ঢালা সমাজের সৃষ্টি করবে। বিপদ সত্যিকার এবং সন্নিকট। আমেরিকা দ্রুত অগ্রসর হচ্ছে সত্যিকার অর্থে স্বাধীনতার মূল্য না বুঝতে পারলে আমাদের ইংল্যাণ্ড ও আমেরিকাকে অনুসরণ করতে বাধ্য হবে। সে স্বাধীনতা আমাদের চাওয়া উচিত তা অপরকে অত্যাচার করার অধিকার নয়, আমাদের পছন্দ এবং ধারণা অনুসারে জীবনধারণ করার অধিকার যা জীবনধারণ করতে বাধা দান করে না।

উপসংহারে মনস্তাত্ত্বিক গতিবাদ যে শব্দটি ব্যবহার করেছিলাম শুরুতে, সে সম্বন্ধে আমি কিছু বলতে চাই। যে সমাজে একজাতীয় চরিত্রের মানুষ অধিক, সে সমাজ বিভিন্ন জাতীয় চরিত্রের সমবায়ে গঠিত সমাজ থেকে বেশি স্বাধীনতা ভোগ করে। মানুষ এবং বাঘে মিলে যে সমাজ গঠিত সে সমাজে অধিক স্বাধীনতা থাকতে পারে না, মানুষকে অথবা বাঘকে অবশ্যই দাসত্বের শৃঙ্খল পরতে হবে। সুতরাং পৃথিবীর যে অঞ্চলের মানুষ কৃষ্ণকায়দের শাসন করে সেখানে কোন স্বাধীনতা থাকতে পারে না। অধিক পরিমাণ স্বাধীনতা অর্জন করতে হলে, শিক্ষার সাহায্যে চরিত্র গঠনের প্রয়োজন, যাতে করে মানুষ যে সব কাজ নির্যাতনমূলক নয় তার মধ্যে সুখের সন্ধান করতে পারে। জীবনের প্রথম ছ’ বছরে চরিত্র গঠন যখন হয় তখনই এই শিক্ষা দিতে হয়। ডেপটফোর্ডে মিস ম্যাকমিলান ছেলেদেরকে যেভাবে শিক্ষা দিচ্ছেন, তার ফলে শিশুরা একটি স্বাধীন সম্প্রদায় গঠন করতে সক্ষম হয়েছে। তাঁর পদ্ধতি অনুসারে ধনী দরিদ্র সকলকে শিক্ষা দান করা যায়, তাহলে এক পুরুষকালে আমাদের সামাজিক সমস্যা সমাধান করার পক্ষে যথেষ্ট। শিক্ষার মধ্যে সবচেয়ে প্রয়োজনীয় কি তার অবিচার না করে পদ্ধতির ওপর, জোর দেয়ার দিকে সকল পার্টি অন্ধ হয়ে উঠে-পড়ে লেগেছে। পরবর্তী বছরগুলোতে অনেক আকাঙ্ক্ষার মূলতঃ পরিবর্তন না করে নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না, সেজন্য শৈশবাবস্থায় বাচ এবং বাঁচতে দাও এ শিক্ষা শিশুদেরকে অবশ্যই দিতে হবে। যে সকল জিনিষ অন্যের ক্ষতি করা ছাড়া অর্জন করা যায় না; অনাগ্রহী নর-নারীকে সে সকল জিনিস দেয়া হোক। সামাজিক স্বাধীনতার প্রতিবন্ধক দ্রুত অপসারিত হবে।

 ১৪. শিক্ষার প্রশ্নে স্বাধীনতা বনাম ক্ষমতা

অন্যান্য বিষয়ের মতো শিক্ষাক্ষেত্রেও স্বাধীনতা পরিমানগত। কোন কোন বিষয়ে স্বাধীনতাকে বরদাশত করা হয় না। একবার আমার সঙ্গে এক ভদ্রমহিলার দেখা হয়েছিল যিনি মনে করতেন, কোন বিষয়ই শিশুদেরকে বাধা দেয়া উচিত নয়, যেহেতু শিশুর অন্তর্নিহিত প্রকৃতি আপনা-আপনি বিকাশ লাভ করে। আমি তাঁকে। জিজ্ঞেস করেছিলাম যদি আলপিন ভক্ষণ করে তখন কেমন হবে। খুবই দুঃখের সঙ্গে স্বীকার করতে হচ্ছে ভদ্রমহিলা জবাবে আমাকে কেবল কটুক্তিই করেছিলেন। তা সত্ত্বেও শিশুদের ছেড়ে দেয়া হলে তাড়া শিগগির অথবা দেরিতে আলপিন ভক্ষণ করবে, ঔষদের বোতল থেকে বিষপান করবে, অথবা উচ্চ কোন জানালা থেকে। লাফিয়ে পড়বে, অথবা ও জাতীয় কোন অঘটন ঘটাবে। একটু বয়স বাড়লে পরে বালকেরা সুযোগ পেলেই অপরিষ্কার থাকবে, অতিরিক্ত খাবে, এবং রোগে না ধরা পর্যন্ত ধূমপান করবে, ঠাণ্ডার কাঁপুনি না ধরা পর্যন্ত ভেজা পায়ে কাটাবে আরো-কত কিছু করবে। বয়স্ক লোকেরা যাদের রসিকতা করার ক্ষমতা নেই, সাধারণতঃ তাদেরকে উৎপাত করার কারণেই তারা সে সব করে থাকে। সুতরাং যারা শিক্ষার মধ্যে স্বাধীনতা থাকাটা আবশ্যক মনে করেন, তারা এ-বলতে চান যে শিশুরা যা করতে পছন্দ করে, সারাদিন কেবল তাই করে কাটাবে। কিছু পরিমাণ শৃঙ্খলা এবং শাসন অবশ্যই থাকতে হবে। এখন কথা হলো, তার পরিমাণ এবং কিভাবে তা বাস্তবায়ন করা হবে তাই নিয়ে।

শিক্ষাকে রাষ্ট্র, গির্জা, স্কুলশিক্ষক, পিতামাতা (এমনকি যা সাধারণতঃ খেয়াল করেনা কেউ) শিশুর দৃষ্টিকোণ থেকেও বিচার করা যেতে পারে। এ দৃষ্টিভঙ্গীসমূহের প্রত্যেকটিই খণ্ডিত, প্রত্যকটার মধ্যে অল্পবিস্তর শিক্ষার আদর্শ প্রতিফলিত হয়ে থাকে, আবার তাতে এমনও অনেক উপাদান আছে যা ক্ষতিকর। চলুন আমরা একটা একটা আলাদাভাবে পরীক্ষা করে দেখি এবং এর প্রত্যেকটার পক্ষে বিপক্ষে কি যুক্তি থাকতে পারে তা পর্যালোচনা করি।

আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থার একমাত্র শক্তিশালী রূপকার রাষ্ট্রকে নিয়েই আমরা আলোচনা শুরু করব। সাম্প্রতিক কালেই শিক্ষাব্যবস্থায় রাষ্ট্রের আগ্রহ পরিলক্ষিত হচ্ছে। মধ্য যুগে, প্রাচীনকালে এ ব্যবস্থা প্রচলিত ছিল না। রেনেসাঁর পূর্ববর্তী সময়ে কেবলমাত্র গির্জাই শিক্ষাব্যবস্থার রক্ষণাবেক্ষণ করত। সরোবন গির্জার সঙ্গে প্রতিযোগিতা করার জন্যে রেনেসা কলেজ দ্যা ফ্রান্সের মত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের গোড়াপত্তন করে, উচ্চতর জ্ঞান আহরণের জন্য সযত্ন প্রয়াসের সঞ্চার করে। ইংল্যাণ্ড এবং জার্মানিতে রিফরমেশন আন্দোলনের ফলে বিশ্ববিদ্যালয় এবং ব্যাকরণ শিক্ষার স্কুলসমূহে পোপের প্রভাব হ্রাস করার নিমিত্ত রাষ্ট্রকর্তৃক শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণের আকাঙ্খা জাগরিত হয়। কিন্তু এ আকাঙ্খ খুব শিগগিরই নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে। সার্বজনীন বাধ্যতামূলক আধুনিক শিক্ষার আন্দোলন না-হওয়া পর্যন্ত রাষ্ট্র শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণের কোন উল্লেখযোগ্য অথবা নিরবচ্ছিন ভূমিকা গ্রহণ করেনি। সে যাহোক এখন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সমূহ পরিচালনার ব্যাপারে অন্যান্য প্রভাবের সম্মিলিত ফলের চাইতে রাষ্ট্রের প্রভাব অধিকতর ব্যাপক এবং সূদুরপ্রসারী।

যে সমস্ত উদ্দেশ্যে সার্বজনীন বাধ্যতামূলক শিক্ষাব্যবস্থা প্রবর্তিত হয়েছে তা বিভিন্ন রকম। এর শক্তিশালী সমর্থকেরা বিচলিত হয়ে ভেবেছিলেন, লিখতে পড়তে জানা প্রত্যেক মানুষের উচিত, অজ্ঞ জনসাধারণ সভ্য দেশের কলঙ্ক এবং শিক্ষা ব্যতীত গণতন্ত্র অচল। এ সকল উদ্দেশ্যের সঙ্গে অন্যান্য কারণ সংযোজিত হয়ে বাধ্যতামূলক শিক্ষাব্যবস্থার দাবিকে আরো বেগবতী করে তুলেছে। পরে দেখা গেলো শিক্ষা বাণিজ্যিক সুবিধা দান করে, শিশু অপরাধ কমায় এবং শিক্ষাব্যবস্থা কদর্য অধিবাসীদের গণ্ডীবদ্ধ করে রাখতে সুযোগ দান করে। যাজক বিরোধীরা রাষ্ট্র পরিচালিত শিক্ষা ব্যবস্থার মধ্যে গির্জার প্রভাব ধ্বংস করার সুবিধা দেখতে পেলো। তুলনামূলকভাবে ইংল্যাণ্ড এবং ফ্রান্সে এই প্রভাব অধিকতর সক্রিয় ছিল। বিশেষতঃ ফ্রাঙ্কো প্রাশান যুদ্ধের পরে জাতীয়তাবাদীরা মনে করল যে সার্বজনীন শিক্ষা ব্যবস্থা জাতীয় শক্তির বৃদ্ধি সাধন করবে। প্রারম্ভে এ সকল এবং আরো কারণ সমূহ গৌণ উদ্দেশ্য হিসেবে বিবেচিত হয়েছিল। সার্বজনীন শিক্ষাব্যবস্থা গ্রহণের পেছনে যে উদ্দেশ্যটি ছিল প্রধান, তাহলো নিরক্ষরতার প্রতি অপমানজনক ধারণা।

এই ব্যবস্থা যখন একবার দৃঢ়ভাবে প্রবর্তন করা হলো তখন রাষ্ট্র বুঝতে পারলো একে বিভিন্ন উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা যায়। শিক্ষার সাহায্যে তরুণদেরকে ভালো এবং খারাপ দু’দিকেই সহজে বাকানো যায়। এর ফলে উন্নততর ভদ্রতার মান প্রতিষ্ঠিত হলে, অপরাধের সংখ্যা কমে গেলো জনসাধারণের জন্য মিলেমিশে কাজ করার সুযোগ দান করল এবং কেন্দ্রের আদেশ শুনবার জন্য সমাজকে অধিকতর আবেদনশীল করে তুলল। শিক্ষা ছাড়া নামেমাত্র গনতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা হতে পারে। রাজনৈতিকেরা গণতন্ত্র বলতে এমন একটি সরকার বুঝেন, যে পদ্ধতি অনুসারে জন সাধারন নেতাদেরকে তাদের আশা-আকাক্ষার নিয়ামক মনে করে, নেতাদের ইচ্ছানুসারে স্বেচ্ছায় পরিচালিত হয়। সেকারণে রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত শিক্ষাব্যবস্থার মধ্যে নানা রকম পক্ষপাতমূলক উদ্দেশ্যের অনুপ্রবেশ ঘটেছে এ পদ্ধতিতে তরুণদেরকে (যতদূর সম্ভব) প্রচলিত বিধিব্যবস্থাকে শ্রদ্ধা করতে শিক্ষাদান করে। ক্ষমতাসীন সরকারকে ভিত্তিগতভাবে সমালোচনা করার ইচ্ছাকে পরিহার এবং অন্যজাতি ও বিদেশীর সম্পর্কে ঘৃণা এবং সন্দেহ পোষন করার শিক্ষা দান করে। আন্তর্জাতিকতা এবং ব্যক্তিগত বিকাশের বদৌলতে এই ব্যবস্থা জাতীয় ঐক্য এবং সংহতির ভিত্তি সুদৃঢ় করে। ক্ষমতাসীনের অন্যায় চাপের ফলে ব্যক্তির ব্যক্তিত্ব বিকাশের চরম ক্ষতি হয়। প্রচলিত বিশ্বাসের সঙ্গে যার বিশ্বাস খাপ খায়না তাকে কঠোর হস্তে দমন করা হয়। শাসকদের কাছে সুবিধাজনক বলে তারা ঐক্যের ওপর জোর দান করে, যদিও একমাত্র মানসিক অবক্ষয় সাধন না করে তা হাসিল করা যায় না। রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত শিক্ষাব্যবস্থায় ক্ষতির পরিমান এত অধিক যে সার্বজনীন শিক্ষাব্যবস্থা সামগ্রীকভাবে ভালো করেছে কি খারাপ করেছে সে ব্যাপারে শাণিত প্রশ্ন উত্থাপন করা যায়।

শিক্ষাব্যবস্থায় গিজার যে দৃষ্টিভঙ্গি, তা বাস্তবে রাষ্ট্রীয় দৃষ্টিভঙ্গি থেকে খুব বেশী আলাদা নয়, সে যাহোক উভয়ের মধ্যে এ ছাড়াও উল্লেখযোগ্য পার্থক্য বর্তমান। গির্জার মতে যাজকদের শিক্ষিত হবার কোন প্রযোজন নেই, রাষ্ট্র কর্তৃক নির্দেশিত হলে তাদেরকে শুধু বিশেষ নির্দেশ দিয়ে থাকে, স্বাধীন অনুসন্ধানে যে সকল বিশ্বাস অযৌক্তিক এবং অসার প্রমাণিত হবে, রাষ্ট্র এবং গির্জা সে-সকল বিশ্বাসের অনুপ্রবেশে আত্ননিয়োগ করে। রাষ্ট্র যারা সংবাদপত্র পড়তে পারে তাদেরকে অতি সহজে দীক্ষিত করে আর গির্জা অশিক্ষিতদেরকেই অনায়াসে দীক্ষিত করে। রাষ্ট্র এবং গিজা উভয়েই স্বাধীন চিন্তার পরিপন্থী। আবার গিজা যা এখন কুসংস্কারাচ্ছন্ন বলে তারা হয়ে থাকে যে কোন রকম পদ্ধতির প্রতিবন্ধক। যে পদ্ধতি অনুসারে সূদুর অতীতে জেসুইটেরা পথ অতিক্রম শুরু করেছিল সেই পদ্ধতিকে পরিপক্ক এবং পূর্নাঙ্গ বিবেচনা করে একদেশদর্শী ক্ষমতাসীনেরা বর্তমানে নির্দেশ দান করছে। এবং ভবিষ্যতেও করবে।

আধুনিক জগতে স্কুল শিক্ষকদের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি অনুসারে বিচার করতে দেয়া হয় না। শিক্ষাবিভাগ কর্তৃক তিনি নিয়োজিত হয়েছেন এবং তিনি শিক্ষা দান করবেন, যদি তিনি আদেশ লজ্ঞান করেন তখন তাঁকে বরখাস্ত করা হবে। এই অর্থনৈতিক অভিপ্রায় ছাড়াও স্কুল শিক্ষক তিনি জানেন না এমন অনেক অবচেতন প্রতিক্রিয়ার শিকার হয়ে পড়বেন। শৃঙ্খলা রক্ষা করার ব্যাপারে রাষ্ট্র এবং গির্জার চাইতে তাঁর পদক্ষেপ আরো সুস্পষ্ট এবং প্রত্যক্ষ। সরকারিভাবে তার ছাত্রেরা যা জানেনা, তিনি তা জানেন। কিছু পরিমান-শৃঙ্খলা এবং ক্ষমতা ছাড়া একটা ক্লাশকে সুষ্ঠুভাবে চালানো অসম্ভব। কোন বালক আগ্রহ দেখাবার বদলে বিরক্তি দেখালে তাকে শাস্তি দেয়া খুবই সহজ। অধিকন্তু, উত্তম স্কুলশিক্ষকও তার প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে বাড়াবাড়ি করেন। তিনি ছাত্রদেরকে যে ধরণের মানুষ করে তুলতে চান, সে ছাঁচে তাদেরকে ঢালাই করবার ইচ্ছা পোষণ করেন। লিটন স্ট্রাচি বলছেন ড. আর্ণলড কোমো হ্রদের পাশে হাঁটবার সময় গভীরভাবে নৈতিক দোষ সম্পর্কে চিন্তা করছেন। তার মতে যে পরিবর্তন ছেলেদের মধ্যে ঘটাতে চান সেগুলোই হলো নৈতিক দোষ। যে-বিশ্বাসের বশবর্তী হয়ে তিনি এ-চিন্তা করেছেন তার মধ্যে ভালোবাসার চেয়ে ক্ষমতাপ্রীতি এই পরিচয় অধিক। এই দৃষ্টিভঙ্গি বিভিন্ন যুগে বিভিন্নভাবে দেখা গিয়েছে। প্রতারণামূলক আত্মপ্রভাবের দিকে সন্ধানী দৃষ্টি রাখা শিক্ষকের উচিত নয়। এটা আশা করা স্বাভাবিক, তা সত্ত্বেও শিক্ষক যে শিক্ষার ক্ষেত্রে সবচেয়ে জোরালো মাধ্যম এবং প্রাথমিকভাবে তার কাছে নিশ্চিতভাবে আমাদেরকে প্রগতিশীলতার প্রত্যাশা করতে হবে।

তা ছাড়া স্কুলশিক্ষক তার নিজস্ব স্কুলের কৃতিত্বের আশা করেন। তিনি তাঁর ছেলেদেরকে ক্রীড়াপ্রতিযোগিতা এবং বৃত্তিলাভের জন্য বিশিষ্ট করে তুলতে চান, যার ফলে তাকে সব ছেলের বদলে নির্বাচিত কয়েকটি ভালো ছেলের প্রতি বিশেষ যত্নবান হতে হয়। এতে বিভেদ এবং মর্যাদার প্রশ্ন জড়িয়ে আছে বলে ফল দাঁড়ায় মারাত্মক। অন্যদেরকে ভালো খেলতে দেখার চাইতে নিজে অংশগ্রহণ করে খারাপ খেলা একজন বালকের পক্ষে অধিকতর মঙ্গলজনরক! মি. এইচ, জি ওয়েলস তার লাইফ অব সানডারসন অউনডেল গ্রন্থে দেখিয়েছেন এই মহান স্কুলশিক্ষকেরা কিভাবে মুখ ঘুরিয়ে বসে থেকে গড়পড়তা ছাত্রের মনোবৃত্তি অযত্নে অকর্ষিত রাখে। তিনি প্রধান শিক্ষক হওয়ার পর দেখতে পেলেন যে একমাত্র নির্বাচিত ছেলেরাই গির্জায় গাইতে পারে এবং তাদেরকে ভজন গাইতে শিক্ষা দিয়ে বাকি সকলকে শ্রোতা হিসেবে রাখা হলো। স্যাণ্ডারসন জিদ করতে লাগলেন মধুর হোক না হোক সকলেরই ভজন গাওয়া উচিত। এতে তিনি এমন এক পক্ষপাতমূলক মনোভাবের বিরুদ্ধে মাথা তুলতে চাচ্ছেন যা একজন স্কুলশিক্ষকের পক্ষে খুবই স্বাভাবিক। যিনি তার ছেলেদের চাইতে নিজের কৃতিত্বের জন্য ঢের বেশি লালায়িত। অবশ্য যদি আমরা বিজ্ঞোচিতভাবে কৃতিত্বের বিচার করি, দু’উদ্দেশ্যের মধ্যে তেমন কোন বিরোধ দেখতে পাবোনা। যে স্কুলের ছেলেরা সবচেয়ে বেশি ভালো করেছে, সে স্কুলই সবচেয়ে বেশি কৃতিত্বের দাবীদার। কিন্তু ব্যস্ত পৃথিবীতে দেখা যায় সাফল্য সবসমসয় বেশি প্রয়োজনের অনুপাতের ওপরই নির্ভরশীল। এতে করে দু’উদ্দেশ্যের মধ্যে সংঘাত এড়িয়ে যাওয়া অসম্ভব হয়ে পড়ে।

এখন আমি পিতামাতার দৃষ্টিভঙ্গি সম্বন্ধে কিছু আলোচনা করব। পিতামাতার অর্থনৈতিক স্বচ্ছলতা অনুসারে তাদের দৃষ্টিভঙ্গীরও বিভিন্নতা ঘটে থাকে। গড়পড়তা মজুরের আকাঙ্খ গড়পড়তা অন্যান্য পেশার ভদ্রলোকের চাইতে ভিন্ন রকম। গড়পড়তা মজুর ঘরে ঝামেলা কমাবার জন্য তার ছেলেমেয়েকে যত শিগগির সম্ভব স্কুলে ভর্তি করে এবং শিগগির তাদেরকে বের করে এনে তাদের আয়ের দ্বারা লাভবান হওয়ার ইচ্ছা পোষণ করে। সম্প্রতি বৃটিশ সরকার শিক্ষাখাতে ব্যয় হ্রাস করার সিদ্ধান্ত করেছে, সে জন্যে প্রস্তাব করা হয়েছ শিশুদের ছ’বছরের আগে স্কুলে যাওয়া অনুচিত এবং তের বছরের পরে স্কুলে থাকতে বাধ্য করা উচিত নয়। এর প্রথম প্রস্তাবটি জনসাধারণের মধ্যে এত বেশি বিরূপ প্রতিক্রিয়া সঞ্চার করেছে যে প্রস্তাবটিকে নাকচ করতে হয়েছে। জননীদের (সম্প্রতি ভোটাধিকার প্রাপ্ত) দুর্দমনীয় আক্রোশই প্রস্তাবটিকে নাকচ করাতে বাধ্য করেছে। পরবর্তী প্রস্তাব স্কুল ত্যাগ করবার বয়স কমানো জনসাধারণের মধ্যে কোন আপত্তির কারণ হয়ে দেখা দেয়নি। পার্লামেন্টের প্রার্থীদের সভায় যারা যোগদান করেন তারা তাদের উচ্চশিক্ষা সম্বন্ধে বক্তব্যে উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করে কিন্তু অরাজনৈতিক দিনমজুরেরা (সংখ্যায় যারা গরিষ্ঠ) তাদের ছেলেমেয়েদেরকে যত শিগগির-সম্ভব স্কুল ছাড়িয়ে কাজে নিয়োগ করতে ইচ্ছুক। এ উদ্দেশ্য সাধনের জন্য তারা মহান ত্যাগ স্বীকার করতেও ইচ্ছুক, কিন্তু আমাদের প্রতিযোগিতামূলক সমাজ ব্যবস্থায়, যে শিক্ষা পদ্ধতি আপনার থেকে ভালো তার চেয়ে অন্য লোকের যে শিক্ষা ব্যবস্থা ভালো গড়পড়তা পিতামাতা ছেলেমেয়েদেরকে সে ব্যবস্থানুসারে শিক্ষিত করে। লেখাপড়ার সাধারণ মানকে অবনমিত করে রাখার পক্ষেও এ পদ্ধতি হয়ত সুবিধাজনক, কিন্তু তাই বলে পেশাদার ব্যক্তিরা মজুরদের ছেলেমেয়ের উচ্চশিক্ষা সুযোগ সুবিধা দান করবে তা আমরা আশা করতে পারিনে। যারা ডাক্তারি শিক্ষা করতে ইচ্ছুক তাদের পিতামাতা যতই দরিদ্র হোকনা কেননা সকলেই যদি ডাক্তার হবার সুযোগ পায়, তাহলে এটা পরিস্কার যে ডাক্তারদের আয় বর্ধিত প্রতিযোগিতা এবং সমাজের মানুষের উন্নততর স্বাস্থ্যের কারণে বর্তমানের তুলনায় অনেক গুন কমে যেত। আইনব্যবসা সিভিল সার্ভিস সবক্ষেত্রে ঐ একই নীতি সমানভাবে প্রযোজ্য। সুতরাং পেশাদার মানুষেরা নিজেদের সন্তানের বেলায় যা ভালো মনে করে, খুব ব্যতিক্রম জনদরদী না হলে, সাধারন মানুষের বেলায় তা ভালো মনে করেনা।

আমাদের প্রতিযোগী সমাজব্যবস্থায় বাবাদের মৌলিক দোষ হলো তারা চায় যে ছেলেরা তাদের গৌরব এবং কৃতিত্বের স্থল হোক। প্রবৃত্তির গভীরে এ দোষ শিকড়িত একমাত্র পৌনঃপুনিক প্রচেষ্টার ফলে তার নিরাময় হতে পারে। অল্প পরিমাণে হলেও এ দোষ থেকে মুক্ত নয় মায়েরা। আমরা প্রবৃত্তিগতভাবে আমাদের সন্তানের সাফল্যে গৌরব এবং ব্যর্থতায় লজ্জাবোধ করি। দুর্ভাগ্যবশতঃ সন্তানের যে সাফল্য আমাদেরকে অহংকারে স্ফীত করে তোলে তা অনেক সময়ই অবাঞ্চিত ধরণের হয়ে থাকে। সভ্যতার শৈশব হতে আজ পর্যন্ত চীন এবং জাপানে পিতামাতারা ধনী বর এবং বধু নির্বাচন করে, নিজেরা তাদের সিদ্ধান্ত নিয়ে সন্তানের সুখ-সন্তুষ্টি বলি দিয়ে থাকে পাশ্চাত্যদেশে (ফ্রান্সের অংশবিশেষ বাদে) সন্তানেরা বিদ্রোহ ঘোষনা করে তাদেরকে এ দাসত্ব থেকে মুক্ত করে নিয়েছে, কিন্তু তার ফলেও পিতামাতার প্রবৃত্তিতে তেমন বিশেষ পরিবর্তন আসেনি। সুখ কিংবা গুনপনা দুটোর কোনটাই নয়। গড়পড়তা পিতামাতা চায় তাদের সন্তান জাগতিক সাফল্যের অধিকারী হোক। তারা তা চায় একারণে যে এতে করে তারা সন্তান-সন্ততি আত্নীয় স্বজনদের জন্য গর্ব করতে পারে। মুখ্যতঃ এ-আকাঙ্ক্ষার তাগিদেই তারা তাদের শিক্ষা ব্যবস্থা করে থাকে, রাষ্ট্র গিজা, স্কুলশিক্ষক এবং পিতামাতা যাদের সম্বন্ধে আমরা আলোচনা করছি, ক্ষমতার দ্বারা যদি শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ন্ত্রন হয় তাদের এক বা একাধিক মাধ্যমের ওপর অবশ্যই ক্ষমতা অর্পিত থাকতে হবে। আমরা দেখেছি, এদের কাউকে শিশুর পূর্ণাঙ্গ বিকাশের জন্য পুরোপুরি ভাবে বিশ্বাস করা যায় না; যেহেতু প্রত্যেকে বিশেষ বিশেষ উদ্দেশ্যে শিশুকে গড়ে তুলতে চায় তার সঙ্গে উন্নতির কোন সঙ্গতি নেই। রাষ্ট্র চায় শিশু জাতীয় প্রতি হিংসার জন্য আত্ননিয়োগ করুক এবং প্রচলিত সরকারকে সমর্থন করুক। প্রতিযোগী পৃথিবীতে রাষ্ট্র যেভাবে জাতিকে সম্মানের চেখে দেখে অধিকাংশ সময় স্কুলশিক্ষকরাও স্কুলকে তেমনি শ্রদ্ধান্বিত দৃষ্টিতে দেখে এবং চায় যে সন্তান পরিবারের গৌরব বৃদ্ধি করুক। শিশুর উন্নতি এবং সুখ বিকাশে সম্ভব,এবং আলাদা একজন মানুষ হিসেবে শিশুর নিজেই নিজের লক্ষ্য স্বরূপ, আংশিকভাবে ছাড়া বিভিন্ন বাহ্যিক উদ্দেশ্য তার নিজস্ব লক্ষ্যের সঙ্গে সম্পর্ক নেই। জীবনকে পরিচালনা করার জন্যে যে অভিজ্ঞতার প্রয়োজন, দুর্ভাগ্যবশতঃ শিশুর তা নেই। নির্দোষিতার সুযোগে তারা বিভিন্ন মন্দ উদ্দেশ্যের শিকার হয়ে পড়ে। এর ফলে শিক্ষাব্যবস্থায় অসুবিধার সৃষ্টি হওয়ায় তা রাজনৈতিক সমস্যার আকার ধারণ করেছে। কিন্তু শিশুদের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি থেকে কি বলা যায়, প্রথমে তাই আমাদের দেখা উচিত।

অধিকাংশ শিশুর ক্ষেত্রে এটা সত্য যে এমনিতে ছেড়ে দিলে তারা লিখতে পড়তে শিখবে না, পরিবেশের সঙ্গে জীবনকে খাপ খাইয়ে নেয়ার মত করে গড়ে উঠবে না। সেজন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রয়োজন অপরিহার্য এবং শিশুদেরকেও নিশ্চিতভাবে কিছু পরিমাণ শাসনের আওতায় রাখতে হবে। কোনরকমে শাসনকে সম্পূর্ণভাবে বিশ্বাস করা যায় না বলে যত কম সম্ভব শাসন করে, কচিকাঁচার স্বাভাবিক প্রবৃত্তি, আকাঙ্খকে শিক্ষার লক্ষ্যে ধাবিত করবার দিকে আমাদের নজর দেয়া উচিত। অনেক সময় যেমন চিন্তা করা হয় তার চেয়ে এ অনেক সহজ পন্থা, কারণ জ্ঞান অর্জন করা প্রত্যেক শিশুর স্বাভাবিক আকাঙ্খ। গরিব ছেলেরা যে পণিরের প্রতি আগ্রহ দেখাতে পারবে না তাতে একরকম সত্য কথা এবং শুদ্ধভাবে যে অঙ্ক কষতে পারবে তারও কোন ভরসা নেই। বিশেষ সাইজের একটা বাক্সের দরকার হলে তাকে যদি বৃত্তির পয়সা, জমিয়ে কাঠ এবং পেরেক কেনার কথা বলা হয়, তাহলে তা তার পাটিগণিতের শক্তি বিস্ময়করভাবে বৃদ্ধি করবে।

একটা শিশুকে যখন অঙ্ক কষতে বলা হবে তাতে কোন কিছু অনুমানমূলক থাকা উচিত নয়। একটি ছেলে অঙ্কের পাঠ সম্পর্কে একদা যে বক্তব্য করেছিল তা আমার মনে পড়ে। অভিভাবিকা (গভর্নের্স) তাকে প্রশ্ন দিয়েছিল, একটি ঘোড়ার দাম একটি টাটু গোড়ার তিনগুণ, টাটু ঘোড়ার দাম ২২ পাউণ্ড, ঘোড়ার দাম কত? বালকটি জিজ্ঞেস করল ‘টাটুর দাম কি নীচে ছিল? অভিভাবিকা জবাব দিলো, “তাতে কোন বেশকম হবে না। কিন্তু সহিস বলে তাতে অনেক বেশকম। অনুমানমূলক সত্যকে হৃদয়ঙ্গম করা সাম্প্রতিক ন্যায়শাস্ত্রীয় বিকাশের একটি দিক শিশুরা তা বুঝতে পারবে এমন আশা করা উচিত নয়। সে যাহোক আমার বক্তব্য বিষয় থেকে একটু দূরে সরে এসেছি।

সব শিশুর বুদ্ধিবৃত্তিক আগ্রহ উপযুক্ত উদ্দীপনার সাহায্যে জাগানো যায় আমি তা মনে করি না। কিছুসংখ্যক শিশুর বুদ্ধিবৃত্তি গড়পড়তা বুদ্ধিরও অনেক নীচে, সেক্ষেত্রে চিকিৎসার প্রয়োজন। বিভিন্ন মানসিক ক্ষমতা সম্পন্ন শিশুদের একশ্রেণীতে মেশানো উচিত নয়। তা করলে বুদ্ধিমান শিশুরা পরিষ্কারভাবে যা বুঝেছে তা বারবার বুঝবার জন্য ক্লান্ত হয়ে পড়বে এবং বোকা শিশু এখনো বুঝতে পারে নি ভেবে নিশ্চিত দুঃখিত হবে। কিন্তু বিষয়বস্তুকে ছাত্রদের বুদ্ধিবৃত্তির সঙ্গে ধাতস্থ করে তুলতে হবে। ম্যাকলেকে কেমব্রিজে অঙ্ক শিখতে হয়েছিল, কিন্তু অঙ্ক শেখা যে শুধু সময়ের অপচয় করা তা তার পত্রাবলী থেকে স্পষ্ট জানা যায়। আমাকে গ্রিক এবং ল্যাটিন শিখতে বাধ্য করা হয়েছিল, যে ভাষাতে কথাবার্তা বলা হয় না সে ভাষা শেখা হাস্যকর বলে আমি তা বর্জন করেছিলাম। নিতান্ত প্রয়োজনীয় বিষয় শিক্ষা দেয়ার পর শিশুদের রুচির সঙ্গে পরিচিত হওয়া দরকার এবং শিশুর যাতে আগ্রহ একমাত্র তাই বাড়তে দেয়া উচিত। এতে শিক্ষকদের পরিশ্রম বাড়ে, কেননা বেশি কাজ করলে খুব সহজে ভোতা হয়ে যায়।

ঐতিহ্যাশ্রয়ী পাণ্ডিত্যাভিমানী ব্যক্তি যাদের জ্ঞান বিতরণশীল অথচ যারা জ্ঞান বিতরণ করবার কলা-কৌশল জানেনা, নিজেদের দোষ বুঝতে সক্ষম হয়ে কল্পনা করে কোমলমতি শিশুর শিক্ষার প্রতি স্বভাবতঃই তারা প্রচণ্ড বিরূপ মনোভাব পোষণ করে। একজন মানুষ একটি বিড়াল ছানাকে ইঁদুর ধরতে শিক্ষা দেয়ার ওপর শেখভের একটি সুন্দর গল্প আছে। বিড়ালছানাটা পেছনে দৌড় দিতো না বলে ভয়ানকভাবে মার দিতো। এর ফল দাঁড়ালো বিড়ালটি বড়ো হলে পর ইউঁর দেখে ভয় পেতে লাগলো। শেখভ আরো বলেছেন সেই লোকটিই আমাকে ল্যাটিন শিখিয়েছিল। বিড়াল তার ছানাকে ইঁদুর ধরতে শেখায় কিন্তু ছানার নিজস্ব প্রকৃতি না-জাগা পর্যন্ত অপেক্ষা করে। বিড়ালছানারা পরে তাদের ইঁদুর ধরার জ্ঞান অর্জন করার ব্যাপারে তাদের মার সঙ্গে একমত হয় বলে কোন শৃঙ্খলা রক্ষার প্রয়োজন পড়ে না।

জীবনের প্রথম দু অথবা তিনবছর শিক্ষাভিমানী ব্যক্তিদের আইনকে এড়িয়ে যেতে দেবে। বিশেষজ্ঞরা একমত যে ঐ সকল বছরেই আমরা জীবনের সবচেয়ে বেশি জ্ঞান আহরণ করি। প্রত্যেক শিশু নিজের চেষ্টায় কথা বলতে শেখে। কেউ নজর করলে দেখতে পাবে যে শিশুদের কথা বলা আয়ত্ব করতে যে-পরিমাণ চেষ্টা করতে হয় তা সামান্য নয়। শিশু মনোযোগ সহকারে শুনে ঠোঁট সঞ্চালন লক্ষ্য করে, সারাদিন ধ্বনি রপ্ত করার কাজে কাটায়, এ আনন্দিত পরিশ্রমে মনকে কেন্দ্রীভূত করে রাখে। অবশ্য বয়স্ক লোকেরা প্রশংসা করে তার উৎসাহ বৃদ্ধি করে। নতুন পৃথিবী সম্পর্কে ঔৎসুক্য জাগার আগে তাদেরকে তা জানার জন্য শাস্তি দিলে বিপরীত ফল ফলতো। বয়স্ক লোকেরা শিশুদের শুধু প্রশংসা এবং সুযোগ করে দেয়। জীবনের কোন পর্যায়ে এর চেয়ে বেশি কিছুর প্রয়োজন আদৌ আছে কিনা তা রীতিমত সন্দেহজনক।

শিক্ষার জন্য যা প্রয়োজন তা হলো শিশু এবং কোমলমতি তরুণদের জ্ঞান অর্জন করা উচিত-এসত্যটা অনুভব করিয়ে দেয়া! অনেক জ্ঞান অর্জন করা বাঞ্ছনীয় নয় বলে এ-কাজ ভয়ঙ্কর অসুবিধা হয়ে পড়ে। কোন বিষয়ে সামান্য পরিমাণ জ্ঞানের প্রয়োজনীয়তা শিশুদেরকে প্রথমে বিরক্ত করে তুলবে এবং নানা অসুবিধার সৃষ্টি হবে তাদের মধ্যে অনুভব ক্রিয়া জাগাতে! যাহোক এসব অসুবিধা অনতিক্রমনীয় নয়। দৃষ্টান্তস্বরূপ অঙ্ক শিক্ষার কথা ধরা যেতে পারে। স্যানডারসন আইনড়ল দেখালেন যে তার ছেলে প্রায় সকলেই যন্ত্রপাতি তৈরি করার সম্বন্ধে উৎসাহী। তিনি তাদেরকে অবাধে যন্ত্রপাতি তৈরি করার সুযোগ দিলেন। বাস্তবে যন্ত্রপাতি নির্মাণের কাজ করতে গিয়ে তারা অঙ্কের প্রয়োজনীয়তা বুঝতে পারল এবং যে কাজে তাদের তীক্ষ্ণ আগ্রহ, গঠনমূলক সাফল্যের জন্য অঙ্কের প্রয়োজন, সুতরাং তারা অঙ্ক শেখায় মনোযোগী হয়ে পড়ল। এটা ব্যয়বহুল পদ্ধতি এবং শিক্ষকের প্রচুর ধৈর্য এবং দক্ষতার প্রয়োজন হয়ে পড়ে। যদি ছাত্রদের প্রকৃতিতে আবেদন জাগাতে পারে তাহলে অতিরিক্ত মানসিক প্রচেষ্টা তাদের বিরক্তিকে অনেকাংশে লাঘব করতে সক্ষম হবে। মানুষ এবং প্রাণী উভয়েই স্বাভাবিকভাবে চেষ্টা করে। প্রবৃত্তিগত অনুরাগ সৃষ্টি করার মত চেষ্টা হওয়া চাই। পায়ে কলের চাকা ঘোরানোর চাইতে ফুটবল ম্যাচে অধিকতর প্রচেষ্টার প্রয়োজন, তবু তার একটা শাস্তি এবং অন্যটা আনন্দবিশেষ। মানসিক প্রচেষ্টা যে আনন্দদায়ক করে তোলার জন্য বিশেষ বিশেষ অবস্থার প্রয়োজন। পরবর্তীকালে ছাড়া শিক্ষাব্যবস্থায় এসকল অবস্থা সৃষ্টি করার কোনো প্রচেষ্টা গ্রহণ করা হয়নি। এর মধ্যে প্রধান যেগুলো; প্রথমত কোন সমস্যার সমাধান প্রয়োজন, দ্বিতীয়তঃ সমস্যার সমাধান বের করবার আশাবাদী মনোভাব বজায় রাখা। ডেভিড কপার ফিল্ডকে যেভাবে পাটিগণিত শেখানো হয়েছিল সে পদ্ধতি পর্যালোচনা করে দেখুন।

অনুশীলনী শেষ করার পরেও জটিল অঙ্কের আকারে ভয়ঙ্কর কিছু ঘটতে পারে। তা আমার জন্য আবিস্কার করা হয়েছিল এবং মি. মাডষ্টেন আমাতে তা মৌখিকভাবে বলতে শুরু করতেন, ‘যদি আমি পনিরের দোকানে গিয়ে ৫০০ ডবল সাইজের গ্লাউচেষ্টার পনির প্রত্যেকটা সাড়ে পাঁচ পেন্স মূল্যে খরদ করি, তাহলে সবগুলোর দাম কতো?” আমি দেখতাম তিনি ব্যাপারটাকে উপভোগ করতেন গোপনে। ডিনারের পূর্বপর্যন্ত এই পনিরের মধ্যে আমি ঝুঁকে পড়ে থাকতাম এবং গায়ে চামড়ায় শ্লেটের লেখা মুছে নিজেকে একজন শ্বেতকায় এবং নিগ্রোর দোআঁশলা সন্তান করে তুলতাম। পনিরের অত্যাচার থেকে সাহায্য করার জন্য এক স্লাইস পাউরুটি পেতাম এবং বাকি সন্ধ্যাটাকে দুঃসহ বলে মনে করতাম।

এই অসুবিধা কাটিয়ে যেতে হলে পড়াবার ঘন্টা হ্রস্ব এবং শিক্ষকদেরকে শিক্ষাদানের কলাকৌশল সম্পর্কে ওয়াকেবহাল করে তুলতে হবে। বর্তমানে প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে এ নিয়ম অনুসৃত হচ্ছে কিন্তু পাবলিক স্কুল এবং বিশ্ববিদ্যালয়সমূহের শিক্ষকেরা তা মেনে চলেন না।

শিক্ষার স্বাধীনতার বিভিন্ন দিক রয়েছে। সর্বপ্রথমে শিক্ষা পাওয়া না পাওয়ার স্বাধীনতা আছে। কি শিক্ষা করবে তার স্বাধীনতা আছে এবং পরবর্তীকালের শিক্ষায় মতামতের স্বাধীনতা রয়েছে। শিক্ষা পাওয়া না পাওয়ার স্বাধীনতা অংশতঃ বাল্যকালের সঙ্গে সম্পর্কশীল। দুর্বল এবং অক্ষম যারা নয়, তাদের সকলকে লিখতে পড়তে শিক্ষা দেয়া নিশ্চিতভাবেই প্রয়োজনীয়। কেবলমাত্র সুযোগ সুবিধার বন্দোবস্ত করে এর কতটুকু করা যাবে অভিজ্ঞতাই তা সপ্রমাণ করবে। সুযোগ সুবিধা তাদের শিক্ষার জন্য যথেষ্ঠ হলেও ছেলেদের গ্রহণ করার এত সুযোগ সুবিধাও অবশ্যই থাকতে হবে। প্রয়োজনীয় সুযোগের অভাবে ছেলেদের বেশিরভাগই ঘরে বাইরে খেলাধূলা করাটাকে পছন্দ করে। পরবর্তী পর্যায়ে তরুণদের পছন্দের ওপর শিক্ষাকে ছেড়ে দেয়া যেতে পারে। দৃষ্টান্তস্বরূপ তাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়া উচিত কিনা, কেউ যেতে চাইবে এবং কেউ যেতে চাইবে না। কোন প্রবেশিকা পরীক্ষা এরকম ভালো এবং নিখুঁত একটি নির্বাচনী নীতির প্রতিষ্ঠা করতে পারবে না। যারা ভালোভাবে কাজ করে না তাদেরকে বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকতে দেয়া উচিত নয়। যে সকল ধনী যুবক বর্তমানে কলেজে তাদের সময়কে হত্যা করছে তারা অন্যান্যদেরকে নীতিহীন করছে,অকর্মণ্য হওয়ার শিক্ষাই গ্রহণ করছে। আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকবার শর্ত হিসেবে কঠোর পরিশ্রম করার ব্যবস্থা প্রবর্তন করা হলে বুদ্ধিবৃত্তির প্রতি যারা নিস্পৃহ মনোভাব পোষণ করে, বিশ্ববিদ্যালয়সমূহ তাদের কাছে। আকর্ষণ সৃষ্টি করতে পারবে না।

কি শিখতে হবে এ ব্যাপারে যতটুকু স্বাধীনতা বর্তমানে আছে, প্রয়োজন তার অনেক বেশির। ছেলেদের নিজস্ব ইচ্ছানুসারে বিষয় নির্বচন করা উচিত বলে আমি মনে করি। নির্বাচনী পদ্ধতিতে অনেক ঘোরতর দোষ রয়েছে যা অনেকগুলো সম্পর্কহীন বিষয় স্বাধীনভাবে বাছাই করার ভার একজন তরুণের ওপর অর্পণ করে। যদি আমাকে কাল্পনিকভাবে শিক্ষাপদ্ধতি রচনা করার জন্য পর্যাপ্ত অর্থ দেয়া হয়। আমি বারো বছর পর্যন্ত প্রত্যেক ছেলেকে কিছু পরিমাণ অঙ্ক বিজ্ঞান এবং প্রাচীন সাহিত্য বিষয়ে শিক্ষাদান করব। দু’বছর পরে ছেলের ঝোঁক কোনদিকে, স্পষ্ঠভাবে তার নাগাল পাওয়া যাবে এবং অন্য কোন বিষয়ের প্রতি কোমলপক্ষপাত না থাকলে শিশুর নিজস্ব রুচিই তার প্রবণতার পরিচয় নিরূপণ করবার জন্যে যথেষ্ট হবে। তারপরে আমি আকাঙ্খিত প্রত্যেকটি বালক বালিকাকে চৌদ্দ বছর বয়স থেকে বিশেষ দিকে দক্ষতা অর্জন করার অনুমতি দান করব। প্রথমে দক্ষতা অর্জন করার ক্ষেত্র ব্যাপক এবং প্রসারিত হওয়া উচিত এবং শিক্ষার সঙ্গে সঙ্গে সুনির্দিষ্ট পথে পরিচালিত হবে। যে সময়ে এ পদ্ধতি চালু করা সম্ভব ছিল, সকলেই জানে তা অতীত হয়ে গেছে। একজন পরিশ্রমী মানুষ ইতিহাস এবং সাহিত্য সম্পর্কে কিছু জ্ঞান রাখতে পারেন, যার জন্য তার প্রাচীন এবং আধুনিক ভাষাসমূহের ওপর কিছুটা দখল থাকা আবশ্যক হয়ে পড়ে। অথবা তিনি অঙ্কের বিশেষ দিক বিজ্ঞানের দু’একটি শাখা সম্পর্কে ওয়াকেবহাল হতে পারেন। সর্বাঙ্গীন শিক্ষার যে আদর্শ তা বিগত জ্ঞানের উন্নতির ফলে সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস হয়ে গেছে।

শিক্ষক এবং ছাত্র উভয়ের জন্য মতামতের স্বাধীনতা বিভিন্ন ধরণের স্বাধীনতার মধ্যে সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ এবং তাতে কোন সীমানা নির্দেশ করার প্রয়োজন পড়েনা। বস্তুতঃপক্ষে মতমতের স্বাধীনতা অনুপস্থিত বলেই এর সমর্থনে কি কি যুক্তি আছে তা আবিষ্কার করা বাঞ্ছনীয় হয়ে দাঁড়ায়।

আমাদের যাবতীয় বিশ্বাসে সংশয় পোষণ করাই হলো মতামতের স্বাধীনতার মৌলিক যুক্তি। যদি আমরা নিশ্চিতভাবে সত্যকে জানতে পারি তাহলে এর জন্য শিক্ষাদান সম্পর্কে কিছু বলা যেতে পারে। ও সকল ব্যাপারে অন্তর্নিহিত যৌক্তিকতার কারণে কোন রকমের ক্ষমতা প্রয়োগ না করেই শিক্ষা দেয়া যেতে পারে। যে লোক গুণের টেবিল সম্পর্কে বিরুদ্ধ মন্তব্য করে তাকে অঙ্ক শিখতে না দেয়ার জন্য একটি আইন করা উচিত। কারণ সত্য এখানে পরিষ্কার এবং জরিমানা করে তা প্রয়োগ করার প্রয়োজন পড়েনা। রাষ্ট্র যখন কোন মতবাদ শিক্ষার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা জারি করে তখন করে একারণে যে ঐ মতবাদের সমর্থনে উপসংহারস্বরূপ কেনো প্রমাণ অনুপস্থিত। এর ফল হয় সত্যকেও সত্য হিসেবে শিক্ষা না দেয়া। নিউইয়র্ক রাজ্যে আজ পর্যন্ত সাম্যবাদ ভালো-এ শিক্ষা দেয়া বেআইনী। আবার সোভিয়েত রাশিয়ায় সাম্যবাদ খারাপ-এ শিক্ষা দেয় বেআইনী। এ দু’-মতবাদের মধ্যে একটা সত্য এবং অন্যটা মিথ্যা তাতে সন্দেহ নেই; কিন্তু কোনটা তা কেউ জানেনা। আমেরিকা এবং সোভিয়েত রাশিয়া সত্য শিক্ষা দিচ্ছে এবং মিথ্যা নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে, কিন্তু কেউ সত্তাবে তা করছেনা। কারণ প্রত্যেকে একটা সংশয়মূলক বক্তব্যকে সত্য বলে ধরে নিয়েছে।

এ সত্যবাদিতার মধ্যে যে পার্থক্য এক্ষেত্রে তা গুরুত্বপূর্ণ আমাদের মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি সম্পর্কে সত্য বলতে দেবতাদের ধারণাকে বোঝায়, যা আমরা অনুমান করতে পারি, কিন্তু অতো উঁচু লক্ষ্যে পৌঁছুবার আশা রাখতে পারিনে। আমাদের শিক্ষা এমন হওয়া চাই, যাতে করে আমরা সত্যের কাছাকাছি উপনীত হতে পারি এবং তার জন্য আমাদেরকে অবশ্যই সত্যবাদিতা শিক্ষা করতে হবে। প্রমাণপঞ্জীর ওপর নির্ভর করে আমাদের মতামত গঠন করা এবং যতদূর প্রমাণিত হয় ততদূর বিশ্বাস করাকেই আমি সত্যবাদিতা মনে করি! এই সম্ভাবনার পরিমাণ নিশ্চিত সত্যের স্বরূপ নির্ধারণে যে সবসময় ব্যর্থ হবে, সেকারণে পুরণো বিশ্বাসের বিরুদ্ধে আমাদেরকে নতুন প্রমাণকে গ্রহণ করার জন্য সবসময় তৈরি থাকতে হবে। অধিকন্তু, যখন কোন বিশ্বাস অনুসারে কাজ করি তখনই তা আমরা অত্যন্ত সম্ভব বলে মনে করি, কিন্তু নিজেদের বিশ্বাস ভুল কি নির্ভুল সে সম্বন্ধে চিন্তা করি না। বিশ্বাস যদি পাকাঁপোক্ত হয় তাহলে আমাদের উচিত বর্বরোচিত কাজসমূহ এড়িয়ে যাওয়া। বিজ্ঞানের একজন পর্যবেক্ষক তার পর্যবেক্ষন ফল সম্ভাব্য ভ্রান্তি সহকারে বর্ণনা করেন, কিন্তু একজন রাজনৈতিক অথবা একজন ধর্মতত্ত্ববিদ তার মতবাদের সম্ভাব্য ভ্রান্তির কথা বলেছে-কখনো কেউ তা শুনেছে কি? এর কারণ হলো বিজ্ঞানে আমরা সত্যিকার জ্ঞানের কাছাকাছি পৌঁছাই, সে-কারণে একজন মানুষ নিরাপদে বিজ্ঞানের ওপর নির্ভর করতে পারে, কিন্তু যেখানে কিছুই জানা হয়নি সেখানে ভোঁতা অনুমান এবং ইন্দ্রজাল অপরকে আমাদের বিশ্বাসে দীক্ষিত করার পরিচিতি পদ্ধতি। যদি ভিত্তি চিন্তার মধ্যে বিবর্তনবাদের বিরুদ্ধে ভালো যুক্তি থাকে তাহলে তারা তা শিক্ষা করা বেআইনী ঘোষণা করত না।

কাউকে রাজনৈতিক, ধর্মীয় এবং নৈতিক গোঁড়ামি শিক্ষা দেয়ার অভ্যাস করালে সব রকমের অশুভ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হবে। এ-সম্পর্কে বলতে গেলে যে সকল পেশাদার শিক্ষক সততা এবং বুদ্ধিবৃত্তিক উৎকর্ষ প্রচেষ্টার সহযোগে শিক্ষাদান করে তা এসকল দোষ থেকে মুক্ত এবং তাদের প্রচেষ্টা ছাত্রদের মধ্যে সর্বোৎকৃষ্ট নৈতিক এবং মানসিক পরিবর্তনের সূচনা করে। আমি তিনটা উদাহরণের সাহায্যে তা বুঝিয়ে তাদের দিচ্ছি। প্রথমতঃ রাজনীতি সম্পর্কে আমাদের আলোচনা আমেরিকার একজন অর্থনীতির অধ্যাপক যারা অতিরিক্ত ধনী তাদের আরো ধন বৃদ্ধি করার মতবাদ শিক্ষা দেয়ার ইচ্ছা পোষণ করেন, যদি তাকে তা করতে না দেয়া হয় তাহলে তিনি হার্ভাডের প্রাক্তন অধ্যাপক এবং বর্তমানে লণ্ডনের অর্থনীতির স্কুলের খ্যাতনামা শিক্ষক মি. লাস্কির মতো যেখানে সুবিধা পাবেন সেখানে গিয়েই তার মত প্রচার করবেন। আমাদের দ্বিতীয় আলোচনা ধর্মপ্রসঙ্গে বুদ্ধিবৃত্তিক দিক দিয়ে যারা প্রখ্যাত তাদের অনেকেই খ্রিষ্টধর্মে অবিশ্বাস করেন, কিন্তু তারা তা জনসাধারণের কাছ থেকে গোপন রাখেন, কেননা তা করলে তাদের আয় কমে যাবে। সুতরাং সবচেয়ে প্রয়োজনীয় বিষয়ে যাদের মতামত খুবই মূল্যবান তাদেরকে নিশ্ৰুপ থাকার দণ্ড ভোগ করতে হয়। আমাদের তৃতীয় আলোচনা নৈতিকতা প্রসঙ্গে। বাস্তবে সব মানুষ তাদের জীবন সম্পর্কে পবিত্র ধারণা পোষণ করে না। যারা পরিষ্কারভাবে গোপন করে রাখে তারা যারা গোপন করেনা তাদের চেয়ে অধম, যেহেতু এ প্রসঙ্গে কপটতার সঙ্গে অপরাধকে যুক্ত করে। কপট ব্যক্তিদের জন্যই শিক্ষকের চাকুরির পথ খোলা। শিক্ষকের পছন্দ এবং চরিত্রের গোঁড়ামির এত ব্যাপক প্রভাব।

ছাত্রদের ওপর কিরূপ প্রতিক্রিয়া হয় এর ফলে, সে-সম্পর্কে আলোচনা করছি যা আমি নৈতিক এবং বুদ্ধিবৃত্তিক এ দু’পর্যায়ে বিভক্ত করে নেব। মতামতের মধ্যে কোনটাকে গ্রহণ করা বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে তরুণের কাছে প্রেরণাদায়ী; তাহলে দৃষ্টান্তস্বরূপ বলা যেতে পারে একজন তরুণ অর্থনীতি পড়ছে, সে ব্যক্তি স্বাতন্ত্রবাদী, সমাজতন্ত্রবাদী, রক্ষণশীল, স্বাধীন বাণিজ্যবাদী, মুদ্রাস্ফীতিবাদী সকলের মধ্যে বিশ্বাসীদের মত করে বক্তৃতা শুনবে। বিভিন্ন পদ্ধতির ওপর গ্রন্থগুলোর মতামতে বিশ্বাসীদের সঙ্গে পরামর্শ করে তাকে পড়তে উৎসাহিত করা উচিত। তাহলে যুক্তির প্রমাণ যাচাই করতে শিখবে; কোন মতামত যে সম্পূর্ণ সত্য নয় তা জানতে পারবে, পূর্বনির্ধারিত বিশ্বাসে স্বীকৃতি না-দিয়ে সে মানুষকে গুণগত উৎকর্ষের জন্য বিচার করতে শিখবে। ইতিহাসকে শুধু নিজদেশের নয় বিদেশের দৃষ্টিভঙ্গিতেও শিক্ষা দেয়া উচিত। ইংল্যাণ্ডে যদি ফরাসিরা, ফ্রান্সে যদি ইংরেজরা ইতিহাস শিক্ষা দেয় তাহলে দু’দেশের মধ্যে তেমন কোন মতবিরোধ থাকবেনা, কারণ একে অন্যের দৃষ্টিকোণ বুঝতে সক্ষম হবে। এজন্য তরুণের সব প্রশ্নের অবারিত চিন্তা করতে শিক্ষা করা উচিত, যেখানেই নিয়ে যাক না যুক্তির ধাবমানতা ক্ষুণ করা উচিত নয়। জীবিকার্জন শুরু হলে বাস্তব প্রয়োজনের তাগিদে তার এ আগ্রহ মরে যাবে, কিন্তু তার পূর্বপর্যন্ত তাকে স্বাধীন কল্পনা করার আনন্দ অনুভব করতে উৎসাহিত করা উচিত। তরুণদেরকে গোঁড়ামি শিক্ষা দেয়া নৈতিক দিক দিয়েও অত্যন্ত ক্ষতিজনক, তার ফলে সমর্থ শিক্ষকরা কপট হয়ে খারাপ দৃষ্টান্ত স্থাপন করেনা শুধু সবচেয়ে ভয়ঙ্কর দোষ হলো জান্তব প্রবৃত্তির আকারে সহনশীলতাকে বিনষ্ট করতে উৎসাহিত করে। এডমাণ্ড গোজ তার পিতাপুত্র গ্রন্থে বর্ণনা করেছে, তার বাবা আবার বিয়ে করতে যাবার সময় তাকে বলেছিলেন তার শৈশবাবস্থার কথা। বালক এডমাণ্ড দেখলেন যে তার মধ্যে এমন কিছু আছে লজ্জার কারণে তার বাবা মুখ ফুটে বলতে পারছেন না। শেষ পর্যন্ত তিনি আতঙ্কিত স্বরে জিজ্ঞেস করলেন, বাবা তাহলে কি তিনি (Paedo Baptist) তার আগে পর্যন্ত তিনি তাদেরকে মন্দ লোক বলে মনে করে আসছিলেন। সুতরাং ক্যাথলিক স্কুলের ছাত্রেরা বিশ্বাস করে প্রোটেষ্টান্টরা খারাপ, যে কোন ইংরেজি ভাষাভাষী দেশের স্কুলের ছাত্রেরা বিশ্বাস করে ফরাসিরা খারাপ, ফরাসিদেশের ছেলেরা বিশ্বাস করে জার্মানেরা খারাপ এবং জার্মানির ছেলেরা ফরাসিদেরকে খারাপ মনে করে। বুদ্ধিবৃত্তিসম্মত পদ্ধতিতে নির্ভযোগ্য নয় এমন সব মতামতকে শিক্ষা দেয়ার আংশিক দায়িত্ব যখন স্কুল গ্রহণ করে, তখন তা বিরুদ্ধবাদীদের সম্বন্ধে খারাপ ধারণা জন্মিয়ে দিতে বাধ্য হয়। (বাস্তবে অধিকাংশ স্কুল তা করে থাকে) তা না হলে বিবেচনাশক্তিকে সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস করে ভাবাবেগ জাগাতে পারেনা। গোঁড়ামির কারণেই শিশুরা কৃপণ, নির্মম এবং কলহপরায়ণ হিসেবে গড়ে ওঠে। যে পর্যন্ত ধর্ম, নৈতিকতা এবং রাজনীতির নির্দিষ্ট মতামতের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা যাবেনা, তখন পর্যন্ত এর থেকে মুক্তিলাভের কোন পথ নেই।

শেষমেষ ব্যক্তির নৈতিকতার ক্ষতি সামাজিক নৈতিকতার অকথিত ক্ষতির কারণ হয়ে থাকে। যুদ্ধ এবং নির্যাতন সব জায়গায় চলছে এবং তা স্কুলের শিক্ষার কারণেই সহজে সম্ভব হয়ে উঠেছে। ওয়েলিংটন বলতেন, ইটনের খেলার মাঠে ওয়াটালু যুদ্ধ জয়লাভ করেছিল। তিনি অধিকতর নিশ্চিতভাবে বলতে পারতেন ইটনের শ্রেণীকক্ষে ওয়াটালু যুদ্ধজয়ের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছিল। মাধ্যমিক এবং মাধ্যমিক স্কুল ছাড়া আমাদের গণতান্ত্রিক যুগে ইটনের প্রয়োজনীয়তা নেই। প্রত্যেক দেশে পতাকা দুলিয়ে সম্রাট দিবস ৪টা জুলাইয়ের উৎসব, অফিসার ট্রেনিং কোর্স ইত্যাদি পালন করার মাধ্যমে বালকদেরকে নরহত্যার শিক্ষা দেয়া হয় এবং বালিকাদের মনে এ বিশ্বাস জাগিয়ে দেয়া হয় যে, সকল মানুষ নরহত্যায় নিয়োজিত তারাই সকল শ্রদ্ধার দাবীদার। কর্তৃপক্ষ যদি শিক্ষক এবং ছাত্রদের মতামতের স্বাধীনতা না দেয় তাহলে অধঃপতনের গহ্বর থেকে বালক বালিকারা মুক্তি লাভ করতে পারবেনা। কোনো কিছুকে গণ্ডীবদ্ধ করলে তা সমস্ত দোষের উৎস হয়ে দাঁড়ায়। ধর্মের মত, শিক্ষাবিভাগীয় কর্তারা ছেলেদের পানে মুক্তিকামী আত্নসম্পন্ন মানুষ হিসেবে, দৃষ্টিপাত করেনা, তারা তাদেরকে জাঁকজমকপূর্ণ সামাজিক পরিকল্পনার উপাদান হিসেবে কারখানার ভাবী হাত হিসেবে, যুদ্ধের সঙ্গীন হিসেবে এবং কি হিসেবে যে ভাবেন না তা কল্পনা করা যায় না। প্রত্যেক শিশুকে তার ব্যক্তিত্ব এবং অধিকারসমন্বিত আলাদা লক্ষ্যের অভিসারী না ভেবে যে লোক ভেল্কিবাজীর যন্ত্র, যুদ্ধক্ষেত্রের সৈনিক এবং রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে শুধু ভাবে তার শিক্ষা দান করা উচিত নয়। সমস্ত সামাজিক প্রশ্নে এবং সর্বোপরি শিক্ষাব্যবস্থায় মানুষের ব্যক্তিত্বের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ থেকেই জ্ঞানের সূচনা।

 ১৫. মনোবিজ্ঞান এবং রাজনীতি

রাজনীতিতে মনোবিজ্ঞান অনতিবিলম্বে যে সকল প্রতিক্রিয়ার কারণ হতে পারে, অথবা কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে তাই আলোচনা করব। সম্ভাব্য ভালো এবং খারাপ দু’রকমের প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে আমি আলোচনা করতে চাই।

রাজনৈতিক মতবাদ যুক্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত নয়। সোনার মান প্রত্যাহার করার মতো। যান্ত্রিক একটি বিষয়ও প্রধানতঃ ভাবাবেগ দ্বারা নির্ধারিত হয়েছিল। মনোঃসমীক্ষকদের মতে ভাবাবেগ হলো তেমন চিজ, যা সভ্যসমাজে কোন পাত্তা পায় না। এখন একজন যুবকের ভাবাবেগ বলতে শিক্ষার প্রতিভাসে সংমিশ্রিত প্রবৃত্তির সারাংশের . সুবৃহৎ পরিধিকেই বোঝায়। ভাবাবেগের এক অংশে শিক্ষাকল্পনার ওপর প্রভাব বিস্তার করে থাকে। প্রত্যেকে নিজেকে একজন সুন্দর মানুষ হিসেবে দেখতে চায় এবং যেটা তার কীর্তিস্থাপনের সম্ভাব্য সহজ পথ বলে মনে করে, সে পথেই তার কল্পনা এবং ধাবিত হয়। আমার মনে হয়, যদি কেউ যৌবনে মনোবিজ্ঞান পড়ে থাকে, তাহলে তিনি পরলোকগত লর্ড কার্জন অথবা লণ্ডনের প্রধান ধর্মাধ্যক্ষের মতো হতে পারবেন।

যে কোন বিজ্ঞানের দু’রকমের প্রতিক্রিয়া আছে। একদিকে বিশেষজ্ঞরা যা তৈরি এবং আবিষ্কার করেন যা শক্তির অধিকারী তারা তা ব্যবহার করেন। অন্যদিকে বিজ্ঞান আমাদের কল্পনায় প্রভাব বিস্তার করে আমাদের বোধবুদ্ধি এবং প্রত্যাশার পরিবর্তন সাধন করতে পারে। খুব কড়াকড়িভাবে বলতে গেলে তৃতীয় রকমের আরেকটি প্রতিক্রিয়া রয়েছে তা হলো যাবতীয় ফলাফলসমূহ জীবনের পদ্ধতিতে একটা বিরাট পরিবর্তন। প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে এই তিন রকমের প্রতিক্রিয়াই এখন সুবিকশিত হয়ে ওঠেছে। প্রথম প্রতিক্রিয়াকে উড়োজাহাজের সাহায্যে দ্বিতীয়টাকে জীবনের প্রতি যান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োগ এবং তৃতীয়টা হলো অধিকাংশ মানুষ শিল্প এবং শহরতলী অথবা গ্রামের মধ্যে পরবর্তী পছন্দের ওপর নির্ভর করে। মনোবিজ্ঞানে আমাদেরকে এখনো বিভিন্ন প্রকারের প্রতিক্রিয়ার প্রকৃতি বুঝতে হলে ভবিষ্যৎবাণীর ওপর নির্ভর করতে হয়। ভবিষ্যৎবাণী সকল সময়ে ভীড় করে থাকে। প্রথম ধরনের প্রতিক্রিয়া তৃতীয় ধরনের প্রতিক্রিয়া যা আমাদের কল্পনার দৃষ্টিভঙ্গির ওপর নির্ভরশীল তার চেয়ে ভবিষ্যত্বাণীর ওপর অধিকতর নির্ভরশীল। সুতরাং আমি প্রথমে প্রথম কারণের প্রধান প্রতিক্রিয়াগুলোর ওপর আলোচনা করব।

ইতিহাসের অন্যান্য সময়ের সম্বন্ধে কিছু বললে আবহাওয়াটা বুঝবার পক্ষে কিছু সাহায্য হতে পারে। মধ্যযুগে প্রত্যেকটা রাজনৈতিক প্রশ্নকে ধর্মতাত্ত্বিক যুক্তির আলোকে বিচার করা হতো, যা সামঞ্জস্য বিধানের রূপ পরিগ্রহ করত। পোপ এবং সম্রাটের মধ্যে প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিল। পোপ সূর্য এবং সম্রাট চন্দ্র বলে স্বীকৃত হলেন। শেষপর্যন্ত জয় হলো পোপের। পোপের সুশিক্ষিত সৈন্য ছিল বলে জয়লাভ করেছেন, একথা বললে ভুল করা হবে। তিনি তার সৈন্যদেরকে আকর্ষণীয় শক্তি সূর্য চন্দ্রের সামঞ্জস্যের তাৎপর্য বুঝিয়ে দিলেন। ফ্রান্সিসের মতাবলম্বীদেরকে তিনি সৈন্য হিসেবে সংগ্রহ করে মোতায়েন করলেন। এভাবেই জনতাকে মুগ্ধ করে সত্যিকারভাবে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাপ্রবাহকে নিয়ন্ত্রণ করা হলো। আজকের যুগে কেউ কেউ সমাজকে যন্ত্র এবং কেউ কেউ গাছ বলে মনে করে। প্রথম দলের মধ্যে আছে ফ্যাসিবাদী সাম্রাজ্যবাদী, শিল্পবাদী এবং বলশেভিক মতানুসারীরা এবং শান্তিবাদী, নিয়মতান্ত্রিকতাবাদী আর কৃষিভিত্তিক সমাজবাদীরা হলেন পরবর্তী দলের অন্তর্ভুক্ত। আদতে সমাজ যন্ত্র কিংবা গাছ দু’টোর কোনটা নয় বলে এ যুক্তিকে উদ্ভট মনে হয়।

রেনেসাঁর সঙ্গে আমরা নতুন প্রভাবের সংস্পর্শে আসি, সে-হলো বিশেষভাবে সাহিত্যের প্রভাব। আমাদের যুগে পর্যন্ত সে প্রভাব ক্রিয়াশীল রয়েছে, বিশেষ করে যারা পাবলিক স্কুল এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠাভ্যাস করেন তাদের মধ্যে বেশি। অধ্যাপক গিলবার্ট মারেকে যখন কোন রাজনৈতিক বিষয়ে মনস্থির করতে হয়, লোকে বলে তিনি নিজেকেই প্রশ্ন করেন, প্রথমে এ সম্পর্কে ইউরিপিডস কী বলে গেছেন? কিন্তু এ দৃষ্টিভঙ্গি বর্তমানে আর প্রভাবশীল নয়। রেনেসাঁর সময়ে অষ্টাদশ শতাব্দী থেকে শুরু করে ফরাসি বিপ্লব পর্যন্ত সে ভাবাদর্শের জোড়ালো প্রভাব ছিল। বিপ্লবী বক্তারা সবসময়ে রোমান গুণাবলীর উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত তুলে ধরতেন। মন্তেস্কু এবং রুশোর মত লেখকদের এমন যুগান্তকারী প্রভাব রয়েছে কোনো সাম্প্রতিক লেখকের মধ্যে পাওয়া যায় না। যা হওয়া উচিত বলে মনে করেছেন তা আমেরিকান সংবিধানে বাস্তবায়িত হয়েছে, একথা যে কেউ বলতে পারে। রোমের শাসনব্যবস্থার কোন দিকটির প্রশংসা নেপোলিয়নের জীবনে ক্রিয়াশীল ছিল তার প্রভাব বিচার করার মতো সক্ষম বিচারক নই।

শিল্পবিপ্লরের সঙ্গে সঙ্গে আমরা একটি নবযুগে পদার্পন করি; তাহলো পদার্থবিজ্ঞানের যুগ। বিজ্ঞানীরা বিশেষ করে গ্যালিলিও এবং নিউটন এ যুগের পথ প্রশস্ত করেছেন, কিন্তু সে যুগের জন্মের সঙ্গে সঙ্গে অর্থনৈতিক পদ্ধতির প্রতীক হিসেবে রূপ পরিগ্রহ করল! যন্ত্র একটি নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যবিশেষ এবং তা বৈজ্ঞানিক নিয়ম-কানুন মেনে চলে, (তা না হলে যন্ত্রের সৃষ্টি করা যেতনা) সে বিশেষ উদ্দেশ্যটি সবসময় বাইরের স্থাপিত মানুষের সঙ্গে, বিশেষ করে মানুষের জাগতিক জীবনের সঙ্গে সম্পর্কশীল। কেলভিনিয় ধর্মতত্ত্বে ভগবানের সঙ্গে পৃথিবীর যে সম্পর্ক বর্ণিত হয়েছে মানুষের সঙ্গে যন্ত্রের সম্পর্ক অবিকল তাই। সম্ভবতঃ সে জন্যই বোধ হয় প্রোটেষ্টান্টদের দ্বারা শিল্পের আবিষ্কার হয়েছিল এবং তাতে এ্যাঙ্গলিকান গির্জার অনুসারীদের তুলনায় ননকনফরমিষ্টরা অধিকতর উল্লেখযোগ্য ভূমিকায় অংশগ্রহণ করেছিল। যান্ত্রিক সামঞ্জস্যবিধান চিন্তাধারার ওপর প্রগাঢ় প্রভাব বিস্তার করেছিল এবং এখনো করছে। আমরা পৃথিবী সম্পর্কে যান্ত্রিক মতামত, যান্ত্রিক ব্যাখ্যা, যান্ত্রিক অর্থ সাধারণতঃ প্রাকৃতিক নিয়মকে যান্ত্রিকভাবে ব্যাখ্যা করে থাকি। সম্ভবতঃ অচেতনভাবে যন্ত্রের বাইরের একটি উদ্দেশ্য এবং পরিণতি যন্ত্রের মধ্যে প্রবর্তন করে থাকি। সুতরাং সমাজকে যদি যন্ত্র বলে ধরা হয়, তাহলে ধরে নিতে হয় সমাজবহির্ভূত একটি উদ্দেশ্য বা লক্ষ্য সমাজের রয়েছে। ভগবানের গৌরবের জন্য যন্ত্রের প্রচলন হয়েছে একথা বলে আমরা আর সন্তুষ্ট হতে পারিনা, কিন্তু ভগবানের সমার্থক যেমন ব্যাঙ্ক অব ইংল্যাণ্ড বৃটিশ সাম্রাজ্য এবং কমিউনিস্ট পার্টি ইত্যাদি খুঁজে নিতে আমাদের কষ্ট হয়না। এই বিভিন্ন ধরনের সমার্থক লক্ষ্যের সংঘাতেই আমাদের মধ্যে যুদ্ধ লাগে। এটা মধ্যযুগীয় চন্দ্র সূর্যের ধারণার পূনরাবৃত্তি ছাড়া আর কিছু নয়।

পদার্থবিজ্ঞান সুনির্দিষ্ট বিজ্ঞান বলেই অধিকারী এবং আমাদের দৈনন্দিন জীবনকে ব্যাপকভাবে পরিবর্তন করতে সক্ষম হয়েছে। কিন্তু এই পরিবর্তন পরিবেশকেই পরিবর্ধিত করে চলেছে, মানুষকে নয়। পদার্থবিজ্ঞানের মতো সমান সুনির্দিষ্ট এবং মানবজীবনে প্রত্যক্ষ পরিবর্তন আনতে সক্ষম আরেকটি বিজ্ঞানের আবির্ভাব হলে পদার্থবিজ্ঞান অপ্রধান হয়ে পড়বে: মনোবিজ্ঞান সে স্থান দখল করতে পারে। সাম্প্রতিককালে ছাড়া অন্যসময়ে গুরুত্বহীন দার্শনিক বাগাড়ম্বর বলে মনে করা হতো। আমি যৌবনে যে মনোবিজ্ঞান পড়েছি সেগুলো আদৌ পাঠ করার উপযুক্ত নয়। কিন্তু বর্তমানে মনোবিজ্ঞানের দু’রকম আবেদন বা পদ্ধতি স্পষ্টতঃই গুরুত্বসম্পন্ন হয়ে উঠেছে। তাহলো মনোবিজ্ঞানী এবং মনঃসমীক্ষকদের পদ্ধতি। ফলাফলের দিক দিয়ে এ দু’পদ্ধতি অধিকতর নিশ্চিত এবং নির্দিষ্ট হয়ে উঠেছে যখন স্পষ্টতঃই মনোবিজ্ঞান বর্ধিতহারে মানুষের দৃষ্টিভঙ্গিকে নিয়ন্ত্রণ করে।

শিক্ষাকে আমরা আলোচ্য বিষয় হিসেবে নিতে পারি। প্রাচীনকালের প্রচলিত মতানুসারে আট বছর বয়স থেকে শিশুদের পড়তে দেয়া উচিত। কিন্তু ল্যাটিন শিক্ষার আগ্রহ হাস পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আগের প্রয়োজনীয় মতবাদ গুরুত্বহীন হয়ে পড়ল! তাৎপর্যগত অর্থে এই মতবাদ এখনো শ্রমিকদের মধ্যে প্রবল : ক্ষমতায় থাকার সময়ে তারা নার্সারি স্কুলে শিশুশিক্ষা দেয়ার চেয়ে চৌদ্দ বছরের পরে শিক্ষা দেওয়ার জন্য অধিকতর যত্নবান হয়ে থাকেন। প্রাচীন ব্যবস্তার প্রতি মানুষের দৃষ্টি এখনো কেন্দ্রীভূত বলেই অনেকে শিক্ষা সম্বন্ধে হতাশা পোষণ করে। তারা মনে করে যে, শিক্ষা একজন মানুষকে ভরণপোষনের উপযোগী ছাড়া আর কিছুই করতে পারেনা! কিন্তু দেখা যাবে যে শিক্ষার বৈজ্ঞানিক মনোভঙ্গী আগেকার তুলনায় অনেক বেশি শক্তি দিয়ে থাকে, অবশ্য শিক্ষা খুবই ছোটকাল থেকে শুরু করতে হবে। মনঃসমীক্ষকেরা জন্মের সঙ্গে সঙ্গে আর জীব বিজ্ঞানীরা তারও আগে থেকে শিক্ষা শুরু করতে চান। আপনি একটি মাছকে দু’দিকে চোখ থাকার বদলে মাঝখানে একটি চোখ বিশিষ্ট করে শিক্ষিত করে তুলতে পারেন (Jennius.Promethus. P 60) কিন্তু তা করতে হলে আপনাকে মাছ জন্মাবার আগে থেকে শিক্ষিত করে তোলার কাজ শুরু করতে হবে। কিন্তু এ পর্যন্ত দেখা গেছে যে স্তন্যপায়ী প্রাণীদেরকে জন্মের পূর্বে শিক্ষা দেওয়ার মধ্যে বিস্তর অসুবিধা আছে, কিন্তু সেগুলো কাটিয়ে ওঠা যায়।

তবে আপনারা বলবেন, আপনি শিক্ষাকে বেশ মজার অর্থেই ব্যবহার করছেন। একটা মাছকে বিকৃত করা একটা ছেলেকে ল্যাটিন ব্যাকরণ শেখানো এ দু’য়ের মধ্যে প্রভেদ কিসের? আমি নিশ্চিতভাবে বলতে পারি আমার কাছে দু’টাই একরকম। উভয়টিই ছাত্রের আনন্দের পক্ষে ক্ষতিকারক। সে যাহোক, একে শিক্ষার সংজ্ঞা বলে মেনে নেয়া যায় না। শিক্ষার আসল অর্থ হলো, পরিচালকের নির্দেশক্রমে সংশোধিত একপ্রকারের (মৃত্যু ছাড়া) ইন্দ্রিয়বৃত্তিক পরিবর্তন। অবশ্য পরিচালক বলে থাকেন যে শিক্ষার্থীর মঙ্গলই হচ্ছে তার আকাঙ্খা। নিরপেক্ষভাবে যাচাই করে দেখলে তার মন্তব্যের যে কোন সত্যতা আছে তা ধরা পড়েনা।

এখন ইন্দ্রিয়বৃত্তিক পরিবর্তন করার জন্য অনেকগুলো পদ্ধতি আবিস্কৃত হয়েছে। আপনি ইচ্ছা করলে মাছের অস্তিত্বে পরিবর্তন করতে পারেন, যাতে করে একটা চোখ হারিয়েও বেঁচে থাকতে পারে। উদাহরণস্বরূপ একজন মানুষের শরীরের অভ্যন্তরে ঔষধ প্রয়োগ করে রাসায়নিক উপাদানের পরিবর্তন সাধন করতে পারেন। মামুলি পদ্ধতি শেষ ধরনের পরিবর্তনের বিশেষ দিক। বর্তমানে শিক্ষার সবকিছু উপদেশ বা অনুজ্ঞা ব্যতিরেকে যন্ত্রটি যখন খুবই তরুন তখনই ছাপ ফেলতে সক্ষম বলে প্রমান করা হয়। এ-ধারনা অনুসারে মানুষের শিক্ষা শুরু হওয়ার গুরুত্বপূর্ণ সময় হলো চার বছরের পর। কিন্তু আমি যেমন আগে বলেছি এখনো বলছি জন্মের পূর্বে শিক্ষা এখনো সম্ভব হয়নি,যদিও তা এশতাব্দীর শেষদিকে সম্ভব হবে বলে আশা করা যায়।

বাল্যকালে শিক্ষা দেবার দুটো পদ্ধতি রয়েছে। একটা রাসায়নিক এবং অন্যটা সাঙ্কেতিক পদ্ধতি। যখন আমি রাসায়নিক কথাটা বলি তখন সম্ভবতঃ আমাকে জবরদস্ত বস্তুবাদী বলে ভাবা হবে। যদি আমি বলতাম প্রত্যেক সতর্ক মা শিশুকে যে সকল স্বাস্থ্যকর পথ্য পাওয়া যায় তাই খেতে দেবে, তাহলে আমাকে বস্তুবাদী ভাবা হতো না। রাসায়নিক কথাটাকে ঘুরিয়ে বললে তাই দাঁড়ায় বৈকি, যে সকল সম্ভাবনা কম বেশি ইন্দ্রিয়বোধ সম্বন্ধীয় সেগুলোর সঙ্গে আমার কারবার। পথ্যের সঙ্গে উপযুক্ত ঔষধ অথবা ইনজেকশনের সাহায্যে রক্তের মধ্যে সারবান উপাদান প্রবিষ্ট করিয়ে দিলে বুদ্ধিবৃত্তির বৃদ্ধি অথবা আবেগের প্রকৃতির পরিবর্তন ঘটানো যায়। সকলেই জানে যে মুখতার সঙ্গে আয়োডিনের অভাবের সম্পর্ক রয়েছে। সম্ভবতঃ আমরা দেখতে পাবো যে তারাই হচ্ছে বুদ্ধিমান মানুষ যারা বাল্যকালে পথ্যের সঙ্গে অল্প পরিমাণে দুপ্রাপ্য উপাদান কড়াই, বাসন অপরিষ্কার থাকার ফলে খেতে পেয়েছে। অথবা গর্ভাবস্থায় মায়ের পথ্যের থেকে সে উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্যের সঞ্চার হয়েছে, এ বিষয়ে আমার পরিপূর্ণ জ্ঞান নেই, শুধু আমি লক্ষ্য করেছি যে মানুষকে শিক্ষা দেওয়ার চাইতে সরীসৃপকে শিক্ষা দেওয়া অনেক বেশি সহজ। তার প্রধান কারণ সরীসৃপের আত্না আছে তা আমরা কল্পনা করিনে!

বাল্যকালে শিক্ষার মনস্তাত্ত্বিক শিক্ষা জন্মের আগে কখনো শুরু হতে পারে না। কারণ, শিক্ষার প্রধান কাজ হলো স্বভাব গঠন। জন্মের আগে আয়ত্ব করা স্বভাবের কোন প্রভাব বেশিরভাগ ক্ষেত্রে জন্মের পরে থাকতে পারে না। কিন্তু শৈশবের চরিত্র সংগঠনের বেলায় তার ব্যাপক প্রভাব রয়েছে, সে সম্বন্ধে আমার সন্দেহ নেই। যারা দেহের ক্রিয়া-প্রক্রিয়া দিয়ে মনকে বিচার করে এবং যারা মনকে প্রত্যক্ষভাবে দেখে তাদের মধ্যে যে বিরোধ আছে, আমার মনে হয় তার কোন প্রয়োজন নেই। প্রাচীনপন্থী ডাক্তার খ্রিষ্টান হলেও আমাদের শারীরিক অবস্থাই দায়ী এবং সে অবস্থাকে দূরীভূত করলে রোগী আরোগ্য হয়ে যাবে। পক্ষান্তরে মনঃসমীক্ষকেরা সবসময় মনস্তাত্ত্বিক কারণই অনুসন্ধান করেন এবং সেগুলোকে বিন্যস্ত করতে চেষ্টা করেন। এ সমস্ত বিষয়টা মন এবং বস্তুর দ্বৈত-সত্তার মধ্যে দোলায়মান, আমার মতে তা ভ্রান্তি ছাড়া আর কিছু নয়। কোন কোন সময়ে সেগুলোকে মানসিক কারণ বলে থাকি তা উদ্ভাবন করা সহজসাধ্য হয়ে পড়ে। কিন্তু আমাদের মনে করা উচিত যে দু’ধরণের প্রতিক্রিয়াই সবসময়ে বর্তমান। কোন বিশেষ ক্ষেত্রে যখন কোন লক্ষণ আবিষ্কার হয় তার সাহায্যে অনুসন্ধান করাটাই যুক্তিসঙ্গত বলে আমার ধারণা। এ ক্ষেত্রে আয়োডিনের সাহায্যে মুগ্ধতা নিরসন এবং অন্যক্ষেত্রে ফোবিয়ার রোগীকে আরোগ্য করা মধ্যে কোন অসঙ্গতি নেই।

যখন আমরা রাজনীতি সম্বন্ধে একটা মনস্তাত্ত্বিক ধারণা নিতে চাই তখন সাধারণ মানুষের মৌলিক আবেগ প্রবৃত্তি এবং পরিবেশের সাহায্যে কি করে সেগুলোর উৎকর্ষ বিধান করা যায় তা দিয়ে শুরু করাই স্বাভাবিক বলে মনে করি। একশ বছর আগে গোঁড়া অর্থনীতিবিদদের ধারণা ছিল ক্ষমতাপ্রীতিই রাজনৈতিক ব্যক্তিদের একমাত্র উদ্দেশ্য। কার্ল মার্কসও এই মতামতকে গ্রহণ করেছেন এবং তার ওপর ভিত্তি করে ইতিহাসের অর্থনৈতিক ভাষ্য রচনা করেছেন। পদার্থবিজ্ঞান এবং শিল্পবাদের থেকে স্বাভাবিকভাবেই এ মতবাদের উদ্ভব হয়েছে। আমাদের যুগে পদার্থবিজ্ঞানকে কাল্পনিক প্রাধান্য দান করার ফলে কমিউনিস্ট এবং সকল শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিবৃন্দ এ মতামতের দ্বারা আচ্ছন্ন! তরুণী রমণীরা জন সাহায্যে প্রতিপালিত মানুষকে বিয়ে করার জন্য আয়ের মায়া ত্যাগ করাতে, বিচারক এবং টাইম পত্রিকা যেমন তাদের আশ্চর্য হওয়ার কথা প্রকাশ করেছিলেন, এ-ও অনেকটা সে রকম। সুখের সম্বন্ধে প্রচলিত মতবাদ, সুখ হলো আয়ের অনুপাতের উপর নির্ভরশীল। তাই যদি হয়ে থাকে তাহলে একজন ধনী অবিবাহিতা বৃদ্ধা একজন বিবাহিতা রমণীর চেয়ে সুখী-এ কথা বলতে হবে। আমাদের প্রথম বক্তব্যকে সত্য প্রতিপন্ন করার জন্য আমরা সাধ্যমত পরবর্তী মহিলার ওপর বেদনা এবং যাতনা আরোপ করি।

গোঁড়া এবং মার্কসবাদীদের বিরুদ্ধে মনঃসমীক্ষকেরা বলে যে যৌনবোধ হচ্ছে মানুষের একটি মৌলিক প্রবৃত্তি। তারা আরো বলে যে ক্ষমতাপ্রীতি হলো পীড়িত যৌন-কামনাবোধের এক ধরনের বিকৃত বিকাশ! যে মানুষ এতে বিশ্বাস করে সে লোক অর্থনৈতিক মতবাদে বিশ্বাসী যে মানুষ, তার চাইতে আলাদা কাজ যে করবে একথা তো দিবালোকের এত স্পষ্ট। বিশেষ বিশেষ রোগে আক্রান্ত হলে, প্রত্যেকেই জীবনে সুখী হতে চায়। কিন্তু অধিকাংশ সুখ কিসের মধ্যে তার কতকগুলি প্রচলিত থিয়োরিকে সারসত্য বলে গ্রহণ করে থাকে। যদি মানুষ চিন্তা করে সম্পদের মধ্যে সুখ রয়েছে, তারা যখন যৌনক্রিয়াকে অপরিহার্য মনে করবে সে অনুসারে কাজ করবেনা। উভয় মতামতের কোনটাকেই আমি সত্য বলে মনে করিনা, কিন্তু নিশ্চিতভাবে মনে করি যে পরবর্তী মতামত অধিকতর কম ক্ষতিকর, কি করলে সুখ পাওয়া যায় তার প্রকৃত থিয়োরির কিসের প্রয়োজন। কোন মানুষ যদি তার জীবনের বৃত্তিকে নির্বাচন করার জন্য তা ব্যবহার করে তাহরে বলতে হবে তিনি থিয়োরি দ্বারা অধিকতর প্রভাবিত হয়েছেন। যদি কোনো ভুল থিয়োরি বর্তমান থাকে, তাহলে সার্থক মানুষেরা অসুখী হবেন; তা তারা নিজেরাও জানবেননা। যে সকল মানুষকে তারা অবচেতনে হিংসা করে তাদেরকে হত্যা করার ইচ্ছায় তাদের হৃদয় ক্রোধে আন্দোলিত হয়ে ওঠে। অত্যাধুনিক রাজনীতি, সাধারণতঃ অর্থনীতির ওপর যা নির্ভরশীল, প্রবৃত্তির সন্তুষ্টির অভাব জনপ্রিয় মনস্তত্ত্বের প্রমাদের কারণেই হয়ে থাকে।

যৌন-প্রবৃত্তি যে সবকিছু তা আমি মনে করতে পারিনা। রাজনীতিতে যৌনপ্রবৃত্তিকে যখন থেতলিয়ে দেয়া হয় তখনই বিশেষভাবে প্রয়োজন হয়ে পড়ে। যুদ্ধে অবিবাহিত বয়স্কদের মধ্যে একধরণের হিংস্রতা এসে থাকে এবং তা অংশতঃ একারণে যে যুবকেরা তাদেরকে অবজ্ঞা করে, তারা অস্বাভাবিকভাবে ঝগড়াটে হয়ে থাকে। আমার মনে পড়ে আর্মিষ্টিসের পরে ট্রেনে সালটাশ সেতু অতিক্রম করার সময় নিচে আমি অনেকগুলো নোঙ্গর করা যুদ্ধজাহাজ দেখেছিলাম। দু’জন অবিবাহিতা বয়স্থা কুমারি পরস্পরকে বলতে শুনেছিলাম, তাদের সকলকে অলসভাবে শুয়ে থাকতে দেখলে দুঃখ হয়না, যৌনপ্রবৃত্তি পরিতৃপ্তি হলে রাজনীতিতে বেশি প্রভাব বিস্তার করতে পারে না। আমার বলা উচিত যে রাজনীতিতে ক্ষুধা তৃষ্ণাকে সর্বাগ্রে স্থান দেয়া হয়। পিতৃত্বের প্রয়োজন অপরিসীম, কেননা পরিবারের প্রয়োজন রয়েছে। এমনকি রিভার্স বলেছেন যে পরিবারই ব্যক্তিগত সম্পত্তির উৎস। কিন্তু পিতৃত্বকে অবশ্যই কোনমতে যৌনকামনার সঙ্গে এক করে মিলিয়ে ফেলা যাবেনা।

প্রবৃত্তির সঙ্গে সঙ্গে জীবনের সংরক্ষণ ও প্রসারের জন্য অনেক কিছু থাকতে পারে, যেগুলো আমরা গৌরব বলে আখ্যায়িত করতে পারি। সেগুলো হলো ক্ষমতাপ্রীতি, গরিমা, প্রতিদ্বন্দিতা ইত্যাদি। স্পষ্টতঃ রাজনীতি সহনশীল জীবনযাপনের অবস্থা সৃষ্টি করতে চায়; তাহলে এ গৌরবের প্রবৃত্তি সমূহকে পোষ মানিয়ে রাখা একান্তই প্রয়োজন এবং এমন শিক্ষিত করে নেয়া উচিত যাতে করে নির্দিষ্ট গণ্ডীর বাইরে আসতে না পারে।

আমাদের মৌলিক প্রবৃত্তিসমূহ ভালো অথবা মন্দ দু’টার কোনটাই নয়, সেগুলো নীতিগতভাবেই নিরপেক্ষ। শিক্ষার এমন লক্ষ্য হওয়া উচিত, যাতে সেগুলো ভালো দিকে মোড় নেয়। খ্রিষ্টানেরা এখনো পুরনো পদ্ধতি, এগুলোকে ধ্বংস করে ফেলা হয় তাতে বিশ্বাস করে। নতুন প্রক্রিয়ানুসারে সেগুলোকে শিক্ষিত করে তোলা হয়। ক্ষমতাপ্রীতির কথা ধরা যাক, সেখানে খ্রিষ্টানদের অবদমিত নীতির কথা প্রচার করে লাভ নেই। তাতে প্রবৃত্তিসমূহ স্পষ্ট রূপ ধারণ করবে। যা আপনি করবেন সে উদ্দেশ্যে সুবিধাজনক একটি রাস্তা আপনাকে করতেই হবে। প্রকৃত অন্তর্নিহিত প্রবৃত্তির হাজারোভাবে যথা নির্যাতন, ব্যবসা, রাজনীতি, বিজ্ঞান, শিল্পচর্চা ইত্যাদি যখন সাফল্যজনকভাবে করা হয়, তাহলে অতি সুচারু পরিতৃপ্তি বিধান করা যায়। একজন মানুষ যার ক্ষমতাপ্রীতি রয়েছে তার বাস্তব রূপ দেবার জন্যে যৌবনে যে সকল বিষয়ে দক্ষতা অর্জন করেছে তার মধ্যে একটি পছন্দ করে সে পেশা হিসেবে গ্রহণ করবে। আমাদের পাবলিক স্কুল সমূহের উদ্দেশ্যে অত্যাচার করা ছাড়া আর কিছু নয়। ফলতঃ সে স্কুলসমূহ সাদা মানুষের বোঝা বইবার মত মানুষের সৃষ্টি করে। যদি এসকল মানুষকে বিজ্ঞানের প্রতি অনুরাগসম্পন্ন করে তোলা হয়, সম্ভবতঃ কঠিনতর কাজটা করতে ভালোবাসে। যেমন সতরঞ্চ খেলোয়ার মমুলি খেলা পছন্দ করবেনা। এভাবে দক্ষতা এবং কলাকৌশলের সাহায্যে প্রবৃত্তিকে শাসনে রাখা যায়।

অন্য একটি দৃষ্টান্ত নিতে পারি, যেমন ভীতিনির্ভর বিপদের চার রকমের প্রতিক্রিয়ার কথা বর্ণনা করেছেন। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্নটা প্রযোজ্য।

(১) ভয় পাওয়া এবং পলায়ন করা।

(২) রাগ হওয়া এবং সংগ্রাম করা।

(৩) কৌশলের আশ্রয় নেওয়া।

(৪) নিঃসাড় হয়ে যাওয়া।

এটা স্পষ্ট যে মধ্যে তৃতীয়টাই হলো সবচেয়ে উত্তম, কিন্তু তার জন্য খাপ খায়, এমন বিশেষ ধরনের কৌশলের প্রয়োজন। দ্বিতীয়টাকে সাহস নাম দিয়ে জঙ্গীবাদী ব্যক্তি, স্কুল শিক্ষক এবং ধর্মাধ্যক্ষেরা প্রশংসা করে থাকেন। প্রত্যেক রকমের শাসকশ্রেণীর নিজস্ব শ্রেণীকে সাহসী করে গড়ে তোলার লক্ষ্য থাকে, যাতে করে তারা অধীনস্থদের ভীতু এবং পালনীয় মনোবৃত্তিসম্পন্ন করে গড়ে তুলতে পারে। আমাদের সময়ের আগে নারীজাতিকে শঙ্কাকুলা করে গড়ে তোলা হতো। অপকৃষ্ট বৃত্তি যে সামাজিক ভাবে নমনীয় এবং হামবড়ামীর রুপ পরিগ্রহ করেছে এখনো তা শ্রমিকদের মধ্যে দেখা যাবে।

সবচেয়ে বেশি ভয়ের কারণ হলো, মনোবিজ্ঞান ক্ষমতাসীনদের হাতে নতুন ধরনের অস্ত্র তুলে দেবে। তারা ভীরুতা এবং বশ্যতা শিক্ষা দিতে সক্ষম হবে এবং ধীরে ধীরে পোষমানা জম্ভর মত করে ফেলবে। আমি ক্ষমতাসীনদের নামে শুধু পুজিপতিদের কথা বলছিনা, সমস্ত সরকারি কর্মচারী, এমনকি ট্রেড ইউনিয়ন, শ্রমিকদল সকলেরই কথা বলছি, প্রত্যেক অফিসার এবং প্রত্যেক ক্ষমতাসীন ব্যক্তি চান যে অনুসারীরা তার কাছে অনুগত থাকুক। তারা যদি তাদের সুখের ধারনা অনুসারে নিজস্ব ভাবধারার প্রসার করতে চায়, তাহলে তিনি রুষ্ট হন। অতীতের উত্তরাধিকারনীতি নিশ্চয়তা প্রদান করেছিল যে শাসক শ্রেণী অলস এবং অযোগ্য হবে, যার ফলে অন্যেরা সুযোগ পেয়ে যাবে। প্রত্যেক সময়ের শাসক শ্রেণী যুগের অত্যুৎসাহী এবং কর্মী ব্যক্তিদের মধ্যে থেকে যদি নির্বাচন করা হয় তাহলে তারা নিজের চেষ্টায় মাথা তুলবে। এ ব্যপারে সাধারন মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি বড়ো বেশী ঝাপসা। পৃথিবীতে কেউ অলসের পক্ষে সমর্থন করে কোন কিছুর ওপর অধিকার প্রতিষ্ঠা করেছে এমন দৃষ্টান্ত বিরল। যারা অপরের ব্যাপারে নাক গলায় না অলস বলতে আমি তাদের কথাই বলছি। পৃথিবীর সমস্ত শক্তি যেখানে প্রতিদ্বন্দিতার পুরস্কার সেখানে যদি শান্তিকামী মানুষেরা পাত্তা অর্জন করতে চায়, তাহলে তাদেরকে যৌবনের নির্ভীকতা এবং উদ্যমশীলতা শিক্ষা করতে হবে। সম্ভবতঃ গণতন্ত্রের যুগ এখন অতিক্রান্ত। তাই যদি হয় মনোবিজ্ঞান দাসদের আবদ্ধ করে রাখার শৃঙ্খলের আঙটা হিসেবে কাজ করবে। অত্যাচার করবার কৌশলে পুরোপুরি দক্ষতা অর্জন করার আগে গণতন্ত্রকে নিরাপদ করবার প্রয়োজন সে জন্য।

শুরুতে আমি বিজ্ঞানের তিন রকমের প্রতিক্রিয়ার কথা বলেছি। তাতে পুনরায় প্রবর্তন করলে এটা স্পষ্ট হয়ে পড়ে যে মনোবিজ্ঞান শক্তির অধিকারী কোন কাজে আসবে তা আমরা কল্পনা করতে পারিনে, যতক্ষণ পর্যন্ত না কী ধরণের সরকার আমাদের গঠন করতে হবে সে সম্বন্ধে ওয়াকেবহাল না হই। প্রত্যেক রকমের বিজ্ঞানের মত মনোবিজ্ঞানও শাসকদের হাতে নতুন রকম অস্ত্র প্রদান করবে। তার মধ্যে প্রধানতঃ উল্লেখযোগ্য হবে শিক্ষা এবং প্রোপাগাণ্ডার অস্ত্র, উভয়টাকে পরিপূর্ণ মনস্তাত্ত্বিক পদ্ধতিতে এমনভাবে গড়ে তোলা যায়, যাতে দু’টোই বাস্তবিকভাবে অপ্রতিরোধ্য হয়ে ওঠে। যদি ক্ষমতাসীনেরা শান্তিকামনা করে, তাহলে তারা শান্তি কামী জনতার সৃষ্টি করতে পারবে। আর যদি যুদ্ধ চায়, তাহলে পোষমানা জনসাধারণের সৃষ্টি করবে। যদি তারা বৃদ্ধিবৃত্তির প্রসার করতে চায় করতে পারবে, যদি বোকামো এবং মূর্খতা প্রচার করতে চায় তাও পারবে। সুতরাং এক্ষেত্রে ভবিষ্যৎবাণী করা রীতিমতো অসম্ভব।

কল্পনায় মনোবিজ্ঞান সম্ভবতঃ দু’টো পরস্পরবিরোধী প্রতিক্রিয়া করবে। একদিকে ব্যাপকভাবে ডিটারমিনিজম বা নিয়ন্ত্রনবাদকে গ্রহণ করা হবে। অধিকাংশ মানুষ এখন বৃষ্টির জন্য প্রার্থনা করতে আরাম বোধ করে না, তার কারণ হলো আবহাওয়াবিজ্ঞান। কিন্তু তারা যখন ভালো হৃদয়ের জন্য প্রার্থনা করে তখন তত খারাপ লাগেনা। বৃষ্টির যা কারণ ভালো হৃদয়েরও তাই যদি কারণ হয়ে থাকে তাহলে প্রভেদ থাকবেনা। যে লোক ডাক্তার ডেকে খারাপ আকাথা থেকে মুক্ত না হয়ে ভালো হৃদয়বিশিষ্ট হওয়ার জন্য প্রার্থনা করে তাকে কপট বলে মার্কা মেরে দেয়া যেতে পারে। যদি যে কেউ হার্লি খ্রিষ্টের সাধুর কাছ থেকে কয়েক গিনি দিয়ে প্রার্থনা করে ভালো হয়ে যেতে পারে, তাহলে তাকে কপট ছাড়া আর কি বলা যায়। নিয়ন্ত্রণবাদের প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে সম্ভবতঃ কর্মপ্রেরণা কমে যাবে এবং সাধারণের মধ্যে নৈতিক অলসতা আসবে, কিন্তু এরকমের ফলাফল যুক্তিসঙ্গত নয়। এ আমাদের পক্ষে লাভজনক হবে কি ক্ষতিকারক হবে তা আমরা বলতে পারি না, যেহেতু প্রমাদপূর্ণ মনোবিজ্ঞানের সঙ্গে সমন্বিত নৈতিক প্রচেষ্টার কি ভালো ফল হবে না খারাপ ফল হবে তা আমি বলতে পারিনে। অন্য দিকটি বস্তুর সঙ্গে নৈতিক এবং দার্শনিক কোন বাঁধন থাকবেনা। আবেগসমূহ যখন সর্বজনস্বীকৃত সক্রিয় বিজ্ঞানের বিষয় হিসেবে রূপান্তরিত হবে তখন আবেগ রাশিকেই অত্যধিক গুরুত্ব প্রদান করা হবে। আমার মতে এর ফল মোটামুটি ভালোই হবে, যেহেতু তা সুখের প্রচলিত প্রমাদপূর্ণ ধারণার নিরসন করতে পারবে।

আমাদের জীবনের ধারায় আবিষ্কার এবং উদ্ভাবনের মাধ্যমে যে সম্ভাব্য পরিবর্তন আনতে পারে তার সম্বন্ধে অগ্রিম কিছু বলার মত দুঃসাহস আমার নেই। একধরণের প্রতিক্রিয়া প্রত্যাশা করার কোন সঙ্গত কারণ আমি দেখিনা। উদাহরণস্বরূপ নিগ্রোদের কাছে অন্যান্য উৎকর্ষ না আয়ত্ব করে সাদা মানুষের মতো যুদ্ধ করতে শিক্ষা করাই হবে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিক্রিয়া অথবা বিপরীতভাবে মনোবিজ্ঞান নিগ্রোদেরকে জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি অবলম্বন করতে অনুপ্রাণিত করবে। এই দুই সম্ভাবনা ভিন্ন ভিন্ন পৃথিবীর জন্ম দিতে পারে : একটা বাস্তবায়ন হবে, না কোনটাই হবে না, সে বিষয়ে অনুমান করার কোন উপায় নেই।

উপসংহারে মনোবিজ্ঞানের শ্রেষ্ঠ বাস্তব গুরুত্ব হবে তা সাধারণত মানুষ মানুষীকে সত্যিকারের সুখ কিসে তার একটি ধারণা প্রদান করবে। প্রধান প্রধান ব্যাপারে মানুষ যদি সুখী থাকে তাহলে তারা অসন্তোষ, দ্বেষ এবং ধ্বংসাত্মক কার্যকলাপের শিকারে পরিনত হবে না। জীবনের প্রয়োজনীয় চাহিদা ছাড়াও কমপক্ষে মধ্যবিত্ত এবং মজুরদের যৌন এবং পিতৃত্বের স্বাধীনতা থাকা চাই। আমাদের প্রবৃত্তির জ্ঞানকে সার্বজনীন করে তোলার কাজ বর্তমান জ্ঞানের সাহায্যে কঠিন হবে না, যদি না আমরা, যারা সুখ পায়নি এবং অন্যকেও পেতে দেয়নি তাদের হিংসুটে আবেগের দ্বারা প্রবৃত্তিগুলোকে ধ্বংস না করি এবং সুখ যখন সার্বজনীন হয়ে পড়বে তখন নিজেই নিজের অস্তিত্ব ঘৃণা এবং ভীতির বিরুদ্ধে আবেদনের মাধ্যমে রক্ষা করতে সম্ভবপর হবে বর্তমান রাজনীতি আঁশে শাঁসে যে হিংসা বিদ্বেষ তাও নিরালম্ব হয়ে পড়বে। কিন্তু মনোবিজ্ঞান যদি অভিজাততন্ত্রের দ্বারা পরিচালিত হয় তাহলে পুরনো দোষত্রুটিাকে আবার জাগিয়ে তুলবে এবং তাও নিরালম্ব হয়ে পড়বে এবং তা দীর্ঘস্থায়ী হবে। পৃথিবীতে সুখ সন্তুষ্টি বিধান করার এমন পর্যাপ্ত জ্ঞান রয়েছে, যে মানুষের উৎপত্তির সময় থেকে তাবৎ ইতিহাসে তার জুড়ি মেলেনা; কিন্তু প্রাচীন অসঙ্গতি লোভ, দ্বেষ এবং ধর্মীয় নিষ্ঠুরতা সে সুখের প্রতিবন্ধক হয়ে রয়েছে, এর ফলাফল কি হবে আমি জানিনা, কিন্তু মনে করি খারাপ হোক, ভালো হোক তা এমন হবে যা মানুষের অনুমান কল্পনার বাইরে।

১৬. নীতিযুদ্ধের বিপত্তি

মানবজাতির ইতিহাসে বিভিন্নভাবে সামরিক আলোড়ন ঘটে গেছে। উৎসাহী ব্যক্তিরা তার যে কোন একটি ইতিহাসের চাবিকাঠি বলে ধরে নিতে পারেন। আমি যে আলোড়নটির ওপর আলোচনা করতে চাই সম্ভবতঃ তা কম গুরুত্বসম্পন্ন নয়। আলোড়নের ফলে ইতিহাসের সমন্বয় এবং অসহনশীলতা থেকে বিশ্লেষণ এবং সহনশীলতায় উত্তরণ, তারপর আবার পূর্বাবস্থায় প্রত্যাগমন আমার প্রস্তাবিত বিষয়।

অসভ্য গোত্রগুলো প্রায়ই অসহিষ্ণু এবং সন্দেহপ্রবণ হয়ে থাকে। তাদের মধ্যে সামাজিক আচার বিচারের খুবই প্রধান্য এবং আগন্তুকদের সন্দেহের দৃষ্টিতে দেখা হয়। ইতিহাসের প্রাকহেলেনিক যুগের সবটাতেই এ বৈশিষ্ট্য পুরোমাত্রায় বিরাজমান ছিল। বিশেষ করে মিশরে শক্তিশালী পুরোহিততন্ত্রই ছিল জাতীয় ঐতিহ্যের সংরক্ষক। আখনাতোন বিদেশী সিরীয় সভ্যতার কাছ থেকে যে সাবলীল সংশয়বাদ আয়ত্ব করেছিলেন তা দমন করতে সম্পূর্ণ পারঙ্গম ছিলেন। মিনোয়ানের সময়ের অবস্থা যাই থাকনা কেনো গ্রিসেই সর্বপ্রথম বিশ্লেষণাত্মক সহনশীলতার পরিপূর্ণ বিকাশ হয়। এর পেছনের অনেকগুলো ধারাবাহিক কারণের একটি দৃষ্টান্ত হলো বাণিজ্য, বিদেশীদের সঙ্গে সম্বন্ধ রাখার অভিজ্ঞতা থাকার ফলে এবং বিদেশীদের সঙ্গে সম্বন্দ রাখার তাগিদে তাদের মধ্যে সহনশীলতার প্রয়োজন ছিল। সাম্প্রতিককালের পূর্বপর্যন্ত বাণিজ্য ছিল ব্যক্তিমালিকানাধীন, কুসংস্কার ছিল তখন লাভের প্রতিবন্ধক এবং সকলের সঙ্গে প্রীতির সম্বন্ধ রক্ষা করাই হলো ব্যবসায়ে সাফল্যের নীতি। কিন্তু পরবর্তী গ্রিসের বাণিজ্যম্পৃহার থেকেই, শিল্প এবং দর্শনের উদ্ভব হয়, কিন্তু সামরিক সাফল্যের জন্যে যে পরিমাণ সামাজিক সঙ্গতির প্রয়োজন ছিল তা সৃষ্টি করতে পারেনি। সুতরাং গ্রিকেরা প্রথমে মেসিডোনিয়া এবং পরে রোমানদের কাছে নতিস্বীকার করতে বাধ্য হয়েছিল।

আধুনিক দৃষ্টিতে দেখতে গেলে রোমান পদ্ধতি ছিল নিঃসন্দেহে সমন্বয়ধর্মী এবং অসহনশীল। এখানে আধুনিক অর্থের মানে আমি বোঝাতে চাচ্ছি যে তারা ধর্মতাত্ত্বিক দিক দিয়ে নয়, সাম্রাজ্যবাদী এবং অর্থনৈতিক দৃষ্টিতেই ছিল সমন্বয়বাদী। সে যাহোক, রোমানদের সমন্বয়বাদ ধীরে ধীরে সংশয়বাদের মধ্যে ডুবে গেলো এবং যা খ্রীষ্টিয় এবং মুসলমান সমন্বয়বাদে রূপ পরিগ্রহ করেছিল। এ সমন্বয়বাদ রেনেসাঁর পূর্ববর্তী সময় পর্যন্ত প্রবল ছিল। পশ্চিম ইউরোপের বুদ্ধিবৃত্তি এবং শিল্পোতকর্ষময় একটি সংক্ষিপ্ত যুগের জন্ম রেনেসা দিয়েছিল; যখন রাজনীতিতে অব্যবস্থা এবং সাদাসিধা মানুষদেরকে বোকা বানিয়ে ধর্মযুদ্ধে পরস্পর পরস্পরকে নির্মমভাবে হত্যা করানো হচ্ছে। ইংল্যাণ্ড, ইংল্যাণ্ডের মতো ব্যবসায়ী জাতিসমূহ সর্বপ্রথমেই সংস্কার এবং প্রতিসংস্কার আন্দোলন থেকে বেরিয়ে আসে এবং আলাদা হবার জন্য অন্যান্যদের সঙ্গে সংগঠিত হয়ে রোমের বিপক্ষে যুদ্ধ করার ব্যাপারে সহনশীলতার পরিচয় দান করল। প্রাচীন গ্রিসের মতো ইংল্যাণ্ডও প্রতিবেশী দেশসমূহে একটা সফল প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হয়েছিল এবং যা গণতন্ত্র ও পার্লামেন্টারি শাসনব্যবস্থার জন্য যে পরিমাণ সংশয়বাদের প্রয়োজন তা সৃষ্টি করেছিল। আজকের অসহিষ্ণু যুগে তা সম্ভব নয় বলে মানুষ ফ্যাসিবাদ এবং বলশেভিক মতবাদকে তার স্থলাভিষিক্ত করতে চায়।

উনবিংশ শতাব্দীর পৃথিবী সম্পর্কে আমাদের যে সাধারণ ধারণা তারও চেয়ে অধিক ১৬৮৮ সালের বিদ্রোহের দর্শন জন লকের লেখায় যা প্রকাশ পেয়েছে, তার মধ্যে হৃদয়ঙ্গম করতে পারি। এই দর্শন ১৭৭৬ সালে আমেরিকা এবং ১৭৮৯ খ্রিষ্টাব্দে ফরাসিদেশে প্রভুত্ব বিস্তার করে এবং তার পরে পাশ্চাত্যের প্রায় দেশেই ছড়িয়ে পড়ল। শিল্পবিপ্লব এবং নেপোলিয়নকে পরাজিত করে ইংল্যাণ্ড যে সম্মান ও মর্যাদার অধিকারী হয়েছিল তাই ছিল এ দর্শনের ব্যাপক প্রসারের কারণ।

মানুষ ধীরে ধীরে এ ক্ষেত্রে একটি অপরিহার্য অসঙ্গতির বিষয়ে সচেতন হয়ে উঠেছে। লক এবং উনবিংশ শতাব্দীর উদারনৈতিক মতবাদ ছিল শিল্পনির্ভর নয়, বাণিজ্যনির্ভর। নিখুঁতভাবে যে দর্শন শিল্পনির্ভর তা সমুদ্রবিহারী অভিযাত্রী বণিকের দর্শনের চাইতে সম্পূর্ণ আলাদা। শিল্পবাদ সংযোজনধর্মী বৃহৎ অর্থনৈতিক এককের সৃষ্টি করে সমাজকে অধিকতর যান্ত্রিকতায় রূপান্তরিত করে এবং ব্যক্তির আশা আকাঙ্খর অবদমনের দাবি করে। তদুপরি, শিল্পবাদের অর্থনৈতিক সংগঠন কাঠামোর দিক দিয়ে এ পর্যন্ত কতিপয় ব্যক্তির দ্বারা নিয়ন্ত্রিত এবং আপাত-বিজয়ের মুহূর্তটিকে রাজনৈতিক গণতন্ত্রের নিরপেক্ষ রূপ দান করেছে। এ সকল কারণে মনে হয় যে আমরা সমন্বয়শীল অসহিষ্ণু নতুন একটি যুগের মধ্যে প্রবেশ করছি। যার ফল অন্যান্য যুগের দর্শনের সংঘাতের মত এযুগে যে যুদ্ধ হবে, তা বলাবাহুল্য মাত্র। আমি এই সম্ভাবনাকেই তুলে ধরে দেখাতে চাই।

আজকের পৃথিবীতে দুটো শক্তিশালী রাষ্ট্র রয়েছে, একটি সোভিয়েট রাশিয়া এবং অন্যটি আমেরিকার যুক্তরাষ্ট্র। তাদের লোকসংখ্যা সমান এবং যে সকল দেশকে নিয়ন্ত্রণ করে তাদের লোকসংখ্যাও প্রায় তাদের সমান। আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র, পশ্চিম ইউরোপসহ বাকি আমেরিকা মহাদেশকে নিয়ন্ত্রণ করে এবং রাশিয়া তুরস্ক,ইরান এবং চীনের অধিকাংশকেই নিয়ন্ত্রণ করে। এই বিভেদ মধ্যযুগের খ্রিষ্টান এবং মুসলমানদের বিভেদের কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়। সে আগের এত নীতির দ্বন্দ্ব, নির্জলা হিংসা এবং বিস্তৃত এলাকা সবকিছু এখনও বর্তমান। মধ্যযুগে খ্রিষ্টান শক্তির সঙ্গে মুসলমান শক্তির যেমন যুদ্ধ হয়েছিল তেমনি এ দুটো শক্তিমান শিবিরের মধ্যেও যুদ্ধ হবে। কিন্তু আমরা প্রত্যাশা করতে পারি যে শীগগীর অথবা বিলম্বে শান্তিচুক্তির মাধ্যমে তার নিরসন করা হবে এবং পরস্পরের মধ্যে ক্লান্তিজনিত সংঘর্ষ ছাড়া আর কিছুই হবে না। এ সংঘর্ষের ফলে দু’দলের একদল বিজয়ী এবং বিজয়ের ফলে যে সুবিধা আদায় করতে পারবে তা আমি মনে করি না। একদল অন্যদলকে ঘৃণা করবে এবং মন্দভাবে বলেই দু’দলের মধ্যে হিংসাত্মক মনোভাব অটুট থাকবে বলে আমি মনে করি এবং তাই হলো নীতিযুদ্ধের একটি বৈশিষ্ট্য।

আমি অবশ্য এ ধরনের কোন পরিণতি যে অবশ্যম্ভাবী সে সম্বন্ধে কোন নিশ্চয়তা দিচ্ছি না। এখন পর্যন্ত বিজ্ঞান যে যে পর্যায়ে তার চেয়ে অনেক দূর না এগিয়ে গেলে মানুষকে তার ভবিষ্যতের ব্যাপারে সবসময় অনিশ্চিতের উপর নির্ভর করতে হবে। আমার কথা হলো নির্দেশিত দিকে টেনে নেয়ার মত কিছু শক্তিশালী উপাদান রয়েছে যেহেতু এ শক্তিগুলো মনস্তাত্ত্বিক সেহেতু এগুলো মানুষের নিয়ন্ত্রণসাধ্য। যদি ক্ষমতার অধিকারী ভবিষ্যতে নীতিযুদ্ধের পুনঃ প্রবর্তন না করতে চায় তাহলে তারা অতি সহজে যুদ্ধ এড়িয়ে যেতে পারবে। ভবিষ্যত সম্পর্কে কোন অপ্রিয় মন্তব্য করে এবং মন্তব্যটাও যদি স্বাভাবিক যুক্তিসিদ্ধ না হয়, তাহলে জনগণকে তার ভবিষ্যদ্বাণী মিথ্যা প্রতিপন্ন করতে চেষ্টা করার জন্য অনুপ্রাণিত করা তার আংশিক কর্তব্য বিশেষ হয়ে দাঁড়ায়। যারা অশুভ ভবিষ্যতের ইঙ্গিত করেন, তারা যদি বিশ্বপ্রেমিক হন প্রথমে নিজেদেরকে ঘৃণিত করে তোলা উচিত, যাতে করে তাদের ভবিষ্যদ্বাণী সফল না হলে তারা অত্যন্ত অসুখী হতে পারেন। এই প্রাথমিক বোধটুকু নিয়ে আমি সম্ভাব্য নীতিযুদ্ধের ভিত্তিভূমি নির্ণয় করতে চাই এবং পরে এড়িয়ে যাওয়ার জন্যে কি পদ্ধতি অবলম্বন করতে হবে, তাতে হাত দেব।

অষ্টাদশ শতাব্দীর চাইতে অদূর ভবিষ্যতে সক্রিয় অসহিষ্ণুতার ক্ষেত্রজ কারণ হলো বৃহৎ সাম্যবাদী ইস্তাহারের চেয়েও পুরনো যুগের আসনে এখনো আসীন। বর্তমান ক্ষেত্রে এর যে প্রতিক্রিয়া আমাদের বুদ্ধিবৃত্তিতে শুরু হয়েছে, তাই আমাদের বিবেচনার বিষয়। কয়েকজনের হাতে ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হওয়ার ফলে মতামতের উৎসকে বন্ধ করে দেয়ার জন্য বর্ধিত মনোভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে। এ কারণে সংখ্যালঘু মতামত কখনো পরিপূর্ণ বক্তব্যের আঙ্গিকে প্রকাশ করার সুযোগ পায় না। সোভিয়েট রাশিয়াতে ক্ষমতাসীন দলের স্বার্থে রাজনৈতিকভাবে মতামতকে অবদমন করা হয়। প্রথমে মতামত অবদমদের পদ্ধতিটি সাফল্যজনক প্রমাণ হবে কিনা সে সম্পর্কে প্রচুর সন্দেহের অবকাশ ছিল, কিন্তু যতই বছরের পর বছর অতিক্রান্ত হচ্ছে ততই সে সন্দেহের নিরসন হচ্ছে। বাস্তব অর্থনীতিতে সুবিধা দেয়া হয়েছে, কিন্তু রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক থিয়োরি এমনকি দর্শনের দৃষ্টিভঙ্গীর মধ্যেও কোন বিশেষ সুবিধা দেয়া হয় না। কমিউনিজম ধীরে ধীরে ভবিষ্যৎ স্বর্গের অনুসন্ধানী এবং পার্থিব সম্পর্কবিমূর্খ একটি বিশ্বাসে পরিণত হচ্ছে। বেড়ে ওঠা নতুন যুগের মানুষ এই বিশ্বাসকে চরম সত্য বলে মেনে নিয়েছে, কারণ এর নির্মিতির যুগে সে সম্বন্ধে কেউ কোন প্রশ্ন ওঠায়নি। বর্তমানে সাহিত্যের ওপর, সংবাদপত্রের ওপর, বেতারের ওপর রাষ্ট্রের যে কর্তৃত্ব, আগামী বিশ বছর যদি তা বলবৎ থাকে তাহলে অধিকাংশ মানুষ কমিউনিস্ট দর্শনকে গ্রহণ করবে, তাতে সন্দেহ করার কোন সঙ্গত কারণ নেই। কিছু সংখ্যক বয়স্ক লোক যারা পূর্ব যুগের দর্শনের রিক্তাবশেষ এবং যারা স্বাধীন চিন্তা করেন তেমনি কতিপয় মানুষ কমিউনিজমের বিরোধিতা করবেন, দীর্ঘদিনের ব্যবধানেও যারা বিশেষ কোন প্রভাব সৃষ্টি করতে পারবেন না বলে মনে হয়। পৃথিবীতে সবসময় স্বাধীন চিন্তাবিদ ছিলেন। ইতালির অভিজাততন্ত্র সবসময় একদেশদর্শী ছিল, কিন্তু কোন আকস্মিক কারণে, আজকের মেক্সিকোর মতো তাদের মতামত রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে কার্যকরী হয়ে গেছে। প্রতিষ্ঠিত গির্জার সামান্য একটু শুভেচ্ছা থাকলে তা এড়ানো যায় এবং ধরে নেয়া যায়। রাশিয়ার প্রতিষ্ঠিত গির্জা এ ব্যাপারে যথকিঞ্চিত সদিচ্ছা দেখাতে পেরেছে। শিক্ষাবিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে তরুণ কৃষকদের মাঠে এনে কৃষিকার্যের পদ্ধতির ক্ষেত্রে তার ব্যক্তিত্ব স্বীকার করে নিয়ে তাকে নীতিতে বিশ্বাস করিয়ে নেয়া হচ্ছে। কমিউনিজম যেখানে গাঢ় নয় সেখানে তা শুধু অর্থনৈতিক রাজত্বমাত্র এবং যেখানে কমিউনিজম প্রগাঢ় সেখানে তা সাধারণত স্বীকৃত একটি বিশ্বাসের স্তরে উন্নীত হয়।

শুধুমাত্র এশিয়া অথবা রাশিয়ার অঞ্চলসমূহের মধ্যে এই পদ্ধতি অনুসৃত হচ্ছে। না। চীনদেশেও এ পদ্ধতি শুরু হতে যাচ্ছে, সম্ভবত তা অধিকতর শক্তিও সংগ্রহ করবে। চীনদেশের সবচেয়ে যা শক্তিশালী, বিশেষ করে বলতে গেলে জাতীয়তাবাদী সরকারের ওপর রাশিয়ানদের প্রভাব অপ্রতিহত। রাশিয়ানদের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত প্রচার প্রোপাগাণ্ডার কারণে দক্ষিণ বাহিনী সামরিক সাফল্য অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে। বৌদ্ধ ধর্ম এবং তাও মতবাদ প্রভৃতি প্রাচীন ধর্মে যে সকল চীনা রাজনৈতিক বিশ্বাসী তারা প্রতিক্রিয়াশীল। বিদেশীদের কাছে জাতীয়তাবাদীদের তুলনায় খ্রিষ্টানেরা অধিকতর বন্ধুভাবাপন্ন। এর কারণ হলো প্রধানতঃ জাতীয়তাবাদীদের সঙ্গে প্রাচীন ধর্মসমূহের কোনও বিরোধ নেই। দেশী হোক, বিদেশী হোক তাদের প্রসঙ্গে একই কথা খাটে। আনকোরা নতুন মতবাদ, প্রগতির শেষ অর্থ এবং তার সঙ্গে একটি বন্ধুত্বপূর্ণ শক্তি বলতে গেলে একমাত্র রাজনৈতিক বন্ধুত্বপূর্ণ শক্তির সংযোগ থাকার ফলে রাশিয়ার নতুন ধর্ম দেশপ্রেমিক জনসাধারণের মধ্যে ব্যাপক সাড়া জাগাতে সক্ষম হয়েছে। চীনদেশে কমিউনিজমকে গ্রহণ করেছে এটা কল্পনা করা অসম্ভব হলেও সন্দেহের কোন অবকাশ নেই।

বৃটিশদের সবচেয়ে বিরাট ভুল হলো অনুন্নত জাতির সম্বন্ধে বিবেচনা করার সময় তার ঐতিহ্যের শক্তিতে অতিমাত্রায় বিশ্বাস স্থাপন করে। চীনদেশে এমন প্রচুর ইংরেজ আছেন, যারা চীনের প্রাচীন সাহিত্য সম্বন্ধে জ্ঞান রাখেন, জনসাধারণের কুসংস্কারের সঙ্গে সুপরিচিত; এমনকি রক্ষণশীল সাহিত্যিকদের মধ্যে তাদের বন্ধু বান্ধবও আছেন, কিন্তু নব্যচীন সম্পর্কে অবজ্ঞেয় নিস্পৃহতা পোষণ করা ছাড়া সত্যিকারভাবে বোঝে এমন একজনও ইংরেজ সেখানে নেই। জাপানিদের বিতাড়নের মুখে চীনের অতীতকে দিয়ে ভবিষ্যৎ বিচার করে এবং বলে যে শিগগির কোন পরিবর্তনের আশঙ্কা নেই। জাপানে, যেমন চীনদেশকেও পাশ্চাত্যের অর্থনৈতিক এবং সামরিক শক্তি নতুন মর্যাদায় মণ্ডিত করেছে এবং ঘৃণার আসনেও বসিয়েছে। কিন্তু রাশিয়ানদের বেলায় ঘৃণার প্রকাশ ঘটবে না; কেননা রাশিয়ানেরা পাশ্চাত্যের অত্যাচার থেকে মুক্তি পাবার জন্য চীনাদের সাহায্য করবে, দ্রুত পরিবর্তনের সাহায্যেই অশিক্ষিত মানুষের মধ্যে সহজেই প্রতিক্রিয়ার সঞ্চার করানো যায়। কারণ শিক্ষাব্যবস্থার পেছনে সরকারি সাহায্যের গৌরব রয়েছে বলে তরুণেরা বয়স্ক শিক্ষিতদেরকে সহজেই ঘৃণা করতে শেখে।

সুতরাং আগামী বিশ বছরের মধ্যে সমগ্র চীনদেশে কোনও উপায়েই বলশেভিক মতবাদকে প্রতিরোধ করা যাবে না এবং চীনারা রাশিয়ানদের সঙ্গে একটি ঘনিষ্ট রাজনৈতিক চুক্তিতে আবদ্ধ হবে। ধীরে ধীরে শিক্ষাব্যবস্থার মাধ্যমে পৃথিবীর অর্ধেক জনসংখ্যার মনে এ মতবাদটিকে প্রবিষ্ট করিয়ে দেয়া হবে। তারপরে আর অর্ধেক জনসাধারণের কি অবস্থা হবে।

প্রতীচ্য জগতের যেখানে সরকারের গোঁড়ামির এবং পূর্বাবস্থার কোনও পরিবর্তন নেই, বরঞ্চ সূক্ষ এবং সুপ্রচুর পদ্ধতিতে সেগুলোকে ধরে রাখা হয়েছে, আসলে প্রচলিত পদ্ধতির একটাও কোন প্রতিষ্ঠিত উদ্দেশ্য ছাড়া বেড়ে উঠতে পারেনি। আধুনিক বিশ্বাসকে খাঁটিভাবে ইউরোপে দেখা যায় না, মধ্য যুগের নানা বিশ্বাসের অপভ্রংশ ও আধুনিক বিশ্বাসের সঙ্গে জড়িয়ে থাকতে দেয়া যায়। একমাত্র আমেরিকার যুক্তরাষ্ট্রেই ধনতান্ত্রিক শিল্পবাদ সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে বিকশিত হয়েছে এবং সেখানে এর লক্ষণগুলো অত্যন্ত সুস্পষ্ট। পশ্চিম ইউরোপকে অবশ্যই পদে পদে আমেরিকান চরিত্রটি গ্রহণ করতে হবে, একারণে যে আমেরিকা এখন পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী রাষ্ট্র। একথার মানে আমি এ বলছিনা যে আমাদেরকে মৌলিকভাবে সে নীতি গ্রহেণ করতে হবে যা ছিল ধার্মিক কৃষকদের মধ্যে বপনকৃত ইউরোপিয়ানদের বিলম্বিত বিশ্বাস। আমেরিকার কৃষিপ্রধান অংশ, আন্তর্জাতিক দিক দিয়ে খুব গুরুত্বপূর্ণ এবং মহৎ বিশ্বাস। কিন্তু এই বিশ্বাসটি আমেরিকাতে একরকম রাশিয়াতে আরেক রকম। এই দুই প্রতিষ্ঠানের বৈপরিত্যই পৃথিবীর সুখ শান্তির সঙ্গে জড়িত।

রাশিয়ার মত আমেরিকারও একটি আদর্শ আছে, তার বাস্তব রূপায়ণ এখনো হয়নি। শুধু থিয়োরিগতভাবে সে আদর্শের সঙ্গে মূল্যবোধের সংযোজন করা হয়েছে। কমিউনিজম হলো রাশিয়ার আদর্শ আর আমেরিকার আদর্শ হলো স্বাধীন প্রতিযোগিতা। যে অর্থনৈতিক পদ্ধতি রাশিয়ান আদর্শের চূড়ান্ত প্রতিবন্ধক সে পদ্ধতিই হচ্ছে আমেরিকান আদর্শের পরম সহায়। কমিউনিস্টরা যেখানে সংগঠনের ভিত্তিতে চিন্তা করে, সেখানে আমেরিকানরা ব্যক্তির পরিপ্রেক্ষিতে চিন্তা করে। রাজনীতিতে যারা তরুণ তাদের সামনে লগ কেবিন থেকে হোয়াইট হাউজ’ নীতিকে তুলে ধরা হয়, ব্যবসার ক্ষেত্রে উন্নতি করার জন্য অনুরূপ একটি অর্থনৈতিক পদ্ধতিরও জোড়ালো বিজ্ঞাপন দান করা হয়। এটা সত্য কথা যে, সকলের পক্ষে হোয়াইট হাউজে প্রবেশ করা অথবা কোন কর্পোরেশনের প্রেসিডেন্ট হওয়া সম্ভব নয়, কিন্তু তা পদ্ধতির দোষ নয়। প্রত্যেক যুবকের কাছে আবেদন করে সঙ্গীদের চেয়ে অধিকতর পরিশ্রমী এবং বুদ্ধিমান করে তোলবার জন্য তা করা হয়। আমেরিকাতে তখন এত সুযোগ ছিল যে অধিকাংশ লোকের পক্ষে অন্যের ঘাড়ের ওপর পা না রেখে কিছু পরিমাণ সাফল্য অর্জন করতে পারা যেত। এখনও মানুষ সেখানে শুধু জাগতিক উন্নতির প্রত্যাশা করে এবং শক্তির পরোয়া করে না। আমেরিকার একজন মজুর মহাদেশের অন্যান্য মানুষের চাইতে বেশি আয়ও করতে পারে।। কিন্তু ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হয়ে আসছে। যারা সুযোগ সুবিধা থেকে বাদ পড়েছে: দাবি দাওয়া নিয়ে আসবে অন্তত তাদের কাছ থেকে একটা বিপত্তি প্রত্যাশা করা যেতে পারে। নেপোলিয়নের প্রতিভাবানেরা অনেক কিছু করতে পারে এ বাণীতে বিশ্বাস স্থাপন করে বাদবাকি কাজ সমষ্টিগত প্রচেষ্টা ব্যতিরেকে ব্যক্তিক চেষ্টায় সাফল্যমণ্ডিত করতে পারে বলে মনে করে। কমিউনিজম দর্শনে গ্রুপ অথবা দলই হলো সাফল্যের মূল কারণ, কিন্তু আমেরিকান দর্শন অনুসারে ব্যক্তি প্রাধান্য লাভ করে। ফলতঃ যে লোক কোন কাজে সফলতা অর্জন করতে অকৃতকার্য হয়, সমাজকে দোষী করা অথবা সমাজের ওপর রাগ পোষণ করার চাইতে নিজের অক্ষমতার জন্য লজ্জিত হয়। একজন ব্যক্তি যদি ব্যক্তিকেন্দ্রিক দর্শনে অভ্যস্ত হয়ে থাকে তাহলে সমন্বিত প্রচেষ্টায় কিছুই অর্জন করা যায় না বলে মনে করে। ক্ষমতার অধিকারী যারা তারা যখন সামাজিক পদ্ধতির সুযোগ গ্রহণ করে অর্থ সম্পদের মালিক হয় এবং বিশ্বজোড়া প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হয়, তাদের বিরুদ্ধে কোন সার্থক বিরোধিতা সম্ভব হয়ে ওঠেনা।

এমন কোন সময় ছিলনা যখন মানুষের আকাঙ্খিত বস্