আমি বললাম, সব ধর্মেই তো অনন্ত জীবনের প্রতিশ্রুতি রয়েছে। ইসলাম ধর্মেও পরকালের ভূমিকাকে বড় করে দেখানো হয়েছে।
স্যার বললেন, ইসলাম ধর্মের সঙ্গে অন্যান্য ধর্মের একটা বড় পার্থক্য এইখানে যে ইসলাম ধর্মেও পরকালের গুরুত্ব স্বীকার করা অইছে, কিন্তু ইহকালের গুরুত্বও অস্বীকার করা অয় নাই। ফিদ্দুনিয়া ওয়াল আখেরাতের কথা ইসলামে যেভাবে বলা আইছে, অন্য কোনো ধর্মে সেরকম নাই। তিনি বললেন, ইন্ডিয়ার কথাই ধরেন না কেন, এইখানে যত কাব্য লেখা অইছে, যত স্থাপত্য এবং ভাস্কৰ্যকীর্তি তৈয়ার অইছে, তার লক্ষ্য আছিল দেবতার সন্তোষ সাধন। মানুষের ভোগ, উপভোগ, আনন্দের কথা প্রসঙ্গক্রমে বলা অইলেও মূল গতিমুখ আছিল দেবতাদের সন্তুষ্ট করা। এই জিনিসটা বাংলা সাহিত্যেও দেখতে পাইবেন। ভারতচন্দ্র এইটিনথ সেঞ্চরিতে অন্নদামঙ্গল কাব্য দেবীর আদেশে, দেবীর পূজা প্রচলন করার উদ্দেশ্যে লিখতে বইছেন। মুসলমানেরা এই দেশে আইস্যা মসজিদ এবং অন্যান্য ধৰ্মস্থান সুন্দর কইর্যা বানাইছে, এই কথা যেমন সত্য, তেমন বাস করবার ঘরটারেও সুন্দর কইর্যা বানাইতে ভুল করেন নাই। এই জিনিস আপনে এ্যানসিয়েন্ট ইন্ডিয়াতে পাইবেন না। সেকুলারাইজেশন ইফেক্ট অব ইসলাম অন ইন্ডিয়া ওয়াজ রিয়্যালি ইনারমাস। এই কথা এখন অনেকে মাইন্যা নিবার চান না।
আমি বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ওপর নাতিক্ষুদ্র একটি পুস্তিকা লিখেছিলাম। ওতে কিছু নতুন কথা সাহস করে বলেছিলাম। লেখাটির বক্তব্য নিয়ে ঢাকা এবং কলকাতার পণ্ডিতদের মধ্যে উত্তপ্ত বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছিল। অনেকে আমার সঙ্গে একমত হয়েছিলেন। অপরদিকে আমার মতের বিরোধিতা যারা করছিলেন, তাদের সংখ্যাও অল্প ছিল না। আমার ইচ্ছে ছিল রাজ্জাক স্যার আমার লেখাটি সম্পর্কে কী ধারণা পোষণ করেন। একসময়ে গিয়ে জেনে নেবো। নানা কাজে ব্যস্ত থাকতে হয়। স্যারও থাকেন অনেক দূরে। কখন বাসায় থাকেন তারও ঠিক নেই। নানা মানুষ তাকে ধরে নানা জায়গায় নিয়ে যান। যাহোক, এক সন্ধ্যায় স্যারের বাড়িতে গেলাম। তিনি সিঙ্গাপুর থেকে কয়েকদিন হল চিকিৎসা সেরে এসেছেন। আমাকে দেখামাত্রই স্যার টেবিল থেকে বঙ্কিমের ওপর আমার লেখা বইটি হাতে তুলে নিয়ে বললেন, এই যে আপনের লেখা।
আমি একটুখানি বিস্মিত হয়ে বললাম, স্যার, আমি তো আপনাকে বইটা দিতেই এসেছি, আপনি কীভাবে পেলেন।
স্যার বললেন, আপনে দেওনের আগে পাইছি।
আমি জানতে চাইলাম, স্যার লেখাটি পড়েছেন।
আমি অপেক্ষা করছিলাম। তার মতামত জানার জন্য। স্যার এভাবে কথা শুরু করলেন, একটা কবিতা আছে না—‘আমি থাকি ছোট ঘরে বড় মন লয়ে, নিজের দুঃখের অন্ন খাই সুখী হয়ে।‘
বঙ্কিমের ব্যাপারে জিনিসটা অইব একেবারে উল্টা অর্থাৎ আমি থাকি বড় ঘরে ছোট মন লয়ে। হের উপরে আপনের সময় নষ্ট করার প্রয়োজন আছিল না। আপনের ত অঢেল ক্ষমতা, অপাত্রে নষ্ট করেন ক্যান? ইচ্ছা করলে অন্য কাম করবার পারেন।
একজন লেখক হিসেবে বঙ্কিমের চাপিয়ে দেয়া ধারণার প্রতিবাদ করার প্রয়োজনীয়তা আমি অনুভব করেছি, একথা স্যারকে বারবার করে বুঝিয়ে বলেও সন্তুষ্ট করতে পারলাম না।
কয়েক বছর থেকে একটা জিনিস। আমি লক্ষ করে আসছি। আমার কোনো লেখা যদি স্যারের মনঃপূত না হয়, স্যার সেই রচনা সম্পর্কে কোনো মন্তব্যই করেন না। শেলফ থেকে টলস্টয়ের ওয়ার অ্যান্ড পীস নিয়ে আলোচনা করতে শুরু করেন। এই উপন্যাসে যুদ্ধের দৃশ্য কত নিপুণভাবে বর্ণিত হয়েছে, মানব-চরিত্রের গভীরে ড়ুব দিয়ে টলস্টয় কত বিশদভাবে ছোটো বড় চরিত্র বিকশিত করে তুলেছেন, নিসর্গদৃশ্য, নরনারীর প্রেম। এসব টলস্টয় যতো মুন্সিয়ানা সহকারে এঁকেছেন, জগতের কোনো লেখকের সঙ্গে তার তুলনা চলে না। অনেকবার কথাবার্তার মাঝখানে উঠে গিয়ে ওয়ার অ্যান্ড পীস উপন্যাসটি টেনে নানাদিক সম্পর্কে কথাবার্তা বলেছেন। বছরখানেক আগে একবার বলেছিলেন, টলষ্টয়াকে যদি সামন্তসমাজের ক্রিটিক হিসেবে ধরা হয়, তা হলে সালঝেনিতসিনকে বলতে হবে কমিউনিস্ট সমাজের ক্রিটিক। বঙ্কিমের ওপর কথা বলতে গিয়ে আজও স্যার টলষ্টয়ের ওয়ার অ্যান্ড পীসের ওপর এন্তার কথাবার্তা বললেন।
সেদিন ঘরে ফেরার সময় আমার মনে আচমকা একটা নতুন চিন্তা এলা। স্যার দীর্ঘদিন ধরে আমাকে টলষ্টয়ের ওয়ার অ্যান্ড পীস উপন্যাস সম্পর্কে এত আগ্রহী করার চেষ্টা করছেন কেনো? আমি নিজেকেই প্রশ্ন করলাম তার পেছনে স্যারের কি কোনো উদ্দেশ্য আছে? তখনই মনের ভেতর থেকে জবাব পেলাম। স্যার বোধ করি চান যে আমি ওয়ার অ্যান্ড পীসের মতো কোনো বড় কাজ করার চেষ্টা করি না কেনো? এইরকম একটি বড় উপন্যাস রচনা করার দাম আমার আছে কি না জানি না। আমার ধারণা সঠিক কি না পরখ করার জন্য একদিন স্যারের কাছেই সরাসরি প্রশ্ন করে বসলাম, স্যার, আপনি কি চান ওয়ার অ্যান্ড পীসের মতো একটি বড় উপন্যাস লেখার কাজে আমিও হাত দিই? স্যার সোজাসুজি আমার দিকে ভালো করে তাকালেন। হ, এতদিনে বুঝবার পারছেন?
রাজ্জাক স্যার আমার সঙ্গে কখনো আমার রচনার ভালোমন্দ কোনোকিছু আলোচনা করেননি। অন্যের মুখে শুনেছি, আমার লেখা তিনি পছন্দ করেন। তারিফ শুনতে কার না ইচ্ছে হয়! আমি একাধিকবার জানতে চেয়েছি, স্যার আমার লেখা আপনার কেমন লাগে, স্যার জবাব দিয়েছেন, না বাবা, আপনেগো লেখার ভালোমন্দ এখনও কইবার পারুম না। লেখার ক্ষমতা আছে লেইখ্যা যান। নিজের খুশিতে লেখবেন। অন্য মাইনষে কী কাইব হেইদিকে তাকাইয়া কিছু লেখবেন না।
